মানবসভ্যতাকে একজন মুসাফিরের সাথে তুলনা করা যেতে পারে, যাকে তার মালিক প্রেরণ করেছেন। যে সফরের একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও গন্তব্য রয়েছে। মালিক সফরের সকল পাথেয়র ব্যবস্থা করেছেন। পথ দেখানোর জন্য রাহবারের এন্তেজাম করেছেন। অন্ধকারে চলার জন্য আলো দান করেছেন। কিন্তু সে তার এ সফরে বারবারই পথ হারিয়েছে। রাহবারের দেখানো পথে হাঁটেনি। মালিকের দেওয়া আলো জ্বেলে রাখতে পারেনি, অন্ধকারে তার দ্বারা উপকৃত হতে পারেনি। বারবারই খাদের কিনারায় পৌঁছেছে। নিজেকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়েছে। কিন্তু মালিক তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেননি। আবারও রাহবার প্রেরণ করেছেন, বারবার আলোর ব্যবস্থা করেছেন, যেন সে তাঁর গন্তব্যে পৌঁছতে পারে, নিজেকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে। সেই ধারাবাহিকতায় মালিকের প্রেরিত রাহবার যখন দুনিয়া ত্যাগ করেছেন, তার রেখে যাওয়া মশালের আলো যখন নিভুনিভু করছে- রাস্তা তো দূরের কথা সে আলোতে মুসাফির নিজেকে পর্যন্ত চিনতে পারছে না। পথহারা, ক্ষত-বিক্ষত সে মুসাফির মৃতপ্রায় অবস্থায় ধ্বংস গহ্বরের খাদে শেষক্ষণ গুনছে। যে কোনো মুহূর্তে তার লীলা সাঙ্গ হতে পারে। ইসলামপূর্ব জাহিলিযুগকে এক কথায় প্রকাশ করলে উল্লেখিত মুসাফিরই হবে তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন,
وَكُنْتُمْ عَلَى شَفَا حُفْرَةٍ مِنَ النَّارِ فَأَنْقَذَكُمْ مِنْهَا অর্থ: তোমরা তো অগ্নিকুণ্ডের প্রান্তে ছিলে, আল্লাহ তা হতে তোমাদের রক্ষা করেছেন। [সূরা আলে ইমরান-১০৪] কিন্তু আল্লাহ তাআলা তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেননি। আবারও রাহবার প্রেরণ করেছেন, অন্ধকারে আলোর ব্যবস্থা করেছেন। তার শরীরে ছড়িয়ে পড়া প্রতিটি রোগ নিরাময়ে চিকিৎসা প্রদান করেছেন। যেন আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে, সঠিক পথে এগিয়ে যেতে পারে, তার লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে। কুরআনে বিষয়টি এভাবে তুলে ধরা হয়েছে :الر .كِتَابٌ أَنْزَلْنَاهُ إِلَيْكَ لِتُخْرِجَ النَّاسَ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ بِإِذْنِ رَبِّهِمْ إِلَى صِرَاطِ الْعَزِيزِ الْحَمِيدِ অর্থাৎ, আলিফ-লাম-রা, এই কিতাব, এটি তোমার প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছে, যাতে তুমি মানবজাতিকে তাদের প্রতিপালকের নির্দেশক্রমে বের করে আনতে পার অন্ধকার হতে আলোতে। [সূরা ইবরাহিম- ১]
هُوَ الَّذِي يُنَزِّلُ عَلَى عَبْدِهِ آيَاتٍ بَيِّنَاتٍ لِيُخْرِجَكُمْ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ وَإِنَّ اللَّهَ بِكُمْ لَرَءُوفٌ رَحِيمٌ অর্থাৎ, তিনিই তাঁর বান্দার প্রতি সুস্পষ্ট আয়াত অবতীর্ণ করেন, তোমাদেরকে অন্ধকার হতে আলোতে আনার জন্য। আল্লাহ তো তোমাদের প্রতি করুণাময়, পরম দয়ালু। [সুরা হাদিদ- ৯]
يَاأَهْلَ الْكِتَابِ قَدْ جَاءَكُمْ رَسُولُنَا يُبَيِّنُ لَكُمْ كَثِيرًا مِمَّا كُنْتُمْ تُخْفُونَ مِنَ الْكِتَابِ وَيَعْفُو عَنْ كَثِيرٍ قَدْ جَاءَكُمْ مِنَ اللَّهِ نُورٌ وَكِتَابٌ مُبِينٌ يَهْدِي بِهِ اللَّهُ مَنِ اتَّبَعَ رِضْوَانَهُ سُبُلَ السَّلَام وَيُخْرِجُهُمْ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ بِإِذْنِهِ وَيَهْدِيهِمْ إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِي
অর্থাৎ, হে কিতাবীগণ! আমার রাসূল তোমাদের নিকট এসেছে, তোমরা কিতাবের যা গোপন করতে সে এর অনেক কিছু তোমাদের নিকট প্রকাশ করে এবং অনেক কিছু উপেক্ষা করে থাকে। আল্লাহর নিকট হতে এক আলোকবর্তিতা ও সু¯পষ্ট কিতাব তোমাদের নিকট এসেছে। যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করতে চায়, এটা দিয়ে তিনি তাদেরকে শান্তির পথে পরিচালিত করেন এবং নিজ অনুমতিক্রমে অন্ধকার হতে বের করে আলোর দিকে নিয়ে যান এবং এদেরকে সরল পথে পরিচালিত করেন। [সূরা মায়িদা : ১৫, ১৬]
مَا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِنْ رِجَالِكُمْ وَلَكِنْ رَسُولَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ وَكَانَ اللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اذْكُرُوا اللَّهَ ذِكْرًا كَثِيرًا وَسَبِّحُوهُ بُكْرَةً وَأَصِيلًا هُوَ الَّذِي يُصَلِّي عَلَيْكُمْ وَمَلَائِكَتُهُ لِيُخْرِجَكُمْ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ وَكَانَ بِالْمُؤْمِنِينَ رَحِيمًا
অর্থাৎ, মুহাম্মাদ তোমাদের মধ্যে কোনো পুরুষের পিতা নন; বরং সে আল্লাহর রাসূল এবং শেষ নবী। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ। হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে অধিক স্মরণ করো এবং সকাল সন্ধ্যায় আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করো। তিনি তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেন এবং তাঁর ফেরেশতাগণও তোমাদের জন্য অনুগ্রহ প্রার্থনা করে অন্ধকার হতে তোমাদেরকে আলোর পথে আনার জন্য এবং তিনি মুমিনদের প্রতি পরম দয়ালু। [সূরা আহযাব: ৪০-৪৩]
رَسُولًا يَتْلُو عَلَيْكُمْ آيَاتِ اللَّهِ مُبَيِّنَاتٍ لِيُخْرِجَ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ وَمَنْ يُؤْمِنْ بِاللَّهِ وَيَعْمَلْ صَالِحًا يُدْخِلْهُ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا قَدْ أَحْسَنَ اللَّهُ لَهُ رِزْقًا
মোটকথা, খ্রিষ্টিয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে মানবসভ্যতা এমন এক সময় পার করছিল, যার সামনে ছিল না সুস্পষ্ট কোনো গন্তব্য, পথ চলার মতো সামান্য আলো। ব্যক্তি থেকে নিয়ে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র কোথাও নীতি-নৈতিকতার কোনো বালাই ছিল না। ধর্ম, সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি সবখানেই চলছিল শুধু অরাজকতা। প্রতিটি মানব সন্তান আত্মবিস্মৃত অবস্থায় কামনা আর প্রবৃত্তির গোলক ধাঁধায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের কাছে আসমানী কোনো জ্ঞান ছিল না, নিজেদের খেয়াল-খুশি অনুযায়ী যার তার সামনে মাথানত করত। ঈসা আ. কে উঠিয়ে নেওয়ার পরপরই তার অনুসারীরা চরম মতানৈক্যে লিপ্ত হয়। সেন্টপলের কল্যাণে শেষ পর্যন্ত তা এক পৌত্তলিকায় রূপ নেয়। ইহুদিরা নিজেদের কাছে থাকা আসমানি জ্ঞানকে দুনিয়া কামানোর মাধ্যম বানিয়ে রেখেছিল। যার কারণে আল্লাহর পক্ষ থেকে স্থায়ীভাবে তাদের উপর লাঞ্ছনা চাপিয়ে দেওয়া। পরবর্তী লাইনগুলোতে নবি মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা. এর আগমনের পূর্বে পৃথিবীতে বিরাজমান অবস্থা অনুসন্ধান করার চেষ্টা করব, ইনশাআল্লাহ।
আরবদের অবস্থা
জাহিলী আরব সমাজে কিছু উন্নত ও মহৎ গুণ পরিলক্ষিত হত। অসীম সাহসিকতা, স্বাধীনচিতা, সরলতা, উদারতা, বদান্যতা, একনিষ্ঠতা, আতিথেয়তা, কাব্যচর্চা, বাগ্মিতা, মহানুভবতা, আত্মসম্মানবোধ, গোত্রের প্রতি আনুগত্য প্রভৃতি মহৎ গুণরাজি সমাজের মানুষের মধ্যে লক্ষ করা যেত। শত্রুর সাথে তারা বিশ্বাসঘাতকতা করত না। আশ্রিতজন শত্রু হলেও জীবনের বিনিময়ে তাকে রক্ষা করত। নিঃসন্দেহে এগুলো ছিল আরব চরিত্রে প্রশংসনীয় দিক। কিন্তু নবীগণের শিক্ষা থেকে দূরে অবস্থান, দীর্ঘকাল যাবত একই উপদ্বীপে আটকে থাকা এবং বাপ-দাদার ধর্ম ও ঐতিহ্যকে শক্তভাবে আঁকড়ে থাকার কারণে ধর্মীয় ও নৈতিক দিক থেকে তাদের অবস্থান ছিল খুবই শোচনীয়। খ্রিষ্টিয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে তারা অধঃপতনের চূড়ান্ত সীমায় উপনীত হয়। প্রকাশ্যে মূর্তীপূজায় লিপ্ত ছিল তারা এবং তারাই এর নেতৃত্ব দিত। মোটকথা, আল্লাহপ্রদত্ত জীবনের অধিকাংশ সৌন্দর্য থেকে তারা বঞ্চিত ছিল এবং জাহিলি জীবনের নিকৃষ্ট বৈশিষ্ট্যে ও দোষত্রুটিতে নিমজ্জিত ছিল।
মূর্তীপ্রীতি ও দেবদেবীর আধিক্য
অজ্ঞতা ও মূর্খতার নিশ্চিত ফল স্বরূপ সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর সাথে সম্পর্ক নষ্ট হতে থাকে। আল্লাহর একত্ববাদ ও তার ইবাদাত বিশিষ্ট কিছু লোকের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। এক সময় তারা প্রকাশ্যে মূর্তীপূজা শুরু করে এবং তাদেরই সমীপে নিজেদের সকল ইবাদত ও প্রার্থনা পেশ করতে থাকে; যদিও তারা তখনও সৃষ্টিকর্তা হিসেবে আল্লাহকে স্বীকার করত। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন, وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ مَنْ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَسَخَّرَ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ لَيَقُولُنَّ اللَّهُ فَأَنَّى يُؤْفَكُونَ অর্থাৎ, যদি তাদের জিজ্ঞাসা করা হয় আসমান ও জমিন কে সৃষ্টি করেছে, তবে অবধারিতভাবেই তারা বলবে, ‘আল্লাহ’। [সুরা আনকাবুত : ৬১]
কিন্তু সৃষ্টিকর্তার সাথে তাদের আত্মিক কোনো সম্পর্ক ছিল না। তাদের সম্পর্ক হয়েছিল তাদেরই হাতে গড়া মূর্তীগুলোর সাথে। আরবে প্রতিটি নগর, বন্দর ও শহরে, এমনকি প্রতিটি পরিবারে বিশেষ বিশেষ মূর্তী ছিল। ঐতিহাসিক কালবি বলেন, ‘মক্কার প্রতিটি ঘরে একটি নিজস্ব মূর্তী ছিল। কেউ ভ্রমণের ইচ্ছা করলে তার সর্বশেষ কাজ ছিল ঘরের মূর্তী স্পর্শ করা। আবার সফর থেকে ফেরার পরও ভক্তিভরে ওই মূর্তীর পা স্পর্শ করা।’
মূর্তীর ক্ষেত্রে তারা এতটাই বাড়াবাড়ি করত যে, কেউ বানাত মূর্তী আবার কেউ বানাতো মূর্তীর ঘর। আর যে ব্যক্তি কোনোটিই বানাতে পারত না, সে হারামের সামনে বা ভিন্ন কোথাও একটি পাথর গেড়ে কাবার মতো সম্মানের সাথে -তাওয়াফ করতে থাকত। এ সকল পাথরকে তারা ‘আনসাব’ বলত। খোদ কাবা শরিফের প্রাঙ্গনে ৩৬০টি মূর্তী রক্ষিত ছিল। মূর্তীপূজায় তারা এতটাই বুঁদ হয়ে ছিল যে, পাথর জাতীয় কিছু একটা পেলেই তার পূজা করা শুরু করত।
ইমাম বুখারী রাহ. তাঁর সহিহ গ্রন্থে আবু রজা আল উতারিদি থেকে বর্ণনা করেন, ‘আমরা পাথর পূজা করতাম। তার চেয়েও ভালো ও উন্নত কোনো পাথর পাওয়া গেলে আগেরটা ছুড়ে ফেলা হতো। আর কখনো কোনো পাথরই না পাওয়া গেলে একটি মাটির ঢিবি বানানো হতো এবং ছাগল এনে সেখানে দুধ দোহন করা হতো। এরপর তা তাওয়াফ করা হতো।’
ইবনুল কালবি বলেন, ভ্রমণকালে কোনো লোক নতুন জায়গায় অবতরণ করলে সেখান থেকে চারটি পাথর উঠিয়ে আনত। সবচে ভালোটিকে উপাস্য হিসেবে গ্রহণ করত। আর বাকি তিনটি রাখত হাঁড়ি বসিয়ে রান্নার জন্য। প্রস্থানের সময় ওগুলো সেখানেই ফেলে যেত।
এছাড়াও তাদের দেব-দেবীর সংখ্যা ছিলো অনেক। ফেরেশতা, জিন, নক্ষত্র সবই এর শামিল ছিল। ঐতিহাসিক কালবি বর্ণনা করেন, খুজাআ গোত্রের একটি শাখা ছিল বনু মালিহ। তারা জিনদের পূজা করত। সা‘দ বর্ণনা করেন, হিময়ার গোত্র সূর্যের পূজা করত। কিনানা গোত্র চাঁদের পূজারী ছিল। বনু তামিম ওয়াবরানের, লাখম ও জুযাম বৃহস্পতির, ত্বই গোত্র সুহায়ল-এর, বনু কায়স শে’রা নক্ষত্রের এবং বনু আসাদ বুধ গ্রহের পূজা করত।
নৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয়
যে জাতি তার রবের পরিচয় হারিয়েছে, সামান্য পাথরের সামনে যারা মাথা ঠুকে- নৈতিক ও সামাজিকভাবে যে তারা কতটা অবক্ষয়ের শিকার হয়েছিল তা সহজেই অনুমেয় এবং তার কারণও স্পষ্ট। মদপান ছিল তখনকার আরব সমাজে খুবই স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য বিষয়। যার কারণে দেখা যায় তাদের সাহিত্য ও কাব্যের এক বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে এর আলোচনা। আরবী ভাষায় মদের অসংখ্য নাম রয়েছে এবং নামের মধ্যেই সেগুলোর সূক্ষ্ম পার্থক্যের দিকে ইঙ্গিত রয়েছে, তা থেকেও এর ব্যাপকতা ও গ্রহণযোগ্যতার বিষয় অনুমান করা যায়। মদের দোকান ছিল প্রকাশ্য রাস্তার পার্শ্বে। চেনার সুবিধার্তে দোকানের ওপর পতাকা উড়ানো হতো। জুয়া ছিল তখনকার সময়ে গর্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক। তারা মনে করত, কেবল কাপুরুষ ও নিস্তেজ লোকেরাই এতে অংশ গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকে। প্রসিদ্ধ তাবিয়ি কাতাদা রাহ. বলেন, ‘জাহিলি যুগে একজন তার ঘরবাড়ি জুয়ায় বাজি রাখত। এরপর তা হারিয়ে ফেলফেল দৃষ্টিতে প্রতিপক্ষের হাতে তা দেখত। এর ফলে তার অন্তরে ঘৃণা ও শত্রুতার আগুন জ্বলে উঠত এবং শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ-বিগ্রহের রূপ পরিগ্রহ হতো।
তখনকার আরবরা বিশেষত ইহুদিরা সুদি লেনদেনের সাথে জড়িত ছিল এবং তা ছিল চক্রবৃদ্ধি হারে। এ ধারাবাহিকতায় ইতিহাস অনেক নির্মম ঘটনার সাক্ষী হয়ে আছে। জিনা ব্যাভিচারকে তখনকার সমাজে ততটা দূষণীয় মনে করা হতো না। আরবদের জীবনে এটি খুব স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল এবং তার জন্য রকমারি পদ্ধতিও প্রচলিত ছিল।
যুদ্ধবিগ্রহ
প্রাচীন গোত্রতান্ত্রিক শাসনই ছিল আরবদের রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তিমূল। তাদের গোত্রপ্রীতি ও বন্ধন ছিল সুদৃঢ়। প্রত্যেক গোত্রে একজন গোত্রপতি বা শাইখ নির্বাচিত হতেন। প্রার্থীর বংশ গৌরব, মহানুভবতা, বীরত্ব, বিচার-বুদ্ধি, বয়স, পদমর্যাদা ও আর্থ-সামাজিক দিক দিয়ে অগ্রসরতার দিক বিবেচনা করে গণতান্ত্রিকভাবে ‘শাইখ’ নির্বাচিত হতেন। গোত্রপতির প্রতি আনুগত্য ছিল অপরিহার্য। গোত্রীয় শাসনে কোন সুনির্দিষ্ট বিধান ছিল না। গোত্রপতিরা পরামর্শ সভার মতানুসারে শাসন, বিচার, যুদ্ধ ও অন্যান্য কার্যাবলী সম্পাদন করতেন। সাধারণ সমস্যাগুলো “দারুন্ নদ্ওয়ার” সভায় আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হত। কাবা শরীফের কারণে মক্কানগর ও নগরবাসী-কুরাইশদের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। এ কারণে কুরাইশ গোত্রের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা এবং পার্শ্ববর্তী আরো কিছু গোত্রের মধ্যে একটি মৈত্রীজোট বা গোত্র-কমনওয়েলথের রূপ লাভ করে। এ জোটের নেতাদের পরামর্শ অনুযায়ী একটি আন্তগোত্রীয় শাসন ব্যবস্থাও গড়ে ওঠে। এ সময়ে কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা না থাকায় গোত্রে গোত্রে দ্বন্দ-কলহ এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। গোত্রের মান-সম্ভ্রম ও স্বার্থ রক্ষার জন্য সদস্যগণ জীবন পর্যন্ত বিসর্জন দিত। এ গোত্র-কলহ ও বিসংবাদ কখনো বংশানুক্রমিকভাবে চলত। “খুনের বদলে খুন” এ ধারায় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ত বছরের পর বছর। গোত্রে গোত্রে যুদ্ধের ভয়াবহ দিনগুলোকে “আইয়ামুল আরব” বলা হত। ঐতিহাসিক গীবনের মতে, “অন্ধকার যুগে আরবে গোত্রীয় দ্বন্দের কারণে ১৭০০ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। বুয়াসের যুদ্ধ, ফিজারের যুদ্ধ, বসুসের যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্যে ছিল উল্লেখযোগ্য। উটকে পানি খাওয়ানোর সামান্য ঘটনা কেন্দ্র করে বনু বকর ও বনু তগলিব গোত্রের মধ্যে সুদীর্ঘ ৪০ বছর ব্যাপী যুদ্ধ চলে ছিল। যুদ্ধ তাদের জীবনের একটি অনিবার্য প্রয়োজনের চেয়েও বেশি ক্রীড়া-কৌতুক ও চিত্তবিনোদনের উপকরণে পরিণত হয়েছিল, যেটি ছাড়া তাদের বেঁচে থাকাটাই ছিল কঠিন। জনৈক কবি বলেন,و أحيانا على بكر أخينا إذا ما لم نجد إلا أخانا আমরা যদি প্রতিপক্ষ হিসেবে কোনো গোত্র না পাই, তাহলে আকাঙ্ক্ষা নিবৃত্তির জন্য আমরা আমাদের মিত্র গোত্রের ওপরই অগত্যা ঝাঁপিয়ে পড়ি।
একজন আরব কবি এভাবে তার অভিলাষ ব্যক্ত করেন, আমার ঘোড়া আরোহনের যোগ্য হলে আল্লাহ যেন যুদ্ধের আগুন জ্বালিয়ে দেন, যেন আমি আমার ঘোড়া ও তরবারির নৈপুণ্য প্রদর্শনের সুযোগ পাই।
নারীর মর্যাদা
তৎকালীন আরবে নারীদের ওপর অত্যাচার এবং তাদের সাথে নির্দয়তা-নিষ্ঠুরতা ছিল সাধারণ ও বৈধ ব্যাপার। তাদের অধিকার বলতে কিছু ছিল না। তাদের সম্পদ পুরুষের সম্পদ বলে বিবেচনা করা হতো। মৃতের রেখে যাওয়া সম্পদে তাদের কোনো অংশ ছিল না। কোনো কারণে স্বামীহারা হলে ইচ্ছেমাফিক দ্বিতীয় বিবাহ করার অধিকার ছিল না। অন্যান্য স্থাবর সম্পত্তির মতো নারীদেরকেও ওয়ারিশদের মধ্যে বন্টন করা হতো। কুরআনে এ ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে এভাবে,يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا يَحِلُّ لَكُمْ أَنْ تَرِثُوا النِّسَاءَ كَرْهًا অর্থাৎ, হে ইমানদারগণ! নারীদেরকে জবরদস্তি উত্তরাধিকার সম্পত্তি হিসেবে গণ্য করা তোমাদের জন্য বৈধ নয়। [সুরা নিসা : ১৯] পুরুষরা তো তাদের অধিকার কড়ায়-গণ্ডায় আদায় করে নিত, কিন্তু মহিলারা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকত। এমন অনেক খাদ্যদ্রব্য পর্যন্ত ছিল, যেগুলো শুধু পুরুষরাই খেতে পারত, মহিলাদের জন্য তা খাওয়া বৈধ ছিল না। পুরুষরা বিনা হিসেবে ইচ্ছামাফিক বিয়ে করতে পারত। কন্যা সন্তানের প্রতি ঘৃণা ও অবজ্ঞা এতটা বৃদ্ধি পেয়েছিল যে, তাদের জীবন্ত প্রোথিত করা ছিল মামুলি ব্যাপার। সা‘সা‘আ ইবনে নাজিয়া বলেন, ইসলাম আবির্ভাবের সময় পর্যন্ত আমি জীবন্ত প্রোথিত হতে যাচ্ছে, এমন তিনশ কন্যা সন্তানের জীবন অর্থের বিনিময়ে বাঁচিয়েছিলাম। ইসলাম গ্রহণের পর অনেকেই তার অতীতের কন্যা সন্তানের উপর অত্যাচারের হৃদয়বিদারক ঘটনা বর্ণনা করেছেন।
পৃথিবীর অন্যান্য ধর্ম ও জাতি
খ্রিষ্ট ধর্ম
খ্রিষ্টধর্ম এতটা বিস্তৃত ও ব্যাপক ছিল না, যার মাধ্যমে মানবজীবনের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলোর সমাধান করা যেতে পারে, বা তার ওপর ভিত্তি করে কোনো রাষ্ট্র পরিচালিত হতে পারে। যা ছিল তা ইসা আ.-এর প্রদত্ত শিক্ষামালার একটি হালকা খসড়া চিত্রমাত্র, যার ওপর একত্ববাদের সহজ সরল বিশ্বাসের কিছুটা প্রলেপ ছিল। এতটুকুও বাকি ছিল খ্রিষ্টধর্মে সেন্টপলের আগমনের আগ পর্যন্ত। তার আগমনের পর তো তাওহিদের ছিঁটেফোঁটাও আর বাকি ছিল না। সে তার পূর্বের পৌত্তলিকতাকে শুধু একটি নতুন নাম দিয়েছে মাত্র। এরপর এল কনস্টানটাইনের শাসনামল। সে তার শাসনামলে খ্রিষ্ট ধর্মের অবশিষ্ট মৌলিকত্বটুকুও নিঃশেষ করে দিল।
মোটকথা, খ্রিষ্টাব্দ ৪র্থ শতাব্দীতেই খ্রিষ্টধর্ম একটি জগাখিঁচুড়িতে পরিণত হয়, যার ভেতর গ্রীক পৌরাণিক কাহিনী, রোমান পৌত্তলিকতা, মিসরীয় নব্য-প্লেটোবাদ ও বৈরাগ্যবাদের যোগ ছিল। ঈসা আ.-এর সহজ সরল শিক্ষামালার উপাদান এ জগাখিচুরির মধ্যে ঠিক সেভাবেই হারিয়ে গিয়েছিল যেভাবে বারিবিন্দু বিশাল সমুদ্র বক্ষে পতিত হয়ে অস্তিত্বহীন হয়ে যায়। একটা সময় খ্রিষ্ট ধর্মের বিষয়গুলো যে যার মতো করে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করতে থাকে, যার আবশ্যিক ফল হলো, খ্রিষ্ট ধর্ম জ্ঞান-গবেষণা ও চিন্তা-চেতনার দ্বার উন্মুক্ত করার পরিবর্তে সে নিজেই এ পথে বাঁধার বিন্ধ্যাচল হয়ে দাঁড়াল এবং শতাব্দীর অব্যাহত অধঃপতনের দরুণ কেবলই পৌত্তলিকতার ধর্মে পরিণত হলো। জর্জ সেল খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীর খ্রিষ্টানদের সম্পর্কে বলেন, ‘খ্রিষ্টানরা সাধু-সন্ত ও ঈসা আ. এর মূর্তীর পূজার ক্ষেত্রে এতটা বাড়াবাড়ি করেছিল যে, এ যুগের রোমান ক্যাথলিকরাও সেই সীমায় পৌঁছতে পারেনি।
ইহুদি জাতিগোষ্ঠী
ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকায় বসবাসরত ইহুদিরা দুনিয়ার অন্যান্য জাতিগুষ্ঠী থেকে ভিন্ন ছিল, কেননা তাদের কাছে দ্বীনি বিষয়ের একটি বড় পুঁজি ছিল এবং তাদের মধ্যে ধর্মীয় ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও পরিভাষাসমূহ অনুধাবনের সর্বাধিক যোগ্যতা ছিল। কিন্তু অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর ওপর প্রভাব ফেলবার মতো যোগ্যতা তাদের ছিল না; বরং অন্যরা তাদের শাসন করবে, সর্বদা অপরের জুলুম-নিপীড়ন সইবে, নানা রকম শাস্তি ও নির্যাতন ভোগ করবে, বিবিধ প্রকারের কঠোরতা ও ভয়-ভীতির শিকার হবে, এটাই ছিল তাদের ভাগ্যলিপি। দীর্ঘকাল গোলামির জিঞ্জিরে আবদ্ধ থাকার কারণে তাদের মধ্যে এক বিশেষ ধরণের মানসিকতা তৈরি হয়েছিল। জাতিগত অহমিকা, গোত্রীয় অহংকার, সম্পদের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত লালসা, সুদি কারবারে তাদের কোনো জুড়ি ছিল না। দুর্বল ও বিজিত অবস্থায় লাঞ্ছিত ও অপদস্থ হওয়া ও বিজয়ী জাতিকে খোশামোদ-তোষামোদ করা আর বিজয় লাভ করার সাথে সাথেই বিরোধীদের উপর নিষ্ঠুর আচরণ এবং সাধারণ অবস্থায় প্রতারণা, শঠতা, সংকীর্ণ মনোবৃত্তি ও স্বার্থপরতা, হারামখোরী ও সত্যের পথে অন্যকে বাধা প্রদান করা তাদের জাতীয় বৈশিষ্ট্যে রূপ নিয়েছিল। কুরআনে কারিমে ষষ্ঠ ও সপ্তম শতাব্দীতে তাদের এ অবস্থান এবং কেন তাদেরকে নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব থেকে বঞ্চিত করে স্থায়ী লাঞ্ছনা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে তা স্পষ্ট করে তুলে ধরা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَإِذْ قُلْتُمْ يَامُوسَى لَنْ نَصْبِرَ عَلَى طَعَامٍ وَاحِدٍ فَادْعُ لَنَا رَبَّكَ يُخْرِجْ لَنَا مِمَّا تُنْبِتُ الْأَرْضُ مِنْ بَقْلِهَا وَقِثَّائِهَا وَفُومِهَا وَعَدَسِهَا وَبَصَلِهَا قَالَ أَتَسْتَبْدِلُونَ الَّذِي هُوَ أَدْنَى بِالَّذِي هُوَ خَيْرٌ اهْبِطُوا مِصْرًا فَإِنَّ لَكُمْ مَا سَأَلْتُمْ وَضُرِبَتْ عَلَيْهِمُ الذِّلَّةُ وَالْمَسْكَنَةُ وَبَاءُوا بِغَضَبٍ مِنَ اللَّهِ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ كَانُوا يَكْفُرُونَ بِآيَاتِ اللَّهِ وَيَقْتُلُونَ النَّبِيِّينَ بِغَيْرِ الْحَقِّ ذَلِكَ بِمَا عَصَوْا وَكَانُوا يَعْتَدُونَ
অর্থাৎ, যখন তোমরা বলেছিলে, ‘হে মূসা! আমরা একই রকম খাদ্যে কখনও ধৈর্য ধারণ করব না। সুতরাং, তুমি তোমার প্রতিপালকের নিকট আমাদের জন্য প্রার্থনা করো—তিনি যেন ভূমিজাত দ্রব্য-শাক সবজি, কাঁকুড়, গম, মসুর ও পেঁয়াজ আমাদের জন্য উৎপাদন করেন। মূসা বললেন, তোমরা কি উৎকৃষ্টতর বস্তুকে নিকৃষ্টতর বস্তুর সাথে বদল করতে চাও?তবে কোনো নগরে অবতরণ করো। তোমরা যা চাও তা সেখানে আছে।’ তারা লাঞ্ছনা ও দারিদ্রগ্রস্ত হলো এবং আল্লাহর ক্রোধের পাত্র হলো। এটা এজন্য যে, তারা আল্লাহর আয়াতকে অস্বীকার করত এবং নবীগণকে অন্যায়ভাবে হত্যা করত। অবাধ্যতা ও সীমালংঘন করার জন্যই তাদের এ পরিণতি হয়েছিল। [সূরা বাকারা : ৬১]
চীন : ধর্ম ও সমাজ
চীনের বিশাল এ ভূখণ্ডে তখন তিনটি ধর্ম প্রচলিত ছিল। লাইতিশো প্রবর্তিত ধর্ম, দার্শনিক কনফুসিয়াস প্রবর্তিত ধর্ম এবং গৌতম বুদ্ধের ধর্ম। লাইতিশোর ধর্ম একে তো জন্মের পরপরই মূর্তিপূজায় আক্রান্ত হয়, অন্যদিকে তাতে বাস্তব জীবনের পরিবর্তে তাত্ত্বিকতার প্রাধান্য ছিল অনেক বেশি। এ ধর্মের অনুসারীরা ছিলো জীবনবিমুখ ও সংসারবিরাগী। তারা বিবাহ ও নারী থেকে দূরে থাকত। যার আবশ্যিক ফল স্বরূপ একটি বিশুদ্ধ জীবন ও সমাজ এবং আদর্শ শাসনব্যবস্থার ভিত্তি হওয়ার কোনো যোগ্যতা তার মধ্যে ছিল না। যার কারণে এ ধর্ম প্রবর্তকের পরবর্তী প্রজন্মই তার বিরোধিতা করে নতুন ধর্মমত গ্রহণ করতে বাধ্য করেছিল।
অন্যদিকে দার্শনিক কনফুসিয়াস তাত্ত্বিকতার বিপরীতে বাস্তব জীবনকে অনেক গুরুত্ব দিতেন। তার শিক্ষা ও দর্শন আবর্তিত হয়েছে পার্থিব জীবনকে ঘিরে। জাগতিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কেই শুধু কিছু দিকনির্দেশনা ছিল, পরকালীন জীবনের কোনো ধারণা তাতে ছিল না।কনফুসিয়াসের অনুসারীরা কখনোই নির্দিষ্ট কোনো উপাস্যে তুষ্ট ছিল না; বরং তারা ইচ্ছামত প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানের-পাথর, গাছ বা নদ-নদীর পূজা করত। এক কথায় বলা যেতে পারে, তা ছিল একজন প্রাজ্ঞ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তির কিছু শিক্ষা, যা মানুষ যখন ইচ্ছা গ্রহণ এবং যখন ইচ্ছা বর্জন করতে পারত। এক্ষেত্রে কোনো বিধিনিষেধ ছিল না।
বৌদ্ধ ধর্ম
বৌদ্ধধর্ম ছিল অপেক্ষাকৃত উন্নত ও সংহত এবং তার অনুসারীর সংখ্যা ছিল বিপুল। বৌদ্ধধর্ম বহু পূর্বেই তার স্বভাবসরলতা ও প্রাণ-উচ্ছলতা হারিয়ে ফিরেছিল। ব্রাহ্মণ-ধর্মের ‘বিশ্বাস ও সংস্কার এবং দেবতা ও অবতার’ গ্রহণ করে বৌদ্ধধর্ম আসলে নিজের অস্তিত্বই শেষ করে দিয়েছিল। উগ্র ও হিংস্র ব্রাহ্মণবাদ বৌদ্ধ-ধর্মকে এমনভাবে গ্রাস করেছিল যে, তার স্বকীয়তা ও বৈশিষ্ট্য বলতে কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। বস্তুত, বৌদ্ধধর্ম তখন হয়ে পড়েছিল মূির্তপূজারই ধর্ম। পৃথিবীর যেখানে বৌদ্ধধর্ম গিয়েছে, মূর্তী ও প্রতিমা সঙ্গে গিয়েছে। বুদ্ধের অনুসারীরা যত দেশে তাদের অধিবাস গড়েছে সেখানে বুদ্ধের অসংখ্য প্রতিমা ও ভাস্কর্য নির্মাণ করেছে। তাদের ধর্মীয় জীবন ও নাগরিক সভ্যতা বলতে গেলে প্রতিমা সংস্কৃতি দ্বারাই আচ্ছন্ন ছিল।
উত্তর ও পশ্চিম ইউরোপ
ইউরোপের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের জাতিগোষ্ঠীগুলো ছিল অজ্ঞতা ও মূর্খতায় নিমজ্জিত। ছিল রক্তাক্ত যুদ্ধ-বিগ্রহ ও মারামারি-হানাহানিতে ক্ষতবিক্ষত। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সভ্যতা সংস্কৃতিতে তাদেরকে আলোকিত করতে তখনও মুসলিমগণ স্পেনে আগমন করেননি। মোটকথা, এ সকল জাতিগোষ্ঠী মানবসভ্যতার কাফেলা থেকে পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ছিল। তারা যেমন বিশ্ব সম্পর্কে অজ্ঞ ছিল, পৃথিবীর সভ্য নগরীর লোকেরাও তাদের সম্পর্কে তেমন কিছুই জানত না। প্রাচ্য ও প্রতীচ্যে চলমান বিপ্লব সম্পর্কে তারা ছিল বেখবর। আকিদা বিশ্বাসের দিক থেকে তাদের অবস্থান ছিল নব খ্রিষ্ট ধর্ম ও প্রাচীন মূর্তি পূজার মাঝামাঝি।
এইচ, জি, ওয়েলস বলেন, ‘তাদের কাছে না দ্বীনের কোনো পয়গাম ছিল আর না রাজনীতির ময়দানে কোনো উচ্চ আসন ছিল, তৎকালে পশ্চিম ইউরোপে ঐক্য-সংহতি ও আইন-শৃঙ্ক্ষলার কোনো চিহ্ন মাত্র ছিল না।
মধ্যএশিয়ার বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী
পূর্ব ও মধ্য এশিয়ার অপরাপর জাতিগোষ্ঠী যেমন—মুঘল, তুর্কি, জাপানী ইত্যাদি জাতিগোষ্ঠী বিকৃত বৌদ্ধ মতবাদ ও বর্বরতাপূর্ণ মূর্তিপূজায় অবস্থান করছিল। তাদের কাছে না ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলো, না ছিল উন্নত রাজনৈতিক কোনো দর্শন। বলা যায়, তারা অন্ধকার ও বর্বরতার যুগ থেকে আলো ও সভ্যতার যুগে উত্তরণের পথে একটি অন্তর্বর্তীকাল অতিক্রম করছিল। পক্ষান্তরে কোনো কোনো জাতিগোষ্ঠী তো তখনো বেদুঈন জীবনের স্তরে- এবং চিন্তার শৈশবেই রয়ে গিয়েছিল। তো যারা জীবন ও নগর সভ্যতার মাত্র প্রাথমিক স্তরে উপনীত হয়েছে এবং চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তির ক্ষেত্রে শৈশব অতিক্রম করছে তারা কীভাবে বিশ্বের অন্যান্য জাতিকে সততা ও সত্যের এবং বিশুদ্ধ জীবনযাপনের পথ দেখাবে?
ভারতবর্ষ : ধর্ম, সমাজ ও নৈতিকতা
ঐতিহাসিকগণ এ ব্যাপারে পূর্ণ একমত যে, খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতকের শুরুটা ছিল ধর্ম, সমাজ ও নৈতিকতার দিক থেকে ভারতবর্ষের জন্য সবচেয়ে অধপতিত যুগ। পুরো পৃথিবীতে চলতে থাকা অধঃপতন ও সামাজিক অবক্ষয়ের এক বিশাল অংশ ভারতবর্ষ নিজেদের করে নিয়েছিল। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে তারা এতোটাই এগিয়ে ছিল, যেগুলো স্বতন্ত্রভাবে তুলে না ধরলেই নয়-ক. উপাস্য ও দেবদেবীর কল্পনাতীত আধিক্য, খ. লাগামহীন যৌন অরাজকতা, গ. নিষ্ঠুর জাতিভেদ ও সামাজিক শ্রেণীভাগ।
উপাস্যের আধিক্য
খ্রিষ্টিয় ষষ্ঠ শতকে ভারতবর্ষে মূর্তিপূজা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল। তাদের ধর্মীয়গ্রন্থ বেদে যেখানে মাত্র তেত্রিশ দেবতার কথা উল্লেখ আছে, এ সময়ে এসে তা তেত্রিশ কোটিতে উপনীত হয়। ভাবা যায়, কোথায় তেত্রিশ আর কোথায় তেত্রিশ কোটি! যে কোনো সুন্দর, আকর্ষণীয়, অভিনব, বিদঘুটে বস্তু এবং জীবনের উপকরণ তাদের উপাস্যের মর্যাদা লাভ করত। এভাবেই মূর্তী, প্রতিমা আর দেবদেবীর সংখ্যা কল্পনাতীতভাবে বেড়ে যায়। তাদের উপাস্যের তালিকায় যেমন ছিল বিভিন্ন উদ্ভিদ ও বৃক্ষলতা তেমনি ছিল অসংখ্য জড়বস্তু ও খনিজ পদার্থ; ছিল ছোট বড় হাজারো পশু-প্রাণী, এমনকি লিঙ্গপূজা পর্যন্ত বাদ পড়েনি। পাহাড় পর্বতও তাদের উপাস্যের মর্যাদা পেয়েছে এ হিসেবে যে, তাদের কোনো দেবতা সেখানে অধিষ্ঠান গ্রহণ করেছেন। গঙ্গা হলো তাদের মা, যা স্নানকারীর সকল পাপ মোচন করে দেয়; কারণ গঙ্গা উৎসারিত হয়েছে ‘মহাদেব’-এর মাথার জট থেকে। ‘গোমাতা’রও তারা পূজা করে, এমনকি গোবর ও গোমূত্র হচ্ছে তাদের দৃষ্টিতে পরম পবিত্র পদার্থ, একবিংশ শতাব্দির আধুনিককালেও যা অতিভক্তির সাথে গ্রহণ করা হয়ে থাকে। ডক্টর গোস্তাভ লী বোন ‘ভারতবর্ষের সভ্যতা’ গ্রন্থে লিখেছেন—‘ভারতের হিন্দুজাতী এদিক থেকে পৃথিবীতে একদম ভিন্ন যে, উপাসনার জন্য তাদের কোনো না কোনো বাহ্যিক আকৃতির উপস্থিতি অপরিহার্য। যদিও বিভিন্ন সময় ধর্মসংস্কারকগণ হিন্দুধর্মে একত্ববাদের অস্তিত্ব প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু তা সফলতার মুখ দেখেনি। বৈদিক যুগের হিন্দু হোক বা এ যুগের, তারা প্রকৃতির ছোট বড় সবকিছুরই পূজা করে থাকে। যা কিছু তাদের বুদ্ধির অগম্য এবং যা কিছু তাদের নিয়ন্ত্রণাতীত (এবং যা কিছু কোনো না কোনোভাবে তাদের আকৃষ্ট করে) সেগুলোই তাদের দৃষ্টিতে উপাসনার উপযুক্ত। হিন্দু ব্রাহ্মণ ও দার্শনিকদের এমন সব প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছে যা তারা একত্ববাদ প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যয় করেছে, এমনকি উপাস্য দেবতার সংখ্যা তিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টাও পণ্ডশ্রমে পর্যবাসিত হয়েছে। সাধারণ মানুষ তাদের শিক্ষা শুনেছে, হয়ত গ্রহণও করেছে, কিন্তু কার্যত এ তিন উপাস্যের সংখ্যা বেড়েই চলেছে এবং প্রকৃতির প্রতিটি বস্তুতে ও শক্তিতে তারা কোনো না কোনো উপাস্যকে দেখতে পেয়েছে।’
অবাধ যৌনতা
প্রাচীনকাল থেকেই যৌনতা ও কামকেলি ছিলো ভারতবর্ষের ধর্ম ও সমাজ-সংস্কৃতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ব্রহ্মার বিভিন্ন গুণের অভিপ্রকাশ, সত্যযুগের ঘটনা-মহাঘটনা এবং ব্রহ্মাণ্ডের অস্তিত্বরহস্য সম্পর্কে যেসব কাহিনী হিন্দুধর্মের পবিত্র গ্রন্থগুলোতে বর্ণিত হয়ে আসছে এবং দেবতা ও মানবীদের কামলীলার যে অশ্লীল বিবরণ রয়েছে তাতে যে কেউ কানে আঙ্গুল দেবে এবং লজ্জায় মাথা নীচু করতে বাধ্য হবে। আরো চমকপ্রদ বিষয় হলো, হিন্দুধর্মের প্রধান উপাস্য শিবের বীভৎস লিঙ্গমূর্তি স্থাপন করা হয় এবং নারী-পুরুষ ও যুবক-যুবতী একত্রে শিবলিঙ্গের পূজা করে। এ প্রসঙ্গে ডক্টর গোস্তাভ লী বোন বলেন-
‘প্রতিমা ও প্রতীক এবং মূর্তী ও স্থুল আকৃতির প্রতি হিন্দুদের অনুরাগ সীমাহীন। ধর্ম তাদের যাই হোক না কেন, আচার-অনুষ্ঠান তারা নিষ্ঠার সাথে পালন করে থাকে। তাদের মন্দির ও পূজাঘর অসংখ্য উপাস্য বস্তুতে পরিপূর্ণ। সেগুলোর মধ্যে অগ্রগণ্য হলো লিঙ্গ ও যোনি, যা সঙ্গম ও যৌনতার ইঙ্গিতবহ। অশোক স্তম্ভকেও সাধারণ হিন্দুরা লিঙ্গপ্রতীক বলে বিশ্বাস করে। যে কোনো শঙ্কু ও ত্রিকোণ আকৃতিই তাদের কাছে পূজ্য ও ভক্তিযোগ্য।’কোনো কোেেনা ঐতিহাসিকের বর্ণনা মতে কতিপয় হিন্দু সম্প্রদায়ের পুরুষেরা নগ্ন নারীদেহের এবং নারীরা নগ্নপুরুষদেহের পূজা করত। মন্দির এবং উপাসনালয়ের সেবায়েত, পুরোহিত ও পাণ্ডাদের লাম্পট্য ছিল এমনই চরমে যে, দেবতার দেবদাসীদের তারা যৌনদাসীরূপে ব্যবহার করত; এমনকি মন্দিরে আগত পূজারিনীদের সতিত্বও তাদের দ্বারা লুণ্ঠিত হতো।
এই যদি হয় মন্দির ও দেবালয়ের অবস্থা, তাহলে রাজার প্রাসাদ ও ধনীর রঙ্গমহলের চালচিত্র কী হতে পারে! সেখানে তো নগ্নতা ও অশ্লীলতার রীতিমত মহড়া চলত। নাচগানের জলসায় মদের নেশায় সবাই যখন চুর তখন লজ্জা ও লোকলজ্জার তো কোনো বালাই থাকত না। এভাবে সমগ্র দেশ ভেসে গিয়েছিল পাপাচার ও অবাধ যৌনতার তোড়ে এবং উভয় লিঙ্গের নৈতিকতা ও চরিত্রে নেমে এসেছিল বিরাট ধ্বস।
শ্রেণীভেদ ও বর্ণপ্রথা
পৃথিবীর বিভিন্ন জনপদ ও দেশে শ্রেণীভেদ ও বর্ণপ্রথা অবশ্যই ছিল, কিন্তু ভারতবর্ষের মতো এতো কঠোর ও নিষ্ঠুর বর্ণপ্রথা এবং শ্রেণিভেদ ছিলো না। বস্তুত এটা ছিল মানবতার প্রতি চরম অবমাননা, যা ভারতবর্ষে শুধু সামাজিকভাবেই নয়, ধর্মীয়ভাবেও স্বীকৃত ছিল, হাজার বছর ধরে চলে আসছে, এখনও চলছে।
তবে এ বর্ণপ্রথাকে সুবিন্যস্ত ও পূর্ণাঙ্গ বিধানরূপে প্রবর্তনের কৃতিত্ব এককভাবে মনুজীর। মনুজী যিশুখ্রিষ্টের জন্মের তিনশ বছর আগে ভারতবর্ষে ব্রাহ্মণ্য সভ্যতার উন্নতির চরম উৎকর্ষের যুগে ভারতীয় সমাজের জন্য এ বিধান প্রণয়ন করে এবং সমগ্র দেশ ও জনগন তা মেনে নেয়। ফলে ভারতীয় সমাজ-সভ্যতায় সেটা সার্বজনীন আইন ও ধর্মীয় বিধানরূপে স্বীকৃতি লাভ করে। এটাই বর্তমানে মনুশাস্ত্র বা মনুসংহিতা নামে পরিচিত।
মনুসংহিতায় দেশের জনগনকে চারটি শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছে যথা—
১. ব্রাহ্মণ, অর্থাৎ পুরোহিত শ্রেণী
২. ক্ষত্রিয়, অর্থাৎ যোদ্ধাশ্রেণী
৩. বৈশ্য, অর্থাৎ কৃষি ও ব্যবসাজীবী শ্রেণী
৪. শূদ্র, অর্থাৎ সেবকশ্রেনী, যাদের নির্ধারিত কোনো পেশা নেই; যাবতীয় নিম্নশ্রেণীর পেশার মাধ্যমে উচ্চবর্ণের সেবা করা যাওয়াই যাদের একমাত্র দায়িত্ব। জগতের কল্যাণার্থে ব্রহ্মা ব্রাহ্মনকে আপন মুখ হতে, ক্ষত্রিয়কে আপন বাহু হতে, বৈশ্যকে আপন উরু হতে আর শূদ্রকে আপন পদযুগল হতে সৃষ্টি করেছেন। পৃথিবীকে হেফাজতের জন্য ব্রহ্মা নিজে তাদের কর্ম ও দায়িত্ব বন্টন করে দিয়েছেন। ব্রাহ্মনের দায়িত্ব হলো বেদ শিক্ষা দেওয়া, দেবতাদের উদ্দেশ্যে নৈবদ্য প্রদান, দান গ্রহণ ও প্রসাদ বিতরণ। ক্ষত্রিয়দের কর্তব্য হলো যোদ্ধাধর্ম পালন, অর্থাৎ মানুষকে যাবতীয় উপদ্রব ও অরাজকতা হতে রক্ষা করা, বেদ অধ্যায়ন করা, দান, নৈবদ্য অর্পন এবং কামসংযম। বৈশ্যের কর্তব্য হলো গবাদি পশু পালন, বাণিজ্য ও কৃষিকাজ, বেদ পাঠ, দান ও নৈবদ্য প্রদান। আর শূদ্রকে ব্রহ্মা একটিমাত্র আদেশ করেছেন, অর্থাৎ উপরের সম্প্রদায়ত্রয়ের সেবায় আত্মনিয়োগ এবং সর্ব-উপায়ে তাদের সন্তুষ্টি অর্জন।
ব্রাহ্মণসম্প্রদায়ের অকল্পনীয় শ্রেষ্ঠত্ব
এ সংহিতায় অপরাপর শ্রেণীর বিপরীতে ব্রাহ্মণসম্প্রদায়কে এতটা শ্রেষ্ঠত্ব ও পবিত্রতা দান করেছিল যে, তারা দেবতার সমপর্যায়ের উপনীত হয়ে যায়। মনুসংহিতায় বলা হয়েছে—
-একজন ব্রাহ্মণ সন্তান পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হিসেবে জন্মলাভ করে। তারা সমগ্র সৃষ্টিজগতের সম্রাট। তাদের দায়িত্ব হলো শাস্ত্রের রক্ষণাবেক্ষণ।
-প্রয়োজনবোধে ব্রাহ্মণ তার শূদ্র দাসদের সম্পদ জবর দখল করতে পারবে। এটি তার কোনো অপরাধ বলে বিবেচিত হবে না; কেননা, দাস সম্পদের মালিক হতে পারে না, তার সকল সম্পদ মালিকের সম্পদ হিসেবে পরিগণিত।
-যে ব্রাহ্মণের ঋগবেদ মুখস্ত সে সকল পাপ হতে মুক্ত, চাই সে ত্রিভূবনের সর্বনাশ করুক বা কারও মুখের খাবার কেড়ে নিক না কেন।
-যতো কঠিন প্রয়োজনই দেখা দিক না কেন রাজা কোনো পরিস্থিতিতেই ব্রাহ্মণের থেকে কোনোরূপ রাজস্ব বা কর গ্রহণ করতে পারবে না। বরং রাজার দায়িত্ব হলো রাজ্যের ব্রাহ্মণদের খাবারের ব্যবস্থা করা, তাদেরকে কোনোভাবেই ক্ষুধার কারণে মরতে না দেওয়া।
-ব্রাহ্মণ মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ করলে তার শাস্তি শুধু মাথা মুণ্ডন। পক্ষান্তরে সে অপরাধে অন্যদের শাস্তি হবে যথারীতি মৃত্যুদণ্ড। উক্ত বিধানে ক্ষত্রিয় যদিও বৈশ্য ও শূদ্রের তুলনায় উন্নততর শ্রেণী হিসেবে স্বীকৃত, কিন্তু তাদের অবস্থান ব্রাহ্মন থেকে অনেক নীচে। মনু বলেন, ‘দশ বছর বয়স্ক ব্রাহ্মণ বালক একজন শতায়ু ক্ষত্রিয় থেকে উত্তম, যেমন পিতা সন্তান থেকে উত্তম।
হতভাগ্য শূদ্র
মনুপ্রবর্তিত সামাজিক ও ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী হিন্দুসমাজে শূদ্র বা অচ্ছুতই হলো সর্বনিম্ন সম্প্রদায়। ইতর পশুর চেয়েও অধম, সমাজে তাদের অবস্থান ও মর্যাদা। মনুশাস্ত্রের সুস্পষ্ট ঘোষণা- শূদ্রের জন্য এটাই পরম সৌভাগ্য যে তারা ব্রাহ্মণ সেবায় নিয়োজিত হতে পারে। এছাড়া তাদের আর কোনো পূণ্য ও প্রাপ্তি নেই। অর্থ উপার্জন ও সম্পদ সঞ্চয়ের কোনো অধিকার শূদ্রের নেই। কারণ তা ব্রাহ্মণের মনোকষ্টের কারণ। শূদ্র যদি কোনো ব্রাহ্মণের উপর হাত তুলে বা ক্রোধান্ধ হয়ে লাথি মারে তাহলে তার হাত ও পা কেটে ফেলা হবে। আর যদি কোনো পাপিষ্ঠ শূদ্র কোনো ব্রাহ্মণের সমকক্ষে বসার ধৃষ্টতা প্রদর্শন করে তাহলে শাসকের অবশ্য কর্তব্য হবে তার পশ্চাদ্দেশে গরম লোহার দাগ দিয়ে দেশান্তর করা। আর কোনো ব্রাহ্মণকে স্পর্শ করা বা তাকে কটু কথা বলার সাজা হলো জিহ্বা ছিঁড়ে ফেলা। আর যদি দাবি করে, ব্রাহ্মণকে সে শিক্ষা দিতে পারে তাহলে তার মুখে তপ্ত তেল ঢেলে দেওয়া। কুকুর, বিড়াল, কাক, পেঁচা এবং কোনো শূদ্রকে হত্যা করার প্রায়শ্চিত্ত একই সমান।
হিন্দুসমাজে নারীর মর্যাদা
ব্রাহ্মণদের সমাজসভ্যতায় নারীজাতির সেই সম্মান ও মর্যাদা ছিল না যা বৈদিক যুগে ছিল। ডক্টর লী বোন এর মতে মনুশাস্ত্রে স্ত্রী জাতিকে দুর্বল ও বিশ্বাসঘাতিনী ভাবা হয়েছে এবং ঘৃণা ও অবজ্ঞার ভাষায় তার আলোচনা করা হয়েছে। বস্তুত মনুযুগের হিন্দু সমাজে নারীর মর্যাদা দাসীর চেয়ে বেশি কিছু ছিল না।
জুয়া খেলায় পুরুষ স্ত্রীকে বাজি ধরত এবং হেরে গিয়ে অন্যের হাতে তুলে দিত। বিধবাদের জীবন ছিল মৃত্যুর চেয়েও বিভীষিকাপূর্ণ। তার দ্বিতীয় বিবাহের অধিকার ছিল না। সমাজ ও পরিবারের লাঞ্ছনা ও গঞ্জনাই ছিল তার ভাগ্যলিপি। মৃত স্বামীর গৃহে দাসীবৃত্তি করেই তাকে জীবন ধারণ করতে হতো। অনেক ক্ষেত্রে বিধবা নারী (স্বেচ্ছায় কিংবা জবরদস্তি) স্বামীর জ্বলন্ত চিতায় আত্মাহুতি দিয়ে জীবনের অভিশাপ থেকে মুক্তি লাভ করত, যার নাম ছিল সতিদাহ। ডক্টর লী বোন বলেন, ‘স্বামীর চিতায় বিধবাকে জ্বালানোর বিধান মনুশাস্ত্রে যদিও নেই, তথাপি মনে হয় এই প্রথা ভারতবর্ষে ব্যাপক ছিল। কেননা গ্রিক ঐতিহাসিকগণ এর উল্লেখ করেছেন।
এভাবেই-যে উর্বর ভারতভূমি ছিল মেধায়, সম্পদে পরিপূর্ণ, একসময় তাই হয়ে পড়েছিল মূর্খতার অন্ধকারে নিমজ্জিত এবং অভ্যন্তরীন গোলযোগে, দারিদ্র্য ও নৈরাজ্যের শিকার। যে জাতি সম্পর্কে কোনো কোনো আরব ঐতিহাসিক লিখেছেন, ‘জ্ঞান ও প্রজ্ঞার আধার, ন্যায় ও সুশাসন, বিচক্ষণতা ও সুশীল চিন্তার উৎস’ সে জাতি দীর্ঘকাল আসমানি সত্য ধর্মের শিক্ষা-বঞ্চিত থাকার কারণে বিভিন্ন আচার, অনাচার ও কুসংস্কারের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। নিকৃষ্টতম মূর্তীপূজার পাশাপাশি ছিল প্রবৃত্তিপূজার জয়জয়কার। সর্বোপরি ধর্মের নামে এমন বর্বরতা, নিষ্ঠুরতা ও শ্রেণীবৈষম্য বিদ্যমান ছিল, যার নজির পৃথিবীর অন্য কোনো জাতির ইতিহাসে নেই।
মোটকথা, সামগ্রিকভাবে পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ তার রবকে ভুলে বসেছিল, তাঁর সাথে ছিল না কোনো দূরতম সম্পর্ক। নিজের প্রবৃত্তি আর কামনার দাসে পরিণত হয়েছিল সবাই। ইচ্ছেমত যার তার সামনে মাথা নত করত।ব্যক্তি থেকে নিয়ে রাষ্ট্র পর্যন্ত নীতি-নৈতিকতার কোনো বালাই ছিল না। যে কোনোভাবে নিজের কামনা চরিতার্থ করাই ছিল জীবনের মূল লক্ষ্য। ফলাফলস্বরূপ মানবসভ্যতার প্রতিটি কোষে মরণব্যধি ছড়িয়ে পড়ে, যার চিকিৎসা ছিল অপরিহার্য। আল্লাহ তাআলা আবারও মানবজাতির প্রতি ফিরে তাকান, তাদের প্রতি আরেকবার অনুগ্রহ করেন এবং প্রেরণ করেন জগতের রহমত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা. কে।وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ অর্থাৎ, আমি তো তোমাকে বিশ্বজগতের প্রতি কেবল রহমতরূপেই প্রেরণ করেছি। [সুরা আম্বিয়া : ১০৭]
মাওলানা রাশেদুল ইসলাম
শিক্ষার্থী, মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়