‘জানাযা’ শব্দের অর্থ মৃতদেহ। সালাতুল জানাযা অর্থ: মৃতদেহের (মাগফিরাতের উদ্দেশ্যে) নামায। জানাযার নামায শরীয়তের অনুপম বিধানসমূহের অন্যতম। এর মাধ্যমে মৃতের জন্য দু‘আ করা হয়। একজন মুসলমান মারা গেলে অন্যান্য মুসলমানের আবশ্যক হয়ে পড়ে মৃতের জানাযা আদায় করা। জানাযা আদায়ের দ্বারা জীবিতদের মাঝে পরকালের কথা স্মরণ হয়। আর পরকালের স্মরণ ব্যক্তিগত ও সামাজিক অনাচার রোধের অন্যতম হাতিয়ার।
জানাযা পড়ার ব্যপারে শরীয়তের উৎসাহ: জানাযায় হাযির হওয়ার ব্যাপারে শরীয়ত উৎসাহ প্রদান করেছে এবং এর উপর সওয়াব ঘোষণা করেছে। একে এক মুসলিমের উপর অপর মুসলিমের হক্ব হিসেবে সাব্যস্ত করেছে।
হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত: قال رسول الله صل الله عليه وسلم من اتبع جنازة مسلم إيمانا واحتسابا وكان معه حتى يصلى عليها ويفرغ من دفنها فإنه يرجع من الأجر بقيراطين كل قيراط مثل أحُد ومن صلى عليها ثم رجع قبل أن تُدْفن فإنه يرجع بقيراط
নবীজী সা. ইরশাদ করেন: যে ব্যক্তি জানাযায় উপস্থিত হয়ে নামায আদায় করল, সে এক ক্বিরাত সাওয়াবের অধিকারী হবে। প্রত্যেক ক্বিরাতের পরিমাণ হলো, উহুদ পাহাড়ের মত। আর যে ব্যক্তি জানাযায় উপস্থিত হয়ে দাফন পর্যন্ত শরীক থাকল, সে দুই ক্বিরাত সাওয়াবের অধিকারী হবে। (বুখারী: ৪৭ ও মুসলিম: ৯৯৫)
অপর এক রেওয়ায়েতে হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. বর্ণনা করেন: عن أبي هريرة، قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: ” خمس من حق المسلم على المسلم: رد التحية، وإجابة الدعوة، وشهود الجنازة، وعيادة المريض، وتشميت العاطس إذا حمد الله
নবীজী সা. ইরশাদ করেন,‘এক মুসলমানের উপর অপর মুসলমানের হক্ব পাঁচটি: সালামের উত্তর দেওয়া, দাওয়াত কবুল করা, জানাযায় উপস্থিত হওয়া, অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যাওয়া, হাঁচি দাতার আলহামদুলিল্লাহ এর জবাব দেওয়া।’ (মুসনাদে আহমাদ: ৮৩৯৭, ইবনে মাজাহ: ১৪৩৫)
জানাযার শরয়ী হুকুম:
সকলের ঐকমত্যে মৃতের জানাযার নামায আদায় করা পুরুষদের জন্য ফরযে কিফায়া। অর্থাৎ, কিছু লোক আদায় করলে অন্য সবাই যিম্মামুক্ত হবে। আর যদি কেউ আদায় না করে তবে সকলেই গুনাহগার হবে। (ই’লাউস সুনান: ৮/২৫০)
একটি ব্যতিক্রমী জানাযা:
নবীজী সা. সাহাবায়ে কেরাম পরিবেষ্টিত হয়ে বসে আছেন। হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, ‘তোমাদের ভাই নাজাশী ইন্তেকাল করেছেন। উঠ, কাতারবন্দী হও, তার জানাযা আদায় কর।’ সাহাবায়ে কেরাম
কাতারবন্দী হলেন, নবীজীর পেছনে বাদশাহ আসহামা নাজাশী রহ. এর জানাযা আদায় করলেন। (বুখারী ১১৮৮, মুসলিম ৯৫১)
নাজাশী রহ. একমাত্র ব্যক্তি যার এ ধরনের বিরল সৌভাগ্য অর্জিত হয়েছিল।
এই ঘটনাটি ছিল ব্যতিক্রম; নবীজী সা. এর বহু ব্যতিক্রমের মধ্যে একটি। নবীজী সা. এর অধীনে একসাথে ৯জন স্ত্রী থাকা, ঘুমালে নবীজী সা. এর ওযু ভঙ্গ না হওয়া- এসব যেমন নবীজী সা. এর বিশেষ বৈশিষ্ট ছিল; তেমনি নাজাশী রহ.এর গায়েবানা জানাযা আদায় করাও ছিল নবীজী সা. এর বিশেষ বৈশিষ্ট।
হাদীসটি উম্মতের আমলের জন্য নয়: বাদশাহ নাজাশী রহ. এর জানাযার বৃত্তান্ত সম্বলিত হাদীসটি যে উম্মতের আমলের জন্য নয়, এব্যাপারে স্পষ্ট বক্তব্য দিয়েছেন ইমামগণ:
সর্বপ্রাচীন ও উপমহাদেশে প্রচলিত মাযহাব- হানাফী মাযহাবের প্রখ্যাত ইমাম সারাখসী রহ. (মৃ. ৪৯০ হি.) বলেন: আমাদের ইমামদের মত হলো, গায়েবী জানাযা পড়া যাবে না। (মাবসূত: ১/৬২)
মদীনার ইমাম- ইমাম মালিক রহ. এর মাযহাবও আমাদের মাযহাবের অনুরূপ। মালেকী মাযহাবের ইমাম ইমাম ইবনে আব্দুল র্ব্ ামালেকী রহ. এর বক্তব্য: ‘অধিকাংশ আহলে ইলমের মত হলো, নাজাশীর গায়েবী জানাযা শুধুমাত্র নবীজী সা. এর বৈশিষ্ট ছিল।’ (আত তামহীদ: ৬/৩২৮)
ইবনুত তুরকমানী রহ. (মৃ.৭৫০) বলেন: ثم اسند اعني ابن عبد البر عن ابي المهاجر عن عمران بن حصين عن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال ان اخاكم النجاشي قد مات فصلوا عليه فقام صلى الله عليه وسلم وصففنا خلفه فكبر عليه اربعا وما نحسب الجنازة الا بين يديه – قلت – ولو جازت الصلاة على غائب لصلى عليه السلام على من مات من اصحابه ولصلى المسلمون شرقا وغربا على الخلفاء الابعة وغيرهم ولم ينقل ذلك
অর্থাৎ, (ইবনে আব্দুল বার্. এর বক্তব্য নকল করার পর) যদি গায়েবী জানাযা শরীয়ত সম্মত হত সেক্ষেত্রে অবশ্যই নবীজী সা. তাঁর সাহাবাদের মধ্যে যারা (দূর দেশে) ইন্তেকাল করেছেন তাদের জানাযা আদায় করতেন এবং (নবীজীর ইন্তেকালের পর) পৃথিবীর নানা প্রান্তে অবস্থানরত মুসলিমগণ চার খলীফা প্রমুখ (জালীলুল ক্বদর সাহাবা) এর জানাযা পড়তেন। (আল জাওহারুন নাক্বী ৪/৫০, দারুল ফিকর)
ইবনুল কাইয়ূম আল জাওযিয়্যাহ রহ. এর বক্তব্য: ولم يكن من هديه وسنته – صلى الله عليه وسلم – الصلاة على كل ميت غائب. فقد مات خلق كثير من المسلمين وهم غيب، فلم يصل عليهم
অর্থাৎ, সব ধরনের মৃতের গায়েবী জানাযা নবীজী সা. এর সুন্নাত নয়। কেননা, বহু মুসলমান (নবীজীর জীবদ্দশায় মদীনার বাইরে) ইন্তেকাল করেছেন, কিন্তু নবীজী সা. তাদের কারো জানাযা পড়েননি।
গায়েবী জানাযা শুধু নবী সা. এর বিশেষত্ব: আল ইস্তিযকার (৩/২৭) গ্রন্থে ইবনে আব্দুল বার রহ. বলেন: ودلائل الخصوص في هذه المسألة واضحة لا يجوز أن يستدل فيها مع النبي صلى الله عليه وسلم غيره لأنه – والله أعلم – أحضر روح النجاشي بين يديه فصلى عليه أو رفعت له جنازته كما كشف له عن بيت المقدس حين سألته قريش عن صفته وروي أن جبريل عليه السلام أتاه بروح جعفر أو بجنازته وقال قم فصل عليه
অর্থাৎ, এই মাসআলা যে শুধু নবী সা. এর বিশেষ বৈশিষ্ট ছিল তার প্রমাণ স্পষ্ট। অন্য কারো জন্য এটা দলিল হতে পারে না। কারণ, (আল্লাহই ভালো জানেন) নাজাশী রহ. এর রূহ নবীজী সা. এর সামনে উপস্থিত করা হয়েছিল। অথবা তার শবাধারকে নবী সা. এর সামনে উপস্থিত করা হয়েছিল। যেমন কুরাইশরা যখন নবীজী সা. কে বাইতুল মুকাদ্দাস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিল তখন বাইতুল মুকাদ্দাসকে তাঁর সামনে উন্মোচিত করে দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া, বর্ণনা করা হয়ে থাকে, জিবরাইল আ. জা‘ফর রা. এর রূহকে অথবা তাঁর লাশকে নবীজী সা. এর নিকট নিয়ে এসেছিলেন এবং বলেছিলেন, উঠুন, তাঁর জানাযা আদায় করুন।
নবীজী সা. এর সারা জীবনের আমল- গায়েবী জানাযা না পড়া: নবীজী সা. এর জীবদ্দশায় দূরদেশে বহু সাহাবী ইন্তেকাল করেছেন; কিন্তু নবীজী সা. তাদের জানাযা পড়িয়েছেন মর্মে কোনো রেওয়ায়েত পাওয়া যায় না। যদি নবী করীম সা. গায়েবী জানাযাকে উম্মতের জন্য অনুসরণীয় হিসেবে রেখে যেতে চাইতেন, তাহলে একাধিকবার গায়েবী জানাযা পড়তেন।
উদাহরণত; গাযওয়াতুর রাযী’ যুদ্ধে হযরত আসেম বিন সাবিত, খাব্বাব, যায়েদ রা. সহ পুরো একদল সাহাবী কাফেরদের হাতে বন্দী হয়ে শহীদ হন। (বুখারী: ৪০৮৬)
বীরে মাঊনায় ৭০জন ক্বারী সাহাবীকে বিশ্বাসঘাতকতা করে শহীদ করে দেওয়া হয়। নবী করীম সা. দীর্ঘ একমাস পর্যন্ত ফজরের নামাযে দু’আ কুনূত পড়ে বদদু’আ করেন। (বুখারী: ৪০৮৮)
মূতার যুদ্ধে নবী কারীম সা. এর অত্যন্ত প্রিয় সাহাবী এবং পালকপুত্র হযরত যায়েদ বিন হারিসা রা., চাচাত ভাই হযরত জা‘ফর সাদিক রা., এবং হযরত আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা রা. শহীদ হন। পুরো দৃশ্যই কুদরতী ব্যবস্থাপনায় নবীজী সা. মদীনায় বসে প্রত্যক্ষ করেন। (বুখারী: ৪২৬০)
উপরোক্ত সবগুলো ঘটনাই ছিল মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক। এমন পরিস্থিতিতে শহীদ সাহাবীদের গায়েবী জানাযা পড়া তাদের পরিবার; বরং, সমস্ত মুসলমানদের জন্যই উত্তম সান্ত্বনার বিষয় হতো; কিন্তু নবীজী সা. জানাযা পড়া থেকে বিরত থেকেছেন।
নবী কারীম সা. এর জীবদ্দশায় এরূপ বহু অভিযানে গিয়ে সাহাবায়ে কিরাম শাহাদাত বরণ করেছেন। ইসলামের প্রাথমিক যুগে হাবশার হিজরতে গিয়ে অনেকেই ইন্তেকাল করেছিলেন; কিন্তু কোনো ঘটনাতেই নবী সা. গায়েবী জানাযা পড়েছেন মর্মে বর্ণনা নেই। অথচ, নবী কারীম সা. সাহাবায়ে কিরামের জানাযা পড়তে আগ্রহী ছিলেন-
عن أبي هريرة، أن امرأة سوداء كانت تقم المسجد – أو شابا – ففقدها رسول الله صلى الله عليه وسلم، فسأل عنها – أو عنه – فقالوا: مات، قال: ্রأفلا كنتم آذنتموني قال: فكأنهم صغروا أمرها – أو أمره – فقال: ্রدلوني على قبره فدلوه، فصلى عليها، ثم قال: ্রإن هذه القبور مملوءة ظلمة على أهلها، وإن الله عز وجل ينورها لهم بصلاتي عليهم
অর্থাৎ, মসজিদ দেখাশোনা করতো এমন একজন কৃষ্ণাঙ্গ সাহাবীয়া অথবা যুবক সাহাবীকে একদিন নবীজী সা. দেখতে না পেয়ে সাহাবীদের জিজ্ঞাসা করলে তারা উত্তর দিলেন, সে মারা গেছে। নবীজী সা. বললেন, আমাকে কেন জানানো হয়নি? অত:পর সাহাবায়ে কিরামকে নিয়ে তার কবরে জানাযা আদায় করলেন। তারপর ইরশাদ করলেন, এইসব কবরগুলো তাদের অধিবাসীদের নিকট অত্যন্ত অন্ধকার অনুভূত হয়। আমার নামাযের উসীলায় আল্লাহ তাআলা সেগুলোকে আলোকিত করে দেন। (বুখারী: ৪৬০, মুসলিম: ৯৫৬)
নাজাশী রহ. এর গায়েবী জানাযা কেন পড়া হয়েছিল?
নাজাশী রহ. এর গায়েবী জানাযা সংক্রান্ত হাদীসটি ইমাম বুখারী রহ. নিম্নোক্ত শিরোনামের অধীনে এনেছেন: باب الرجل ينعى إلى الناس الميت بنفسه
অর্থাৎ, এমন ব্যক্তি সম্পর্কিত অধ্যায়- যিনি কারো মৃত্যুর সংবাদ মানুষের নিকট পৌঁছে দেন। ইবনে বাত্তাল রহ. (মৃ.৪৪৯) তাঁর বুখারী শরীফের ব্যাখ্যা গ্রন্থে বলেন:
وإنما نعى (صلى الله عليه وسلم) النجاشى للناس، وخصه بالصلاة عليه، وهو غائب، لأنه كان عند الناس على غير الإسلام، فأراد أن يعلم الناس كلهم بإسلامه، فيدعو له فى جملة المسلمين ليناله بركة دعوتهم، ويرفع عنه اللعن المتوجه إلى قومه. والدليل على ذلك أنه لم يصل (صلىالله عليه وسلم ) على أحد من المسلمين ومتقدمى المهاجرين والأنصار الذين ماتوا فى أقطار البلدان، وعلى هذا جرى عمل المسلمين بعد النبى (صلى الله عليه وسلم) ، ولم يصل على أحدٍ مات غائبًا، لأن الصلاة على الجنائز من فروض الكفاية يقوم بها من صلى على الميت فى البلد التى يموت فيها، ولم يحضر النجاشى مسلمٌ يصلى على جنازته، فذلك خصوص للنجاشى، بدليل إطباق الأمة على ترك العمل بهذا الحديث. وقال بعض العلماء: إن روح النجاشى أحضر بين يدى النبى، (صلى الله عليه وسلم) ، فصلى عليه، ورفعت له جنازته كما كشف له عن بيت المقدس حين سألته قريش عن صفته، وعلم يوم موته ونعاه لأصحابه، وخرج فأمهم فى الصلاة عليه قبل أن يُوارَى، وهذه أدلة الخصوص، يدل على ذلك أيضًا إطباق الأمة على ترك العمل بهذا الحديث
অর্থাৎ, নবীজী সা. নাজাশী রহ. এর গায়েবী জানাযা পড়েছিলেন কারণ, নাজাশী জনসাধারণের নিকট অমুসলিম হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। নবীজী সা. চাচ্ছিলেন যেন তাঁর ইসলাম গ্রহণের ব্যপারটা সকলের
অবগতিতে আসে। এইজন্য তিনি সবার উপস্থিতিতে নাজাশীর জন্য দুআ করেছিলেন, যেন সকলের সম্মিলিত দুআর বরকত নাজাশী রহ. লাভ করতে পারেন।
এটা ছিল মূলত এমন একজন মুসলিমের ব্যাপারে অন্যদের অবগত করা- যিনি অমুসলিম দেশে অমুসলিম পরিবেষ্টিত হয়ে ইন্তেকাল করেছেন। সংবাদ দেওয়ার প্রয়োজন এজন্য হয়েছিল, যেন অমুসলিমদের যেসব লা‘নত করা হয় না জানার কারণে বাদশাহ নাজাশী রহ. সে লা‘নতের লক্ষ্যবস্তু না হয়ে যান। ওহীর যামানা চলার কারণে সে সময় এটা (অর্থাৎ, দূরদেশে কারো গোপনে মুসলিম হওয়ার সংবাদ লাভ ও তা অন্যদের প্রদান) সম্ভবও ছিল।
এটা যদি নবীজী সা. জানাযার উদ্দেশ্যেই করতেন, তাহলে তাঁর জীবদ্দশায় পৃথিবীর নানা প্রান্তে বহু জালীলুল ক্বদর সাহাবীর ইন্তেকাল হয়েছে- কিন্তু তিনি তাঁদের কারো জানাযা পড়েছেন মর্মে ইতিহাসে বর্ণনা নেই। নবীজী সা. এর ইন্তেকালের পর মুসলমানগণও কারো গায়েবী জানাযা পড়েননি। কারণ, জানাযার নামায ফরজে কিফায়া, কিছু লোকের আদায় করার দ্বারাই সকলের পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যায়। কিন্তু নাজাশী রহ. এর জানাযা পড়ার মত কেউ ছিলো না বিধায় নবী সা. তার জানাযা পড়েছিলেন। এটা শুধু নাজাশীর জন্য বিশেষায়িত ছিল। (এটা শুধু নাজাশীর জন্য বিশেষায়িত) এর প্রমাণ হলো, এই হাদীসের উপর আমল না করার ব্যপারে উম্মতের ঐকমত্য। (ঈষৎ সংক্ষেপিত) (শরহে ইবনে বাত্তাল লিল বুখারী ৩/২৪৩)
ইমাম ইবনে কাছীর রহ. নকল করেন:
وقال بعض العلماء إنما صلى عليه لأنه كان يكتم إيمانه من قومه فلم يكن عنده يوم مات من يصلي عليه فلهذا صلى عليه صلى الله عليه وسلم. قالوا: فالغائب إن كان قد صلي عليه ببلده لا تشرع الصلاة عليه ببلد أخرى ولهذا لم يصل النبي صلى الله عليه وسلم في غير المدينة، لا أهل مكة ولا غيرهم وهكذا أبو بكر وعمر وعثمان وغيرهم من الصحابة لم ينقل أنه صلي على أحد منهم في غير البلدة التي صلي عليه فيها فالله أعلم
……অর্থাৎ, একদল উলামায়ে কিরামের মত হলো, নাজাশীর গায়েবী জানাযা পড়া হয়েছিল, কারণ, তিনি তাঁর জাতির কাছে তাঁর ঈমান আনয়নের ব্যপারটা গোপন রেখেছিলেন। যার ফলে তার মৃত্যুর সময় জানাযা পড়ার মতো কেউ ছিল না। একারণেই নবীজী সা. তাঁর জানাযা পড়েছিলেন। এর ভিত্তিতে তারা বলেন, কোন মৃত ব্যক্তির কোনো অঞ্চলে একবার জানাযা হয়ে গেলে তার জানাযা দ্বিতীয় বার অন্য অঞ্চলে পড়া জায়েয নেই। একারণেই নবীজী সা. মদীনার বাসিন্দা ব্যতিত মক্কা কিংবা অন্য কোনো অঞ্চলের মৃত ব্যক্তির জানাযা পড়েননি। হযরত আবূ বকর, উমার, উসমান রা. সহ অন্যান্য সাহাবাদের ব্যাপারেও ভিন্ন অঞ্চলের কেউ তাদের জানাযা পড়েছেন মর্মে বর্ণনা পাওয়া যায় না। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৩/৭৮)
আল্লামা আইনী রহ. ইমাম খাত্তাবী রহ. থেকে নকল করেন:
وقال الخطابي: النجاشي رجل مسلم قد آمن برسول الله صلى الله عليه وسلم وصدقه على ثبوته إلا أنه كان يكتم إيمانه، والمسلم إذا مات وجب على المسلمين أن يصلوا عليه، إلا أنه كان بين ظهراني أهل الكفر ولم يكن بحضرته من يقوم بحقه في الصلاة عليه، فلزم رسول الله صلى الله عليه وسلم، أن يفعل ذلك، إذ هو نبيه ووليه وأحق الناس به، فهذا والله أعلم هو السبب الذي دعاه إلى الصلاة عليه بظهر الغيب.
অর্থাৎ, নাজাশী মুসলিম ছিলেন এবং তাঁর ইমান গোপন ছিল। আর কোনো মুসলমান মারা গেলে তার জানাযা পড়া অন্যান্য মুসলিমদের উপর আবশ্যক হয়ে যায়। কিন্তু নাজাশী রহ. এর অবস্থান ছিল কাফের
জনগোষ্ঠির মাঝে; তার আশেপাশে এমন কোনো মুসলমান ছিল না যে তার জানাযা পড়ে মুসলমানদের উপর অর্পিত দায়িত্ব আদায় করবে।
ফলে রাসূল সা. এর জন্য অবশ্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায় তার জানাযা পড়া। কারণ তিনি নবী, অভিভাবক এবং সকল মানুষের তুলনায় নাজাশীর জানাযা পড়ানোর অধিক হকদার। এটাই ছিল (আল্লাহ তা‘আলাই অধিক অবগত) বাহ্যত লাশ অনুপস্থিত থাকার পরও নাজাশীর জানাযা আদায় করার কারণ। (উমদাতুল ক্বারী: ৮/২১)
নাজাশী রহ. এর জানাযা কি গায়েবী ছিল?
বিভিন্ন দলীলের আলোকে বুঝা যায়, নাজাশী রহ. এর জানাযাটি প্রকৃতপক্ষে গায়েবী জানাযা ছিল না। বরং, আসহামা নাজাশী রহ. এর লাশ নবী করীম সা. এর মু‘জেযা স্বরূপ দৃষ্টির গোচরে ছিল। আর লাশ শুধুমাত্র ইমামের দৃষ্টিসীমায় থাকাই জানাযা সহীহ হওয়ার জন্য যথেষ্ট; মুক্তাদীদের দৃষ্টির সীমায় থাকার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
সহীহ ইবনে হিব্বান (৩১০২) ও মুসনাদে আহমাদের (২০০০৫) বর্ণনা:
عن عمران بن حصين قال: أنبأنا رسول الله صلى الله عليه وسلم أن أخاكم النجاشي توفي فقوموا فصلوا عليه فقام رسول الله صلى الله عليه وسلم وصفوا خلفه وكبر أربعا وهم لا يظنون إلا أن جنازته بين يديه
অর্থাৎ, ইমরান বিন হুসাইন রা. ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেছেন,‘(অবস্থার প্রেক্ষিতে) সাহাবায়ে কেরামের প্রবল ধারণা হচ্ছিল যে, নাজাশী রহ. এর শবাধার নবীজী সা. এর সামনেই রয়েছে।
নবীজীর শানে এধরনের ঘটনা মোটেই আশ্চর্য কিছু নয় সেটা বোঝাতে ইমাম ত্বহাবী রহ. মে’রাজ পরবর্তী কুরাইশদের সাথে নবী কারীম সা. এর কথোপোকথনের ঘটনার অবতারণা করেছেন:
قال أبو جعفر: ففي هذا الحديث مما كان عن أصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم في أمر النجاشي: أنه حمل إلى المدينة بلطيف قدرة الله عز وجل في اليوم الذي مات فيه حتى صلى عليه رسول الله صلى الله عليه وسلم، كما يصلي على من مات عنده بالمدينة ودفع ذلك أن يكون في هذا الحديث حجة لمن أطلق الصلاة على الميت الغائب، وكان ما كان من الله عز وجل في ذلك من لطيف قدرته كمثل ما كان منه لنبيه صلى الله عليه وسلم لما كذبته قريش حين أخبرهم: أنه أسري به إلى بيت المقدس، ثم رجع إلى بيته من ليلته
অর্থাৎ, নাজাশী রহ. এর জানাযা সংক্রান্ত এই রেওয়ায়েতটি দ্বারা তাদের কথার জবাব হয়ে যায়, যারা দাবি করেন গায়েবী জানাযা জায়েজ এবং দাবির স্বপক্ষে নাজাশীর জানাযার বর্ণনা দলীল হিসেবে পেশ করেন। (কেননা, এই হাদিসটির বর্ণনার ঢঙে বোঝা যাচ্ছে) আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা নাজাশীর শবাধার নিজ কুদরতে নবী কারীম সা. এর সামনে উপস্থিত করে দিয়েছিলেন; যেমন বাইতুল মুকাদ্দাসকে তাঁর
ামনে উপস্থিত করে দেওয়া হয়েছিল যখন কুরাইশরা মি’রাজের ঘটনাকে অস্বীকারের প্রয়াস পাচ্ছিল। (শরহু মুশকিলিল আসার: ৪৮৫০)
ইবনে হাজার রহ. নিজ বুখারী শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থে ওয়াকেদীর বরাতে হযরত ইবনে আব্বাস রা. এর একটি রেওয়ায়েত সনদবিহীন নকল করেন: وكأن مستند قائل ذلك ما ذكره الواقدي في أسبابه بغير إسناد عن ابن عباس قال كشف للنبي صلى الله عليه وسلم عن سرير النجاشي حتى رآه وصلى عليه
অর্থাৎ, ওয়াকেদী রহ. (মৃ.২০৭ হি.) ইবনে আব্বাস রা. থেকে সনদ বিহীন নকল করেন: নবীজী সা. এর সামনে নাজাশী রহ. এর শবাধার উন্মোচিত করে দেওয়া হয়েছিল; ফলে তিনি নাজাশীর মৃতদেহ দেখতে পান এবং তার জানাযার নামাজ পড়েন। (ফাতহুল বারী: ৩/১৮৮)
স্মর্তব্য, ওয়াকেদী রহ. এর জন্ম ১৩০ হি. এবং তিনি একজন প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক। তাঁর যুগে ফিতনার সয়লাব কম থাকায় তৎকালীন অনেকের মাঝেই সনদবিহীন রেওয়ায়েত করার প্রচলন ছিল।
প্রসিদ্ধ ফিকাহ গ্রন্থ বাদায়েয়ূস সানায়ে‘ তে উল্লেখ আছে:
ولا حجة له فيه لما بينا على أنه روي أن الأرض طويت له، ولا يوجد مثل ذلك في حق غيره، ثم ما ذكره غير سديد؛
অর্থাৎ, নাজাশীর হাদীস দ্বারা গায়েবী জানাযার স্বপক্ষে দলীল প্রদান করা যাবে না; কেননা, বর্ণনা পাওয়া যায় যে, যমীনকে নবী সা. এর জন্য সংকুচিত করে দেওয়া হয়েছিল। (বাদায়ে‘ ১/৩১২)
আল্লামা ইবনে আবিদীন শামী রহ. এর বক্তব্য: لأنه رفع سريره حتى رآه عليه الصلاة والسلام بحضرته فتكون صلاة من خلفه على ميت يراه الإمام وبحضرته دون المأمومين وهذا غير مانع من الاقتداء
(নাজাশী রহ. এর জানাযা দিয়ে দলীল দেওয়া যাবে না) কারণ, এটা ছিল নবী আলাইহিস সালাম এর বিশেষ বৈশিষ্ট অথবা আমরা বলব যে, তার শবাধার নবীজী সা. এর দৃষ্টির সীমায় এনে রাখা হয়েছিল, তবে মুক্তাদীগণ তা দেখতে পায় নি। আর লাশ না দেখতে পাওয়া ইমামের ইক্তেদা সহীহ হওয়ার পথে প্রতিবন্ধক নয়। (ফাতাওয়া শামী; বাবু সালাতিল জানাযা ২/২০৯)
হাসান বসরী রহ. তো নাজাশীর জানাযাকে জানাযাই মনে করতেন না; তিনি বলতেন, এটা ছিল মূলত দুআ। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা: ১২০৮০) عن الحسن وابن سيرين أن النبي صلى الله عليه وسلم صلى على النجاشي وقال الحسن إنما دعا له
মোটকথা, নাজাশী রহ. এর জানাযা প্রকৃতপক্ষে গায়েবী জানাযা ছিল কিনা- সালাফে সালেহীনের মাঝে এ নিয়ে দ্বিধা রয়েছে। আর শরীয়তের একটি প্রসিদ্ধ মূলনীতি হলো- إذا جاء الاحتمال بطل الاستدلال
অর্থাৎ, কোনো বর্ণনায় যদি একাধিক বিষয়ের সম্ভাবনা চলে আসে তখন তা দ্বারা কোনো একটি নির্দিষ্ট দাবীর স্বপক্ষে দলীল পেশ করা চলেনা। তাছাড়া যদি উম্মতের জন্য গায়েবী জানাযার অনুমতি দেওয়া হয় তাহলে কিছু ক্ষেত্রে শরীয়তের গুরুত্বপূর্ণ দু‘টি ফরয বিধান লঙ্ঘন হয়: لأن الميت إن كان في جانب المشرق فإن استقبل القبلة في الصلاة عليه كان الميت خلفه، وإن استقبل الميت كان مصليا لغير القبلة وكل ذلك لا يجوز.
অর্থাৎ, (অনুপস্থিত) মৃতব্যক্তি যদি পূর্ব দিকে থাকে আর জানাযা পড়ানোর সময় কিবলার দিকে ফেরা হয়- সেক্ষেত্রে মায়্যিত মুসল্লির পিছনে থাকে। আর যদি মায়্যিতের দিকে ফিরে দাঁড়ানো হয় তাহলে কিবলামুখি না হয়ে জানাযা আদায করা আবশ্যক হয়। আর এই দুটির একটিও জায়েয নেই। (বাদায়ে’ ১/৩১২) অতএব, যে বিধানের কারণে আরেকটি ফরয বিধান ছেড়ে দেওয়া আবশ্যক হয় সেটা শরীয়ত সিদ্ধ হতে পারে না।
একাধিক জানাযা পড়ার বিধান: মৃতের জানাযা একবার পড়াই বিধান। মৃতের ওলী একবার জানাযা পড়ে নিলে অন্যদের জন্য দ্বিতীয় বা তৃতীয়বার জানাযা আদায়ের সুযোগ নেই।
ইমাম ত্বহাবী রহ.এর বক্তব্য:
قال أبو جعفر يسقط الفرض بالصلاة الأولى إذا صلى عليه الولي والثانية لو فعلت لم تكن فرضا فلا يصلي عليه لأنهم لا يختلفون أن الولي إذا صلى عليه لم يجز له إعادة الصلاة عليه ثانية لسقوط الفرض فكذلك غيره من الناس إلا أن يكون الذي صلى عليه نائبه لسقوط حق الولي لأن الولي كان إليه فعل فرض الصلاة على الميت.
অর্থাৎ, যদি ওলী জানাযা পড়ে থাকে তাহলে প্রথমবার জানাযা পড়ার দ্বারাই ফরয আদায় হয়ে যাবে। এখন যদি দ্বিতীয়বার পড়া হয় তাহলে সেটা ফরয হিসেবে আদায় হবে না। (অতএব, দ্বিতীয়বার আর পড়া যাবে না।) কারণ, এব্যাপারে কারো দ্বিমত নেই যে, যদি ওলী একবার জানাযা পড়ে ফেলে তাহলে ওলীর জন্য আর দ্বিতীয়বার পড়ার অনুমতি নেই। কারণ, তার ফরয আদায় হয়ে গেছে। তেমনি অন্যদের জন্যও একই হুকুম। (মুখতাসারু ইখতেলাফিল উলামা: ১/৩৯৩)
আল বাহরুর রায়েক কিতাবের ভাষ্য: ولو أعادها الولي ليس لمن صلى عليها أن يصلي مع الولي مرة أخرى
অর্থাৎ, মৃতের ওলী যদি (অন্যদের পড়ার পর) জানাযা পড়ে ফেলে তাহলে অন্যদের জন্য (ওলীর পর) জানাযা পড়ার অনুমতি নেই। (বাহরুর রায়েক: ২/৩১৮)
ফিকহে হানাফীর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ বাদায়েয়ূস সানায়ে এর ভাষ্য: ولا يصلى على ميت إلا مرة واحدة لا جماعة ولا وحدانا عندنا، إلا أن يكون الذين صلوا عليها أجانب بغير أمر الأولياء، ثم حضر الولي فحينئذ له أن يعيدها.
অর্থাৎ, আমাদের মত হলো মৃতের জানাযা একাকী কিংবা জামাআতে কোনো অবস্থাতেই একবারের বেশি পড়া যাবে না। তবে প্রথমবার যারা জানাযা পড়েছে তারা যদি মৃতের ওলীর অনুমতি ব্যতীত পড়ে থাকে অত:পর ওলী উপস্থিত হয়, সেক্ষেত্রে তার দ্বিতীয়বার জানাযা পড়ার অধিকার রয়েছে। (বাদায়ে ১/৩১১)
সাহাবায়ে কিরাম মৃতের জানাযা দ্বিতীয়বার আদায় করতেন না:
মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক ইবনে উমার রা. এর আমল বর্ণনা করা হয়েছে: عن نافع قال: كان ابن عمر إذا انتهى إلى جنازة وقد صلي عليها دعا وانصرف ولم يعد الصلاة
ইবনে উমার রা. জানাযা পড়ে ফেলার পর পৌঁছলে শুধু দু‘আ করে ফিরে আসতেন; দ্বিতীয়বার জানাযা পড়তেন না। (মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক :৬৫৪৫) عن نافع، أن ابن عمر، قدم بعدما توفي عاصم أخوه فسأل عنه فقال: أين قبر أخي فدلوه عليه، فأتاه فدعا له وبه نأخذ
অর্থাৎ, ইবনে উমার রা. তাঁর ভাই আসেম রা. এর ইন্তেকালের পর এসে জিজ্ঞাসা করলেন, আমার ভাইয়ের কবর কোথায়? লোকেরা দেখিয়ে দিলে তিনি কবরে এসে তার জন্য দুআ করলেন (জানাযা পড়লেন না)। ইমাম আব্দুর রাজ্জাক আস সান‘আনী বলেন, এই মতের উপরই আমরা আমল করি। (মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক -৬৫৪৬)
ইবনে উমার রা. নবীজীকে পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসরণ করতেন। নবীজী সা. এর দ্বিতীয়বার জানাযা পড়াকে তিনি যদি উম্মতের জন্য আমলযোগ্য মনে করতেন তাহলে তিনি ভাইয়ের জানাযা দ্বিতীয়বার পড়ার সুযোগ ছেড়ে দিতেন না।
তাবে‘ঈ সালেহ বিন নাবহান সাহাবায়ে কিরামের আমল বর্ণনা করেছেন: عن صالح مولى التوأمة ، عن أبي هريرة ، قال : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : من صلى على جنازة في المسجد فلا صلاة له ، قال : وكان أصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم إذا تضايق بهم المكان رجعوا ، ولم يصلوا
অর্থাৎ, সাহাবায়ে কিরাম যখন স্থান সংকীর্ণ দেখতেন, জানাযা না পড়ে ফিরে যেতেন। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা: ১২০৯৭)
যদি একাধিক জানাযা শরীয়তসম্মত হতো, সাহাবায়ে কিরাম দ্বিতীয় বা তৃতীয় জানাযার জন্য অপেক্ষা করতেন। কেননা, জানাযা পড়ার ফযীলত আকাশচুম্বী। আর সাহাবায়ে কিরাম যেকোনো নেক কাজে সর্বাধিক অগ্রসর ছিলেন।
বিখ্যাত তাবে‘ঈ হযরত ইবরাহীম নাখ‘ঈ রহ. এর মত: عن مغيرة ، عن إبراهيم ، قال : لا يصلى على الميت مرتين
অর্থাৎ, মৃতব্যক্তির জানাযা একাধিকবার আদায় করা যাবে না। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা: ১২০৭০)
উল্লেখ্য, ইবরাহীম নাখ‘ঈ রহ. কে বলা হতো ইবনে মাস‘ঊদ রা. এর প্রতিচ্ছবি। عن معمر، عن رجل، عن الحسن كان إذا فاتته الصلاة لم يصل عليها
প্রসিদ্ধ তাবে‘ঈ হাসান বসরী রহ. জানাযা ছুটে গেলে দ্বিতীয়বার আদায় করতেন না। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা: ১২০৭০) عن الحسن ، أنه كان إذا سبق بالجنازة يستغفر لها ويجلس ، أو ينصرف
হাসান বসরী রহ. জানাযা পড়া হয়ে যাওয়ার পর পৌঁছলে মৃতের জন্য ইস্তেগফার করতেন অথবা ফিরে যেতেন। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা: ১২০৭১)
ইমাম ত্বহাবী রহ. বলেন: قال أَصْحابنا ومالك والثَّوري والْأَوزاعيّ والحسن بن حَيّ واللَّيْث إذا صلي على الْميّت ثمّ جاء آخرون فَإنّهُ لا تعاد الصّلاة عليه
অর্থাৎ, হানাফী ইমামগণ, ইমাম মালিক, ইমাম সুফইয়ান ছাওরী, ইমাম আওযায়ী, হাসান বিন হাই এবং লাইস বিন সা’দ রহ. এর মত হলো, মৃতের উপর একবার জানাযা পড়ে ফেলার পর আরেক দল যদি উপস্থিত হয়, তাহলে তাদের জন্য দ্বিতীয়বার জানাযা পড়ার অনুমতি নেই। (মুখতাসারু ইখতিলাফিল উলামা লিত্ ত্বহাবী: ১/৩৯৪ (৩৭২)
স্মর্তব্য, ইমাম মালিক রহ. ছিলেন মদীনার ইমাম। ইমাম আবূ হানিফা, সুফইয়ান ছাওরী কূফার, ইমাম আওযায়ী রহ. শামের এবং ইমাম লাইস বিন সা‘দ রহ. ছিলেন মিসর অঞ্চলের ফকীহ। বলা বাহুল্য ইসলামের স্বর্ণযুগের এই মনীষীগণ তাবে‘ঈন উস্তাদদের মাধ্যমে নিজ নিজ অঞ্চলের সাহাবায়ে কেরামের আমল ধরে রেখেছিলেন। পরবর্তী মুসলিম উম্মাহর নিকট এঁরা তাই বরিত হয়েছেন ইমাম রূপে।
এসব বর্ণনা থেকে প্রতীয়মান হয়, সাহাবায়ে কিরাম ও তাবে‘ঈন-তাবে’ তাবে‘ঈন যুগে দ্বিতীয় বা তৃতীয় জানাযার প্রচলন ছিল না।
হানাফী ফিকহের আরেক গ্রন্থ মাবসূতে সারাখসীতে আছে:
(قال): وإذا صلى على جنازة ثم حضر قوم لم يصلوا عليها ثانية جماعة ولا وحدانا عندنا إلا أن يكون الذين صلوا عليها أجانب بغير أمر الأولياء ثم حضر الولي فحينئذ له أن يعيدها وقال الشافعي رضي الله عنه تعاد الصلاة على الجنازة مرة بعد مرة لما روي ্রأن النبي صلى الله عليه وسلم مر بقبر جديد فسأل عنه فقيل: قبر فلانة فقال: هلا آذنتموني بالصلاة عليها فقيل: إنها دفنت ليلا فخشينا عليك هوام الأرض فقام وصلى على قبرهاগ্ধ ولما قبض رسول الله صلى الله عليه وسلم صلى الصحابة عليه فوجا بعد فوج
(ولنا) ما روي عن ابن عباس رضي الله عنهما وابن عمر رضي الله عنه أنهما فاتتهما الصلاة على جنازة فلما حضرا ما زادا على الاستغفار له وعبد الله بن سلام رضي الله عنه فاتته الصلاة على جنازة عمر فلما حضر قال: إن سبقتموني بالصلاة عليه فلا تسبقوني بالدعاء له. والمعنى فيه أن حق الميت قد تأدى بفعل الفريق الأول فلو فعله الفريق الثاني كان تنفلا بالصلاة على الجنازة وذلك غير مشروع ولو جاز هذا لكان الأولى أن يصلي على قبر رسول الله صلى الله عليه وسلم من يرزق زيارته الآن لأنه في قبره كما وضع فإن لحوم الأنبياء حرام على الأرض به ورد الأثر ولم يشتغل أحد بهذا فدل أنه لا تعاد الصلاة على الميت إلا أن يكون الولي هو الذي حضر فإن الحق له وليس لغيره ولاية إسقاط حقه وهو تأويل فعل رسول الله صلى الله عليه وسلم فإن الحق كان له قال الله تعالى {النبي أولى بالمؤمنين من أنفسهم} [الأحزاب: ৬] وهكذا تأويل فعل الصحابة فإن أبا بكر رضي الله عنه – كان مشغولا بتسوية الأمور وتسكين الفتنة فكانوا يصلون عليه قبل حضوره وكان الحق له لأنه هو الخليفة فلما فرغ صلى عليه ثم لم يصل أحد بعده عليه (وعلى) هذا قال علماؤنا رحمهم الله تعالى لا يصلى على ميت غائب
অর্থাৎ, একবার জানাযা পড়ে ফেললে সেই মাইয়্যেতের দ্বিতীয়বার জানাযা শরীয়ত সম্মত নয়। হাঁ, যদি প্রথম জানাযা মৃতের ওলীর বিনা অনুমতিতে হয় তাহলে ওলীর জন্য দ্বিতীয়বার পড়ার সুযোগ রয়েছে।
হযরত ইবনে আব্বাস, ইবনে উমার ও আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম রা. এর কর্মপন্থা আমাদের জন্য দলিল।
………..যদি (তাকরারে জানাযা) অর্থাৎ বারবার জানাযার নামাজ পড়া জায়েয থাকতো তাহলে অবশ্যই নবীজী সা. এর কবরে আজ পর্যন্ত জানাযা পড়া হতো। কারণ, নবীদের দেহ মাটির জন্য ভক্ষণ করা হারাম। কিন্তু কেউ এই কাজে অগ্রসর হয়নি।
নবীজী সা. বিভিন্ন সময় দ্বিতীয়বার জানাযা পড়েছিলেন। কারণ, তিনি উম্মতের সবচেয়ে বড় ওলী। (আর ওলির জন্য জানাযা না পড়ে থাকলে পরে পড়ার অনুমতি থাকে)
নবীজী সা. এর জানাযা বারবার হয়েছিল। কারণ, খলীফা হওয়ায় আবূ বকর রা. ছিলেন নবীজী সা. এর সবচেয়ে বড় ওলী। উদ্ভূত ফিতনার প্রতিকারে ব্যস্ত ছিলেন বিধায় তিনি জানাযা পড়তে পারছিলেন না। পরবর্তীতে আবূ বকর রা. এর জানাযা পড়ে নেওয়ার পর আর কেউ জানাযা পড়েন নি। এটাও আমাদের মতকেই প্রতিষ্ঠিত করে। (আল মাবসূত লিস্্ সারাখসী ২/২৬৭, ঈষৎ সংক্ষেপিত)
উপমহাদেশের বিখ্যাত ফিকহ গ্রন্থ ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়ার ভাষ্য:
وإنما لم يصلى عليها مرتين؛ لأن الصلاة الثانية تطوع؛ لأن المفروض هي الأولى، ولا يتطوع بالصلاة على الميت؛ لأنه لو جاز ذلك، لجازت الصلاة على قبر النبي صلى الله عليه وسلم، فلما اتفق الجميع على امتناع جواز الصلاة على قبر النبي صلى الله عليه وسلم، دل على أنه لا يجوز أن يتطوع بالصلاة على الميت.
অর্থাৎ, মাইয়্যেতের দ্বিতীয়বার জানাযা পড়া যাবে না। কারণ, দ্বিতীয়বার জানাযা নফল হিসেবে পরিগণিত হবে; কেননা, প্রথম জানাযার দ্বারা ফরয আদায় হয়ে গিয়েছে। আর মৃত ব্যক্তির নফল জানাযা পড়া যায় না। কেননা, যদি এটা জায়েয থাকত তাহলে নবীজীর কবরে জানাযা পড়ার প্রচলন থাকত। কিন্তু এধরনের আমল পাওয়া যায় না। যেহেতু, সকলেই নবী সা. এর কবরে জানাযা পড়া থেকে বিরত থেকেছেন। এটাই প্রমাণ যে, মৃতের নফল জানাযা পড়া শরীয়ত সম্মত নয়। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া ২/২১৮)
নবীজী সাঃ কেন দ্বিতীয়বার জানাযা পড়েছেন? হাদীস ভাণ্ডারে কয়েকটি হাদীস এমন পাওয়া যায়; যেখানে নবীজী সা. দ্বিতীয়বার জানাযা পড়েছেন মর্মে বর্ণনা রয়েছে।
কিন্তু এই হাদীসগুলো সাহাবায়ে কিরাম রা. উম্মতের জন্য আমলযোগ্য মনে করেন নি। অন্যথায় তারা আমল করে উম্মতের জন্য দৃষ্টান্ত রেখে যেতেন। সাহাবায়ে কিরাম এই হাদীসগুলোর উপর আমল করেননি; যার প্রমাণ উপরে উল্লেখ করা হয়েছে। মদীনার ইমাম হযরত ইমাম মালিক রহ. কে এইসব হাদীস প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন:
قال ابْن القاسم فقلت لمالك فالْحديث الَّذي جاء به عن النّبي صلى الله عليْه وسلم في الْمرأَة التي صلى عليها في قبرها فقال قد جاء هذا الحديث وليس عليه العمل
অর্থাৎ, ইবনুল ক্বাসিম রহ. বলেন আমি মালেক রহ. কে ওই হাদিস প্রসঙ্গে জিঞ্জাসা করলাম যে হাদীসে বর্ণনা রয়েছে নবীজী সাঃ কবরের ওপর জানাযা পড়েছেন। প্রত্যুত্তরে ইমাম মালেক রহ. বলেন হাদীসে এসেছে ঠিক; কিন্তু এর উপর উম্মতের আমল নেই। (মুখতাসারু ইখতিলাফিল উলামা: ১/৩৯৪, (৩৭২)
ইমাম ত্বহাবী রহ. বলেন:
وما روي عن النبي صلى الله عليْه وسلم في إعادة الصّلاة فلأنّه كان إليْه فعل فرض الصّلاة فلم يكن يسْقط بفعل غيره وقد كان قال لا يموت منكم ميت ما دمت بين أظهركم إلَّا أَن أَتيتموني به فإن صلاتي عليه رحْمة
অর্থাৎ, নবীজী সা. থেকে পুনরায় জানাযা পড়ার যেসব রেওয়ায়েত পাওয়া যায়; এর কারণ ছিল (উম্মতের সর্বোচ্চ ওলী হওয়ার কারণে) তার ফরয জানাযা আদায়ের অধিকার ছিল। একারণেই অন্যদের জানাযা পড়ার দ্বারা ফরয জানাযা পড়ার অধিকার নবীজী সা. এর যিম্মা থেকে রহিত হয়নি। (মুখতাসারু ইখতিলাফিল উলামা: (৩৭২) ১/৩৯৪)
বলাবাহুল্য, নবীজী সা. এর ইন্তেকালের পর এই সার্বজনীন অভিভাবকত্ব আর কারো নেই। অতএব, এখন মৃতের ওলী ব্যতীত অন্য কারো জন্য দ্বিতীয়বার জানাযা পড়ার অনুমতি নেই।
আল মুহীতুল বুরহানী:
ولو جاز ذلك لكان الأولى أن يصلي على قبر رسول الله عليه السلام من رزق زيارته الآن؛ لأنه في قبره كما وضع؛ لأن لحوم الأنبياء حرام على الأرض، به ورد الأثر عن رسول الله عليه السلام، ولم يستقبل أحد بهذا، فعلم أنه لا تعاد الصلاة على الميت.
অর্থাৎ, যদি তাকরারে জানাযা জায়েয থাকতো তাহলে অবশ্যই নবীজী সা. এর কবরে আজপর্যন্ত জানাযা পড়া হতো। কারণ, নবীদের দেহ মাটির জন্য ভক্ষণ করা হারাম। কিন্তু কেউ এই কাজে অগ্রসর হয়নি। (মুহীত ২/২০০)
একাধিক জানাযা শরীয়তের মেজায পরিপন্থী:
শরীয়তের মেজায হলো দাফনের কাজ দ্রুত সম্পাদন করা। বারবার জানাযা পড়ার অবকাশ দেয়া হলে মানুষ নিজেদের আত্মিক প্রশান্তির জন্য শরীয়তের এই গুরুত্বপূর্ণ আদেশ লঙ্ঘন করবে।
বুখারী ও মুসলিম শরীফের হাদীস:
عن أبي هريرة رضي الله عنه، عن النبي صلى الله عليه وسلم قال: أسرعوا بالجنازة، فإن تك صالحة فخير تقدمونها، وإن يك سوى ذلك، فشر تضعونه عن رقابكم
অর্থাৎ, তোমরা জানাযাকে দ্রুত দাফন করো। যদি সে নেককার হয় তাহলে তো তাকে কল্যাণের দিকে এগিয়ে দাও। আর যদি বদকার হয় তাহলে একটা নিকৃষ্ট বস্তুকে তোমাদের ঘাড় থেকে নামিয়ে ফেল।
(বুখারী: ১৩১৫, মুসলিম: ৯৪৪)
তিরমিযী ও নাসাঈ শরীফের হাদীস:
عن جابر بن عبد الله قال: لما كان يوم أحد حمل القتلى ليدفنوا بالبقيع، فنادى منادى رسول الله صلى الله عليه وسلم إن رسول الله صلى الله عليه وسلم يأمركم أن تدفنوا القتلى في مضاجعهم. بعدما حملت أمى أبى وخالى عديلين لتدفنهم في البقيع فردوا
অর্থাৎ, হযরত জাবির বিন আব্দুল্লাহ রা. বলেন, উহুদের দিন শহীদদের জান্নাতুল বাকীতে দাফনের জন্য নিয়ে আসা হলো। তখন নবীজী সা. এর পক্ষ থেকে একজন ঘোষক ঘোষণা করলেন, ‘নবীজী সা. তোমাদের আদেশ করেছেন শহীদদের নিজ শাহাদাতের স্থানে দাফন করে দিতে।’ আর এই ঘোষণা হয়েছিল আমার মা, বাবা ও মামাকে জান্নাতুল বাকীতে দাফনের উদ্দেশ্যে নিয়ে আসার পর। (তিরমীযী:১৭১৭, নাসাঈ:২০০৪)
উল্লেখিত হাদীসে মৃত ব্যক্তিকে মৃত্যুর স্থান থেকে সরাতে নিষেধ করা হয়েছে। যেন কাফন-দাফনে অনর্থক দেরী না হয়। অর্থাৎ, শরীয়ত চায় যথাসম্ভব দ্রুত দাফনের কাজ শেষ করতে। একাধিকবার জানাযার অনুমতি হওয়া এর প্রতিবন্ধক।
মুফতী সোহাইল
প্রতিষ্ঠাতা মুহতামিম,
জামি‘আতুল আবরার আল-ইসলামিয়া টাঙ্গাইল