জুমু‘আর খুতবা আরবী ভাষায় না দিয়ে মাতৃভাষায় দেয়ার বিষয়টি বর্তমানে সমাজে ফিতনা আকারে ছড়িয়ে পড়ছে। অথচ জুমু‘আর খুতবা আরবী ভাষায় দেয়া সুন্নাতে মুতাওয়ারাছা তথা যুগ পরম্পরায় চলে আসা অনুসৃত আমল। রাসূল সা:, সাহাবায়ে কেরাম রা., তাবে‘ঈন, তাবে তাবে‘ঈন, আইম্মায়ে মুজতাহিদীন এবং মুসলিম উম্মাহর সর্বযুগে জুমু‘আর খুতবা আরবীতে প্রদান করা হয়েছে। অনারবী ভাষায় খুতবা দেয়ার কোনো প্রমাণ খায়রূল কুরূন তথা দলিলযোগ্য তিন যুগে পাওয়া যায় না।
তাছাড়া রাসূল সা: ও সাহাবায়ে কেরাম রা. এর যুগে অনারবী ভাষায় খুতবা দেয়ার প্রয়োজনও ছিল। কারণ, রাসূল সা: এর শেষ যামানায় লোকেরা ইসলামে দলে দলে প্রবেশ করতে থাকে। আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে কারীমে এরশাদ করেন, وَرَأَيْتَ النَّاسَ يَدْخُلُونَ فِي دِينِ اللَّة أَفْوَاجًا অর্থ: আর আপনি দেখবেন, লোকেরা দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করছে। (সূরা নাসর আয়াত: ২)
উক্ত আয়াত দ্বারা বোঝা যায় যে, রাসূল সা: এর পেছনে বিভিন্ন ভাষার মানুষ নামায আদায় করত। আর তৎকালীন সময়ে খুতবা ছাড়া দ্বীনি শিক্ষার তেমন কোনো মাধ্যম কিতাব ইত্যাদিও ছিল না। তারপরেও রাসূল সা: অন্য ভাষায় খুতবা অনুবাদের ব্যবস্থা করেননি।
তদ্রূপ, হযরত উমর রা. এর যামানায় মদীনা অনারবী মানুষে ভরে গিয়েছিল এবং হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. নিজের ফাতাওয়া ইত্যাদির কাজ পরিচালনার জন্য দোভাষী ব্যবহার করতেন। তবুও তারা স্থানীয় ভাষায় খুতবা দেওয়া বা অনুবাদের ব্যবস্থা করেননি। এমনিভাবে সাহাবায়ে কেরাম রা. এর যামানায় বহু আরব দেশ বিজয় হয়ে মুসলমানদের কর্তৃত্বে এসেছিল, যেগুলোর অনেক স্থানে ভিন্ন ভাষা প্রচলিত ছিল। তখন দ্বীনের তাবলীগ ও মাসআলা মাসাইলের তা‘লীম দেওয়ার উদ্দেশ্যে স্থানীয় ভাষায় জুমু‘আর খুতবা প্রদানের প্রয়োজন ছিল বেশি। কেননা, খুতবা ছাড়া মাসআলা মাসাইল শিক্ষা দীক্ষার জন্য তেমন কোনো কিতাব ছিল না। তাছাড়া, বেশ কিছু সাহাবী ও তাবে‘ঈ অনারবী বিভিন্ন ভাষায় অত্যন্ত দক্ষও ছিলেন। তবুও তারা আরবী ভাষাতেই খুতবা প্রদান করতেন। (জাওয়াহিরুল ফিক্বহ ২/৫০৭)
আব্দুল হাই লাখনবী রহ. লিখেন: أن النبي واصحابه قد خطبوا دائما بالعربية
অর্থ, নবী কারীম স: এবং সাহাবায়ে কেরাম সর্বদা আরবী ভাষায় খুতবা প্রদান করতেন। (আ-কামুন নাফায়েস, ১/১১২) খুতবার ভাষা আরবী হওয়ার ব্যাপারে চার মাযহাবের বক্তব্য তুলে ধরা হচ্ছে।
মালেকী মাযহাব:
قوله: وكونها عربية ولو كان الجماعة عجما لا يعرفون العربية فلو كان ليس فيهم من يحسن الإتيان بالخطبة عربية لم يلزمهم جمعة
অর্থ: জুমু‘আর খুতবা আরবীতে হওয়া শর্ত। যদিও গোটা জামা‘আত অনারবী হয়, যাদের কেউ আরবী বুঝে না। আর যদি উপস্থিত লোকদের মধ্যে কেউ আরবীতে খুতবা দিতে সক্ষম না হয়, তাহলে তাদের উপর জুমু‘আ ওয়াজিব হবে না। বরং তারা যুহরের নামায পড়বে। (হাশিয়াতুদ দুসূকী ১/৩৭৮)
শাফে‘ঈ মাযহাব:
ويشترط كونها أى الخطبة عربية لاتباع السلف والخلف ولأنها ذكر مفروض فاشترط فيه ذلك كتكبيرة الإحرام
অর্থ: সালাফ এবং খালাফদের অনুসরণার্থে খুতবা আরবী ভাষায় হওয়া জরুরী। কেননা, খুতবা একটি নির্দিষ্ট যিকির। তাই তাকবীরে তাহরীমার ন্যায় খুতবার ভাষাও আরবী হওয়া শর্ত। (নেহায়াতুল মুহ্তায ২/৩১৭)
ইমাম নববী রহ. বলেন:
حمد الله تعالى ركن في خطبة الجمعة وغيرها لا يصح بشيء منها الا به ويشترط كونها اي خطبة الجمعة وغيرها بالعربية
অর্থ: আল্লাহর হাম্দ হলো জুমু‘আর খুতবার রুকন। হাম্দ ছাড়া খুতবা সহীহ হবে না। আর খুতবার জন্য শর্ত হলো তা আরবী ভাষায় হওয়া। (কিতাবুল আযকার ১ /১১২)
হাম্বলী মাযহাব:
ولا تصح الخطبة بغير العربية مع القدرة عليها بالعربية (كقراءة) فإنها لا تجزئ بغير العربية (وتصح) الخطبة بغير العربية (مع العجز) عنها بالعربية
অর্থ, আরবী ভাষায় সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও অন্য ভাষায় খুতবা প্রদান করা জায়েয নেই, যেমন নামাযে অন্য ভাষায় ক্বিরাত পড়া জায়েয নেই। তবে আরবী ভাষায় অক্ষম হলে অন্য ভাষায় খুতবা প্রদান করতে পারবে। (কাশফুল কিনা ২/৩৪)
হানাফী মাযহাব:
ولا يشترطُ كونُها بالعربيَّة؛ فلو خطبَ بالفارسيَّةِ أو بغيرها جاز، كذا قالوا، والمراد بالجوازِ هو الجوازُ في حقِّ الصَّلاة، بمعنى أنّه يكفي لأداءِ الشَّرطيَّة، وتصحُّ بها الصَّلاة، ولا الجوازُ بمعنى الإباحةِ المطلقة، فإنّه لا شكَّ في أنَّ الخطبةَ بغيرِ العربيَّةِ خلافُ السُّنَّةِ المتوارثةِ عن النَّبيِّ – صلى الله عليه وسلم والصَّحابة رضي الله عنهم فيكون مكروهاً تحريماً،
(উক্ত ইবারতের সারাংশ হলো) আরবী ছাড়া অন্য ভাষায় খুতবা দিলে জুমু‘আর শর্ত পূরণ হয়ে যাবে এবং নামাযও সহীহ হয়ে যাবে। তবে অনারবী ভাষায় খুতবা দেয়া রাসূল সা: এবং সাহাবায়ে কেরামের ধারাবাহিক সুন্নাত আমলের পরিপন্থী হওয়ায় তা মাকরূহে তাহরীমি হবে। (উমদাতুর রি‘আয়া ৩/৬৫)
উপমহাদেশের বিখ্যাত ফক্বীহ ও মুহাদ্দিস শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবী রহ. এর ভাষ্য:
وكون الخطبة عربية وأما كونها عربية فلاستمرار اهل المسلمين في المشارق والمغارب به مع ان في كثير من الاقاليم كان المخاطبون اعجمين
অর্থাৎ, খুতবার শর্ত হলো তা আরবী ভাষায় হতে হবে। কেননা, পূর্ব এবং পশ্চিমের সর্বকালের আমল হলো, খুতবা আরবীতে দেয়া। যদিও অনেক দেশের শ্রোতা অনারবী। (মুসাফ্ফা শরহুল মুয়াত্তা ১/৫৫৪)
উল্লেখিত দলীলসমূহ দ্বারা স্পষ্টভাবে বুঝা গেল যে, খুতবার ভাষা আরবী হওয়া জরুরী। তাই জুমু‘আর খুতবা আরবী ভাষায়ই দিতে হবে। মাতৃভাষায় দেয়া যাবে না। শ্রোতাদের অর্থ বুঝে আসুক চাই না আসুক।
খুতবা আর বক্তৃতা কি এক?
যারা রাসূল সা: ও সাহাবায়ে কেরামের পদ্ধতি বাদ দিয়ে নিজ খেয়াল খুশির অনুসরণে আরবী ছাড়া অন্য ভাষায় খুতবা দিয়ে থাকেন, তারা কুরআন ও হাদীস রেখে মনগড়া একটি ভ্রান্ত কিয়াসের আশ্রয় নিয়ে থাকেন। তারা বলেন, খুতবা হলো বক্তৃতার নাম। আর বক্তৃতা দ্বারা উদ্দেশ্য থাকে শ্রোতাদের তা বুঝা ও উপদেশ গ্রহণ করা। যদি আরবী ছাড়া অন্য ভাষায় খুতবা দেয়া হয়, তাহলে অনারবী শ্রোতারা তা থেকে কিভাবে উপকৃত হবে? তাই মাতৃভাষায় খুতবা দিতে হবে। আরবী ভাষায় খুতবা দেয়া যাবে না।
এটি তাদের অজ্ঞতা প্রসূত বক্তব্য। কেননা, খুতবা শুধু ওয়াজ বা বক্তৃতার নাম নয়। বরং খুতবা হলো জুমু‘আর নামায সংশ্লিষ্ট একটি বিশেষ ইবাদত।
খুতবা শুধু বক্তৃতা নয়, বরং ইবাদত-
১.আরবীতে বক্তৃতাকে তাযকীর বলা হয়। আর খুতবাকে যিকির বলা হয়।
কুরআনে কারীমে খুতবাকে যিকির বলা হয়েছে:
يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نُودِيَ لِلصَّلَاةِ مِنْ يَوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا إِلَى ذِكْرِالله
অর্থ: হে মুমিনগণ! জুমু‘আর দিন যখন নামাযের জন্য ডাকা হয়, তখন আল্লাহর যিকিরের দিকে ধাবিত হও। (সূরা জুমু‘আ, আয়াত: ৯)
উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফাসসিরীনে কেরাম লিখেছেন যে, এখানে যিকির দ্বারা উদ্দেশ্য হলো খুতবা। এ ব্যাপারে কয়েকটি তাফসীরের উদ্ধৃতি পেশ করা হলো:
তাফসীরে রুহুল মাআনী (১৩/৭০২) এ উল্লেখ আছে:
المراد بذكر الله الخطبة
অর্থ: আল্লাহর যিকির দ্বারা উদ্দেশ্য হলো খুতবা ।
ইমাম রাযী রহ. লিখেন:
الذكر هو الخطبة عند الاكثر من اهل التفسير
অর্থ: অধিকাংশ মুফাস্সিরগণের নিকট যিকির দ্বারা খুতবা উদ্দেশ্য। (তাফসীরে কাবীর: ৯/৩০)
আল্লামা ইবনে কাসীর রহ. বলেন:
فان المراد من ذكر الله الخطبة
অর্থ, আল্লাহর যিকির দ্বারা উদ্দেশ্য খুতবা। (তাফসীরে ইবনে কাসীর ৯ /৪৫৬)
হাদীসে খুতবাকে যিকির হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
فاذا خرج الامام حضرت الملائكة يستمعون الذكر
অর্থ, যখন ইমাম খুতবা দিতে বের হয় তখন ফেরেশতারা এসে যিকির শুনে অর্থাৎ খুতবা শ্রবণ করে। (বুখারী: ৮৮১)
ফুক্বাহায়ে কেরামও খুতবাকে যিকির বলেছেন:
শামসুল আইম্মাহ সারাখছী রহ. বলেন:
ولنا ان الخطبة ذكر
অর্থাৎ, আমাদের নিকট খুতবা একটি বিশেষ যিকির। (আল মাবসূত ২/৪২)
অতএব একথা প্রমাণিত হলো যে, খুতবা একটি বিশেষ যিকির। আর যিকির আরবীতেই হতে হয়। তাই খুতবা আরবী ভাষায়ই দিতে হবে।
২. হাদীসে জুমু‘আর খুতবাকে দুই রাকা‘আত নামাযের স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে।
عن عمر بن الخطاب رضي الله عنه قال كانت الجمعة اربعا فجعلت ركعتين من اجل الخطبة
অর্থাৎ, হযরত উমর রা. বলেন, জুমু‘আর নামায চার রাকা‘আত ছিল। অত:পর খুতবার কারণে দুই রাকা‘আত করা হয়েছে। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বাহ: ৫৩৬৭)
অন্যত্র বর্ণিত আছে:
عن عمرابن الخطاب رضي الله عنه قال انما جعلت الخطبة مكان الركعتين
অর্থ: হযরত উমর রা. বলেন, জুমু‘আর খুতবাকে দুই রাকা‘আত নামাযের স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বাহ: ৫৩৭৪)
৩. খুতবা নামাযের সাদৃশ্যপূর্ণ, অর্থাৎ-
ক. নামাযের জন্য যেমন ওয়াক্ত নির্ধারিত রয়েছে, খুতবার জন্যও তদ্রুপ ওয়াক্ত নির্ধারিত রয়েছে। ওয়াক্ত হওয়ার পূর্বে বা পরে খুতবা দিলে তা সহীহ হয় না।
খ. জুমু‘আর নামাযের যেমন ওয়াজিব ও সুন্নাত রয়েছে, জুমু‘আর খুতবার জন্যও ওয়াজিব ও সুন্নাত রয়েছে।
গ. নামাযের জন্য যেমন পবিত্রতা শর্ত, তদ্রূপ খুতবার জন্যও পবিত্রতা জরুরী। উযূবিহীন খুতবা দেয়া মাকরূহ। বরং ইমাম আবূ ইউসুফ রহ. এর মতে নাজায়েয। (আল-বাহরুর রায়েক (২/২৫৮)
ঘ. নামাযের পূর্বে ইকামত দিতে হয়, তদ্রূপ খুতবার পূর্বে আযান দিতে হয়।
ঙ. নামাযের মধ্যে সালাম কালাম করা যায় না। নামাযে কারো হাঁচির উত্তর দেয়া যায় না। সালামের জবাব দেয়া যায় না। তেমনিভাবে খুতবাতেও কারো হাঁচির ও সালামের উত্তর দেয়া যায় না।
চ. নামায যেমন দাঁড়িয়ে পড়া হয়, খুতবাও তেমন দাঁড়িয়ে দিতে হয়।
যেহেতু খুতবা নামাযের মতো। অতএব, নামাযে যেমন আরবী ছাড়া অন্য ভাষা ব্যবহার করা জায়েয নেই, অনুরূপ খুতবার মধ্যেও আরবী ছাড়া অন্য ভাষা ব্যবহার করা জায়েয নেই।
৪. খুতবা শ্রবণ করা এবং খুতবা চলাকালীন চুপ থাকা ওয়াজিব। যবানে দরূদ শরীফ পড়া, তাসবীহ পাঠ করা, তাকবীর বলা অথবা সালামের উত্তর দেয়া জায়েয নেই।
হাদীস শরীফে এসেছে:
عن ابي هريرة رضي الله تعالى عنه ان رسول الله صلى الله عليه وسلم قال اذا قلت انصت والامام يخطب فقد لغوت
অর্থাৎ, জুমু‘আর দিন ইমামের খুতবা প্রদানকালে যদি কেউ অন্যকে বলে- চুপ করো, তবে সেটাও অনর্থক হবে। (আবূ দাউদ, হাদীস নং :১১১২)
অন্যত্র এসেছে:
اذا خرج الامام فلا صلاة ولا كلام
অর্থাৎ, ইমাম যখন খুতবা দেয়ার জন্য কামরা থেকে বের হবেন, তখন নামায ও কথাবার্তা বলা নিষেধ। (নসবুর রায়া ২/২০১)
খুতবা যদি ভাষণই হতো, তাহলে সালামের জবাব দেয়া, কথা বলা এবং নামায থেকে নিষেধ করা হতো না।
৫. ফুক্বাহায়ে কেরাম জুমু‘আর নামায সহীহ হওয়ার জন্য খুতবাকে শর্ত বলেছেন।
ويشترط لصحتها سبعة اشياء الرابع الخطبة فيه (بدائع الصنائع ১/১২)
وكونها شرطا لانعقاد الجمعة (الدر المختار৩/১২)
যদি খুতবা দ্বারা ওয়াজ করাই উদ্দেশ্য হতো, তাহলে এটাকে জুমু‘আর নামায সহীহ হওয়ার পূর্বশর্ত বলা অর্থহীন।
৬. জুমু‘আর খুতবা জুমু‘আর নামাযের ওয়াক্তে হওয়া শর্ত। যেমন,
ফুকা¡হায়ে কেরাম লিখেছেন:
فلو خطب قبله وصلى فيه لم تصح
অর্থ, যদি জুমু‘আর নামাযের ওয়াক্ত আসার পূর্বে খুতবা দেয়, আর ওয়াক্ত আসার পর নামায পড়ে, তাহলে জুমু‘আ সঠিক হবে না। (আদ্দুররুল মুখতার ১/১৯)
এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, যদি খুতবা দ্বারা উদ্দেশ্য ওয়াজ বা বক্তৃতা হতো, তাহলে তার জন্য জুমু‘আর নামাযের ওয়াক্ত হওয়া শর্ত করা হতো না। বরং, যে কোনো সময় কিছু ওয়াজ নসীহত করাই যথেষ্ট হতো। সময় নির্ধারণই প্রমাণ বহন করে এটি একটি ইবাদত; শুধুমাত্র ওয়াজ বা নসীহত নয়।
৭.জুমু‘আর নামায সহীহ হওয়ার জন্য খুতবা পাঠ করা শর্ত। আর খুতবা শ্র্রবণ করা ওয়াজিব। তবে যদি উপস্থিত মুসল্লিদের সকলেই বধির বা ঘুমন্ত থাকে এবং তাদের সামনে খুতবা দেয়া হয়, তাহলেও তা আদায়ের জন্য যথেষ্ট হবে।
আল্লামা শামী রহ. বলেন:
كونها قبلها بحضرة جماعة ينعقد الجمعة بهم ولو كانوا صما او نياما
অর্থ: জুমু‘আ শুদ্ধ হওয়ার জন্য কমপক্ষে তিনজন লোকের সম্মুখে নামাযের পূর্বে খুতবা দেয়া শর্ত। যদিও মুসল্লিগণ বধির কিংবা ঘুমন্ত হয়।
(ফাতাওয়ায়ে শামী ৩/১৯)
যদি খুতবা ওয়াজ বা বক্তৃতাই হতো, তাহলে বধির ও ঘুমন্ত লোকদের সামনে খুতবা দেয়ার অর্থ কি?
৮. খুতবা দেয়ার পর যদি খতীব সাহেব কোনো কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন এবং তাতে দীর্ঘ সময় বিলম্ব হয়ে যায়, তাহলে পুনরায় খুতবা দিতে হবে। যদিও শ্রোতা প্রথমবারের শ্রোতারাই হোক না কেন।
لو خطب ثم رجع الى بيته فتغدى او جامع واغتسل ثم جاء استقبل الجمعة
অর্থ: খুতবা দেয়ার পর যদি খতীব সাহেব কামরায় গিয়ে খানা-পিনা কিংবা অন্য কোনো কাজে লিপ্ত হয়ে যান, অত:পর মসজিদে আসেন, তাহলে খুতবা পুনরায় দিতে হবে। (আল- বাহরুর রায়েক ২/২৮৫)
যদি খুতবা দ্বারা ওয়াজ বা নসীহত করাই উদ্দেশ্য হতো, তাহলে একবার খুতবা দেওয়ার পর বিলম্ব হওয়ার কারণে পূর্বের শ্রোতাদের সামনে পুনরায় খুতবা দেয়ার কি অর্থ?
৯. খুতবা শুধু ওয়াজ বা বক্তৃতার নাম নয় এর বড় প্রমাণ হলো, ইমাম আবূ হানিফা রহ. এর মতে শুধু আলহামদুলিল্লাহ বা সুবহানাল্লাহ পড়ার দ্বারা খুতবা আদায় হয়ে যায়। (আল- বাহরুর রায়েক,২/২৮৫)
অথচ সুব্হানাল্লাহ বা আলহাম্দুলিল্লাহকে কেউ ওয়াজ বা বক্তৃতা বলে না।
১০. খুতবা ইসলামের একটি প্রতীক অর্থাৎ আযান-ইকামত, নামাযের তাকবীর এগুলো যেমন ইসলামের প্রতীক, তেমনি খুতবাও একটি প্রতীক। আযান ইকামত যেমন অন্য ভাষায় দেয়া যায় না, তেমনি খুতবাও অন্য ভাষায় দেয়া যাবে না।
১১. যদি খুতবা ভাষণেরই নাম হয় যা মানুষকে বুঝানোর জন্য স্থানীয় ভাষায় দেয়া জরুরী। তাহলে প্রশ্ন হলো, যদি স্থান এমন হয় যেখানে একাধিক ভাষাভাষী মানুষ থাকে, যেমন হজ্বের সময় মক্কা ও মদীনায়, তখন খতীব সাহেব কোন্ ভাষায় খুতবা দিবেন? অথচ খুতবা তো একবারই।
উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা সুস্পষ্ট ভাবে বুঝে আসে যে, খুতবা ওয়াজ বা বক্তৃতার নাম নয়। বরং একটি বিশেষ ইবাদত বা যিকির। তবে খুতবা নামক ইবাদতে আরবী ভাষায় ওয়াজ নসীহত থাকা একটি স্বতন্ত্র সুন্নাত। সুতরাং, যখন প্রমাণিত হলো খুতবার উদ্দেশ্য ওয়াজ নসীহত নয়, বরং ইবাদত; তাহলে অনারবী শ্রোতাদের সামনে আরবী ভাষায় খুতবা দেয়ার দ্বারা কি ফায়দা? এ ধরনের প্রশ্নের কোনো অবকাশ নেই। কেউ যদি এমন প্রশ্ন করে, তাহলে সর্বপ্রথম নামায ও কুরআনের ব্যাপারে করতে হবে। যখন কুরআন বা নামাযের ব্যাপারে এই ধরনের প্রশ্ন নেই, তাহলে খুতবার ব্যাপারেও এধরণের প্রশ্ন করা অনর্থক।
নবীজি সা: আরবী ভাষায় নয়, বরং মাতৃভাষায় খুতবা দিয়েছেন এমন
উদ্ভট যুক্তিও অনেকে দিয়ে থাকে।
তাদের জবাবে আমরা বলব, তাহলে কি আপনারা বলবেন যে, নবীজি সা: আরবী ভাষায় নয় বরং মাতৃভাষায় কুরআন পড়েছেন? মাতৃভাষায় আযান দিয়েছেন? মাতৃভাষায় ইকামত দিয়েছেন? তাহলে তো কুরআন তিলাওয়াত এবং নামাযের রুকন-আরকান, আযান ও ইকামত সবই সবার নিজস্ব মাতৃভাষায় দিতে হবে। আরবীতে কেন দেয়া হবে? বুঝা গেল এটি একটি অহেতুক কথা ছাড়া আর কিছুই নয়।
সারকথা:
ইসলামে আরবী ভাষাকে অন্যান্য ভাষা থেকে বেশী গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কারণ, জানা-অজানা অসংখ্য হেকমতের ভিত্তিতে আল্লাহ তা‘আলা আরবীকে ইসলাম ও ঈমানের ভাষা বানিয়েছেন। তাই দ্বীনের শি‘আর তথা প্রতীক বা যে সব আমল কিংবা ইবাদতের প্রচলন আরবী ভাষায় হয়েছে, সেগুলোকে অন্য ভাষায় রূপান্তরের দাবি ইসলামের শি’আর পরিবর্তন করে ইসলামকে তামাশার বস্তু বানানোর একটি ষড়যন্ত্র মাত্র।
ইসলামকে তার মূল চেহারায় বাকী রাখার জন্য ইবাদত যথা- আযান, ইকামত, নামায ইত্যাদির মধ্যে কুরআন হাদীসের মৌলিক ভাষাকে আবশ্যকীয় রাখা হয়েছে। যেন তা ভাষান্তরের ফলে বিকৃতির শিকার না হয়।
খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে ইসলাম বিভিন্ন ভাষাভাষীদের কাছে ছড়িয়ে পড়লেও পৃথিবীর কোনো প্রান্তে ইসলামের কোনো ইবাদতে আরবী ছাড়া অন্য ভাষা ব্যবহারের কোনো নযীর পাওয়া যায় না। যেমন: আযান আরবীতে না দিয়ে বাংলা কিংবা ফার্সী ভাষায় দেয়া, নামাযের আরকানগুলোর তাকবীর অন্য ভাষায় দেয়ার কোনো নযীর ইসলামের সূচনালগ্ন থেকে অদ্যবধি নেই। কারণ, এসবের অনুমোদন রাসূল সা: থেকে প্রমাণিত নয়। তাই এসব ইবাদত যে পদ্ধতিতে, যে শব্দে এসেছে, হুবহু সেই পদ্ধতি ও সেই শব্দে-বাক্যে অবিকৃত রেখে তা আদায় করা কিয়ামত পর্যন্ত মুসলমানদের উপর আবশ্যক।
সুতরাং, খুতবার প্রচলনও যেহেতু ইসলামের সূচনালগ্ন থেকে আরবী ভাষায় হয়েছে এবং রাসূল সা: সাহাবায়ে কেরাম, তাবে‘ঈন, তাবে তাবে‘ঈন, আইম্মায়ে মুজতাহিদীন সকলেই জুমু‘আর খুতবা আরবী ভাষায় প্রদান করেছেন। তাই জুমু‘আর খুতবা আরবী ভাষায়ই দিতে হবে। মাতৃভাষায় দেয়া যাবে না। কেননা, যে কাজ রাসূল সা: করেননি এবং পরবর্তীতে সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেঈগণ করেননি, সে কাজ দ্বীন হিসাবে করা সুনিশ্চিতভাবে সুন্নাত বহির্ভূত ও বিদ্আত, যা থেকে আমাদের সকলেরই বিরত থাকা জরুরী।
হযরত ইরবাস বিন সারিয়া রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা: ইরশাদ করেন,
من يعيش منكم بعدى فسيرى اختلافا كثيرا فعليكم بسنتي وسنة الخلفاء الراشدين المهديين تمسكوا بها وعضوا عليها بالنواجذ واياكم ومحدثات الامور فان كل محدثة بدعة وكل بدعة ضلالة
অর্থাৎ, তোমাদের মাঝে আমার পর যারা জীবিত থাকবে তারা অনেক মতভেদ দেখবে। তখন তোমাদের উপর আমার এবং আমার হেদায়াতপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাত আঁকড়ে ধরা জরুরী এবং সেটিকে মাড়ির দাঁত দিয়ে কামড়ে রাখবে। আর সাবধান থাকবে নব
উদ্ভাবিত ধর্মীয় বিষয় থেকে। কেননা, ধর্মীয় ব্যাপারে প্রতিটি নতুন বিষয়ই বিদ্‘আত। আর প্রতিটি বিদ্‘আতই গোমরাহী। (মুসনাদে আহমাদ: ১৬৫২১)
অপর হাদীসে এসেছে:
عن عائشة قالت: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم “من أحدث في أمرنا هذا ما ليس فيه فهو رد
অর্থাৎ, হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা: ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি আমাদের ধর্মে নেই এমন বিষয়কে ধর্মীয় বিষয় হিসাবে উদ্ভাবন করবে তা পরিত্যাজ্য। (বুখারী: ২৬৯৭)

পরিশেষে, আল্লাহ্ তা‘আলার নিকট দু‘আ করি তিনি যেন আমাদেরকে সর্বদা রাসূল সা: ও সাহাবায়ে কেরামের আদর্শের উপর অবিচল থাকার তাওফীক দান করেন এবং এর বিপরীত যত আদর্শ ও চিন্তা চেতনা রয়েছে তা থেকে হেফাযত করেন। আমীন!

মুফতী তাওহীদুল ইসলাম
মুদাররিস, জামি‘আতুল আবরার আল-ইসলামিয়া টাঙ্গাইল।

Share: