এক:
এপ্রিলের শেষ দশক চলছে। হযরত ঈসা আঃ কে আসমানে উঠিয়ে নেয়ার পর ৫৭০ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। নবীর উপস্থিতি হল আলোর মত। নবুওতের আলোহীন পৃথিবী। তাই এক ঘোর অমানিশায় আচ্ছন্ন। সেই তমসাচ্ছন্ন পৃথিবীতে সুবহে সাদিক হয়ে ধরায় আগমন ঘটেছিল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সল্লাম এর। জন্মের সময়ই বোঝা গিয়েছিল ইনি সাধারণ কেউ নন। যত দিন গড়াল তার অসাধারণত্ব আরো প্রস্ফুটিত হল। যারা তার সংস্পর্শে এলেন জানলেন ইনি বিশেষ কেউ। হালিমা সাদিয়া রা. সাক্ষ্য দিলেন মুহাম্মদ মুবারক। আব্দুল মুত্তালিব বললেন মুহাম্মদের মর্যাদা। আবু তালিব অপত্যস্নেহে ঘোষণা করল মুহাম্মদ অনন্য। বুহায়রা রাহিব জানালেন মুহাম্মদ ভবিষ্যত নবী। কুরাইশরা বলল তিনি আমীন।
জন্মের পূর্বে ইন্তেকাল করেছেন পিতা। ছ’ বছর বয়সে মা। আট বছর বয়সে দাদার স্নেহের ছায়াও উঠে গেল। আপন চাচা আবূ তালিব এবার দায়িত্ব নিলেন এই র্দুরে ইয়াতিমের। মমতার মালিক শিশু মুহাম্মদের প্রতি তার হৃদয়ে মমতা ঢেলে দিলেন। তাই তিনি মুহাম্মদকে স্নেহ করতেন নিজ পুত্রদের চেয়েও বেশি। এমনকি আবু তালেবের শত্রুতা মিত্রতা নির্ধারণ হত ভাতিজার স্বার্থে। চাচার স্নেহের ছায়ায় বেশ ভালই ছিলেন মুহাম্মদ।
মক্কায় প্রচণ্ড দুর্ভিক্ষ। প্রখর রোদে মাঠ ঘাট চৌচির। এক ফোঁটা বৃষ্টির দেখা নেই। কুরাইশরা দল বেধে এল আবু তালেবের কাছে। একটু দুআ করে দিতে হবে কাবার প্রভুর কাছে, এই তাদের প্রত্যাশা। আবু তালিব কাবার চত্বরে এলেন। সাথে ভাতিজা মুহাম্মদ। আবু তালিব বালক মুহাম্মদের পিঠ কাবার দেয়ালে লাগালেন। তার আঙ্গুল নিজের হাতে নিলেন। কাবার প্রতিবেশিরা দেখল মেঘমুক্ত আকাশে মেঘের ঘনঘটা। মূহূর্তে শুরু হল অঝোর ধারায় বৃষ্টি। শহর-প্রান্তর সজীব হলো। আবু তালেব বললেন, মুহাম্মদ সুদর্শন, তাঁর চেহারা থেকে বৃষ্টির প্রত্যাশা করা হয়।
দুই:
ঠিক দুপুর। মক্কা নগরী, তাতানো সূর্যের তাপে দগ্ধ হচ্ছে সবকিছু। এরই মাঝে একদল নারী পরম ভক্তিভরে নিবিষ্ট মনে তাওয়াফ করছে। তাদের মধ্যে পূর্ণবয়ষ্কা যেমন আছে, তেমনি আছে কিশোরী ও অনূঢ়া তরূণীরাও। হঠাৎ এক বৃদ্ধকন্ঠে জোরালো হাঁক শুনে সচকিত হল সবাই। ইতিউতি চেয়ে সবার চোখ স্থির হল এক মলিন আলখেল্লা পরিহিত ইহুদী পন্ডিতের উপর। তিনি বলে চলেছেন “ মক্কার রমনীগণ শোনো! মক্কায় এক নবীর আগমন অত্যাসন্ন। তার নাম হবে আহমদ। তোমাদের কারো যদি সৌভাগ্য হয় দ্বিধাহীন চিত্তে তাঁর স্ত্রী হয়ে যেও।
তাওয়াফরত রমণীগন অত্যন্ত বিরক্ত হলো এ কথায়। তাদের তো দেবতারা আছেন। কোথাকার কোন নবী আসতে যাবে কেন মক্কায়? দূর দূর করে তাড়িয়ে দিল বুড়ো পন্ডিতকে। অদূরে বসা ছিলেন “কুরাইশ রাজকুমারী“ খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ। মনযোগ দিয়ে শুনলেন তিনি। কী এক অবোধ্য আবেগে তাড়িত হলেন। ভাবলেন আকাশ কুসুম। হৃদয়ে অঙ্কুরিত এই আবেগের বীজ চাচাতো ভাই ওরাকা বিন নওফেলের জল সিঞ্চনে ও ভৃত্য মায়সারার আনীত মুহাম্মদ নামায় ভর করে উঠে দাঁড়াল এবং একদিন পরিণত হলো মহীরুহে। খাদিজা নবী মুহাম্মদ কে নবী হিসেবে চিনে নবুওয়াতের পনের বছরপূর্বেই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন। খোদায়ী ব্যবস্থাপনা আরও একবার মানব সমাজে নিদর্শন রেখে দিল-মুহাম¥দ কিন্তু নবী হবেন!
তিন:
চারদিকে নিকষ আঁধার। এক চিলতে আলো নেই কোথাও। জাহিলিয়্যাতের মেঘে ঢেকে আছে সত্যের সূর্য। অন্যায় পাপাচারে সয়লাব ধরণী। মানুষের মনে আসন গেড়েছে অদ্ভুত সব ধর্মবিশ্বাস। একেশ্বরবাদী ধর্মের কায়াটি পর্যন্ত দৃষ্টির অগোচরে। তবে মুহাম্মদ এর ব্যতিক্রম। মানব নির্মিত দেবতায় তার শ্রদ্ধা নেই। মানবসৃষ্ট কোন বিষয়ে তার আস্থা নেই। তিনি সবার চেয়ে আলাদা। পঙ্কিলতার আধারে উদীয়মান সত্যের সূর্য। তিনি বিশ্বাস রাখেন এক মহা-মহিমের উপর। যার আহ্ববান ধরায় পৌছিয়েছেন মুহাম্মদের পূর্বপুরুষ নবী ইবরাহীম (আঃ)। হৃদয়ের একান্ত আর্তি, শ্রদ্ধা-ভক্তি অর্পণ করেন একেশ্বরের কুদরতী চরণে। তার নামেই ধ্যান করেন। তার নাম জপে পার করেন অষ্টপ্রহর। তিনি জানতেন, যদি মানুষ জানতে পারে প্রচলিত খোদার ইবাদত তিনি করেননা, তাহলে গালমন্দ করবে। পথভ্রষ্ট বলবে। তাই তিনি বেছে নিলেন জাবালে নূরের শীর্ষদেশে ছোট একটি নির্জন গুহা।
চল্লিশের দিকে যতই আগাচ্ছিলেন, ততই আশ্চর্য সব বিষয়য়াবলী তার সামনে উদ্ভাসিত হতে লাগলো। একদিন তিনি রাতে ঘুমিয়ে ছিলেন। স্বপ্নে দেখলেন, ঘরের কড়িকাঠ খুলে ফেলা হল। সে পথে নেমে এল দুজন শ্বেত-শুভ্র বসনধারী। তিনি ভয় পেলেন। কাউকে ডাকবেন সে সাহসও হচ্ছিলনা। চুপচাপ বিছানায় পড়ে রইলেন। লোক দুজন তার পাশে বসে পড়লো। একজন তার দু‘হাত ধরে রাখলো অন্যজন ধুকপুুক করতে থাকা হৃদপিণ্ডটা বের করে আনলো। মুহাম্মদ হৃদপিণ্ডের উপর হাতের চাপ অনুভব করতে পারছিলেন। তার কষ্টও হচ্ছিল। হৃদপিণ্ড ধরা লোকটি মন্তব্য করলো ‘এ মহান মানুষটির হৃদপিণ্ড অসম্ভব সুন্দর’। এরপর সঙ্গে আনা পাত্রে মুহাম্মদের হৃদপিণ্ড পরিশোধন করলো লোক দুটি। তারপর পাজরের খাঁচায় যথাস্থানে হৃদপিণ্ড রেখে ছাদের ফাঁক গলে তারা বেরিয়ে গেলেন। ভীত সন্ত্রস্ত মুহাম্মদ জেগে উঠলেন। পাশে থাকা খাদিজাকে জাগিয়ে বর্ণনা করলেন স্বপ্নের আদ্যোপান্ত। খাদিজা বিচলিত হলেননা মোটেও। নিজেও তিনি এমন অলৌকিক স্বপ্নের সাক্ষী। স্বামীর থেকেও এমন স্বপ্ন তিনি প্রত্যাশা করেন। স্বামীকে কাছে টেনে অভয় দিলেন। সাহস জোগালেন। মুহাম্মদ আস্বস্ত হলেন। এসময় একাকিত্ব আর নির্জনতা তার প্রিয় হয়ে উঠল। কখনও তিনি মক্কা থেকে বহুদূরে চলে যেতেন। লোকালয় ছাড়িয়ে দৃষ্টিসীমার ওপারে। তিনি যখন চলতেন দুপাশের গাছপালা-প্রস্তর খন্ড থেকে সালাম ভেসে আসতো। ডানে-বামে তাকিয়ে তিনি কাউকে দেখতে পেতেননা।
চার:
জন্মের ৪১ তম বছর। ১৭ই রমজান। ৬ ই আগষ্ট ৬১০ খ্রীষ্টাব্দ। হেরা গুহায় ধ্যানে মগ্ন ছিলেন তিনি। হঠাৎ অজানা এক আলোর ঝলকানিতে সচকিত হয়ে উঠলেন। জেগে দেখলেন এক জোতির্ময় অবয়ব তার সামনে দাঁড়ানো। হাতে এক খন্ড রেশমের টুকরো, তাতে আরবীতে কিছু লেখা। জোতির্ময় লোকটি বললেন, ‘পড়ুন!’ সদ্য ধ্যান ভাঙ্গা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতবিহ্বল। বললেন ‘আমি তো পড়তে পারিনা।’ লোকটি এগিয়ে এসে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বুকে চেপে ধরলেন। তার মনে হল হাড়গোড় সব বুঝি ভেঙ্গে যাবে। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার বললেন, ‘আমি তো পড়তে পারিনা।’ আবার লোকটি তাকে বুকে চেপে ধরলেন। তিনবার এঘটনার পুনরাবৃত্তি হল। এরপর লোকটি তিলাওয়াত করলেন: اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَم الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ عَلَّمَ الْإِنْسَانَ مَا لَمْ يَعْلَم
এবার মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পড়তে পারলেন। তার মনে হল পড়ার সাথে সাথে প্রতিটি অক্ষর যেন তার অন্তঃকরনে খোদাই হয়ে যাচ্ছে। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কী জানতেন, এই একটি আয়াত বদলে দেবে আগামীর পৃথিবী ? বদলে দেবে মানবজাতির প্রলয়ংকারী গতিপথ, বদলে দেবে কোটি মানুষের বিশ্বাস, ভালোবাসা, জীবনাচার! এই “ইকরা” ধ্বনির মাধ্যমে সূচিত হল ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়। শুরু হল ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম জাতির পথচলা।
এই ঘটনায় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভীত হয়ে পড়লেন। এমন ঘটনার কথা কেউ তাকে শুনায়নি। সর্বশেষ নবীর সময় গত হয়েছে বহু যুগ হল। বিপদের আশংকা তাই অমূলক ছিলনা মোটেও।
জীবন সঙ্গীনি খাদিজা রা. এবারও শান্তনা হয়ে এগিয়ে এলেন। প্রত্যয়দৃপ্ত সান্তনার বাণীগুলো আজও অমর, ‘আল্লাহর কসম ! আল্লাহ তাআলা আপনাকে কখনও লাঞ্চিত করবেননা। আপনি তো আত্নিয়তা রক্ষা করেন। অপরের বোঝা বয়ে দেন। অভাবীর সাহায্য করেন। অতিথির আপ্যায়ন ও বিপদগ্রস্তকে সহায়তা করেন। হে মুহাম্মদ! অবিচল থাকুন। যে সত্তার হাতে আমার প্রাণ তার শপথ! আপনি এ যুগে মানবজাতীর জন্য নবীরূপে প্রেরিত হয়েছেন। এ আমার একান্ত বিশ্বাস। এ আমার স্বীকারোক্তি।’ হযরত খাদীজার এ কথাগুলো ছিল নিরপেক্ষ পর্যালোচনার সত্যাভাষণ। কিন্তু ব্যাপারটি ছিল নবুওয়াত সংশ্লিষ্ট। তাই শুধু সান্তনার বাণীই যথেষ্ট ছিলনা। বরং এমন কারো সমর্থন দরকার ছিল যার থাকবে আসমানী কিতাবের জ্ঞান ও পূর্ববর্তী নবীদের ইতিহাস সম্পর্কে ভালো জানাশোনা।
এসব গুণাবলী পূর্ণরূপে বিদ্যমান ছিল খাদীজা রা. এর চাচাতো ভাই ওরাকা বিন নওফেলের মাঝে। খাদীজা রা. মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সঙ্গে নিয়ে ওরাকা বিন নওফেলের নিকট গেলেন এবং বৃত্তান্ত শুনালেন। ওরাকা সব শুনে বলে উঠলেন “ কসম খোদার! এতো নামুস, যিনি এসেছিলেন মুসা নবীর কাছে। নিশ্চয় আপনি এ উম্মতের নবী। শীঘ্রই এমন একদিন আসবে, যখন আপনার সম্প্রদায় আপনাকে মাতৃভূমি ছাড়া করবে ও আপনাকে মিথ্যাবাদী বলবে। আমি যদি সেদিন বেঁচে থাকি আপনাকে সর্বশক্তি দিয়ে সাহায্য করবো।”
ওহী এলো মাত্র পাঁচ আয়াত। নেই কোন নির্দেশনা। নেই আদেশ কিংবা নিষেধ। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অপেক্ষা করতে লাগলেন। কিন্তু সত্ত্বর কোন ওহী এল না। এ ওহী- বিরতি ছিল নবীজীর জন্য যাতনার। নবী হিসেবে সত্যায়নের পর কিছু নির্দেশনার অভাব বোধ করছিলেন তিনি। অবশেষে রমজানের এতেকাফ শেষে যখন হেরা গুহা থেকে মক্কায় প্রত্যাবর্তন করছিলেন, তখন জিব্রাইলকে আবার দেখতে পেলেন। দ্বিতীয়বারের মত ওহীর নির্দেশনা শোনালেন তিনি। কোনো কোনো সীরাত রচয়িতা বলেছেন, এটা ছিল সূরা দ্বোহার প্রথম পাঁচ আয়াত। কারো মতে সূরা মুযাম্মিলের প্রথম পাঁচ আয়াত।
পাঁচ
সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করেন হযরত খাদীজা রা.। তারপর একে একে হযরত আলী, হযরত আবূবকর, হযরত যায়েদ বিন হারেছা, ইসলাম গ্রহনে ধন্য হন। দ্বিতীয় পর্যায়ে ইসলামে শামিল হন হযরত উসমান, যুবাইর ইবনুল আওয়াম, তালহা বিন উবাইদুল্লাহ্ ,আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রা. প্রমুখ। ইসলামের সূচনালগ্নে যারা তাওহীদের ছায়ায় এসেছিলেন তাদের শ্রেণী বৈচিত্র বেশ চমকপ্রদ। এতে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ ছিলেন। এদের মাঝে যেমন ছিলেন কৃষ্ণকায় দাস হযরত বেলাল বিন রবাহ। ছিলেন বিত্তবান উসমান বিন আফ্ফান রা.। ছিলেন সমাজের অবহেলিত শ্রেণীর আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ।
আবার ছিলেন সর্দার শ্রেণির যুবাইর ইবনুল আওয়াম। আব্দুর রহমান ইবনে আওফ বা সা‘আদ বিন আবি ওযাক্কাস। রোমান নাগরিক সুহাইব রুমী রা.। ইসলামের আদর্শে আকৃষ্ট হয়েছিলেন পারসিক সালমান রা. ও। সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মানুষগুলো যেমন নবীজীর ওপর বিশ্বাস রেখেছিলেন, মাত্র একবারের দেখায় ইসলাম গ্রহণকারীর সংখ্যাও কম নয়। ইসলামের সার্বজনীনতার এটাও এক বড় নিদর্শন।
নবুওয়াতের প্রথম তিন বছর ইসলামের দাওয়াত ছিল অপ্রকাশ্য। প্রাথমিক ইবাদত লুকিয়ে পালন করা হত। কুরাইশদের বিরোধিতা তখনও শুরু হয়নি। এর মধ্যেই আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশ এল :
(সূরা হিজর-৮৯) فاصدع بما تؤمر وأعرض عن المشركين
(সূরা শূরা-২১৪) وأنذر عشيرتك الأقربين
(সূরা হিজর-৯৪) وقل إني أنا النذير المبين
এই নির্দেশ প্রাপ্তির পর নবীজী একদিন সাফা পর্বতে আরোহন করে মক্কাবাসীকে ডাকলেন ‘يا صباحاه’ আরবদের নিকট এই ডাক ছিল বিপদ সংকেত হিসেবে পরিচিত। তাই সর্দার সমেত সব কুরাইশী সাফা পাহাড়ের পাদদেশে একত্র হলো। নবীজী তখন বললেন — হে বনু আব্দুল মুত্তালিব! হে ফাহার বংশধর! হে বনী কাব! যদি আমি বলি পাহাড়ের ওপাশে একদল শত্রুসেনা তোমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে অপেক্ষমাণ। তোমরা কি বিশ্বাস করবে?”
মক্কার আল-আমিন কে বিশ্বাস করবেনা এমন কথা কল্পনাতেও এল না কারো। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জানিয়ে দিল তারা সে কথা। তখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, فاني نذير لكم بين يدي عذاب شديد মুহূর্তেই পিনপতন নীরবতা। প্রায় ছয়শত বছর পর নবুওয়াতের দাবি হজম করা জন্য কষ্টকর ছিল বৈকি! প্রথম বাধা এল আবু লাহাবের পক্ষ থেকে। সে বলে উঠল, تبا لك سائرا اليوم ! ألهذ جمعتنا ؟ নবীজীর প্রথম দাওয়াতের মাঝে নববী প্রজ্ঞা আমরা দেখতে পাই।শত্রু আক্রমণের কথা টেনে নবীজী যেন প্রকারান্তারে একথাই বোঝাতে চাইলেন যে, শত্রু তোমাদের ঘরেই লুকিয়ে আছে। আমি সেই শত্রুদের সম্পর্কে তোমাদের সতর্ক করতে এসেছি। তোমাদের ঘরে আশ্রয় পাওয়া দেব-দেবিই তোমাদের সবচেয়ে বিপজ্জনক শত্রু।
প্রকাশ্য দাওয়াতের সূচনা হতেই কুরাইশদের বাধা আরম্ভ হয়ে গেল। যারা ইতিমধ্যে ইসলাম গ্রহণ করেছেন তাদের উপর চলতে লাগল অকথ্য নির্যাতন। হযরত বেলাল রাঃ কে মরুর উত্তপ্ত বালিতে শুইয়ে পাথর চাপা দিয়ে রাখা হত। হযরত সুমাইয়া রাঃ এ সময় বনী মাখযুমের অত্যাচারে শাহাদাৎ বরণ করেন। তিনিই ইসলামে প্রথম শহীদ।
এসময় নবীজীর ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে যান চাচা আবূ তালেব। হযরত খাদিজা রাঃ ও সাধ্যমত রক্ষা করতেন। কিন্তু এতে অত্যাচারের পরিমাণ কমেইনি বরং আবূ তালেবকেও লাঞ্চিত করা হতে লাগলো। নব মুসলিমদের বাপ দাদার ধর্মে ফিরিয়ে আনার সমস্ত প্রচেষ্টা যখন ব্যর্থ হল, কুরাইশরা তখন নতুন পন্থা অবলম্বন করল। তারা কিছু অর্বাচীনকে নবীজীর পেছনে লেলিয়ে দিল। এরা নবীজীকে যাদুকর, গনক, কবি, মাথা খারাপ ইত্যাদি নানা অপবাদ প্রচার করে বেড়াত। ইট পাটকেল ছুঁড়ে জখম করতো। হযরত হামযা রাঃ এর ইসলাম গ্রহণ ছিল কুরাইশদের গালে প্রথম চপেটাঘাত। তাকে কুরাইশদের মধ্য সবচেয়ে উদ্যমী বীর হিসেবে বিবেচনা করা হত। তার ইসলাম গ্রহণে কুরাইশদের শোরগোল অনেকটাই কমলো। কিন্তু নির্যাতনের মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলছিল।
অবস্থাদৃষ্টে নবীজী সাহাবাদের আবিসিনিয়ায় হিজরতের অনুমতি দিলেন। আমীর ছিলেন হযরত উসমান বিন মাযউন রাঃ। এরপর জাফর বিন আবি তালেব রাঃ পরিবার সহ হিজরত করেন। এ সফরে বাদশার সামনে তার ইসলামের পরিচিতি মূলক বক্তব্য ইতিহাসের এক উজ্জল অধ্যায়। এরপর বোন ফাতিমা বিনতে খাত্তাবের ইসলাম গ্রহণকে উপলক্ষ করে ইসলাম গ্রহণ করেন হযরত উমর রা.। প্রভূত ব্যক্তিত্ব ও প্রচণ্ড দুঃসাহসী উমরের ইসলাম গ্রহণ মুসলমানদের মধ্যে এক নতুন আত্মবিশ্বাসের জন্ম দেয়। কাবায় প্রকাশ্যে নামাজ আদায় শুরু হয়ে যায়। বস্তুত, হামযা ও উমর রা. এর ইসলাম গ্রহণে কুরাইশদের পরাজয়ের সূচনা হয়।
এসময় অন্যান্য আরব গোত্রসমূহে ইসলামের শাশ্বত পয়গাম পৌঁছে যায়। মুসলমানদের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। ভ্রষ্ট কুরাইশ মুশরিকরা ইসলামের এই অগ্রগতি রুখতে বনু হাশেম ও বনু আব্দিল মুত্ত্বালিব গোত্রদ্বয়ের উপর অবরোধ আরোপ করে। একই বৎসর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সমর্থনের দুই স্তম্ভ হযরত খাদিজা রা. ও চাচা আবু তালিব ইন্তেকাল করেন। বেদনাদায়ক এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে এ বৎসরটিকে ‘আমুল হুযুন’ বা দুঃখের বছর নামে অভিহিত করা হয়। এরপর একে একে সংঘটিত হয় তায়েফের হৃদয়বিদারক ঘটনা, নবীজীর মিরাজ গমন, আনসারদের মক্কায় আগমন ও বাই‘আত গ্রহণ। ধীরে ধীরে ইসলামের সূর্য মদীনার আকাশে উদিত হওয়ার আয়োজন সম্পন্ন করতে থাকে।
মক্কায় ইসলামের সূচনাকাল ছিল নানা ঘাত-প্রতিঘাতে ভরপুর। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নবুওয়াত পরবর্তী দশ বছরের মক্কীজীবনে ধৈর্য ও উদারতা ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে মূল নির্দেশ। মদীনায় হিজরত-পরবর্তী তের বছর হলো ইসলামের আন্তর্জাতিক শক্তি ও বৈশ্বিক এক আদর্শ মতবাদ হিসেবে আত্মপ্রকাশের সময়। মদীনার ভৌগলিক কাঠামোও ছিল আত্মরক্ষা ও পালটা আঘাত হানার জন্য আদর্শ। তাই হিজরত পরবর্তী তের বছরে মক্কীজীবনে রোপিত ইসলামের নধর চারা পরিপুষ্ট হয়ে মহীরূহে পরিণত হয়।
মুফতী সোহাইল
প্রতিষ্ঠাতা মুহতামিম,
জামি‘আতুল আবরার আল-ইসলামিয়া টাঙ্গাইল