আমাদের নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ্ তা‘আলার সর্বশেষ নবী ও রাসূল। তিনি গোটা মানব জাতির জন্য আল্লাহ্ তা‘আলার সর্বশেষ দূত। আমাদের উপর আল্লাহ্ তা‘আলার পরই নবীজীর অনুগ্রহ সবচেয়ে বেশী। তিনি হাজারো জুলুম নির্যাতন সহ্য করে আমাদের প্রতি দরদী হয়ে আমাদের পর্যন্ত দ্বীন পৌঁছিয়েছেন। অন্যথায় আমরা কুফর শিরকের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত থাকতাম। তাই তাঁর প্রতি নিখাদ ভালোবাসা ও ভক্তি শ্রদ্ধা অন্তরে পোষণ করা আমাদের ঈমানী দায়িত্ব। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দরূদ শরীফ পাঠ করা তাঁর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের অন্যতম নিদর্শন। কুরআনে স্বয়ং আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন দরূদের মাধ্যমে নবীজীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেছেন। ইরশাদ হচ্ছে…
إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অর্থ: আল্লাহ্ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর উপর দরূদ পাঠ করে থাকেন। অতএব, হে ঈমানদারগণ! তোমরাও তাঁর উপর দরূদ ও সালাম পাঠ কর। (সূরা আহযাব: আয়াত নং ৫৫)
কুরআনে কারীমের সাথে হাদীছে পাকের মধ্যেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দরূদ পাঠ করার অসামান্য ফযীলত খুঁজে পাওয়া যায়। হাদীস সমূহ হতে কিছু হাদীস এখানে আলোচনা করা হচ্ছে।
আল্লাহ্ প্রদত্ত রহমত লাভ হয়
যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর একবার দরূদ শরীফ প্রেরণ করে, আল্লাহ্ তা‘আলা তার উপর একের বিনিময়ে একবার নয়, বরং দশবার রহমত নাযিল করেন। হাদীস শরীফে এসেছেمَنْ صَلَّى عَلَى صَلاةً وَاحِدَةً صلَّى الله عليه بها عَشْراً
অর্থ: যে আমার উপর একবার দরূদ পড়বে, বিনিময়ে আল্লাহ্ তা‘আলা তার উপর দশটি রহমত নাযিল করবেন। (সহীহ মুসলিম: ১/১৬৬)
মাগফিরাত ও মর্যাদা বৃদ্ধি-
مَنْ صَلَّى عَلَى صَلاةً وَاحِدَةً صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ عَشْرَ صَلَوَاتٍ وَحُطَّتْ عَنْهُ عَشْرَ خَطِيئَاتٍ وَرُفِعَتْ لَهُ عَشْرُ دَرَجَات
অর্থ: যে আমার উপর একবার দরূদ পাঠ করে, বিনিময়ে আল্লাহ্ তা‘আলা তার উপর দশটি রহমত অবতীর্ণ করেন। তার দশটি গুনাহ মাফ করে দেন এবং দশগুণ মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন। (সুনানে নাসাঈ, হাদীস নং ১২৯৭)
শাফাআ‘ত প্রাপ্তির ওয়াদা-
عن رويفع بن ثابت الأنصاري، قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: من قال: اللهم صل على محمد وأنزله المقعد المقرب عندك يوم القيامة وجبت له شفاعتي
অর্থ: যে ব্যাক্তি আমার উপর এই দরূদ পাঠ করে তার জন্য আমার সুপারিশ অবধারিত হয়ে যায়। (মুসনাদে আহমাদ: ২৪/৪৫১)
ফেরেশতাদের পক্ষ হতে মাগফেরাতের দু‘আ পাওয়া যায়-
عَنْ عَاصِمِ بْنِ عُبَيْدِ اللهِ، قَالَ: سَمِعْتُ عَبْدَ اللهِ بْنَ عَامِرِ بْنِ رَبِيعَةَ، يُحَدِّثُ عَنْ أَبِيهِ، قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَخْطُبُ يَقُولُ: مَنْ صَلَّى عَلَيَّ صَلَاةً لَمْ تَزَلِ الْمَلَائِكَةُ تُصَلِّي عَلَيْهِ مَا صَلَّى عَلَيَّ، فَلْيُقِلَّ عَبْدٌ مِنْ ذَلِكَ أَوْ لِيُكْثِرْ
অর্থ: আমার উপর দরূদ পাঠকারী যতক্ষণ দরূদ পাঠ করে, ফেরেশতাগণ ততক্ষণ পর্যন্ত তার জন্য মাগফেরাতের দু‘আ করতে থাকে।
(তিরমিজী শরীফ: হাদীস নং-২/৩৫৪)হাশরের ময়দানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটবর্তী থাকার সম্মান লাভ-
عن عبد الله بن مسعود، أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال: أولى الناس بي يوم القيامة أكثرهم علي صلاة
অর্থ: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রাঃ বর্ণনা করেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ঐ ব্যক্তি কেয়ামতের দিন আমার সবচেয়ে বেশী নিকটবর্তী হবে, যে আমার উপর সবচে বেশী দরূদ পাঠ করবে। (তিরমিজী শরীফ: হাদীস নং-৪/৬৩৬)
মনের নেক আশা-আকাঙ্খা পূরণ হয়-
عن أبي بن كعب، عن أبيه، قال: كان رسول الله صلى الله عليه وسلم إذا ذهب ثلثا الليل قام فقال: ্রيا أيها الناس اذكروا الله اذكروا الله جاءت الراجفة تتبعها الرادفة جاء الموت بما فيه جاء الموت بما فيه، قال أبي: قلت: يا رسول الله إني أكثر الصلاة عليك فكم أجعل لك من صلاتي؟ فقال: ما شئت. قال: قلت: الربع، قال: ما شئت فإن زدت فهو خير لك، قلت: النصف، قال: ্রما شئت، فإن زدت فهو خير لك، قال: قلت: فالثلثين، قال: ্রما شئت، فإن زدت فهو خير لك، قلت: أجعل لك صلاتي كلها قال: إذا تكفى همك، ويغفر لك ذنبك
অর্থ: হযরত উবাই বিন কা‘ব রাঃ বলেন, একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ্ তা‘আলার যিকিরের ব্যাপারে খুবই তাগিদ করলেন। আমি আরজ করলাম ইয়া রাসূলাল্লাহ্ ! আমি আপনার প্রতি অধিক পরিমানে দরূদ পাঠ করে থাকি। আমি আমার দু‘আর কতভাগ আপনার জন্য নির্ধারণ করবো? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন তোমার যতটুকু ইচ্ছা। আমি বললাম চার ভাগের একভাগ? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন তোমার যতটুকু ইচ্ছা। তবে বেশী করলে আরো ভালো। আমি বললাম তাহলে অর্ধেক? তিনি বললেন তোমার যতটুকু ইচ্ছা। তবে বেশী করলে আরো ভালো। আমি বললাম তাহলে তিন ভাগের দুই ভাগ? তিনি বললেন তোমার যতটুকু ইচ্ছা। তবে বেশী করলে আরো ভালো। তাহলে কি আমার দু‘আর পূর্ণ অংশ আপনার জন্য নির্ধারণ করবো?

তিনি বললেন তবে তো তোমার মাকছুদ পুরা হবে, তোমার গুনাহ্ মাফ হবে।
(সুনানে আবু দাউদ: হাদীস নং-৯৮২)
পাত্র ভর্তি কল্যাণ লাভ-
عن أبي هريرة، عن النبي صلى الله عليه وسلم قال: من سره أن يكتال بالمكيال الأوفى، إذا صلى علينا أهل البيت، فليقل اللهم صل على محمد، وأزواجه أمهات المؤمنين، وذريته وأهل بيته، كما صليت على آل إبراهيم إنك حميد مجيد
অর্থ: যে চায় আমাদের উপর অর্থাৎ আহলে বাইতের উপর দরূদ পাঠের সময় প্রতিদানের পাত্র ভরে দেয়া হোক। সে যেন এভাবে পড়ে-
اللهم صل على محمد، وأزواجه أمهات المؤمنين، وذريته وأهل بيته، كما صليت على آل إبراهيم إنك حميد مجيد
(সহীহ ইবনে হিব্বান: হাদীস নং-৯০৩)
দরিদ্র ব্যক্তিদের জন্য সদকার সওয়াব-
عن أبي سعيد الخدري، عن رسول الله صلى الله عليه وسلم، قال: أيما رجل مسلم لم يكن عنده صدقة، فليقل في دعائه: اللهم صل على محمد عبدك ورسولك، وصل على المؤمنين والمؤمنات، والمسلمين والمسلمات
অর্থ: যে মুসলমানের দান করার সামর্থ নেই সে যেন দু‘আ করার সময় এভাবে বলে- اللهم صل على محمد عبدك ورسولك، وصل على المؤمنين والمؤمنات، والمسلمين والمسلمات
এটা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হবে।
এছাড়া আমাদের দরূদ ও সালাম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে পৌঁছানোর জন্য আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন একদল ফেরেশতা নিয়োজিত রেখেছেন। যারা জমিনে বিচরণ করতে থাকে এ উদ্দেশ্যে যে, উম্মতের যে যেখান থেকে দরূদ পাঠ করবে তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে পৌঁছিয়ে দিবে।
إن لله ملائكةً في الأرض سيّاحِين، يبلغوني من أمتي السلام
(নাসায়ী শরীফ: হাদীস নং-১২৮২)

মুফতী আব্দুল হালীম
মুদাররিস, জামি‘আতুল আবরার
আল-ইসলামিয়া টাঙ্গাইল

Share: