ইসলামে শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। মহান রাব্বুল আলামীনের পক্ষ হতে মানব জাতিকে সঠিক জীবন যাপনের জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রেরণের উদ্দেশ্য এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে “তিনিই উম্মীদের মাঝে তাদেরই একজনকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন, যে তাদের সামনে তাঁর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করবে এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমতের শিক্ষা দিবে। যদিও তারা এর আগে সুস্পষ্ট গোমরাহীতে নিপতিত ছিল।”
অপরদিকে কুরআনের প্রথম শব্দই হচ্ছে শিক্ষা সংক্রান্ত। আল্লাহ্ তা‘আলা ইরশাদ করেন “পড় তোমার প্রভূর নামে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।”
রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, “আমি শিক্ষক হিসেবে প্রেরিত হয়েছি।”
শিক্ষাকে সর্বশ্রেণীর মানুষের জন্য আবশ্যক করতে ইরশাদ করেন “ইলমে দ্বীন অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমানের উপর ফরয।”
নিরক্ষরতা দূরীকরণের লক্ষ্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধে যুদ্ধবন্দিদের মুক্তির শর্তারোপ এভাবে করেছিলেন, যারা লেখাপড়া জানে তারা দশজন নিরক্ষর ব্যক্তিকে অক্ষরজ্ঞান দান করবে।
ইসলামের শুরু যুগে দারুল আরকাম, সুফ্ফাসহ ছোট ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো মুষ্টিমেয় ছাত্র নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সাহাবায়ে কেরামকে দ্বীনী শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলার জন্য। যা ছিল ওহীয়ে এলাহীর মহান দায়িত্ব সমূহের অন্যতম। এগুলো সবই ছিল মূলত দ্বীনী শিক্ষা তথা মাদরাসা শিক্ষা কার্যক্রমের ভিত্তি। কাল-পরিক্রমায় যুগের পরিবর্তনে পদ্ধতিগত বাহ্যিক পরিবর্তন হলেও শিক্ষানীতির মৌলিকতা আজও অপরিবর্তনীয়।
বর্তমানে আমরা যদি শিক্ষাকে বিশ্লেষণ করি তাহলে লক্ষ্য করব শিক্ষা মৌলিকভাবেই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছে।
এক. জাগতিক শিক্ষা দুই. দ্বীনি শিক্ষা। মানুষের কেবলমাত্র জাগতিক প্রয়োজন পূরণের উপযোগী জ্ঞান হচ্ছে জাগতিক শিক্ষা। এই শিক্ষার মূল সূত্র হচ্ছে অভিজ্ঞতা। যেমন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কেরাম রাযিঃ কে একবার পরাগায়ন করতে দেখে অনীহা প্রকাশ করেছিলেন। সাহাবায়ে কেরাম পরাগায়ন করা থেকে বিরত থাকার ফলে পরবর্তী বৎসর খেজুরের ফলন কম হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অবগত হওয়ার পর বললেন “তোমরা তোমাদের পার্থিব বিষয়ে অধিক পারদর্শী”।
পক্ষান্তরে পালনর্তার সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টির জ্ঞান হচ্ছে দ্বীনী শিক্ষা। যার মূল সূত্র ওহীয়ে এলাহী। আর এ শিক্ষাকে আমরা মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থা বলে থাকি।
জাগতিক শিক্ষা যেহেতু অভিজ্ঞতার উপর নির্ভরশীল তাই সেখানে ভুল-ভ্রান্তি থাকাটা একেবারেই স্বাভাবিক ব্যাপার। যার প্রভাব গিয়ে পরে সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার উপর। আর মাদরাসা শিক্ষার ভিত্তিই হল কুরআন-সুন্নাহ বা ইলমে ওহী। যেখানে ভুলের কোন অবকাশ নেই।
মুসলিম সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষ যেন দ্বীন মোতাবেক চলতে পারে, হালাল-হারাম জেনে নববী আদর্শে জীবন পরিচালনা করতে পারে সেজন্যই কুরআন-সুন্নাহ্তে পারদর্শী একটি জামা‘আত বা স্বতন্ত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকা অপরিহার্য। আল্লাহ্ তা‘আলা ইরশাদ করেন, “কেন বের হয়না প্রত্যেক সম্প্রদায় হতে একটি দল যাতে তারা দ্বীনের গভীর জ্ঞান অর্জন করতে পারে এবং ভীতি প্রদর্শন করতে পারে তাদের জাতিকে, যখন তারা তাদের নিকট ফিরে আসবে।” তাই প্রত্যেক জনপদে এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকা জরুরী যেখান থেকে দ্বীনের প্রতিটি বিষয়ে ব্যুৎপত্তি অর্জন করবে। ইসলামের প্রকৃত শিক্ষাকে পরিপূর্ণরূপে সংরক্ষণ করে দ্বীনের বিশেষজ্ঞ তৈরী করবে। যারা ইসলামের অপব্যাখ্যা ও বিভিন্ন বাতিল মতবাদের স্বরূপ উন্মোচন করে সঠিক ইসলামী শিক্ষা ও ইসলামী চিন্তাধারা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিবে।
মাদরাসা শিক্ষা তথা কুরআন-সুুন্নাহ চর্চা ও অনুসরণের অভাব হলে সমাজের সকল অঙ্গনে দূর্নীতি ও অনাচার দেখা দিবে।

বিজ্ঞান আর প্রযুক্তিতে সমাজ যতই উন্নতি লাভ করুক না কেন আল্লাহর ভীতি না থাকলে তা মানুষের ক্ষতি ও অকল্যাণে ব্যবহৃত হবে। মানুষের সকল আবিষ্কারকে কল্যাণমুখী করার জন্য অপরিহার্য প্রয়োজন হল মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা বা ইলমে ওহীর চর্চা।
মাদরাসা শিক্ষায় শিক্ষিত লোকেরা তাহযীব-তামাদ্দুন, দ্বীন-ঈমান, ইজ্জত- আবরুর সংরক্ষণে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে। পথহারা মানুষগুলোকে সঠিক পথের দিশা দিতে এদের বিকল্প নেই। নেই অনৈতিক কাজ কর্মের সাথে তাদের কোন প্রকার সম্পৃক্ততা। মোটকথা, সৎ ও আদর্শ জাতি গঠনে মাদরাসা শিক্ষার ভূমিকা অস্বীকার করা বা ছোট করে দেখার কোন সুযোগ নেই।
মাদরাসা শিক্ষার মাধ্যমেই সমাজে ঈমান-আমল, আল্লাহভীতি ও আখিরাতমুখিতা বৃদ্ধি পায়। আর এই বৈশিষ্টগুলো ছাড়া যেমনি আল্লাহ্ তা‘আলার নৈকট্য ও সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে আখেরাতের কামিয়াবী অর্জন করা যায় না, তেমনি দুনিয়ার জীবনও দূর্নীতি, অনাচার, জুলুম ও শোষন মুক্ত করা যায়না। এজন্য আখেরাতে কামিয়াবী ও শান্তি- নিরাপত্তার জন্য মাদরাসা শিক্ষা অপরিহার্য।

মুফতী তাওহীদুল ইসলাম
নাযেমে দারুল ইক্বামা, জামি‘আতুল আবরার
আল-ইসলামিয়া টাঙ্গাইল

Share: