ভোগবাদী লম্পটেরা তাদের কামভাব চরিতার্থের হীন মানসে যে সকল অপকৌশল অবলম্বন করেছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সুন্দরী প্রতিযোগীতা।
আজ থেকে প্রায় সত্তর বছর পূর্বে ১৯৫১ সালে ১ম অনুষ্ঠিত হয় বিশ্বসুন্দরী প্রতিযোগীতা। অন্ধ অনুকরণের মত অনেক রাষ্ট্রই এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে শুরু করল| বাদ যায়নি আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতও। ১৯৯৬ সালের ২৩শে নভেম্বর দক্ষিণ ভারতের একটি প্রদেশ কর্ণাটকের রাজধানী ব্যঙ্গালোরে অনুষ্ঠিত হয় বিশ্ব সুন্দরী প্রতিযোগীতা।
ভারতীয় ফিল্ম জগতের কিংবদন্তীর কিংস্টার অমিতাভ বচ্চন ছিল এর প্রধান উদ্যোক্তা। তার নিজ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এর থেকে হাতিয়ে নিয়েছে ৩০ কোটি রূপী। বিশ্বের ১১৫টি দেশ এ অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার করে। এর ফলে বিশ্বের প্রায় দুশত কোটি টিভি দর্শক এ অনুষ্ঠানটি সরাসরি দর্শন করে। বিশ্বসুন্দরী নামক প্রতিযোগীয় প্রতিযোগীতার নামে কি হয় তা অভিজ্ঞ মহলের সকলেরই জানা। সংক্ষেপে বলতে গেলে এতটুকু বলা যায়,সুন্দরীদের দেহকে যথেচ্ছা নিরক্ষণের অধিকার দেয়া হয় নিরক্ষকদের। পরিশেষে ফলাফল প্রকাশ করা হয়। একজন সমাজ সুশৃঙ্খল কামনাকারী মানবতাবোধ সম্পন্ন ব্যক্তি কখনই এটা মেনে নিতে পারেনা। ধর্মের কথা না হয় কিছুক্ষনের জন্য বাদই দিলাম। তাইতো অশ্লীলতায় অগ্রগামী ভারতের মত রাষ্ট্রেও এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ করা হয়। পত্রিকার মাধ্যমে জানা যায়, ভারতের এক শ্রেনীর রাজনীতিবিদ সমাজকর্মী এবং মহিলা সংগঠন ভারতের মাটিতে বিশ্বসুন্দরী প্রতিযোগীতার অনুষ্ঠানকে অশ্লীল ও নির্লজ্জ বলে অভিভুক্ত করেছেন। এ প্রতিযোগীতা প্রতিহত করতে চুড়ান্ত দিনে ১০ লাখ প্রতিবাদ পত্র পাঠানো হয়। এছাড়া কর্ণাটক প্রাদেশিক পরিষদের বেশ কয়েকজন সদস্য হুমকি দিয়েছিল যে, তারা অনুষ্ঠান পন্ড করার জন্য সুইসাইড স্কোয়াড পাঠানোর ব্যবস্থা করবে। অন্যদিকে প্রতিবাদী কন্ঠ স্তব্ধ করার জন্য দিল্লী থেকে কমান্ডো বাহিনী নেওয়া হয়েছিল। ঘনকালো কৃষ্ণবর্ণের এ বাহিনী হল ভারতীয় সে বাহিনীর একটি দুধর্ষ অংশ যাদেরকে ব্ল্যাকক্যাট বলা হয়। এছাড়া সকরার ১৫ হাজার পুলিশ মোতায়েনেরে ব্যবস্থা করেছিল। ভারতের কংগ্রেস দলও সেদেশে বিশ্বসুন্দরী প্রতিযোগীতা আয়োজনের বিরুদ্ধবাদীদের সাথে একাত্বতা পোষন করে বলেছিল, এ ধরনের প্রতিযোগীতা ভারতীয় সংস্কৃতির পরিপন্থী।
এছাড়া বহু সংগঠন ও অঙ্গসংগঠন প্রাদেশীক সরকারকে এই বিশ্বসুন্দরী প্রতিযোগীতা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছিলেন। আমরা জানি ভারত অশ্লীলতার স্বর্গরাজ্য। তা সত্বেও সেখানে কতিপয় রুচিবান দেশপ্রেমিক ধর্মীয় স্বার্থে নয়, বরং কেবল মাত্র নৈতিক চরিত্রের অবক্ষয়ের প্রতি লক্ষ্য করে নোংরা, অশ্লীল ও রুচি বিকৃতির সুন্দরী প্রতিযোগীতা অনুষ্ঠানের চরম বিরোধিতা করেছেন, ঘৃণা ও বিদ্বেষ প্রকাশ করেছেন। অথচ এই প্রতিবাদের কারণে তাদের কোন লাঞ্ছনা-বাঞ্ছনা বা ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়নি। বরং বিভিন্ন সুধীমহল থেকে সাবাসী পেয়েছিলেন সৎসাহস দেখানোর বদৌলতে। সেই একই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে তথা মনোরঞ্জনের নাম দিয়ে আমাদের প্রিয় বাংলাভূমি বাংলাদেশেও গত কয়েক বৎসর যাবৎ সুন্দরী প্রতিযোগীতার মহড়া চলছে। যদিI গণতান্ত্রিক এই দেশে যেখানে অধিকার রয়েছে সকলের প্রাণ খুলে কথা বলার বা কোন বিষয়ে মন্তব্য পেশ করার, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই দেশেই যদি কেউ এর প্রতিবাদ করে তাহলে প্রথমেই তাকে মৌলবাদ উপাধিতে ভূষিত করা হবে। বলা হবে জঙ্গিবাদ, প্রগতি ও উন্নতির পথে বাধা প্রদানকারী। অ_চ তলিয়ে দেখা প্রয়োজন এর দ্বারা কি সমাজ ও জাতি উন্নতির দিকে অগ্রসর হচ্ছে নাকি ভেঙ্গে পড়ছে সমাজ ব্যবস্থা, আর হচ্ছে নৈতিক চরিত্রের অবনতি। হুজুগে বাঙ্গালী বলে কথা, যা দেখে তাই অনুকরণের প্রচেষ্টায় ব্যস্ত। ভেবে দেখার বা দীর্ঘ সময় অবলোকন করে এর পরিনতি বা ফলাফল দেখে তারপর সিদ্ধান্ত নেয়ার চিন্তা মাথায় আসে না। মৃত্যু পরবর্তী জীবনের বিষয়কে বাদ দিলেও দুনিয়ার বিপর্যয় ও অনৈতিক বহির্ভূত কাজের সীমা থাকেনা। আত্মসম্ভম রক্ষায় হিন্দু, বৌদ্ধ,খ্রীষ্টান সকলেই তৎপর। মুসলিম নারীকে ভোগের সামগ্রী হিসেবে পরিণত করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে ভোগবাদীরা। আর আমাদের মুসলিম যুবতীরা, তাদের কথা আর কি বলার আছে। তারা যেন নিজেদের মুসলিম পরিচয়টুকু দিতে দ্বিধাবোধ করছে। কেন বলতে হচ্ছে এমন কথা? কারণ একটি মুসলিম নারীর পোশাক পরিচ্ছদ তো এমন ছিলনা। বরং ছিল পোশাকের একটি বিশেষ মূলনীতি। এখন আমাদের অধিনস্তদের জোরপূর্বকও সেই ইসলামী নীতিমালা অনুযায়ী পোশাক পরিধান করানো যাচ্ছে না। শতকরা ৯৯জন যুবতী পশ্চিমা ধাঁচে পোশাক পরিধান করতে তথা অধিকাংশ শরীর অনাবৃত রাখতে ভালোবাসছে। ঘরে বা বাহিরে সকলস্থানে একই দৃশ্য পরিলক্ষিত হচ্ছে। এ কেমন মুসলিম রাষ্ট্রে আমরা বাস করছি! যাহোক এরশাদের শাসনামলে বাংলাদেশের নারী ব্যক্তিত্বের অবমাননা করে বিশ্বসুন্দরী প্রতিযোগীতার অপচেষ্টা চালানো হয়। কিন্তু জনতার আপত্তির কারণে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। তাই বলে থেমে থাকেনি এই হীন চক্রান্তের কারসাজি। ১৯৯৫ সালের ১২ই আগষ্ট রাজধানীর ঈসা খাঁ হোটেলে মিস বাংলাদেশ প্রতিযোগীতা হয়। তবে বাংলাদেশ এর আয়োজন করেনি, করেছিল লন্ডন ভিত্তিক এর ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। একবার ভেবে দেখুন, সুন্দরী প্রতিযোগীতার সাথে এদেশের মানুষের বিশ্বাস, মূল্যবোধ এবং সাংস্কৃতির কি ন্যূনতম কোন যোগসূত্র পাওয়া যাবে ? পত্রিকার মাধ্যমে জানা যায় সেদিন অনেক বুদ্ধিজীবীরাই হলরুমে বসে সেই অর্ধনগ্ন যুবতীর অঙ্গ-ভঙ্গিমা প্রত্যক্ষ করেছিলেন। এদের কাছ থেকে জাতি কিই বা আশা করতে পারে, যারা শুধুমাত্র চিত্তবিনোদনের জন্যই এ ধরণের অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এরাই আবার যখন কলম হাতে নেয় তখন সাধু বনে যায়। লিখতে থাকে “সামাজ থেকে অশ্লীলতা দূর করতে চলচ্চিত্রে পরিবর্তন আনয়ন প্রয়োজন। বড় আশ্চর্যের ও পরিতাপের বিষয় এই যে, সংস্কৃতি মন্ত্রনালয় এ ব্যাপারে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছিল। Aথচ ঘটনা ঘটে গেল তাদের নাকের ডগা দিয়ে। জনগন যখন ধাপে ধাপে এর তীব্র নিন্দা জানাতে আরম্ভ করল তখন তাদের পক্ষ থেকে একটু প্রতিবাদের সূর ভেসে আসল। এদেশেই আমরা আবার দাবী করি আমরা মুসলিম রাষ্ট্রে বসবাস করি। আমাদের ইসলামী মূল্যবোধ সেখানে রয়েছে। দাবীর সাথে বাস্তবতার মিলের কত অভাব।
—চলমান
Share: