মুফতী আবুল হাসান শামসাবাদী

কালিমায়ে তাইয়্যিবায় দু’টি অংশ রয়েছে : নফী ও ইছবাত। ‘নফী’ অর্থ না-বোধক অর্থাৎ অন্য কোন মা‘বূদ অস্তিত্বে নেই। এটা বুঝায় لَا إِلَهَ অংশ। আর ‘ইছবাত’ অর্থ হ্যাঁ-বোধক। অর্থাৎ আল্লাহই একমাত্র মা‘বূদ। এটা বুঝায় إِلَّا اللهُ অংশ। এভাবে কালিমায়ে তাইয়্যিবাহ উক্ত দু’টি অংশের সমষ্টি। মহান আল্লাহর তাওহীদের কথা অন্তরে বিশ্বাস করে সেরূপে মুখে প্রকাশ করার মাধ্যমে ঈমান ও ইয়াকীনকে মজবূত করার জন্য যুগ যুগ ধরে মাশায়িখে কিরাম এ কালিমার জিকির করেন এবং তাঁদের মুতা‘আল্লিক্বীন মুসলমানগণকে এর তা‘লীম দেন। لَا إِلَهَ অংশের জিকির দ্বারা অন্য সকল মা‘বূদের ইয়াকীনকে অন্তর থেকে বের করে দেয়া হয় এবং إِلَّا اللهُ অংশের জিকির দ্বারা মহান আল্লাহর ইয়াকীন অন্তরে বসানো হয় । এ সম্পর্কে নির্দেশনায় হযরত আবু বকর (রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন–مَنْ شَهِدَ اَنْ لَّا اِلهَ اِلَّا اللهُ يُصَدِّقُ قَلْبُه لِسَانَه دَخَلَ مِنْ اَيِّ اّبْوّابِ الْجَنَّةِ شّاءَ “যে ব্যক্তি এই সাক্ষ্য দিবে যে, অন্য কোন মা‘বূদ অস্তিত্বে নেই–একমাত্র মা‘বূদ আল্লাহ, আর তার অন্তর তার মুখের এ কথাকে সত্যায়ন করবে, সে জান্নাতের যে কোন দরজা দিয়ে ইচ্ছে প্রবেশ করবে।” (কানযুল উম্মাল, হাদীস নং ২০০)
মুহাক্কিক মাশায়িখে কিরাম তাযকিয়ায়ে নফসের জন্য কালিমার নফী ও ইছবাত উভয় অংশের জিকির করার পরে শুধু কালিমার মূল মর্ম ইছবাত অংশ “ইল্লাল্লাহ”-এর জিকির করেন এবং মুরীদগণকে করতে সবক দেন। এর উদ্দেশ্য হলো– বিশেষভাবে কালিমার ইছবাতের ইয়াকীন অন্তরে বদ্ধমূল করা–যা মহান আল্লাহর তাওহীদের মূল কথা।
এভাবে “ইল্লাল্লাহ” জিকির করা সম্পূর্ণ শরীয়তসম্মত আমল। পবিত্র কুরআন ও হাদীসের দ্বারা এরূপ “ইল্লাল্লাহ” জিকিরের ছুবূত তিনভাবে প্রমাণিত হয় :
এক
কুরআন ও হাদীসে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” জিকির ছাবিত রয়েছে। আর “ইল্লাল্লাহ” হচ্ছে “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ”-এর প্রধান অংশ এবং তার মূল মর্মকথা। সে হিসেবে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বাক্যটি ‘দালালাতে তাজাম্মুনী (ভিতরে ধারণ করা মূল অংশকে বুঝানো)’ হিসেবে “ইল্লাল্লাহ”-এর ছাবিত হওয়ার দলীল বহন করে । সুতরাং “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”-এর অংশ হিসেবে এবং তার মূল মর্মকে উদ্দেশ্য করে “ইল্লাল্লাহ” জিকির করা হলে তা গ্রহণীয় হবে। এটা ইসলামী শরীয়তের উসূলে আহকাম (আহকামে দালালাত) দ্বারা প্রমাণিত। ইসলামী শরীয়তে এর অনেক উদাহরণ রয়েছে। পবিত্র কুরআনে অনেক আয়াত এমন রয়েছে যে, সেখানে তাওহীদের জিকির রয়েছে। সেখান থেকে পূর্ণ আয়াত উচ্চারণ না করে শুধু বিশেষ মূল অংশ পাঠ করাও বিধিসম্মত হয় এবং এতেও কুরআনের সেই অংশের ‍উপর আমল গণ্য হয়। যেমন, পবিত্র কুরআন মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন–
ٱللَّهُ لَآ إِلـٰهَ إِلَّا هُوَ ٱلْحَىُّ ٱلْقَيُّومُ
“আল্লাহ ঐ মহান সত্তা যে, অন্য কোন মা‘বূদ নেই–তিনিই একমাত্র মা‘বূদ, তিনি চিরঞ্জীব, সবকিছুর ধারক।” (সূরাহ আলে ইমরান, আয়াত নং ২)
এ আয়াতে বর্ণিত ٱللَّهُ لَآ إِلـٰهَ إِلَّا هُوَ ٱلْحَىُّ ٱلْقَيُّومُ পূর্ণ জিকির। এটা তার অংশবিশেষ ٱللَّهُ لَآ إِلـٰهَ إِلَّا هُوَ -এর ছাবিত হওয়া প্রমাণ করে (যা তার মূল মর্মার্থ বোধক অংশ)। আর এটা প্রমাণ করে উসূলে আহকামে শরীয়ত-এর বিশেষ নিয়ম দালালাতে তাজাম্মুনী (ُاَلدَّلَالَةُ التَّضّمُّنِيَّة) হিসেবে। তাই لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ পূর্ণ বাক্যের যেমন জিকির করা যাবে, তার মূল মর্ম বোধক إِلَّا اللهُ অংশেরও জিকির করা যাবে। তবে অপরাংশ لَا إِلَهَ -এর জিকির আলাদাভাবে করা সঙ্গত হবে না। কেননা, এটা আনুষাঙ্গিক বিষয়ক, তাওহীদের মূল মর্ম নয়।
দ্রষ্টব্য : ইহকামুল ফুসূল ফী আহকামিল উসূল, ১ম খণ্ড, ২১৩ পৃষ্ঠা)
দুই
কুরআন ও হাদীসে অনেক স্থানে আল্লাহর একত্ব বর্ণনা করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, কিন্তু সেখানে কোন বিশেষ বাক্য নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়নি। এ ধরনের স্থানে অর্থগতভাবে মহান আল্লাহর একত্ব প্রকাশকারী যে কোনরূপ বাক্য দ্বারা কুরআনের সেই আয়াত এবং সেই হাদীসের উপর আমল করা যাবে। যেমন, পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন– قُلْ إِنَّمَا هُوَ إِلَٰهٌ وَاحِدٌ “বলুন, তিনিই একমাত্র মা‘বূদ।” (সূরাহ আন‘আম, আয়াত নং ১৯)
এ আয়াতের ‍উপর আমল করতে এমন যে কোন বাক্য বলা যাবে–যার দ্বারা মহান আল্লাহর তাওহীদের বর্ণনা হয়। যেমন, إِنَّمَا اللهُ إِلَٰهٌ وَاحِدٌ বলা যাবে, অথবা لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ বলা যাবে, তেমনি مَا مِنْ إِلَهٍ إِلَّا اللهُ -ও বলা যাবে, আবার বাংলায় “আল্লাহই একমাত্র মা‘বূদ” বলাও যাবে, অনুরূপ আল্লাহর তাওহীদের ইয়াকীন অন্তরে রেখে কালিমায়ে তাইয়্যিবার মূল অংশ হিসেবে إِلَّا اللهُ বলাও যাবে। এমনিভাবে তাওহীদ বুঝায় এমন যে কোন বাক্য এ সকল আয়াত বা হাদীসের উপর আমলের জন্য বলা যাবে–ইসলামী শরীয়তে সেই ওসা‘আত রয়েছে।
(দ্রষ্টব্য : তাফসীরুল কুরআনিল কারীম)
তিন
কুরআন ও হাদীসের বর্ণনায় অনেক বিষয় ইক্বতিজায়ে নস (اِقْتِضَاءُ النَّصِّ অর্থাৎ কথা বা অবস্থার কারীনা-আলামত দ্বারা নির্ণয় করা)-এর মাধ্যমে সাব্যস্ত হয়েছে। এটা ইসলামী শরীয়তের উসূলে আহকাম-এর একটি বিশেষ নিয়ম। যেমন, হোটেলে খাবার খেতে বসে যদি কেউ অর্ডারচুক্তি করে বলেন, “ইলিশ-মাছ দিন।” এতে তার অবস্থার কারীনা (কারীনায়ে হালিয়্যা)-এর প্রেক্ষিতে বুঝা যায়–তিনি রান্নাকৃত ইলিশ মাছ বা তার তরকারী চেয়েছেন। সুতরাং যদি তখন একটি জীবন্ত ইলিশ মাছ এনে দেয়া হয়, তাতে তার কথামতো কাজ গণ্য হবে না এবং তার মূল্য পরিশোধ করতে তিনি বাধ্য নন। এভাবে কথার কারীনা (কারীনায়ে মাক্বালিয়্যা)-এর দ্বারাও কোন বিষয় নির্ণিত হয়ে হুকুম সাব্যস্ত হয়। যেমন, বুখারী শরীফে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) মক্কা বিজয়ের দিন হিজরত, জিহাদ ও মক্কা নগরী হারাম এলাকা হওয়ার বিষয়ে হুকুম বর্ণনা করে সেখানে যুদ্ধবিগ্রহ নিষিদ্ধ হওয়া, শিকার করা নিষিদ্ধ হওয়া, পরিত্যাক্ত বস্তু না তোলা, গাছ না কাটা প্রভৃতি বর্ণনা করার পর্যায়ে এটাও বলেন– وَلَا يُخْتَلَى خَلَاهَا “মক্কার তরু-ঘাস উপড়ানো যাবে না।” এ কথা শুনে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বললেন — يَا رَسُولَ اللَّهِ إِلَّا الْإِذْخِرَ فَإِنَّهُ لِقَيْنِهِمْ وَلِبُيُوتِهِمْ “ইয়া রাসূলাল্লাহ! ‘ইযখির’ ব্যতীত। কেননা, এটা মক্কাবাসীদের কর্মকারদের (আগুনের কাজের) জন্য এবং তাদের ঘরবাড়ীর (তৈরীতে ছাদের কাঠের ফাঁকে ব্যবহারের) কাজে অপরিহার্য।” তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন– إِلَّا الْإِذْخِرَ “ইযখির ব্যতীত।” (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৭৩৭) এ হাদীসের শেষাংশে রাসূলুল্লাহ (সা.) শুধু বলেছেন–إِلَّا الْإِذْخِرَ । কিন্তু তাঁর আগের কথার কারীনার দ্বারা তাঁর বলা নির্ণীত হয়েছে– لَا يُخْتَلَى خَلَاهَا إِلَّا الْإِذْخِرَ । উক্ত হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর إِلَّا الْإِذْخِرَ বলার দ্বারা যেমন কারীনায়ে মাকালিয়্যার দ্বারা لَا يُخْتَلَى خَلَاهَا إِلَّا الْإِذْخِرَ সাব্যস্ত হয়েছে, ঠিক তেমনিভাবে لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ বাক্যের জিকির করার পর শুধু إِلَّا اللهُ বলা হলে, তাতে কারীনায়ে মাকালিয়্যার দ্বারা لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ বলাই সাব্যস্ত হয়। সুতরাং এভাবে إِلَّا اللهُ উচ্চারণ করা হলেও তা لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ বলা গণ্য হয়ে সুন্নাহসম্মত জিকির পরিগণিত হবে। উল্লেখ্য, এ অবস্থায় إِلَّا শব্দকে ইছতিছনার অর্থে প্রয়োগ করাও সহীহ হবে। তখন কালিমাটির সঠিক অর্থমূলক পূর্ণ বাক্য হবে– لَا إِلَهَ حَقٌّ إِلَّا اللهُ ।
(দ্রষ্টব্য : ই‘রাবু লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ৭৬ পৃষ্ঠা)
সুতরাং প্রমাণিত হলো–“ইল্লাল্লাহ” জিকির কুরআন ও হাদীসের আলোকে সহীহ জিকির। তাই প্রথমে “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ” জিকির করে সেই ভিত্তিতে “ইল্লাল্লাহ” জিকির করতে কোন অসুবিধা নেই। তা নিঃসন্দেহে শরীয়তসম্মত ও সুন্নাহসম্মত হবে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য :
যারা “ইল্লাল্লাহ” জিকির করেন, তারা তার পূর্বে অবশ্যই “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” জিকির করে থাকেন। আর এটাই নিয়ম। কারণ, “ইল্লাল্লাহ” দ্বারা কালিমায়ে তাওহীদের মূল মর্ম নির্দিষ্ট করার জন্য তার পূর্বে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বাক্য উল্লেখ থাকা বাঞ্ছনীয়। এভাবে উভয় জিকিরের আমল করাই কর্তব্য। অবশ্য যদি কেউ শুধু “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” জিকির করেন এবং কখনো “ইল্লাল্লাহ” জিকির না করেন, তাতেও অসুবিধা নেই। সেটা তার ইখতিয়ার। তার এ কাজটাও শরীয়তের দৃষ্টিতে ঠিক আছে। কিন্তু যারা শরীয়তসম্মতভাবে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” জিকির করেন, আবার তার সাথে শুধু ইছবাতের জিকির দ্বারা অন্তরে তাওহীদের মর্মকে ‍সুদৃঢ়ভাবে গেঁথে নিতে শরীয়তসম্মতভাবে বাড়তি চেষ্টা করেন, তাদের সেই শরীয়তসম্মত আমলের বিরোধিতা করা তার জন্য সমীচীন নয়। তদুপরি তাকে বিদ‘আত বা নাজায়িয বলা আরো ঘোরতর অন্যায়। যেহেতু কুরআন ও হাদীসের আলোকে তা শরীয়তসম্মত আমল গণ্য হয়।
“ইল্লাল্লাহ” জিকির নিয়ে দু’টি ইশকাল ও তার জবাব :
১. অনেকে প্রশ্ন করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবায়ে কিরাম (রা.) কি “ইল্লাল্লাহ” জিকির করেছেন? তারা না করলে এ জিকির করা যাবে না। এর জবাব হলো, কোন জিকির বিধিবদ্ধ হওয়ার জন্য কুরআন ও হাদীসে তার ভিত্তি বা তার নির্দেশনা থাকাই যথেষ্ট। এরপর তা হুবহু সেই শব্দে রাসূলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবায়ে কিরাম (রা.)-এর আমলে থাকতে পারে। আবার তার অনুরূপ বা মর্মার্থ বোধক শব্দেও থাকতে পারে। যেমন, পবিত্র কুরআনে বর্ণিত একটি তাওহীদের জিকির হলো– إِنَّمَا اللَّهُ إِلَٰهٌ وَاحِدٌ (সূরাহ নিসা, আয়াত নং ১৮১)। কিন্তু এভাবে হুবহু রাসূলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবায়ে কিরাম (রা.) জিকির করেছেন বা করতে বলেছেন বলে বর্ণনা পাওয়া যায় না। তবে তার অনুরূপ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ জিকির করার নির্দেশনা পাওয়া যায়। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবায়ে কিরাম (রা.) থেকে এভাবে হুবহু “ইল্লাল্লাহ” জিকির করার বর্ণনা না থাকলেও এর সমার্থক বাক্যের জিকির করার যে প্রমাণ রয়েছে–তা-ই এ জিকির সুন্নাহভিত্তিক হওয়ার জন্য যথেষ্ট। অপরদিকে বিভিন্নভাবে কুরআন ও হাদীসের আলোকে এ জিকির শরীয়তসম্মত সাব্যস্ত হয়েছে–যা উপরে বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে। তাই এ জিকির করতে কোন অসুবিধা নেই।
২. অনেকে আপত্তি করে বলেন, শুধু إِلَّا ও তার পরবর্তী অংশ দিয়ে কীভাবে পূর্ণ কথা হয়? তা তো স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্থ দেয় না। তাই “ইল্লাল্লাহ” জিকির করা সঠিক হয় না। তার জবাব হলো– কুরআন ও হাদীসে “ইল্লাল্লাহ” দু’ধরনের রয়েছে। যখন إِلَّا ইছতিছনার জন্য অথবা غَيْرُ অর্থে পূর্বোক্ত শব্দের সিফাত হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তখন তা পরবর্তী অংশকে নিয়ে পূর্ণ বাক্যের অর্থ দেয়া না–যেমনটা আপনি বললেন। আর এ রকম অর্থদানের ক্ষেত্রে শুধু “ইল্লাল্লাহ” জিকির করা যাবে না। যেমন, لَوْ كَانَ فِيهِمَا آلِهَةٌ إِلَّا اللَّهُ لَفَسَدَتَا বাক্যের মধ্যে “ইল্লাল্লাহ” শব্দটি “গাইরুল্লাহ” অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে এবং সেটা পূর্ণ বাক্য বা তাওহীদের মূল মর্মবাণী প্রকাশ করেনি। তাই সেই বাক্যের এ “ইল্লাল্লাহ” সিফাতকে জিকির হিসেবে আলাদাভাবে ‍উচ্চারণ করা যাবে না। বরং তাকে সেই পূর্ণ বাক্যের সাথেই ব্যবহার করতে হবে।
কিন্তু إِلَّا যখন لكِنْ অর্থে ব্যবহৃত হয়, তখন তার পরবর্তী অংশ পূর্ণ বাক্য হিসেবে সাব্যস্ত হয়–যার বিস্তারিত বিবরণ গত পোস্টে করা হয়েছে। আর কালিমায়ে তাইয়্যিবায় বর্ণিত “ইল্লাল্লাহ” সে ধরনেরই। তাই এটাকে আলাদাভাবে উচ্চারণ করতে কোন অসুবিধা নেই। যেমন, উদাহরণ স্বরূপ পবিত্র কুরআনে অনেক আয়াত রয়েছে যেগুলো শুধু إِلَّا ও তার পরবর্তী অংশ মিলে পূর্ণ আয়াত হিসেবে নাযিল হয়েছে। এসব আয়াতে إِلَّا শব্দটি لكِنْ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এ জন্য সেই আয়াতগুলোতে শুধু إِلَّا ও পরবর্তী অংশ দিয়ে নামায পড়লে (বড় আয়াত হওয়া সাপেক্ষে) নামায সহীহ হবে। (দ্রষ্টব্য : কিতাবুল ফিকহ : কিতাবুস সালাহ)
পবিত্র কুরআনে এ ধরনের আয়াত বহু রয়েছে। যেমন–
إِلَّا الَّذِينَ صَبَرُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ أُولَٰئِكَ لَهُم مَّغْفِرَةٌ وَأَجْرٌ كَبِيرٌ
(অর্থ : তবে যারা ধৈর্য্যধারণ করেছে এবং সৎকার্য করেছে, (তারা কুফরকারী, অহংকারী ও উদ্ধত নয়)। তাদের জন্য ক্ষমা ও বিরাট প্রতিদান রয়েছে।) (সূরাহ হূদ, আয়াত নং ১১) এ আয়াতে “ইল্লা” শব্দটি “লাকিন (তবে)” অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। আর এতে পূর্ণ বাক্যের স্বরূপ পরিগ্রহ করেছে। এ জন্য إِلَّا ও তার পরবর্তী অংশ মিলে আলাদা একটি আয়াতের মর্যাদা লাভ করেছে। ঠিক এমনভাবেই “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বাক্যে “ইল্লা” শব্দটি লাকিন-এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে এবং তার পরের শব্দের সাথে اِلهٌ وَاحِدٌ উহ্য ধরে পূর্ণ তাওহীদী বাক্যরূপে পরিগণিত হয়েছে। সুতরাং কোন ইশকাল থাকছে না। অবশ্য যদি إِلَّا -কে ইছতিছনার অর্থে গণ্য করা হয়, তারও এ কালিমায়ে তাইয়্যিবার ক্ষেত্রে অবকাশ রয়েছে। তবে তখন إِلَّا দ্বারা পূর্ণ বাক্য না হলেও অসুবিধা নেই। কারণ, সেই অবস্থায় তার হুকুম উপরে উল্লিখিত “তিন” নং নিয়মোর ভিত্তিতে হবে। এতে তখন إِلَّا اللهُ বলা হলেও কারীনায়ে মাকালিয়্যার দ্বারা لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ বলাই সাব্যস্ত হবে। এভাবে পূর্ণ তাওহীদী বাক্যের ‍রূপ পরিগ্রহ করবে। তাই সেই অবস্থায়ও কোন ইশকাল থাকবে না।
মোট কথা, “ইল্লাল্লাহ” জিকির সার্বিকভাবে শরীয়তসম্মত ও সুন্নাহভিত্তিক জিকির। সুতরাং তাকে সেভাবেই শরীয়তসম্মত জিকিররূপে গণ্য করা কর্তব্য।
মহান আল্লাহ আমাদেরকে সহীহ বুঝ দান করুন। আমীন।

Share: