ভূমিকা
মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা ইসলামের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। পবিত্র কুরআন ও হাদীসে অতি বাড়াবাড়ি এবং ছাড়াছাড়ি পরিহার করে মধ্যপন্থা অবলম্বন করার নির্দেষ দেওয়া হয়েছে। ইফরাত ও তাফরীত উভয়ই দ্বীনের জন্য ক্ষতিকারক। তাফরীত পন্থিরা দ্বীন ইসলামকে কাটছাঁট করতে চেষ্টা করে। এমনকি কোনো কোনো সময় তাদের হাতে দ্বীন ইসলাম এতই বিপন্ন হয়ে পড়ে যে, দ্বীন ও গাইরে দ¦ীনের মধ্যে আর পার্থক্য থাকে না। ইসলামের ইতিহাসে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায়, অতি বাড়াবাড়ি এবং ছাড়াছাড়ির কারণে এ উম্মতের ওপর কখনো কখনো বিপর্যয় নেমে এসেছে। এর পেছনে কারণ হিসেবে দেখা যায়, ব্যক্তিবিশেষের ভিন্নমতকে সাধারণ উন্মতের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার অযথা চেষ্টা। উদাহরণ হিসেবে ফরয নামাযের পর হাত তুলে দু‘আ করার মাসআলাটি এখানে প্রণিধানযোগ্য। কিছু লোকের অতি রক্ষণশীলতার কারণে এটি
মতানৈক্যপূর্ণ মাসআলায় রূপ পরিগ্রহ করেছে। একদিকে ফরয নামাযের পর হাত তুলে দু‘আ করা খুবই প্রয়োজনীয় কাজ মনে করা হচ্ছে, অন্যদিকে এটিকে বিদ‘আত ও ঘৃণিত কাজ মনে করা হচ্ছে। অথচ এই দুই অতিরঞ্জিত মতামতের মাঝখানে হলো এ মাসআলার আসল সমাধান। অর্থাৎ ফরয নামাযের পর হাত তুলে দু‘আ করা যেমন বাধ্যতামূলক নয়, তেমনি এটি বিদ‘আতও নয়। বরং এটি একটি মুসতাহসান বা উত্তম কাজ। কেউ যদি স্বেচ্ছায় করে ভালো, না করলে কোনো জোর-জবরদস্তি নেই। কুরআন- হাদীসের দৃষ্টিতে এটি একটি সুন্নাত আমল। এটিকে বিদ‘আত বলার কোনো অবকাশ নেই।
ফরয নামাযের পর দু‘আ করা হাদীসের ছয়টি নির্ভরযোগ্য কিতাব অর্থাৎ সিহাহ্ সিত্তার মাধ্যমে প্রমাণিত। অন্যদিকে দোআর সময় হাত তোলার কথাও হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। কিন্তু এমন কোনো প্রমাণ নেই, যাতে ফরয নামাযের পর হাত তুলে দু‘আ করাকে হারাম কিংবা নিষেধ করা হয়েছে। সাহাবায়ে কেরামের যামানা থেকে আজ পর্যন্ত হাজার বছর ধরে ফরজ নামাজের পর হাত তুলে দু‘আ করার নিয়ম চলে আসছে। এতে কেউ আপত্তি করেনি। ইমাম আবূ হানীফা রহমাতুল্লাহি আলাইহি, ইমাম মালেক রহমাতুল্লাহি আলাইহি, ইমাম শাফেঈ রহমাতুল্লাহি আলাইহি এবং ইমাম আহমাদ রহমাতুল্লাহি আলাইহি এরমতো অগণিত ফক্বীহ ও মুহাদ্দিস চলে গেছেন। কোনো একজন ইমামও এ বিষয়ে আপত্তি করেননি। শুধু ইবনে তাইমিয়া রহমাতুল্লাহি আলাইহি ও ইবনে কাইয়্যিম রহমাতুল্লাহি আলাইহি আপত্তি জানিয়েছেন। আহলে হাদীসের আলেম নাসীরুদ্দীন আলবানীর অনুকরণে বর্তমানে কিছু লা-মাজহাবি আলেম ফরয নামাযের পর হাত তুলে মুনাজাত সম্পর্কে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছেন, যা শরী‘আতের যুক্তিতে কখনো গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। হ্যাঁ, যাঁরা ফরয নামাযের পর হাত তুলে মুনাজাত করাকে বাধ্যতামূলক মনে করতেন, তাঁরাও ভুলের মধ্যে আছেন। জায়েয কাজকে বাধ্যতামূলক মনে করাও শরিয়তের দৃষ্টিতে গর্হিত কাজ।
প্রথমে আমরা জানবো মুনাজাত কি? এবং মুনাজাত ও দুআর মাঝে পার্থক্য কি? দু‘আ ও মুনাজাত এ দুটি শব্দের মধ্যে ব্যবহারগত দিক থেকে তেমন পার্থক্য নেই। কিন্তু শাব্দিক দিক থেকে পার্থক্য আছে। সেই পার্থক্য নিচে আলোচনা করা হলো-
ব্যবহারিক বলতে বুঝায়, দু‘আটা আরবি শব্দ এবং দু‘আই মূলত শরী‘আত অনুযায়ী সঠিক শব্দ। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন, ‘তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের বলেন, তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের দু‘আ কবুল করব।’ এখানে দু‘আ শব্দটি এসেছে।
আর এই দু‘আকে খুব সহজে বুঝানোর জন্য উর্দূ ভাষায় মুনাজাত বলা হয়। মুনাজাত শব্দের শাব্দিক অর্থ কানে কানে কথা বলা, চুপিচুপি কথা বলা এবং এই কানে কানে কথা বলাটা দুজনের মধ্যে হতে হবে। যেহেতু এ শব্দটি বাবে মুফা‘আলার অন্তর্গত একটি শব্দ। আর মুফা‘আলার বৈশিষ্ট মুশারাকা থাকা। অর্থাৎ একজনের সঙ্গে আরেকজনের শেয়ারিং বা অংশগ্রহণ থাকা। অংশগ্রহণ যেখানে নেই, সেখানে মুশারাকা হয় না।
মুনাজাতের মধ্যে অংশগ্রহণ হচ্ছে আল্লাহর সঙ্গে বান্দার। বান্দা গোপনে বা চুপিচুপি অথবা কানে কানে যে কথা বলবে, সেটি মোনাজাত হবে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে এই শব্দ খুব বেশি উপযুক্ত বা যথার্থ নয়। বরং দুআটাই হচ্ছে উপযুক্ত শব্দ। কারণ, দু‘আর মধ্যে আমরা কানে কানে কথা বলি না। আল্লাহর কাছে হাত তুলে প্রার্থনা করি। তবে যদি কেউ উল্লেখিত পার্থক্যের প্রতি দৃষ্টি না করেন এবং তিনি দু‘আ অর্থেই মুনাজাত শব্দকে প্রয়োগ করেন, তাহলে এই প্রয়োগের মধ্যে ব্যবহারগত কোনো পার্থক্য হবে না এবং তা ভুল হবে না। ফরয নামাযের পর সম্মিলিত দু‘আর বিষয় বুঝতে হলে চারটি বিষয় ভাল করে বুঝতে হবে। যথা-১। ফরয নামাযের পর দু‘আ প্রমাণিত কি না?
২। হাত উত্তোলন করে দু‘আ করা বৈধ কী না?
৩। সম্মিলিত দু‘আ প্রমাণিত কি না?
৪। ফরয নামাযের পর সম্মিলিত দু‘আর হুকুম কী?
১ম বিষয়:
কুরআনের দলীল-
নামাযের পর মুনাজাত সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশ
عن الضحاك فإذا فرغت قال من الصلاة المكتوبة، وإلى ربك فارغب، قال في المسئلة
১। হযরত যাহ্হাক রহ. আলাম নাশরাহ এর উক্ত আয়াতের তাফসীরে বলেন, যখন তুমি ফরয নামায থেকে ফারেগ হবে তখন আল্লাহর দরবারে দু‘আতে মশগুল হবে। (তাফসীরে দূররে মানসূর : ৬/৩৬৫)
إذا فرغت من الصلاة المكتوبة فانصب في الدعاء. (تفسیر ابن عباس : ۵۱۴ )
২। হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি উক্ত আয়াতের তাফসীরে বলেন, যখন তুমি ফরয নামায হতে ফারেগ হও, তখন দু‘আয় মশগুল হয়ে যাবে।”(তাফসীরে ইবনে আব্বাস রা., ৫১৪ পৃঃ)
قال ابن عباس وقتادة والضحاك ومقاتل والكالي : إذا فرغت من الصلاة المكتوبة أو مطلق الصلاة فانصب إلى ربك والدعاء، وارغب إليه في المسئلة (تفسير مظهری: ۲۹۴/۱ )
৩। হযরত ক্বাতাদাহ, যাহ্হাক ও কালবী রা. হতে উক্ত আয়াতের তাফসীরে বর্ণিত আছে, তাঁরা বলেন- ‘ফরয নামায সম্পাদন করার পর দু‘আয় লিপ্ত হবে’। (তাফসীরে মাযহারী, ১০/২৯৪ পৃ:)
হাদীসের দলীল-
ফরজ নামাযের পর মুনাজাত করা একাধিক সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। যেমন-
১। وَقَالَ: يَا مُحَمَّدُ، إِذَا صَلَّيْتَ فَقُلْ: اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ فِعْلَ الخَيْرَاتِ، وَتَرْكَ الْمُنْكَرَاتِ، وَحُبَّ الْمَسَاكِينِ
হযরত ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, হে মুহাম্মদ! যখন তুমি নামায পড়ে ফেলবে, তখন এ দু‘আ করবে- হে আল্লাহ! আপনার নিকট ভাল কাজের তৌফিক চাই এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকার ব্যাপারে সাহায্য চাচ্ছি। আপনার দরবারের মিসকীন তথা আল্লাহ ওয়ালাদের মুহাব্বত কামনা করি। (সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং-৩২৩৩)
২। ইমাম বুখারী রহ. স্বীয় কিতাব আত্তারীখুল কাবীরে এনেছেন-
عَنْ كاتب المغيرة رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ: كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَدْعُو في دبر صلاته হযরত মুগিরা রা. থেকে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামায শেষে দু‘আ করতেন। (আততারীখুল কাবীর, হাদীস নং-১৭৭২, ৬/৮০)
৩।عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ، قَالَ: كَانَ مَقَامِي بَيْنَ كَتِفَيْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَكَانَ إِذَا سَلَّمَ قَالَ: اللَّهُمَّ اجْعَلْ خَيْرَ عُمُرِي آخِرَهُ، اللَّهُمَّ اجْعَلْ خَوَاتِيمَ عَمَلِي رِضْوَانَكَ، اللَّهُمَّ اجْعَلْ خَيْرَ أَيَّامِى يَوْمَ أَلْقَاكَ
হযরত আনাস বিন মালিক রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ছিলাম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাঁধের পাশে। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সালাম ফিরিয়ে বললেন, হে আল্লাহ! তুমি আমার শেষ জীবনকে সবচে’ সুন্দর কর। হে আল্লাহ! তুমি আমার শেষ আমলকে তোমার সন্তুষ্টি অনুপাতে কর। হে আল্লাহ! তুমি তোমার সাথে আমার সাক্ষাতের দিনকে সর্বোত্তম দিন কর। (আলমুজামুল আওসাত লিততাবারানী, হাদীস নং-৯৪১১)
৪। হযরত সা‘দ রা. বলেন,
وَيَقُولُ: إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَتَعَوَّذُ بِهِنَّ فِي دُبُرِ كُلِّ صَلَاةٍ اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْبُخْلِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الْجُبْنِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ أَنْ أُرَدَّ إِلَى أَرْذَلِ الْعُمُرِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ فِتْنَةِ الدُّنْيَا، وَعَذَابِ الْقَبْرِ
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি নামাযের পর এই শব্দে আল্লাহর কাছে পানাহ চাইতেন, “হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে কৃপণতা থেকে পানাহ চাই। এবং অভাব থেকে পানাহ চাই এবং অশীতিপর বৃদ্ধাবস্থা থেকে পানাহ চাই এবং দুনিয়ার ফিতনা ও কবরের আযাব থেকে পানাহ চাই।
(সুনানে নাসায়ী, হাদীস নং-৫৪৭৯)
৫। مُحَمَّدُ بْنُ أَبِي يَحْيَى، قَالَ: رَأَيْتُ عَبْدَ اللهِ بْنَ الزُّبَيْرِ وَرَأَى رَجُلًا رَافِعًا يَدَيْهِ بِدَعَوَاتٍ قَبْلَ أَنْ يَفْرُغَ مِنْ صَلَاتِهِ، فَلَمَّا فَرَغَ مِنْهَا، قَالَ: ্রإِنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَمْ يَكُنْ يَرْفَعْ يَدَيْهِ حَتَّى يَفْرُغَ مِنْ صَلَاتِهِ
হযরত মুহাম্মদ বিন আবী ইয়াহইয়া বলেন, আমি হযরত আব্দুল্লাহ বিন যুবায়ের রা. কে দেখলাম। তিনি এক ব্যক্তিকে নামাযের ভিতরে হাত তুলে দু‘আ করতে দেখলেন। যখন লোকটি নামায শেষ করল। তখন তিনি তাকে বললেন, নিশ্চয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামায শেষ করার আগে হাত তুলে দু‘আ করতেন না। (আলমু‘জামুল কাবীর লিত্তাবরানী, হাদীস নং-৩২৪)
এছাড়া আরো অসংখ্য হাদীস রয়েছে যা প্রমাণ করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফরয নামাযের পর হাত তুলে দু‘আ করতেন।
৬। আবূ উমামা বাহেলী রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হলো, কোন মুহূর্তের দোয়া অধিক কবুল হয়ে থাকে? রাসূল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, রাতের শেষাংশের দু‘আ এবং ফরয নামাযগুলোর পরের দু‘আ। (জামে তিরমিযী, কিতাবুদ্ দাওয়াত, বাব-৮, হাদিস: ৩৪৯৯, খ. ৫, পৃ: ১৮৮; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা, হাদীস : ৯৯৩৬)।
৭। ইমাম তবারি (রহ.) হযরত ইমাম জা‘ফর সাদিকের র. প্রতিবেদন সূত্রে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন, ফরয নামাযের পর দু‘আ প্রার্থনা করাটা নফল নামাযের পর দু‘আ করার চেয়ে ঐরূপ উত্তম, যেরূপ নফল নামাযের চেয়ে ফরয নামায উত্তম। এ বর্ণনাটি হাফেয ইবনে হাজার তার ফতহুল বারির খ: ১১, পৃ: ১৪৫-এর মধ্যে এনেছেন। এ বর্ণনাটি হাসান স্তরের।
৮। একদা সাহাবাগণ আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে কোন সময় দু‘আ অধিকরুপে কবূল হয়- সে বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেছিলেন, গভীর রাতের শেষাংশে এবং সকল ফরয নামাযের পশ্চাতে। (তিরমিযী: ৩৪৯৯, নাসাঈ: আমালুল ইয়াউমি অল্লাইলাহ্ ১০৮নং, মিশকাত ৯৬৮ নং) হাদীসটি অনেকের নিকট দুর্বল হলেও আসলে তা হাসান। (তিরমিযী, সুনান২৭৮২নং)
৯। عن أبي بکرۃ رض فی قول اللہم إني أعوذبک من الکفر والفقر وعذاب النار کان النبي صلی اللہ علیہ وسلم یدعو بہن دبر کل صلاۃ (.رو اہ النساءي : ۱۵۱ الحدیث ۵۴۶۵)
হযরত আবু বকরা রা. বর্ণনা করেন যে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রত্যেক নামাযের পর এ দু‘আ করতেন, “হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট কুফর, অভাব অনটন এবং দোযখের আযাব থেকে মুক্তি চাই।” (নাসাঈ শরীফ: ১/১৫১ হাঃ নং ৫৪৬৫)
১০। عن زید بن أرقم سمعت رسول اللہ صلی اللہ علیہ وسلم یدعو في دبر کل صلاۃ اللہم بنا ورب کل شيء۰ (ر و اہ أبو داود : ۱/۲۱۱ الحدیث ۱۵۰۸)
হযরত যায়েদ বিন আরকাম রা. বলেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে প্রত্যেক নামাযের পর এ দু‘আ করতে শুনতাম, হে আল্লাহ যিনি আমাদের প্রতিপালক এবং প্রত্যেক জিনিসের প্রতিপালক। (আবু দাউদ:১/২১১ হাঃ নং ১৫০৮)
১১। عن معاذ بن جبل رض أن النبي صلی اللہ علیہ وسلم قال لہ أوصیک یا معاذ! لا تدعن أن تقول دبر کل صلاۃ، اللہم أعني علی ذکرک وشکرک وحسن عباد تک۰ (رواہ النساءي : ۱/۱۴۶، وأبو داود : ۱/۲۱۳ الحدیث ۱۵۲۲) হযরত মু‘আয বিন জাবাল রা. বর্ণনা করেন যে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, হে মু‘আয! আমি তোমাকে ওসীয়ত করছি যে, প্রত্যেক নামাযের পর এ দু‘আ পড়াকে তুমি কখনো ছাড়বে না-হে আল্লাহ! আমাকে তোমার জিকির, শোকর এবং উত্তম ইবাদত করার জন্য সাহায্য কর। (নাসাঈ শরীফ ১/১৪৬, আবু দাউদ শরীফ ১/২১৩ হাঃ নং ১৫২২)
মুনাজাতের স্বপক্ষে ফিক্বহী কিতাবসমূহের দলীল
ফিক্বহের কিতাবসমূহে মুনাজাতের স্বপক্ষে বহু প্রমাণ পাওয়া যায়। নিচে তার কিছুটা তুলে ধরা হল
(۱) قال في شرعة الإسلام : ويغتنم أى المصلي الدعاء بعد المكتوبة (۲) في مفاتيح الجنان : قوله بعد المكتوبة أى قبل السنة، كذا في السعادة
(۳) في نور الإيضاح وشرحه المسمى بإمداد الفتاح ثم بعد الفراغ عن الصلاة يدعو الإمام لنفسه وللمسلمين رافعي أيدى هم حذو الصدور وبطونها مما يلى الوجه بخشوع وسكون ثم
التحفة في يمسحون ب ١٥ وجوبهم في اخره اى عند الفراغ من الدعاء. انتهى. كذا
المرغوبة والسعادة.
(۴) قد أجمع العلماء على استحباب الذكر والدعاء بعد الصلاة وجائت فيه أحاديث كثيرة. انتهى تهذيب الأذكار للرملي كذا في التحفة المرغوبة) (۵) أى اذكروا الله تعالى وادعوا بعد الفراغ من الصلاة . (فتاوى صوفيه كذا في التحفة)
(۶) إن الدعاء بعد الصلاة المكتوبة مسنون وكذا رفع اليدين ومسح الوجه بعد الفراغ. (منهج العمال والعقائد السنية كذا في التحفة) بحواله كفايت المفتي : ٣/
১। ফিক্বহে হানাফীর অন্যতম মুল কিতাব মাবসূত এর বর্ণনা যখন তুমি নামায থেকে ফারিগ হবে, তখন আল্লাহর নিকট দু’আয় মশগুল হয়ে যাবে। কেননা, এ সময় দু‘আ কবূল হওয়ার সম্ভাবনা বেশী।
২। প্রসিদ্ধ ফিক্বহের কিতাব মিনহাযুল উম্মাল ও আকায়িদুছ ছুন্নিয়্যাহ এর বর্ণনা ফরয নামাযের পর দু‘আ করা সুন্নত। অনুরূপভাবে দু‘আর সময় হাত উঠানো এবং পরে হাত চেহারায় মুছে নেয়াও সুন্নত। ‘আত্তাহযীবুল আযকারের বর্ণনা, এ কথার উপর উলামায়ে কেরামের ইজমা হয়েছে যে, নামাযের পর যিকর ও দু‘আ করা মুস্তাহাব। শির‘আতুল ইসলাম এর বর্ণনা, ফরয নামাযের পর মুসল্লীরা দু’আ করাকে গণিমত মনে করবে।
তুহ্ফাতুল মারগুবা ও সি‘আয়া-এর বর্ণনা নামায শেষে ইমাম ও মুসল্লীগণ নিজের জন্য এবং মুসলমানদের জন্য হাত উঠিয়ে দু’আ করবেন। অতঃপর মুনাজাত শেষে হাত চেহারায় মুছবেন। (তুহফা পৃ: ১৭)
ফাতাওয়া বায্যাযিয়া এর বর্ণনা নামায শেষে ইমাম প্রকাশ্যভাবে হাদীসে বর্ণিত দু‘আ পড়বেন এবং মুসল্লীগণও উচ্চস্বরে দু‘আ পড়বেন। এতে কোন অসুবিধা নেই। তবে মুসল্লীদের দু‘আ ইয়াদ হয়ে যাওয়ার পর সকলে বড় আওয়াজে দু’আ করা বিদ’আত হবে। তখন মুসল্লীগণ দু’আ আস্তে পড়বেন।৭। ‘নূরুলঈযাহ’-এবং, হাশিয়াতুত্ ত্বাহত্বাবী এর বর্ণনা পৃ:৩১৮
নামাযের পরে জরুরী বা ওয়াজিব মনে না করে হাত উঠিয়ে সম্মিলিতভাবে আল্লাহর নিকট দু’আ করা মুস্তাহাব। (নূরুল ঈযাহ পৃঃ ৮২)
উল্লেখিত বর্ণনাসমূহ দ্বারা স্পষ্টতঃ প্রমাণিত হলো যে, নামাযের পর দু‘আ করা মুস্তাহাব। আরো প্রমাণিত হল যে, মুনাজাত করা ইমাম-মুক্তাদী সবার জন্যই পালনীয় মুস্তাহাব আমল।
২য় বিষয়ঃ
দু‘আর সময় হাত না উঠানো এটা কখনও মুসলিমদের চরিত্র হতে পারে না। এটা মুনাফিকদের চরিত্র ছিল। যা পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,
الْمُنَافِقُونَ وَالْمُنَافِقَاتُ بَعْضُهُم مِّن بَعْضٍ يَأْمُرُونَ بِالْمُنكَرِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمَعْرُوفِ وَيَقْبِضُونَ أَيْدِيَهُمْ نَسُواْ اللّهَ فَنَسِيَهُمْ إِنَّ الْمُنَافِقِينَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
অর্থ: মুনাফেক নর-নারী সবারই গতিবিধি একরকম মন্দ কথা শিখায়, ভাল কথা থেকে বারণ করে এবং তারা নিজ হাত বন্ধ করে রাখে।
(সুরা তাওবা: ৬৭)
অত্র আয়াতে মুনাফিকদের কয়েকটা কর্মকান্ড উল্লেখ করেছেন মহান আল্লাহ তা‘আলা। এর ভেতর মুনাফিকদের একটি কর্মকান্ড ছিলো,
وَيَقْبِضُونَ أَيْدِيَهُمْ
অর্খাৎ তারা (মুনাফিকরা) নিজ হাত বন্ধ করে রাখে।
উক্ত আয়াতের তাফসীর করতে গিয়ে বিভিন্ন মুফাসসির বিভিন্ন মত ব্যক্ত করেছেন। নিম্নে উল্লেখ করা হল,
وَيَقْبِضُونَ أيْدِيَهُم فِيهِ أرْبَعَةُ أقاوِيلَ أحَدُها يَقْبِضُونَها عَنِ الإنْفاقِ في سَبِيلِ اللَّهِ تَعالى قالَهُ الحَسَنُ ومُجاهِدٌ
والثّانِي يَقْبِضُونَها عَنْ كُلِّ خَيْرٍ قالَهُ قَتادَةُ
والثّالِثُ يَقْبِضُونَها عَنِ الجِهادِ مَعَ النَّبِيِّ ﷺ قالَهُ بَعْضُ المُتَأخِّرِينَ
والرّابِعُ يَقْبِضُونَ أيْدِيَهم عَنْ رَفْعِها في الدُّعاءِ إلى اللَّهِ تَعالى
অর্থাৎ এ আয়াতের ব্যাপারে চারটি মত আছে,
১। তারা (মুনাফিকরা) আল্লাহর রাস্তায় খরচ করার ব্যাপারে হাত গুটিয়ে রাখতো। এটা হাসান বসরী রহ. ও মুজাহিদ রহ. এর অভিমত।
২। তারা সকল ভাল কাজ থেকে হাত গুটিয়ে রাখতো। এটা ক্বাতাদাহ রহ. এর অভিমত।
৩। তারা জিহাদ করা থেকে নিজেদেরকে গুটিয়ে রাখতো। এটা কিছু মুতাআখখিরিনের মত। ৪। তারা আল্লাহর কাছে দুআ করার সময় হাত উঠানো থেকে গুটিয়ে রাখতো। (তাফসীরে মাওয়ারদী খ: ২ পৃ: ৩৭৯)
ইবনুল জাওযী রহ. তিনিও এ আয়াতের ব্যাপারে চারটি অভিমত উল্লেখ করেছেন। চতুর্থ নাম্বার অভিমতে উল্লেখ করেছেন, الرّابِعُ عَنْ رَفْعِها في الدُّعاءِ إلى اللَّهِ تَعالى ذَكَرَهُما الماوَرْدِيُّ অর্থাৎ আল্লাহর কাছে দুআ করার সময় হাত উঠানো থেকে গুটিয়ে রাখতো। (তাফসীরে ইবনুল জাওযী খ: ২ পৃ: ৩৫২)
قَالَ بعض الْمُتَأَخِّرين يَعْنِي لَا يبسطونها للدُّعَاء وَالرَّغْبَة إِلَى الله
অর্থ: কিছু মুতাআখখিরিনি বলেছেন, অর্থাৎ তারা (মুনাফিকরা) আল্লাহর কাছে দু‘আ করার জন্য হাত প্রশস্ত করতো না। (তাফসীরে সামআনী খ: ২ পৃ: ১৫০)
প্রিয় পাঠক! দু‘আর সময় হাত উত্তোলন করা একটি সুন্নাত আমল। যা কুরআন সুন্নাহ দ্বারা সাব্যস্ত। আসলাফগণ যুগপরম্পরায় এর ওপর আমল করে আসছেন। সুতরাং নবীজীর এই আমলকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। আল্লাহ আমাদের সবাইকে হিদায়াত নসীব করুন। আমিন।
হাত তুলে দু‘আ করার ব্যাপারে এ কথা বলা যে, দু‘আ করার সময় হাত তোলার কোনও প্রয়োজনীয়তা নেই। বা দু‘আ করার সময় হাত তোলার কোনও ভিত্তি নেই এ ধরনের কথা বলা একেবারেই অমূলক। অথচ এ ব্যাপারে অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে। যা পাঠক সমীপে এখানে পেশ করা হল।
হাদীস-১ قَالَ أَبُو مُوسَى دَعَا النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَرَفَعَ يَدَيْهِ وَرَأَيْتُ بَيَاضَ إِبْطَيْهِ
অর্থাৎ হযরত আবূ মূসা আশ‘আরী রা. বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দু‘আর মধ্যে দু’ হাত উপরে উঠিয়েছেন; এবং আমি তাঁর বগলের শুভ্রতা দেখেছি। (সহিহ বুখারী হাদিস: ৩৫৬৫)
হাদীস-২ عن عبدالله بن عباس قال كانَ إذا دعا جعلَ باطنَ كفِّه إلى وجهِهِ
অর্থাৎ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী সা. যখন দু‘আ করতেন, তখন হাতের তালু মুখের দিকে করতেন।
(মুসনাদে আহমাদ: ১৬৫৬৩ তাবরানী: ৬৬২৫ জামে সগীর: ৬৬৬৮ তাহযিবুল কামাল
খ: ৫ পৃ: ৭৩)
হাদীসটির মান:
১. আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী রহ. হাদিসটি হাসান বলেছেন। (জামে সগীর হাদিস: ৬৬৬৮)
২. আহলে হাদীসের মূখপাত্র নাসির উদ্দীন আলবানী বলেছেন, هذا حديث صحيح অর্থাৎ হাদিসটি সহিহ। (সহিহ আল জামে হাদিস: ৪৭২১)
হাদীস-৩
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم مَا مِنْ عَبْدٍ يَرْفَعُ يَدَيْهِ حَتَّى يَبْدُوَ إِبْطُهُ يَسْأَلُ اللَّهَ مَسْأَلَةً إِلاَّ آتَاهَا إِيَّاهُ مَا لَمْ يَعْجَلْ قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ وَكَيْفَ عَجَلَتُهُ قَالَ يَقُولُ قَدْ سَأَلْتُ وَسَأَلْتُ وَلَمْ أُعْطَ شَيْئًا
অর্থাৎ আবূ হুরাইরাহ রা. হতে বর্ণিত আছে যে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন যে সময় কোনো বান্দা তার দুই হাত উপরের দিকে উত্তোলন করে, এমনকি তার বগল খুলে আল্লাহর নিকটে কিছু প্রার্থনা করে, তখন তিনি অবশ্যই তাকে তা দেন, যদি সে তাড়াহুড়া না করে। সাহাবীগণ বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তার তাড়াহুড়া কি? তিনি বললেন, সে বলে, আমি তো প্রার্থনা করছি, আবারও প্রার্থনা করেছি (বারবার প্রার্থনা করছি), কিন্তু আমাকে কিছুই দান করা হয়নি। (জামে তিরমিযী হাদীস: ৩৬০৪)
হাদীস-৪ عَنْ أَنَسً عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم رَفَعَ يَدَيْهِ حَتَّى رَأَيْتُ بَيَاضَ إِبْطَيْهِ
অর্থ: আনাস রা. হতে বর্ণিত। নবীকারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দু’ হাত এতটুকু তুলে দু‘আ করেছেন যে, আমি তার বগলের শুভ্রতা দেখতে পেয়েছি। (সহিহ বুখারী হাদিস: ১০৩০ মুসলিম:৮৯৭ আহমাদ: ১২০১৯ আবু দাউদ: ১১৭৫ নাসাঈ: ১৫২৮)
হাদীস-৫
عَنْ أَبِي مُوسَى قَالَ دَعَا النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم بِمَاءٍ فَتَوَضَّأَ ثُمَّ رَفَعَ يَدَيْهِ فَقَالَ اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِعُبَيْدٍ أَبِي عَامِرٍ وَرَأَيْتُ بَيَاضَ إِبْطَيْهِ فَقَالَ اللَّهُمَّ اجْعَلْهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَوْقَ كَثِيرٍ مِنْ خَلْقِكَ مِنَ النَّاسِ
অর্থ: হযরত আবূ মূসা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার পানি আনিয়ে উযূ করলেন। তারপর উভয় হাত তুলে দু‘আ করলেন হে আল্লাহ! আপনি উবায়দ আবূ ‘আমেরকে মাফ করে দিন। আমি তখন তাঁর বগলের শুভ্রতা দেখলাম। আরও দু‘আ করলেন হে আল্লাহ! আপনি তাকে কিয়ামতের দিন আপনার সৃষ্ট অধিকাংশ অনেক লোকের উপর স্থান দান করুন। (সহীহ বুখারী হাদিস: ৬৩৮৩)
হাদীস-৬
عَنْ سَلْمَانَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم إِنَّ رَبَّكُمْ تَبَارَكَ وَتَعَالَى حَيٌّ كَرِيمٌ يَسْتَحْيِي مِنْ عَبْدِهِ إِذَا رَفَعَ يَدَيْهِ إِلَيْهِ أَنْ يَرُدَّهُمَا صِفْرًا
অর্থ: হযরত সালমান রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ তোমাদের রব চিরঞ্জীব ও মহান দাতা। যখন কোনো বান্দা হাত উঠিয়ে দু‘আ করে, তখন তিনি তার খালি হাত ফিরিয়ে দিতে লজ্জাবোধ করেন। (সুনানে আবূ দাউদ হাদীস:১৪৮৮ তিরমিযী: ৩৫৫৬ ইবনে হিব্বান: ৮৭৬)
হাদীসটির মান:
১. আবূ দাউদ রহ:, ইবনে হিব্বান রহ: সহ অসংখ্য মুহাদ্দিসগণ হাদীসটি সহীহ সনদে বর্ণনা করেছেন।
২. এমনকি আহলে হাদীসদের মান্যবর ব্যক্তি শায়খ শুয়াইব আল আরনাউত, শায়খ আলবানীসহ ইবনে বায রহ: হাদীসটি সহীহ বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
(ফাতাওয়া নুর আলাদ্দারব খ: ৯ পৃ: ১৫৬)
হাদিস-৭
عَنِ الْفَضْلِ بْنِ عَبَّاسٍ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم الصَّلاَةُ مَثْنَى مَثْنَى تَشَهَّدُ فِي كُلِّ رَكْعَتَيْنِ وَتَخَشَّعُ وَتَضَرَّعُ وَتَمَسْكَنُ وَتَذَرَّعُ وَتُقْنِعُ يَدَيْكَ يَقُولُ تَرْفَعُهُمَا إِلَى رَبِّكَ مُسْتَقْبِلاً بِبُطُونِهِمَا وَجْهَكَ وَتَقُولُ يَا رَبِّ يَا رَبِّ وَمَنْ لَمْ يَفْعَلْ ذَلِكَ فَهُوَ كَذَا وَكَذَا
অর্থ: হযরত ফযল ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেনঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, সালাত হল দু’ রাকাআত দু’ রাকাআত করে। প্রতি দু’ রাকাআতের পর রয়েছে তাশাহ্হুদ। সালাতে আছে খুশূ-খুযূ, আল্লাহর নিকটে বিনয় প্রকাশ এবং আহাজারি করা। ধীরস্থিরভাবে তা আদায় করবে। এতে আরো আছে, দু’আর সময় দুই হাত তোলা। দুই হাতের ভিতরের দিক তোমার চেহারার সামনের দিকে রেখে, তোমার প্রভূর পানে তুলে ধরে বলবে, হে আমার রব্ব! যদি এই কাজগুলি কেউ সালাতে না করে, তার সালাত অপূর্ণাঙ্গ হবে। (জামে তিরমিযী হাদিস: ৩৮৫ আহমাদ: ১৭৯৯ তুহফাতুল আহওয়াযী খ: ২ পৃ: ২০০)
হাদীস-৮
عَنْ الْحُسَيْنِ قَالَ کَانَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ یَرْفَعُ یَدَيْهِ إِذَا ابْتَھَلَ وَدَعَا کَمَا یَسْتَطْعِمُ الْمِسْکِيْنُ
অর্থাৎ হযরত হুসাইন রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সা. যখন দুআ করতেন, তখন দু’হাত এমন ভাবে উত্তোলন করতেন, যেমন অসহায় মিসকীন খাবারের জন্য হাত বাড়ায়। (তারিখে বাগদাদী খ: ৮ পৃ: ৬৩)
বি:দ্র: হাদিসটির উপর কালাম রয়েছে, কিন্তু তথাপি সমর্থক হিসাবে আনা হয়েছে।
হাদীস-৯
عن أنس بن مالك قَالَ خرجتُ معَ النَّبيِّ صلّى اللَّهُ عليهِ وسلَّمَ منَ البيتِ إلى المسجِدِ وقومٌ في المسجِدِ رافِعي أَيديهم يَدعونَ فقالَ ترى بأَيديهم ما أرى فقلتُ وما بأَيديهِم قالَ بأيديهِم نورٌ قُلتُ ادعُ اللَّهَ أن يُريَنيهِ فدعا
فأرانيه فأسرَعَ فرفَعنا أيديَنا
অর্থাৎ হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একদিন নবী সা. এর সাথে ঘর থেকে বের হয়ে মসজিদের দিকে গেলাম। তখন কিছু লোক হাত তুলে আল্লাহর কাছে দুআ করছিলেন। তখন নবী সা. আমাকে বললেন, তুমি কি ঐ জিনিষটি দেখতে পাচ্ছো যা ওদের হাতের ভেতরে আছে? তখন আমি বললাম, কি আছে তাদের হাতের ভেতর? নবী সা. বললেন, (আমি ওদের হাতের ভেতর দেখছি) নূর। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহর কাছে একটু দুআ করেন যেন তিনি আমাকে ঐ নূর দেখিয়ে দেন। তিনি দু‘আ করলেন, ফলে আল্লাহ আমাকে ঐ নূর দেখালেন। (অতঃপর তিনি বললেন, হে আনাস, দ্রুত দেখো) অতপর আমি দ্রুত শেষ করলাম এবং আমরা তাঁদের সাথে আমাদের হাত উত্তোলন করলাম। (তারিখে কাবীর বুখারী রহ. খ: ৩ পৃ: ২০২ দালায়িলুন নাবুওয়াহ খ: ৬ পৃ: ১৯৭ কিতাবুদ্ দু‘আ (তাবরানী) হাদিস: ২০৬
হাদীস-১০
عن المطلب قال قال رسول اللہ صلی اللہ علیہ وسلم : صلاۃ اللیل مثنی مثنی، وتشہد في کل رکعتین، وتبائس وتمسکن، وتقنع وتقول اللہم اغفر لي فمن لم یفعل ذلک فہو خداج۰
হযরত মুত্তালিব রা. বর্ণনা করেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, রাত্রের নামাযে দুই-দুই রাকা‘আতের পর বসবে, এবং প্রত্যেক দু’ রাকা‘আতের পর তাশাহ্হুদ পড়বে এবং নামাযের মধ্যে নিজের নিঃস্বতা এবং বিনয়ীভাব প্রকাশ করবে। তারপর নামায শেষে দু’ হাত উঠাবে এবং দু‘আ করবে, হে আল্লাহ! আমাকে মাফ করে দাও। যে ব্যক্তি এরূপ করবে না, তার নামায অসম্পন্ন থাকবে।
(আবূ দাউদ শরীফ : ১/১৮৩, ইবনে মাজাহ শরীফ পৃ: ৯৩ হাদীস নং ১২৯৬)
হাদীস-১১
ما من عبد مؤمن بسط کفیہ في دبر کل صلاۃ ثم بقول : اللہم إلہي۰ (ابن السنی فی عمل الیوم ۱۳۸)
হযরত আনাস রা. হতে বর্ণিত, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে বান্দা প্রত্যেক নামাযের পর দু’হাত তুলে এ দু‘আ পড়বে-
“আল্লাহুম্মা ইলাহী” আল্লাহু তা’আলা নিজের উপর নির্ধারিত করে নিবেন যে, তার হস্তদ্বয়কে বঞ্চিত ফেরত দিবেন না। (ইবনুস সুন্নী হাঃ নং ১৩৮)
হাদীস-১২
عن عمر بن الخطاب کان رسول اللہ صلی اللہ علہ وسلم إذا رفع یدیہ في الدعاء لم یحطہما حتی یمسح بہما وجہہ۰
হযরত উমর ফারুক রা. বর্ণনা করেন যে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম দু‘আর জন্য যখন হাত তোলতেন তখন চেহারায় মুছার পূর্বে হাত নামাতেন না। (বুখারী শরীফ ২/১৭৬ হাঃ নং ৬৩৪১)
চলুন, এবার দেখি এ বিষয়ে উলামায়ে কেরাম কি বলেছেন।
সুয়ূতী রহ. এর অভিমত: আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী রহ. বলেন,
أَحَادِيْثُ رَفَعِ الْیَدَيْنِ فِي الدُّعَاءِ فَقَدْ وَرَدَ عَنْهُ ﷺ نَحْوُ مِائَةِ حَدِيْثٍ فِيْهِ رَفَعَ یَدَيْهِ فِي الدُّعَاءِ অর্থাৎ দু‘আর সময় হাত তোলার ব্যাপারে নবী সা. থেকে আনুমানিক এক শত হাদীস বর্ণিত আছে। যেখানে এটা বর্ণিত রয়েছে যে, নবী সা. দুআর সময় হাত উঠাতেন। তিনি আরও বলেন, الرَّفْعُ عِنْدَ الدُّعَاءِ تَوَاتَرَ بِاعْتَبَارِ الْمُجْمُوْعِ অর্থাৎ সমষ্টিগতভাবে হাত তুলে দু‘আ করা মুতাওয়াতির হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। (তাদরীবুর রাবী খ: ২ পৃ: ৬২১)
ইমাম নববী রহ. এর অভিমত:
قَالَ جَمَاعَةٌ مِنْ أَصْحَابِنَا وَغَيْرِھِمْ اَلسُّنَّةُ فِي کُلِّ دُعَاءٍ لِرَفْعِ بَلاَءٍ کَالْقَحْطِ وَنَحْوِهِ أَنْ يَّرْفَعَ یَدَيْهِ وَیَجْعَلَ ظَھْرَ کَفَّيْهِ إِلَی السَّمَاءِ অর্থাৎ আমাদের উলামায়ে কেরাম এবং অন্যান্য মাশায়েখগণ বলেছেন, মসিবত যেমন: দুর্ভিক্ষ বা এমন কোনো বিষয় থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য দু‘আ করার সময় হাত উঠানো সুন্নাত এবং সেটা এভাবে যে, দু’হাতের তালু আসমানের দিকে উঠাবে।
তিনি আরও বলেন,
قَدْ ثَبَتَ رَفْعُ یَدَيْهِ ﷺ فِي الدُّعَاءِ فِي مَوَاطِنَ غَيْرَ الاسْتِسْقَاءِ وَھِيَ أَکْثَرُ مِنْ أَنْ تُحْصَرَ অর্থাৎ এ বিষয়টি প্রমাণিত যে, নবী সা. ইস্তেস্কার নামায ছাড়াও অগণিত সময়ে হাত তুলে দু‘আ করেছেন। (শরহুল মুসলিম খ: ৬ পৃ: ১৯০ মারিফাতুস সুনান ওয়াল আছার খ: ৫ পৃ: ১৭৯)
ইবনে রজব হাম্বলী রহ. এর অভিমত: আল্লামা ইবনে রজব হাম্বলী রহ. দু‘আ কবূল হওয়ার জন্য ৪টি বিষয় উল্লেখ্য করছেন। তার মধ্যে তৃতীয় বিষয় হিসাবে লিখেছেন,
الثالث: مد يديه إلى السماء، وهو من آداب الدعاء التي يرجى بسببها إجابته
অর্থাৎ তৃতীয় বিষয় হলো, (দু‘আ করার সময়) দু’ হাত আসমানের দিকে তুলে ধরবেন। এটা দু‘আর একটি আদব, যার দ্বারা দু‘আ কবূল হওয়ার আশা করা যায়। (জামিউল উলূম ওয়াল হিকাম খ:১ পৃ: ২৫৮)
ইবনে তাইমিয়া রহ. এর অভিমত: শাইখুল ইসলাম আবুল আব্বাস ইবনে তাইমিয়া রহ. দু’আ করার সময় হাত তোলার ব্যাপারে বলেন,
ويسن للداعي رفع يديه অর্থাৎ দু‘আকারীর জন্য দু’ হাত তোলা সুন্নাত। (আল ফাতাওয়াল কুবরা খ: ৫ পৃ: ৩৩৭ )
বিন বায রহ. এর অভিমত: إذا دعا ورفع يديه فهذا من أسباب الإجابة إلا في المواضع التي لم يرفع فيها النبي ﷺ فلا نرفع فيها
অর্থাৎ দু‘আ করার সময় দু’ হাত তোলা দু‘আ কবূল হওয়ার কারণ। তবে কিছু জায়গায় নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাত তোলেননি আমরাও সে সব স্থানে হাত তুলবো না। যেমন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘুমের পূর্বে দু‘আ করেছেন কিন্তু হাত উত্তোলন করননি। আবার পায়খানায় প্রবেশের পূর্বে দু‘আ করেছেন সেখানেও হাত উত্তোলন করেন নি। এরকম আরো অনেক স্থানে দু‘আ করেছেন কিন্তু হাত উত্তোলন করেননি। (মাজমুউ ফাতাওয়া বিন বায খ: ৬ পৃ: ১২৪, হাশিয়াতুত্ ত্বাহত্বাবী :পৃ:৩১৮)
৩য় বিষয়:
দলীল-১
এ বিষয়ে বাস্তব কথা এই যে, দু‘আ অনেক বড় আমল, এমনকি হাদীস শরীফে এসেছে যে, ‘দু‘আই ইবাদত।’ এই দু‘আ যেমন একা একা করা যায় তেমনি সম্মিলিতভাবেও করা যায়। শরী‘আত যেখানে কোনো একটি পন্থা নির্ধারণ করে দিয়েছে সেখানে ওইভাবে দু‘আ করতে হবে। একা হলে একা এবং সম্মিলিতভাবে হলে সম্মিলিতভাবে। কিন্তু শরী‘আত যেখানে কোনো একটি পন্থা নির্দিষ্ট করেনি সেখানে উভয় পন্থাই মুবাহ। বিনা দলীলে কোনো একটিকে যেমন নাজায়েয বলা যায় না তেমনি সুন্নত বা জরুরিও বলা যায় না। এধরনের ক্ষেত্রে উভয় পন্থাই মুবাহ ও দু‘আকারীর ইচ্ছাধীন থাকে।
উল্লেখ্য, সম্মিলিত দু‘আ দুইভাবে হতে পারে। ১। সমবেত লোকদের মধ্যে একজন দু‘আ করবে এবং অন্যরা আমীন বলবে। ২। এক স্থানে সমবেত হয়ে সবাই দু‘আ করবে, প্রত্যেকে নিজে নিজে দু‘আ করবে। এই উভয় সূরত জায়েয।
এছাড়া সমবেত হওয়ারও দুই সূরত হতে পারে। শুধু দু‘আর উদ্দেশ্যেই সমবেত হওয়া কিংবা কোনো দ্বীনী বা দুনিয়াবী কাজের উদ্দেশ্যে সমবেত হয়ে মজলিসের শুরু বা শেষে সম্মিলিতভাবে দু‘আ করা। এই দুই সূরতই জায়েয। তবে কোথাও যদি কোনো শর‘ঈ সমস্যা যুক্ত হয় তবে তার হুকুম ভিন্ন। এই সংক্ষিপ্ত আলোচনার পর শরী‘আতের দলীলসমূহে সম্মিলিত দু‘আর সূত্র লক্ষ্য করুন।
১. প্রথম কথা হল শরী‘আতে সম্মিলিত দু‘আর এমন কিছু ক্ষেত্র বিদ্যমান রয়েছে যা একেবারেই সুস্পষ্ট এবং যে বিষয়ে দ্বিমতের কোনোই অবকাশ নেই। যেমন-
(ক) জামাতের নামাযের জাহরী (স্বশব্দে) কিরাআতে ইমাম যখন সূরা ফাতিহা সমাপ্ত করেন তো সবাই ‘আমীন’ বলে। নামাযে সূরা ফাতিহা মূলত কিরাআত হিসেবে পড়া হলেও তা একই সঙ্গে দু‘আও বটে। এজন্যই তা সমাপ্ত হওয়ার পর আমীন বলা সুন্নত। একই কারণে সূরা ফাতিহার অপর নাম ‘দুআউল মাসআলাহ।’
(খ) জানাযার নামায একদিকে যেমন নামায অন্যদিকে তা দু‘আও বটে। জানাযার নামাযের মূলকথা হচ্ছে দু‘আ। এই নামাযও জামাতের সঙ্গে আদায় করা হয় এবং তৃতীয় তাকবীরের পর ইমাম-মুকতাদী সবাই একসঙ্গে মাইয়্যেতের জন্য দু‘আ করে।
(গ) অনাবৃষ্টি দেখা দিলে এবং প্রয়োজন সত্ত্বেও যথারীতি বৃষ্টি না হলে শরী‘আতে ‘ইস্তিসকা’র (অর্থাৎ আল্লাহর কাছে রহমতের বৃষ্টি কামনা করার) নির্দেশ এসেছে। ‘ইস্তিসকা’র বিভিন্ন পদ্ধতি আছে। একটি পদ্ধতি এই যে, সবাই সম্মিলিতভাবে দু‘আ করবে। যেমন সহীহ বুখারীতে আনাস রা.-এর বর্ণনা এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বৃষ্টির জন্য উভয় হাত উঠিয়ে দু‘আ করেছেন এবং তাঁর সঙ্গে উপস্থিত সকলে হাত উঠিয়ে দু‘আ করেছেন। (সহীহ বুখারী)
(ঘ) জুমু‘আ ও দুই ঈদের খুৎবায় খতীব দু‘আ করেন এবং শ্রোতাগণ মনে মনে আমীন বলেন। সম্মিলিত দু‘আর এই পদ্ধতিও সব জায়গায় প্রচলিত রয়েছে। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাধারণত ‘ইস্তিগফার’ এর মাধ্যমে খুৎবা সমাপ্ত করতেন (মারাসীলে আবু দাউদ; যাদুল মাআদ ১/১৭৯)
২. কুরআন মজীদে ইরশাদ হয়েছে- قَالَ قَدْ اُجِیْبَتْ دَّعْوَتُكُمَا ‘তোমাদের দুজনের দু‘আ কবূল করা হয়েছে।’
এ আয়াতে ‘তোমাদের দুই জনের দু‘আ’ বলতে মূসা আ. ও হারূন আ. এর দু‘আ বোঝানো হয়েছে। একাধিক সাহাবী ও বেশ কয়েকজন তাবেঈ ইমামের সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত মূসা আ. দু‘আ করেছেন এবং হারূন আ. আমীন বলেছেন। একেই আল্লাহ তা‘আলা ‘দুইজনের দু‘আ’ বলেছেন। (তাফসীরে ইবনে কাছীর ২/৪৭০; আদ্দুররুল মানছূর ৩/৩১৫) তো এটা তাঁদের দু’ জনের সম্মিলিত দু‘আ ছিল, যা আল্লাহ তা‘আলা কবূল করেছেন এবং খোশখবরী শুনিয়েছেন যে ‘তোমাদের দু’ জনের দু‘আ কবূল করা হয়েছে।
সাহাবীয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত হাবীব ইবনে মাসলামা আলফিহরী রা. যিনি বড় মুস্তাজাবুদ দাওয়াহ ছিলেন একবার তাকে একটি বাহিনীর আমীর নিযুক্ত করা হয়। তিনি যুদ্ধের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সমাপ্ত করার পর যখন যুদ্ধের সময় নিকটবর্তী হল তখন সহযোদ্ধাদের লক্ষ্য করে বললেন-
سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ : لَا يَجْتَمِعُ مَلَأٌ فَيَدْعُو بَعْضُهُمْ وَيُؤَمِّنُ سَائِرُهُمْ إِلَّا أَجَابَهُمُ اللَّهُ ‘আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি যে, কিছু মানুষ যখন কোথাও একত্র হয়ে এভাবে দু‘আ করে যে, একজন দু‘আ করে এবং অন্যরা আমীন বলে তো আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তাদের দু‘আ কবূল করেন।’
এই হাদীস বয়ান করে তিনি আল্লাহ তা‘আলার হামদ ও সানা করলেন এবং দু‘আ করতে আরম্ভ করলেন। তাঁর দু‘আর একটি অংশ এই ছিল-
اللَّهُمَّ احْقِنْ دِمَاءَنَا وَاجْعَلْ أُجُورَنَا أُجُورَ الشُّهَدَاءِ
‘ইয়া আল্লাহ! আমাদের প্রাণ রক্ষা করুন এবং আমাদেরকে শহীদদের সমতুল্য সওয়াব দান করুন।’
তাঁরা সবাই দু‘আতেই মশগুলে ছিলেন ইতোমধ্যে রোমক বাহিনীর সেনাপতি (অস্ত্র ত্যাগ করে) হাবীব ইবনে মাসলামা রা এর তাবুতে এসে উপস্থিত হল। (মু‘জামুল কাবীর, তাবরানী ৪/২৬; মুসতাদরাকে হাকেম ৩/৩৪৭)
বর্ণনাটির সম্পূর্ণ আরবী পাঠ নিম্নরূপ:
عَنْ حَبِيبِ بن مَسْلَمَةَ الْفِهْرِيُّ وَكَانَ مُسْتَجَابًا أَنَّهُ أُمِّرَ عَلَى جَيْشٍ فَدَرَّبَ الدُّرُوبَ، فَلَمَّا لَقِيَ الْعَدُوَّ، قَالَ لِلنَّاسِ : سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، يَقُولُ : لا يَجْتَمِعُ مَلأٌ فَيَدْعُو بَعْضُهُمْ وَيُؤَمِّنُ سَائِرُهُمْ إِلا أَجَابَهُمُ اللَّهُ، ثُمَّ إِنَّهُ حَمِدَ اللَّهَ وَأَثْنَى عَلَيْهِ، فَقَالَ : اللَّهُمَّ احْقِنْ دِمَاءَنَا وَاجْعَلْ أُجُورَنَا أُجُورَ الشُّهَدَاءِ، فَبَيْنَمَا عَلَى ذَلِكَ إِذْ نَزَلَ الْهِنْبَاطُ أَمِيرُ الْعَدُوِّ،فَدَخَلَ عَلَى حَبِيبٍ سُرَادِقَهُ
رواه الطبراني في الكبير والحكم في المستدرك، والراوي عن ابن لهيعة أبو عبد الرحمن المقري، وهو أحد العبادلة الذين تعد روايتهم عن ابن لهيعة صحيحة
এই রেওয়ায়েতের সনদ কম করে হলেও ‘হাসান’ পর্যায়ের। সম্মিলিত দু‘আর ভিত্তি প্রমাণের জন্য এরচেয়ে স্পষ্ট বর্ণনার প্রয়োজন আছে কি?
৩. ইতিহাসে ‘আলা আলহাযরামী রা. এর ঘটনা সুপ্রসিদ্ধ। বাহরাইনের
মুরতাদদের সঙ্গে ১১ হিজরীতে যে লড়াই হয়েছিল তাতে তিনি সিপাহসালার ছিলেন। সেই অভিযানের একটি প্রসিদ্ধ ঘটনা এই যে, মুসলিম বাহিনী একস্থানে যাত্রাবিরতি করতেই কাফেলার সকল উট রসদপত্রসহ পলায়ন করল। একটি উটও পাকড়াও করা গেল না। অবস্থা এই দাঁড়াল যে, পরনের কাপড় ছাড়া কোনো রসদ কাফেলার সঙ্গে রইল না। সবার পেরেশান অবস্থা। আলা আলহাযরামী রা. ঘোষকের মাধ্যমে সবাইকে একত্র করলেন এবং শান্তনা দিয়ে বললেন, ‘তোমরা মুসলমান, আল্লাহর রাস্তায় আছ তোমরা আল্লাহর সাহায্যকারী। অতএব আল্লাহ তোমাদেরকে সহায়-সঙ্গী বিহীন অবস্থায় ত্যাগ করবেন না। ইতোমধ্যে ফজরের আযান হল। তিনি নামাযে ইমামতী করলেন। নামাযের পর দোজানু হয়ে বসে অত্যন্ত বিনয় ও কাতরতার সঙ্গে দু‘আয় মশগুল হয়ে গেলেন। কাফেলার সবাই দু‘আ করতে লাগল। এ অবস্থায় সূর্য উদিত হল, কিন্তু তারা দু‘আয় মশগুল রইলেন। একপর্যায়ে আল্লাহ তা‘আলা তাদের সন্নিকটে একটি বড় জলাশয় সৃষ্টি করে দিলেন। সবাই সেখানে গেলেন, তৃষ্ণা নিবারণ করলেন এবং গোসল করলেন। বেলা কিছু চড়ার পর একে একে সকল উট সমস্ত রসদসহ ফিরে আসতে লাগল।
হাদীস ও তারীখের ইমাম ইবনে কাছীর রহ. বলেন, এটা ওই লড়াইয়ের
অনেকগুলো অলৌকিক ঘটনার একটি, যা লোকেরা সরাসরি প্রত্যক্ষ করেছে।
আলোচ্য বিষয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরবী ইবারতটুকু তুলে দিচ্ছি :
فلما قضا الصلاة جثا على ركبتيه وجثا الناس، ونصب في الدعاء ورفع يديه وفعل الناس مثله
(আলবিদায়া ওয়াননিহায়া ৫/৩৪; তারীখে তাবারী ২/৫২৩)
মোটকথা শরী‘আতের দৃষ্টিতে সম্মিলিত দু‘আর প্রমাণ-সিদ্ধতা একটি স্পষ্ট বিষয়। এসম্পর্কে অতিরিক্ত দলীল-প্রমাণের প্রয়োজন নেই। সম্মিলিত দু‘আ সম্পর্কে আরো হাদীস জানতে হলে শায়েখ আব্দুল হাফিজ মাক্কী সংকলিত ‘ইসতিহবাবুদ দু‘আ বা‘দাল ফারাইয’ কিতাবটি (পৃ: ৬৮-৭৯) দেখা যেতে পারে।
সহীহ বুখারী ও তার ব্যাখ্যাগ্রন্থ ফাতহুল বারীতে ঘটনা উল্লেখিত হয়েছে যার সারাংশ এই যে, লোকেরা বৃষ্টির জন্য দু‘আর উদ্দেশ্যে একত্র হল। হযরত উমর রা. খুৎবা দিলেন এবং বললেন, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (তার চাচা) আব্বাসকে পিতার মতো মনে করতেন। অতএব, তোমরা তাঁর সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অনুসরণ কর এবং তাঁকে আল্লাহর দরবারে অসীলা বানাও। এরপর হযরত আব্বাস রা. ও উপস্থিত সবাই দু‘আ করতে আরম্ভ করেন। হযরত আব্বাস রা এর দু‘আ এই ছিল- اللَّهُمَّ إِنَّهُ لَمْ يَنْزِلْ بَلَاءٌ مِنَ السَّمَاءِ إِلَّا بِذَنْبٍ، وَلَمْ يَكْشِفْ إِلَّا بِتَوْبَةٍ، وَقَدْ تَوَجَّهَ الْقَوْمُ بِي إِلَيْكَ لِمَكَانِي مِنْ نَبِيِّكَ، وَهَذِهِ أَيْدِينَا إِلَيْكَ بِالذُّنُوبِ وَنَوَاصِينَا إِلَيْكَ بِالتَّوْبَةِ، فَاسْقِنَا الْغَيْثَ
সবাই দু‘আয় মশগুল ছিলেন। ইতোমধ্যে মুষলধারে বৃষ্টি হতে আরম্ভ করে। (ফাতহুল বারী ২/৫৭৭ কিতাবুল ইস্তিসকা)
দু‘আটির তরজমা এই, ‘ইয়া আল্লাহ, গুনাহর কারণে বিপদাপদ আসে আর তাওবার মাধ্যমেই তা দূর হয়। যেহেতু আপনার নবীর সঙ্গে আমার বিশেষ সম্বন্ধ আছে এজন্য সবাই আমাকে অসীলা বানিয়ে আপনার দয়ার ভিখারী হয়েছে। আমাদের গুনাহগার হাতগুলো আপনার দরবারে উত্তোলিত রয়েছে আর আমাদের কপাল তওবার সঙ্গে আনত রয়েছে। বৃষ্টির মাধ্যমে আপনি আমাদের ফরিয়াদ কবূল করুন।’
পাঠকবৃন্দই বলুন, এই দু‘আ সম্মিলিত ছিল না একাকী? তাছাড়া এ বিষয়ে তাবাকাতে ইবনে সা‘আদ: এ স্পষ্ট উল্লেখ আছে যে, সে দু‘আয় ওমর রা. এবং সকল মানুষ হাত উঠিয়ে দীর্ঘক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর দরবারে কেঁদেছিলেন।
عن أبي عثمان قال : كتب عامل لعمر بن الخطاب رضي الله عنه إليه : أن ههنا قوماً يجتمعون، فيدعون للمسلمين وللأمير. فكتب إليه عمر : أقبل وأقبل بهم معك فأقبل. فقال عمر، للبواب : أعِدَّ لي سوطاً، فلما دخلوا على عمر، أقبل على أميرهم ضرباً بالسوط. فقال: يا أمير المؤمنين! إنا لسنا أولئك الذين يعني أولئك قوم يأتون من قبل المشرق.
অর্থ: আবূ উসমান বলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব রা. এর একজন প্রশাসক তাকে পত্র লিখলেন যে, এখানে কিছু মানুষ আছে যারা একস্থানে একত্র হয় এবং মুসলমানদের জন্য ও ‘আমীরে’র জন্য দু‘আ করে। উমর রা. তাকে উত্তরে লিখলেন, ‘তুমি তাদেরকে নিয়ে আমার কাছে আস।’ প্রশাসক তাদেরকে নিয়ে উপস্থিত হলেন। এদিকে উমর রা. প্রহরীকে বললেন, একটা চাবুক প্রস্তুত করে রাখ। যখন তারা উমর রা. এর দরবারে উপস্থিত হল তখন তিনি তাদের
আমীরকে চাবুক মারতে লাগলেন। সে বলল, আমীরুল মু‘মিনীন, আমরা ওই গোষ্ঠী নই, তারা মাশরিক থেকে আসে। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস ২৬৭১৫, কিতাবুল আদব, মান কারিহাল কাসাসা ওয়াজজারবা ফীহ)
উপরোক্ত রেওয়ায়েত মনোযোগ সহকারে অধ্যয়ন করলে আপনি পরিষ্কার বুঝতে পারবেন যে, হযরত উমর রা. কেন নারাজ হয়েছেন এবং কেন প্রহার করেছেন।
এরা কোনো উদ্দেশ্যে একত্র হয়েছিল এবং নিজেদের মধ্যে একজনকে আমীর বানিয়েছিল। এরপর প্রতিদিন সম্মিলিত হয়ে মুসলমানদের জন্য ও নিজেদের আমীরের জন্য (আমীরুল মু‘মিনীন উমর রা. এর জন্য নয়) দু‘আ করত। বলাবাহুল্য, ইসলামী খিলাফত বিদ্যমান থাকা অবস্থায় গোপনে ভিন্ন নেতৃত্ব তৈরির কোনোই অবকাশ নেই। হযরত উমর রা. অত্যন্ত বিচক্ষণ ও দূরদর্শী ছিলেন। তাদের এই কার্যকলাপ থেকে বিদ্রোহ বা ফিৎনার আশঙ্কা করে তৎক্ষণাৎ তাদের শাস্তির ব্যবস্থা করেছেন।
মোটকথা, বিষয়টা সম্মিলিত দু‘আর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয় গোপন নেতৃত্ব সৃষ্টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এজন্য এখান থেকে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা ভুল হবে যে, হযরত উমর রা. তাদেরকে সম্মিলিত দু‘আর জন্য প্রহার করেছিলেন।
সহীহ বুখারী:হাদীস ৬৪০৮, সহীহ মুসলিম: হাদীস ২৬৮৯ সহ বহু হাদীসের কিতাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ওই হাদীস বর্ণিত হয়েছে, যাতে যিকরের হালকার ফযীলত বয়ান করেছেন। সে হাদীসে যিকরের হালকায় কী আমল হয় তারও বিবরণ আছে। এই হাদীস যাদের জানা আছে তারা জানেন যে, তাতে তাসবীহ ও তাহ্লীলের সঙ্গে জান্নাতের প্রার্থনা,
জাহান্নাম থেকে পানাহ চাওয়া ও ইস্তেগফারের আমলও শামিল রয়েছে। প্রশ্ন এই যে, জান্নাত লাভের ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির প্রার্থনা, ইসতিগফার এগুলো কি দু‘আ নয়? আর যিকিরের হালকায় যিকরের সঙ্গে যখন দু‘আও শামিল রয়েছে তো এটা কি সম্মিলিত দু‘আ নয়?
এই হাদীস এবং এ বিষয়ের অন্যান্য হাদীস আর এ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য শর‘ঈ দলীল বিদ্যমান থাকা অবস্থায় সম্মিলিত দু‘আর ওপর কীভাবে কাউকে প্রহার করা যেতে পারে?
দলীল-২
أَنَسَ بْنَ مَالِكٍ، قَالَ: أَتَى رَجُلٌ أَعْرَابِيٌّ مِنْ أَهْلِ البَدْوِ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ الجُمُعَةِ، فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، هَلَكَتِ المَاشِيَةُ، هَلَكَ العِيَالُ هَلَكَ النَّاسُ، ্রفَرَفَعَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَدَيْهِ، يَدْعُو، وَرَفَعَ النَّاسُ أَيْدِيَهُمْ مَعَهُ يَدْعُونَ
হযরত আনাস বিন মালিক রাঃ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা একজন গ্রাম্য সাহাবী জুম‘আর দিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে আসলেন। এসে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! জিনিস পত্র, পরিবার, মানুষ সবই ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। একথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার উভয় হাত উত্তোলন করলেন দু‘আর উদ্দেশ্যে। উপস্থিত সবাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে দু‘আর জন্য হাত উত্তোলন করলেন।
(সহীহ বুখারী, হাদীস নং-১০২৯)
এ হাদীসে পরিস্কারভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে
সম্মিলিতভাবে মুনাজাত প্রমানিত। লক্ষ্য করুন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দু‘আ করেছেন, আর উপস্থিত সাহাবীগণ আমীন আমীন বলে সম্মিলিত মুনাজাতে অংশ নিয়েছেন।
দলীল-৩
عَنْ سَلْمَانَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ্রمَا رَفَعَ قَوْمٌ أَكُفَّهُمْ إِلَى اللهِ عَزَّ وَجَلَّ يَسْأَلُونَهُ شَيْئًا، إِلَّا كَانَ حَقًّا عَلَى اللهِ أَنْ يَضَعَ فِي أَيْدِيهِمُ الَّذِي سَأَلُوا
হযরত সালমান রা. থেকে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যখন কোনো জাম‘াআত তাদের প্রয়োজন পূর্ণ করার আশায় আল্লাহর দরবারে হাত উঠায়, তখন আল্লাহর উপর হক হল প্রার্থিত বিষয় উক্ত জা‘মাতকে প্রদান করা। (আলমুজামুল কাবীর লিততাবরানী, হাদীস নং-৬১৪২, আততারগীব ওয়াত তারহীব, হাদীস নং-১৪৪, মাযমাউয যাওয়ায়েদ, হাদীস নং-১৭৩৪১, কানযুল উম্মাল, হাদীস নং-৩১৪৫)
আল্লামা হায়ছামী রহ. বলেন, এ হাদীসের সনদের সকল রাবীগণ সহীহের রাবী। (মাযমাউয যাওয়ায়েদ, হাদীস নং-১৭৩৪১)
এরকম আরো অসংখ্য বর্ণনা প্রমাণ করে সম্মিলিত মুনাজাত এটি দু‘আ কবূলের আলামত। সেই সাথে উত্তম আমল। যা কিছুতেই বিদ‘আত হতে পারে না। যে সম্মিলিত মুনাজাত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে করেছেন সাহাবীদের নিয়ে, সাহাবায়ে কেরাম সাথিবর্গকে নিয়ে যে সম্মলিত মুনাজাত করেছেন, তা কী করে বিদ‘আত হতে পারে? সুতরাং বুঝা গেল যে, সম্মিলিত মুনাজাত করাও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরাম রা. থেকে প্রমাণিত। সেই সাথে সম্মিলিতভাবে মুনাজাত করতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরিস্কার ভাষায় উৎসাহ প্রদান করেছেন।
৪র্থ বিষয়
দলীলের আলোকে ফরয নামাযের পর দু’আর বিষয়টি প্রমাণিত এবং সাহাবাকেরামের আমল দ্বারাও বিষয়টি প্রমাণিত।
যেহেতু ইসলামি শরী‘আ মুতাবিক যেখানে শরী‘আত একাকি দু‘আর কথা বলেছেন সেখানে একাকি। আর যেখানে সম্মিলিত দু‘আর কথা বলেছেন সেখানে সম্মিলিত দু‘আ করতে হবে। আর যেখানে একাকি বা সম্মিলিত কোনোটিই নির্ধারণ করেন নাই, সেখানে একাকিও করা যায় বা সম্মিলিতও করা যায়। শরী‘আত যেখানে কোনো একটি পন্থা নির্দিষ্ট করেনি সেখানে উভয় পন্থাই মুবাহ। বিনা দলীলে কোনো একটিকে যেমন নাজায়েয বলা যায় না তেমনি সুন্নত বা জরুরীও বলা যায় না সেহেতু এধরণের ক্ষেত্রে উভয় পন্থাই মুবাহ ও দু‘আকারীর ইচ্ছাধীন থাকে।
উল্লেখ্য, সম্মিলিত দু‘আ দুইভাবে হতে পারে। ১। সমবেত লোকদের মধ্যে একজন দু‘আ করবে এবং অন্যরা আমীন বলবে। ২। একস্থানে সমবেত হয়ে সবাই দু‘আ করবে, প্রত্যেকে নিজে নিজে দু‘আ করবে। এই উভয় ছুরত জায়েয।
তবে বিশেষভাবে লক্ষনীয় বিষয় হল, ফরয নামাযের পর সম্মিলিত দু‘আ করবে নাকি একাকি করবে? এব্যপারে উলামাকেরামের দুটি মত রয়েছে ১. বড় একটি দলের মত হল, সম্মিলিত দু‘আ করা মুস্তাহাব।
২. যারা বলেন সম্মিলিত দু‘আ করার চেয়ে একাকি করা উত্তম।
এখানে এই দুটি মতের ওপর যদি ক্ষ্যন্ত থাকত তাহলে কোনো সমস্যা ছিল না। কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো এমন একটি বিষয় নিয়েও মতানৈক্য হয়েছে এক দল যারা ফরয বানিয়ে দিয়েছে। অপর দল এটাকে ভিত্তিহীন বানিয়ে দিয়েছে।
এখন ফরয নামাযের পর একাকি করবে নাকি সম্মিলিত করবে? এব্যপারে নির্দিষ্ট করে কোনো বিধান শরী‘আত দেয়নি যে, সম্মিলিতই করতে হবে বা একাকিই করতে হবে।
এখানে কয়েকটি বিষয় লক্ষণীয় ১. আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন ফরয নামাযের পর দু‘আ বেশী কবূল হয়। ২. আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দু‘আ করেছেন এবং সাহাবাগণও করেছেন। ৩. হাত তুলে দু‘আ করলে দু‘আ বেশী কবূল হয়। যা আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি।
৪. এবং সম্মিলিত দু‘আ করলে দু‘আ কবূল হয়। উপরোক্ত বিষয়গুলো আমরা পূর্বে বিষদভাবে উল্লেখ করেছি।
সুতরাং ফরয নামাযের পর দু‘আ করা মুস্তাহাব এবং উক্ত বিষয়গুলি প্রমাণিত হওয়ার পর এবিষয়টি প্রমাণিত হলো যে, ফরয নামাযের পর সম্মিলিত মুনাজাত করাও বৈধ আবার একাকি করাও বৈধ। বরং সম্মিলিত করাই উত্তম। আর উভয়টিই বৈধ থাকার ফলে আমরা উভটির নযীরই দেখতে পাই। যেমন
বাহরাইনে মুরতাদদের সঙ্গে ১১ হিজরীতে যে লড়াই হয়েছিল তাতে আলা হাযরামী রা. তিনি সিপাহসালার ছিলেন। সেই অভিযানের একটি প্রসিদ্ধ ঘটনা এই যে, মুসলিম বাহিনী এক স্থানে যাত্রাবিরতি করতেই কাফেলার সকল উট রসদপত্রসহ পলায়ন করল। একটি উটও পাকড়াও করা গেল না। অবস্থা এই দাড়াল যে, পরনের কাপড় ছাড়া কোনো রসদ কাফেলার সঙ্গে রইল না। সবার পেরেশান অবস্থা। ‘আলা আলহাযরামী রা. ঘোষকের মাধ্যমে সবাইকে একত্র করলেন এবং শান্তনা দিয়ে বললেন, ‘তোমরা মুসলমান আল্লাহর রাস্তায় আছো তোমরা আল্লাহর সাহায্যকারী। অতএব, আল্লাহ তোমাদেরকে সহায়-সঙ্গী বিহীন অবস্থায় ত্যাগ করবেন না।’
نودي بصلاة الصبح حين طلع الفجر فصلى بالناس، فلما قضى الصلاة جثا على ركبتيه وجثا الناس، ونصب في الدعاء ورفع يديه وفعل الناس مثله حتى طلعت الشمس
অর্থাৎ ফজরের নামাযের ওয়াক্ত হলে আযান দেওয়া হলো। অতঃপর তিনি সকলকে নিয়ে নামায পড়লেন। নামায শেষ করে তিনি হাঁটু গেড়ে (তাশাহহুদের বৈঠকের ন্যায়) বসলেন এবং লোকেরা সকলে হাঁটু গেড়ে বসলো। হযরত আলা বিন হাযরামী রা. হাত তুলে দু‘আয় মাশগুল হলেন এবং লোকেরাও দু‘আয় মাশগুল হলো। এভাবে সূর্য ওঠা পর্যন্ত চললো। (আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ খ: ৬ পৃ: ৩৬১)
হযরত আলা বিন হাযরমী রা. এবং ও সাথীদের আমল হতে ফরয নামাযের পরে ইজতিমায়ী দু‘আ প্রমাণিত হয়। আর হাদীসের নীতিমালা অনুযায়ী ইবাদাতের ক্ষেত্রে সাহাবাদের আমল হুকমী মারফু‘ অর্থাৎ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে শুনে বা দেখে করেছেন বলে ধরে নেয়া হয়ে থাকে (শরহু নুখবাতিল ফিকার: ৫০-৫১)
একটি প্রশ্ন:
এই হাদীস দিয়ে দলীল দিলে কেউ কেউ বলেন, এটা তো সাহাবায়ে কেরাম রা. বিপদের জন্য করেছেন”।
জবাব:
প্রশ্নটি যারা করেন, জানি না তারা কেমন গভীর জ্ঞান নিয়ে প্রশ্নটি করেন! তাদের জানা উচিৎ যে, সাহাবায়ে কেরাম নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দ্বীন পালনে এত মজবুত ছিলেন যে, পাহাড় সরে গেলেও তারা বিদ‘আত কাজ করতেন না। সম্মিলিত দু‘আ যদি বিদ‘আত হতো, তাহলে সাহাবায়ে কেরাম রা. সামান্য দুনিয়াবী বিপদে পড়েই বিদ‘আত কাজে শামিল হয়ে গেলেন? কতবড় মুর্খতা ভেবে দেখেছেন কখনও?
عَنْ ثَوْبَانَ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَৃوَلاَ يَؤُمَّ قَوْمًا فَيَخُصَّ نَفْسَهُ بِدَعْوَةٍ دُونَهُمْ فَإِنْ فَعَلَ فَقَدْ خَانَهُمْ
অর্থ: হযরত সাওবান রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন এবং কোন জনসমষ্টির ইমামতী করে দু‘আর বেলায় তাদের বাদ দিয়ে কেবল নিজের জন্য দু‘আ করবে না। এরূপ করলে তাদের সাথে খেয়ানত করা হবে। (জামে তিরমিযী হাদিস: ৩৫৭)
হাদীসটির মান:
১. ইমাম তিরমিযী রহ. বলেন, সাওবান রা. এর হাদীসটি হাসান। (জামে তিরমিযী খ: ১ পৃষ্ঠা: ৮২)
২. আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বলেছেন, হাদীসটি হাসান।
(নাতায়িজুল আফকার খ: ২ পৃ: ১৬৫)
একটি প্রশ্ন:
প্রিয় পাঠক! এ হাদীসে মুক্তাদীদেরকে বাদ দিয়ে ইমাম শুধু তার নিজের জন্য দু‘আ করলে এটাকে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুক্তিদীদের সাথে খেয়ানত বলে উল্লেখ করেছেন। হয়তো অনেকে এখানে একটি প্রশ্ন করবেন এখানে মূলত নামাযের ভেতরে যেসকল মাসনুন দু‘আ রয়েছে, সেগুলোর ব্যাপারে বলা হয়েছে, নামাযের পরের দু‘আর কথা বলা হয়নি।
উত্তর:
এখানে নামাযের ভেতরের দু‘আ না বাহিরের দু‘আ সে বিষয়টি উল্লেখ নেই। উপরন্তু নামাযের মধ্যে আমরা যে দু‘আ পড়ে থাকি তার কোনটায়
মুক্তাদীদেরকে শরীক করে কোনো দু‘আ নেই। দুই সিজদার মাঝে এবং দুরূদের পরে যে দু‘আ হাদীসে বর্ণিত আছে, সেগুলোও কেবল নিজের জন্য। সুতরাং খেয়ানত থেকে বাঁচার কোনো ব্যবস্থা নামাযে পঠিত দোয়াগুলোতে নেই। অবশ্য, নামাযের পরের দু‘আকে হিসাব করলে উক্ত খেয়ানত হতে বাঁচার একটি পথ পাওয়া যেতে পারে।
হাদীসটির দুটি অর্থের সম্ভাবনা:
হাদীসটির فَيَخُصَّ نَفْسَهُ بِدَعْوَةٍ دُونَهُمْ (কোন জনসমষ্টির ইমামতী করে দু‘আর বেলায় তাদের বাদ দিয়ে কেবল নিজের জন্য দু‘আ করবে না।)
এর অর্থের ব্যপারে দুটি সম্ভাবনা রয়েছে-
১. শুধু নিজের জন্য দু‘আ করা, মুসল্লীদের জন্য না করা।
২. মুসল্লিদের সাথে না নিয়ে শুধু একা একা দু‘আ করা।
প্রথম অর্থটি যদি গ্রহণ করি অর্থাৎ “শুধু নিজের জন্য দু‘আ করা, মুসল্লীদের জন্য না করা খিয়ানত” তাহলে সে ক্ষেত্রেও খিয়ানত থেকে বাঁচতে মুসল্লীদের জন্যও দু‘আ করতে হবে। সুতরাং ইমাম সাহেবের জন্য নামাযের পর দু‘আ করা যেহেতু এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হলো, পরোক্ষভাবে এটাও প্রমাণিত হলো যে, মুসল্লীরাও সে দু‘আয় শরীক হবে। কারণ ইমাম সাহেব যাদের জন্য দু‘আ করবেন তাদের জন্য ইমাম সাহেবের সাথে হাত তোলা বিদ‘আত, এটা মুর্খতা সুলভ কথা। আর যদি ২য় অর্থ গ্রহণ করি অর্থাৎ “মুসলীøদের সাথে না নিয়ে শুধু একা একা দু‘আ করা খিয়ানত।” তাহলে এ ক্ষেত্রে ইমাম সাহেব একা একা দু‘আ না করে বরং মুসল্লীদের সাথে নিয়ে সম্মিলিত দু‘আ করা বিদ‘আত নয়, বরং আবশ্যকীয় বিষয় প্রমাণ করবে হাদীসটি।
এক কথায় হাদীসটি যেভাবেই অর্থ করুন না কেন ফরয নামাযের পর
সম্মিলিত দু‘আ বৈধ হওয়ার একটি সুস্পষ্ট দলীল।
আবার একাকির নযীরও আমরা দেখতে পাই। যা পূর্বে আমরা উল্লেখ করেছি।
তবে দু‘আ করার ক্ষেত্রে লক্ষণীয় বিষয় হলো-
১। ফরয নামাযের পর দু‘আকে জরুরী মনে করা যাবে না।
২. দু‘আকে নামাযের অংশ মনে করা যাবে না।
৩. এ ছাড়া নামায পূর্ণ হয় না এই আকিদা রাখা যাবে না।
এর বিপরীত হলে উক্ত দু‘আ বিদ‘আত বলে বিবেচিত হবে।
কিন্তু যদি উপরোক্ত কোন কারণ পাওয়া না যায় বরং যেহেতু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফরয নামাযের পর দু‘আ করেছেন, সেই সাথে
সম্মিলিতভাবে দু‘আ করতে উৎসাহ প্রদান করেছেন, সেই সওয়াব পাবার আশায় যদি ইমাম সাহেব সম্মিলিতভাবে দু‘আ করেন, তাহলে উক্ত সম্মিলিত দু‘আকে বিদ‘আত বলার কোনো সুযোগ নেই। যদি কেউ বলে তাহলে সে হাদীসে নববী সম্পর্কে অজ্ঞ ছাড়া আর কিছু নয়।
তবে ফরয নামাযের পর অনেক সময় মাসবূক তার ছুটে যাওয়া নামায আদায় করে। তাই সে ক্ষেত্রে স্বশব্দে দু‘আ না করে নিম্নস্বরে দু‘আ করা। যাতে মাসবূকের নামাযে ব্যাঘাত না ঘটে।