বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ব পরিমণ্ডলে একই সময়ে কোথাও দিন হয় আবার কোথাও হয় রাত। কোথাও বিকেল হলে অন্য জায়গায় ঠিক একই সময়ে দেখা যাচ্ছে সন্ধ্যা। কোথাও শীত হলে অন্যস্থানে দেখা যায় গরম। তাই যেভাবে পাঁচ ওয়াক্ত নামায সারা বিশ্বের মানুষ একই সাথে পালন করতে পারে না; বরং, ভিন্ন ভিন্ন সময়ে আদায় করে থাকে, তদ্রুপ রোযা এবং ঈদও নিজ নিজ অঞ্চলে চাঁদ দেখা সাপেক্ষে পালন করে থাকে মুসলমানগণ।
বিজ্ঞানের এই যুগে পৃথিবীর যে কোনো প্রান্ত থেকে চাঁদ দেখার খবর মুহূর্তেই পাওয়া যায়। যার ফলশ্রুতিতে অনেকেই বলে থাকেন,“ভিন্ন ভিন্ন স্থানে ভিন্ন ভিন্ন দিনে চাঁদ দেখার উপর নির্ভর করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। বরং এক চাঁদ, এক রামাযান, এক ঈদ, এক উম্মাহ এই স্লোগানকে সামনে রেখে সমগ্র বিশ্বে একই দিনে রোযা এবং ঈদ পালন করার উচিত। সারা বিশ্বের মুসলমানদের মক্কার সময় অনুসরণ করা উচিত’’। পৃথিবীতে স্ট্যান্ডার্ড টাইম জোন রয়েছে প্রায় চব্বিশটি। এই জোনের ভিন্নতা সময়কে ভিন্ন করেছে। কোথাও যখন রাত বারোটা, অন্যত্র তখন দুপুর বারোটা। যেমন- আমেরিকায় (জিএমটি-৬) চাঁদ উঠেছে কিনা তা জানতে কোরিয়ার (জিএমটি+৯) মুসলমানদের অপেক্ষা করতে হবে অন্তত ১৫ ঘণ্টা। অর্থাৎ আমেরিকায় সন্ধ্যা ৬টায় উদিত হওয়া চাঁদের সংবাদ কোরিয়ার মুসলমানরা পাবে স্থানীয় সময় পরদিন দুপুর ১১টায়। এমতাবস্থায় তারা একই দিনে আরাফার রোযা ও ঈদ উদযাপনের কোনটা করবে? কীভাবে করবে? আরও পূর্বের দেশ নিউজিল্যান্ডের সাথে আমেরিকার সর্ব পশ্চিমে তথা আলাস্কার সময়ের পার্থক্য প্রায় ২৪ ঘণ্টা। তাহলে আমেরিকার চাঁদ ওঠার খবর নিউজিল্যান্ডবাসী পাবে পরদিন রাতে। তাহলে তাদের উপায় কী হবে? এমনকি বাংলাদেশেও আমেরিকার চাঁদ ওঠার সংবাদ জানতে অপেক্ষা করতে হবে পরদিন ভোর ৬টা পর্যন্ত। সেক্ষেত্রে, তারা আরাফার রোযা সৌদির নয় তারিখে পালন করতে পারবে না। রমাযান হলে তারাবীহ্ও পাবে না। সৌদি আরবের চাঁদ দেখার খবর ফিজির মানুষেরা পাবে তাদের সকালে। এমতাবস্থায় সৌদির সাথে রোযা বা ঈদ করবে কীভাবে? অতএব, স্ট্যান্ডার্ড টাইম জোনকে ভিত্তি করে পৃথিবীকে যে অঞ্চল ভিত্তিক ভাগ করা হয়েছে, সেই হিসেবকে সামনে রেখে স্থানীয় ‘চাঁদ দেখা কমিটি’র সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে রোযা এবং ঈদ সহ আরবী তারীখ গণনা করা উচিত। রোযা ও ঈদ ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দুই ইবাদাত। সমগ্র বিশ্বের মুসলমান এই দুই ইবাদত গুরুত্ব সহকারেই পালন করে থাকে। স্বাভাবিকভাবেই এই দুই ইবাদত সমগ্র বিশ্বে একই সাথে পালিত হয় না। কোথাও একদিন আগে পালন হয়, কোথাও পালন হয় এক দিন পরে। তবে কেউ কেউ প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়, কেন এই অমিল, সমগ্র বিশ্বের সব দেশের মুসলমান কেন এক সাথে এই দুই ইবাদাত পালন করতে পারে না?
“একই দিনে রোযা, ঈদ” শুধু ভিন্ন দেশে নয়, এক দেশেই সমস্যা ঘটাতে পারে। যেমন: বাংলাদেশের চট্টগ্রামে সাহ্রীর ৫ মিনিট পূর্বে খবর এলো, আমেরিকায় চাঁদ উঠেছে। এমতাবস্থায় চট্টগ্রামবাসী কোনোক্রমে হয়তো সাহ্রী সম্পন্ন করল, কিন্তু রাজশাহীবাসী যাদের ব্যবধান চট্টগ্রাম থেকে ১৩ মিনিট তারা কী করবে? একই দেশে অবস্থান করেও তারা রোযা রাখতে পারবে না। প্রকৃতপক্ষে একই চাঁদে রোযা ও ঈদের প্রস্তাব যতই চটুল ও শ্রুতিমধুর শোনাক না কেন, বাস্তবতা হলো, একই দিনে সমগ্র বিশ্বে রোযা কিংবা ঈদ করতে চাইলেও অসম্ভব। অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে।
সম্প্রতি কিছু লোক এ বিষয় নিয়ে বেশ বাড়াবাড়ি করছে। আমাদের দেশের কিছু এলাকায় সৌদি আরবকে মডেল বানিয়ে সৌদি আরবের সাথে মিলিয়ে রোযা ও ঈদ পালনও শুরু হয়েছে। এ ব্যাপারে তাদের বক্তব্য হলো, ‘হানাফী মাযহাবেই সারা বিশ্বে একই দিনে রোযা ও ঈদ পালন করতে বলা হয়েছে’। অথচ কুরআন-সুন্নাহ্, ইজমা ও হানাফী মাযহাবের আলোকে এ কথা প্রমাণিত যে, সারা বিশ্বে একদিনে রোযা ও ঈদ শুরু করা শরী‘আতের চাহিদা নয় । বরং প্রত্যেক দূরবর্তী এলাকার লোকজন নিজের এলাকার চাঁদ দেখা অনুযায়ী রোযা ও ঈদ শুরু করাই শরী‘আতের হুকুম। নিম্নে এ ব্যাপারে কুরআন, সুন্নাহ্, ইজমা ও ফিক্বহে হানাফীর উদ্ধৃতি তুলে ধরা হলো যাতে বিভ্রান্তির নিরসন হয় এবং সত্যপ্রেমিরা পথ খুঁজে পায়।
এ ব্যাপারে আল কুরআনের ভাষ্য: فمن شهد منكم الشهر فليصمه ‘সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তিই রমযান মাস পাবে সে যেন এ সময় অবশ্যই রোযা রাখে।’ (সূরা বাক্বারা: ১৮৫)
এ আয়াত দ্বারা বুঝা যাচ্ছে, যে অঞ্চলের লোকেরা যখন চাঁদ দেখবে তখন তারা রোযা শুরু করবে। এখানে সারা বিশ্বে একই দিনে রোযা শুরু করতে বলা হয়নি।
সূরা বাক্বারার ১৮৯ নং আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে: يسئلونك عن الاهلة ‘লোকেরা আপনার কাছে নতুন মাসের চাঁদসমূহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে…’ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা ইবনে কাসীর আবূল আলিয়া থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন আমার কাছে সংবাদ পৌঁছেছে, সাহাবায়ে কেরাম নবীজী সা: কে জিজ্ঞাসা করেছেন, হে আল্লাহর রাসূল! নতুন চাঁদের রহস্য কী? তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। তিনি বলেন, আল্লাহ্ তা‘আলা রোযা শুরু করা ও রোযা খতম করার সময় নির্ধারক হিসেবে নতুন চাঁদ সৃষ্টি করেছেন। (তাফসীরে ইবনে কাসীর : ১/৪৮৮)
এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো এই আয়াতে চাঁদ বুঝানোর জন্য هلال শব্দের বহুবচন الاهلة শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। যার অর্থ নতুন চাঁদসমূহ। এখানে বহুবচন ব্যবহার করাই হয়েছে এ কথা বুঝানোর জন্য যে, মাতলা’ বা উদয়স্থলের ভিন্নতার ভিত্তিতে রোযা ফরয হওয়ার বিধান জারী হবে। অর্থাৎ ভিন্ন ভিন্ন হেলাল তথা নতুন চাঁদের ভিত্তিতে ভিন্নভিন্ন উদয়স্থলের লোকদের উপর রোযা ফরয হবে। আর কুরআনের যেখানে শব্দের মধ্যে ব্যাপকতা থাকে সেখানে আয়াতের বিধান শুধুমাত্র শানে নুযূল তথা অবতীর্ণের উৎস মূলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। (বিস্তারিত জানতে দেখুন মাবাহেস ফী উলূমিল কুরআন: পৃ.৭৮, শায়েখ মান্না কাত্তা)
এ ব্যাপারে সুন্নাহর ভাষ্য:
১. হযরত আবূ হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবীজী সা: বলেছেন, ‘তোমরা চাঁদ দেখে রোযা শুরু কর, আবার চাঁদ দেখে ইফতার (ঈদুল ফিতর) করো, যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকে তাহলে শা‘বান মাস ত্রিশদিন পূর্ণ করো।’ (সহীহ বুখারী: ১০৯০, মুসলিম: ২৫৬৭)
এই হাদীস দ্বারা শুধু এতটুকু বুঝে আসে যে, চাঁদ দেখে রোযা রাখতে হবে, আবার চাঁদ দেখেই রোযা ছাড়তে হবে। কাছের এলাকা বা শহর থেকে যদি চাঁদ দেখার সংবাদ আসে তা গ্রহণ করা যাবে কিনা- এ ব্যাপারে এই হাদীসে কোনো নির্দেশনা নেই। কিন্তু অপর এক হাদীস দ্বারা বুঝা যায় যদি নিকটবর্তী কোনো এলাকা থেকে চাঁদ দেখার সংবাদ আসে তাহলে নিজেরা চাঁদ না দেখলেও তা গ্রহণ করা হবে।
যেমন, হযরত ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, গ্রামে বসবাসকারী জনৈক ব্যক্তি নবীজী সা: এর নিকট এসে বললেন, আমি গত রাতে রমযানের নতুন চাঁদ দেখেছি। নবীজী সা: তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি সাক্ষ্যপ্রদান কর যে, আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া সত্যিকার কোনো ইলাহ্ নেই। লোকটি বলল, হ্যাঁ। রাসূল সা: জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি সাক্ষ্য প্রদান কর যে, আমি আল্লাহর রাসূল? লোকটি উত্তর দিল, হ্যাঁ। অতঃপর নবীজী সা: বেলাল রাযি. কে লক্ষ্য করে বললেন, হে বেলাল! তুমি লোকদেরকে জানিয়ে দাও, তারা যেন আগামী দিন থেকে রোযা রাখা শুরু করে। (আবূ দাঊদ: ৬৯১, নাসায়ী: ২১১২)
বর্ণিত হাদীসে আগত ব্যক্তি শহরের বাহির থেকে এসে চাঁদের সাক্ষ্য প্রদান করেছেন, রাসূলুল্লাহ সা: তা গ্রহণও করেছেন। এর দ্বারা এ কথা স্পষ্ট বুঝে আসে যে, নিজেরা চাঁদ না দেখলেও কাছের এলাকার বা শহরের কারো দ্বারা চাঁদ দেখা প্রমাণিত হলে রোযা রাখা ফরয হয়ে যাবে। কিন্তু দূরবর্তী এলাকার চাঁদ দেখার সংবাদ এলে বা সেখানের আমীর কর্তৃক চাঁদ দেখা প্রমাণিত হওয়ার ব্যাপারে ফয়সালার খবর এলে তা গ্রহণ করা হবে কিনা-সে ব্যাপারে অপর একটি হাদীসে নির্দেশনা পাওয়া যায়।
ঐ যুগের সাধারণ অবস্থা অনুসারে দূর-দূরান্তের অঞ্চল থেকে চাঁদের খবর পাওয়ার কথা চিন্তাই করা যেত না। কিন্তু কুদরতের কারিশমা, সাহাবাযুগে ঘটনাচক্রে সংঘটিত এমন একটি ঘটনা হাদীসের কিতাবে সংরক্ষিত হয়ে গেছে। সহীহ মুসলিম ও মুসনাদে আহ্মদসহ হাদীসের অনেক কিতাবে তা সহীহ সনদে বর্ণিত হয়েছে। এ ঘটনায় দেখা যাচ্ছে, শামে চাঁদ দেখার সংবাদ মদীনাবাসী জানতে পেরেছেন। শাম (দামেশক) মদীনা থেকে স্থলপথে ১৯২৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। আর দামেশক ৩৩ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশে, ৩৬ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে এবং মদীনা ২৪ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশে, ৩৯ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত।
ঘটনাটি এই, عن كريب أن أم الفضل بنت الحارث، بعثته إلى معاوية بالشام قال: فقدمت الشام، فقضيت حاجتها، واستهل علي هلال رمضان وأنا بالشام، فرأينا الهلال ليلة الجمعة، ثم قدمت المدينة في آخر الشهر، فسألني ابن عباس، ثم ذكر الهلال، فقال: متى رأيتم الهلال، فقلت رأيناه ليلة الجمعة، فقال: أأنت رأيته ليلة الجمعة؟ فقلت: رآه الناس، وصاموا، وصام معاوية، قال: لكنا رأيناه ليلة السبت فلا نزال نصوم حتى نكمل ثلاثين يوما أو نراه فقلت: ألا تكتفي برؤية معاوية وصيامه، قال لا، هكذا أمرنا رسول الله صلى الله عليه وسلم ـ
অর্থাৎ, তাবে‘ঈ কুরাইব ইবনে আবী মুসলিম (মৃ.৯৮ হি.) কে উম্মুল ফযল বিনতে হারিছ কোনো কাজে মু‘আবিয়া রা. এর কাছে শামে পাঠিয়েছিলেন। তিনি তাঁর কাজ সমাপ্ত করলেন। ইতিমধ্যে শামে জুমু‘আর রাতে (বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে) রমযানের চাঁদ দেখা গেল এবং জুমু‘আবার থেকে রোযা শুরু হল। কুরাইব মাসের শেষের দিকে মদীনায় পৌঁছলেন। হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস রা.- যিনি ছিলেন কুরাইবের মাওলা- কথা প্রসঙ্গে কুরাইবকে জিজ্ঞাসা করলেন,
‘তোমরা কবে চাঁদ দেখেছ?’ কুরাইব বললেন, ‘জুম‘আরাতে।’ ইবনে আব্বাস রা. জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি নিজে দেখেছ?’ তিনি বললেন, ‘হাঁ, আমিও দেখেছি, অন্যরাও দেখেছেন। সবাই রোযা রেখেছেন। মু‘আবিয়া রা.ও (ঐ সময়ের আমীরুল মুমিনীন) রোযা রেখেছেন।’ আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বললেন, لكنا رأيناه ليلة السبت، فلا نزال نصوم حتى نكمل ثلاثين، أو نراه
‘কিন্তু আমরা তো শনিবার রাতে (শুক্রবার দিবাগত রাতে) চাঁদ দেখেছি। অতএব, আমরা আমাদের হিসাব অনুযায়ী ত্রিশ রোযা পুরা করব, তবে যদি (২৯ তারীখ দিবাগত রাতে) চাঁদ দেখি সেটা আলাদা কথা।’
কুরাইব জিজ্ঞাসা করলেন- أولا تكتفي برؤية معاوية وصيامه
‘আপনি কি মু‘আবিয়া রা.-এর চাঁদ দেখা ও রোযা রাখাকে যথেষ্ট মনে করবেন না?’ আব্দুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস রা. বললেন- لا، هكذا أمرنا رسول الله صلى الله عليه وسلم ‘না, আল্লাহর রাসূল সা: আমাদেরকে এ আদেশই করেছেন।’
(সহীহ মুসলিম ১০৮৭; মুসনাদে আহ্মদ, হাদীস : ২৭৮৯; জামে তিরমিযী, হাদীস : ২৩৩২; সুনানে আবূ দাউদ, হাদীস : ৬৯৩; সুনানে নাসায়ী, হাদীস : ২১১১)
এ ঘটনা সম্পূর্ণ পরিষ্কার। কুরাইব একজন তাবে‘ঈ ও ছিক্বাহ (বিশ্বস্ত, নির্ভরযোগ্য) ব্যক্তি এবং আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-এর অতি ঘনিষ্ঠ। আর আব্দুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস রা.-এর মতানুযায়ী রমযান সম্পর্কে এক ব্যক্তির সংবাদই যথেষ্ট। তিনি নিজেই হাদীস বর্ণনা করেছেন (যা উপরে বর্ণিত হয়েছে) যে, রমযানের চাঁদের বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সা: এক বেদুঈনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেছেন। আর কুরাইব শুধু নিজের চাঁদ দেখার সংবাদ দেননি, আমীরুল মুমিনীনের নিকট চাঁদ দেখা প্রমাণিত হওয়া ও তা কার্যকর হওয়ার সংবাদ দিয়েছেন।
যাই হোক, এ সংবাদের উপর নির্ভর করে এই ফয়সালা করা যে, “রমাযান মূলত জুম‘আবারেই শুরু হয়েছে। আমরা চাঁদ দেখিনি এবং যথাসময়ে অন্য জায়গার চাঁদ দেখার সংবাদও পাইনি। এ কারণে আমাদের একটি রোযা কাযা হয়ে গেছে।” কুরাইবের সংবাদের ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বাধা ছিল না। ইবনে আব্বাস রা. কে যদি দূরবর্তী অঞ্চলের এই চাঁদ দেখা গ্রহণ করতে হত তাহলে মাসআলার দিক থেকে তা গ্রহণের ক্ষেত্রে অন্য কোনো বাধা ছিল না। কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করেননি; বরং বলেছেন- هكذا أمرنا رسول الله صلى الله عليه وسلم
‘আল্লাহর রাসূল সা: আমাদেরকে এমনই আদেশ করেছেন।’ এখন এটা আলাদা বিষয় যে, আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-এর কাছে এ বিষয়ে (দূরবর্তী অঞ্চলের চাঁদ দেখা ধর্তব্য হওয়া না হওয়া) আল্লাহর রাসূল সা: -এর কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশ ও নির্দেশনা ছিল? না তিনি এর দ্বারা আল্লাহর রাসূল সা: -এর ঐ বাণীর দিকেই ইঙ্গিত করেছেন, যা তাঁর মতো আরো অনেক সাহাবী বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ যে বাণীতে (তোমরা চাঁদ দেখে রোযা রাখ এবং চাঁদ দেখে রোযা ছাড়) এর নির্দেশ রয়েছে।
আব্দুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস রা. বলেন: إني لأعجب من هؤلاء الذين يصومون قبل رمضان، إنما قال رسول الله صلى الله عليه وسلم إذا رأيتم الهلال فصوموا وإذا رأيتموه فأفطروا، فإن غُمَّ عليكم فعُدُّوا ثلاثين
ঐ সকল লোকের উপর আমি আশ্চর্য বোধ করি, যারা রমযান আসার আগেই রোযা রাখতে শুরু করে। আল্লাহর রাসূল সা: তো বলেছেন, যখন তোমরা চাঁদ দেখবে তখন রোযা রাখবে এবং যখন (দ্বিতীয়) চাঁদ দেখবে তখন রোযা ছাড়বে। চাঁদ যদি আড়ালে থাকে তাহলে ত্রিশ সংখ্যা পূর্ণ করবে। (আসসুনানুল কুবরা, বাইহাকী ৪/২০৭)
আব্দুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস রা. এটাও বর্ণনা করেছেন- قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : لا تقدموا الشهر بصيام يوم ولا يومين، إلا أن يكون شيئا يصومه أحدكم، ولا تصوموا حتى تروه، ثم صوموا حتى تروه، فإن حال دونه غمامة فأتموا العدة ثلاثين
তোমরা একটি বা দু‘টি রোযার দ্বারা (রমযান) মাসের চেয়ে অগ্রগামী হয়ো না। তবে যদি তোমাদের কারো (অভ্যাসগত নফল) রোযার দিবস হয়, যা সে আগে থেকে রেখে আসছে, তাহলে আলাদা কথা। আর তোমরা চাঁদ দেখার আগে রোযা রাখবে না এবং (দ্বিতীয়) চাঁদ দেখা পর্যন্তই রোযা রাখবে। যদি মেঘের কারণে চাঁদ দেখা না যায় তাহলে ত্রিশ সংখ্যা পূর্ণ করবে। (আসসুনানুল কুবরা, বাইহাকী ৪/২০৭)
আব্দুুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস রা.-এর কাছে যদি এ বিষয়ে (দূরবর্তী অঞ্চলের চাঁদ দেখা অবশ্যগ্রহণীয় না হওয়ার বিষয়ে) কোনো সুস্পষ্ট বাণী নাও থেকে থাকে এবং তিনি ‘রাসূলের আদেশ’ বলে উপরোক্ত হাদীসের প্রতিই ইঙ্গিত করে থাকেন, তবুও তো এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, তিনি صوموا لرؤيته وأفطروا لرؤيته (তোমরা চাঁদ দেখে রোযা রাখ চাঁদ দেখে রোযা ছাড়) শীর্ষক হাদীসের এই অর্থই বুঝেছেন যে, এ হাদীসে নিজ এলাকা ও নিকটবর্তী এলাকার চাঁদ দেখা উদ্দেশ্য। দূরবর্তী এলাকার চাঁদ দেখা উদ্দেশ্য নয়।
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-এর এ অনুধাবনের সাথে কোনো মুজতাহিদ ইমামের যদি দ্বিমত থাকে তবে থাকতে পারে, কিন্তু এর দ্বারা দুটি বিষয় সুস্পষ্টভাবে সামনে আসে: এক. صوموا لرؤيته শীর্ষক হাদীসের এ ব্যাখ্যাই নির্ধারিত নয় যে, ‘যেখানেই চাঁদ দেখা যাক তোমরা রোযা শুরু কর, দূরবর্তী অঞ্চলের চাঁদ দেখাও তোমাদের জন্য অবশ্যগ্রহণীয়।’ কারণ, আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. একজন ফকীহ সাহাবী এবং তিনি নিজে ঐ হাদীস আল্লাহর রাসূল সা: থেকে শুনেছেন, কিন্তু তিনি এর ঐ অর্থ বোঝেননি।
দুই. আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-এর মাযহাব এই ছিল যে, দূরবর্তী এলাকার চাঁদ দেখা অবশ্যগ্রহণীয় নয়; নিজ এলাকার চাঁদ দেখাই আমলযোগ্য। এর বিপরীতে অন্য কোনো সাহাবা থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সারকথা, সাহাবা-যুগে দূরবর্তী অঞ্চলের চাঁদ দেখা ‘অবশ্যগ্রহণীয়’ না হওয়ার বিষয়ে এক বড় ফকীহ্ সাহাবী আব্দুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস রা.-এর মাযহাব পাওয়া গেল। মুয়াত্তার শরাহ্ (ভাষ্যগ্রন্থ) ‘আলইসতিযকারে’ ঐ তাবেঈগণের মাযহাব উল্লেখ করেছেন।
وبه قال عكرمة، والقاسم بن محمد، وسالم بن عبد الله، وإليه ذهب ابن المبارك، وإسحاق بن راهوية، وطائفة
‘‘এটিই ইকরিমা, কাসিম ইবনে মুহাম্মাদ ও সালিম ইবনে আব্দুল্লাহর বক্তব্য। ইবনুল মুবারক ও ইসহাক ইবনে রাহ্ওয়াইসহ একটি জামা‘আতের মাযহাবও এটিই।’’ (আলইসতিযকার ১০/২৯)
আমাদের জানা মতে তাবেঈ যুগের এই তিন বিশিষ্ট মনীষীর বিপরীতে অন্য কোনো তাবেঈর ফতোয়া বিদ্যমান নেই। শুধু হাসান বসরী (২১ হি.-১১০ হি.) রহ. থেকে এমন একটি রেওয়ায়েত পাওয়া যায়, যা এই মাযহাবের বিপরীত ধারণা করা হতে পারে।
সারকথা: এ পর্যন্ত আলোচনার সারসংক্ষেপ এই যে, দূর-দূরান্তের অঞ্চলের চাঁদ দেখা ওয়াজিবুল আমল (অবশ্যগ্রহণীয়) না হওয়ার বিষয়ে সাহাবাযুগে আব্দুল্লাহ্্ ইবনে আব্বাস রা.-এর মাযহাব পাওয়া গেল, এর বিপরীত কিছু কারো থেকে পাওয়া যায়নি। তাবে‘ঈযুগে তিন বড় মনীষী ইকরিমা রহ., কাসিম রহ. ও সালিম রহ. থেকেও এই মাযহাবই পাওয়া গেল। এর বিপরীত বিবরণ শুধু এক হাসান বসরী রহ. থেকে পাওয়া যায় যদি তাঁর ফতোয়াকে শব্দের ব্যাপকতার উপর রাখা হয়। নতুবা শক্তিশালী সম্ভাবনা আছে, তাঁর উদ্দেশ্য নিকটবর্তী কোনো শহরে চাঁদ দেখা ও রোযা রাখা প্রমাণিত হলে কাযা আসবে, অন্যথায় নয়।
উম্মতের ইজমা: দূরবর্তী এলাকার চাঁদ দেখা গ্রহণযোগ্য না হওয়ার ব্যাপারে ইজমা তথা মুসলিম উম্মাহর ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
ইমাম আবূ বকর আল-জাসসাস আহকামুল কুরআনে লিখেন: ‘আর এ ব্যাপারে সকলেই ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে, দূরবর্তী অঞ্চলের প্রত্যেক শহরের জন্য তাদের চাঁদ দেখা ধর্তব্য হবে অন্যের দেখার অপেক্ষা করা ছাড়াই।’ (আহকামুল কুরআন:১/৩০৫)
ইমাম জাসসাস রহ. এখানে ইজমার কথা উল্লেখ করেছেন যে, দূরবর্তী অঞ্চলের জন্য তাদের নিজেদের চাঁদ দেখা ধর্তব্য। যদিও এর ব্যাখ্যায় তিনি ভিন্ন ক্ষেত্রের কথা বলেছেন। কিন্তু মূল বিষয়টির ব্যাপারে ইজমার স্বীকারোক্তি দিয়েছেন।
ইমাম ইবনে আব্দুল বার রহ. মুআত্তা মালেকের ভাষ্য গ্রন্থ ‘আল ইসতিযকার’-এ লিখেছেন: ‘এ ব্যাপারে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, দূরবর্তী শহর যেমন খোরাসান থেকে স্পেন, এমন ক্ষেত্রে এক স্থানের চাঁদ দেখা অন্য স্থানের জন্য গ্রহণযোগ্য হবে না। তদ্রুপ প্রত্যেক শহরবাসীর জন্য তাদের চাঁদ দেখা ধর্তব্য, তবে বড় শহর হলে বা চাঁদের উদয়স্থল কাছাকাছি হলে এমন শহরের কথা ভিন্ন। অর্থাৎ সেক্ষেত্রে পার্শ্ববর্তী এলাকার চাঁদ দেখা ধর্তব্য হবে। (ইসতিযকার:৩/২৮৩)
ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. ইমাম ইবনে আব্দুল বারের পূর্বোক্ত ইজমার কথা উল্লেখ করে দ্বিমত পোষণ করেননি। তিনি লিখেছেন: ‘ ইবনে আব্দুল বার উল্লেখ করেছেন, এক এলাকার চাঁদ দেখা অন্য এলাকার জন্য গ্রহণযোগ্য হবে কিনা? এই মতানৈক্য ঐ সব এলাকার ক্ষেত্রে যেসব এলাকার চাঁদের উদয়স্থল এক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আর যেসব এলাকা দূরবর্তী যেমন, খোরাসান ও স্পেন এসব এলাকার ক্ষেত্রে এ ব্যাপারে কোনো মতানৈক্য নেই যে, এমন দূরবর্তী এক এলাকার চাঁদ দেখা অন্য এলাকার জন্য ধর্তব্য নয়।’ এ কথা উল্লেখ করার কিছু পরেই তিনি এ ব্যাপারে ইমাম আহ্মাদ বিন হাম্বলের মাযহাব বর্ণনা করে লিখেছেন: ‘দূরবর্তী অঞ্চলের চাঁদ দেখা ধর্তব্য না হওয়ার যে ইজমা ইবনে আব্দুল বার বর্ণনা করেছেন তা ইমাম আহমাদ রহ. এর দলীলের খেলাফ নয়।’ (মাজমূ’আতুল ফাতাওয়া : ২৫/১০৩, ১৩/৬২)
হাফেয ইবনে হাজার রহ. ফাতহুল বারীতে লিখেছেন: ‘ইবনে আব্দুল বার রহ. দূরবর্তী এক এলাকার চাঁদ দেখা অন্য এলাকার জন্য গ্রহণযোগ্য হবে না মর্মে ইজমা নকল করেছেন। তিনি বলেছেন, উলামায়ে উম্মত এ ব্যাপারে একমত পোষণ করেছেন যে, দূরবর্তী এক এলাকার চাঁদ দেখা অন্য এলাকার জন্য যথেষ্ট নয়।’ (ফাতহুল বারী: ৪/১৫৫)
ইমাম ইবনে রুশদ ‘বিদায়াতুল মুজতাহিদ’ কিতাবে লিখেছেন: ‘এ ব্যাপারে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, দূর দেশের ক্ষেত্রে এক স্থানের চাঁদ দেখা অন্য স্থানের জন্য ধর্তব্য হবে না। যেমন: স্পেন ও হেজায।’ (বিদায়াতুল মুজতাহিদ নিহায়াতুল মুকতাসিদ:২/৫০)
আল্লামা ইউসুফ বান্নূরী মা‘আরেফুস সুনানে লিখেছেন: ‘শাইখ আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী রহ. বলেন, ইমাম যায়লা‘ঈর কথার উপর আমার সিদ্ধান্ত স্থির ছিল। পরে কাওয়ায়েদে ইবনে রুশদ কিতাবে এ ব্যাপারে ইজমার বর্ণনা পেয়েছি যে, দূরবর্তী স্থান হলে উদয়স্থলের বিভিন্নতা ধর্তব্য হবে। আর কতটুকু দূরকে দূর বলে ধরা হবে তা অবস্থার শিকার ব্যক্তি সিদ্ধান্ত নিবে, তার নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারিত নেই।’ (মা’আরিফুস সুনান: ৫/৩৪০)
তবে এ ব্যাপারে গ্রহণযোগ্য মত হলো, যে দুই দেশে বা এলাকার চাঁদ দেখার তারীখ সব সময় একই হয় সে দুই দেশকে নিকটবর্তী এলাকা হিসেবে গণ্য করা হবে। যে সব এলাকার মধ্যে চাঁদ দেখার ব্যাপারে সাধারণত একদিন বা ততোধিক দিনের পার্থক্য থাকে সেসব এলাকাকে দূরবর্তী শহর বা এলাকা গণ্য করা হবে। (ফাতহুল মুলহিম: ৩/১১৩, কিতাবুল মাজমূ : ৬/১৮৩)
আরব বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্যায়ের আলেম ড. ওয়াহবা আযযুহায়লী ‘আল ফিকহুল ইসলামী ওয়া আদিল্লাতুহু’তেও ইবনে রুশদের অনুরূপ ইজমা নকল করেছেন। (আল ফিকহুল ইসলামী : ৩/১৬৫৮)
পূর্বের আলোচনা থেকে এ কথা স্পষ্ট হলো যে, দূরবর্তী অঞ্চলের চাঁদ দেখা অন্য অঞ্চলের জন্য প্রযোজ্য নয়, এ ব্যাপারে মুসলিম উম্মাহর ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সুতরাং ইজমার কথা যখন বর্ণনা হয়েছে এবং ইবনে তাইমিয়া, ইবনে হাজার ও ইমাম কাশ্মীরীর মত বিদগ্ধ উলামায়ে কেরামও ঐ ইজমাকে অস্বীকার করেননি; বরং ইবনে তাইমিয়া তো বিভিন্ন স্থানে বারবার এ কথা বলেছেন যে, এটা ইবনে আব্দুল বারের বর্ণনা করা ইজমার খেলাফ না। সুতরাং বর্ণিত ইজমাকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। তাছাড়া, প্রথম যুগের ইমামদের থেকে বর্ণিত মতামত হয়তো একাধিক রয়েছে অথবা মুজমাল (ব্যাখ্যা সাপেক্ষ)। সুতরাং সে মতের কারণে ইজমার উপর কোনো প্রভাব পড়বে না। (মাআরেফুস সুনান:৫/৩৪৩) যদিও মাসআলাটি মূলত মুজতাহাদ ফীহ্ তথা কিতাব ও সুন্নাহ থেকে উদ্ভাবনকৃত হওয়ায় পরবর্তী উলামায়ে কেরাম মতানৈক্য ও ভিন্নভিন্ন ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছেন। নিচে প্রতিটি মাযহাবের গ্রহণযোগ্য বক্তব্য তুলে ধরা হচ্ছে।
হানাফী মাযহাব: উদয়স্থলের বিভিন্নতার সূরতে চাঁদ প্রমাণিত হওয়া না হওয়ার ব্যাপারে আসহাবে মাযহাব অর্থাৎ ইমাম আবূ হানিফা, আবূ ইউসুফ ও মুহাম্মাদ রহ. থেকে কোনো মতামত পাওয়া যায় না। আর পরবর্তীদের মধ্যে দুই ধরনের মতামত পাওয়া যায়:
ক. ইখতিলাফে মাতালে’ গ্রহণযোগ্য। অর্থাৎ চন্দ্রের উদয়স্থলের পার্থক্য ধর্তব্য হবে। সুতরাং এক দূরবর্তী দেশের চাঁদ দেখা অন্য দূরবর্তী দেশের জন্য গ্রহণযোগ্য হবে না।
হ্যাঁ, নিকটবর্তী দেশ হলে এক দেশের চাঁদ দেখা অন্য দেশের জন্য গ্রহণযোগ্য হবে।

খ. ইখতিলাফে মাতালে’ গ্রহণযোগ্য নয়। অর্থাৎ চন্দ্রের উদয়স্থলের পার্থক্য ধর্তব্য নয়। সুতরাং এক অঞ্চলে চাঁদ দেখা গেলে অন্য অঞ্চলের জন্য তা গ্রহণযোগ্য হবে। এ মতটির প্রয়োগস্থল নিকটবর্তী এলাকা না দূরবর্তী এলাকা তা অস্পষ্ট এবং ব্যাখ্যাহীন।
দ্বিতীয় মতের আলোচনা ও তার ব্যাখ্যা পরে উল্লেখ করা হবে, প্রথমে ১ম মতের স্বপক্ষে যেসব হানাফী উলামায়ে কেরাম মতামত ব্যক্ত করেছেন তাঁদের নাম ও কিতাবের হাওয়ালা নিম্নে উল্লেখ করা হলো:
১. ইমাম হুসামুদ্দীন শহীদ ‘আলফাতাওয়াল কুবরা’ (পৃ. ১৬)
২. ফকীহ আবূল ফাতাহ যহীরুদ্দীন আল ওয়ালওয়ালেজী ‘আল ফাতাওয়া আলওয়ালওয়ালিজিয়্যাহ (১/২৩৬)
৩. আল্লামা কাসানী ‘বাদায়ে‘উস সানায়ে’ (২/৫৭৯)
৪. আল্লামা আইনী ‘শরহুল আইনি আলা কানযিদ্দাক্বায়েক্ব’ (১/১৩৮)
৫. ইমাম মুহাম্মাদ বিন আব্দুর রশীদ কিরমানী ‘জাওয়াহেরুল ফাতাওয়া’ (১/৩২ : ৩৩)
৬. মোল্লা আলী ক্বারী ‘ফাতহু বাবিল ইনায়া’ (১/৫৬৫)
৭. ফক্বীহ্ আব্দুর রহমান ইবনে মুহাম্মাদ শায়খী যাদা ‘মাজমা‘উল আনহুর’ (১/৩৫৩)
৮. ইমাম আব্দুল হাই লাখনাবী ‘মাজমূ‘আতুল ফাতাওয়া’-এর রুয়াতুল হেলাল অধ্যায় (উর্দূ ১/৩৪৪)
৯. ফকীহ আলী ইবনে উসমান ‘আল ফাতাওয়াস সিরাজিয়্যাহ’ (৩১পৃ)
১০. ইমাম ফখরুদ্দীন যাইলা‘ঈ ‘তাবয়ীনুল হাক্বায়েক্ব’ (২/১৬৪)
১১. আল্লামা শাব্বির আহ্মাদ উসমানী ‘ফাতহুল মুলহিম’ (৩/১১৩)
১২. মুফতী শফী রহ. ‘জাওয়াহেরুল ফিক্বহ্’ (৩/৪৩৯)
১৩. মক্কা-মদীনার উলামায়ে কেরামের ফাতাওয়াও অনুরূপ। (ফাতাওয়া উলামা‘ইল বালাদিল হারাম পৃ.৮৮৭)
১৪.‘মাজালিসে তাহক্বীক্বাতে শর‘ইয়্যাহ নদওয়াতুল উলামা’-এর সিদ্ধান্তও অনুরূপ। (নাফায়িসুল ফিক্বহ্: ৩/১৪১)
আল্লামা ইবনুল হুমাম পূর্বে উল্লেখিত কুরাইব রহ. থেকে বর্ণিত হাদীসটি উল্লেখ করার পর বলেন: ‘এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, এ হাদীসের অনুসরণ অধিকতর শ্রেয়। কারণ, দূরবর্তী অঞ্চলের চাঁদ দেখা গ্রহণযোগ্য কিনা এ ব্যাপারে এ হাদীসটি সুস্পষ্ট বর্ণনা। তাছাড়া এ সম্ভাবনাও রয়েছে যে, প্রত্যেক অঞ্চলের লোকদেরকে তাদের নিজেদের চাঁদ দেখা সাপেক্ষে রোযা রাখার আদেশ করা হয়েছে। (ফাতহুল ক্বদীর: ২/৩১৯)
আল্লামা কাসানী রহ. লিখেছেন: (এক শহরবাসী চাঁদ দেখে ত্রিশ রোযা পুরা করার সূরতে অপর শরহবাসী উনত্রিশ রোযা রাখলে একটি রোযা কাযা করবে।) ‘এটা সে ক্ষেত্রে যখন দুই শহর কাছাকাছি হয়, উদয়স্থলের পার্থক্য না হয়। আর যদি অপর শহর দূরে হয়, তাহলে এক শহরবাসীর জন্য অন্য শহরের হুকুম আবশ্যক হবে না। কারণ, শহর বা অঞ্চলের মাঝে অনেক দূরত্ব হলে উদয়স্থলও ভিন্ন ভিন্ন হয়ে যায়। সুতরাং এমন ক্ষেত্রে প্রত্যেক শহরবাসীর জন্য তাদের উদয়স্থলই ধর্তব্য হবে; অন্যদেরটা নয়। (বাদায়ে‘উস সানায়ে: ২/৫৭৯)
আল্লামা ফখরুদ্দীন যায়লা‘ঈ লিখেছেন: ‘দলীল প্রমাণের বিচারে সর্বাধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ মত হলো উদয়স্থলের বিভিন্নতা ধর্তব্য হওয়া। কারণ, প্রত্যেক এলাকাবাসী তাদের অবস্থা হিসাবে সম্বোধিত বা দায়িত্ব প্রাপ্ত।’ (তাবয়ীনুল হাক্বায়েক্ব: ২/১৬৪)
মোল্লা আলী কারী রহ. লিখেছেন: ‘দলীল প্রমাণের বিচারে সর্বাধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ মত হলো উদয়স্থলের বিভিন্নতা ধর্তব্য হওয়া।’ (ফাতহু বাবিল ইনায়াহ: ১/৫৬৭)
‘ফাতাওয়া উলামায়ে বালাদে হারাম’ গ্রন্থে উদয়স্থলের বিভিন্নতা গ্রহণ করা হবে মতটি উল্লেখ করার পর বলা হয়েছে: ‘আর এই মতটিই শব্দ ও সঠিক গবেষণার বিচারে শক্তিশালী’। (ফাতাওয়া উলামাইল বালাদিল হারাম পৃ.৮৮৯)
আবূল ফাতাহ ওয়ালওয়ালেজী লিখেছেন : ‘দুই দেশের উদয়স্থল যদি ভিন্ন হয়, তাহলে এক দেশের হুকুম অন্য দেশের জন্য আবশ্যক হবে না।’ (আল ফাতাওয়াল ওয়ালওয়ালেজিয়াহ : ১/৩২৬)
দ্বিতীয় মতের বিচার বিশ্লেষণ : যেসব হানাফী উলামায়ে কেরাম দ্বিতীয় মত উল্লেখ করেছেন তাদের নাম ও কিতাবের নাম:
১. সাহেবে খুলাসাতুল ফাতাওয়া ‘খুলাসাতুল ফাতাওয়া’ (১/২৪৯)
২. আল্লামা কাযী খান ‘ফাতাওয়া কাযীখান’ (১/১৯৮)
৩. ফকীহ আলম ইবনুল আলা ‘তাতারখানিয়া’ (৩/৩৬৫)
৪. ইবনে নুজাইম ‘বাহরুর রায়েক’ (২/৪৭১)
৫. আল্লামা বায্যাযী ‘ফাতাওয়া বায্যাযিয়্যা’ (১/৮৬)
৬. উমর ইবনে ইবরাহীম ‘নাহরুল ফায়েক্ব’ (২/১৪)
৭. সাহেবে ফাতাওয়া হিন্দিয়া ‘ফাতাওয়া হিন্দিয়া’ (১/১৯৮)
৮. আশরাফ আলী থানভী রহ. ‘ইমদাদুল ফাতাওয়া’ (২/১০৭)
৯. তাছাড়া, ফাতাওয়ায়ে দারুল উলূম সহ আরো বিভিন্ন কিতাবে এ কথা বলা হয়েছে যে, উদয়স্থলের বিভিন্নতা ধর্তব্য না হওয়ার মতটিই জাওয়াহেরুর রেওয়ায়াহ্। সুতরাং এক অঞ্চলে চাঁদ দেখা গেলে অন্য অঞ্চলেও চাঁদ দেখা প্রমাণিত হবে। নিকটবর্তী অঞ্চল ও দূরবর্তী অঞ্চলের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।
উল্লেখ্য, এ ব্যাপারটি কারো কাছে অস্পষ্ট থাকার কথা নয় যে, ‘উদয়স্থলের বিভিন্নতা সত্ত্বেও এক স্থানের চাঁদ দেখা অন্য স্থানের জন্য গ্রহণযোগ্য হবে কিনা’ এ বিষয়টি মুজতাহাদ ফীহ্ এবং মুখতালাফ ফীহ্ও বটে। ‘ফাতাওয়া আল লাজনাতুদ্ দায়িমায়’ আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্লাহ বিন বায, আব্দুর রায্যাক আফীফী এবং আব্দুল্লাহ বিন মুনির স্বাক্ষরিত ফাতাওয়াতে আছে: ‘উদয়স্থলের বিভিন্নতা সত্ত্বেও এক স্থানের চাঁদ দেখা অন্য স্থানের জন্য ধর্তব্য না হওয়ার মাসআলাটি মাসায়েলে নাযরিয়্যাহ্, এতে ইজতিহাদের সুযোগ রয়েছে। আর এ মাসআলার ক্ষেত্রে মতের ভিন্নতা হয়েছে তাদের যাদের ইলম ও দ্বীনের ক্ষেত্রে আলাদা মর্যাদা রয়েছে। আর এটা ঐ সকল মাসায়েলের একটি, যাতে ইজতিহাদ সঠিক হলে দ্বিগুণ সাওয়াব, আর ভুল হলে অর্ধেক সাওয়াব।’ (প্রাগুক্ত : ১০/১০২)
সুতরাং, এ ক্ষেত্রে মুজতাহিদ ইমামদের ইজতিহাদের যেমন সুযোগ রয়েছে তেমনি পরবর্তী ফক্বীহ্দের জন্য শর্ত সাপেক্ষে কোনো একটি মত গ্রহণ করার অবকাশ রয়েছে। আর মূলত এ মাসআলাটি তারজীহ্ বা অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে আমল করার মত একটি মাসআলা। সুতরাং কোনো ‘আসহাবে তারজীহ’ যেকোনো মতকে দলীলের ভিত্তিতে তারজীহ অর্থাৎ প্রাধান্য দিতে পারেন।
শেষোক্ত উলামায়ে আহনাফের ইবারাতের বর্ণনা থেকে এ কথা প্রতীয়মান হয় যে, তাঁরা উদয়স্থলের বিভিন্নতা সত্ত্বেও এক স্থানের চাঁদ দেখা অন্য স্থানের জন্য গ্রহণযোগ্য হওয়াকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন এবং এ মতটিকে তারা জাহেরুল মাযহাব বলে দাবি করেছেন, আর জাহেরুল মাযহাব হওয়ার কারণেই এই মতটিকে তারা অন্য মতটির উপর অগ্রাধিকার দিয়েছেন। এখন দেখার বিষয় হলো, এই মতটি আসলেই জাহেরুল মাযহাব বা জাওয়াহেরুর রেওয়ায়াহ্ কিনা? বা এ কথাগুলোকে জাওয়াহেরুর রেওয়ায়াহ্ এর মাসআলা কে বলেছেন, কীভাবে বলেছেন?
এই মাসআলাটির উৎস: শাইখুল ইসলাম আল্লামা তাকী উসমানী দা.বা. লিখেছেন, ‘জাওয়াহেরুর রেওয়ায়াহ্ বলা হয় ঐ সকল মাসায়েলকে যেগুলো ইমাম মুহাম্মাদ রহ. এর কিতাব মাবসূত, যিয়াদাত, জা‘মে সগীর, সিয়ারে সগীর, জা‘মে কাবীর ও সিয়ারে কাবীরে পাওয়া যায়। (উসূলে ইফতা: পৃ. ১১৩, উকূদে রসমিল মুফতী: পৃ. ৭৩)
অনুসন্ধানে যদ্দূর জানা গেছে, এ কথা সর্বপ্রথম (আল্লাহ তা‘আলাই ভালো জানেন) আল্লামা তাহির ইবনে আহ্মদ ইবনে আবদুর রশীদ বুখারী রহ.-এর কিতাব ‘খুলাসাতুল ফাতাওয়া’ থেকে শুরু হয়েছে। সেখান থেকে আল্লামা হাসান বিন মানসূর কাযী খান রহ. তাঁর ফাতাওয়া গ্রন্থে নিয়েছেন (যা খানিয়া নামে প্রসিদ্ধ)। এরপর এ দু‘জনের উপর নির্ভর করে পরের অনেক মুসান্নিফ এ কথা লিখেছেন। কেউ তাঁদের বরাত দিয়েছেন, কেউ দেননি। এভাবেই কথাটি মশহুর হয়ে গেছে। (দ্রষ্টব্য: একই দিনে রোযা ও ঈদ, মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেব, আল-কাউসার মে-জুন’১৭)
তাহির বিন আহ্মদ বিন আবদুর রশীদ রহ. এর জন্ম ও মৃত্যুসন
‘আততাবাকাতুছ ছানিয়া’ এবং এর বরাতে ‘আলজাওয়াহিরুল মুযিয়্যাহর’ (২/২৭৬) হাশিয়ায় উল্লেখিত হয়েছে। তাঁর জন্ম ৪৮১ বা ৪৮২ হিজরীতে, আর মৃত্যু ৫৪২ হিজরীতে। কাশফুয যুনূনে (খন্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৭০৩) তাঁর কিতাব ‘খিযানাতুল ওয়াকিয়াত’’ এর আলোচনায় তাঁর মৃত্যুসন ৫৪২ হিজরীই লেখা হয়েছে।
কাযী খান রহ. ছিলেন সাহিবে হিদায়ার সমসাময়িক। সাহিবে হিদায়ার জন্ম ৫১১ হিজরীতে, মৃত্যু ৫৯৩ হিজরীতে। কাযী খান রহ. এর মৃত্যুসন তো ঐতিহাসিকগণ ৫৯২ হিজরী লিখেছেন, কিন্তু জন্মসন উল্লেখ করেননি। অনুমান করা যায়, তার জন্মও ৫১০ হি. থেকে ৫২০ হিজরীর মধ্যেই হবে।
যাই হোক, ইখতিলাফে মাতালে’ (উদয়স্থলের বিভিন্নতা) ধর্তব্য না হওয়াকে যে হানাফী মাযহাবের ‘জাওয়াহেরুর রেওয়ায়াহ্’ বলা হয়েছে সেটা একজন অপরজনের উপর নির্ভর করেই লিখেছেন। আর পরের অনেক লেখক এই দু‘জনের উপর বা তাঁদের কোনো একজনের উপর নির্ভর করে লিখেছেন। উপরের কিতাবসমূহ খুলে এবং সরাসরি জাওয়াহেরুর রেওয়ায়াহ্ এর ছয় কিতাব দেখে বরাত পরীক্ষা করার সুযোগ হয়নি বা তার প্রয়োজন বোধ করেননি। মোটকথা, এ এক ‘তাসামুহ্’ (ভ্রম)। প্রকৃত অবস্থা জানার পর একে বুনিয়াদ বানানো মুনাসিব নয়।
‘খুলাসাতুল ফাতাওয়া’র আরবী পাঠ এই- ولو صام أهل بلدة ثلثين يوما للرؤية، وأهل بلدة أخرى تسعة وعشرين يوما للرؤية، فعليهم قضاء يوم، ولا عبرة لاختلاف المطالع في ظاهر الرواية، وعليه فتوى الفقيه أبي الليث، وبه كان يفتي شمس الأئمة الحلواني، قال : لو رأى أهل المغرب هلالَ رمضان يجب الصوم على أهل المشرق، وفي التجريد : اعتبر اختلاف المطالع
কোনো শহরের অধিবাসীগণ যদি চাঁদ দেখে ত্রিশদিন রোযা রাখে আর অপর শহরের অধিবাসীগণ চাঁদ দেখে উনত্রিশ রোযা রাখে তাহলে তাদেরকে একটি রোযা কাযা করতে হবে। আর চাঁদের উদয়স্থলের ভিন্নতা ধর্তব্য নয়, জাওয়াহেরুর রেওয়ায়াহ্ অনুসারে। এরই উপর ফকীহ আবূল লাইছের ফতোয়া। আর এই ফতোয়াই দিতেন শামসুল আইম্মা হালওয়ানী। তিনি বলেন, পশ্চিমের অধিবাসীগণ যদি রমযানের চাঁদ দেখে তাহলে পূর্বের অধিবাসীদের উপর রোযা ওয়াজিব হয়। আর তাজরীদে আছে, উদয়স্থলের বিভিন্নতা ধর্তব্য হবে। (খুলাসাতুল ফাতাওয়া ১/২৪৯)
আর খানিয়ায় আছে- ولو صام أهل بلدة ثلاثين يوما للرؤية، وأهل بدلة أخرى تسعة وعشرين يوما للرؤية، فعلم من صام تسعة وعشرين يوما فعليهم قضاء يوم، ولا عبرة لاختلاف المطالع في ظاهر الرواية، وكذا ذكر شمس الأئمة الحلواني رحمه الله تعالى
(খানিয়া ১/১৯৮, ফাতাওয়া আলমগীরীর সাথে মুদ্রিত নুসখা)
উভয় ইবারতে ভালোভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে-
ক. খুলাসা, খানিয়া দুই কিতাবেই কথা শুরু হয়েছে এই মাসআলা থেকে যে, যে শহরের অধিবাসীরা ২৯ রোযা রেখেছেন তাদের কাছে যদি প্রমাণিত হয় যে, অন্য শহরের অধিবাসীরা চাঁদ দেখার ভিত্তিতে ৩০ রোযা রেখেছেন তাহলে ২৯ রোযাওয়ালাদের উপর এক রোযা কাযা করা জরুরী হবে। যারা ইবারতের অর্থ বোঝার ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো করেন তারা খুলাসা, খানিয়ার ইবারত থেকে এ ধারণাও করতে পারেন যে, লেখকদ্বয় এ মাসআলাকেও জাওয়াহেরুর রেওয়ায়াহ-এর মাসআলা বলেছেন। অথচ তা নয়। ঐ ইবারতে في ظاهر الرواية কথাটিকে এ মাসআলার সাথে যুক্ত মনে করা ভিত্তিহীন। আর বাস্তবতাও এই যে, মাসআলাটি নাওয়াদেরুর রেওয়ায়াহ্-এর; জাওয়াহেরুর রেওয়ায়াহ্-এর নয়।
খ. ‘নাওয়াদেরুর রেওয়ায়েতে’ এ মাসআলায় এ কথার উল্লেখ নেই যে, দূরের দুই শহরের ক্ষেত্রে এই বিধান, না কাছাকাছি দুই শহরের ক্ষেত্রে? ফিকহে হানাফীর একাধিক নির্ভরযোগ্য কিতাবে ও বড় বড় অনেক ফকীহের বক্তব্যে একথার উল্লেখ আছে যে, এ বিধান কাছাকাছি অঞ্চলসমূহের ক্ষেত্রে; দূরের শহর-নগরের ক্ষেত্রে নয়।
গ. ولا عبرة لاختلاف المطالع (উদয়স্থলের ভিন্নতা ধর্তব্য নয়)-এ বাক্য নাওয়াদেরুর রেওয়ায়াহ্-এর উক্ত মাসআলায়ও নেই। এটি খুলাসা-
খানিয়ার লেখকদ্বয়ের নিজস্ব বাক্য, যা তাঁরা জাওয়াহেরুর রেওয়ায়াহ্-এর দিকে সম্বন্ধ করেছেন। তারা যেন বলতে চাচ্ছেন, এ বাক্য ইমাম মুহাম্মাদ রহ. -এর ছয় কিতাবের কোনো কিতাবে আছে। অথচ বাস্তবতা এই যে, এ বাক্যের সম্বন্ধ জাওয়াহেরুর রেওয়ায়াহ্-এর দিকে করা, একান্তই ‘তাসামুহ’ (ভ্রম)। ইমাম মুহাম্মাদ রহ. এর ছয় কিতাবের কোনো
কিতাবেই এর খোঁজ পাওয়া যায় না। বরঞ্চ এই মূলনীতি শ্রেণীর বাক্য
ولا عبرة لاختلاف المطالع (উদয়স্থলের ভিন্নতা ধর্তব্য নয়) দূরের কথা, উপরের মাসআলাটিই (২৯ রোযাওয়ালাদের উপর ৩০ রোযাওয়ালাদের কারণে এক রোযা কাযা করার বিধান) নাদের শ্রেণীর। জাওয়াহেরুর রেওয়ায়াহ্-এ এর কোনো অস্তিত্ব নেই।
সুতরাং, হানাফীদের কোনো গ্রন্থে ‘ইখতিলাফে মাতালে মু‘তাবার না’ এটাকে জাওয়াহেরুর রেওয়ায়াহ্ বলা এবং শুধু এ কারণে এই মতকে প্রাধান্য দেওয়ার ব্যাপারে নতুন করে ভেবে দেখা উচিত।
আবার অনেক সময় এমন হয় যে, কোনো একটি মাসআলা কারো দিকে নিসবত করা হয়, পরবর্তীরাও তার অনুসরণ করে নিজের কিতাবে তা উল্লেখ করে দেয়। কিন্তু আসল কিতাব পুনরায় নিরীক্ষণ করলে তা যেভাবে উল্লেখ করা হয়েছে সেভাবে পাওয়া যায় না। আল্লামা ইবনে আবেদীন শামী রহ. ‘শরহু উকূদি রসমিল মুফতী’ কিতাবে এ বিষয়ে অনেকগুলো দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন। (শরহু উকূদি রসমিল মুফতী পৃ.৫৮)
‘তাসামুহ’ হওয়ার কারণ:
নাওয়াদেরুর রেওয়ায়াহ্-তে একটি মাসআলা পাওয়া যায় যার থেকে চাঁদের মাসআলাটি মুসতাম্বাত বা বের হতে পারে। আহ্কামুল কুরআনসহ কয়েকটি কিতাবে তার বর্ণনা রয়েছে।
ইমাম জাসসাস রহ. বলেন: ‘বিশর বিন ওয়ালীদ আবূ ইউসুফ রহ. থেকে এবং হিশাম মুহাম্মাদ রহ. থেকে আমাদের আসহাবদের কারো
মতবিরোধ ছাড়াই উল্লেখ করেছেন যে, যখন কোনো শহরবাসী চাঁদ দেখে উনত্রিশ দিন রোযা রাখে, আর ঐ শহরে কোনো অসুস্থ ব্যক্তি রোযা রাখলো না, তার হুকুম হলো সুস্থ হওয়ার পর সে উনত্রিশটি রোযাই ক্বাযা করবে। আর যদি কোনো অঞ্চলের লোক চাঁদ দেখে ত্রিশটি রোযা রাখে আর অপর অঞ্চলের লোকেরা চাঁদ দেখে উনত্রিশটি রোযা রাখে তাহলে পূর্বোক্ত মাসআলা থেকে বুঝে আসে যে, যারা উনত্রিশটি রোযা রেখেছে তাদের জন্য একটি রোযা ক্বাযা করা জরুরী। আর ঐ শহরের অসুস্থ ব্যক্তির জন্য ত্রিশটি রোযা ক্বাযা করতে হবে। (আহকামুল কুরআন লিল জাসসাস : ১/৩০৩)
ইমাম জাসসাস আবূ ইউসুফ ও মুহাম্মাদ রহ. থেকে যে দুইটি মাসআলা বর্ণনা করেছেন, সম্ভবত তার দ্বিতীয়টি থেকে ইখতেলাফে মাতালের মাসআলাটি ছাবেত করা হয়েছে। অর্থাৎ এক শহরবাসী উনত্রিশ দিন রোযা রাখল আর অপর শহরবাসী চাঁদ দেখে ত্রিশ দিন রোযা রাখল, তাহলে যে শহরবাসী উনত্রিশ দিন রোযা রেখেছে, তাদের ব্যাপারে বলা হয়েছে যে, তারা একটি রোযা ক্বাযা করবে। সুতরাং, এর দ্বারা বুঝা যায় যে, যে শহরবাসী উনত্রিশ দিন রোযা রেখেছে তাদের উপর ঐ শহরবাসী যারা চাঁদ দেখে ত্রিশ দিন রোযা রেখেছে তাদের চাঁদ দেখার কারণেই একটি রোযা ক্বাযা করতে হবে। অতএব, এর দ্বারা বুঝা গেল যে, অপর শহরবাসীর চাঁদ দেখা ধর্তব্য। ফলে ‘ইখতিলাফে মাতালে মু‘তাবার নয়’ অর্থাৎ,‘উদয়স্থলের পার্থক্য গ্রহণযোগ্য নয়’ মূলনীতিটি সাব্যস্ত হলো।
এখানে কয়েকটি বিষয় লক্ষণীয়:
১. দ্বিতীয় মাসআলার ব্যাপারে ইমাম জাসসাস রহ. বলেছেন: ‘পূর্বোক্ত মাসআলা থেকে বুঝা যায় যে, যারা উনত্রিশটি রোযা রেখেছে তারা একটি রোযা ক্বাযা করবে।’ এর দ্বারা বুঝা গেল দ্বিতীয় মাসআলাটি প্রথম মাসআলা থেকে ইস্তিম্বাত বা বের করা হয়েছে, এটি মান্সূস আলাইহি অর্থাৎ, ইমামদের থেকে সরাসরি বর্ণিত কোনো মাসআলা নয়।
২. বর্ণিত মাসআলায় দুই শহরের উদয়স্থল ভিন্ন ভিন্ন নাকি এক, এ ব্যাপারে কোনো কিছুই উল্লেখ নাই। তাই এ মাসআলা থেকে ‘ইখতিলাফে মাতালে মু‘তাবার না’, এ কথা প্রমাণ করা অসম্ভব।
৩. তাছাড়া এ মাসআলাটি ‘মুহীতে বুরহানী’ এবং ‘তাতারখানিয়াতে’ ‘মুনতাকা’-এর উদ্ধৃতিতে বর্ণনা করা হয়েছে। আর মুনাতাকার ব্যাপারে ‘কাশফুয যুনূন’ এর লেখক লিখেছেন: ‘আল মুনতাকা ফী ফুরূঈল হানাফিয়্যাহ’ হাকেম শহীদ রহ. এর লেখা। এতে মাযহাবের নাওয়াদিরুর রেওয়ায়াহ্ সন্নিবেশিত হয়েছে।’(কাশফুয যুনূন:১৮৫১)
অতএব, যে বর্ণনার মধ্যে মাতালে’ বা উদয়স্থলের ভিন্নতা সত্ত্বেও চাঁদ প্রমাণিত হওয়ার কোনো আলোচনাই নেই এবং যেটা নাওয়াদিরুর রেওয়ায়াহ্ সন্নিবেশিত গ্রন্থ থেকে সংগৃহীত, সেটাকে জাওয়াহেরুর রেওয়ায়াহ্ বলা কি করে বৈধ হতে পারে?
তাই আমরা বলতে পারি যে, ‘ইখতেলাফে মাতালে মু‘তাবার না’ এই মাসআলাটিকে জাওয়াহেরুর রেওয়ায়াহ্ দাবি করে, জাওয়াহেরুর রেওয়ায়াহ্ হওয়ার কারণেই তারজীহ বা প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। অথচ আমাদের আলোচনা দ্বারা এ কথা প্রমাণিত হলো যে, এই মতটিকে জাওয়াহেরুর রেওয়ায়াহ্ দাবি করার কোনো সুযোগ নেই।
সুতরাং, এ ক্ষেত্রে আসহাবে মাযহাবের মতের ব্যাপারে আমরা তাই বলতে চাই-যা ইউসুফ বান্নুরী রহ. বলেছেন। তিনি বলেন: ‘প্রকাশ থাকে যে, মাযহাবের উলামাদের থেকে শুধু এতটুকু বর্ণনা পাওয়া যায় যে, উদয়স্থলের বিভিন্নতা ধর্তব্য না। কাছের এলাকার বা দূরের এলাকার অথবা অন্যকোনো ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ছাড়া তাদের থেকে এই ইজমালী কথা পাওয়া যায়… এ দিকে আমরা যখন জানতে পারলাম যে, দূরবর্তী এলাকার ক্ষেত্রে উদয়স্থলের পার্থক্য ধর্তব্য হওয়ার ব্যাপারে উম্মতের ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সুতরাং, আইম্মায়ে কেরামের মুতলাক (ব্যাখ্যা ছাড়া) বক্তব্যকে ‘নিকটবর্তী অঞ্চলের ক্ষেত্রে উদয়স্থলের পার্থক্য ধর্তব্য না’ এরূপ শর্তের সাথে শর্তযুক্ত করা আবশ্যক। আমাদের শায়েখ আল্লামা কাশ্মীরী এটাই বলতে চেয়েছেন।’ (মা‘আরিফুস সুনান:৫/৩৪১-৪২)
এখন আর হানাফীদের দুই প্রকার মতের ক্ষেত্রে কোনো সংঘর্ষ থাকল না। শুধু এতটুকু পার্থক্য থাকলো যে, একটি মত বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে, আরেকটি মত-যেটির আলোচনা আমরা শেষে করেছি-সেটি অস্পষ্টভাবে আলোচিত হয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয় মতটির ব্যাখ্যা করার পর প্রথম মতটির সাথে এর কোনো সংঘর্ষ বাকি থাকে না।
আলোচিত মাসআলায় হানাফী মাযহাবের ফকীহগণের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে কিছু আলোচনা হলো। এখন অন্য তিন মাযহাবের (শাফে‘ঈ, মালেকী ও হাম্বলী) ফকীহগণের সিদ্ধান্ত উল্লেখ করা হচ্ছে।
শাফে‘ঈ মাযহাব:
শাফে‘ঈ মাযহাব বর্ণনার আগে ভূমিকা হিসেবে এটুকু বলে নিচ্ছি যে, শাফে‘ঈ মাযহাবের ফিকহের কিতাবগুলোর পরিভাষায় ইমাম শাফে‘ঈ রহ.-এর সিদ্ধান্তগুলোকে ‘ক্বওল’ (قول ) এর বহুবচন: আকওয়াল (أقوال) বলে। আর মাযহাবের অনুসারী ও ভাষ্যকার ইমামদের ইস্তিম্বাতকৃত মতামতকে ‘ওয়াজহ’ (وجه) এর বহুবচন ‘উজূহ’ (وجوه) বলে। ‘আকওয়াল’ বা ‘উজূহ’ বর্ণনার ক্ষেত্রে মাযহাবের ফকীহগণের মাঝে পার্থক্য বা বিভিন্নতা দেখা দিলে একে ‘তরীক’ (طريق) বলে।
শাফে‘ঈ ফকীহগণ আলোচিত মাসআলায় (এক এলাকার চাঁদ দেখা অন্য এলাকার জন্য অবশ্যঅনুসরণীয় কি না) শুধু ‘উজূহ’ বর্ণনা করেছেন, ‘আকওয়াল’ বর্ণনা করেননি। এর অর্থ, তাঁরা এ মাসআলা ইমাম শাফে‘ঈ রহ. এর কিতাবসমূহে পাননি এবং ইমাম শাফে‘ঈ রহ. থেকে তাঁদের কাছে এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত পৌঁছেনি। তাঁদের কাছে আছে শুধু ইমাম শাফে‘ঈ রহ.-এর অনুসারী ফকীহ ইমামগণের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত।
শাফে‘ঈ মাযহাবের সর্বসম্মত মুখপাত্র ইমাম আবূ যাকারিয়া নববী রহ. ‘‘শরহুল মুহায্যাবে’’ লিখেন-
এক শহরের লোকেরা রমযানের চাঁদ দেখেছে, অন্য শহরের লোকেরা দেখেনি-এক্ষেত্রে শহর দু‘টি কাছাকাছি হলে তা এক শহরের মতো গণ্য হবে। সুতরাং, দ্বিতীয় শহরের অধিবাসীদেরও রোযা রাখা জরুরী হবে। এতে কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু যদি দুই শহর পরস্পর দূরবর্তী হয়, তাহলে এক্ষেত্রে দুই ‘তরীকায়’ দুটি প্রসিদ্ধ ‘ওয়াজহ’ রয়েছে : অধিকতর শুদ্ধ ‘ওয়াজহ’ এই যে, (এক শহরে চাঁদ দৃষ্টিগোচর হওয়ার কারণে) অন্য শহরের অধিবাসীদের উপর রোযা রাখা জরুরী হবে না। গ্রন্থকার (আবূ ইসহাক শীরাজী), শাইখ আবূ হামীদ বান্দানীজী ও অন্যরা নিশ্চিতভাবে এ কথাই বলেছেন। (অর্থাৎ অন্য মতের উল্লেখও করেননি)। আবদারী ও রাফে‘ঈসহ অধিকাংশ মনীষী একেই সহীহ বলেছেন। ইমাম নববী রহ. এখানে শুধু الأكثر নয়; বরং বহুবচন الأكثرون ব্যবহার করেছেন। এ থেকে অনুমান করা যায়, কী বিপুলসংখ্যক শাফে‘ঈ ফকীহ ঐ সিদ্ধান্তকে সঠিক বলেছেন।
শাফে‘ঈ মাযহাবে রাফে‘ঈ ও নববীকে ‘শায়খাইন’ উপাধিতে স্মরণ করা হয় এবং এঁদের সম্মিলিত মতামত (متفقه تصحيح وترجيح) কে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়। ইতিমধ্যে পাঠক নববী রহ.-এর মত পেয়েছেন। এবার রাফে‘ঈর বক্তব্য দেখুন-
এক শহরে চাঁদ দেখা গেল, অন্য শহরে দেখা গেল না এ অবস্থায় দেখতে হবে, যদি শহর দু‘টি কাছাকাছি হয়, তাহলে দুটোকে এক শহরের মতো গণ্য করা হবে (অর্থাৎ এক জায়গার চাঁদ দেখা অন্য জায়গার জন্যও অবশ্যঅনুসরণীয় হবে)। আর যদি শহর দু‘টি পরস্পর দূরবর্তী হয় তাহলে এ ক্ষেত্রে দু‘টি ‘ওয়াজহ’ রয়েছে । অধিক জাহের (অর্থাৎ দলিলের বিচারে অধিক স্পষ্ট এবং গ্রহণকারীর সংখ্যার বিচারে অধিক প্রসিদ্ধ) ‘ওয়াজহ’ এই যে, দ্বিতীয় শহরের অধিবাসীদের রোযা রাখা জরুরী হবে না।
ফিকহে শাফে‘ঈর মুদ্রিত অসংখ্য গ্রন্থ থেকে কিছু কিতাবের শুধু নাম উল্লেখ করছি। আগ্রহী পাঠক সেগুলো খুলে দেখতে পারেন:
১। ইহ্ইয়াউ ‘উলূমিদ্দীন (১/৩৩৮), ইমাম গাযালী শাফে‘ঈ (৪৫০-৫০৫ হি.।) উক্ত কিতাব তো মাশাআল্লাহ্ আম-খাস, আলেম-বুদ্ধিজীবী সব মহলে সমান সমাদৃত।
২। আততাহযীব ফী ফিকহিল ইমামিশ শাফে‘ঈ (৩/১৪৭),
আবূ মুহাম্মাদ হুসাইন ইবনে মাসউদ আলবাগাভী (৫১৬ হি.)
৩। আলবায়ান ফী মাযহাবিল ইমামিশ শাফে‘ঈ (৩/৪৭৮),
আবুল হুসাইন ইয়াহইয়া ইবনে আবিল খাইর আল ইমরানী।
৪। রওযাতুত তালেবীন ওয়া উমদাতুল মুফতীন (২/৩৪৮)
ইমাম নববী শাফে‘ঈ (৬৩১-৬৭৬ হি.)
৫। তুহফাতুল মুহতাজ শরহুল মিনহাজ (৪/৫০৫)
ইবনে হাজার মক্কী হাইতামী শাফে‘ঈ (৯৭৪ হি.)
৬। মুগনিল মুহতাজ শরহুল মিনহাজ (১/৫৬২)
আলখতীবুশ শিরবীনী শাফে‘ঈ (৯৭৭ হি.)
৭। নিহায়াতুল মুহতাজ ইলা শারহিল মিনহাজ (৩/২৩৫-২৩৬)
শামসুদ্দিন মুহাম্মাদ ইবনে আহমদ রামলী শাফে‘ঈ (১০০৪ হি.)
উল্লেখ্য, আল মিনহাজ ফিক্বহে শাফে‘ঈর নির্ভরযোগ্যতম ‘মতন’।
৮। আলফাতাওয়াল ফিক্বহিয়্যাহ (২/৬০), ইবনে হাজার মক্কী হাইতামী
৯। আহকামুল কুরআন (১/৭০) ইলকিয়া আততবারী (৪৫০-৫০৪ হি.)
১০। বাহ্রুল মাযহাব, আবূল মাহাসিন আররূয়ানী (৪১৫-৫০২ হি.)
মালেকী মাযহাব:
এ মাযহাবের একাধিক গবেষক ফকীহ, ইলমে হাদীস ও ইলমে তাফসীরে যাঁদের অনেক উঁচু মাক্বাম রয়েছে, স্পষ্ট বলেছেন, যে সকল অঞ্চল পরস্পর অনেক বেশি দূরবর্তী সেগুলোতে এক অঞ্চলের চাঁদ দেখা অন্য অঞ্চলের জন্য অবশ্যঅনুসরণীয় নয়। যেমন: ইমাম আবূ উমার ইবনে আবদিল বার মালেকী রহ. (৪৬৩ হি.) ‘আলইসতিযকার’ গ্রন্থে ইমাম মালেক রহ. -এর মিসরী শাগরিদ ও মাদানী শাগরিদগণের বর্ণনা ও অন্যান্য ফক্বীহগণের মাযহাব বর্ণনার পর লিখেন-
وأجمعوا أنه لا تُراعى الرؤية فيما أخر من البلدان كالاندلس من خراسان
অর্থাৎ ‘তাঁরা সবাই এ বিষয়ে একমত যে, যে সকল শহর পরস্পর অনেক বেশি দূরে অবস্থিত যেমন আন্দালুস থেকে খোরাসান, সেখানে এক জায়গার চাঁদ দেখা অন্য জায়গায় প্রযোজ্য হবে না।’ (আলইসতিযকার শরহুল মুয়াত্তা ১০/৩০)
কাযী আবূ বকর ইবনুল আরাবী
কাযী আবূ বকর ইবনুল আরাবী মালেকী (মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ্ ৪৬৮-৫৪৩ হি.) তাঁর কিতাব ‘আ’রিযাতুল আহওয়াযী’ (৩/২১০-২১১)-এর আলোচনার বিপরীতে তার অন্য কিতাব ‘‘আহকামুল কুরআনে’’ লিখেন-
‘কেউ যদি অন্য কোনো শহরে চাঁদ দৃষ্টিগোচর হওয়ার সংবাদ দেয়, তাহলে হয়তো সে শহর কাছে হবে অথবা দূরে। কাছে হলে দুই শহরের বিধান একই। আর দূরে হলে এক দল (ফকীহগণের এক জামা‘আত) বলেন, প্রত্যেক শহরের অধিবাসীদের জন্য নিজেদের চাঁদ দেখাই ধর্তব্য। আবার এ কথাও বলা হয়েছে যে, তাদের জন্যও (সে চাঁদ দেখা) অবশ্যঅনুসরণীয়। (এরপর ইবনে আরাবী রহ. আব্দুুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-এর ঐ হাদীস উল্লেখ করে বলেন) ইবনে আব্বাস রা.-এর এ বক্তব্যের ব্যাখ্যায় ইখতিলাফ আছে: কেউ বলেছেন, তিনি এর (শামে চাঁদ দেখার) ই‘তিবার এজন্য করেননি যে, বর্ণনাকারী ছিলেন একজন। আর কেউ বলেছেন, ই‘তিবার না করার কারণ দুই এলাকার উদয়স্থল আলাদা হওয়া। এটিই সঠিক কথা। কারণ, কুরাইব তো ফয়সালার সংবাদ দিয়েছিলেন। আর এতে কোনো দ্বিমত নেই যে, কাযীর ফয়সালা নকল করার ক্ষেত্রে একজনের সংবাদও গ্রহণযোগ্য। (তাই ই‘তিবার না করার কারণ সংবাদদাতা একজন হওয়া নয়, বরং, উদয়স্থল আলাদা হওয়া।)
এর দৃষ্টান্ত এমন যে, যদি ‘আগমাত’-এ বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে চাঁদ দেখা যায় আর ‘ইশবীলিয়্যা’য় শুক্রবার দিবাগত রাতে, তাহলে এক্ষেত্রে প্রত্যেক শহরের অধিবাসীদের নিজেদের চাঁদ দেখাই ধর্তব্য হবে। (আহকামুল কুরআন, ইবনুল আরাবী ১/৮৪-৮৫) আর আগমাত থেকে ইশবিলিয়্যার দূরত্ব আনুমানিক ৬৮১ কি.মি।
ইবনে জুযাই আলকালবী (৬৯৩-৭৪১ হি.)
ইমাম আবুল কাসেম মুহাম্মাদ ইবনে আহমদ ইবনে জুযাই আলকালবী আলমালেকী, ৭৪১ হিজরীতে যার শাহাদত, তিনি তাঁর প্রসিদ্ধ কিতাব ‘‘আলকাওয়ানীনুল ফিকহিয়্যাহ’’য় পরিষ্কার বলেছেন যে, অনেক দূরের শহর-নগরে যেমন আন্দালুস ও হিজায, এক শহরের চাঁদ দেখা অন্য শহরের জন্য অবশ্যঅনুসরণীয় না হওয়া ইজমা‘য়ী বা সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত। (আলক্বাওয়ানীনুল ফিক্বহিয়্যাহ, পৃ. ৮৯, আলকিসমুল আওয়াল, কিতাবুস সিয়াম)
ইবনে আরাফা (৭১৬-৮০৩ হি.) তিনি ছিলেন অষ্টম হিজরী শতকে মালেকী মাযহাবের অনেক বড় ব্যক্তিত্ব।
তিনিও ইবনে আবদিল বার রহ. এর বক্তব্য নকল করে এর সমর্থন করেছেন।
আবূ আব্দিল্লাহ্ আলহাত্তাব আলমালেকী (৯০২-৯৫৪ হি.)
আল্লামা মুহাম্মাদ ইবনে মুহাম্মাদ আবূ আবদিল্লাহ আলহাত্তাব ‘মুখতাসারু খলীল’ এর প্রসিদ্ধ ও সমাদৃত ভাষ্যকার। তিনি তাঁর শরহ গ্রন্থে ইবনে আরাফার সূত্রে আবূ উমার ইবনে আব্দুল বার রহ. এর কথা নকল করেছেন যে, ‘অনেক দূরের এলাকায় এক জায়গার চাঁদ দেখা অন্য এলাকার জন্য ধর্তব্য না হওয়া সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত।’ আর একে তিনি تنبيه শিরোনামে উল্লেখ করেছেন, যা বাংলায় ‘বিশেষ দ্রষ্টব্য’ শিরোনামের সমার্থক।
تنبيه : قال ابن عرفة : قال أبو عمر : وأجمعوا على عدم لحوق حكم رؤيته ما بعد كالأندلس من خراسان
(মাওয়াহিবুল জলীল শরহু মুখতাসারি খলীল, হাত্তাব মালেকী ৩/২৮৪)
হাম্বলী মাযহাব:
ইমাম আহ্মদ ইবনে হাম্বল রহ্. থেকে স্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায় যে, দূরের শহরেও যদি অন্য শহরের চাঁদ দেখা প্রমাণিত হয় তাহলে তার ই‘তিবার করা জরুরী। হাম্বলী মাযহাবের ফকীহদের মাসলাকও এটিই। তবে মাযহাবের একটি সিদ্ধান্ত এটাও যে, উদয়স্থল আলাদা হলে দূরের এলাকাগুলোতে নিজেদের চাঁদ দেখাই ধর্তব্য হবে। ইবনে হামদান রহ্. ও ইবনে তাইমিয়া রহ. এটিই গ্রহণ করেছেন। যাহোক, হাম্বলী মাযহাবে তো এ বিষয়ে আল্হামদুলিল্লাহ সরাসরি ইমাম আহমদ রহ.-এর বক্তব্যই পাওয়া গেল। ফিকহে হাম্বলীর কিতাবসমূহে এ মাসআলা এভাবেই লেখা আছে। এখানে এ মাযহাবের সবচেয়ে সুলভ ও প্রসিদ্ধ কিতাবের বরাত নকল করা হচ্ছে:
শায়খ ইবনে কুদামা (আবূ মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ ইবনে আহমদ আলমাকদিসী) হাম্বলী রহ. (৫৪১-৬২০ হি.) ইমাম আহমদ রহ. এর শাগরিদদের শাগরিদ আবুল কাসেম উমার ইবনুল হুসাইন আলখিরাকী (৩৩৪ হি.)-এর সংকলিত ‘মুখতাসার’ কিতাবের একটি উৎকৃষ্ট ও বিশদ ভাষ্যগ্রন্থ রচনা করেছেন ‘আলমুগনী’ নামে, যা মাশাআল্লাহ্ খুবই সমাদৃত। ইবনে কুদামা তাতে লিখেছেন-
وإذا رأى الهلال أهل بلد، لزم جميعَ البلاد الصوم. وهذا قول الليث، وبعض أصحاب الشافعي، وقال بعضهم : إن كان بين البلدين مسافة قريبة لا تختلف المطالع لأجلها كبغداد والبصرة، لزم أهلهما الصوم برؤية الهلال في أحدهما، وإن كان بينهما بعد كالعراق والحجاز والشام، فلكل أهل بلد رؤيتهم
অর্থাৎ, কোনো শহরের অধিবাসীরা চাঁদ দেখলে সকল শহরের অধিবাসীদের উপর রোযা অপরিহার্য হয়। এটি (আহ্মদ ইবনে হাম্বল রহ. -এর সাথে) লাইছ রহ. (১৭৫ হি.) এবং কতিপয় শাফে‘ঈ ইমামের এরও ‘কওল’ । আর কেউ কেউ বলেছেন, যদি দুই শহরের মাঝে দূরত্ব কম হয়, যার কারণে এদের উদয়স্থল অভিন্ন থাকে, যেমন বসরা ও বাগদাদ তো এদের কোনো শহরে চাঁদ দৃষ্টিগোচর হওয়ার দ্বারা উভয় শহরের অধিবাসীদের রোযা রাখা জরুরী হবে। পক্ষান্তরে দুই শহরের মাঝে দূরত্ব বেশি হলে যেমন, ইরাক, হিজায ও শাম- প্রত্যেক শহরের অধিবাসীদের জন্য নিজেদের চাঁদ দেখা ধর্তব্য হবে। (আলমুগনী, ইবনে কুদামা হাম্বলী রহ. ৪/৩২৮)
উল্লেখ্য, বসরা থেকে বাগদাদের দূরত্ব ৪৪৮ কি.মি.।
আহলে হাদীস আলেমগণের মাযহাব:
তাদের হাদীস অনুযায়ী আমলের পন্থা কতদূর সুন্নাহ্সম্মত বা সালাফের মাসলাকের সাথে কতটা সঙ্গতিপূর্ণ সে প্রসঙ্গে আপাতত না গিয়ে তাদের কিছু অনুসরণীয় আলেমের সিদ্ধান্ত নকল করা মুনাসিব মনে হচ্ছে।
মাওলানা সানাউল্লাহ অমৃতসরী (১২৮৭-১৩৬৭ হি.)
তাঁর ফাতাওয়া-সংকলন মাওলানা মুহাম্মাদ দাঊদ দারাযের তত্ত্বাবধানে দুই খন্ডে ‘ফাতাওয়ায়ে সানাইয়্যাহ’ নামে প্রকাশিত হয়েছে, যার নযরে সানী (নিরীক্ষণ) করেছেন মাওলানা আবূ সায়ীদ শরফুদ্দীন। এ সংকলনে আলোচিত মাসআলাটিও আছে। এক প্রশ্নের উত্তরে মাওলানা অমৃতসরী রহ্. লিখেন, ‘যদি কাছাকাছি এলাকা থেকে নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য পাওয়া যায় যে, চাঁদ দেখা গেছে, তাহলে আপনি সে অনুযায়ী হিসাব রাখবেন, পরে একটি রোযা কাযা করবেন। আর দূরের সাক্ষ্য আপনার জন্য দলীল নয়।’ (ফাতাওয়ায়ে সানাইয়্যাহ ১/৬৫৭)
তিনি এটাও লিখেছেন যে, ‘আহলে হাদীসদের কাছে দূর-দূরান্তের চাঁদ দেখা দলীল নয়। এ ফয়সালা সাহাবা-যুগেই সম্পন্ন হয়েছে।’ তার ভাষায়-
اہل حديث كے نزديك دور دراز كى رويت ہلال حجت نہيں، يہ فيصلہ صحابۂ كرام كے زمانہ ميں ہو چكا ہے
(ফাতাওয়ায়ে সানাইয়্যাহ ১/৬৬৩)
আরেক আহলে হাদীস আলেম মুহাম্মদ ইয়াহইয়া আল আযমীর বক্তব্যও ‘ফতোওয়ায়ে সানাইয়্যাহ’য় আছে। তিনি লিখেছেন,‘আহলে হাদীস আলেমগণের আমল এই যে, উদয়স্থলের বিভিন্নতা ধর্তব্য।’
(ফতোওয়ায়ে সানাইয়্যাহ ১/৬৭৩)
প্রিয় পাঠক! আশা করি, আমাদের সংক্ষিপ্ত এই আলোচনা পড়ার পর আপনার বুঝতে বাকী নেই যে, নিকটবর্তী এলাকার কোনো এলাকায় চাঁদ প্রমাণিত হলে তাঁর পার্শ্ববর্তী এলাকায় ঐ চাঁদ দেখা গ্রহণযোগ্য হতে পারে, তবে দূরবর্তী এলাকার হুকুম ভিন্ন। দূরবর্তী এলাকার ক্ষেত্রে এক অঞ্চল বা দেশের চাঁদ দেখা অন্য দেশের জন্য যথেষ্ট নয়। বরং প্রত্যেক দূরবর্তী এলাকা নিজেদের চাঁদ দেখা অনুযায়ী রোযা ও ঈদ পালন করবে। উল্লেখিত মাসআলাটি নির্দিষ্ট কোনো মাযহাবের একক সিদ্ধান্ত নয়। বরং মুসলিম উম্মাহর অধিকাংশ উলামায়ে কেরামের ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত এটিই। সুতরাং এ মাসআলার ব্যাপারে আর কোনো দ্বিধা-দ্বন্দের অবকাশ নেই। চৌদ্দশ’ বছর ধরে উম্মতের আমল যেভাবে চলে আসছে তাই সহীহ এবং দলীল প্রমাণ সমর্থিত আর ইজমাও এর উপর প্রতিষ্ঠিত। বিশ্বব্যাপী একই দিনে রোযা ও ঈদ করার মতবাদ একটি নতুন বিষয়। চার মাযহাবেরই অধিকাংশ আলেম এবং এই উপমহাদেশের দেওবন্দী, বেরলভী ও আহ্লে হাদীস, সকল ঘরানার অধিকাংশ আলেম একে এক অপ্রয়োজনীয় বরং ভিত্তিহীন প্রচেষ্টা হিসেবে গণ্য করেছেন। আর এ প্রয়াসকে বিশেষ কোনো সওয়াবের কাজ মনে করা হলে তা বিদ‘আত হওয়ার বিষয়ে কোনো সন্দেহ থাকে না। এই মাসআলার বিরোধিতা করে নতুন কোনো আমল চালু করা মুসলিম সমাজে বিভ্রান্তি ছড়ানো ও কুরআন-সুন্নাহের বিরোধিতার নামান্তর। মোটকথা, দ্বীনের ইলম এবং শরীয়তের রুচি-প্রকৃতি সম্পর্কে বেখবর থাকার কারণে যারা একে ফরয বা ওয়াজিব বলতে চান, তারা তো বুঝে অথবা না বুঝে শরীয়ত বিকৃতিতে লিপ্ত।
উপরের দীর্ঘ আলোচনা শেষে আমাদের সামনে এটাই স্পষ্ট হলো যে, এ কথার প্রবক্তা হওয়া যে, ‘সর্বত্র একই দিনে রোযা-ঈদ হওয়া জরুরী’ সম্পূর্ণ ভুল। রেওয়াতের বিচারে এই মতটি যেমন নির্ভরযোগ্য নয়, যুক্তি-গবেষণা ও আধুনিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গিও এই মতের অনুকূলে নয়। এ ব্যাপারে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কিছু কারণ নিম্নরুপ:
০১. যুক্তি বহির্ভূত:
তথ্য-প্রযুক্তির কল্যাণে একই দিনে ঈদ পালনের যুক্তি দাঁড় করানো হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, ১০০ বছর আগেও যখন উপগ্রহ (স্যাটেলাইট) ছিল না, তাহলে কি এক হাজার ৩০০ বছর ধরে যেদিন রোযা রাখা নিষিদ্ধ, সেদিন তথা ঈদের দিনেও রোযা রাখা হতো? শুধু প্রযুক্তিগত সুবিধার অভাবে এমনটা হতো? মহান আল্লাহ্ তা‘আলা কি কিয়ামতের দিন মুসলিম উম্মাহর এক হাজার ৩০০ বছরের আমল ভুল ও বাতিল বলে ঘোষণা করবেন?
০২. পাঁচ ওয়াক্ত নামায সব দেশে এক সাথে পড়া যায় না:
সর্বক্ষেত্রে সৌদি আরব বা আন্তর্জাতিক অভিন্ন সময় মানা হলে পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের বেলায় কী হবে? অঞ্চলগত ব্যবধানে দেখা যায়, আমরা যখন ফজরের নামায আদায় করি, সৌদির মানুষ তখন ঘুমিয়ে। আমাদের দেশে যখন ইশার ওয়াক্ত, তখন ঐ দেশে আসরের ওয়াক্ত শেষ হয় না। মাসের ক্ষেত্রে এক-দুই দিনের পার্থক্য খুবই স্বাভাবিক নয় কি?
০৩. বিজ্ঞান অসমর্থিত:
ইসলামে মাসের সময় নির্ধারক হলো চাঁদ, দিনের সময় নির্ধারক সূর্য। ঈদ, রোযা ইত্যাদির সময়কাল নির্ধারিত হয় চন্দ্রোদয়ের হিসাবে।
রোযা/ঈদ পালনের ঘধঃঁৎধষ পুপষব (প্রাকৃতিক চক্র) অস্বীকার করা অবৈজ্ঞানিক। কোনো স্থানে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে যেমন দিনের শুরু হয়, তেমনি অমাবস্যার পর চন্দ্রোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে মাস গণনা শুরু হয়ে যায়।

০৪. নববী যুগের আমল:
রাসূলে কারীম সা. চাঁদ দেখার জন্য অথবা চাঁদের সংবাদ বা সাক্ষ্য সংগ্রহ করার জন্য এক/দুই দিন দূরত্ব নয়; পাঁচ-দশ মাইল দূরত্বের কোনো এলাকায়ও কোনো লোক কি পাঠিয়েছেন? হাদীস, সীরাত ও ইতিহাসের গ্রন্থাবলীতে এর একটি দৃষ্টান্তও কেউ দেখাতে পারবে না।
এখানে একটি বিষয় বুঝতে হবে যে, এক হল সাক্ষ্য এসে গেলে সাক্ষ্য কবুল করা, আরেক হল সাক্ষ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা করা, দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। একই হিলাল এবং প্রথম হিলালের ভিত্তিতে রোযা ও ঈদ করা যদি কুরআন ও হাদীসের নির্দেশ হয়ে থাকে তাহলে অন্যান্য অঞ্চল থেকে নতুন চাঁদের সংবাদ এবং সাক্ষ্য সংগ্রহ করাও তো ফরয হবে। কিন্তু নবীযুগে এর উপর আমল হল না কেন? এসে যাওয়া সাক্ষ্য গ্রহণেই কেন ক্ষান্ত থাকা হল?
০৫. নববী যুগ থেকে বর্তমান যুগ পর্যন্ত মুসলমানদের অবিচ্ছিন্ন কর্মধারা:
ইসলামের বয়স প্রায় সাড়ে চৌদ্দশ বছর হতে চলেছে। ইসলাম প্রায় এক হাজার বছর পর্যন্ত বিশ্ব শাসন করেছে। এই সুদীর্ঘ ইতিহাসে কোনো অঞ্চলের মুসলমানগণ সারা বিশ্বে একই দিনে রোযা বা ঈদ পালনের জন্য কোনো চিন্তা করেছেন বা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন; এর কোনো নযীর ইতিহাসে নেই। প্রত্যেক অঞ্চলের মুসলমানগণ স্ব স্ব অঞ্চলের চাঁদ দেখার ভিত্তিতে রোযা/ঈদ পালন করেছেন। এটাকে তারা কোনো সমস্যা মনে করেননি। যদি সারা বিশ্বে একই দিনে রোযা বা ঈদ পালন জরুরী বা কমপক্ষে উত্তম কোনো আমল হত, তাহলে ৬০/৭০ বছর আগ পর্যন্তও কেন এ ব্যাপারে কোনো আওয়াজ উঠলো না? এর দ্বারাই বিষয়টির বাস্তবতা বুঝে আসে।
০৬. সারা বিশ্বে একই নিয়মে ঋতুচক্র আবর্তিত হয় না:
সাগরপারে জোয়ার-ভাটা স্থানীয় সময় অনুসারে হয়, যার সম্পর্ক চাঁদের সঙ্গে। পৃথিবীর সর্বত্র জোয়ার-ভাটা একই সময়ে হয় না। সারা বিশ্বে তো একই নিয়মে ঋতুচক্র আবর্তিত হয় না। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষাকাল বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময়ে শুরু হয়। যদি বিশ্বের কোথাও চাঁদ দেখামাত্রই সারা বিশ্বে ঈদ পালন যৌক্তিক হয়, তাহলে প্রশ্ন থাকে চাঁদ তো পশ্চিমাকাশে প্রথম উদিত হয় বিশ্বের সর্বপশ্চিমের ভূখণ্ড আমেরিকার আলাস্কা প্রদেশে। সৌদি আরবে নয়।

এতে পরিষ্কার বোঝা গেল, চান্দ্রমাস দেশে দেশে আলাদা এবং ঈদ-রোযাও এ জন্য একই দিনে বা একসঙ্গে হয় না বা হওয়া সম্ভব নয়।
০৭. রোযা শুরু অন্য দেশের চাঁদ উদয়ের খবরে আর সাহ্রি-ইফতার স্থানীয় সময়ে?
সাহরি ও ইফতার সম্পর্কে কুরআনের আয়াত দেখুন, মহান আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন, ‘তোমরা পানাহার করো যতক্ষণ রাতের কৃষ্ণরেখা থেকে উষার শুভ্ররেখা প্রতিভাত না হয়। এরপর তোমরা রাতের শুরু (সূর্যাস্ত) পর্যন্ত রোযাকে পূর্ণ করো।’ (সূরা : বাকারা, আয়াত : ১৮৭)
এখানে দেখা যায়, সাহ্রি ও ইফতারের বিধান চাঁদকে কেন্দ্র করে। তাহলে এটা বলার সুযোগ নেই যে, সূরা বাক্বারার ১৮৫ নম্বর আয়াত চাঁদের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং ১৮৭ নম্বর আয়াত সূর্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত। যদি তা-ই হয়, তাহলে প্রশ্ন থাকে, মানুষ কি রোযা শুরু করবে অন্য দেশের চাঁদ উদয়ের খবরে? আর সাহ্রি ও ইফতার করবে স্থানীয় সময় অনুযায়ী? এটা হতে পারে না।
০৮. ‘আন্তর্জাতিক ইসলামী ফিক্বহ্ কমিটি’র সিদ্ধান্ত:
সব শেষে ‘আন্তর্জাতিক ইসলামী ফিক্বহ্ কমিটি’র সিদ্ধান্ত হলো, ‘বিশ্বব্যাপী একই দিনে সিয়াম ও ঈদ পালনের আহ্বান জানানোর কোনো প্রয়োজন নেই। বরং মুসলিম দেশগুলোর দারুল ইফতা (ফাতাওয়া বিভাগ) ও বিচার বিভাগের ওপর চাঁদ দেখার বিষয়টি ছেড়ে দেওয়া উত্তম। এতে মুসলিম উম্মাহর জন্য অধিকতর কল্যাণ নিহিত রয়েছে।’ (ইসলামী ফিক্বহ্ একাডেমি: ১২ই ফেব্রুয়ারি’৮১, রাবেতাতুল আলামিল ইসলামী, জেদ্দা, সৌদি আরব)।
তো একই দিন রোযা ও ঈদ করার উপর উম্মতের ঐক্য নির্ভরশীল মনে করা বা এ ধারণা করা যে, এছাড়া উম্মাহর ঐক্য ও সম্প্রীতি অর্জিত হতেই পারে না-একটি অপরিণত চিন্তা। না এর কোনো দালীলিক ভিত্তি আছে, না সালাফের জীবনের সাথে এর কোনো সম্পর্ক আছে। এ তো খুব সহজেই বোধগম্য যে, বিষয়টি যদি শরীয়তের মাকাসিদের অন্তর্ভুক্ত হত তাহলে সালাফে সালেহীন নিজ নিজ যুগের প্রচার ও যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে এক্ষেত্রে যতটুকু সম্ভব ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতেন। কিন্তু নবী-যুগের পর শত শত বছর পর্যন্ত এর কোনো দৃষ্টান্ত ইসলাম ও মুসলমানের ইতিহাসে পাওয়া যায় না।
দারুল খিলাফায় (রাজধানীতে) চাঁদ দেখা প্রমাণিত হওয়ার পর এর সংবাদ দূত মারফত মদীনার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহে পৌঁছানো যেত। ঈদুল আযহা, আশূরা, লাইলাতুন নিসফি মিন শা‘বান ইত্যাদি ক্ষেত্রে তো খুব সহজেই তা সম্ভব হত; ঈদুল ফিতরেও সময়ের পরে হলেও রাজধানীর ঈদ সম্পর্কে অবগত করা যেত, যাতে অন্যান্য অঞ্চলের লোকেরাও প্রকৃত ২৯ রমযান ও প্রকৃত ১ লা শাওয়াল সম্পর্কে অবগত হয় এবং এক দুইটি রোযা কাযা করতে হলে তা তারা জানতে পারে। কিন্তু খাইরুল কুরূনে বা পরবর্তী কোনো যুগেও কি মুসলিম আমীরগণ বা উলামা ও ইমামগণ এরূপ কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন? এ প্রসঙ্গে নির্ভরযোগ্য একটি উদাহরণও কি পেশ করা যাবে?
ঐ যুগে কেন তাঁরা শুধু নিজ এলাকায় চাঁদ খুঁজতেন? ২৯ শা‘বান সকালে কি চারদিকে দূত পাঠানো যেত না? যারা চাঁদ দেখত, চাঁদের শাহাদাত নিয়ে দ্রুত রওয়ানা হত। কেউ হয়তো ইশার পর, কেউবা সুবহে সাদিকের আগে এসে পৌঁছত। কিন্তু সম্ভাব্য পর্যায় পর্যন্ত অন্যান্য অঞ্চলের চাঁদের সংবাদ তো মিলে যেত। এর কোনো দৃষ্টান্ত কি পাওয়া যায় নবী-যুগে, খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগে? কিংবা খাইরুল কুরূন বা তারপরে ইসলামী খিলাফতের দীর্ঘ সময়ের ইতিহাসে?
তদ্রুপ ২৯ রমযানেও চারদিকে দূত পাঠানো সম্ভব ছিল কিন্তু তা-ও করা হয়নি। হাদীস-সীরাতে যে দৃষ্টান্ত আছে তা হচ্ছে, ৩০ রমযান সন্ধ্যায় ঘটনাক্রমে একটি কাফেলা সফর থেকে ফিরল এবং চাঁদ দেখার সাক্ষ্য দিল। তখন রোযা ভাঙ্গার এবং পরের দিন ঈদ কাযা করার আদেশ এল কিন্তু কখনো কি এমন চিন্তা করা হয়েছে যে, কাফেলা এসে কেন আমাদের সংবাদ দিবে, আমরাই কেন আগে চারদিকে দূত পাঠাই না কিংবা আগে থেকেই পত্র লিখে অন্যান্য অঞ্চলের দায়িত্বশীল ও গভর্ণরদের জানিয়ে দেই না যে, যেখানেই চাঁদ দেখা যাবে অবশ্যই যেন চারদিকে দূত পাঠিয়ে এ সংবাদ পৌঁছে দেয়া হয়?
আপনি হয়তো বলবেন, এটা কষ্টসাধ্য ছিল। কিন্তু শুধু কষ্টের কারণে কি সাহাবা-তাবে‘ঈন শরীয়তের কোনো কাম্যবিষয় ত্যাগ করতে পারেন? তারা তো সাধ্যের শেষ সীমা পর্যন্ত নিজেদের দায়িত্ব পালন করতেন। অতঃপর অসীয়ত করে যেতেন যে, তোমাদের পক্ষে আরো বেশি করা সম্ভব হলে তাতেও কোনো ত্রুটি করবে না। প্রশ্ন এই যে, সালাফের সীরাতে এই ‘পূণ্যকর্মের’ কোনো দৃষ্টান্ত (ঐ যুগে যতদূর সম্ভব ছিল) কেন পাওয়া যায় না?
ইতিহাসে নবী-যুগ ও খিলাফত আমলের রাজনৈতিক ফরমানসমূহ সংরক্ষিত রয়েছে। সেগুলো এক এক করে পাঠ করা হোক এবং একটি মাত্র ফরমান বের করে আনা হোক, যাতে দারুল খিলাফা বা হারামে মক্কা বা হারামে মদীনার চাঁদ সাব্যস্ত হওয়ার সংবাদ অন্যান্য অঞ্চলের অধিবাসীদের জন্য লেখা হয়েছে। যাতে তারা ঐ চাঁদের ভিত্তিতে যথাসময়ে বা সময়ের পরে তাদের করণীয় সম্পন্ন করতে পারেন। আমাদের জানামতে, এরূপ একটি দৃষ্টান্তও নেই। এর বিপরীতে এমন ফরমান পাওয়া যাবে, যাতে খলীফাতুল মুসলিমীন অন্য এলাকায় রাসূল সা: এর এই হাদীস লিখে পাঠিয়েছেন : ‘মাস (কখনো) ঊনত্রিশে হয়, তবে তোমরা চাঁদ না দেখে রোযা ছাড়বে না। আর যদি চাঁদ ঢাকা পড়ে যায় তাহলে তা (ত্রিশটি) হিসাব করে নাও’। (সুনানে আবূ দাঊদ, হাদীস : ২৩১৫; সুনানে বায়হাকী ৪/২০৪)
এর অর্থ এ ছাড়া আর কী হতে পারে যে, প্রত্যেক অঞ্চলের অধিবাসীগণ নিজ নিজ চাঁদ দেখা অনুসারে আমল করবেন।
এ কারণে এই মত ও চিন্তা অবশ্যই বর্জনীয় যে, ‘তাওহীদুল আহিল্লাহ্’ তথা এক চাঁদভিত্তিক রোযা ও ঈদ করা শরীয়তের মাকাসিদ ও উদ্দেশ্যাবলির অন্তর্ভুক্ত কিংবা উম্মাহর ঐক্য এ ছাড়া অসম্পূর্ণ থাকবে। দৃষ্টিভঙ্গির সংশোধনের পর রোযা ও ঈদ একই দিনে করার বিষয়ে নিছক জযবা ও আবেগের পরিবর্তে দলীল ও বাস্তবতার আলোকে চিন্তা করা উচিত যে, প্রকৃতপক্ষেই এর গুরুত্ব কতটুকু আর তা বাস্তবায়নই বা কত দূর সম্ভব?
রোযা ও ঈদের ঐক্যের ডাক বেশি আগের নয়, আবার বেশি নতুনও নয়, ষাট বছরেরও কিছু বেশি এর বয়স। প্রথমে যারা এই আওয়াজ তুলেছেন তারা শুধু মুসলিম বিশ্বব্যাপী ঐক্যের প্রস্তাব পেশ করেছেন। পরবর্তীরা বিশ্বব্যাপী এক করার জন্য পীড়াপীড়ি করছেন এবং এখনও করে চলেছেন। আল্লাহ্ পাকের কি অপার মহিমা! মুসলিম শরীফে এই হাদিসটি সংকলিত হয়ে যাওয়ায় আমরা এক বিশাল দিকনির্দেশনা পেয়েছি যে, একই দিনে সারা বিশ্বে রোযা, ঈদ সম্ভব নয়। তাছাড়া যৌক্তিকভাবে সৌদি আরবে সন্ধ্যা ৭ টায় চাঁদ দেখলে তা জানার জন্য বাংলাদেশে রাত ১০ টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। কোন দেশে রাত ২টা কোথাও রাত ৪টা, কোথাও সকাল ৬টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এভাবে সারা রাত তাদের অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটাতে হবে। তারাবী পড়বে নাকি ঈদের প্রস্তুতি নিবে-সারারাত সংবাদ মাধ্যম ঘাঁটতে হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেকের সে সুবিধা নেই। নিজেরা চাঁদ দেখলে তো আর হচ্ছে না। খবর আসতে হবে দূর দেশ থেকে। কোনো দেশের যোগাযোগ মাধ্যম বিচ্ছিন্ন হলে তারা কিছুই জানতে পারবে না।
ইসলামের প্রতিটি বিষয় প্রকৃতির সাথে সম্পর্কিত। কোন বস্তুর উপর নির্ভরশীল নয়। যেমন মাইক না থাকলেও মুকাব্বিরের মাধ্যমে লক্ষ লোক জামা‘আতে নামায পড়তে পারেন। যারা ঐক্য চান, আমরা ধরে নিচ্ছি, তাদের নিয়্যাত ভাল। তবে এ পদ্ধতি অযৌক্তিক। সারা বিশ্বের মুসলিমদের সারা রাত উৎকন্ঠায় রেখে কেমন ঐক্য হবে? আরও পশ্চিমের দেশ দুপুরবেলা জানল সৌদি আরবে চাঁদ দেখা গেছে। তারা কি চাঁদ দেখার খবরে ইফতার করে ফেলবে? কারণ, শাওয়াল মাস তো শুরু হয়ে গেছে।
কত মুসলিম ফজরের জামা‘আতে শরীক হয়না, রোযা রাখেনা, যাকাত দেয়না, হজ্জ করেনা। এদেরকে এক কাতারে দাঁড় করাতে পারলে বেশি ঐক্য হত। এটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এগুলো ফরয। সে ব্যাপারে আমরা কি চেষ্টা চালাচ্ছি? আমরা কি প্রতিদিন আমাদের মহল্লার
বে-নামাযীদের সাথে সাক্ষাত করি?
সারা বিশ্বের মুসলিমরা যেমন স্থানীয় সময়ে খায়, ঘুমায়, চাকরি, ব্যবসা করে সেভাবেই ইবাদাতগুলোও করতে দেয়া উচিৎ। পরে তো আবার প্রশ্ন উঠতে পারে, একই দিনে ঈদ তো হল কিন্তু একই সময়ে তো হলো না। সুতরাং সবাইকে সৌদির সাথে মিলিয়ে একই সময় ঈদের নামায পড়তে হবে। এভাবে তো উম্মতের মধ্যে আরও অনৈক্য হল! শতধা বিভক্ত উম্মতের মধ্যে নতুন একটি ক্ষুদ্র দল তৈরি হল। তাই যারা একই দিনে ঈদ করার পক্ষে তাদেরকে বিষয়টা একটু গভীর ভাবে ভাবার জন্য অনুরোধ করছি। আলোচ্য হাদীসের শেষে কিন্তু বলা হয়েছে নবীজী আমাদের এভাবে নির্দেশ দিয়েছেন। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. নিশ্চয়ই আমাদের চেয়ে বেশি জ্ঞানী ছিলেন। রইসুল মুফাস্সিরীন তিনি।
প্রকৃত ঐক্য কি?
প্রকৃত ঐক্য এই নয় যে, মুসলমানদের রোযা ও ঈদ একই তারীখে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল; বরং প্রকৃত ঐক্য হচ্ছে গোটা উম্মত-
১. খালিস তাওহীদের উপর ঐক্যবদ্ধ হওয়া।
২. আল্লাহর বিধানসমূহ পালন করতে থাকা।
৩. সুন্নতে নববীর অনুসরণ ও উসওয়ায়ে হাসানা মোতাবেক জীবন গঠনে সচেষ্ট হওয়া।
৪. উম্মত ইজমা‘ঈ বিষয়সমূহে ইজমার উপর অটল অবিচল থাকা এবং ইজতিহাদী ও ইখতিলাফী বিষয়ে নিজের ইমাম, মুফতী বা মুরশিদের নির্দেশিত পন্থায় আমল করা এবং অন্যদের পথ ও পন্থার উপর আপত্তি ও সমালোচনা থেকে বিরত থাকা।
মাওলানা মাসীহুল্লাহ খান জালালাবাদীর ভাষায় :
اپنے مسلك كو چهوڑے نہيں اور دوسرے كے مسلك كو چهيڑے نہيں
নিজের পথ ছাড়বে না, অন্যের পথকে ‘ছুঁড়বে না’।
৫. উম্মতের মাঝে প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ব সৃষ্টি হওয়া এবং ভালো কাজে সহযোগিতা আর জুলুম ও অন্যায় কাজে সহযোগিতা পরিহারের প্রেরণা জাগ্রত হওয়া।
এই উম্মতের এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তাওহীদ ও ঈমান এবং ঈমানী ভ্রাতৃত্বের উপর ঐক্যবদ্ধ হওয়া।
রাবেতাতুল আলামিল ইসলামী-এর ‘আলমাজমাউল ফিকহিল ইসলামী’ (রাবেতার ফিকহী বোর্ড)-এর ফেব্রুয়ারী ১৯৮১ ঈ.-এ গৃহীত সিদ্ধান্তের বাক্যগুলো এই :
لا حاجة إلى توحيد الأهلة والأعياد في العالم الإسلامي، لأن توحيدها لا يكفل وحدتهم، كما يتوهمه كثير من المقترحين لتوحيد الأهلة والأعياد. وأن تترك قضية إثبات الهلال إلى دور الإفتاء والقضاة في الدول الإسلامية، لأن ذلك أولى وأجدر بالمصلحة الإسلامية العامة، وأن الذي يكفل توحيد الأمة وجمع كلمتها، هو اتفاقهم على العمل بكتاب الله وسنة رسول الله صلى الله عليه وسلم في جميع شؤونهم.
মুসলিম জাহানে চাঁদ ও ঈদ এক করার কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ, তা মুসলিমদের ঐক্য নিশ্চিত করবে না যেমনটা চাঁদ ও ঈদ এক করার অনেক প্রস্তাবকের ধারণা। চাঁদ প্রমাণ হওয়ার বিষয়টি ইসলামী দেশগুলোর বিচার বিভাগ ও ফাতাওয়া বিভাগগুলোর উপর ছেড়ে দেওয়াই সমীচীন। কারণ, এটিই ইসলামের সাধারণ কল্যাণ বিবেচনায় অধিকতর উত্তম ও উপযোগী।
আর যে বিষয়টি উম্মাহর ঐক্য নিশ্চিত করবে তা হচ্ছে, সকল বিষয় আল্লাহর কিতাব ও আল্লাহর রাসূলের সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করার বিষয়ে সবাই ঐক্যবদ্ধ হওয়া।’’ (কারারাতুল মাজমাইল ফিকহিল ইসলামী, মক্কা মুকাররমা, পৃষ্ঠা : ৮৭-৮৯)
রাবেতায়ে আলমে ইসলামীর ‘আলমাজমাউল ফিক্হী’-এর ঐ অধিবেশনে, যাতে উপরোক্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, পুরো বিশ্বের এবং সকল মাযহাবের বড় বড় ব্যক্তিত্ব উপস্থিত ছিলেন। সিদ্ধান্তে যাঁদের স্বাক্ষর রয়েছে তাঁদের মধ্য হতে কয়েকজন হলেন:
১. আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্লাহ বিন বায
২. মুহাম্মাদ আলী আলহারকান (উপপ্রধান)
৩. আব্দুল্লাহ্ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে হুমাইদ (প্রধান)
৪. মুস্তফা আয্যারকা
৫. মুহাম্মাদ মাহ্মূদ আস্সাওয়াফ
৬. মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ্্ ইবনে সুবাইলী
৭. সালেহ ইবনে উছাইমিন
৮. মাবরুক আল-‘আওয়াদী
৯. মুহাম্মাদ আশ্শাযেলী আন্নাইফার
১০. আব্দুল কুদ্দূস হাশেমী
সুতরাং, আমাদের দেশের গুটিকয়েক বিদ‘আতী ও ফেতনা সৃষ্টিকারী নামধারী আলেমদের কথা শুনে ও তাদের লেখা পড়ে বিভ্রান্ত হবেন না। তাদের কথা অনুযায়ী সাউদী আরবের সাথে মিলিয়ে রোযা ও ঈদ পালন করা যাবে না। আল্লাহ্ তা‘আলা আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন এবং হেদায়াতের উপর কায়েম-দায়েম রাখুন। আমীন।

 

মুফতী সানাউল্লাহ্
শিক্ষাসচিব,
জামি‘আতুল আবরার আল-ইসলামিয়া টাঙ্গাইল

Share: