[এক]
সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী আল্লাহ্ তা‘আলা মানবজাতির কল্যাণে ও সত্য পথ প্রদর্শনের জন্য যুগে যুগে নবী ও রাসূলগণকে এ ধরায় পাঠিয়েছেন। সর্বশেষ যখন হযরত ঈসা (আঃ) উম্মতকে রেখে উর্ধ্বলোকে উত্থিত হন,তখন উম্মত নিজেদের গন্তব্য ভুলে নবীদের পথ-নির্দেশ বিস্মৃত হয়ে সম্পূর্ণরূপে দুনিয়ামুখী হয়ে পড়ে। জাহিলিয়্যাতের মেঘে ঢেকে যায় সত্যের সূর্য। আধাঁরে ছেয়ে যায় পৃথিবী। অনাচার-অবিচার পরিণত হয় নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপারে।
দয়াময় খোদা তখন এই জাহিলিয়্যাত দূর করে সত্যের আলোয় পৃথিবী আলোকিত করতে প্রেরণ করেন সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে। রহমতের বারিধারায় সিক্ত হয় মানবক‚ল। ছেলেবেলা থেকেই শিশু মুহাম্মদ ত্যাগের দীক্ষায় দীক্ষিত হোক এই ছিল দয়াময়ের বাসনা। তাই নবীজী পিতাকে হারান জন্মের পূর্বেই। মাতার স্নেহের কোল থেকেও নবীজী বঞ্চিত হন শিশু কালেই। নবীজীর বয়স যখন চার বা ছয় বছর তখন তার মা আমেনা ধরাধাম ত্যাগ করেন। তার মাত্র দুই বা চার বছর পরই দাদা আব্দুল মুত্তালিবকে হারিয়ে নবীজী (সাঃ) এই বিশাল দুনিয়ায় একদম একা হয়ে যান।
ছেলেবেলা থেকেই তাই নবীজী ছিলেন ত্যাগের মন্ত্রে দীক্ষিত, সহিষ্ণুতার গুণে উদ্ভাসিত। কৈশর-তারুণ্যে ধু-ধু মরুতে বকরী পালন ও যৌবনে সুদূর পথ পাড়ি দিয়ে বাণিজ্য এসবই ছিল দ্বীন প্রতিষ্ঠার ত্যাগের প্রস্তুতি পর্ব। তদুপরি নবীজীর নবুওয়াতের যিন্দিগী ছিল ত্যাগ ও কুরবানী ঘেরা এক জীবনাদর্শ। এ আদর্শ প্রতিষ্ঠায় নবীজী ও তাঁর সাহাবাগণ ছিলেন আপসহীন। চরম অত্যাচারের সম্মুখীন হয়েও থেকেছেন অবিচল। এ পথের সকল প্রতিক‚লতাকে হাসি মুখে বরণ করেছেন। অত্যাচারী জালিমের খড়গ-কৃপাণ ও বদ্ধ কারাপ্রাচীর তাদের বিশ্বাসের ভিতকে এক বিন্দুও টলাতে পারেনি। বিলাসী ও আয়েশী জীবন-যাপনের শত সুযোগ পায়ে ঠেলে তাঁরা বেছে নিয়েছিলেন নির্লোভ ও নির্মোহ জীবনাচার। মানুষের সামনে রেখে গেছেন এক অনুপম আদর্শ।
রূহানিয়্যাতের প্রোজ্জ্বল আলোকধারায় পাপক্লিষ্ট ও পথভ্রষ্ট মানুষকে হেদায়েতের প্রশস্ত রাজপথে এনে দাঁড় করিয়েছেন। তাদের মধ্য হতে দু‘জনের কুরবানী আজ আমরা পাঠকের সমীপে পেশ করছি।
১। হযরত উমর ইবনে আব্দুল আজিজ রহঃ
ইসলামের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ শাসকদের অন্যতম ছিলেন উমর ইবনে আবদুল আজিজ রহঃ খোদাভীতি, সাহসিকতাসহ সাহাবাদের অনন্য গুণাবলীর সমন্বয় ঘটেছিল তাঁর মাঝে। তাই তাকে অনেকে ইসলামের পঞ্চম খলীফা বলে আখ্যায়িত করেন বা খোলাফায়ে রাশেদার মধ্যে গণ্য করেন। উমর ইবনে আব্দুল আজিজ রহঃ ৬১ হিজরীতে মদিনায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আব্দুল আজিজ বিন হাকাম ছিলেন বনু উমাইয়ার শ্রেষ্ঠ গভর্ণরদের মধ্যে অন্যতম। বিয়ের সময় আব্দুল আজিজ বিন হাকাম নিজ সহকারীকে বললেন, “আমার বৈধ সম্পদ থেকে আমার জন্য চারশত দীনার সংগ্রহ করো। আমি অত্যন্ত সৎ-পরিবারের মেয়ে বিয়ে করব।” অতঃপর তিনি ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমর ফারুক রাযিঃ এর নাতনি উম্মে আসেম লায়লা বিনতে আসেমকে বিয়ে করেন। এই মুবারক দম্পতির ঔরশে জন্মগ্রহণ করেন উমর ইবনে আব্দুল আজিজ রহঃ। তাঁর শৈশব কাটে মদিনায়। মদিনার বড় বড় সাহাবীদের সান্নিধ্যে বেড়ে উঠেন তিনি। আব্দুল্লাহ বিন উমরের সব দরসে তিনি শৈশবকাল থেকে যাতায়াত করতেন। ছোট বেলায় প্রায়ই তাঁর মাকে বলতেন, “আম্মু আমি নানার মত হবো।” তখন মা উত্তরে বলতেন, “সফর করো, ইলম অর্জন করো।”(সিয়ারু আলামিন নুবালা-৫/১৪৪)
হযরত উমর ইবনে আব্দুল আজিজ রহঃ যখন শৈশব পেরিয়ে যৌবনে, তখন ৮৭ হিজরীতে চাচা খলীফা আব্দুল মালেক বিন মারওয়ান তাঁকে মদিনার গভর্ণর নিযুক্ত করেন। অতঃপর ৯৯ হিজরীতে তিনি আমীরুল মুমিনীন তথা মুসলিম উম্মাহর খলীফা নিযুক্ত হন। শৈশব থেকে মহান সাহাবীদের সান্নিধ্যে বেড়ে উঠায় চারিত্রিক দৃঢ়তা ও শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব ছিল উমরের স্বভাবজাত। তাই খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করে খেলাফত ব্যব¯’ার সংস্কারে বহুবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন।সুশাসন প্রতিষ্ঠা, মজলিসে শূরা বা উপদেষ্টা পরিষদ গঠন, অত্যাচার- নিপীড়নমূলক সব নীতিমালা পরিহার, জনসাধারণের মাঝে ইলমের প্রচার-প্রসার ও ইলমে হাদীস সংকলনের সূচনা সহ অনেক জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপ তাঁর হাতেই সূচিত হয়েছিল। আর বিশাল সাম্রাজ্য অধিপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করলেও সার্বিক জীবনযাপনে তাঁর মতো সাদাসিধা অনাড়ম্বর খোদাভীরু শাসক ইতিহাসে বিরল। কিন্তু তাঁর এই ন্যায়ের বারিধারা অব্যাহত থাকেনি বেশী দিন। কারণ, এতো কঠোর ন্যায়নিষ্ঠার সাথে জীবনযাপন করা উমাইয়া বংশের অন্য শাসকদের জন্য ছিল অতি কঠিন। উমরের শাসনকাল ছিল মাত্র দুই বছর পাঁচ মাস। উমাইয়া শাসকদের ষড়যন্ত্রে অবশেষে ১০১ হিজরীতে বিষ প্রয়োগের কারণে মুসলিম উম্মাহর এ মহান খলীফা উমর ইবনে আব্দুল আজিজ রহঃ শাহাদাত বরণ করেন। তখন তাঁর বয়স হয়েছিল ৩৯ বছর পাঁচ মাস চার দিন। [রহিমাহুল্লাহু তা‘আলা রহমাতান ওয়াসি‘আ] (সিরাতে উমর ইবনে আব্দুল আজিজ রহঃ পৃ:৩১৬)২। শাইখুল হিন্দ মাহমূদ হাসান দেওবন্দী (রহঃ)
১৮৫৭ সালের বিপ্লব ও যুদ্ধে ইংরেজ বেনিয়াদের জয়ের ফলে এদেশের শত শত স্বাধীনতাকামী মুজাহিদদের ফাঁসির কাষ্ঠে ঝোলানো হয় এবং হাজার হাজার যোদ্ধাদের বন্দি করা হয়। মাওলানা কাসেম নানুতুবী (রহঃ) এই বন্দিদের একজন ছিলেন। তিনি থানা ভবন ও শামেলীর ময়দানে ইংরেজ বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে অংশগ্রহণ করেন।
মাওলানা কাসেম নানুতুবী (রহঃ) এর উপর গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি হলে তিনি কিছুকাল আত্মগোপন করে থাকেন। অতঃপর ইংরেজ সরকার কর্তৃক সাধারণ ক্ষমা ঘোষিত হলে তিনি জনসম্মুখে আসেন এবং পুনরায় ব্রিটিশ সা¤্রাজ্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিতে থাকেন। তবে তিনি এবার তাঁর কৌশল পরিবর্তন করেন। ইসলামী সংস্কৃতির বিরুদ্ধে ইংরেজ সরকারের অব্যাহত আগ্রাসনের ফলে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন সশস্ত্র সংগ্রামের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক সংগ্রামও প্রয়োজন। অন্যথায় উপমহাদেশে ইসলামী তাহযীব-তামাদ্দুন টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।ইংরেজদের বিরুদ্ধে সামরিক ও সাংস্কৃতিক দু’ধরণের বিপ্লবই প্রয়োজন।সাংস্কৃতিক বিপ্লবের প্রয়োজনীয়তা থেকেই তিনি ১৮৬৬ সালে ভারতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি প্রতিষ্ঠান দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠা করেন।
এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্র ছিলেন মাওলানা মাহমূদ হাসান দেওবন্দী রহঃ। যিনি ভারতের স্বাধীনতায় এক নতুন অধ্যায় সূচনা করেন। ভারতের স্বাধীনতায় মাওলানা মাহমূদ হাসান দেওবন্দী রহঃ এর অবদান এত বিশাল যে, তার আলোচনা ছাড়া ভারতবর্ষের স্বাধীনতার ইতিহাস অপূর্ণ থেকে যাবে। মোহন দাস করম চাঁদ গান্ধীকে তিনিই সর্বপ্রথম ‘মাহাত্মা’ উপাধিতে ভূষিত করেন। ভারতবর্ষকে দখলদার মুক্ত করার উদ্দেশ্যে তুর্কি খেলাফতের সাহায্য নিতে মাওলানা মাহমূদ হাসান দেওবন্দী রহঃ হেজায সফর করেন এবং তুর্কি গভর্নর গালিব পাশার সঙ্গে সামরিক সহযোগিতার একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী তুর্কি বাহিনী বাগদাদ হয়ে বেলুচিস্তান সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করবে।
এই পরিকল্পনাটি গোপনে একটি রেশমী রুমালে রেখে ভারতে প্রেরণ করা হয়। ইতিহাসে যা রেশমী রুমাল আন্দোলন(silk letter conspirac) নামে বিখ্যাত। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে ওই চুক্তি পাঞ্জাবে সিআইডির হাতে ধরা পরে। ফলে মাওলানা মাহমূদ হাসান দেওবন্দী রহঃ কে মক্কায় মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী রহঃ সহ অন্যান্যদেরকেও গ্রেফতার করা হয়। মাল্টার দ্বীপে তাঁদের ৩ বছর ৭ মাস বন্দি রাখা হয় এবং বন্দী কালীন সময়ে এই বয়োজ্যোষ্ঠ আলেমে দ্বীনের উপর অমানুষিক নির্যাতন-নিপীড়ন চালানো হয়। এভাবেই যুগে-যুগে ইসলাম প্রতিষ্ঠায় ত্যাগ ও কুরবানী দিয়ে আসছে উলামায়ে কেরাম। আল্লাহ্ আমাদেরকে তাঁদের খাদেম হিসেবে কবুল করুন। আমীন!