ইসলামের প্রতিটি বিধান সু-প্রতিষ্ঠিত এবং অপরিবর্তনীয়। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মাধ্যমে প্রাপ্ত ইসলামে ছোট ছোট বিষয়গুলোকেও সংরক্ষণ ও অবিকৃত রাখতে অসংখ্য মনীষী অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। নির্ঘুম কাটিয়েছেন বহু রাত। রণাঙ্গনে ঝরিয়েছেন বুকের তাজা রক্ত। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে ইসলামের দীক্ষা নিয়ে অক্ষরে অক্ষরে জীবনে বাস্তবায়ন করেছেন স্বর্ণমানব সাহাবায়ে কেরাম। সাহাবীদের থেকে প্রাপ্ত শিক্ষানুযায়ী জীবন গঠন করেছেন তাবেয়ী‘ ও তাবে‘তাবেয়ী‘গণ। পর্যায়ক্রমে সালাফে সালেহীন, আইম্মায়ে মুজতাহিদীন ও উলামায়ে হক্কানী-রব্বানী তথা প্রকৃত নায়েবে নবীগণ সেই প্রকৃত ইসলামের ইশা‘আত করেছেন। যুগে যুগে কিছু স্বার্থান্বেষী দরবারী আলেমও ছিল, যারা দুনিয়ার মোহে পড়ে শরীয়ত ও সুন্নতে নববীর আদর্শ থেকে দূরে সরে গিয়ে শিরক ও বিদ‘আতের সয়লাবে ইসলামের নূর নির্বাপিত করে ফেলার চক্রান্ত করেছে। কিন্তু, আল্লাহর প্রজ্বলিত নূরকে নির্বাপিত করবে, সাধ্য কার ? তাই প্রতি যুগেই একটি নির্বাচিত নায়েবে নবীর দল ছিল যারা বাতিল প্রতিরোধে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছেন। তাঁদের কর্মতৎপরতায় প্রজ্বলিত হয়েছে নববী নূর। বিদূরিত হয়েছে বিদআ‘তের আঁধার। সেই দলটিরই পরিচয় “মা আনা আলাইহি ওয়া আসহাবী” তথা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আত। এ যুগেও সে দলটির ঝান্ডা বহন করে চলেছেন নায়েবে নবীগণ।
নায়েবে নবী যারা
কুরআন সুন্নাহর আলোকে নায়েবে নবী বলতে এমন আদর্শ মানুষদের বোঝানো হয়েছে যারা হবেন অত্যন্ত মুত্তাকী, খোদাভীরু ও পরহেযগার। প্রকাশ্যে-গোপনে, শয়নে-স্বপনে, সরবে-নীরবে, আনন্দে-বেদনায়, সুখে -দুঃখে, সুস্থতায়-অসুস্থতায়, ভ্রমনে-বাসস্থানে, মোট কথা, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে হবেন তাকওয়ার মূর্তপ্রতিক।তিনি হবেন এমন অনুসরণীয় ও অনুকরণীয় যে তার কথা বা তার সাহচর্যে এসে তৌহিদী জনতা মুক্তি পাবে যাবতীয় ভ্রান্ত আক্বীদা-বিশ্বাস ও পশ্চিমা কৃষ্টি-কালচারের করাল গ্রাস থেকে। সঠিক পথের দিশা পেয়ে ধন্য হবে পাপাচারে নিমজ্জিত, শতধা-বিভক্ত অগণিত মানব সন্তান । আমরা আজ এই নায়েবে নবীর গুণাবলি নিয়েই আলোচনা করবো।
১। ইলমে পরিপক্কতা।
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হক্কানী নায়েবে নবীর আলামত বয়ান করতে গিয়ে ইরশাদ করেছেন,
العلماء ورثة الانبياء وان الانبياء لم يورثوا دينارا ولادرهما وانما يرثوا العلم فمن أخذه اخذ بحظ وافر
অর্থঃ উলামায়ে কেরাম নবীগণের ওয়ারিস। নবীগণ দীনার-দিরহাম, টাকা-পয়সার ওয়ারিস বানান না; ইলমের ওয়ারিস বানান। সুতরাং যে ব্যক্তি ইলম অর্জন করল সে যথেষ্ঠই অর্জন করলো। (সুনানে আবূ দাউদ: হাঃ নং ৩৬৪)
উক্ত হাদীস দ্বারা বুঝা যায় নায়েবে নবী কুরআন,হাদীস,ফিক্বাহ্ প্রভৃতি শাস্ত্রে অভিজ্ঞ হবেন। আলেম হবেন, তা দুনিয়াবী উদ্দেশ্যে নয়। ইলমকে দুনিয়াবী তুচ্ছ স্বার্থে ব্যবহার করবেন না। আমাদের আকাবিরে হযরত, যাদের পদাঙ্ক আমরা অনুসরণ করি, যাদের নিয়ে আমরা গর্ব করি, তারা এমনই ছিলেন।
২। ইলম অনুযায়ী আমল
একজনের ইলম আছে কিন্তু তদানুযায়ী আমল নেই সে নায়েবে নবী নয়। হতে পারে সে মাদ্রাসার পরিচালক,বা মসজিদের ইমাম কিংবা ভালো বক্তা। তার চিত্তাকর্ষক বয়ানে ভালো কোন প্রভাব শ্রোতাদের অন্তরে পরবে না। ইমাম গাযালী (রহঃ) বে-আমল আলেমের উদাহরণ দিয়েছেন ঐ সৈনিকের সাথে,যার কাছে শত্রুকে মোকাবেলা করার মতো সকল প্রকার হাতিয়ার বিদ্যমান, কিন্তু আক্রান্ত হয়েও সে একটি অস্ত্রও ব্যবহার করল না, বেঘোরে মারা পরাই ঐ সৈনিকের নিয়তি।মুসলিম জাতির জন্য কুরআন-সুন্নাহর চেয়ে বড় কোন অস্ত্র নেই। তারা যদি সে অস্ত্র ব্যবহার না করে, ইলম অনুযায়ী আমল না করে, শুধু মানুষকে বলে বেড়ায়, তাহলে পরিণতি হবে মারাত্মক ও ভয়াবহ।
৩। সুন্নতে নববীর অনুসরণ এবং শরীয়তের আনুগত্য
একজন খাঁটি নায়েবে নবী সুন্নতে নববী এবং অনুসরণের ক্ষেত্রে এতটাই দৃঢ় ও মজবুত হবেন যে, তাঁর অস্তিত্ব ও তাঁর চলাফেরা-উঠাবসা থেকেই সুন্নতে নববীর আশেকগণ বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবে। কুতবুল ইরশাদ ফক্বীহুন নফ্স হযরত মাওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী রহঃ একবার দেওবন্দের দস্তারবন্দী জলসায় উপস্থিত ছিলেন। ইত্যবসরে আসরের সময় হয়ে গিয়েছিল। সাক্ষাৎপ্রার্থীদের ভিড় ও মুসাফাহার আধিক্যের দরুন তাড়াহুড়া করে জামা‘আতে শরীক হতে হতে ক্বিরাত আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল। সালাম ফেরানোর পর দেখা গেল যে, তাঁর উদাস চেহারায় বিষন্নতার গভীর ছাপ। তিনি ব্যথাভরা কন্ঠে বলেছিলেন, “আফসোস ! বাইশ বছর পর আজ তাকবীরে ঊলা ছুটে গেল।
১৮৫৭ সালে ভারতবর্ষকে স্বাধীন করার জন্য শামেলীর ময়দানে ইংরেজদের বিরুদ্ধে মুসলমানগণ আমীরে শরীয়ত হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী রহঃ এর নেতৃত্বে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। সেখানে অগ্রণী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে সম্মুখ সমরে বীরদর্পে যারা লড়েছিলেন তাদের অন্যতম ছিলেন মাওলানা ক্বাসেম নানুতবী রহঃ। সামনের সারির নেতৃবৃন্দদের বিরুদ্ধে ইংরেজ সরকার রাষ্ট্রদ্রোহীতার অভিযোগ আনে এবং প্রহসনের বিচার দ্রুত সম্পন্ন করে ফাঁসির দন্ডাদেশ পর্যন্ত জারি করে। জেনে শুনে নিজের প্রাণকে শত্রুর হাওয়ালা করে বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া যেহেতু ইসলামের শিক্ষা নয়, বরং সাধ্যমত আত্মরক্ষার পন্থা অবলম্বন করা উচিত। তাই তিনি দেওবন্দ প্রত্যাবর্তন করে তিনদিন পর্যন্ত নিজ গৃহে আত্মগোপনে ছিলেন। তিনদিন পর ঘর থেকে বের হয়ে সাত্তা মসজিদে চলে এলেন। খাদেমগণ বিনয়ের সাথে অনুরোধ করতে লাগলেন যে, হযরত ! ইংরেজরা আপনাকে পাগলা কুকুরের ন্যায় হন্য হয়ে খুঁজছে।আপনি এখনো বিপদমুক্ত নন। আপনার আরো কিছুদিন আত্মগোপনে থাকা উচিত। তখন তিনি উত্তরে যা বলেছিলেন সেটাই আমাদের জন্য লক্ষণীয় ও শিক্ষণীয়। তিনি বলেছিলেন, “ক্বাসেমের বিপদ তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও আবূ বকর রাযিঃ এর উপর আপতিত বিপদের চেয়ে অধিক ভয়ানক নয়। ক্বাসেমের প্রাণ তো তাঁদের দু‘জনের প্রাণ থেকে অধিক মূল্যবান নয়। হিজরতের পূর্ব মুহুর্তে যখন মক্কার কাফেররা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে শহীদ করে দেয়ার চূড়ান্ত পাঁয়তারা করে ফেলেছিল, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবূ বকর রাযিঃ কে নিয়ে রাতের অন্ধকারে বের হয়ে তিনদিন পর্যন্ত ছওর গুহায় আত্মগোপনে ছিলেন। চতুর্থদিন সেখান থেকে বের হয়ে মদীনার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গিয়েছিলেন। ক্বাসেমের আত্মমর্যাদা এটা বরদাশ্ত করতে পারে না যে, আমার মুনিব তিনদিন পর্যন্ত আত্মগোপনে ছিলেন, সেখানে আমি এর চেয়ে বেশী আত্মগোপনে থাকব। কোথায় ছিল তাঁদের দৃষ্টি ভাবা যায় ! প্রতি মূহুর্তে শত্রুদের হাতে পাকড়াও হওয়ার আশঙ্কা ছিল, যার পরিণতিতে নিশ্চিত ফাঁসি। কিন্তু, দৃষ্টি ছিল সুন্নতের উপর। আত্মগোপনেও সুন্নতের অনুসরণ এবং আত্মপ্রকাশেও সুন্নতের অনুকরণ।
৪। খাঁটি নায়েবে নবী দুনিয়ার ভোগ-বিলাস থেকে পারতপক্ষে দূরে থাকেন
জাগতিক আরাম-আয়েশ,সাজ-সজ্জা ও শান-শওকত এড়িয়ে অত্যন্ত সাদামাটা জীবন-যাপন করেন। আমাদের নিকট অতীতের উলামায়ে কেরাম একেবারেই সাদামাটা ছিলেন। মাওলানা হেদায়াতুল্লাহ (মুহাদ্দিস সাহেব হুজুর) রহঃ কে দেখলে বুঝা যেত না, এই ব্যক্তিটি উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাদীসবিশারদ। হাফেজ্জী হুজুর রহঃ কে দেখে কল্পনাও করা যেত না তিনি সেই তিন বুযুর্গের একজন, যাদের হাতে বাংলাদেশে ইসলামী ভাবধারার পুনর্জাগরণ হয়েছে। এমনকি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও হাফেজ্জী হুজুর রহ: থাকতেন বাহুল্যবর্জিত অতি সাধারণ।
৫। দেশের শাসক শ্রেণী এবং রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলদের থেকে নায়েবে নবীগণ যথাসাধ্য দূরে থাকবেন। বর্তমানে এই বৈশিষ্টের আলেম খুব বেশি নেই।
দুনিয়ার ধন-সম্পদের লোভে ক্ষমতাসীনদের পক্ষে না-হক্ব কথা বলে ফেলতে দ্বিধা করে না। অধুনা আলেম সমাজ এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।
৬। কোন হক্বানী কামেল মুরশিদের খেদমতে থেকে বায্যিক ইলমের পাশাপশি আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ ইলম দ্বারাও নিজেকে সুসজ্জিত করবেন।
৭। তাঁর মাঝে তাওয়াযু‘ অর্থাৎ বিনয়ের গুণ থাকবে; যেমন তাওয়াযু‘ ও বিনয় ছিল আমাদের পূর্ববর্তী বরেণ্য মহামণীষীদের মধ্যে। হযরত মুহাদ্দিস সাহেব রহঃ এর মধ্যে এত বেশী বিনয় ছিল যে, তিনি কখনো নিজেকে মুহ্তামিম বলে পরিচয় দিতেন না। কেউ জিজ্ঞাসা করলে বলতেন, “নিয়ম হিসেবে একজনের নাম থাকতে হয়, সে জন্যে আমার নাম আছে। কিন্তু মাদ্রাসা তো চলে সবার সম্মিলিত মাশওয়ারায়।” হাদীসে আছে, যে আল্লাহর জন্য নত হয় আল্লাহ্ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন।
৮। দুনিয়ার অপেক্ষা দ্বীনদার লোকেরাই তাঁর প্রতি বেশী ভক্তি রাখে। তাঁর সাহচর্যে কিছুদিন থাকলে দুনিয়ার মুহাব্বত কমে যায়। আখেরাতের মুহাব্বত বেড়ে যায়।
৯। সমসাময়িক পরহেযগার মুত্তাকী আলেমগণ এবং সুন্নতের অনুসারী হক্কানী পীরগণ তাঁকে হক্ব বলে মনে করেন।
১০।
অর্থ: আলেমগণ তথা নায়েবে নবীগণই আল্লাহ্ তা‘আলাকে ভয় করে থাকেন।
(সূরা ফাত্বির: ২৮)
উক্ত আয়াত বাস্তবায়নে খোদাভীতি অর্জনে সচেষ্ট হওয়া।
নায়েবে নবীর যে গুণাগুণ আলোচনা করা হলো সেগুলো ধারণ করে আল্লাহ্ তা‘আলা আমাদেরকেও হক্কানী রব্বানী এবং তাঁর প্রিয় বান্দা হওয়ার তাওফীক দান করুন। আমীন ।
মুফতী সানাউল্লাহ্
শিক্ষাসচিব, জামি‘আতুল আবরার
আল-ইসলামিয়া টাঙ্গাইল।