ইসলামে হক আদায়ের গুরুত্ব
মানুষের সঙ্গে যাবতীয় দেনা- পাওনা ও হক পরিশোধ করা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অতুলনীয় সুন্নাত সমূহের অন্যতম একটি সুন্নাত। কোন মুসলমান প্রকৃত ঈমান এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের তাবেদারীর দাবি করতে পারেনা যদি সে লেনদেন ও হক আদায়ে স্বচ্ছ না হয়। মানুষের সাড়া জীবন জুড়েই ব্যাক্তিগত, পারিবারিক বা সমাজ ও সমষ্টিগত লেনদেন বা দেনা-পাওনার সর্ম্পক বিদ্যমান। জীবনযাপন সংসার সমাজে দেনা-পাওনার বাইরে কেও থাকেনা। যদি কেউ ইচ্ছা করে চাকরি, বাণিজ্য বা ধার-দেনার মতো কোনো কাজে নাও জড়ায় তবুও তার উপর উত্তরাধিকার সহ নানারকম অনিবার্য বিষয় এসেই যায়। সেক্ষেত্রেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই সুন্নতটির অনুসরন তার উপর আবশ্যক। হক পরিশোধের গুরুত্ব এবং এ বিষয়ে শরীয়তের কঠোরতা নিম্নোক্ত হাদীস থেকে স্পষ্ট অনুধাবন করা যায়।
عن أبي هريرة قال قال رسول الله – صلى الله عليه وسلم -: “لتؤدن الحقوق إلى أهلها حتى تقاد الشاة الجماء من الشاة القرناء. [صحيح مسلم: ২৫৮২]
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন কেয়ামতের দিন সকল হকদারদের হক অবশ্যই আদায় করা হবে,এমনকি শিংবিহীন ছাগলের হক শিংওয়ালা ছাগলের কাছ থেকে আদায় করে দেয়া হবে।
হক অনাদায়ে হাশরের ময়দানে কি ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টি হবে তা নিম্নোক্ত হাদীস থেকে আরও স্পষ্ট হয়,
عن أبى هريرة – رضي الله عنه -، قال: إن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال: “أتدرون من المفلس قالوا: المفلس فينا من لا درهم له ولا متاع فقال: إن المفلس من أمتي يأتي يوم القيامة بصلاة وصيام وزكاة، ويأتي وقد شتم هذا وقذف هذا وأكل مال هذا وسفك دم هذا وضرب هذا فيعطى هذا من حسناته وهذا من حسناته فإن فنيت حسناته قبل أن يقضى ما عليه أخذ من خطاياهم فطرحت عليهم ثم طرح في النار”. أخرجه م. في البر والصلة. [صحيح مسلم: ২৫৮১]
হযরত আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কেরাম (রা.) কে জিজ্ঞাসা করলেন তোমরা কী জান? হতদরিদ্র কোন ব্যাক্তি? সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন আমাদের মধ্যে যার কোন দীনার,দিরহাম কিংবা আসবাব পত্র নেই সেই দরিদ্র। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বল্লেন আমার উম্মতের মধ্যে নিঃস্ব তো ঐ ব্যাক্তি যে কিয়ামতের দিন অনেক নামায, রোযা এবং যাকাত নিয়ে উপস্থিত হবে সাথে এ নিয়েও উপস্থিত হবে যে, কাউকে গালি দিয়েছে, কারো সম্পদ আত্নসাৎ করেছে, কারোও রক্ত ঝরিয়েছে বা কাউকে হত্যা করেছে। তাকেও পাওনাদারদের সামনে উপস্থিত করা হবে এবং সৎকর্ম দ্বারা একেক করে সকলকে তার আমলনামা থেকে নেক আমল দিয়ে বদলা দেয়া হবে। অতঃপর পাওনাদার শেষ হওয়ার পূর্বেই নেক আমল শেষ হয়ে গেলে পাওনাদারদের গুনাহগুলো তার উপর চাপিয়ে দিয়ে পরিশেষে তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। অপর এক বর্ণনায় এসেছে
عن أبي هريرة، قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم:”رحم الله عبدا كانت عنده لأخيه مَظلمة في عِرض -قال أبو كريب في حديثه: أو مال أو جاه، فاستحله قبل أن يؤخذ منه وليس ثَمَّ دينار ولا درهم، فإن كانت له حسنات أخذوا من حسناته، وإن لم تكن له حسنات حملوا عليه من سيئاتهم” [سنن التررمذى: ২৪১৯]
হযরত আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত রাসূেল আরাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ ফরমান: ঐ ব্যক্তির উপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক, যার কাছে তার ভাইয়ের সম্মান,আভিজাত্য বা সম্পদের অধিকার ছিল। আর উক্ত ব্যাক্তিটি তার নিপীড়িত ভাইয়ের নিকট এসে হিসাবের পূর্বেই নিস্কৃতি নিয়ে নিল। অন্যথায় তাকে সেই দিন পাকড়াও করা হতো , যে দিন কোন দিনার দিরহাম থাকবেনা। ফলে তার নেক আমল নিয়ে নেয়া হবে। যদি তার কোন নেক আমলও না থাকে তাহলে অপর ব্যক্তির গুনাহসমূহ তার উপর চাপিয়ে দেওয়া হবে।এসকল হাদিস দ্বারা নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করা যায়, দুনিয়াতে মানুষে মানুষে শুধু নয় কুল মাখলুকাতের মাঝে বিদ্যমান সকল অন্যায়, বৈষম্য ও বে-ইনসাফীর সমতা বিধান ও সমাধান আখেরাতের আদালতে হবে। কেউ কারো হক নষ্ট করে দুনিয়াতে পার পেয়ে গেলেও আখেরাতে তাকে অবশ্যই পাকড়াও করা হবে।
হাকীমুল উম্মত থানবী (রহ.) বলেন, নেক আমল অথবা তাওবা দ্বারা গুনাহ মাফ হয়ে যায় কিন্তু কারো হক মাফ হয় না। সুতরাং যথাসম্ভব বান্দার হক আদায় করতে হবে এবং সমস্ত হক আদায়ের ব্যাপারে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হতে হবে , তার পরও যদি কিছু বাকি থেকে যায় এবং মৃত্যু এসে যায় তখন আল্লাহ্ তা‘আলার কাছে আশা করা যায় তিনি তাকে দায় মুক্ত করে দিবেন ,অর্থাৎ মাজলুমকে খুশি করে জালিমের মাগফেরাত করে দেবেন। তরীকাটা এমন হবে যে তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা হকদারদের বলবেন দেখ,আমার এই বান্দা তোমাদের হক আদায়ে যথাসাধ্য চেষ্টা ও করেছিল কিন্তু তার যেন্দেগী খতম হয়ে যাওয়ায় হক আদায়ের কাজ সে সমাপ্ত করতে পারেনি, এখন আমি তোমাকে বড় বড় নেয়ামত দিচ্ছি , তোমরা খুশি হয়ে তাকে মাফ করে দাও।
কেউ যদি তাওবা করেই ভাবে যে দায়মুক্ত হয়ে হয়ে গেছে আর কিছুর প্রয়োজন নেই তাহলে এটা হবে শয়তানের ধোকা বরং তাওবা করার পর চিন্তা করে বের করতে হবে আমার উপর কি কি হক ওয়াজিব ছিলো হোক সেটা বান্দার বা আল্লাহ্র সেগুলো আদায় করা শুরু করতে হবে।
নারীর উত্তরাধিকার আদায়ের গুরুত্ব
ইসলাম পূর্বকালে আরব ও অনারব জাতিসমূহের মধ্যে দূর্বল শ্রেণী এতিম,বালক-বালিকা ও অবলা নারী চিরকালই জুলুম নির্যাতনের শিকার ছিল। প্রথমত তাদের কোন অধিকারই স্বীকার করা হতনা, কোন অধিকার স্বীকার করা হলেও পুরুষদের কাছ থেকে আদায় করে নেয়ার সাধ্য কারো ছিলনা।
ইসলাম সর্বপ্রথম তাদের ন্যায্য অধিকার প্রদান করে এরপর এসব অধিকার সংরক্ষণেরও চমৎকার ব্যবস্তা করে। উত্তরাধীকার আইনেও জগতের সাধারণ জাতিসমূহ সমাজের উভয় প্রকার দূর্বল অঙ্গকে তাদের স্বাভাবিক ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রেখেছিল। আরবদের নিয়মই ছিল এই যে যারা অশ্বারোহন করে এবং শত্রুদের মুকাবেলা করে তাদের অর্থ সম্পদ লুট করার যোগ্যতা রাখে তারাই শুধুমাত্র উত্তরাধীকারের যোগ্যতা হতে পারে। বলাবাহুল্য, বালক-বালীকা ও নারী উভয় প্রকার দুর্বল শ্রেণী এই নিয়মের আওতায় পরেনা। তাই তাদের নিয়ম অনুযায়ী শুধুমাত্র যুবক ও বয়প্রাপ্ত পুত্রই ওয়ারিশ হতে পারতো। কন্যা কোন অবস্থাতেই ওয়ারিস বলে গণ্য হতোনা। প্রাপ্ত বয়স্কা হোক, বা অপ্রাপ্ত বয়স্কা। পুত্র সন্তান অপ্রাপ্ত বয়স্ক হলেও সে উত্তরাধিকারের যোগ্য বলে বিবেচিত হত।
এছাড়া কুরআনে কারীমে মিরাছের যে আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে তাও ছিল এক মজলুম নারীর সন্তানদের অসহায়ত্ব ও বঞ্চনার অভিযোগের ভিত্তিতে । ওহীর মাধ্যমেই এই নিপীড়ন মুলক আইনের পরিবর্তন সাধন করা হয়, সূরায়ে নিসাতে যার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। আল্লাহ্ তাআলা ইরশাদ করেন, لِلرِّجَالِ نَصِيبٌ مِمَّا تَرَكَ الْوَالِدَانِ وَالْأَقْرَبُونَ وَلِلنِّسَاءِ نَصِيبٌ مِمَّا تَرَكَ الْوَالِدَانِ وَالْأَقْرَبُونَ مِمَّا قَلَّ مِنْهُ أَوْ كَثُرَ نَصِيبًا مَفْرُوضًا
পিতা মাতা ও আত্বীয়-স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে পুরুষদের ও অংশ রয়েছে এবং পিতা-মাতা ও আত্বীয়-স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে নারীদের ও অংশ রয়েছে,অল্প হোক কিংবা বেশী। এ অংশ নির্ধারিত। (সূরা নিসা: ৭)
এই আয়াতের শেষে বলা হয়েছে এ অংশ নির্ধারিত। অর্থাৎ ওয়ারিশদের জন্য কুরআনের বর্ণিত অংশগুলো আল্লাহ্র পক্ষ হতে নির্ধারিত অংশ, এতে কারো নিজস্ব অভিমত ও অনুমানের ভিত্তিতে পরিবর্তন পরিবর্ধন করার কোন অধিকার নেই। এছাড়া উত্তরাধীকারের মাধ্যমে যে মালিকানা হয় তা
বাধ্যতামূলক, এতে ওয়ারিশদের কবুল করা বা সম্মত হওয়ার কোন শর্ত নয়, বরং সে যদি স্পষ্ট বলে যে, সে তার অংশ নেবেনা, তবুও আইনত সে নিজের অংশের মালিক হয়ে যায়। এটা ভিন্ন কথা যে,মালিক হওয়ার পর শরিয়তের বিধান অনুযায়ী অন্য কাউকে দান, বিক্রি অথবা বিলী বন্টন করে দিতে পারবে। (মাআরেফুল কুরআন) মীরাছ বন্টনের ক্ষেত্রে সকলেই সমান অংশিদার হবেনা বা কেউ কেউ নিকটাত্নীয় হওয়া সত্বেও কোন অংশ পাবেনা। তথাপি বঞ্চিত আতী¡য়দের মনতুষ্টি বিধানের জন্য আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-
وَإِذَا حَضَرَ الْقِسْمَةَ أُولُو الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينُ فَارْزُقُوهُمْ مِنْهُ وَقُولُوا لَهُمْ قَوْلًا مَعْرُوفًا “সম্পত্তি বন্টনের সময় যখন আত্বীয়-স্বজন এতিম ও মিসকীন উপস্থিত হয়, তখন তা থেকে তাদের কিছু খাইয়ে দাও এবং তাদের সাথে কিছু সদালাপ করো।“ (সূরা নিসা: ৮)
অর্থাৎ যেসব দূরবর্তী আত্বীয়-স্বজন, এতীম মিসকিন ত্যজ্য সম্পত্তির অংশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে যদি তারা বন্টনের সময় উপস্থিত থাকে তবে অংশীদারদের নৈতিক দায়িত্ব হচ্ছে এ মাল থেকে সেচ্ছায় তাদের কে কিছু দেয়া। এটা তাদের জন্য এক প্রকার সদকা ও সওয়াবের কাজ।
পিতৃবিয়োগের পর পৈতৃক সম্পদ ভাই বোনদেরকে অথবা দাদার ইন্তেকালের পর বাপ চাচা ফুফুদের কে তাদের ন্যায্য প্রাপ্য হিসাবে দিয়ে দেওয়া তো দুরের কথা নারীদের প্রাপ্য সম্পদে আজ তাদের কোন অধিকার আছে বলেও স্বীকার করা হচ্ছে না, ইসলামে এ মীরাছ বা ত্যাজ্য সম্পদ বন্টন এক দিকে যেমন মানবধিকার সম্পর্কিত, অন্যদিকে তা মহাস্রষ্টার অপরিহার্য নির্দেশিও বটে, কিন্তু আজ মৃত্যের পরিত্যক্ত সম্পদের সুষ্ঠ বন্টন তো দুরের কথা তার স্বীকারোক্তিটুকুও সমাজ থেকে বিদায় নিয়েছে। মেরাছ সংক্রান্ত বিষয় বিস্তারিত আলোচনা করার পর যারা এই বিধানের ব্যাপারে যত্নবান হবে এবং মানতে সচেষ্ট থাকবে তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,
تِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ يُدْخِلْهُ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا وَذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ এগুলো (মেরাছ সংক্রান্ত আহকাম ও এতিম সম্পর্কীয় নির্দেশাবলী) আল্লাহ্ তাআ‘লার নির্ধারিত সীমারেখা। যে কেউ আল্লাহ্ ও তার রাসূলের আনুগত্য করবে আল্লাহ্ তাআ‘লা তাকে জান্নাতে দাখিল করবেন যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত; সেখানে তারা স্থায়ী হবে এবং ইহা মহাসাফল্য।” (সূরা নিসাঃ১৩) পক্ষান্তরে যারা এসকল বিধানের ব্যাপারে উদাসিনতা বা শিথিলতা প্রদর্শন করবে তাদের ব্যাপারে কুরআনে কারীমে অত্যন্ত কঠোর বাণি এসেছে, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَتَعَدَّ حُدُودَهُ يُدْخِلْهُ نَارًا خَالِدًا فِيهَا وَلَهُ عَذَابٌ مُهِينٌ “আর কেউ আল্লাহ্ ও তার রাসূলের অবাধ্য হলে এবং তার নির্ধারিত সীমারেখা লংঘন করলে তিনি তাকে দোযখে নিক্ষেপ করবেন, সেখানে সে স্থায়ী হবে এবং তার জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি।” (সূরা নিসা: ১৪)
নারীদের উত্তরাধিকার আদায়ের ব্যাপারে বর্তমানে সামাজিক চিত্র
অধিকাংশ ক্ষেত্রে সমাজের বর্তমান অবস্থা অবলোকন করলে আমরা দেখতে পাই পিতার মৃত্যুতে ক্ষমতাবান পুত্র তার সবটুকু সম্পত্তিই গ্রাস করে নিচ্ছে, ভাইয়েরা একযোগে গোটা সম্পদ আত্বসাৎ করে ফেলছে। দাপট দেখিয়ে বোনদের সম্পূর্ন বঞ্চিত করে দিচ্ছে। এতে শেষ পর্যন্ত তার পৈতৃক ভিটায় আসাটাই বন্ধ হয়ে যায় । কোনো বোন যদি উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ হস্তগত করে অথবা নিজ প্রয়োজনে বিক্রি করতে চায় তাহলে ভাইদের মানসপট থেকে বোনের অস্তিত্বও মুছে ফেলে। ছিন্নভিন্ন করে দেয়া হয় আত্বীয়তার বন্ধন। যদি কোন জামাতা স্ত্রীর প্রাপ্য পৈতৃক সম্পত্তির অধিকার আদায় করে নেয় বা নিতে চায় তাহলে মুছে যায় তার কপাল থেকে শশুরালয়ের আদর আপ্যায়ন টুকু। এসব আচার আচরণ থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, আদর আপ্যায়ন সম্মান ভালোবাসা ,আত্বীয়তার বন্ধন সবই ছিল সম্পদকে কেন্দ্র করে। অথচ ভাইদের এমন বন্ধু-বান্ধব বা এমন ঘনিষ্ঠজন যাদের সাথে সম্পদের কোন সর্ম্পক নেই, অথচ তারা তাদের আনন্দ উৎসবে কখনো বঞ্চিত হয়না। বঞ্চনার স্রোতে ভেসে যায় কেবল রক্তের বন্ধন। নারীদের উত্তরাধীকার না দেয়ার হেতু
মেয়েদের উত্তরাধিকার না দেয়ার মানসিকতা বিশ্লেষণ করলে এর প্রধান কারণ যেটা দেখা যায় তা হচ্ছে বিয়ের পর মেয়েকে তার বাপ ভাইয়েরা অন্য বাড়ি বা গোষ্টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা চিন্তা করে । সুতরাং তাকে সম্পদ দেয়ার অর্থই হল অন্য বংশের মানুষের হাতে সম্পদ তুলে দেয়া। আর এর পেছনে অন্য আরেকটি কারণ লুকায়িত থাকে , তা হচ্ছে মানুষ সাধারণত ছেলে বা ছেলের সন্তানদেরকেই বংশধর মনে করে থাকে আর মেয়ের ঘরের সন্তানদের শুধু আদরের নাতী বা নাতনী মনে করে, আওলাদ বা বংশধর জ্ঞান করেনা। অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ভাষ্যনুযায়ি মেয়ের গর্ভজাত নাতী – নাতনীও আওলাদ হিসাবে পরিগণিত। স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসান ও হুসাইন রা. কে নিজের আওলাদ বলেছেন। (বুখারী শরীফ, হাদীস নং ৭১০৯)
উক্ত বিষয় সর্ম্পকে সচেতন হলে বা অবহিত থাকলে মেয়ে ও মেয়ের ঘরের সন্তানদের উত্তরাধীকারী মনে করতে কষ্ট হতনা । গুরুত্বপুর্ন কথা হল মেয়ের পর তার সম্পত্তি কে বা কারা খাবে এটাতো তাদের চিন্তার বিষয় নয়, তাদের দায়িত্ব হচ্ছে ভাই ও বোনদের প্রাপ্য অধিকার আল্লাহর বিধান মত প্রত্যেকের অংশ তাদের ভোগ দখলে দিয়ে দেয়া।
মেয়েদের মীরাছ না দেয়ার দ্বিতীয় কারণ
মেয়েদের মীরাছ না দেয়ার আরেকটি বড় কারণ এই যে, হল পিতার কাছে ছেলের ভবিষ্যৎ চিন্তাটা খুবই প্রকট হয়ে থাকে। এই চিন্তার ফলে তিনি মেয়ের ভতিষ্যতের গোটা হক সর্ম্পকে আত্নবিস্মৃত হয়ে যায়। তার এই অবস্থাদৃষ্টে ছেলেদের মনেও পরবর্তীতে বোনদের হক বা পাওনা আদায়ের গুরুত্ত্বটা কমে যায়। কখনোও এমনও হয় যে পিতা মাতা ছেলেদের সুবিধার কথা চিন্তা করে মেয়েদের কে পৈতৃক অধিকার ছেড়ে দেয়ার জন্য উৎসাহিত করেন। পিতার জীবদ্দশায় একে তো মালিকই নয় তদুপরি পিতা মাতার আবদার বা উৎসাহ । এমতাবস্থায় মেয়ে সংকোচে না নেওয়ার কথাই বলে দেয়। আর ভবিষ্যতে ভাইদের জন্য বোনদের না দেয়ার পক্ষে এটা দলীল হয়ে দাড়ায়।
সমাজে এমন লোকও রয়েছেন যারা এমন পন্থা অবলম্বন করেন যা পরকালীন ধ্বংসের পথ ! পিতা ছেলে,স্ত্রী বা কোন আত্নীয় স্বজনদের প্ররোচনায় অথবা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কন্যাদের যৎসামান্য দিয়ে বা একেবারে মাহরুম করে ছেলেদের নামে সম্পত্তি লিখে দেয়। শহরে হোক বা উপশহরে বাড়িটা ছেলেদের নামে লিখে দেয়। যার মূল্য কোটি বা কয়েক কোটি টাকা। আর মেয়েদের জন্য বরাদ্দকৃত নীচু বা খালি জমিন যার মূল্য হয় কয়েক লক্ষ টাকা। যেখানে শরীয়ত এক ভাইয়ের অংশ দুই বোনের অংশের সমান নির্ধারিত সেখানে ভাইয়ের অংশ বোনের অংশের দশ, বিশ গুণ হয়ে যায়। এতো না দেয়ার মতই। একটি বিষয় আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন তা হল অন্যের দুনিয়া গুছিয়ে দেয়ার জন্য নিজের আখেরাতকে ধ্বংস করা কোন বিবেকবান মানুষের কাজ হতে পারেনা। তাই বে-ইনসাফী বা পক্ষপাতিত্ত্বমূলক কোন সিদ্ধান্ত যেন না হয় সেদিকে গভীরভাবে লক্ষ্য রাখতে হবে।
হাকীমুল উম্মত মুজাদ্দিদে মিল্লাত থানভী রহ: এর কাছে বাইআত হওয়ার জন্য একটি ফরম পুর্ণ করতে হতো। তাতে লেখা ছিল آپ کے پاس کوئی موروثی زمین تو ہے نہیں ؟ অর্থাৎ আপনার নিকট কারো ওয়ারিসী সম্পত্তি নেই তো ? অর্থাৎ বোন ফুফু অথবা অন্য কারো উওরাধীকার সম্পত্তি দখলে থাকলে তা পাওনাদারকে পৌছানো পর্যন্ত হযরত তাকে বাইআত করা তো দুরের কথা নিজ দরবারে থাকতেই দিতেন না। কেননা, অপরের সম্পদ না হক ভাবে খেয়ে আল্লাহর পথের পথিক হওয়া যায় না ।
ওলীয়ে কামেল মুহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর রহ: বলতেন ভাই যদি বোন, ফুফুর কাছে সম্পত্তি না দেয়ার জন্য মাফ চায় এবং তারা মাফ করে দেয় তবুও মাফ হয় না। কারণ এটা লৌকিকতা মাত্র। অন্তর থেকে মাফ করা হয় না ।
উওরাধিকার না নেয়া না দেয়া বিষয়টি এতই ব্যাপকতা ধারণ করেছে যে বর্তমানে আমাদের দেশে বাপের বাড়ির সম্পত্তি নেয়াকে দোষের বিষয় মনে করা হয়। যার ফলে মীরাছের আলোচনা আসলেই মেয়েরা সহজেই না করে দেয়। আর ভাই যদি মাফ চায় তাহলে তো কথাই নেই।
মেয়েদের মীরাছ বা উত্তরাধীকার না দেয়ায় প্রবনতা ও মানীষিকতা দুনিয়ার মহলে তো কথাই নেই, দ্বীনদার মহলেও কারো কারো মধ্যে উক্ত বিষয়ে বেশ শিথীলতা লক্ষ্য করা যায়। দ্বীনি ভাবধারায় অধিকারী, ব্যক্তি জীবনে আমলী এমনকি দ্বীনী খেদমতে নিবেদিত হয়েও তারা বোন ফুফুদের হক তথা হুকুকুল ইবাদত সম্বন্ধে গাফেল রয়েছে । এই গাফলতি ও শিথিলতা সাধারাণ ও দুনিয়াদার মানুষের জন্য বোন ফুফুদের মীরাছ না দেয়ায় পক্ষে কাজ করে।
উপসংহার
পিতা নিজেই এব্যপারে সর্বাধিক গুরুত্ত্বর্পূণ ভুমিকা পালন করেত পারেন। আমরা প্রায় সকলেই ছেলে মেয়েদের পিতা। আমাদের দায়িত্ব এই যে মুসলমান হিসাবে আমরা পবিত্র কুরআনে ঘোষিত উত্তরাধিকার আইন ও বিধানের কথা ঘরে পরিবারে ও সমাজে সকলের সঙ্গে আলোচনা করতে থাকা, শরীয়তের এই ফরজ বিধানের বিষয় ভুলে গিয়ে আমরা আমাদের মা বোনদের অধিকার থেকে মাহরুম করে আল্লাহর গযবে ও পরকালের কঠোর শাস্তির দিকে অগ্রসর হচ্ছি এদিকে পরস্পরের মনোযোগ আকর্ষণ করে ভবিষ্যতের জন্য সর্তক হওয়া।
সর্বোপরি দেশের উলামায়ে কেরাম বয়ান ও লিখনীর মাধ্যমে, আইমায়ে মাসাজিদ মসজিদের মেম্বার থেকে সমাজের চিন্তাশীল ও সমাজকর্মীরা যদি এই আওয়াজ তোলে যে আমরা সকলে মিলে কী কর্মপন্থা অবলম্বন করবে। যার মাধ্যমে আমাদের নারীরা বঞ্চনার কবলে থেকে রক্ষা পাবে। সে কর্মপন্থা দেশবাসীর সামনে তুলে ধরা, যাতে সমাজের সকলে অবগত হয়ে সামাজিক এই অবক্ষয় থেকে আমরা রক্ষা পেতে পারি এবং শরীয়তের মৃতপ্রায় একটি ফরজ বিধানকে জীবিত করার গুরু দায়িত্ত্ব পালন করে আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারি। আল্লাহ আমাদের তাওফীক দান করুন। আমীন!!