পর্দা শব্দটি মূলত একটি ফার্সী শব্দ। যার অর্থ আবরণ বা ঢাকনা। পর্দার সংজ্ঞা করতে গিয়ে একশ্রেণীর জ্ঞানপাপীরা অবরোধ বা নারীকে চার দেয়ালের ভিতর গৃহবন্দী করে রাখা ইত্যাদি অশালীন শব্দ দ্বারা আখ্যায়িত করে। তাদের নিকট পর্দা একটি সমালোচনার বিষয়। প্রাচীনকালের গোড়ামী, প্রগতী ও উন্নতির অন্তরায়। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে পর্দা হচ্ছে একটি বিশেষ আমল । পোষাক ও আবরণের মাধ্যমে বিশুদ্ধ ও পবিত্র জীবন গঠন করা। সকল যুগে পর্দা একটি সামাজিক ভদ্রতার প্রতিক এবং আভিজাত্যের পরিচায়ক। সামাজিক প্রেক্ষাপটে এটি একটি বহুল আলোচিত বিষয়। যা মুসলমানদের বিশেষ একটি শ্রেণীর নিকট অত্যন্ত মর্যাদার বিষয়। তারা চান মানুষ পর্দার মাধ্যমে আল্লাহ রাসূল প্রদত্ত বিধান মেনে পশুত্বকে বাদ দিয়ে সৃষ্টির সেরা হিসেবে বেঁচে থাক। আবহমানকালের এ চিররীতি বজায় রেখে সমাজ জীবনের ভিতকে মজবূত করুক। পারিবারিক বন্ধনকে করুক আরো দৃঢ়। পর্দার মূল লক্ষ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে পরপুরুষের সামনে নারীদের রূপ লাবণ্য প্রকাশ না করা। অনেকে মনে করে পর্দার বিধান শুধু নারীদের জন্য, পুরুষের জন্য নয়। তাদের ধারণাটি সঠিক নয়। বরং নারী-পুরুষ উভয় শ্রেণীর জন্য পর্দার বিধান অপরিহার্য। তবে উভয়ের ক্ষেত্রে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। যে শ্রেণীর জন্য যে পর্দা উপযোগী তাকে সেভাবে পর্দা করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যে কোনো ন্যায়নিষ্ঠা ব্যক্তিই কুরআন সুন্নাহর পর্দা সম্পর্কিত আয়াত ও হাদীস সমূহ গভীরভাবে অধ্যায়ন করলে এই বাস্তবতা স্বীকার করবেন যে, ইসলামে পর্দার বিধানটি অন্যান্য হিকমতের পাশাপাশি নারীর সম্মান, মর্যাদা ও সামাজিক পবিত্রতা রক্ষার জন্যই দেয়া হয়েছে। এই বিধানের কারণে মুসলিম অমুসলিম নির্বিশেষে সকলের ইসলামের প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত এবং অযথা এ বিধান সম্পর্কে আপত্তি বা আপত্তিকর মন্তব্য না করা উচিত। নারী পুরুষ উভয়ের পবিত্রতা রক্ষার অতি সহজ ও কার্যকর উপায় হল ইসলামের পর্দা ও হিজাব বিধান । এই বিধানের মাধ্যমেই মনের পবিত্রতা অর্জন করা সম্ভব। পর্দার এই সুফল স্বয়ং আল্লাহ তা‘আলা ঘোষণা দিয়েছেন এভাবে, “এ বিধানে তোমাদের ও তাদের অন্তরের জন্য অধিকতর পবিত্রতার কারণ।” (সূরা আহযাবঃ ৫৩) সুতরাং মানবসমাজকে পবিত্রতা ও পঙ্কিলতামুক্ত রাখতে পর্দা বিধানের কোনো বিকল্প নেই। বিশেষ করে সমাজের যুবক ও তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা ও
নারীজাতির নিরাপত্তার জন্য পর্দা বিধানের পূর্ণ অনুসরণ এখন সময়ের দাবি। আমরা কুরআন সুন্নাহর দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখতে পাই নারীদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো দুইভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। একটি হচ্ছে সতর অপরটি হচ্ছে পর্দা। সতরের ক্ষেত্রে চেহারা, দুই হাতের কব্জি এবং দুই পায়ের গিরার নিচের অংশ ধর্তব্য নয়। যা নামাযের সময় খোলা রাখতে বলা হয়েছে। কিন্তু পর্দার ক্ষেত্রে চেহারাসহ সম্পূর্ণ শরীরকেই গণ্য করা হয়েছে। সতর এবং পর্দার এই দুইয়ের পার্থক্য না বুঝার কারণে অনেকে মনে করেন, নারীদের চেহারা খোলা রাখা জায়েয। বাস্তবে এটা নিয়ে সমাজে অনেকে ভুলের মধ্যে রয়েছে। প্রথমেই আমাদের যে জিনিসটি মনে রাখতে হবে তা হল, ফেতনা সৃষ্টির কারণেই পর্দার আদেশ দেওয়া হয়েছে। কারণ, নারীদের খোলা চেহারা তাদের সৌন্দর্যের সমাগম বা কেন্দ্র। বর্তমান সময়ে খারাপ কাজের আধিক্য ও ব্যভিচারের ঘটনাগুলো নারীদের ফেতনা সৃষ্টির ভয়কে আরও তীব্রতর করে তুলেছে। যেখানে আল্লাহ তা‘আলা নারীদের কন্ঠের কোমলতা বর্জন করতে আদেশ দিয়েছেন। সেখানে আল্লাহ তা‘আলা তাদের চেহারা খোলা রাখার অবকাশ কিভাবে দিতে পারেন? কুরআন সুন্নাহর আলোকে আমরা সারগর্ভ আলোচনা করার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ্। কুরআনে কারীমে চেহারা ঢেকে রাখার বিধান
আয়াত: ১
আল্লাহ তা‘আলা মুমিনদেরকে নবী-পত্নীগণের বিষয়ে আদেশ করেন- وَ اِذَا سَاَلْتُمُوْهُنَّ مَتَاعًا فَسْـَٔلُوْهُنَّ مِنْ وَّرَآءِ حِجَابٍ ؕ ذٰلِكُمْ اَطْهَرُ لِقُلُوْبِكُمْ وَ قُلُوْبِهِنَّ
যখন তোমরা তাদের (নবী-পত্নীগণের) কাছে কোনো জিনিস চাইবে, তখন পর্দার আড়াল থেকে চাইবে। এটি তোমাদের ও তাঁদের অন্তরের জন্য অধিকতর পবিত্রতা দানকারী। (সূরা আহযাব: ৫৩)
প্রখ্যাত মুফাস্সির আল্লামা ইবনে কাসীর রহ. উক্ত আয়াতের তাফসীরে লিখেছেন, যখন নবীপত্নিদের নিকট তোমাদের কোনো প্রয়োজন থাকে তখন পর্দার আড়াল থেকে চাও। তাদের দিকে তাকানো তোমাদের জন্য সম্পূর্ণভাবে নিষেধ। (৩/২৩৬ ইবনে কাসীর)
আরবী পাঠ:
لَا تَنْظُرُوا إِلَيْهِنَّ بِالْكُلِّيَّةِ، وَلَوْ كَانَ لِأَحَدِكُمْ حَاجَةٌ يُرِيدُ تَنَاوُلَهَا مِنْهُنَّ فَلَا يَنْظُرْ إِلَيْهِنَّ، وَلَا يَسْأَلْهُنَّ حَاجَةً إِلَّا مِنْ وَرَاءِ حِجَابٍ এ আয়াতে সুস্পষ্টভাবে আদেশ করা হয়েছে, নবী পত্নীগনের সাথে কথা বলতে হলে পর্দার আড়াল থেকে কথা বলতে হবে।
উক্ত আয়াত সম্পর্কে আল্লাম্া জাসসাস রহ. লিখেছেন আয়াতটি যদিও নবীপত্নীদের ক্ষেত্রে তবে বিধানটি অন্যদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কেননা, আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আনুগত্য ও অনুসরণে আদিষ্ট। তবে যা তার জন্য খাছ তা ভিন্ন বিষয়। (৩/৪৮৩ আহকামুল কুরআন)
আরবী পাঠ: وهذا الحكم وإن نزل خاصا في النبي صلى الله عليه وسلم وأزواجه فالمعنى عام فيه وفي غيره، إذ كنا مأمورين باتباعه والاقتداء به إلا ما خصه الله به دون أمته
আল্লামা সানাউল্লাহ্ রহ. তার বিখ্যাত তাফসীরে মাযহারীতে ইমাম বগবী রহ. এর বরাতে উল্লেখ করেছেন, তোমাদের কারো জন্য নবীপতীœদের দেখার অনুমতি নেই। (তাফসীরে মাযহারী ৭/৩৭৩)
আরবী পাঠ: مِنْ وَرَاءِ سِتْرٍ، فَبَعْدَ آيَةِ الْحِجَابِ لَمْ يَكُنْ لِأَحَدٍ أَنْ يَنْظُرَ إِلَى امْرَأَةٍ مِنْ نِسَاءِ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ
ইমাম কুরতুবী রহ: বলেন, উক্ত বিধানের আওতায় সকল মহিলা অন্তর্ভুক্ত হবে। তিনি আরো বলেন মহিলাদের পুরো আপাদমস্তক পর্দার অন্তর্ভুক্ত। (কুরতুবী: ৭/৫২০)
আরবী পাঠ: وَيَدْخُلُ فِي ذَلِكَ جَمِيعُ النِّسَاءِ بالمعنى َبِمَا تَضَمَّنَتْهُ أُصُولُ الشَّرِيعَةِ مِنْ أَنَّ الْمَرْأَةَ كُلُّهَا عَوْرَةٌ
বিশিষ্ট মুফাসসির আল্লামা ওয়াহেদী রহ. বলেন, এ আয়াত নাযিল হওয়ার পূর্বে নারীরা পুরুষের সম্মুখে আসতো। যখন এ আয়াত নাযিল হয়, তখন নারীদের উপর পর্দার বিধান আরোপ করা হয়। তাই এ আয়াতকে নারী পুরুষের মাঝে পর্দার বিধানকারী আয়াত বলা হয়। (আল ওয়াজীয ফী তাফসীরিল কিতাবিল আযীয ৭/২২২)
আরবী পাঠ: وكانت النِّساء قبل نزول هذه الآية يبرزن للرِّجال فلمَّا نزلت هذه الآية ضرب عليهنَّ الحجاب فكانت هذا آية الحجاب بينهنَّ وبين الرِّجال
আয়াত: ২ আল্লাহ তা‘আলা বলেন, یٰۤاَیُّهَا النَّبِیُّ قُلْ لِّاَزْوَاجِكَ وَ بَنٰتِكَ وَ نِسَآءِ الْمُؤْمِنِیْنَ یُدْنِیْنَ عَلَیْهِنَّ مِنْ جَلَابِیْبِهِنَّ
হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রী, মেয়ে ও মুমিন নারীদের বলে দিন, তারা যেন তাদের জিলবাব (বড় চাদর)-এর কিছু অংশ তাদের উপর ঝুলিয়ে দেয়। সূরা আহযাব ৫৯ আয়াতে বলা হয়েছে নারীরা যেন তাদের বড় চাদরের কিছু অংশ নিজেদের উপর ঝুলিয়ে দেয়।
অর্থাৎ তারা বের হওয়ার সময় ‘জিলবাব’ তো পরবেই, এরপর এই পরিহিত জিলবাবের কিছু অংশ নিজেদের উপর ঝুলিয়ে দিবে।
উক্ত আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা এভাবে বলেননি যে, তারা যেন বের হওয়ার সময় জিলবাব পরে; বরং বলেছেন, তারা যেন তাদের পরিহিত জিলবাবের কিছু অংশ নিজেদের উপর ঝুলিয়ে দেয়। জিলবাব তো তারা পরেছেই; এর পরও বলা হচ্ছে, সেটার কিছু অংশ নিজেদের উপর ঝুলিয়ে দিবে। এর অর্থ কী ? এর অর্থ হল, নারীরা জিলবাব তো পরবেই; সাথে সাথে জিলবাবের কিছু অংশ তাদের চেহারার উপর ঝুলিয়ে দিবে। যদি এ আয়াতে তাদেরকে চেহারা ঢাকা ছাড়া শুধু জিলবাব পরার আদেশ দেয়া হতো, তাহলে শুধু এভাবে বলা হতো, ‘তারা যেন জিলবাব পরে’। কেননা, চেহারা ঢাকা ছাড়া জিলবাব পরলে সেটাকে শুধু জিলবাব পরাই বলা হয়। তখন আয়াতে এভাবে বলা হতো না যে, ‘তারা যেন নিজেদের উপর তাদের জিলবাবের কিছু অংশ ঝুলিয়ে দেয়’।
ইবনে আব্বাস রা. এ আয়াতের ব্যখ্যায় বলেন, أمر الله نساء المؤمنين إذا خرجن من بيوتهن في حاجة أن يغطين وجوههن من فوق رؤوسهن بالجلابيب ويبدين عينا واحدة
আল্লাহ মুমিন নারীদেরকে আদেশ দিয়েছেন, তারা যখন ঘর থেকে বের হবে, তখন তারা পুরো চেহারা ঢেকে বের হবে। তবে শুধু এক চোখ খোলা রাখবে। (তাফসীরে তবারী ২০/৩২৪) আবীদা আস্সালমানী রহ. এর তাফসীর সাহাবীদের পর কুরআন-হাদীস তথা শরী‘আত সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী হলেন তাবেয়ীগণ। আবীদা রহ. তাবে‘য়ীন যুগের এক নক্ষত্র। ইসলামী ইতিহাসে সাহাবীদের পরে এক বিরাট ব্যক্তিত্ব। তিনিও ইবনে আব্বাসের মতোই আলোচ্য আয়াতের ব্যাখ্যা করেন। বিখ্যাত তাবে‘য়ী মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন রহ. বলেন, আমি আবীদা আস্সালমানীকে এ আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করি। (অর্থাৎ, নারীরা কীভাবে তাদের উপর জিলবাব ঝুলিয়ে দিবে?) তিনি তখন তার মাথা ও চেহারা ঢেকে শুধু বাম চোখ খোলা রেখে আমাকে তা দেখিয়ে দেন। আরবী পাঠ عن ابن سيرين قال: سألت عبيدة عن قوله (قُلْ لِّاَزْوَاجِكَ وَ بَنٰتِكَ وَ نِسَآءِ الْمُؤْمِنِیْنَ یُدْنِیْنَ عَلَیْهِنَّ مِنْ جَلَابِیْبِهِنَّ) قال: فقال بثوبه، فغطى رأسه ووجهه، وأبرز ثوبه عن إحدى عينيه (তাফসীরে তবারী ২০/৩২৫)
আবীদা রহ. হযরত আলী রা. ও ইবনে মাস‘ঊদ রা. এর বিশিষ্ট ছাত্র। তাহলে বোঝা যায়, তিনি এ ব্যাখ্যা তাঁদের থেকেই শিখেছেন। অতএব, বলা যায় এটি আলী রা. ও ইবনে মাস‘ঊদ রা. এরও ব্যাখ্যা।
ইবনে সীরীন রহ. এর তাফসীর তাবে‘য়ীদের মধ্যে আরেক বড় তাবে‘য়ী হলেন মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন। যাকে বসরা নগরীর শ্রেষ্ঠ তাবে‘য়ী বলা হয়। তিনিও এ আয়াতের ব্যাখ্যা এভাবে করেছেন تُغَطّي إحدى عينيهَا وجبهتَها والشِّقّ الآخر، إلاّ العين নারীরা বের হওয়ার সময় এক চোখ ছাড়া পুরো চেহারা ঢেকে নেবে। (মা‘আনিল কুরআন, খ. ২, পৃ. ৩৪৯) ইকরিমা রহ.-এর তাফসীর ইকরিমা রহ. এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, تُدْني الْجِلْبَابَ حَتّى لَا يُرَى ثَغْرَةُ نَحْرِهَا জিলবাব এমনভাবে ঝুলিয়ে দিবে যে, তার গলার কোটর পর্যন্তও যেন দেখা না যায়। (তাফসীরে ইবনে আবী হাতেম ১০/৩১৫৫) অর্থাৎ, পুরো শরীর তো ঢাকবেই, সাথে সাথে মাথার উপর থেকে গলদেশ পর্যন্ত জিলবাব ঝুলিয়ে দিয়ে ঢেকে নিবে। এখন আমরা দেখব উক্ত “جلباب” শব্দের ক্ষেত্রে মুফাসসিরিনগণ কি বলেন জিলবাব এমন কাপড়কে বলে যদ্বারা মহিলারা নিজেদের শরীর ঢাকেন। জিলবাব অর্থ বড় চাদর, যা দ্বারা মুখমণ্ডল ও পূর্ণ দেহ আবৃত করা যায়। (কুরতুবী, আল-জামে‘ লিআহকামিল কুরআন : ১৪/২৪৩) আল্লামা আলূসী রহ. আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর বরাত দিয়ে লিখেন, জিলবাব সেই চাদরকে বলে যা মহিলারা দেহের ওপর থেকে নীচ পর্যন্ত উড়িয়ে ছেড়ে দেয়। (রুহুল মা‘আনী: ২২/৮৮) আল্লামা ইবন হাযম রহ. লিখেন আরবী ভাষায় জিলবাব এমন কাপড়কে বলা হয় যা সারা শরীর অচ্ছাদন করে। যে কাপড় সমস্ত শরীর ঢাকে না, সে কাপড়ের ক্ষেত্রে ‘জিলবাব’ শব্দটির প্রয়োগ সঠিক ও শুদ্ধ নয়। (আল-মুহাল্লা: ৩/২১৭) রূহুল মা‘আনী গ্রন্থের লেখক ﻳُﺪۡﻧِﻴﻦَ ﻋَﻠَﻴۡﻬِﻦَّ এর তফসীরে লিখেছেন, শব্দটি
অভিধানে কোনো জিনিস নিকটবর্তী করা অর্থে বলা হয়। এখানে শব্দটি ঝুলানো এবং ফেলে দেওয়া অর্থে এসেছে। কারণ, শব্দটিকে এখানে ﻋَﻠَﻲۡ দ্বারা হয়েছে। (রুহুল মা‘আনী: ২২/৮৮)
আল্লামা যামাখশারী রহ. শব্দটির ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লিখেন, এর অর্থ, মহিলারা নিজেদের মুখমণ্ডলের ওপর চাদর টেনে দেবে। যেমন কোনো মহিলার মুখমণ্ডল থেকে নিকাব সরে যায় তখন তাকে আরবীতে বলা হয়,
يدني ثوبك على وجهك তোমার মুখমণ্ডলের ওপর তোমার কাপড় ফেলে দাও। এ থেকে বুঝা গেল, কুরআন কারীমের এই আয়াতে মুখমণ্ডল ঢাকার স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে।
আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু মুখমণ্ডলের ওপর জিলবাব ফেলার যে পদ্ধতি বর্ণনা করেছেন তা হলো, মুসলিম মহিলারা নিজেদের চাদর দ্বারা নিজ নিজ মাথা ও মুখমণ্ডল ঢেকে বের হবে। তারা কেবল একটি চোখ খোলা রাখতে পারে। (শাওকানী, ফাতহুল কাদীর : ৭/৩০৭)
ইসমা‘ঈল ইবনে উল্ইয়্যা জিলবাবের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে একটি চাদর নিলেন এবং ঘোমটার মতো পরে মাথা মুখ ঢেকে ফেললেন কপাল, নাক, কান ও চোখও ঢাকলেন ডান চোখ খোলা রাখলেন এভাবে দেখিয়েছেন আব্দুল্লাহ ইবনে আওন আলমাযানী রহঃ তাকে দেখিয়েছেন বিখ্যাত তাবেয়ী মুহাম্মদ ইবনে সীরীন রহ. তাকে দেখিয়েছেন আবীদা সালমানী রহ. যিনি আব্দুল্লাহ ইবনে মাস‘ঊদ রা. এর ছাত্র। (তবারী: ১০/৩৩২) ( ইবনে কাছীর: ৩/৮২৫)
শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যা রহ. বলেন, বেগানা পুরুষ দেখতে পারে এমনভাবে মহিলাদের মুখমণ্ডল খোলা রাখা জায়িয নেই। অধীনস্থ নারীদের পর্দাহীনতা থেকে বিরত না রাখাও দায়িত্বশীল পুরুষদের জবাবদিহিতামূলক অপরাধ। এজন্য তাদেরকে শাস্তিও দেয়া যেতে পারে। (মাজমূ‘উল ফাতাওয়া: ২৪/৩৮২)
হাফিয ইবনুল কাইয়্যিম রহ. লিখেন, স্বাধীন নারী মুখমণ্ডল ও হাতের কবজি পর্যন্ত খোলা রেখে সালাত আদায় করতে পারে এই শর্তে যে সেখানে কোনো বেগানা পুরুষ থাকবে না। তবে এ অবস্থায় সে বাজারে এবং পুরুষের ভীড়ের মধ্যে যেতে পারবে না। (ই‘লাম আল-মুওয়াককিঈন : ২/৮০)
আয়াত -৩
ﻭَﻗُﻞ ﻟِّﻠۡﻤُﺆۡﻣِﻨَٰﺖِ ﻳَﻐۡﻀُﻀۡﻦَ ﻣِﻦۡ ﺃَﺑۡﺼَٰﺮِﻫِﻦَّ ﻭَﻳَﺤۡﻔَﻈۡﻦَ ﻓُﺮُﻭﺟَﻬُﻦَّ ﻭَﻟَﺎ ﻳُﺒۡﺪِﻳﻦَ ﺯِﻳﻨَﺘَﻬُﻦَّ ﺇِﻟَّﺎ ﻣَﺎ ﻇَﻬَﺮَ ﻣِﻨۡﻬَﺎ ﻭَﻟۡﻴَﻀۡﺮِﺑۡﻦَ ﺑِﺨُﻤُﺮِﻫِﻦَّ ﻋَﻠَﻰٰ ﺟُﻴُﻮﺑِﻬِﻦَّۖ ﻭَﻟَﺎ ﻳُﺒۡﺪِﻳﻦَ ﺯِﻳﻨَﺘَﻬُﻦَّ ﺇِﻟَّﺎ ﻟِﺒُﻌُﻮﻟَﺘِﻬِﻦَّ ﺃَﻭۡ ﺀَﺍﺑَﺎٓﺋِﻬِﻦَّ ﺃَﻭۡ ﺀَﺍﺑَﺎٓﺀِ ﺑُﻌُﻮﻟَﺘِﻬِﻦَّ ﺃَﻭۡ ﺃَﺑۡﻨَﺎٓﺋِﻬِﻦَّ ﺃَﻭۡ ﺃَﺑۡﻨَﺎٓﺀِ ﺑُﻌُﻮﻟَﺘِﻬِﻦَّ ﺃَﻭۡ ﺇِﺧۡﻮَٰﻧِﻬِﻦَّ ﺃَﻭۡ ﺑَﻨِﻲٓ ﺇِﺧۡﻮَٰﻧِﻬِﻦَّ ﺃَﻭۡ ﺑَﻨِﻲٓ ﺃَﺧَﻮَٰﺗِﻬِﻦَّ ﺃَﻭۡ ﻧِﺴَﺎٓﺋِﻬِﻦَّ ﺃَﻭۡ ﻣَﺎ ﻣَﻠَﻜَﺖۡ ﺃَﻳۡﻤَٰﻨُﻬُﻦَّ ﺃَﻭِ ﭐﻟﺘَّٰﺒِﻌِﻴﻦَ ﻏَﻴۡﺮِ ﺃُﻭْﻟِﻲ ﭐﻟۡﺈِﺭۡﺑَﺔِ ﻣِﻦَ ﭐﻟﺮِّﺟَﺎﻝِ ﺃَﻭِ ﭐﻟﻄِّﻔۡﻞِ ﭐﻟَّﺬِﻳﻦَ ﻟَﻢۡ ﻳَﻈۡﻬَﺮُﻭﺍْ ﻋَﻠَﻰٰ ﻋَﻮۡﺭَٰﺕِ ﭐﻟﻨِّﺴَﺎٓﺀِۖ ﻭَﻟَﺎ ﻳَﻀۡﺮِﺑۡﻦَ ﺑِﺄَﺭۡﺟُﻠِﻬِﻦَّ ﻟِﻴُﻌۡﻠَﻢَ ﻣَﺎ ﻳُﺨۡﻔِﻴﻦَ ﻣِﻦ ﺯِﻳﻨَﺘِﻬِﻦَّۚ ﻭَﺗُﻮﺑُﻮٓﺍْ ﺇِﻟَﻰ ﭐﻟﻠَّﻪِ ﺟَﻤِﻴﻌًﺎ ﺃَﻳُّﻪَ ﭐﻟۡﻤُﺆۡﻣِﻨُﻮﻥَ ﻟَﻌَﻠَّﻜُﻢۡ ﺗُﻔۡﻠِﺤُﻮﻥَ ٣١ [ ﺍﻟﻨﻮﺭ : ٣١ ]
আর মুমিন নারীদেরকে বল, তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখবে এবং তাদের করতে পারবে। আর তারা হলেন মাহরাম। কারণ, নারীগৃহে অপরিচিত লোকদের অবাধ প্রবেশকে কেউ বৈধ বলেন না। লজ্জাস্থানের হিফাযত করবে। আর যা সাধারণত প্রকাশ পায় তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য তারা প্রকাশ করবে না। তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে । আর তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, নিজেদের ছেলে, স্বামীর ছেলে, ভাই, ভাই এর ছেলে, বোনের ছেলে, আপন নারীগণ, তাদের ডান হাত যার মালিক হয়েছে, অধীনস্থ যৌনকামনামুক্ত পুরুষ অথবা নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ বালক ছাড়া কারো কাছে নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। আর তারা যেন নিজেদের গোপন সৌন্দর্য প্রকাশ করার জন্য সজোরে পদচারণা না করে। হে মুমিনগণ! তোমরা সকলেই আল্লাহর নিকট তাওবা কর। যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।’ (সূরা আন-নূর, আয়াত: ৩১)
হিজাবের আয়াত নাযিলের পর আযওয়াজে মুতাহ্হারাত ও অন্যান্য মহিলা সাহাবীদের যে কর্মপদ্ধতি ছিল তা দ্বারাও এটা প্রমাণিত হয় যে, মহিলাদের জন্য মুখমণ্ডল ঢাকা জরুরী। যখন এই আয়াত নাযিল হয় তখন মহিলা সাহাবীদের আমল কী ছিল তা আমরা জানতে পারি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয়তমা পত্নী আয়িশা রা. বর্ণনা থেকে। তিনি বলেন,
ﻳَﺮْﺣَﻢُ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻧِﺴَﺎﺀَ ﺍﻟْﻤُﻬَﺎﺟِﺮَﺍﺕِ ﺍﻷُﻭَﻝَ ﻟَﻤَّﺎ ﺃَﻧْﺰَﻝَ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻭَﻟْﻴَﻀْﺮِﺑْﻦَ ﺑِﺨُﻤُﺮِﻫِﻦَّ ﻋَﻠَﻰ ﺟُﻴُﻮﺑِﻬِﻦَّ ﺷَﻘَّﻘْﻦَ ﻣُﺮُﻭﻃَﻬُﻦَّ ﻓَﺎﺧْﺘَﻤَﺮْﻥَ ﺑِﻪِ
আল্লাহ হিজরতকারী অগ্রবর্তী নারীদের ওপর রহমত করুন। যখন তিনি নাযিল করলেন, আর তারা যেন তাদের বক্ষের ওপর ওড়না টেনে দেয় তখন তারা তাদের নিম্নাংশের কাপড়ের প্রান্ত ছিঁড়ে ফেলেন এবং তা দিয়ে ওড়না বানিয়ে নেন। (বুখারী : ৮৫৭৪)
আলোচ্য বর্ণনায় ‘ইখ্তামারনা’ শব্দটি এসেছে। সহীহ বুখারীর ব্যাখ্যাকার হাফিয ইবন হাজার আসকালানী রহ. ‘ইখতামারনা’ শব্দের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লিখেছেন, ‘গাত্তাইনা উজুহাহুন্না’। অর্থাৎ তারা নিজেদের মুখমণ্ডল ঢেকে রাখতেন। (ফাতহুল বারী : ৮/৩৪৭)
শুধু পবিত্র কুরআনের তাফসীর নয় চেহারা আবৃত রাখার বিধান সহীহ হাদীস দ্বারাও প্রমাণিত। আবদুল্লাহ ইবন উমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ﻭَﻻَ ﺗَﻨْﺘَﻘِﺐِ ﺍﻟﻤَﺮْﺃَﺓُ ﺍﻟﻤُﺤْﺮِﻣَﺔُ، ﻭَﻻَ ﺗَﻠْﺒَﺲِ ﺍﻟﻘُﻔَّﺎﺯَﻳْﻦ
আর ইহরাম গ্রহণকারীনী নারী যেন নিকাব ও হাতমোযা পরিধান না করে। (বুখারী: ১৮৩৮) এই হাদীস থেকে বুঝা যায়, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে মেয়েরা তাদের হাত ও চেহারা ঢাকতেন। এ কারণে ইহরামের সময় নেকাব ও দস্তানা না পরার আদেশ করা হয়েছে।
আল্লাহ তা‘আলা নারীদেরকে বলেন, وَ لَا یَضْرِبْنَ بِاَرْجُلِهِنَّ لِیُعْلَمَ مَا یُخْفِیْنَ مِنْ زِیْنَتِهِ মুসলিম নারীদের উচিত ভূমিতে এভাবে পদক্ষেপ না করা, যাতে তাদের গুপ্ত সাজ-সজ্জা জানা হয়ে যায়। (সূরা নূর: ৩১)
এবার চিন্তা করি, যেখানে নূপুর দেখা যেতে পারে বা তার আওয়াজ শোনা যেতে পারে বলে জোরে পা ফেলতে নিষেধ করা হয়েছে, সেখানে কীভাবে চিন্তা করা যায় যে, আল্লাহ তা‘আলা নারীদের চেহারা; যা সকল সৌন্দর্যের কেন্দ্র, তা খোলা রাখার বৈধতা দিবেন!
তাফসীরে কাবীরের মধ্যে ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী রহ. লিখেছেন, উক্ত আয়াতে অলংকার বিশেষ সৌন্দর্য বর্ধন করতে নিষেধ করেছেন। আর যখন উক্ত আয়াতে সামান্য নূপুর বা এ জাতীয় সৌন্দর্যের কথাই নিষেধ করা হয়েছে। যা সৌন্দর্যের দিকে আহ্বান করে। তাহলে তো যে জিনিসটা স্বয়ং সৌন্দর্য সেটা তো আরো উত্তম ভাবে নিষেধ।
আরবী পাঠ لَمّا نَهى عَنِ اسْتِماعِ الصَّوْتِ الدّالِّ عَلى وُجُودِ الزِّينَةِ فَلَأنْ يَدُلَّ عَلى المَنعِ مِن إظْهارِ الزِّينَةِ أوْلى
আয়াত: ৪ وَقُلْ لِلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا
অর্থ: হে নবী! আপনি মুমিন নারীদের বলে দিন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নিম্নগামী করে রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থানসমূহের হিফাযত করে। তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন করে না বেড়ায়। তবে (শরীরের) যে অংশ (এমনিতেই) প্রকাশ হয়ে যায় তার কথা ভিন্ন। (সূরা নূর: ৩১)
مَا ظَهَرَ مِنْهَا তবে তার (শরীরের) যে অংশ খোলা থাকে (তার কথা ভিন্ন) আয়াতের এ অংশটুকুর ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে তাফসীর কারকগণ ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাস‘ঊদ রাযি. مَا ظَهَرَ مِنْهَا এর ব্যাখ্যা ‘চাদর এবং ওড়না’র দ্বারা করেছেন। অর্থাৎ নারীরা তাদের পরিধেয় পরিচ্ছদের উপর যে ওড়না বা চাদর মুড়িয়ে নেয় তা পরপুরুষের সামনে প্রকাশিত হলে কোনো সমস্যা নেই। কেননা, তা আড়াল করে রাখা অসম্ভব। হযরত হাসান রহ., ইমাম ইবনে সীরীন রহ., আবুল জাওযা রহ., ইবরাহীম নাখয়ী রহ. প্রমুখের মতও এটিই। এ ব্যাখ্যাটিই কুরআন ও হাদীসের বিভিন্ন সুস্পষ্ট বক্তব্যের অনুকূলে।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. مَا ظَهَرَ مِنْهَا এর ব্যাখ্যা চেহারা, দুই হাতের তালু এবং আংটি দ্বারা করেছেন। হযরত ইবনে উমর রাযি., হযরত আতা রাযি., হযরত ইকরামা রাযি. প্রমুখের মতও এটি। (আযওয়াউল বায়ান ফী ইযাহিল কুরআনি বিল কুরআন ২৭/২৮১)
যারা বলেন, মুখমণ্ডল আবৃত রাখা মুস্তাহাব বা বর্তমানে যারা বলেন, মুখমণ্ডল হিজাবের অংশ নয়, তারা ইবনে আব্বাস রাযি. এর ব্যাখাটিকে প্রমাণ হিসেবে পেশ করে থাকেন। তবে ইবনে আব্বাস রাযি.-এর ব্যাখ্যাটিকে মুখমণ্ডল হিজাবের অংশ না হওয়ার পক্ষে দলীল হিসেবে গ্রহণ করা কয়েকটি কারণে যথার্থ নয়।
(ক) زينة (সৌন্দর্য) এর ব্যাখ্যা মুখমণ্ডল এবং উভয় হাতের তালু দ্বারা করাটা বাস্তবসম্মত নয়। কারণ, زينة বলা হয় ما تتزين به المرأة ঐ উপাদানকে যদ্বারা নারীরা সাজ-সজ্জা অবলম্বন করে থাকে। যেমন, অলঙ্কার, বস্ত্র ইত্যাদি। আর সেটা নারীদের শারীরিক কোনো অংশ নয়। সুতরাং زينة এর ব্যাখ্যা নারীদের শরীরের কোনো অংশ তথা মুখমণ্ডল বা উভয় হাতের তালু দ্বারা করা বাস্তবতা পরিপন্থী। আর এ ব্যাখ্যার সমর্থনে শক্তিশালী কোনো দলীলও পাওয়া যায় না। বরং এর বিপক্ষে সুস্পষ্ট দলীল রয়েছে। যাতে সুস্পষ্টরূপে প্রমাণিত হয় যে, মুখমণ্ডল হিজাবের অংশ।
(খ) কুরআনে কারীমের বিভিন্ন আয়াতে زينة শব্দটি ব্যবহার হয়েছে, সেখানে যীনাত দ্বারা সাজসজ্জার উপকরণ উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে। সুসজ্জিত বস্তুর কোনো অংশ উদ্দেশ্য নেয়া হয় নি। যেমন,
১. خُذُوا زِينَتَكُمْ عِنْدَ كُلِّ مَسْجِدٍ
হে বনী আদম! তোমরা নামাযের সময় সাজ-সজ্জা গ্রহণ কর
(সূরা আ‘রাফ- ৩১)
২. الْمَالُ وَالْبَنُونَ زِينَةُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا
ধনৈশ্বর্য ও সন্তান-সন্তুতি পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য। (সূরা কাহাফ- ৪৬)
৩. وَلَا يَضْرِبْنَ بِأَرْجُلِهِنَّ لِيُعْلَمَ مَا يُخْفِينَ مِنْ زِينَتِهِنَّ
তারা যেন তাদের গোপন সাজসজ্জা প্রকাশ করার জন্য জোরে পদচারণা না করে। (সূরা নূর- ৩১)
৪. وَلكِنَّا حُمِّلْنَا أَوْزَارًا مِنْ زِينَةِ الْقَوْمِ
কিন্তু আমাদের উপর ফিরাউনীদের অলঙ্কারের বোঝা চাপিয়ে দেয়।
(সূরা ত্বাহা- ৮৭)
৫. وَمَا أُوتِيتُمْ مِنْ شَيْءٍ فَمَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَزِينَتُهَا
তোমাদেরকে যা কিছু দেয়া হয়েছে তা পার্থিব জীবনের ভোগ ও শোভা বৈ কিছুই নয়। (সূরা ক্বাসাস- ৬০)
৬. إِنَّا جَعَلْنَا مَا عَلَى الْأَرْضِ زِينَةً لَهَا
আমি পৃথিবীস্থ সবকিছুকে পৃথিবীর জন্য শোভা করেছি। (সূরা কাহাফ- ৭)
৭. قُلْ مَنْ حَرَّمَ زِينَةَ اللَّهِ الَّتِي أَخْرَجَ لِعِبَادِهِ
‘আপনি বলুন, আল্লাহর সাজসজ্জা যা তিনি বান্দাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন তা কে হারাম করেছে?’ (সূরা আ’রাফ- ৩২)
এছাড়া অন্যান্য আয়াতে زينة দ্বারা সাজসজ্জার উপকরণ উদ্দেশ্য নেওয়া হয়েছে। আর এটা শতসিদ্ধ কথা, উপকরণ কখনো মূল অবয়বের অংশ হয় না। কুরআনে কারীমে زينة শব্দটি ব্যাপকভাবে এ অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। সুতরাং বিরোধপূর্ণ স্থানে ঐ অর্থই উদ্দেশ্য নেয়া হবে যা কুরআনে ব্যাপকভাবে গৃহীত হয়েছে।
(গ) ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, ইবনে আব্বাস রাযি. يدنين عليهن এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, নারীরা প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হলে একটি চক্ষু ব্যতীত পুরো শরীর আবৃত করে বের হবে। আর এখানে الا ما ظهر منها এর ব্যাখ্যায় তিনি মুখমণ্ডল এবং উভয় হাতের তালু খোলা রাখার কথা বলবেন এতে তো স্ববিরোধী বক্তব্য প্রমাণিত হয়। মূলত তার দুটি ব্যাখ্যার মাঝে কোনো বিরোধ নেই। কারণ আল্লামা ইবনে জারীর রহ. সহীহ সূত্রে ইবনে আব্বাস রাযি. এ একটি বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন। বর্ণনাটি হলো
حدثنى على قال حدثنا عبد الله قال حدثنى معاوية عن على عن ابن عباس ولا يدنين زينتهن الا ما ظهر منها قال الزينة الظاهرة الوجه وكحل العين وخضا الكف والخاتم فهذه تظهر فى بيتها لمن دخل من الناس عليها
অর্থ: ইবনে আব্বাস রাযি. ولا يدنين زينتهن الا ما ظهر منها ‘তারা তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন করে বেড়াবে না। তবে যা নিজে নিজে প্রকাশ হয়ে যায় তার কথা ভিন্ন’ এর ব্যাখ্যায় বলেন, দৃশ্যমান সৌন্দর্য হলো মুখমণ্ডল, চোখের সুরমা, হাতের মেহেদী এবং আংটি। সুতরাং নারীরা তাদের গৃহে যে সকল লোক প্রবেশ করে তাদের সামনে এগুলো প্রকাশ করতে পারবে।
(তাফসীরে ইবনে জারীর ত্ববারী ১২/১৮৬)
এই বর্ণনার দ্বারা উভয় বক্তব্যের বিরোধ নিষ্পত্তি হয়ে গেল। কারণ ইবনে আব্বাস রাযি. উক্ত বর্ণনায় সুস্পষ্টরূপে বলে দিয়েছেন, নারীরা মুখমণ্ডল এবং উভয় হাতের তালু তাদের গৃহে যারা প্রবেশ করে তাদের সামনেই শুধু প্রকাশ করতে পারবে। সুতরাং ইবনে আব্বাস রাযি. এর ব্যাখ্যাকে মুখমণ্ডল হিজাবের অংশ না হওয়ার পক্ষে দলীল হিসেবে পেশ করা সম্পূর্ণ ভুল ও অগ্রহণযোগ্য। এতে স্পষ্ট হয়ে গেল, ইবনে আব্বাস রাযি. এর মতেও নারীদের জন্য তাদের মুখমণ্ডল পরপুরুষের সামনে অনাবৃত রাখা বৈধ নয়।
(ঘ) তাছাড়া যদি মেনেও নেয়া হয় যে, ما ظهر দ্বারা উদ্দেশ্য হলো মুখমণ্ডল এবং উভয় হাতের তালু। তবুও আলোচ্য আয়াতাংশ দ্বারা মুখমণ্ডল হিজাবের অংশ না হওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হয় না। কারণ আয়াতে অকর্মক ক্রিয়া ظهر ব্যবহার হয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে, নিজে নিজে প্রকাশ পাওয়া বা অনিচ্ছায় প্রকাশ হওয়া। আল্লাহ তা‘আলা সকর্ম ক্রিয়া اظهر ব্যবহার করেননি। যার অর্থ হচ্ছে, ইচ্ছাকৃতভাবে প্রকাশ করা। সুতরাং এখন আয়াতের অর্থ দাঁড়ায়, ‘নারীরা তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ করে বেড়াবে না। তবে অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাদের সৌন্দর্যের যে অংশ প্রকাশ হয়ে যায় তাতে কোনো ক্ষতি নেই।’ আর মুখমণ্ডল অনিচ্ছায় সাধারণত প্রকাশ হয় না। বরং ব্যক্তির ইচ্ছাক্রমেই প্রকাশ পেয়ে থাকে। হ্যাঁ, তারপরও যদি কখনো মুখমণ্ডল অনিচ্ছায় প্রকাশ হয়ে যায় বা শরী‘আত অনুমোদিত প্রয়োজনের স্বার্থে মুখমণ্ডল অনাবৃত করতে হয় তাতে কোনো সমস্যা নেই। (ইমদাদুল ফাতাওয়া ৪/১৮২)
উক্ত ব্যাখ্যাটি আল্লামা ইবনে কাসীর রহ.-এর তাফসীর দ্বারা সমর্থিত। তিনি বলেন,
وَلا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلا مَا ظَهَرَ مِنْهَا أي: لا يُظهرْنَ شيئا من الزينة للأجانب، إلا ما لا يمكن إخفاؤه.
অর্থ : তারা তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ করে বেড়াবে না। তবে তার (শরীরের) যে অংশ আড়াল করে রাখা অসম্ভব তার কথা ভিন্ন। অর্থাৎ নারীরা তাদের সৌন্দর্যের কোনো অংশই পরপুরুষের সামনে প্রকাশ করবে না। তবে সৌন্দর্যের যে অংশ আড়াল করে রাখা সম্ভব নয় তা প্রকাশ করতে পারবে। (তাফসীরে ইবনে কাসীর ১০/৩৯৬)
আর এ কথা দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট যে, মুখমণ্ডল আড়াল করে রাখা অসম্ভব কিছু নয়; বরং খুবই সহজ। সুতরাং কুরআনে কারীমের পূর্বোল্লেখিত চারটি আয়াত দ্বারা সুস্পষ্ট ও সুদৃঢ়ভাবে প্রমাণিত যে, মুখমণ্ডল পর্দার অংশ।
হাদীসের দলীল
হাদীস: ১
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকাল হয়ে গেলে আবূ বকর রা. আয়েশা রা. এর ঘরে প্রবেশ করেন। আয়েশা রা. এর ঘরেই নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইন্তেকাল করেন। এসময় আশেপাশে তাঁর স্ত্রীগণ ছিলেন। আবূ বকর রা. প্রবেশ করতে চাইলে আয়েশা রা. ছাড়া সকলে মুখ ঢেকে ফেলেন। বর্ণনাটির আরবী পাঠ-
…فدخل، ورسول الله صلى الله عليه وسلم قد توفي على الفراش والنسوة حوله، فخمرن وجوههن، واستترن من أبي بكر إلا ما كان من عائشة .
(দালায়েলুন নুবুওয়াহ, বায়হাকী ৭/১১৭)
হাদীস : ২
ইফ্কের ঘটনা কুরআন-হাদীসে প্রসিদ্ধ। বুখারী-মুসলিমসহ হাদীসের বহু কিতাবে তা বর্ণিত হয়েছে। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বনূ
মুস্তালিক যুদ্ধে যান। সাথে আয়েশা রা. ছিলেন। যুদ্ধ শেষে মদীনায় ফেরার পথে এক স্থানে যাত্রাবিরতি হয়। আয়েশা রা. বলেন, বিরতির পর নবীজী পুনরায় যাত্রা করার আদেশ দিলেন। এসময় আমি প্রয়োজন পূরণের উদ্দেশ্যে কাফেলা থেকে একটু দূরে যাই। প্রয়োজন সেরে যখন আমি হাওদার কাছে আসি, গলায় হাত দিয়ে দেখি, আমার হার নেই। তা খোঁজার জন্য পুনরায় প্রয়োজন পূরণের স্থানে যাই এবং তা খুঁজতে থাকি। এসময় হাওদা বহনকারীরা আমি ভেতরে আছি ভেবে হাওদা উঠিয়ে নেয়। সেসময় আমি ছিলাম হালকা-পাতলা। তাই হাওদা হালকা হওয়াতেও আমি ভেতরে নেই বলে তাদের কোনো সন্দেহ হয়নি।
এরই মধ্যে হার খুঁজে পাই এবং যাত্রাবিরতির স্থানে ফিরে আসি। এসে দেখি, কেউ নেই। তখন আমি চিন্তা করলাম, আমাকে না পেয়ে নিশ্চয় তারা খুঁজতে আসবে। তাই সেখানে ঘুমিয়ে পড়ি।
এদিকে সাফওয়ান ইবনে মুয়াত্তাল রা.-কে নিযুক্ত করা হয়েছিল সৈন্যদলের পেছনে চলার জন্য, যাতে কিছু পড়ে থাকলে তিনি নিয়ে আসতে পারেন। তিনি সকালে আমাদের যাত্রাবিরতির স্থানে পৌঁছেন। এখানে তিনি একজন ঘুমন্ত মানুষের অবয়ব দেখতে পান।
আয়েশা রা. বলেন,
فأتاني فعرفني حين رآني، وقد كان يراني قبل أن يضرب علي الحجاب
তিনি এগিয়ে আসেন এবং আমাকে দেখেই চিনতে পারেন। কেননা, পর্দার বিধান অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে তিনি আমাকে দেখেছেন। আমাকে দেখেই ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজি‘ঊন পড়েন। আমি তার ‘ইন্না লিল্লাহ’ শুনে জেগে যাই।
আয়েশা রা. বলেন, فخمرت وجهي بجلبابي
অর্থাৎ তাকে দেখামাত্রই আমি জিলবাব দ্বারা আমার চেহারা ঢেকে ফেলি। (সহীহ বুখারী, হাদীস ৪১৪১; সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৭৭০)
চিন্তা করুন, এত বড় দুর্ঘটনা ও ভীতিকর অবস্থা। এ সময়ও আয়েশা রা. জাগ্রত হওয়ার সাথে সাথে চেহারা ঢেকে নেন।
আরো ভাবনার বিষয় হল, আয়েশা রা. বলেন, পর্দার বিধান অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে সে আমাকে দেখেছে, সে হিসেবে আমাকে চিনেছে।
তাহলে স্পষ্ট হয়ে গেল, পর্দার বিধান অবতীর্ণ হওয়ার পর নারীরা পরপুরুষের সামনে চেহারা খোলা রাখত না।
হাদীস: ৩
আব্বাস রা. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘরে প্রবেশ করি। এ সময় তাঁর কাছে স্ত্রীগণ ছিলেন। আমি যাওয়ার সাথে সাথে তারা সকলেই আমার থেকে পর্দা করলেন, মাইমূনা রা. ছাড়া।
(মুসনাদে আহমাদ: হাদীস ১৭৮৪)
মাইমূনা রা. এর সাথে আব্বাস রা.-এর দুধসম্পর্কীয় কোনো বন্ধন ছিল। তাই তিনি পর্দা করেননি। আরেক বর্ণনায় এভাবে আছে, আমার থেকে মায়মূনা ছাড়া সবাই পর্দা করেন। আর মায়মূনার জন্য সেটির অবকাশ ছিল।
আরবী পাঠ- فَاسْتَتَرْنَ مِنِّي إِلّا مَيْمُونَةَ، قَدْ وسعها ذلك.
(আলমা‘রিফাতু ওয়াত তারীখ, ফাসাবী ১/৫০৯ )
হাদীস: ৪
আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, পর্দার বিধান অবতীর্ণ হওয়ার পর কুরাইশের ‘আফলাহ’ নামক এক ব্যক্তি আমার ঘরে প্রবেশ করে। আমি সাথে সাথে পর্দার আড়ালে চলে যাই। সে বলল, তুমি আমার থেকে আড়ালে থাকছ, পর্দা করছ! আমি তো তোমার চাচা। আমি বললাম, কীভাবে? সে বলল, আমার ভাইয়ের স্ত্রী তোমাকে দুধ পান করিয়েছে। আমি বললাম, তোমার ভাই আবুল কুআইস তো আমাকে দুধ পান করাননি, দুধ পান করিয়েছে তার স্ত্রী। এরপর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে প্রবেশ করলে আমি তাকে বিষয়টি অবহিত করি। তখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘না, তুমি তাকে প্রবেশের অনুমতি দাও, কেননা, সে তোমার চাচা (দুধচাচা)।
আরবী পাঠ-
عَنْ هِشَامِ بْنِ عُرْوَةَ، عَنْ عُرْوَةَ، عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا، قَالَتْ: دَخَلَ عَلَيَّ أَفْلَحُ بْنُ أَبِي الْقُعَيْسِ فَاسْتَتَرْتُ مِنْهُ، قَالَ: تَسْتَتِرِينَ مِنِّي وَأَنَا عَمُّكِ، قَالَتْ: قُلْتُ: مِنْ أَيْنَ؟ قَالَ: أَرْضَعَتْكِ امْرَأَةُ أَخِي، قَالَتْ: إِنَّمَا أَرْضَعَتْنِي الْمَرْأَةُ وَلَمْ يُرْضِعْنِي الرَّجُلُ، فَدَخَلَ عَلَيَّ رَسُولُ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَحَدَّثْتُهُ، فَقَالَ: إِنَّهُ عَمُّكِ فَلْيَلِجْ عَلَيْكِ.
(সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২০৫৭)
হাফেয ইবনে হাজার রাহ. বলেন- وفيه وجوب احتجاب المرأة من الرجال الأجانب
এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয়, নারীরা পরপুরুষ থেকে পর্দা করবে। (ফাতহুল বারী, ইবনে হাজার ১৫/৩০১)
আল্লামা আইনী রাহ. বলেন,
فِيهِ: ثُبُوت الْمَحْرَمِيّة بَينهَا وَبَين عَمها من الرضَاعَة. وَفِيه: أَنه لَا يجوز للْمَرْأَة أَن تَأذن للرجل الّذِي لَيْسَ بِمحرم لَهَا فِي الدُّخُول عَلَيْهَا، وَيجب عَلَيْهَا الاحتجاب مِنْهُ، وَهُوَ كَذَلِك إِجْمَاعًا بعد أَن نزلت آيَة الْحجاب، وَمَا ورد من بروز النِّسَاء فَإِنّمَا كَانَ قبل نزُول الْحجاب، وَكَانَت قصّة أَفْلح مَعَ عَائِشَة بعد نزُول الْحجاب، كَمَا ثَبت فِي الصّحِيحَيْنِ،. من طَرِيق مَالك أَن ذَلِك كَانَ بعد أَن نزل الْحجاب.
(উমদাতুল কারী ১৩/২০৪)
এ হাদীস এটাও প্রমাণ করে যে, কোনো নারী পরপুরুষকে তার সামনে আসার অনুমতি দেবে না এবং নারীদের জন্য পরপুরুষ থেকে পর্দা করা ওয়াজিব। সকল উলামায়ে কেরাম এ ব্যাপারে একমত।
হাদীস: ৫
যাইনাব আলআসাদিয়্যাহ রা. বলেন, আমি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললাম, আমার পিতা মারা যান এবং একটি দাসী রেখে যান।
কিছুদিন পর সে দাসী একটি সন্তান জন্ম দেয়। এক্ষেত্রে আমরা তাকে সন্দেহ করি। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাকে নিয়ে আসো। তাকে আনা হল। তিনি দেখে বললেন, এ সন্তান তোমার পিতা থেকে মীরাস পাবে। তবে তুমি তার থেকে পর্দা কর। অর্থাৎ, এ বাঁদি যে ব্যভিচার করেছে তার কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ নেই; আর সে-ও স্বীকার করছে না। তাই ধরে নিতে হবে, এ সন্তান তার মুনিবেরই। সুতরাং পুত্র হিসেবে সে মীরাস পাবে। তবে তার চেহারা ও অবয়ব দেখে মনে হচ্ছে এটি মুনিব ছাড়া অন্যের সন্তান, তাই মুনিবের মেয়ে যাইনাবকে বলেছেন, তার থেকে পর্দা করতে।
(আলমুজামুল কাবীর, তবারানী ২৪/২৮৮)
হাদীস: ৬
সাহাবী আবূ মূসা আশ‘আরী রা. বলেন, একদা আমরা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে ছিলাম। তিনি তখন জি‘র্ইরানায় অবতরণ করলেন। এসময় এক বেদুঈন এসে তাকে বলল, আপনি যা দেয়ার ওয়াদা করেছিলেন তা দেন না কেন? নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন ‘আবশির’ সুসংবাদ গ্রহণ কর। সে বলল আপনি এ কথা অনেকবার বলেছেন। তখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাগান্বিত হয়ে আবূ মূসা ও বিলালের অভিমুখী হয়ে বললেন, তার সুসংবাদ ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে, তোমরা গ্রহণ করো। তখন তারা উভয়ে বললেন, আমরা গ্রহণ করলাম। তখন তিঁনি এক পেয়ালা পানি আনতে বললেন তা দ্বারা হাত ও ধৌত করলেন এবং পাত্রে কুলি করলেন। অতঃপর বললেন, তোমরা উভয়ই পান কর। এবং মুখমণ্ডল ও গণ্ডদেশে ঢেলে দাও। এরপর সুসংবাদ গ্রহণ কর। তারা উভয়ে পেয়ালা নিয়ে এমনটি করলেন। তখন উম্মে সালামা রা. পর্দার ওপাশ থেকে তাদের উদ্দেশে বললেন- أفضلا لأمكما তোমাদের মায়ের জন্যও কিছু রেখো। (সহীস বুখারী, হাদীস ৪৩২৮)
হাদীস: ৭
হযরত উমর রা. থেকে বর্ণিত, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মৃত্যুশয্যায় একদিন উপস্থিত সাহাবীদের বললেন, কাগজ আর দোয়াত নিয়ে আসো! আমি তোমাদের জন্য এমন কিছু লিখে দিব, যা থাকলে তোমরা আর গোমরাহ হবে না। তখন আমরা বলি, কুরআনে তো সব আছেই। সুতরাং তাকে এখন কষ্ট দেয়ার কোনো মানে হয় না। তিনি পুনরায় কাগজ কলম চান।
فقال النسوة من وراء الستر ألا تسمعون ما يقول رسول الله صلى الله عليه وسلم؟
তখন মহিলাগণ পর্দার ওপাশ থেকে বলে উঠলেন, আরে, তোমরা কি শুনছ না- নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কী বলছেন…! (আল‘মুজামুল আওসাত, তবারানী হাদীস ৫৩৩৪)
হাদীস: ৮
আয়েশা রা. বলেন, মুমিন নারীগণ নবীজীর সাথে ফজরের নামাযে উপস্থিত হতেন। অতঃপর তারা নামায শেষে চাদরে আবৃত হয়ে এমন সময় বাড়ি ফিরতেন যে, অন্ধকারে তাদের চেনা যেত না।
আরবী পাঠ-
كن نساء المؤمنات يشهدن مع رسول الله صلى الله عليه وسلم صلا الفجر متلفعات بمروطهن ثم ينقلبن إلى بيوتهن حين يقضين الصلاة لا يعرفهن أحد من الغلس
(সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৭৮)
‘চাদর আবৃত হয়ে’ কথাটিকে হাদীসে التلفع দ্বারা ব্যক্ত করা হয়েছে। যার অর্থ পুরো শরীর ঢেকে নেয়া। অনেকে তো এর অর্থ করার সময় চেহারা ঢাকার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন।
আরবী ভাষাবিদ ইমাম আযহারী বলেন- اللِّفاع : ثوب يُجَلَّل به الجسَد كلُّه
তালাফ্ফু‘ লিফা‘ থেকে নির্গত। আর লিফা‘ হচ্ছে এমন কাপড়, যা দ্বারা পুরো শরীর আবৃত করা হয়। (লিসানুল আরব ৫/৪০৫৪)
ইবনুল আসীর রাহ. বলেন- اللِّفاع : ثوب يُجَلّل به الجسَد كلّه كِساءً كان أو غيره.
লিফা‘ এমন কাপড়, যার দ্বারা পুরো শরীর আবৃত করা হয়।
(আননিহায়া, পৃ: ১০৯৯)
প্রসিদ্ধ হাদীস ব্যাখ্যাতা ইমাম বদরুদ্দীন আইনী রাহ. বলেন- وهو ما يغطي الوجه
ইবনে বাত্তাল রাহ.-ও এমনই বলেন। (উমদাতুল কারী ৪/৮৯; আলকাওয়াকিবুদ দারারী, খ. ০৪, পৃ: ২১৮)
আবূ মনসূর আলহারাবী বলেন-
فالمتلفعات: النساء اللاتي قد اشتملن بجلابيبهن، حتى لا يظهر منهن شيء غير عيونهن.
‘মুতালাফ্ফিআত’ (লিফা‘ দ্বারা আবৃত নারী) ঐ নারীদের বলে, যারা চাদর দিয়ে নিজেদেরকে এমনভাবে ঢেকে নেয় যে, তাদের চোখ ছাড়া অন্য কিছুই দেখা যায় না। (আযযাহির ১/৫২)
কাযী ইয়ায রাহ., নববী রাহ. ও হাফেয ইবনে হাজার রাহ.-এর ব্যাখ্যা থেকেও স্পষ্ট হয় যে, তালাফ্ফু‘ অর্থ চেহারাসহ আবৃত হওয়া। দেখুন, ফাতহুল বারী, ইবনে হাজার ২/৫৬; আলমিনহাজ, নববী ২/৪৬০ আরো দেখুন, আওনুল মা‘বুদ, আযীমাবাদী ২/৬৫; ফাতহুল বারী, ইবনে রজব ২/১৫৬, ২/১০৭
হাদীস : ৯
সাহাবী বাক্র ইবনে শাদ্দাখ থেকে বর্ণিত, তিনি নাবালেগ অবস্থায় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমত করতেন। যখন বালেগ হন, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি যখন অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছিলাম তখন আপনার ঘরে প্রবেশ করতাম, এখন আমি প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে গিয়েছি।
আরবী পাঠ-
أخرج ابن منده، وأبو نعيم عن عبد الملك بن يعلى الليثي، أن بكر بن شداخ الليثي رضي الله عنه – وكان ممن يخدم النبي صلى الله عليه وسلم وهو غلام – فلما احتلم، جاء إلى النبي صلى الله عليه وسلم فقال: يا رسول الله! إني كنت أدخل على أهلك، وقد بلغت مبلغ الرجال.
(মা‘আরিফাতুস সাহাবা, ইবনে মান্দাহ, হায়াতুস সাহাবা ২/১৫৫)
হাদীস: ১০
عن أبي سلمة بن عبد الرحمن قال: قلت لعائشة: إنما فاقنا عروة بدخوله عليكِ كلما أراد. قالت: وأنت إذا أردت فاجلس من وراء الحجاب، فسلني عما أحببت.
তাবে‘য়ী আবূ সালামা বলেন, আমি আয়েশা রা. কে বললাম, আপনার ভাগিনা উরওয়া আপনার থেকে ইলম অর্জনে আমাদের চেয়ে অগ্রগামী হয়ে যাচ্ছে। কারণ, সে যখনই চায় আপনার কাছে যেতে পারে এবং জিজ্ঞাসা করতে পারে। জবাবে আয়েশা রা. বলেন, তুমিও যদি জিজ্ঞাসা করতে চাও, তাহলে পর্দার ওপারে বসবে, এরপর যা চাও জিজ্ঞাসা করবে। (তবাকাতে ইবনে সা‘দ ১০/২০০)
হাদীস: ১১
সাহাবী আবূ হুমাইদ থেকে বর্ণিত, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
إذا خطب أحدكم امرأة، فلا جناح عليه أن ينظر إليها، إذا كان إنما ينظر إليها لخطبته، وإن كانت لا تعلم.
কেউ যদি কোনো নারীকে বিবাহের প্রস্তাব দেয়, তাহলে তাকে দেখতে কোনো গোনাহ নেই। কেননা, সে তো বিবাহের প্রস্তাবের কারণেই দেখবে। যদিও সে নারী তা না জানে। মুসনাদে আহমাদ ৫/৪২৪ লক্ষ্য করি, হাদীসে বলা হয়েছে, বিবাহের প্রস্তাব দিলে দেখতে কোনো গোনাহ নেই। তাহলে বুঝা যায়, অন্য সময় দেখলে গোনাহ হয়। এরপর বলা হয়েছে, সে তো বিবাহের কারণেই দেখবে। তাহলে আরো দৃঢ় হয় যে, বিবাহ বা এজাতীয় শরী‘আত স্বীকৃত কারণ ছাড়া পরনারীকে দেখা জায়েয নেই। হাদীসের শেষে বলা হয়েছে, যদিও সে নারী তা না জানে। এ থেকে বোঝা যায়, সে যুগে নারীরা পুরুষ থেকে আড়ালেই থাকত। কেননা, তারা পুরুষদের সম্মুখে খোলামেলা চলাফেরা করলে পুরুষরা তো তাদেরকে এমনিতেই দেখে ফেলতে পারবে। তাহলে এভাবে বলার কী দরকার যে, যদিও সে নারী না জানে।
উম্মে ছালজা বলেন, আমি আয়েশা রা.-এর ঘরে প্রবেশ করলাম। এ সময় এক লোক পর্দার ওপাশ থেকে ডাক দেয় এবং নাবীয সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে।
হাদীস: ১২
আরবী পাঠ
عن أم ثلجة قالت: دخلت على عائشة فناداها رجل من وراء الحجاب، فسألها عن النبيذ، فقالت: نهى رسول الله صلى الله عليه و سلم عن الدباء والمزفت.
(আল মু‘জামুল আওসাত, তবারানী ৫/৩৭৩)
হাদীস: ১৩
শাহর রাহ. বলেন, আমি উম্মে সালামা রা.-এর কাছে গেলাম পর্দার আড়াল থেকে তাঁকে বলতে শুনলাম, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দু‘আ বেশি বেশি পড়তেন
يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوبِ، ثَبِّتْ قَلْبِي عَلَى دِيْنِكَ.
আরবী পাঠ
قَالَ: دَخَلْتُ عَلَى أُمِّ سَلَمَةَ بِالْمَدِينَةِ، وَبَيْنِي وَبَيْنَهَا حِجَابٌ، فَسَمِعْتُهَا تَقُولُ: كَانَ أَكْثَرُ دُعَاءِ النّبِيِّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ: يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوبِ، ثَبِّتْ قَلْبِي عَلَى دِينِكَ
(আলমু‘জামুল আওসাত, তবারানী ৩/১৯৫)
হাদীস: ১৪
আবূ সা‘ঈদ রাকাশী বলেন, আমি আয়েশা রা. কে পর্দার আড়াল থেকে বলতে শুনেছি, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা জাহান্নাম থেকে বাঁচো, খেজুরের এক ফালি দিয়ে হলেও।
আরবী পাঠ
عن أبي سعيد الرقاشي، قال : سمعت عائشة من وراء الحجاب تقول: سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول: اتقوا النار ولو بشق تمرة
(তবাকাতুল মুহাদ্দিসীন, আবুশ শায়খ আসবাহানী ৩/৪০২)
চার মাযহাবের ঐকমত্যে নারীর চেহারা ঢেকে রাখা ফরয
হানাফী মাযহাবের উলামায়ে কেরাম মূলনীতি ও দলীলের আলোকে সম্মিলিত সিদ্ধান্ত প্রদান করেন যে, নারীর চেহারা পর্দার অন্তর্ভুক্ত, পরপুরুষের সামনে তা খোলা রাখা বৈধ নয়। ইমাম আবূ বকর আল-জাস্সাস (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,
فِيْ هَذِهِ الْآيَةِ دَلَالَةٌ عَلَى أَنَّ الْمَرْأَةَ الشَّابَّةَ مَأمُوْرَةٌ بِسَتْرِ وَجْهها عَنْ الْأَجْنَبِيِّينَ وَإِظْهَارِ السِّتْرِ وَالْعَفَافِ عِنْدَ الْخُرُوْجِ لِئَلَّا يَطْمَعَ أَهْلُ الرِّيَبِ فِيْهِنَّ
‘পর্দার আয়াত দ্বারা সাবালিকা নারীকে বেগানা পুরুষ থেকে চেহারা এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ঢেকে রাখার হুকুম দেয়া হয়েছে এবং বাহিরে বের হওয়ার সময় সংযত হতে বলা হয়েছে। যাতে বিবেকহীন লোকেরা লোলুপ দৃষ্টি দিতে না পারে’।
‘রদ্দুল মুহতার’ গ্রন্থকার উল্লেখ করেছেন,
(فَإِنْ خَافَ الشَّهْوَةَ) أَوْ شَكَّ (امْتَنَعَ نَظَرُهُ إلَى وَجْهِهَا) فَحِلُّ النَّظَرِ مُقَيَّدٌ بِعَدَمِ الشَّهْوَةِ وَإِلَّا فَحَرَامٌ وَهَذَا فِيْ زَمَانِهِمْ وَأَمَّا فِيْ زَمَانِنَا فَمَنَعَ مِنْ الشَّابَّةِ قُهُسْتَانِيٌّ وَغَيْرُهُ
‘যদি পুরুষ কামনার আশঙ্কা করে বা সন্দিহান হয়, তাহলে নারীর চেহারার প্রতি দৃষ্টিপাত করা নিষেধ। সুতরাং দৃষ্টির বৈধতা, কামনা জাগ্রত না হওয়ার সাথে শর্তযুক্ত ছিল, অন্যথা তা হারামই; এটা তাদের যুগের মতামত। তবে আমাদের যুগে, কুহুস্তানী সহ অন্যান্যরা নাজায়েয বলেছেন’।
যদিও অনেকে ইমাম আবূ হানীফার দোহাই দিয়ে বলেন যে, তার মতে চেহারা খোলা রাখা বৈধ। এটা তাদের অজ্ঞতার পরিচায়ক। ফিতনার আশঙ্কা না থাকার শর্তে কিছু দলীলের ভিত্তিতে ইমাম আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ) সেই সোনালী যুগে চেহারা খোলা রাখার মতামত দিয়েছিলেন বটে। কিন্তু চূড়ান্ত ফিতনার যুগে সেই শর্ত বিলীন হয়ে ইমাম আবূ হানীফার মূলনীতির আলোকেই তা অবৈধ হয়ে যায়।
মালেকী মাযহাবের ক্ষেত্রেও একই কথা অর্থাৎ শর্ত সাপেক্ষে রুখসাত ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে তাদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তে নাজায়েয বলা হয়।وَاَلَّذِيْ أَوْقَعَهُمْ فِيْ تَنْوِيْعِهِ أَنَّهُمْ رَأَوْا السِّتْرَ وَالْحِجَابَ ‘এখন নারীর চেহারা ঢেকে রাখাই তারা ফরয গণ্য করেন’।
ইমাম শাফেঈ (রাহিমাহুল্লাহ) ও ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রাহিমাহুল্লাহ) এবং তাদের মাযহাবের ওলামায়ে কেরাম চেহারাকে পর্দার অন্তর্ভুক্ত বলেছেন এবং খোলা রাখাকে নাজায়েয বলেছেন। ফিতনার আশঙ্কা থাকুক বা না থাকুক।
মোটকথা, চার মাযহাব এবং জমহূর উলামায়ে কেরামের সম্মিলিত অবস্থান হল নারীর চেহারা পর্দার অন্তর্ভুক্ত তা পরপুরুষের সামনে খোলা রাখা বৈধ নয়। বর্তমান ফিতনার যুগে এর বাইরে কিছু বলার সুযোগ নেই। যেমনটি বলা হয়েছে ‘আদিল্লাতিল হিজাব’ নামক গ্রন্থে,
نَسْتَطِيْعُ أَنْ نُخَلِّصَ مِّمَّا تَقَدَّمَ بِأَنَّ عُلَمَاءَ الْمَذَاهِبِ الْأَرْبَعَةِ يَكَادُوْنَ يَتَّفِقُوْنَ عَلَى تَغْطِيَةِ المْرَأَةِ جَمِيْعِ بَدَنِهَا عَنِ الْاَجَانِبِ سَوَاءٌ مِنْهُمْ مَنْ يَّرَى أَنَّ الْوَجْهَ وَ الْكَفّيْنِ عَوْرَةٌ وَمَنْ يَّرَى أَنَّهُمَا غَيْرُ عَوْرَة. لَكِنَّهُ يُوْجِبُ تَغْطِيَتُهُمَا فِىْ هَذَا الزَّمَانِ لِفَسَادِ أَكْثَرِ النَّاسِ
‘এ বিষয়ে আমরা দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে পারি যে, চার মাযহাবের ঐকমত্যে, পরপুরুষ থেকে পূর্ণ শরীর ঢেকে রাখা ফরয। তাদের মধ্যে কেউ কেউ চেহারা ও উভয় কব্জি পর্দার অন্তর্ভুক্ত গণ্য করেন আবার অনেকে তা করেন না। কিন্তু বর্তমানে ফিতনার যুগে হাত ও চেহারা ঢেকে রাখা ওয়াজিব। ইমাম নববী রহ. স্বীয় গ্রন্থ ‘আল-মিনহাজ’ এ লিখেছেন, যদি ফিতনার আশংকা থাকে তাহলে কোনো প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষের জন্য কোনো প্রাপ্ত বয়স্কা নারীর মুখমণ্ডল ও হাত দেখা জায়িয নেই।
আল্লামা রামালী রহ. ‘আল-মিনহাজ’ গ্রন্থের ব্যাখ্যায় এই মতের ওপর আলিমগণের ইজমা’র কথা বর্ণনা করেছেন। তিনি এও লিখেছেন, সঠিক মতানুযায়ী ফিতনার আশংকা না থাকলেও প্রাপ্ত বয়স্কা নারীকে দেখা হারাম। এর দ্বারা বুঝা যায়, মুখমণ্ডল খোলা অবস্থায় মহিলাদের বাইরে বের হওয়া জায়িয নেই। কারণ, সে অবস্থায় পুরুষ তাদেরকে দেখবে এবং দেখার মাধ্যমে ফিতনা ও কুপ্রবৃত্তির সৃষ্টি হবে। (নিহায়াতুল মিনহাজ ইলা শারহিল মিনহাজ : ৬/১৮৮)
মুফতী শফী রহঃ তার বিখ্যাত তাফসীরুল মা‘আরিফিল কুরআনে লিখেন, ইমাম চতুষ্টয়ের মধ্যে ইমাম মালেক, ইমাম শাফেয়ী এবং আহমাদ ইবনে হাম্বাল তারা মোটেই মুখ ও হাতের কবজি খোলা রাখার অনুমতি দেননি। ফিতনার আশংকা থাকুক বা না থাকুক।
ইমাম আবূ হানীফা ফেতনার আশংকা না থাকলে জায়েয বলেছেন। কিন্তু স্বাভাবিকভাবে এই শর্ত পূরণ হবার নয়।
তাই হানাফী ফক্বীহগণ গায়রে মাহরামের সাথে মুখ ও হাতের কবজি খোলা রখার অনুমতি দেননি। অন্য আরেকটি বিষয়ের প্রতি আমরা দৃষ্টিপাত করি, সেটি হল পুরুষদের নযরের হেফাযতের ব্যপারে যে আয়াত এবং হাদীস এসেছে সেগুলো চেহারাকে কেন্দ্র করেই। কারণ, পর নারীর দিকে তাকানো সকল অনিষ্টের মূল। শয়তান পর নারীর চেহারা অত্যন্ত নয়নালোভ পদ্ধতিতে উপস্থাপনা করে। কাবিল যে তার ভাই হাবিলের স্ত্রীর রূপের প্রতি কুদৃষ্টি দেয়ার কারণে কাঁধে এমন ভূত চেপে ছিল যে, আপন ভাইকে হত্যা করতে দ্বিধা করেনি। যার ফলে কিয়ামত পর্যন্ত সকল হত্যার বোঝা তার কাধে চাপানো হবে। নযরের বিধি সম্পর্কে কিছু আয়াত হাদিস তুলে ধরা হল-
(১) চোখের চুরি এবং অন্তরের গোপন বিষয় তিনি জানেন। (সূরা গাফিরঃ১৯)
يعلم خائنة الأعين وما تخفي الصدور
(২)“মুমিন পুরুষদেরকে বল, তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখবে এবং তাদের লজ্জা স্থানের হিফাযত করবে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র। নিশ্চয় তারা যা করে সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবহিত। (সূরা নূর আয়াত: ৩০)
قُل لِّلۡمُؤۡمِنِينَ يَغُضُّواْ مِنۡ أَبۡصَٰرِهِمۡ وَيَحۡفَظُواْ فُرُوجَهُمۡۚ ذَٰلِكَ أَزۡكَىٰ لَهُمۡۚ إِنَّ ٱللَّهَ خَبِيرُ بِمَا يَصۡنَعُونَ
(১)“তোমরা আমার জন্য ছয়টি জিনিসের দায়িত্ব নিলে, আমি তোমাদের জান্নাতের দায়িত্ব নিব। যখন কথা বল, সত্য বল। যখন প্রতিশ্রুতি দেবে তা পুরো করবে। যখন তোমার নিকট আমানত রাখা হবে, তা রক্ষা করবে। আর তোমরা তোমাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করবে, তোমাদের চক্ষুকে অবনত করবে এবং তোমরা তোমাদের হাতকে বিরত রাখবে”।
(মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ২২৭৫৭)
اضمنوا لي ستا من أنفسكم أضمن لكم الجنة: اصدقوا إذا حدثتم، وأوفوا إذا عاهدتم، وأدوا إذا ائتمنتم، واحفظوا فروجكم، وغضوا أبصاركم، وكفوا أيديكم
(২)“তোমরা রাস্তা বা মানুষের চলাচলের পথে বসা থেকে বিরত থাক। সাহাবীরা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! রাস্তায় বসা ছাড়া আমাদের কোনো উপায় নাই আমরা রাস্তায় বসে কথা-বার্তা বলি-আলোচনা করি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যদি তোমাদের বসতেই হয়, তাহলে তোমরা রাস্তার হক আদায় কর। তারা জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল! রাস্তার হক কি? তিনি বললেন, চক্ষু অবনত করা, কষ্টদায়ক বস্তু পথের থেকে সরানো, সালামের উত্তর দেয়া, সৎকাজের আদেশ দেয়া এবং অসৎ কাজ হতে নিষেধ করা”। (মুসলিম: হাদীস: ২১২১)
إياكم والجلوس في الطرقات، فقالوا: يا رسول الله مالنا من مجالسنا بُدٌّ نتحدث فيها. فقال: ” فإذا أبيتم إلا المجلس فأعطوا الطريق حقه. قالوا: وما حق الطريق يا رسول الله؟ قال: غض البصر، وكف الأذى ، ورد السلام، والأمر بالمعروف، والنهي عن المنكر
(৩) একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট একজন মহিলা ফতোয়া জানতে আসলে, তার দিক ফযল ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমাকে তাকাতে দেখলে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার থুতনি ধরে তার চেহারাকে অন্যদিক ফিরিয়ে দেন। (বুখারী, হাদিস: ৬২২৮)
وقد وجد النبي صلى الله عليه وسلم الفضل بن عباس رضي الله عنهما ينظر إلى امرأة جاءت تستفتيه صلى الله عليه وسلم فأخذ بذقن الفضل فعدل وجهه عن النظر إليها
(৪) আদম সন্তানের উপর ব্যভিচারের কিছু অংশ লিপিবদ্ধ হয়েছে সে অবশ্যই তার মধ্যে লিপ্ত হবে। দুই চোখের ব্যভিচার হল দৃষ্টি। দুই কানের ব্যভিচার হল শ্রবণ। মুখের ব্যাভিচার হল কথা বলা। হাতের ব্যভিচার হল স্পর্শ করা এবং পায়ের ব্যভিচার হল অগ্রসর হওয়া। আর অন্তর আশা ও আকাঙ্ক্ষা করতে থাকে। লজ্জা স্থান তাকে বাস্তবায়ন করে অথবা মিথ্যায় পরিণত করে।
عن أبي هريرة – رضي الله عنه – أن النبي – صلى الله عليه وسلم – قال: كتب على ابن آدم نصيبه من الزنا مدرك ذلك لا محالة: العينان زناهما النظر، والأذنان زناهما الاستماع، واللسان زناه الكلام، واليد زناها البطش، والرجل زناها الخطا، والقلب يهوى ويتمنى، ويصدق ذلك الفرج أو يكذبهগ্ধ . متفق عليه. هذا لفظ (.مسلم، ر و اية البخاري )
(৫) হযরত জারীর রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে (গাইরে মাহরাম মহিলার দিকে) হঠাৎ দৃষ্টি সম্পর্কে জিঞ্জাসা করলাম তিনি উত্তর তুমি তোমার চোখকে ফিরিয়ে রাখো। (মুসলিম)
عن جَرير رضي الله عنه قال: سألت رسول الله صلى الله عليه وسلم عن نظر الفَجْأَةِ فقال: اصْرِف بَصَرك
(৬) আলী রা. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে জিজ্ঞেস করেন, উত্তরে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন : ‘হে আলী, অনাকাঙ্ক্ষিত দৃষ্টি পড়ে গেলে পুনরায় তুমি দৃষ্টি দিও না। কেননা, প্রথম দৃষ্টি তোমার জন্য ক্ষমাযোগ্য কিন্তু পুনরায় দৃষ্টিপাত করা তোমার জন্য ক্ষমাযোগ্য নয়।’
(তিরমিযী: ২৭৭৭)
ﺗُﺘْﺒِﻊِ ﺍﻟﻨَّﻈَﺮَ ﺍﻟﻨَّﻈَﺮَ، ﻓَﺈِﻥَّ ﺍﻟْﺄُﻭﻟَﻰ ﻟَﻚَ ﻭَﻟَﻴْﺴَﺖْ ﻟَﻚَ ﺍﻟْﺂﺧِﺮَﺓُ
(৭) হজরত ইবনে আব্বাস রা. চোখের খেয়ানতের দৃষ্টান্ত উল্লেখ করে বলেন, এক দল লোকের পাশ দিয়ে যখন কোনো নারী অতিক্রম করে তখন কেউ কেউ সাথীদের কাছে এমন অভিনয় করে যে, তারা মনে করে তাদের সঙ্গী পরনারী থেকে দৃষ্টি অবনত রাখছে। কিন্তু যখনই সে বুঝতে পারে তার সাথীরা বেখেয়ালে আছে, তখন সে ওই নারীর দিকে তাকায়। এ জাতীয় অবৈধ গোপন দৃষ্টিগুলোই হলো চোখের খেয়ানত।’
(মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা: ১৭২২৮)
(৮) ‘চোখের যিনা হলো হারাম দৃষ্টি।’ (বুখারী : ৬৬১২)
তোমার অনুমতি ছাড়া কেউ যদি তোমার ঘরের ভেতর তাকায় আর তুমি কঙ্কর মেরে তার চোখ ফুটো করে দিয়ে থাকো, এতে তোমার কোনো দোষ হবে না। (বুখারী-৬৮৮৮)
(৯) আবূ উমামা বাহেলী রা. সূত্রে বর্ণিত হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো নারীর সৌন্দর্যের প্রতি (অনিচ্ছাকৃত) নযর পড়ে যাওয়ার পর প্রথমবারেই (সঙ্গে সঙ্গে) দৃষ্টি অবনত করে ফেলে, আল্লাহতায়ালা তাকে এমন ইবাদত করার তৌফিক দেন, যার মিষ্টতা (স্বাদ) সে হৃদয়ে অনুভব করে।’ (মুসনাদে আহমদ : ২২২৭৮)
(১০) তোমরা তোমাদের চোখকে নিচু করে রাখ এবং লজ্জাস্থানের হিফাযত করো। (মুসনাদে আহমাদ, মুসতাদরাকে হাকেম, ইবনে হিব্বান, বায়হাকী)
غُضُّوْا أَبْصَارَكُمْ، وَاحْفَظُوْا فُرُوْجَكُمْ
উল্লেখিত আয়াত ও হাদীস ছাড়াও আরও অনেক আয়াত হাদীস এবং সাহাবায়ে কেরামের আমল রয়েছে, যেগুলো পাঠ করলে সহজেই বুঝা যায় নববী ও সাহাবী যুগে নবী পত্নীগণ ও অন্যান্য মুমিন মহিলাগন কীভাবে ও কত কঠোর ভাবে পরপুরুষ থেকে চেহারা ঢাকতেন। নারীর শরীরের যতটুকু অংশ সতর ততটুকু তো কোনো মাহরামের সামনেও খোলা জায়েয নয়। পর্দার বিধান তো মূলত শরীরের ঐ অংশের জন্য যা সাধারণ অবস্থায় সতরের মধ্যে দাখিল নয় এবং মাহরামের সামনে ঢেকে রাখার প্রয়োজন নেই, তা হল চেহারা এবং দুই হাতের কব্জি। এখন যদি চেহারাই পর্দার বিধানের আওতাভুক্ত না হয়,তাহলে পর্দার আয়াত কোন্ অঙ্গের ব্যাপারে অবর্তীণ হয়েছে? সারকথা, হচ্ছে সম্ভ্রান্ত নারীরা পর্দার ক্ষেত্রে তিনটি বিষয়ের প্রতি যত্নশীল হবেন।
১. নারীগণ ঘর থেকে প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হবেনা। যা কুরআনে
কারীমের সূরায়ে আহ্যাবের ৩৩নং আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “তোমরা তোমাদের গৃহভ্যন্তরে অবস্থান কর।”
وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَى
তোমরা স্বগৃহে অবস্থান করবে এবং প্রাচীন যুগের মত নিজেদেরকে প্রদর্শন করে বেড়াবে না।
২. নারীগন ঘরের মধ্যেও কোনো গাইরে মাহ্রাম বা পরপুরুষের সামনে যাবেনা এবং কোনো গাইরে মাহরামকে সামনে আসার অনুমতিও দেবেনা। যা কুরআনে কারীমের সূরা আহযাবের ৫৩ নং আয়াতে ইরশাদ করেন “তোমরা নবী-পত্নীগণের কাছে কোনো জিনিস চাইলে, তখন পর্দার আড়াল থেকে চাইবে।
وَ اِذَا سَاَلْتُمُوْهُنَّ مَتَاعًا فَسْـَٔلُوْهُنَّ مِنْ وَّرَآءِ حِجَابٍ ؕ ذٰلِكُمْ اَطْهَرُ لِقُلُوْبِكُمْ وَ قُلُوْبِهِنَّ
“যখন তোমরা তাদের (নবী-পত্নীগণের) কাছে কোনো জিনিস চাইবে, তখন পর্দার আড়াল থেকে চাইবে। এটি তোমাদের ও তাদের অন্তরের জন্য অধিকতর পবিত্রতা দানকারী।
৩. প্রয়োজনে শরী‘আত অনুমমোদিত স্থানে ঘর থেকে বের হতে হলে চেহারা ঢেকে রাখবে। পাশাপাশি পুরুষ আকর্ষিত হয় এরকম কোন সুগন্ধি সাজ-সজ্জা গ্রহণ করবেনা। বোরকাও যেন হয় সাদামাটা আকর্ষণমুক্ত, কারুকাজমুক্ত। যা কুরআনে কারীমের সূরা নূর এর ৩১ নং আয়াত দ্বারা প্রমাণিত অর্থাৎ “তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে বেড়ায়।”
ﻭَﻗُﻞ ﻟِّﻠۡﻤُﺆۡﻣِﻨَٰﺖِ ﻳَﻐۡﻀُﻀۡﻦَ ﻣِﻦۡ ﺃَﺑۡﺼَٰﺮِﻫِﻦَّ ﻭَﻳَﺤۡﻔَﻈۡﻦَ ﻓُﺮُﻭﺟَﻬُﻦَّ ﻭَﻟَﺎ ﻳُﺒۡﺪِﻳﻦَ ﺯِﻳﻨَﺘَﻬُﻦَّ ﺇِﻟَّﺎ ﻣَﺎ ﻇَﻬَﺮَ ﻣِﻨۡﻬَﺎ ﻭَﻟۡﻴَﻀۡﺮِﺑۡﻦَ ﺑِﺨُﻤُﺮِﻫِﻦَّ ﻋَﻠَﻰٰ ﺟُﻴُﻮﺑِﻬِﻦَّۖ ﻭَﻟَﺎ ﻳُﺒۡﺪِﻳﻦَ ﺯِﻳﻨَﺘَﻬُﻦَّ ﺇِﻟَّﺎ ﻟِﺒُﻌُﻮﻟَﺘِﻬِﻦَّ ﺃَﻭۡ ﺀَﺍﺑَﺎٓﺋِﻬِﻦَّ ﺃَﻭۡ ﺀَﺍﺑَﺎٓﺀِ ﺑُﻌُﻮﻟَﺘِﻬِﻦَّ ﺃَﻭۡ ﺃَﺑۡﻨَﺎٓﺋِﻬِﻦَّ ﺃَﻭۡ ﺃَﺑۡﻨَﺎٓﺀِ ﺑُﻌُﻮﻟَﺘِﻬِﻦَّ ﺃَﻭۡ ﺇِﺧۡﻮَٰﻧِﻬِﻦَّ ﺃَﻭۡ ﺑَﻨِﻲٓ ﺇِﺧۡﻮَٰﻧِﻬِﻦَّ ﺃَﻭۡ ﺑَﻨِﻲٓ ﺃَﺧَﻮَٰﺗِﻬِﻦَّ ﺃَﻭۡ ﻧِﺴَﺎٓﺋِﻬِﻦَّ ﺃَﻭۡ ﻣَﺎ ﻣَﻠَﻜَﺖۡ ﺃَﻳۡﻤَٰﻨُﻬُﻦَّ ﺃَﻭِ ﭐﻟﺘَّٰﺒِﻌِﻴﻦَ ﻏَﻴۡﺮِ ﺃُﻭْﻟِﻲ ﭐﻟۡﺈِﺭۡﺑَﺔِ ﻣِﻦَ ﭐﻟﺮِّﺟَﺎﻝِ ﺃَﻭِ ﭐﻟﻄِّﻔۡﻞِ ﭐﻟَّﺬِﻳﻦَ ﻟَﻢۡ ﻳَﻈۡﻬَﺮُﻭﺍْ ﻋَﻠَﻰٰ ﻋَﻮۡﺭَٰﺕِ ﭐﻟﻨِّﺴَﺎٓﺀِۖ ﻭَﻟَﺎ ﻳَﻀۡﺮِﺑۡﻦَ ﺑِﺄَﺭۡﺟُﻠِﻬِﻦَّ ﻟِﻴُﻌۡﻠَﻢَ ﻣَﺎ ﻳُﺨۡﻔِﻴﻦَ ﻣِﻦ ﺯِﻳﻨَﺘِﻬِﻦَّۚ ﻭَﺗُﻮﺑُﻮٓﺍْ ﺇِﻟَﻰ ﭐﻟﻠَّﻪِ ﺟَﻤِﻴﻌًﺎ ﺃَﻳُّﻪَ ﭐﻟۡﻤُﺆۡﻣِﻨُﻮﻥَ ﻟَﻌَﻠَّﻜُﻢۡ ﺗُﻔۡﻠِﺤُﻮﻥَ ٣١ [ ﺍﻟﻨﻮﺭ : ٣١ ]
‘আর মুমিন নারীদেরকে বল, তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখবে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করবে। আর যা সাধারণত প্রকাশ পায় তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য তারা প্রকাশ করবে না। তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে। আর তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, নিজদের ছেলে, স্বামীর ছেলে, ভাই, ভাই এর ছেলে, বোনের ছেলে, আপন নারীগণ, তাদের ডান হাত যার মালিক হয়েছে, অধীনস্থ যৌনকামনামুক্ত পুরুষ অথবা নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ বালক ছাড়া কারো কাছে নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। আর তারা যেন নিজেদের গোপন সৌন্দর্য প্রকাশ করার জন্য সজোরে পদচারণা না করে। হে মুমিনগণ, তোমরা সকলেই আল্লাহর নিকট তাওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।’ (সূরা আন-নূর, আয়াত : ৩১)