বিষয়: হিজড়া ও ট্রান্সজেন্ডার সংক্রান্ত মাসআলা জানার আবেদন।
প্রশ্ন: মুহতারাম! আমরা জানি যে, বাংলাদেশ সরকার হিজড়া জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের জন্য উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে আসছে।
সাম্প্রতিককালে দৈনিক ইত্তেফাকসহ বিভিন্ন মিডিয়া থেকে জানতে পারলাম যে, বাংলাদেশ সরকার হিজড়া জনগোষ্ঠীর অধিকার সংরক্ষণের জন্য “ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তির অধিকার সুরক্ষা আইন ২০২৩” নামে একটি আইনের খসড়া তৈরি করেছে এবং আগামী সংসদের প্রথম অধিবেশনে তা পাশ করার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। তবে আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে এই আইনের শিরোনামে “ট্রান্সজেন্ডার” শব্দের পরিবর্তে “হিজড়া” শব্দটির ব্যবহার যথার্থ ছিল। কেননা সরকার আইনটি করছে হিজড়া জনগোষ্ঠীর অধিকারকে কেন্দ্র করে (যদিও এখানে ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তির সংজ্ঞায় হিজড়া ব্যক্তিকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে)। তাছাড়া “ট্রান্সজেন্ডারিজম” এমন একটি বিষয়, যা আমাদের
কৃষ্টি-কালচারের সাথে কতটুকু খাপ খায় তা-ও ভাবনার বিষয়। দেশের সাধারণ মানুষ এই টার্ম দু’টোকে প্রায়শই গুলিয়ে ফেলে এবং একটিকে আরেকটির সমার্থক শব্দ মনে করে। কিন্তু আদৌ তা নয়; বরং “হিজড়া” এবং “ট্রান্সজেন্ডার” শব্দ দু’টির আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থের বিশাল ব্যবধান রয়েছে। প্রথমটি জন্মগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ লিঙ্গ সম্পর্কীয় আর দ্বিতীয়টি হলো, মনস্তাত্বিক-লিঙ্গ অভিব্যক্তি বা জেন্ডার সম্পর্কীয়।
প্রচলিত অর্থে, “হিজড়া” (Intersex) বলতে এমন লৈঙ্গিক বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন (লিঙ্গ-প্রতিবন্ধী) ব্যক্তিকে বোঝায়, যাকে শারীরিক এবং মানসিক গঠনের উপর ভিত্তি করে পূর্ণাঙ্গ নারী বা পুরুষ কোনো লিঙ্গেই স্বাভাবিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যায় না। চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুসারে ক্রোমোজোমের ত্রুটির কারণে জন্মগত যৌন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, যাদের দৈহিক (ফেনোটাইপ) বা জেনেটিক (জেনোটাইপ) কারণে নারী বা পুরুষ কোন শ্রেণীতে অন্তর্ভুক্ত করা যায় না, সমাজে এই জনগোষ্ঠী হিজড়া হিসেবে পরিচিত। পক্ষান্তরে “ট্রান্সজেন্ডার” (Transgender) বা “রূপান্তরকামী” হলো এমন ব্যক্তি যার মনস্তাত্বিক লিঙ্গবোধ জন্মগত লিঙ্গ-চিহ্ন হতে ভিন্ন। অর্থাৎ, শারীরিক গঠন বা জৈবিক লিঙ্গ সাপেক্ষে পুরো বিপরীত মানসিকতার লিঙ্গবোধ সম্পন্ন ব্যক্তিই হলো, “ট্রান্সজেন্ডার” আর এই মতাদর্শকে বলে “ট্রান্সজেন্ডারিজম” (Trans-genderism)। এই মতাদর্শ অনুযায়ী একজন ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তি চাইলে তার শারীরিক অবকাঠামো (সার্জারী বা হরমোন থেরাপির মাধ্যমে) পরিবর্তন করতেও পারে, আবার না-ও পারে; তা আবশ্যক নয়। আসলে ট্রান্সজেন্ডারদের এরূপ ব্যতিক্রমী মানসিক বৈশিষ্ট্যের জন্য চিকিৎসা শাস্ত্র এটাকে Gender Identity Disorder (GID) বা মানসিক ব্যাধি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অবশ্য এই মানসিক ব্যাধি নিরাময়ের জন্য চিকিৎসা ব্যবস্থাও রয়েছে যেমন- Psychotherapy, Sexual Orientation Change Effect (SOCE), Gender Identity Change Effect (SOCE) ইত্যাদি। অনেকে এই মানসিক ব্যাধির চিকিৎসা না করিয়ে বরং মনের চাহিদাকে প্রাধান্য দিয়ে ট্রান্সজেন্ডার রূপেই স্থিত হয়।
ট্রান্সজেন্ডারিজম মূলত: জেন্ডার সম্পর্কীয় পাশ্চাত্যের একটি মতাদর্শ। এই মতাদর্শ যদি আইনি-বৈধতা পায় তাহলে একজন পুরুষ মনস্তাত্বিকভাবে ( self-perceived) নিজেকে নারী দাবী করলে সে সমাজ এবং রাষ্ট্রের কাছে একজন নারী (ট্রান্স-নারী) হিসেবে এবং একজন নারী নিজেকে পুরুষ দাবী করলে সে একজন পুরুষ (ট্রান্স-পুরুষ) হিসেবে গণ্য হবে। রাষ্ট্রীয় অধিকার বা নিয়মাবলী তার রূপান্তরিত অবস্থা অনুযায়ী নির্ধারিত হবে। ফলে এ নিয়ে সমাজের বিভিন্ন স্তরে ঘটবে বিশৃঙ্খলা। যেমন ট্রান্সজেন্ডার উত্তরাধিকার আইনে ট্রান্স-নারী (জন্মগত পুরুষ) একজন নারীর সমান এবং ট্রান্স-পুরুষ (জন্মগত নারী) একজন পুরুষের সমান অধিকার পাবে। অর্থাৎ, একজন মেয়ে নিজেকে ট্রান্স-পুরুষ দাবী করলে, সেও তার ভাইয়ের সমান অংশ পাবে। যা কি-না এক পর্যায়ে পারিবারিক দ্বন্দের সূচনা করবে। নারীদের সামাজিক নিরাপত্তাও অনেকাংশে ঝুঁকির সম্মুখীন হবে।
ট্রান্সজেন্ডার আইনের সবচেয়ে ভয়াবহ আশঙ্কা হচ্ছে সমকামিতার অবাধ প্রসার। এই আইনে যেহেতু একজন ট্রান্স-নারী (জন্মগত পুরুষ) নারী হিসেবে বিবেচিত হবে, তাই যে কোনো একজন পুরুষ সঙ্গীকে বেছে নিয়ে বিয়ে করতে তার আর আইনগত কোনো বাধা থাকে না। কারণ বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৭৭ নং ধারার সমকামী বিরোধী আইন তার উপর প্রযোজ্য হবে না। ফলে কার্যত এই আইন পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে দিয়ে সমকামিতাকে উষ্কে দেবে এবং সমলিঙ্গের মধ্যে বিয়ের দ্বার উন্মুক্ত করবে।
উল্লেখ্য যে, খএইঞ (নারী-সমকামী, পুরুষ-সমকামী, উভকামী এবং ট্রান্সজেন্ডার) তথা ট্রান্সজেন্ডারিজম মতাদর্শের ভয়াবহতার কথা বিবেচনা করে বিশ্বে অনেক দেশ ইতিমধ্যে এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে।
আন্তর্জাতিক চাপ থাকার পরেও আমাদের দেশের সরকারও এ ব্যাপারে সর্বদা অনমনীয় মনোভাব পোষণ করে আসছে। আবহমানকাল থেকে আমাদের কালচারে এবং ধর্মে জন্মগত লৈঙ্গিক অবকাঠামো তথা জৈবিক লিঙ্গের উপর ভিত্তি করে একজন ব্যক্তির (নারী বা পুরুষ) লিঙ্গ নির্ধারিত হয় এবং সে অনুযায়ী ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় রীতিনীতি প্রযোজ্য হয়। অপরপক্ষে, ট্রান্সজেন্ডারিজম মতবাদে কেবলমাত্র আত্ম-অনুভূতির উপর নির্ভর করেই লিঙ্গ নির্ধারিত হয়, শারীরিক বা জৈবিক (জন্মগত) লিঙ্গ এখানে একদম গুরুত্বহীন, এ ব্যাপারটি আমার কাছে বেশ বিভ্রান্তিকর। এমতাবস্থায়, আমার বিভ্রান্তি নিরসনের লক্ষ্যে উপরের আলোচনার প্রেক্ষিতে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে নিম্নল্লিখিত প্রশ্নগুলোর উত্তর জানতে চাই—
১. “ট্রান্সজেন্ডারিজম” (ঞৎধহংমবহফবৎরংস) মতবাদ সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি কী?
২. ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় হিজড়া এবং ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য কী?
৩. হিজড়া ব্যক্তির জন্য নাগরিক অধিকার, উত্তরাধিকার সম্পত্তি বণ্টন, বিবাহ-শাদী, লিঙ্গ নির্ধারণ (নারী বা পুরুষ) ইত্যাদি ক্ষেত্রে শরয়ী বিধান কী?
৪. ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তির জন্য নাগরিক অধিকার, উত্তরাধিকার সম্পত্তি বণ্টন, বিবাহ- শাদী, লিঙ্গ নির্ধারণ (নারী বা পুরুষ) ইত্যাদি ক্ষেত্রে শরয়ী বিধান কী?
৫. চিকিৎসার নিমিত্তে হিজড়া এবং ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তির জন্য হরমোন-থেরাপি এবং সার্জারীর অনুমতি আছে কি? শরীয়তের অনুমোদন থাকলে তার ব্যাপ্তি বা পরিসর জানতে চাই।
মহোদয়ের নিকট আবেদন, কুরআন-সুন্নাহ তথা ইসলামী শরীয়ার আলোকে উল্লিখিত প্রশ্নগুলোর জবাব প্রদান করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে মর্জি ফরমাবেন।

নিবেদক
ড. মো. কামরুজ্জামান প্রামাণিক
উত্তর:

باسمه تعالى
الجواب ومن الله الصواب، حامداً ومصلياً ومسلماً

প্রথম প্রশ্নের শরয়ী সমাধান:
‘ট্রান্সজেন্ডার মতবাদ’ মূলত একটি পশ্চিমা মতাদর্শ। ব্যক্তিস্বাধীনতার নামে সমাজে অশান্তি, বিশৃঙ্খলা, অবাধ ও বিকৃত যৌনতা এবং নোংরামির বিস্তার ও প্রচার ঘটাতে এর আত্মপ্রকাশ। পশ্চিমা বিকৃত কালচার বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার অংশ হিসেবে শব্দের মারপ্যাঁচ ও ধোঁকার আশ্রয় নিয়ে এদেশে ট্রান্সজেন্ডার মতাদর্শটির সামাজিক ও আইনী বৈধতা আদায়ের চেষ্টা চলছে। এই মতবাদটি সম্পূর্ণ ইসলাম, মানবতা ও প্রকৃতি বিরোধী মতবাদ। ট্রান্সজেন্ডার মতবাদ কয়েকটি কারণে ইসলাম সমর্থিত নয়—
ক. আল্লাহ তা‘আলার সৃষ্টি ও বণ্টনে অসন্তুষ্টি:
এই মতাদর্শের প্রথম ত্রুটি হলো, এ ধরনের লোকেরা আল্লাহর সৃষ্টি ও বণ্টনে সন্তুষ্ট নয়। তারা মনে করে, জন্মগতভাবে তারা ভুল দেহ নিয়ে জন্মেছে। এজন্য তারা বিপরীত লিঙ্গ গ্রহণ করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়। অথচ আল্লাহ তা‘আলা মানুষের সৃষ্টি সম্পর্কে বলেন— ‘যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, যথোচিত অবয়ব দিয়েছেন এবং সুসামঞ্জস্যশীল করেছেন। যে আকৃতিতে চেয়েছেন তিনি তোমাকে গঠন করেছেন।’
(সূরা ইনফিতার-৭৮)
অপর আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা কসম করে বলেছেন যে, মানুষকে তিনি সর্বোৎকৃষ্ট আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন। ইরশাদ হচ্ছে— ‘নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি সর্বোত্তম গঠনে। (সূরা ত্বীন-৪)
আল্লাহ তা‘আলা তার ইচ্ছানুযায়ী মানুষকে পুরুষ বা নারী বানিয়েছেন। প্রতিটি ব্যক্তির লিঙ্গ আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত এবং এটি আল্লাহ তা‘আলার একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে—
عن عبد الله بن مسعود قال: الشقي من شقي في بطن أمه، والسعيد من وعظ بغيره. فأتى رجلًا من أصحاب رسول الله يقال له: حذيفة بن أسيد الغفاري، فحدثه بذلك من قول ابن مسعود، فقال: وكيف يشقى رجل بغير عمل؟ فقال له الرجل: أتعجب من ذلك؟ فإني سمعت رسول الله يقول إذا مر بالنطفة ثنتان وأربعون ليلة بعث الله إليها ملكا، فصورها وخلق سمعها وبصرها وجلدها ولحمها وعظامها، ثم قال: يا رب! أذكر أم أنثى؟ فيقضي ربك ما شاء ويكتب الملك، ثم يقول: يا رب! أجله. فيقول ربك ما شاء ويكتب الملك، ثم يقول: يا رب! رزقه. فيقضي ربك ما شاء ويكتب الملك، ثم يخرج الملك بالصحيفة في يده، فلا يزيد على ما أمر ولا ينقص.
অর্থ: রাসূলুল্লাহ সা বলেন, যখন শুক্রাণুর উপর বিয়াল্লিশ রাত (দিন) অতিবাহিত হয়ে যায়, তখন আল্লাহ তা‘আলা একজন ফেরেশতা পাঠান। সে সেটিকে একটি আকৃতি দেয়; তার কান, চোখ, চামড়া, গোশত ও হাড় সৃষ্টি করে। এরপর সে বলে, হে আমার প্রতিপালক! সে কি পুরুষ হবে, না নারী হবে? তখন তোমার রব যা চান নির্দেশ দেন এবং ফেরেশতা তা লিখে ফেলে। (সহীহ মুসলিম: ২৬৪৫)
উল্লিখিত হাদীস থেকে জানা যায় যে, একজন ব্যক্তি পুরুষ না নারী— তা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কর্তৃক প্রণীত সিদ্ধান্ত, যা চেনার মানদণ্ড হলো
মানুষের শারীরিক গঠন। যার দেহে পুরুষের অঙ্গ রয়েছে সে পুরুষ, আর যার শরীরে নারীর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ রয়েছে সে নারী হিসেবে গণ্য হবে। এতে মানুষের কোনো ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা এবং ব্যক্তিগত অনুভূতি ও প্রবণতার কোনো হস্তক্ষেপ নেই। আল্লাহ তা‘আলা যার জন্য যেটা নির্ধারণ করেছেন তার বিপরীত কিছু চাইতে তিনি নিষেধ করেছেন। অর্থাৎ, একজনকে আল্লাহ তা‘আলা নারী বানিয়েছেন তার জন্য পুরুষের অধিকার চাওয়া কবীরা গুনাহ এবং হারাম। তদ্রূপ কাউকে তিনি পুরুষ বানিয়েছেন তার জন্য মহিলার অধিকার চাওয়াও হারাম। এটা তাকদীর অস্বীকার করার নামান্তর। আর তাকদীরের উপর বিশ্বাস রাখা ঈমানের একটি মৌলিক স্তম্ভ। তাকদীর অস্বীকার করলে ঈমান থাকবে না। সুতরাং এ মতাদর্শ লালন করলে তাকদীর অস্বীকার করার দরুণ ঈমান থাকবে না। তাকদীর অস্বীকার করার কারণে এটি একটি ইসলাম-বিরোধী ও ঈমান-বিধ্বংসী মতবাদ।
খ. পোশাক-আশাক ও বেশ-ভূষায় বিপরীত লিঙ্গের সাদৃশ্য গ্রহণ:
ইসলামে একজন নারী বা পুরুষের জন্য বিপরীত লিঙ্গের বেশ-ভূষা ধারণ করা এবং তার অনুসরণ করা সম্পূর্ণ হারাম এবং মারাত্মক গুনাহের কাজ। হাদীসে পাকে রাসূলুল্লাহ সা এ ধরনের কাজে লিপ্ত ব্যক্তিদের প্রতি মারাত্মক লা‘নত ও অভিসম্পাত করেছেন—
عن ابن عبّاسٍ رضي الله عنهما قال: لعن النبي ‌المُخَنَّثِينَ من الرجال، والمُتَرَجِّلَاتِ من النّساء، وقال أَخْرِجُوهُمْ مِنْ بُيُوتِكُمْ .وأَخْرَجَ فلانًا، وأخرج عمر فلاناً.
অর্থ: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন, রাসূল সা: নারীর সাদৃশ্য বহনকারী পুরুষ ও পুরুষের সাদৃশ্য বহনকারিণী নারীকে অভিসম্পাত করেছেন এবং বলেছেন, তাদেরকে তোমাদের ঘর থেকে বের করে দাও। (সহীহ বুখারী: ৫৮৮৬)
এই হাদীস থেকে বুঝা যায়, আল্লাহ যাকে পুরুষ বানিয়েছেন— তার জন্য বিপরীত লিঙ্গ অর্থাৎ নারীর সাদৃশ্য গ্রহণ করা জায়েয নেই। একইভাবে আল্লাহ যাকে নারী বানিয়েছেন— তার জন্যও এটা জায়েয নেই যে, সে একজন পুরুষের সাদৃশ্য গ্রহণ করবে। এমন আরো বহু হাদীসে নবী কারীম সা পোশাক-আশাক, চাল-চলন, বেশ-ভূষা, আচার-আচরণ ইত্যাদির ক্ষেত্রে পুরুষের জন্য নারীর এবং নারীর জন্য পুরুষের সাদৃশ্য গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন।
গ. আল্লাহ তা‘আলার সৃষ্টির বিকৃতি:
কুরআনে কারীমে আল্লাহ তা‘আলার সৃষ্টির পরিবর্তনকে শয়তানের কাজ বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। শয়তান যখন আল্লাহ তা‘আলার অবাধ্যতা করার কারণে জান্নাত থেকে বিতাড়িত হলো, তখন সে আল্লাহর সাথে বিদ্রোহ করে ঘোষণা দিল, আমি বনী আদমের অধিকাংশকে পথভ্রষ্ট করে জাহান্নামে নিব। কুরআনে কারীমে ইরশাদ হচ্ছে— ‘আর সে (শয়তান) বলেছিল, আমি আপনার বান্দাদের একটি নির্দিষ্ট অংশ নিয়ে নিব (অর্থাৎ, আমার অনুসারী বানাব) এবং অবশ্যই তাদেরকে পথভ্রষ্ট করব, তাদেরকে (মিথ্যা) আশা-ভরসা দিব এবং তাদেরকে আদেশ করব, ফলে তারা চতুষ্পদ জন্তুর কান চিরে ফেলবে। তাদেরকে আরো আদেশ করব, ফলে তারা আল্লাহর সৃষ্টিকে বিকৃত করবে। আর যে আল্লাহর পরিবর্তে
শয়তানকে বন্ধু বানাল, সে সুস্পষ্ট ক্ষতিতে পড়ে গেল।’(সূরা নিসা-১১৮, ১১৯)
অপর আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সৃষ্টির বিকৃতি এবং পরিবর্তন করতে নিষেধ করত বলেছেন— ‘আল্লাহর সেই ফিতরত অনুযায়ী চল, যে ফিতরতের উপর তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। আর তোমরা আল্লাহর সৃষ্টিতে কোনো পরিবর্তন করো না। (সূরা রূম-৩০)
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফাসসিরগণ বিশেষভাবে এই হাদীসটি উল্লেখ করে থাকেন—
عن عبد الله بن مسعود رضي الله عنه قال: لعن الله الواشمات والمستوشمات، والمتنمصات والمتفلجات للحسن، المغيرات خلق الله. قال: ما لي لا ألعن من لعنه رسول الله، وهو في كتاب الله؟
অর্থ: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রাযি. থেকে বর্ণিত, আল্লাহ তা‘আলা ঐ সমস্ত মহিলাদের উপর লা‘নত করেছেন যারা সৌন্দর্যের জন্য উল্কি করে, ভ্রু উপড়ে ফেলে, সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য দাঁত চিকন করে মাঝে ফাঁক করে এবং যারা আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে পরিবর্তন সাধন করে। হযরত ইবনে মাসঊদ রা. বলেন, আমি কেন তাকে লা‘নত করব না, যাকে আল্লাহর রাসূল সা: লানত করেছেন এবং তা আল্লাহর কিতাবে বিদ্যমান রয়েছে? (সহীহ বুখারী: ৫৯৪৩)
সুতরাং যখন সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য এই ছোট-খাটো কাজগুলোর ব্যাপারে এত কঠিন হুঁশিয়ারি এসেছে, তখন মানুষের লিঙ্গ পরিবর্তন করা তো আরো জঘন্য ও গুরুতর অপরাধ। এই শরীর আল্লাহ তা‘আলার আমানত, শরীয়তের হুকুমের বাইরে এর মধ্যে কোনো ধরনের পরিবর্তন সেই আমানতের চরম খেয়ানত এবং মারাত্মক কবীরা গুনাহ। এজন্য পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল উলামা, ফুকাহা, মুহাদ্দিস, মুফাসসির— আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের মাখলুকের সৃষ্টিগত বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করাকে অবৈধ ও হারাম ঘোষণা করেছেন।
ঘ. সমকামিতা ও বিকৃত যৌনতা প্রচার:
ট্রান্সজেন্ডাররা তাদের বিকৃত যৌনরুচির কারণে লিঙ্গ পরিবর্তনসহ বিপরীত লিঙ্গের সাদৃশ্য গ্রহণের মত জঘন্য কাজে লিপ্ত হয়ে মূলত ক্বওমে লূতের জঘন্যতম কার্যকলাপকে সারা বিশ্বে স্বাভাবিক করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যারা প্রকৃতির বিরুদ্ধাচরণ করে এই জঘন্য ও মন্দ কাজ করে, তারা শরীয়তের দৃষ্টিতে অভিশপ্ত। ইসলামের দৃষ্টিতে অশ্লীলতা অনেক বড় গুনাহ।
হাফেয ইবনুল ক্বায়্যিম রহ. বলেন, কুরআনে কারীমে গুনাহের মধ্যে শিরক, ব্যভিচার এবং সমকামিতাকে অপবিত্র ও মন্দ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। অন্য আরেক জায়গায় লিখেন, ব্যভিচার ও সমকামিতার গুনাহ অন্যান্য গুনাহের চেয়ে বেশি। এটি এমন একটি জঘন্য কাজ, যার কারণে এ ধরনের লোক এবং তাদের জনবসতির উপর ফেরেশতাদের অভিশাপ এবং আল্লাহর গজব নাযিল হয়। পূর্ববর্তী উম্মতদের মাঝে যারা এই জঘন্য কাজে লিপ্ত ছিল, আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে পাথর বর্ষণ করে, যমীন উল্টে দিয়ে ধ্বংস করে দিয়েছেন এবং তাদের এলাকাকে সাগর বানিয়ে দিয়েছেন, যা মৃত সাগর বা ডেড-সী নামে পরিচিত। উল্লিখিত কারণসমূহের ভিত্তিতে ট্রান্সজেন্ডার মতবাদ সম্পূর্ণরূপে ইসলাম, মানবতা ও প্রকৃতি-বিরোধী মতবাদ। এই মতাদর্শকে ব্যক্তিঅধিকার মনে করা, এর সমর্থন করা, এর পক্ষে কথা বলা, এর পক্ষে আইন পাশ করে এর বৈধতা দেওয়া সবই হারাম। আর এ কাজকে জেনে বুঝে হালাল ও বৈধ মনে করা এবং ব্যক্তিঅধিকার মনে করা— ঈমান বিধ্বংসী ও কুফরী কাজ। কারণ, হালালকে হালাল জানা এবং হারামকে হারাম জানা ঈমানের দাবী। আর এর বিপরীত বিষয় অর্থাৎ হালালকে হারাম মনে করা এবং হারামকে হালাল মনে করা কুফরী। (সূরা নাজম-৪৫, সূরা শূরা-৪৯-৫০, সূরা নিসা-৩২ ও ১১৮-১২১, সূরা রূম-৩০, সূরা বাকারা-২০৫, সূরা আ’রাফ-৮০, সহীহ বুখারী: ৫৮৮৬, সহীহ মুসলিম: ২৬৪৫, মুসনাদে আহমাদ: ২২৯১, ৬৮৭৫, ১৮৭৫, সুনানে আবূ দাঊদ: ৪০৯৮, আহকামুল কুরআন লিল-জাস্সাস্ ৩/২৬৮, রদ্দুল মুহতার ৪/২২৩, ইগাছাতুল লাহ্ফান ফী মাছায়িদিশ শায়তান ১/৫৯)
দ্বিতীয় প্রশ্নের শরয়ী সমাধান:
আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কুদরতের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে মাঝে-মধ্যে কারো কারো দেহে বাহ্যিকভাবে নারী-পুরুষ উভয়ের আলামত ও বৈশিষ্ট্যের সংমিশ্রণ দেখা যায়। চিকিৎসা-বিজ্ঞান অনুসারে ক্রোমোজোমের ত্রুটির কারণে জন্মগত যৌন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি— যাদেরকে দৈহিক বা জেনেটিক কারণে নারী কিংবা পুরুষ কোনো শ্রেণীতে অন্তর্ভুক্ত করা যায় না— এ ধরনের মানুষের ক্ষেত্রে “আন্তঃলিঙ্গ” বা “Intersex” শব্দ ব্যবহার করা হয়। স্বাভাবিক ভাষায় আমরা তাদেরকে “হিজড়া” বলে থাকি। এটি একটি শারীরিক প্রতিবন্ধকতা। বাহ্যিকভাবে তাদের লিঙ্গ নির্ধারণ করা না গেলেও ইসলাম তাদের বিধানও সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করে দিয়েছে। আলামত বা নিদর্শনের আধিক্যের ভিত্তিতে তার উপর হয়তো নারীর বিধান প্রযোজ্য হবে কিংবা পুরুষের বিধান প্রযোজ্য হবে। ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় ওহঃবৎংবী, আন্তঃলিঙ্গ বা হিজড়া হলো এমন ব্যক্তি, যার পুরুষ-লিঙ্গ এবং স্ত্রী-লিঙ্গের উভয়টি থাকে কিংবা উভয়টির একটিও থাকে না। আরবীতে এদেরকে ‘খুন্ছা’ বলা হয়।
ট্রান্সজেন্ডার এবং হিজড়া এক নয়:
ট্রান্সজেন্ডারের ব্যাখ্যা এবং হিজড়ার সংজ্ঞা থেকে এটা খুবই স্পষ্ট যে, ট্রান্সজেন্ডার এবং হিজড়া একে অপরের প্রতিশব্দ নয়। ট্রান্সজেন্ডার হলো এমন ব্যক্তি, যে শারীরিক গঠনের দিক থেকে হয়তো পূর্ণাঙ্গ পুরুষ বা পূর্ণাঙ্গ মহিলা, কিন্তু নিজের মানসিক ব্যাধির কারণে কিংবা ব্যক্তিগত অনুভূতি বা মনস্তাত্ত্বিক আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে অথবা বিকৃত যৌনরুচির কারণে সে তার জন্মগত লিঙ্গকে অস্বীকার করে।অপরদিকে ইসলামী শরীয়ত ও চিকিৎসা-বিজ্ঞানের পরিভাষায় হিজড়া হলো এমন ব্যক্তি, যার শারীরিক গঠনে জন্মগত সমস্যা রয়েছে এবং এর কারণে বাহ্যিক দৃষ্টিতে তার লিঙ্গ স্পষ্ট নয়।
হিজড়া এবং ট্রান্সজেন্ডারের মাঝে মৌলিক পার্থক্য হলো, হিজড়াদের সমস্যাটি একটি জন্মগত শারীরিক সমস্যা, এটি খুবই অস্বাভাবিক ঘটনা। বয়ঃসন্ধির সময় তার মাঝে কোনো এক লিঙ্গের নিদর্শনের আধিক্যের মাধ্যমে তার প্রকৃত লিঙ্গ নির্ধারণ করা সম্ভব। তাছাড়া বর্তমান চিকিৎসা-বিজ্ঞানের উৎকর্ষের যুগে ল্যাব টেস্টের মাধ্যমে অতি সহজেই তার প্রকৃত লিঙ্গ নির্ধারণ করা যায়। তাকে ট্রান্সজেন্ডারের মধ্যে গণ্য করা প্রতারণা ছাড়া কিছুই নয়। কেননা, ট্রান্সজেন্ডারের সমস্যা জন্মগত কোনো সমস্যা নয়; বরং একটি মানসিক বিকৃতি, যার সাথে তার জন্মগত লিঙ্গের সম্পর্ক ধর্তব্য নয়। এমনকি অস্ত্রপচার ইত্যাদির মাধ্যমে লিঙ্গ পরিবর্তন করাও জরুরী নয়; বরং নিজেকে বিপরীত লিঙ্গের দাবী করলেই সে ট্রান্সজেন্ডার। অথচ হরমোন থেরাপি বা অস্ত্রপচারের মাধ্যমে লিঙ্গ পরিবর্তন করলেও একজন ট্রান্সজেন্ডার প্রকৃতপক্ষে বিপরীত লিঙ্গের হতে পারে না; বরং শুধু দৈহিক অবকাঠামোর কিছু পরিবর্তন হয়। বিপরীত লিঙ্গের এ নিদর্শনটুকুও নিজ দেহে বহাল রাখতে চিকিৎসা অব্যাহত রাখতে হয়। ট্রান্সজেন্ডাররা স্বভাবত সমকামী হয়ে থাকে, আবার উভকামীও হতে পারে। তাদের এই বিকৃত যৌনরুচিই তাদেরকে এমন অশ্লীল কাজে উদ্বুদ্ধ করতে থাকে। এর কারণে তাদের দেহে মারাত্মক রোগ সৃষ্টি হয় এবং মানসিকভাবে চরম অস্থিরতা ও বিষণ্নতায় ভোগে, যার ফলে অনেক সময় তারা আত্মহত্যা করে নিজেদেরকে ধ্বংস করে দেয়। (সূরা নাজম-৪৫, আহকামুল কুরআন লিল-জাস্সাস্ ৫/২৯৮, আল-মাবসূত লিস-সারাখসী ৩০/৯১-৯২, রদ্দুল মুহতার ৬/৭২৭-৭৩১, বাদায়িউস সানায়ে’ ১০/৪৬১-৪৬২, আল-ফিকহুল হানাফী ফী ছাওবিহিল জাদীদ ২/২৭২)
তৃতীয় প্রশ্নের শরয়ী সমাধান:
হিজড়াদের শরয়ী বিধি-বিধান নিচে প্রদত্ত হলো।
শরীয়তে হিজড়াদেরকে মৌলিকভাবে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে—
১. যাকে আলামত ও বৈশিষ্ট্যের আধিক্যের মাধ্যমে নারী বা পুরুষ হিসেবে নির্ণয় করা সম্ভব।
এই শ্রেণীর লোক আবার দুই প্রকার—
ক. যার মাঝে পুরুষের আলামত ও বৈশিষ্ট্যের আধিক্য পরিলক্ষিত হয়— যেমন পুরুষ-লিঙ্গ দিয়েই কেবল পেশাব বের হওয়া বা পুরুষ-লিঙ্গ দিয়ে পেশাব আগে বের হওয়া, অথবা প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পর স্বাভাবিক পুরুষের মত স্বপ্নদোষ হওয়া বা পুরুষের মত দাড়ি উঠা, কিংবা স্ত্রীর সাথে সহবাসে সক্ষম হওয়া ইত্যাদি— তাহলে সে পুরুষ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং পুরুষের যাবতীয় বিধি-বিধান তার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।
খ. যার মাঝে মহিলার আলামত ও বৈশিষ্ট্যের আধিক্য পাওয়া যায়— যেমন কেবল স্ত্রী-লিঙ্গ দিয়েই পেশাব বের হওয়া বা স্ত্রী-লিঙ্গ দিয়ে পেশাব আগে বের হওয়া, অথবা প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পর মহিলার মত স্তন প্রকাশ পাওয়া বা স্তন থেকে দুধ বের হওয়া অথবা ঋতুমতি হওয়া কিংবা গর্ভবতী হওয়া ইত্যাদি— তাহলে সে মহিলা হিসেবে বিবেচিত হবে এবং মহিলাদের যাবতীয় বিধি-বিধান তার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। এই শ্রেণীর হিজড়া— নারী হোক কিংবা পুরুষ— বিপরীত লিঙ্গের স্বাভাবিক এবং হিজড়া যে কোনো নারী-পুরুষকে বিবাহ করতে পারবে এবং তাদের বিপরীত লিঙ্গের গায়রে মাহরামদের সাথে পর্দা করতে হবে। মীরাস বা পরিত্যাজ্য সম্পত্তির ক্ষেত্রে তারা স্বাভাবিক নারী-পুরুষের মতই অংশ পাবে। মোটকথা, একজন স্বাভাবিক সুস্থ নারী-পুরুষের যে বিধি-বিধান— তাদের ক্ষেত্রেও একই বিধি-বিধান প্রযোজ্য হবে।
২. যাকে আলামত বা বৈশিষ্ট্যের আধিক্যের মাধ্যমে পুরুষ বা নারী হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায় না।
শরীয়তের পরিভাষায় এধরণের হিজড়াকে “খুন্ছায়ে মুশকিলা” অর্থাৎ, জটিল হিজড়া বলা হয়। আর প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পর এমনটি খুব কমই ঘটে থাকে। বিশেষ করে বর্তমান চিকিৎসা-বিজ্ঞানের উৎকর্ষের যুগে বিষয়টি আরো দুর্লভ। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের ইমেজিং, ক্রোমোজোমাল টেস্টিং এবং অস্ত্রপচারের মাধ্যমে অস্বাভাবিক অঙ্গ অপসারণের মাধ্যমে এর সমস্যা সমাধান করা সম্ভব বলে চিকিৎসকগণ বলে থাকেন। আর খুন্ছায়ে মুশকিলার ক্ষেত্রে কোনো লিঙ্গ প্রাধান্য না-পাওয়া পর্যন্ত তার সকল বিধি-বিধানে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। অর্থাৎ তার বিবাহ মওকুফ থাকবে, মীরাসের ক্ষেত্রে নারী কিংবা পুরুষ— যে অবস্থায় সে কম অংশ পাবে, তাকে কম অংশ দেওয়া হবে। সে স্বর্ণালঙ্কার এবং রেশমী কাপড় ব্যবহার করতে পারবে না, বেগানা নারী-পুরুষ সবার সাথেই পর্দা করবে, কেবল মাহরাম নারী-পুরুষের সাথে দেখা দিতে পারবে। এমনিভাবে তার লিঙ্গ প্রমাণিত না হওয়ার পূর্বেই সে মারা গেলে তাকে গোসল দেওয়া হবে না; বরং তাকে তায়াম্মুম করাবে। যদি মাহরাম হয়ে থাকে তাহলে সরাসরি কোনো আবরণ ছাড়াই তায়াম্মুম করাতে পারবে। আর গায়রে মাহরাম হলে হাতে গ্লাভস পরে তায়াম্মুম করাবে।
হিজড়ারা আমাদের মতই মানুষ, তাদেরও আছে সব ধরণের অধিকার:
মানুষ মহান রাব্বুল আলামীনের সৃষ্টির মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত। ইসলাম প্রতিটি মানুষকে ধনী-গরীব, সাদা-কালো, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যথোপযুক্ত সম্মান দিয়েছে। একজন সাধারণ মানুষের যেমন মানবিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় অধিকার রয়েছে, তেমন অধিকার একজন হিজড়ারও সমানভাবে আছে। শরীয়তে তাদের শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে তাদেরকে বাঁকা চোখে দেখা, খাটো করা, সমাজচ্যুত করা, ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা সম্পূর্ণ হারাম; ইসলাম কখনোই এর অনুমতি দেয় না। সুতরাং হিজড়ারা সাধারণ ছেলে-মেয়েদের মতই সমাজে তাদের পিতা-মাতার সাথে বেড়ে উঠবে। তাদের পরিবারের অভিভাবকগণ তাদেরকে ইসলামী মূল্যবোধ, নীতি-নৈতিকতা, আচার-আচরণ ও আমল-আখলাক শিক্ষা দিবে। কারণ, হিজড়া হওয়ার দরুণ তাদের ক্ষেত্রে শরীয়তের বিধি- বিধান রহিত হয়ে যায়নি এবং হিজড়া হয়ে জন্মগ্রহণ করা সমাজচ্যুত হওয়ার কোনো বৈধ কারণও নয়। তবে কোনো হিজড়ার দ্বারা সমাজে ফিতনা-ফাসাদ হওয়ার আশঙ্কা হলে তার সংশোধনের জন্য তাকে তার এলাকা থেকে অস্থায়ী বা স্থায়ীভাবে বের হয়ে যেতে সরকারীভাবে বাধ্য করা যাবে। সরকারী অনুমতি ছাড়া কারো জন্য এমন পদক্ষেপ গ্রহণ করা জায়েয নেই।
আরেকটি বিষয় হলো, হিজড়াদেরকে সমাজচ্যুত করে নির্দিষ্ট এক স্থানে রাখার ফলে দিন দিন তাদের চারিত্রিক অবনতি হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষ পথে-ঘাটে তাদের দ্বারা উৎপীড়নের শিকার হচ্ছে। এজন্য হিজড়াদেরকে এক স্থানে রাখার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের সহযোগিতা করা কারো জন্য জায়েয হবে না। তাদের জন্য সরকারী বা বেসরকারিভাবে নিরাপদ ও সমীচীন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হলে সমাজে অনেক বিশৃঙ্খলা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে এবং এ পদক্ষেপ গ্রহণকারী ব্যক্তিরাও অনেক সাওয়াবের অধিকারী হবে। বিশেষ করে এটা তাদের অভিভাবকদের দায়িত্ব যে, তারা তাদেরকে শিক্ষা-দীক্ষা দিয়ে হালালভাবে জীবিকা অর্জনের ব্যবস্থা করে দিবে। (সূরা নাজম-৪৫, সূরা বনী ইসরাঈল-৭০, সূরা হুজুরাত-১১, সহীহ মুসলিম: ৪০, ২৫৬৪, আস-সুনানুল কুবরা লিল-বাইহাকী: ১২৫১৩-১২৫১৮,
আহকামুল কুরআন লিল-জাস্সাস্ ৫/২৯৮, আল-মাবসূত লিস-সারাখসী ৩০/৯১-৯২, রদ্দুল মুহতার ৬/৭২৭-৭৩১, বাদায়েউস সানায়ে’ ১০/৪৬১-৪৬২, আল-ফিকহুল হানাফী ফী ছাওবিহিল জাদীদ ২/২৭২, ইমদাদুল ফাতাওয়া ৪/৫৪৩-৫৪৪)
চতুর্থ প্রশ্নের শরয়ী সমাধান:
ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে ট্রান্সজেন্ডার মতবাদ পুরোটাই একটি হারাম এবং ঈমানবিধ্বংসী মতবাদ। প্রবৃত্তির চাহিদার অনুসরণে যারা এ জঘন্য মতাদর্শ লালন করে তাদের তাওবা করে পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসতে হবে। মানসিক কোনো সমস্যা থাকলে সে অনুযায়ী চিকিৎসা নিবে। জন্মগতভাবে তারা যে লিঙ্গের অধিকারী, সে লিঙ্গেরই বিবেচিত হবে এবং তাওবা করে ঈমান নবায়নের শর্তে জন্মগত লিঙ্গ অনুযায়ী উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে অংশ পাবে। যদি কেউ এ মতাদর্শের সকল কার্যকলাপকে জেনে-বুঝে ব্যক্তিঅধিকার বলে বিশ্বাস করে তাহলে তার ঈমান নষ্ট হয়ে যাবে। তাওবা করে পুনরায় ঈমান আনতে হবে, বিবাহিত হলে বিবাহ দোহরাতে হবে। কারণ, হালালকে হারাম মনে করা এবং হারামকে হালাল মনে করা কুফরী কাজ।
শরীয়ত মতে কোনো ট্রান্সজেন্ডার উত্তরাধিকার সূত্রে কোনো মুসলমানের সম্পত্তিতে অংশ পাবে না। কেননা, ট্রান্সজেন্ডার মতবাদে বিশ্বাসী হওয়ায় সে প্রকাশ্য বে-ঈমান হয়ে গেছে। আর কোনো প্রকাশ্য বে-ঈমান কোনো মুসলমানের সম্পদে উত্তরাধিকারী হতে পারে না। বিবাহ-শাদীর ক্ষেত্রেও তার সাথে কোনো মুসলমানের বিবাহ জায়েয নেই। কারণ, কাফের ও মুসলমানের মাঝে বৈবাহিক সম্পর্ক ইসলামে বৈধ নয়। অনুরূপভাবে তার নাগরিক অধিকারের ক্ষেত্রেও সে মুরতাদ হিসেবে গণ্য হবে। ইসলামী শরীয়তে মুরতাদের কোনো নাগরিক অধিকার নেই; বরং রাষ্ট্র তাকে তিন দিনের মধ্যে তাওবা করে ফিরে আসতে বলবে। এর মধ্যে ফিরে আসলে তো ভালো, অন্যথায় পুরুষ হলে তাকে মৃত্যুদণ্ড দিবে, আর মহিলা হলে আমরণ কারাগারে বন্দি করে রাখবে। (সহীহ বুখারী: ৬৯২২, ৬৭৬৪, রদ্দুল মুহতার ১/২৯৭, ৪/২২৫-২২৬, ৪/২২৩, ৪/২৪১-২৪২, বাদায়েউস সানায়ে’ ৯/৩৯৫-৪০৩, আশ-শারীফিয়্যা শরহুস সিরাজিয়্যা ৩২-৩৩, ফাতাওয়া বাইয়্যিনাত ১/৩৭৫-৩৭৬)
পঞ্চম প্রশ্নের শরয়ী সমাধান:
হরমোন থেরাপি এবং সার্জারীর মাধ্যমে লিঙ্গ পরিবর্তন করার শরয়ী বিধান
সাধারণত দুই শ্রেণীর লোক হরমোন থেরাপি বা লিঙ্গ পরিবর্তন সার্জারি (Sex Reassignment Surgery) ব্যবস্থা গ্রহণ করে লিঙ্গ পরিবর্তন করে থাকে—
১. ঐ সমস্ত লোক যারা শারীরিকভাবে পরিপূর্ণ সুস্থ; শুধুমাত্র প্রবৃত্তির চাহিদার বশবর্তী হয়ে বা ব্যক্তিগত চাহিদা-আকাঙ্ক্ষার কারণে নিজের লিঙ্গ পরিবর্তন করতে চায়।
২. ঐ সমস্ত লোক যারা বাস্তবিকপক্ষেই শারীরিকভাবে লিঙ্গ প্রতিবন্ধকতার কারণে লিঙ্গ পরিবর্তন করতে চায়।
প্রথম প্রকারের বিধান: একজন মানুষ— যে কিনা অভ্যন্তরীণ প্রজনন অঙ্গ এবং বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও অবকাঠামোর ভিত্তিতে কোনো এক লিঙ্গের হয়ে অর্থাৎ পরিপূর্ণ পুরুষ কিংবা পরিপূর্ণ নারী হয়ে জন্ম নেয়— কিন্তু কোনো কারণে সে তার জন্মগত লিঙ্গকে মেনে নিতে পারে না— তো এটি একটি মানসিক ব্যাধি বা শয়তানের কুমন্ত্রণা। এর চিকিৎসা হলো “আঊযু বিল্লাহ” পড়া এবং এর প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করা। কেননা বাস্তবিকপক্ষে এটি কোনো শারীরিক রোগ নয়। অতঃপর এমন ব্যক্তি যদি ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা এবং প্রবৃত্তির চাহিদার কারণে লিঙ্গ পরিবর্তনের জন্য কোনো ব্যবস্থা গ্রহণও করে তবুও এ ব্যবস্থা গ্রহণের দ্বারা তার লিঙ্গ পরিবর্তন হয় না। অর্থাৎ এর মাধ্যমে সে কখনোই একজন পূর্ণাঙ্গ পুরুষ কিংবা পূর্ণাঙ্গ নারীতে রূপান্তরিত হতে পারে না; বরং ক্রোমোজোমের নিরিখে তার পূর্বের লিঙ্গেই সে বহাল থাকে। এমনিভাবে এই রূপান্তরের দ্বারা সে অন্যান্য বৈশিষ্ট্য— যেমন পুরুষের জন্য গর্ভধারণ করা ও ঋতুমতি হওয়ার সক্ষমতা তৈরি হয় না, আর নারীর জন্য শুক্রাণু তৈরি করার যোগ্যতাও হয় না। শুধুমাত্র বাহ্যিক আকার-আকৃতি ও নিদর্শনের পরিবর্তন দেখা যায়। আর বাহ্যিক অবকাঠামোর এই পরিবর্তন বহাল রাখতে তার হরমোন থেরাপি এবং অন্যান্য চিকিৎসা অব্যাহত রাখতে হয়। এ প্রকার লোকেরা লিঙ্গ পরিবর্তনের জন্য যে ব্যবস্থাই গ্রহণ করে তা নিঃসন্দেহে আল্লাহর সৃষ্টির বিকৃতি, যা শরীয়তে সম্পূর্ণ না-জায়েয এবং হারাম। কোনো ডাক্তারের জন্যও জেনে-শুনে এ ধরণের অস্ত্রপচার করে বা হরমোনাল মেডিসিন দিয়ে এদের সহযোগিতা করা জায়েয হবে না।
দ্বিতীয় প্রকারের বিধান: অবশ্য যার অভ্যন্তরীণ প্রজনন অঙ্গ, হরমোন এবং ক্রোমোজোম এক লিঙ্গের হয়, কিন্তু বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও অবকাঠামোতে উভয় লিঙ্গের সংমিশ্রণ দেখা দেয়— তার জন্য অভ্যন্তরীণ প্রজনন অঙ্গ ও বাহ্যিক নিদর্শনের আধিক্যের ভিত্তিতে বিপরীত লিঙ্গের অতিরিক্ত অস্বাভাবিক অঙ্গ এবং নিদর্শন দূরীভূত করার উদ্দেশ্যে লিঙ্গ পরিবর্তন সার্জারি (ঝবী জবধংংরমহসবহঃ ঝঁৎমবৎু) সহ অন্যান্য চিকিৎসা ব্যবস্থা গ্রহণ করা জায়েয আছে। অর্থাৎ শারীরিকভাবে
নারী-পুরুষ উভয় লিঙ্গের বৈশিষ্ট্যের অধিকারী কারো শরীরে যদি পুরুষত্বের নিদর্শনের আধিক্য পরিলক্ষিত হয়, তাহলে তার জন্য চিকিৎসা ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে নারীত্বের নিদর্শন দূরীভূত করা এবং কারো মধ্যে
নারীত্বের নিদর্শনের আধিক্য পাওয়া গেলে তার জন্য চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় পুরুষত্বের চিহ্ন মুছে দেওয়া শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েয আছে। কেননা এটি বাস্তবেই একটি শারীরিক প্রতিবন্ধকতা; চিকিৎসার মাধ্যমে যার নিরাময়ের চেষ্টা করা হচ্ছে। এটা আল্লাহর সৃষ্টির পরিবর্তন নয়; বরং এ ধরনের চিকিৎসা ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে বস্তুত তার প্রকৃত লিঙ্গ নির্ধারণ এবং প্রকাশ করা হচ্ছে। এমনকি এ চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে একজন লিঙ্গপ্রতিবন্ধী নারীর মাঝে যেমনিভাবে একজন পূর্ণাঙ্গ নারীর মত গর্ভধারণ, ঋতুমতি হওয়া ইত্যাদির যোগ্যতার প্রকাশ পাওয়া যায়। তেমনিভাবে একজন লিঙ্গপ্রতিবন্ধী পুরুষের মাঝে স্বাভাবিক পুরুষত্বের বৈশিষ্ট্যের প্রকাশ পরিলক্ষিত হয়। এ শ্রেণীর কেউ যদি চিকিৎসা নিয়ে স্পষ্ট পুরুষ কিংবা নারী হয়েছে মর্মে দাবী করে এবং নির্ভরযোগ্য মেডিকেল টেস্টের মাধ্যমে তা প্রমাণিত হয়, তাহলে তাকে পুরুষ কিংবা নারী হিসেবে নিবন্ধন করা হবে; ট্রান্সজেন্ডার হিসেবে নয়। আর তার উপর নারী কিংবা পুরুষের সকল বিধি-বিধান প্রযোজ্য এবং সে অন্যান্য নারী বা পুরুষের ন্যায় সকল অধিকার প্রাপ্ত হবে। (সূরা নিসা-১১৮-১২১, সূরা রূম-৩০, সহীহ বুখারী; হাদীস ৫৯৩১, মাজাল্লাতুল বুহূসিল ইসলামিয়্যা ৪৯/৩৭০-৩৭১, ফাতাওয়া আল-লাজনাতুদ দায়িমা ২৫/৪৫-৪৯ ফাতওয়া নম্বর ২৬৮৮, দারুল ইফতা বানুরী টাউন; ফাতওয়া নম্বর ১৪৪১০৫২০০৩৯৮)

ফাতাওয়া বিভাগ
জামি‘আ রাহমানিয়া আরাবিয়া

Share: