আল্লাহ তা‘আলার বিধানের প্রতি পূর্ণ সমর্পণ ঈমান ও ইসলামের অপরিহার্য শর্ত। এই আত্মসমর্পণ ছাড়া কেউ মুসলমান হতে পারবে না। যার হুকুম আল্লাহ তা‘আলা সূরায়ে আহযাবের ৩৬ নং আয়াতে দিয়েছেন:
وَ مَا كَانَ لِمُؤۡمِنٍ وَّ لَا مُؤۡمِنَة اِذَا قَضَی اللّٰهُ وَ رَسُوۡلُهٗ اَمۡرًا اَنۡ یَّكُوۡنَ لَهُمُ الۡخِیَرَۃُ مِنۡ اَمۡرِهِمۡ ؕ وَ مَنۡ یَّعۡصِ اللّٰهَ وَ رَسُوۡلَهٗ فَقَدۡ ضَلَّ ضَلٰلًا مُّبِیۡنًا.
অর্থ: আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোনো নির্দেশ দিলে কোনো মুমিন পুরুষ ও নারীর জন্য নিজেদের ব্যাপারে অন্য কিছু ইখতিয়ার করার অধিকার থাকে না। আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করল সে স্পষ্টই পথভ্রষ্ট হবে।
ইসলাম শুধু রীতিনীতি বা ধ্যানধারণার নাম নয়। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। একজন মানুষ পূর্ণাঙ্গ মুসলিম হিসেবে তখনই পূর্ণ স্বীকৃতি পাবে যখন পরিপূর্ণ ইসলামের পাবন্দ হবে ।
যার হুকুম আল্লাহ তা‘আলা সূরা বাকারার ২০৮ নং আয়াতে করেছেন: یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا ادۡخُلُوۡا فِی السِّلۡمِ كَآفَّة ۪ وَ لَا تَتَّبِعُوۡا خُطُوٰتِ الشَّیۡطٰنِ ؕ اِنَّهٗ لَكُمۡ عَدُوٌّ مُّبِیۡنٌ
অর্থ: হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। এই আয়াতে বলা হয়েছে কেউ কিছু মানল, আর কিছু মানল না বা গড়িমসি করল, তাহলে ইসলামের কিছু অনুসরণ হলেও, বাকিটুকু হবে শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ। উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফতীয়ে আযম মুফতী শফী’ রহ. বলেন, ঐ লোকদের প্রতি কড়া সতর্কবাণী যারা ইসলামকে শুধু মসজিদ ও ইবাদাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ মনে করে।
আর এই আত্মসমর্পণে নেই এমন কোনো আদেশ যা পালন করা দুষ্কর। নেই কোনো নিষেধ, যা বর্জন করা অসম্ভব। বরং তাতে রয়েছে সহজতা, পূর্ণতা এবং মানবপ্রকৃতির সাথে পূর্ণ সামঞ্জস্যতা। কিন্তু এর প্রতি অবহেলা ও উদাসীনতার দরুণ মুসলিমদের মাঝে ইয়াহুদী, খ্রিস্টান, মুশরিক ও বিভিন্ন অমুসলিমদের অপসংস্কৃতি ও অসভ্যতা অনুপ্রবেশ করেছে, যার অন্যতম হলো প্রাণীর ছবি আঁকা ও তোলা এবং ভাষ্কর্য ও মূর্তি প্রস্তুত করা। এই বিষয়টির ক্ষেত্রে অনেক মানুষ অবহেলা করে। অথচ এটাই হচ্ছে এই পৃথিবীতে শিরকের সূচনার কারণ। নূহ আলাইহিস সালামের কওম তাদের মধ্য থেকে কিছু নেককার লোকের প্রতিকৃতি তৈরী করেছিল (তারা হলেন: ওয়াদ্দ, সুওয়াআ’, ইয়াগূছ, ইয়াঊক ও নাসর)। যাতে করে তারা দু‘আতে ও প্রশংসাতে তাদেরকে স্মরণ করতে পারে এবং এটি নেক আমলের প্রতি তাদের উদ্বুদ্ধ হওয়ার কারণ হয়। এভাবে যখন দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেল তখন তারা এদের ইবাদত করা ও আল্লাহ্র সাথে শিরক করা শুরু করল। আল্লাহ্ তাআলা বলেন: ‘কাফেররা লোকদেরকে বলে, তোমরা কখনো পরিত্যাগ করো না তোমাদের উপাস্যদেরকে; পরিত্যাগ করো না ওয়াদ্দ, সুওয়া‘আ, ইয়াগূছ, ইয়া‘ঊক ও নাসরকে। বস্তুত তারা অনেককে বিভ্রান্ত করেছে; কাজেই আপনি যালিমদের বিভ্রান্তি ছাড়া আর কিছুই বৃদ্ধি করেননা।’ [সূরা নূহ্, আয়াত: ২৩]
সুতরাং একজন মুসলিমের উচিত ইসলামী শিক্ষার কাছে আত্মসমর্পণ করা এবং এই বলে তর্ক না করা যে, আমিতো এসব ছবি বা চিত্রের ইবাদত করি না অথবা এগুলোকে সেজদা করি না।
ছবি তোলার ব্যাপারে হাদীসে রয়েছে কঠিন ধমকি: قال حدثنا الاعمش عن مسلم قال كنا مع مسروق فى دار يسار بن نمير فراى فى صفته تماثيل فقال سمعت عبد الله قال سمعت النبى صلى الله عليه وسلم يقول ان اشد الناس عذابا عند الله المصورون
অর্থ: হযরত আ’মাশ রহ. মুসলিম রহ. হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি মাসরুক রহ. এর সঙ্গে ইয়াসার ইবনে নুমাইরের ঘরে ছিলাম। তিনি তাঁর ঘরের মধ্যে প্রাণীর ছবি দেখতে পেয়ে বললেন, আমি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাস‘ঊদ রা. এর নিকট শুনেছি, তিনি বলেন, হুযূর সা: বলেছেন, “নিশ্চয়ই মানুষের মধ্যে ঐ ব্যক্তিকে আল্লাহ তা‘আলা কঠিন শাস্তি দেবেন যে ব্যক্তি প্রাণীর ছবি বানায় বা আঁকে।” (বুখারী শরীফ ২/ ৮৮০)
كل مصور فى النار يجعل له بكل صورة صورها نفس فتعذبه فى جهنم
অর্থ: প্রত্যেক চিত্রশিল্পী জাহান্নামে যাবে। প্রত্যেক চিত্রের বিপরীতে জীবন্ত একেকটি সত্তা বানানো হবে। অতপর সে তাকে জাহান্নামে শাস্তি দিবে। (মুসলিম: ৫৬৬২)
অপর হাদীসে আছে:
أشد الناس عذابا يوم القيامة الذين يضاؤون بخلق الله
কিয়ামতের দিন মানুষের মধ্যে থেকে তারা বেশি শাস্তি পাবে যারা আল্লাহর সৃষ্টি করার সিফাত নিয়ে প্রতিযোগিতা করত। (সহীহ বুখারী: ৫৬১০)
ইমাম বুখারী রহ. বর্ণনা করেন:
وعد النبي صلى الله عليه و سلم جبريل فقال إنا لا ندخل بيتا فيه صورة ولا كلب
হযরত জিবরাইল আ. নবী করীম সা: এর নিকট শপথ করে বলেন যে, আমরা সেই ঘরে প্রবেশ করি না যে ঘরে ছবি বা কুকুর থাকে। (সহীহ বুখারী: ৩০৫৫)
عن ابى هريرة رضى الله تعالى عنه قال سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول قال الله تعالى ومن اظلم ممن ذهب يخلق كخلقى فليخلقوا ذرة اوليخلقوا حبة او شعيرة
অর্থ: হযরত আবূ হুরায়রা রা. বলেন, আমি নবী কারীম স: কে বলতে শুনেছি আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন, মানুষের মধ্যে ঐ ব্যক্তি অধিক
অত্যাচারী, যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার সৃষ্টির সাদৃশ্য কোনো প্রাণীর সূরত তৈরী করে। তাদেরকে বলা হবে- তোমরা আজ একটি পিপীলিকা অথবা একটি শস্য অথবা একটি গম তৈরী করে দেখাও তো! (মিশকাত শরীফ :৩৮৫)
عن عائشة عليها السلام حدثته ان النبى صلى الله عليه وسلم لم يكن يترك فى بيته شيئا فيه تصاليب الا نقضه
অর্থ: উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রা. বর্ণনা করেন যে, রাসূল স: ঘরে প্রাণীর ছবি বা ছবি জাতীয় সকল জিনিস (থাকলে) ধ্বংস করে ফেলতেন। (বুখারী শরীফ ২/৮৮০, মিশকাত: ৩৮৫)
عن جابر رضى الله تعالى عنه قال نهى رسول الله صلى الله عليه وسلم عن الصورة فى البيت ونهى ان يصنع ذلك
অর্থ: হযরত জাবের রা. বলেন, রাসূল স: ঘরের মধ্যে প্রাণীর ছবি রাখতে নিষেধ করেছেন এবং তা তৈরী করতেও নিষেধ করেছেন। (তিরমিযি-১৭৪৯)
عن ابن مسعود قال اشد الناس عذابا يوم القيامة رجل قتل نبيا او قتله نبى او رجل يضل الناس بغير العلم او مصور يصور التماثيل
অর্থ: আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ স: বলেছেন, কিয়ামতের দিন সবচেয়ে বেশি আযাব হবে সেই ব্যক্তির, যে কোন নবীকে হত্যা করেছে অথবা যাকে কোন নবী হত্যা করেছেন। অথবা সেই ব্যক্তি, যে বিনা ইলমে মানুষকে ভ্রষ্ট করে। অথবা সেই নির্মাতা, যে মূর্তি নির্মাণ করে। (সহীহুল জামে: ১০০০)
যে সকল কারণে প্রাণীর প্রতিকৃতি তৈরি করা ও সংরক্ষণ করা হারাম:
০১. مضاهاة بخلق الله আল্লাহ তা‘আলার সৃষ্টি করার সিফাতের সাদৃশ্য অবলম্বন করা। (আহকামুল কুরআন লি ইবনিল আরাবী ৪/৮) ছবি হারাম হওয়ার বড় কারণ এটাই। পূর্বে বর্ণিত অধিকাংশ হাদীসে এই কারণটি স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। তবে পাহাড়-পর্বত, গাছ- গাছালি এগুলো যদিও আল্লাহ তা’আলার সৃষ্টি। কিন্তু এগুলো অঙ্কন বা চিত্র তৈরি করা আল্লাহ তা’আলার সৃষ্টি করার সিফাতের সাদৃশ্য অবলম্বনের নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে না। কারণ, এ ধরনের ছবি আঁকা অন্য হাদীস দ্বারা অনুমোদিত।
০২. كون التصوير وسيلة إلى الغلو في غير الله تعالى بتعظيمه ছবি হলো গাইরুল্লাহর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনে বাড়াবাড়ির প্রথম পদক্ষেপ। যার শেষ ফলাফল হল, তা পূজনীয় বস্তুতে পরিণত হওয়া। নূহ্ আ. এর সম্প্রদায় এবং তার পূর্ববর্তী ক্বওমে যেমনটি ঘটেছিল। এ কারণেই শরীয়তে মুহাম্মাদীতে প্রাণীর চিত্রাঙ্কন, প্রতিকৃতি তৈরি করা সর্বাবস্থায় হারাম ঘোষণা করা হয়েছে।
০৩. ان هذه الصور تمنع من دخول الملائكة في المكان الموجود فيه বহুসংখ্যক হাদীসে এসেছে, যে ঘরে প্রাণীর ছবি থাকে সেখানে ফেরেশতা প্রবেশ করে না। তাই উলামায়ে কেরাম এটিকেও ছবি হারাম হওয়ার একটি কারণ হিসেবে গণ্য করেছেন।
০৪. إن التصوير فيه نوع من التشبه باليهود والنصارى وقد نهينا عن التشبه بهم চিত্রাঙ্কন এবং প্রতিকৃতি তৈরি ইয়াহুদী-নাসারাদের স্বভাব। হযরত আয়েশা রাযি. বলেন:
لما اشتكى النبي صلى الله عليه وسلم ذكرت بعض نسائه كنيسة رأينها بأرض الحبشة يقال لها مارية وكانت أم سلمة وأم حبيبة رضي الله عنهما أتتا أرض الحبشة فذكرتا من حسنها وتصاوير فيها
নবী কারীম সা: অসুস্থতার সময় তাঁর জনৈকা স্ত্রী একটি গির্জার কথা উল্লেখ করলেন। গির্জাটির নাম ছিল মারিয়া। উম্মে সালামা ও উম্মে হাবীবা ইতোপূর্বে হাবশায় গিয়েছিলেন। তারা গির্জাটির কারুকাজ ও তাতে বিদ্যমান প্রতিকৃতিসমূহের কথা আলোচনা করলেন… (সহীহ বুখারী: ১৩৪১)
এ হাদীস দ্বারা বোঝা যায়, গির্জায়, ইবাদতখানায় প্রতিকৃতি তৈরি করা ইয়াহুদী-খ্রিস্টানদের স্বভাব ছিল। হাদীসে তাদের সাদৃশ্য অবলম্বন করতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে।
প্রাণীর ছবি সম্পর্কে ফুকাহায়ে কিরামের মতামত:
প্রাণীর ছবি বানানো ও ব্যবহার করা হারাম হওয়ার হুকুম অসংখ্য সহীহ হাদীস, সাহাবায়ে কিরাম এবং তাবে‘ঈগণের বক্তব্য ও আমল দ্বারা প্রমাণিত। তাই চার মাযহাবের ইমামগণ এবং ফুক্বাহায়ে কিরাম একান্ত প্রয়োজন ব্যতিরেকে প্রাণীর ছবি হারাম হওয়ার উপর ঐকমত্য পোষণ করেছেন। তবে বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে ফুক্বাহায়ে কিরামের মাঝে কিছু মতানৈক্য পাওয়া যায়।
ফুকাহায়ে কিরামের মতামতের সারসংক্ষেপ হতে তিন ধরনের ছবির বর্ণনা পাওয়া যায়:
১. দেহবিশিষ্ট বা ত্রিমাত্রিক ছবি।
২. দেহবিহীন বা অংকিত ছবি।
৩. ফটোগ্রাফী ও ডিজিটাল ছবি।
১.দেহবিশিষ্ট ছবি। অর্থাৎ এমন ছবি, যাতে কোনো প্রাণীর জীবন ধারণের প্রয়োজনীয় অঙ্গসমূহ বিদ্যমান রয়েছে এবং একেবারে ছোটও নয় ও খেলনা জাতীয় পুতুলও নয়। এ জাতীয় ছবি বানানো ও ব্যবহার হারাম হওয়ার ব্যাপারে ফুক্বাহায়ে কিরাম ঐকমত্য পোষণ করেছেন। এতে কারো কোনো দ্বিমত নেই।
২. দেহবিহীন ছবি। অর্থাৎ এমন ছবি যা কাগজ কিংবা কাপড়ে অংকিত এবং যার প্রকৃত কোনো ছায়া নেই। এ জাতীয় ছবির ব্যাপারে আলেমদের মাঝে মতানৈক্য বিদ্যমান।
জমহুর ফুক্বাহায়ে কিরামের নিকট এমন ছবিও নাজায়েয। ইমাম মালেক রহ. হতে এ ব্যাপারে দ্বিমুখী বর্ণনা পাওয়া যায়। মালেকী মাযহাবের মুহাক্কিক আলেমদের মধ্য হতে আল্লামা ইবনুল কাসেম মালেকী, আল্লামা ইব্বী মালেকী, আল্লামা আবূ আব্দুল্লাহ মাওয়াক্ব, আল্লামা মুহাম্মদ আল উলাইশ আল মালেকী প্রমুখ এমন ছবি জায়েয হওয়ার পক্ষে মতামত ব্যক্ত করেছেন। এমনিভাবে হাম্বলী মাযহাবেও এ ব্যাপারে দ্বিমুখী বর্ণনা পাওয়া যায়। ছবি আঁকা হারাম হওয়ার ব্যাপারে মালেকী মাযহাবের কেউ কেউ দ্বিমত পোষণ করেছেন, যা গ্রহণযোগ্য নয়।
আল্লামা ইবনে আব্দুল বার আল ইস্তিযকারে উল্লেখ করেছেন:
قال أبو عمر ذهب بعض أهل العلم إلى أنه لا يكره من الصور إلا ما له ظل مما له روح من تمثال النحاس والجواهر كلها والطين وكل ما إذا صور كان له ظل .وذهب غيرهم من أهل العلم إلى أن المكروه من الصور ما كان له روح من كل حيوان من أي شيء صنع كان له ظل أو لم يكن
অর্থাৎ, কতক আহলে ইলমের অভিমত হল, ছায়াবিশিষ্ট ছবি অঙ্কন করা নিষিদ্ধ। বাকীদের মত হল, সব ধরণের প্রাণীর ছবিই নিষিদ্ধ, চাই তা যেভাবেই বানানো হোক; ছায়াবিশিষ্ট হোক বা না হোক। (আল- ইসতিযকার ৮/৪৮৮)
আত-তামহীদে এই দ্বিতীয় মাযহাবের বর্ণনা এসেছে এভাবে:
وذهب جماعة من أهل العلم إلى أن الصورة المكروهة في صنعتها واتخاذها ما كان له روح
অর্থাৎ, আহলে ইলমদের এক জামা’আতের অভিমত হল, প্রাণীর ছবি আঁকা, প্রতিকৃতি তৈরি করা এবং তা নিজের কাছে রাখা সবই হারাম। (আত-তামহীদ ৮/৫২৮)
আল মাউসূআতুল ফিকহিয়্যাতুল কুয়িতিয়্যাহ গ্রন্থে বলা হয়েছে:
يحرم تصوير ذوات الأرواح مطلقا، أي سواء أكان للصورة ظل أو لم يكن وهو مذهب الحنفية والشافعية والحنابلة وتشدد النووي حتى ادعى الإجماع عليه وفي دعوى الإجماع نظر يعلم مما يأتي وقد شكك في صحة الإجماع ابن نجيم
অর্থাৎ, প্রাণশীল সকল কিছুর ছবি সার্বিকভাবে হারাম। চাই তার ছায়া থাকুক বা না থাকুক। এটা হানাফী, শাফিয়ী ও হাম্বলী মাযহাব। (আল মাউসূ‘আহ ১২/১০২)
৩. ফটোগ্রাফি বা প্রিন্টকৃত ছবি:
এমন ছবি যা হাত দ্বারা বানানো নয়, বরং ক্যামেরার মাধ্যমে তৈরিকৃত। এ পার্থক্যের কারণে বর্তমান সময়ের কতিপয় আলেম এ জাতীয় ছবিকে নিষিদ্ধ ছবির অন্তর্ভূক্ত করেননি, বরং তা জায়েয বলে উল্লেখ করেছেন। তবে বিজ্ঞ আলেমগণের বড় একটি জামা‘আত ফটোগ্রাফিকে হারাম ছবির অন্তর্ভূক্ত করেছেন। এমনকি উপমহাদেশের প্রায় সকল আলেম এ ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে, ফটোগ্রাফি এবং হাতে বানানো ছবি উভয়টি না জায়েয হওয়ার দিক থেকে কোনো পার্থক্য নেই। আর
উপমহাদেশের সকল দারুল ইফতা এই ফাতওয়া প্রদান করেছে যে, একান্ত প্রয়োজন ছাড়া এবং বড় কোনো কারণ ব্যতীত কোন অবস্থাতেই প্রাণীর ছবি তোলা বৈধ নয়।
করাচীসহ সকল দারুল ইফতার অবস্থান এখন পর্যন্ত এটাই যে, ছবি শুধু কলম, রং কিংবা এ জাতীয় পদার্থ দ্বারা কাগজ, কাপড় দেয়াল ইত্যাদির উপর হাত দ্বারা বানানো অথবা পাথর ইত্যাদি দ্বারা তৈরি ভাস্কর্যই নয়, বরং ওই সকল পদ্ধতিও ছবির অন্তর্ভূক্ত যার মাধ্যমে কোনো প্রাণীর স্পষ্ট আকৃতি কাগজ, কাপড়, দেয়াল ইত্যাদি এ জাতীয় কোনো বস্তুর উপর এমনভাবে অংকন করা যে, এ আকৃতি ওই বস্তুর উপর স্থির হয়ে যায়। চাই তা পুরাতন কিংবা নতুন যন্ত্রের মাধ্যমে হোক না কেন। যেমন
ক্যামেরার নেগেটিভ এর উপর অংকিত আকৃতি অথবা ফটোগ্রাফির মাধ্যমে নির্মিত ছবি তথা প্রিন্টকৃত ছবি।
তাই আমাদের আকাবিরগণ ফটোগ্রাফিকে হারাম ছবি হতে পৃথক মনে করেন অথবা ফটোগ্রাফি দ্বারা নির্মিত ছবিকে হারাম ছবি মনে করেন না এ ধারণা করা সঠিক নয়। (বিস্তারিত দ্রষ্টব্য: ফাতহুল মুলহিম, ৪/১৬২-১৬৩)
এমনিভাবে মুফতী শফী রহ. তার রিসালাহ تصوير كى شرعى احكام এর মধ্যে দলীলের আলোকে প্রমাণ করেছেন যে, ছবি চাই তা হাতে বানানো হোক কিংবা নবআবিস্কৃত যন্ত্রের মাধ্যমে হোক; তা হারাম ছবির অন্তর্ভূক্ত। যন্ত্রের পরিবর্তনের কারণে হুকুমের মাঝে কোন পরিবর্তন হবে না।
আরবের প্রসিদ্ধ ফিক্বহ গবেষণা সংস্থা ‘আল লাজনাতুত দায়িমা’ এর আলেমগণ একটি প্রশ্নের উত্তরে বলেন:
التصوير الفوتوغرافي الشمسي من أنواع التصوير المحرم، فهو والتصوير عن طريق النسيج والصبغ بالألوان والصور المجسمة سواء في الحكم، والاختلاف في وسيلة التصوير وآلته لا يقتضي اختلافا في الحكم
অর্থাৎ, আলোকচিত্র বা ফটোগ্রাফি হারাম ছবির প্রকারভুক্ত। সুতা বা বিভিন্ন রঙ দ্বারা আঁকা ছবি এবং শরীর বিশিষ্ট প্রতিকৃতি সবকিছুই হুকুমের ক্ষেত্রে সমান। ছবি তৈরি বা সৃজনের মাধ্যমের ভিন্নতার কারণে হুকুমের ভিন্নতার চাহিদা রাখে না।’ (আল লাজনাতুত দায়িমা -১/৬৬৯)
ডিজিটাল ক্যামেরায় তোলা ছবি:
যে সকল উলামায়ে কেরাম ডিজিটাল ছবি হারাম মনে করেন, তাদের দৃষ্টিতে ছবি হারাম হওয়ার ভিত্তি হল, সেটির স্বতন্ত্র অস্তিত্ব থাকা; যার ছবি তার অনুগামী না হওয়া। চাই তা কোনো পৃষ্ঠায় বা হার্ড কপিতে চিত্রিত হোক বা সফ্ট কপিতে সংরক্ষিত হোক। অ্যানালগ পদ্ধতিতে সংরক্ষিত হোক কিংবা ডিজিটাল পদ্ধতিতে (সংখ্যা নির্ভর পদ্ধতিতে)। ছবিটি যার তার আকৃতিতেই যদি পুনর্বার প্রকাশ করার সক্ষমতা সম্পন্ন হয় তবে এমন ছবিকে হারাম ছবিই বলা হবে। যেভাবেই সংরক্ষণ করা হোক, যেভাবেই প্রকাশ পাক।
মাযাহেরে উলূম-এর ফাতাওয়া; যার উপর দেওবন্দের মুফতীয়ানে কেরামও স্বাক্ষর করেছেন, তাতে বলা হয়েছে:
چونکہ اس وقت بغیر سطح آور مسالہ کے عکس تو محفوظ کرنے اور باقی رکھنے کی شکل پیدا نہیں ہوتی تھی ، اس لیے سطح اور مسالہ کے ذریعہ بقاء کی قید تھی، یہ قید قید واقعی ہے ، قید احترازی نہیں۔
অর্থাৎ, যে ছবি সংশ্লিষ্ট সত্তার অনুগামী; স্বতন্ত্র নয়, তা হারাম হবে না। যেমন আয়না বা পানিতে প্রকাশ পাওয়া ছবি যা মূলত আলোর কারণে সৃষ্ট ছায়া হয়। এসব যেহেতু সংশ্লিষ্ট সত্তার অনুগামী তাই তা হারাম না।
ছবি হারাম হওয়ার বর্ণিত কারণের স্বপক্ষে উলামায়ে কেরামের বক্তব্য:
১। মাওলানা যফর আহমাদ উসমানী عکس (প্রতিবিম্ব) এবং ফটোর মাঝে পার্থক্য বর্ণনা করেছেন এভাবে;
سب سے بڑا فرق دونوں میں یہی ہے کہ آئینہ وغیرہ کا عکس پائیدار نہیں ہو نا، اور فوٹو کا عکس مسالہ لگا کر قائم کر لیا جاتا ہے، پس وہ اسی وقت عکس ہے، جب تک مسالہ سے اسے قائم نہ کیا جائے اور جب اسکو کسی طریقہ سے قائم اور پائیدار کر لیا جائے وہی تصویر بن جاتا ۔
সবচেয়ে বড় পার্থক্য হল, আয়না বা এ জাতীয় জিনিসের প্রতিবিম্ব সংরক্ষিত এবং স্থায়িত্বের বৈশিষ্টে বৈশিষ্টপূর্ণ হয় না। কিন্তু ফটোর ছায়া কেমিক্যাল লাগিয়ে স্থায়ী এবং স্বতন্ত্র করা হয়। সুতরাং তা ততক্ষণ عکس তথা প্রতিবিম্ব যতক্ষণ কেমিক্যাল লাগিয়ে স্থায়ী করা না হয়। আর যখন তা কোনভাবে স্থায়িত্ব এবং অনুগমন-মুক্ত হয়ে যায় তা ছবি হয়ে যায়। (ইমদাদুল আহ্কাম ৪/৩৮৪)
মুফতী শফী রহ. ‘আলাতে জাদীদাহ কে আহকাম’ (পৃষ্ঠা ১৪২)-এ লিখেন:
حاصل یہ ہے کہ عکس جب تک مسالہ وغیرہ کے ذریعہ سے پائیدارنہ کر لیا جائے ، اس وقت تک عکس ہے ، اور جب کسی طریقہ سے قائم و پائیدار کر لیا جائے تو وہ تصویر بن جاتا ہے ، اور عکس جب تک عکس ہے ، نہ شرعا اس میں کوئی حرمت ہے اور نہ کسی قسم کی کراہت ، خواہ آئینہ پانی یا کسی شفاف چیز پر ہو یا فوٹو کے شیشہ پر، اور جب وہ اپنی حد سے گذر کر تصویر کی صورت اختیار کریگا، خواہ وہ مسالہ کے ذریعہ سے ہو یا خطوط و نقوش کے ذریعہ سے ، اور خواہ یہ فوٹو کے شیشہ پر ہو یا آئینہ وغیرہ شفاف چیزوں پر، اس کے سارے احکام وہی ہوں گے جو تصویر کے متعلق ہیں۔
সারকথা হল, প্রতিচিত্র বা ছায়া যতক্ষণ কেমিক্যাল ইত্যাদি দ্বারা স্থিরতা লাভ না করে ততক্ষণ পর্যন্ত তা ছায়া। আর যখন কোনভাবে স্থির এবং স্বতন্ত্র হয়ে যায় তখন তাসবীর হয়ে যায় (ছায়া থাকে না)। আর ছায়া যতক্ষণ ছায়া, না শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে তাতে কোন হুরমত থাকে, না কেনো কারাহাত। চাই আয়না, পানি বা পরিচ্ছন্ন কিছুতে হোক। কিংবা ক্যামেরার শিশায় হোক। আর ছায়া যখন নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ছেড়ে তাসবীরের বৈশিষ্টে বৈশিষ্টমণ্ডিত হয়ে পড়ে চাই তা কেমিক্যালের মাধ্যমে তাসবীরের বৈশিষ্টপূর্ণ হোক বা নকশার মাধ্যমে অথবা তা ফটোর শিশায় হোক বা আয়না ইত্যাদি পরিচ্ছন্ন জিনিসের মধ্যে। তো তাসবীরের যত বিধান রয়েছে সব এ ছবির সাথে সম্পৃক্ত হবে।
মুফতী রশীদ আহমদ লুধিয়ানবী এ সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে বলেন:
اسکو عکس کہنا بھی صحیح نہیں، اس لئے کہ عکس اصل کے تابع ہوتا ہے اور یہاں اصل کی موت کے بعد بھی اسکی تصویر باقی رہتی ہے۔
অর্থ: এ ধরনের ছবিকে عکس তথা প্রতিবিম্ব বলা অনুচিত। কারণ ছায়া তো মূলের অনুগামী হয়। অথচ এক্ষেত্রে যার ছবি তার মৃত্যুর পরও তার ছবি বাকী থাকে। (আহসানুল ফাতাওয়া ৯/৮৯)
অপর স্থানে বলেন, তাসবীর এবং عکس তথা প্রতিবিম্ব এ দু’টি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী জিনিস। তাসবীর হলো কোন জিনিসের স্থিত এবং সংরক্ষিত নকশা। عکس তথা প্রতিবিম্ব অ-স্থির এবং সাময়িক নকশা হয়, যার ছায়া সে সটকে পড়লে তার সেই ছায়াও অদৃশ্য হয়ে যায়। ভিডিও এর ফিতায় যে তাসবীর তৈরী হয় সেটা যখন চায় যতবার চায় টিভি স্ক্রিনে প্রত্যক্ষ করা যায়। এ ছবি মূলের অনুগামী নয় বরং তার থেকে সম্পর্কমুক্ত এবং স্বতন্ত্র হয়ে থাকে।
কত লোক এখন দুনিয়ায় যার নাম-নিশানা পর্যন্ত নেই, কিন্তু তার দিব্যি চলমান ছবি ভিডিও ক্যাসেটে সংরক্ষিত এমন ছবিকে কোনো পাগলও عکس তথা প্রতিবিম্ব বলবে না। ভিডিও এর ফিতায় কোনো ছবি দেখা যায় না- শুধু এইটুকু বিষয়কে কেন্দ্র করে তাসবীরের অস্তিত্ব অস্বীকার করা ভুল।
মুফতী সাঈদ আহমাদ পালনপুরী রহ. শরহে তিরমিযীতে বলেন:
اسی طرح یہ دلیل کہ کیمرہ کا فوٹو ایک ظل سایہ ہے اور خود اسکا سایہ نہیں ہے، جیسا کہ پانی میں سایہ پڑتا ہے، بس اس کو کیمرہ سے بر قرار کر لیا، پس اس میں کیا حرج ہے ؟ اس کا جواب یہ ہے کہ ہر ظل بر قرار کرنے ہی سے تو صورت بنتا ہے ، اور صورت کا سایہ ہونا ضروری نہیں ، اور مطلق صورت سے فساد پھیلتا ہے، پس جب یک وہ ظل ہے اس کے احکام ہیں، اور جب اس کو بر قرار کر لیا جائے تو وہ تصویربن جاتا ہے آور حرام ہوجاتا ہے
অর্থ: উপরোক্ত উদ্ধৃতিতে এ বিষয় পরিষ্কারভাবে সামনে এসে গেছে যে, প্রাণীর ছবি যদি স্বতন্ত্রতা লাভ করে এবং যে প্রাণীর ছায়া তার অনুগমন মুক্ত হয়ে যায়, মূলের অনুপস্থিতিতে তা দেখা সম্ভবপর হয় তবে এমন ছবি হারাম ছবিই হবে। চাই তা কোন নেগেটিভে সংরক্ষিত হোক কিংবা ইলেক্ট্রিক সিগন্যাল/ইমেজ ডাটার আকৃতিতে সংরক্ষিত হোক।
(তুহফাতুল আলমাঈ: ৫/৮০)
নিকট অতীতের সকল উলামায়ে কেরাম ডিজিটাল ক্যামেরার ছবিকে হারাম বলেছেন। তাদের কয়েক জনের উদ্ধৃতি:
মুফতী রশীদ আহমাদ লুধিয়ানবী রহ. বলেন,
ویڈیوکیمرہ سے کسی بھی تقریب کی منظر کشی کا عمل تصویر سازی کی ایک ترقی یافتہ صورت ہے ، جیسے قدیم زمانہ میں تصویر ہاتھ سے بنائی جاتی تھی، پھر کیمرہ کی ایجاد نے اس قدیم طریقہ میں ترقی کی اور تصویر ہاتھ کے بجائے مشین سے بنے لگی، جو زیادہ سہل اور دیر پا ہوتی ہے، اب اس عمل میں نئی نئی سائنسی ایجادات نے مزید ترقی جدت پیدا کی، اور جامد و ساکن تصویر کی طرح آب چلتی پھرتی دوڑتی بھاگتی صورت کو بھی محفوظ کیا جانے لگا، یہ کہنا صحیح نہیں کہ اس کو قرار و بقاء نہیں۔
অর্থ: ভিডিও ক্যামেরা দ্বারা যে কোনো অনুষ্ঠান ধারণ করার কাজ ছবি তৈরির অত্যাধুনিক পদ্ধতি। যেমন অতীতে এক সময় ছবি হাতে বানানো হতো। পরে ক্যামেরা আবিষ্কারের মাধ্যমে সেই পদ্ধতির আধুনিকায়ন হয়েছে। ফলে ছবি হাতের পরিবর্তে মেশিনে তৈরি হতে লাগল, যা বেশি সহজ; বহুদিন ভালো থাকে। এখন বিজ্ঞানের নতুন নতুন আবিষ্কার এই কাজে আরো উন্নতি করেছে এবং নতুনত্ব সৃষ্টি করেছে। স্থির, নিষ্প্রাণ ছবির মত এখন চলমান, ধাবমান ছবিও সংরক্ষণ করা যায়। এ ধরনের ছবির ক্ষেত্রে এ কথা বলা সঠিক নয় যে, এর কোনো স্থিরতা এবং স্বাতন্ত্র নেই। (আহসানুল ফাতাওয়া ৯/৮৮)
০২. মুফতী ইউসুফ লুধিয়ানবী এর ফাতওয়া,
ٹی وی اور ویڈیو فلم کا کیمرہ جو تصویر میں لیتا ہے وہ اگرچہ غیر مرئی ہیں لیکن تصویر بہر حال محفوظ ہے، اور اس کو ٹی وی پر دیکھا اور دکهایا جا تا ہے، اس کو تصویر کے حکم سے خارج نہیں کیا جا سکتا، زیادہ سے زیادہ یہ کہا جا سکتا ہے کہ ہاتھ سے تصویر بنانے کے فرسودہ نظام کی بجائے سائنسی ترقی نے تصویرسازی کا ایک دقیق طریقہ ایجاد کرلیا ہے۔ جب شارع نے تصویر کو حرام قراردیا ہے۔تو تصویرسازی کا طریقہ خواہ کیسا ہی ایجاد کرلیا جائے تصویر تو حرام ہی رہے گی۔
অর্থ: টিভি এবং ভিডিও ফিল্মের ক্যামেরায় যে ছবি তোলা হয় তা যদিও দৃশ্যমান না, কিন্তু ছবি সর্বাবস্থায় সংরক্ষিত (দেখা যাক বা না যাক)। এই সংরক্ষিত ছবি টিভিতে দেখা সম্ভব। এ ধরনের ছবিকে হারাম ছবি বহির্ভূত বলা যায় না। বেশির থেকে বেশি বলা যায় যে, হাতে ছবি বানানোর পুরাতন নিয়মের পরিবর্তে বিজ্ঞানের অগ্রগতি ছবি বানানোর এক সূক্ষ্ম পদ্ধতি আবিষ্কার করেছে।

কিন্তু শরীয়ত প্রণেতা যখন প্রাণীর ছবি হারাম বলেছেন, তো ছবি বানানোর যেমন পদ্ধতিই আবিষ্কার হোক ছবি বানানো হারামই হবে। (ডিজিটাল তাসবীর আওর সিডি কে শরয়ী আহকাম; পৃষ্ঠা ১২৬)
০৩. মুফতী সাঈদ আহমাদ পালনপুরী রহ. বলেন,
اسی طرح ایک دلیل لوگ یہ بھی دیتے ہیں کہ ڈیجیٹل میں اور فلم میں غیر واضح ذرات کی شکل میں تصویر آتی ہے، پس اس پر تصویر کا اطلاق درست نہیں، مگر سوچنے کی بات یہ ہے کہ وہ غیر واضح نکتے کیا کام آئیں گے ؟ ان کو بہرحال یہ صفحۂ فرطاس (اسکرین) واضح کر کے منتقل کیا جائے گا، پس مالا وہ تصویر بنیں گے ، اس لئے ابتداہی سے وہ حرام ہوں گے۔
অর্থ: এক দলীল এই দেয়া হয় যে, ডিজিটাল এবং ফিল্মে উড়ঃং এর আকৃতিতে ছবি আসে। সুতরাং এমন ছবিকে হারাম ছবি বলা ঠিক না। কিন্তু ভাবার বিষয় হল, এই غیر واضح (অদৃশ্য) উড়ঃং এর কী সার্থকতা! এই ছবি তো উড়ঃং স্ক্রিনে প্রকাশ করাই মূল উদ্দেশ্য। এটাতো শেষ পর্যন্ত তাসবীরই (হারাম ছবি) হবে। এজন্য শুরু থেকেই তা হারাম ধরা হবে। (তুহফাতুল আলমাঈ ৫/৮০)
০৪. মিশরী আলেম শাইখ আবূ যর কালমুনী তার লিখিত فتنة تصوير العلماء والظهور في القنوات الغضائية এর ৪৬ পৃষ্ঠায় লিখেন:
إن التفريق بين الصور التي ورد تحريمها في النصوص وبين هذه الصور بأن هذه “موجات الكترونية” تفريق بوصف ملغى لا اعتبار لها في الشرع لأن الشرع علق الحكم على وصف المضاهاة، فهو الوصف المؤثر في الحكم، أما طريقة مضاهاة الصورة فهو وصف طردي لم يتعرض له الشارع
অর্থ : কুরআন-হাদীসে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হারাম ছবি আর বর্তমানের ছবির মাঝে এ কথার ভিত্তিতে পার্থক্য বর্ণনা করা যে, এ ছবি হলো ‘ইলেক্ট্রিক তরঙ্গ; এটা মূলত ভিত্তিহীন বিষয়ের উপর নির্ভর করে পার্থক্য করা। এর কোন গ্রহণযোগ্যতা শরীয়তে নেই। (নাফাইসুল ফিকহ ৪/৩২০)
০৫. মুফতী খালেদ সাইফুল্লাহ রাহমানী এ সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে বলেন:
ویڈیو گرافی اور فوٹو گرافی کو عکس قرار دینا صحیح نہیں، عکس وہ صورت ہے جس میں ٹھہراؤ اور جماؤ نہ ہو ، جیسا کہ پانی یا آئینہ میں ہوتا ہے۔ ویڈیو گرافی اور فوٹو گرافی میں یہ صورت نہیں ہوتی، بلکہ صاحب تصویر کی صورت ریل میں محفوظ ہو جاتی ہے اور جماؤ کی کیفیت پیدا ہو جاتی ہے۔
অর্থ : ভিডিওগ্রাফি এবং ফটোগ্রাফিকে ছায়া বলা ঠিক নয়। কারণ عکس তথা প্রতিবিম্ব বলা হয়, যে ছবির স্থিরতা এবং স্বতন্ত্রতা না হয়, যেমনটি পানি বা আয়নায় হয়। ভিডিওগ্রাফি কিংবা ফটোগ্রাফিতে এই অবস্থা হয় না; বরং যার ছবি তার আকৃতি ৎববষ এ সংরক্ষিত হয়ে স্বতন্ত্র এবং স্থিরকৃত হয়ে যায়। (কিতাবুল ফাতাওয়া ৬/১৮০)
অধিকাংশ বিজ্ঞ উলামায়ে কেরামের দৃষ্টিতে প্রাণীর ডিজিটাল ছবি শরীয়তে নিষিদ্ধ ছবির অন্তর্ভুক্ত এবং শরীয়ত স্বীকৃত প্রয়োজন ছাড়া তা ধারণ করা ও ব্যবহার করা হারাম। এ মর্মে তাদের বক্তব্য সুস্পষ্ট এবং অধিক প্রামাণ্য।
শরীয়তের স্বীকৃত নীতি হলো, হালাল-হারাম কিংবা বৈধ-অবৈধের মধ্যে বিরোধ হলে হারামটাই অগ্রাধিকার পায়। কারণ এতে অধিক সতর্কতা।
যারা প্রাণীর ডিজিটাল ছবিকে নিষিদ্ধ ছবি বলেননি তারা হারাম ছবি না হওয়ার কথা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তমূলক ও দ্ব্যর্থহীন শব্দে বলেননি। এ ব্যাপারে তাদের শব্দ প্রয়োগ সংশয়ের দিকটি পরিষ্কার ফুটিয়ে তোলে। যেমন, শাইখুল ইসলাম আল্লামা মুফতী মুহাম্মাদ তাকী উসমানী দা. বা. এক স্থানে বলেছেন, فيه وقفة অর্থাৎ, এ ব্যাপারে দ্বিধা রয়েছে। (তাকমিলাতু ফাতহিল মুলহিম ৪/৯৮) দারুল উলুম করাচীর ফাতাওয়ায় বলা হয়েছে: ‘প্রাণীর ডিজিটাল ছবিকে অকাট্যভাবে হালাল ছবি বলতে দ্বিধা আছে অর্থাৎ, হারাম হওয়ারও সম্ভাবনা আছে।
অপরদিকে যারা ডিজিটাল ছবিকে শরীয়তে নিষিদ্ধ ছবি বলেছেন তারা এ কথা সিদ্ধান্তমূলক দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেছেন।
উল্লিখিত কারণসমূহের ভিত্তিতে আমাদের দৃষ্টিতে ডিজিটাল ছবি হারাম ছবির অন্তর্ভুক্ত। বিনা প্রয়োজনে এ ধরনের ছবি তোলা বা ভিডিও করা এবং তার দর্শন-প্রদর্শন হারাম। হ্যাঁ, যে ধরনের প্রয়োজনে মুদ্রিত ছবি ধারণ ও ব্যবহার বৈধ হয় ডিজিটাল ছবির ক্ষেত্রেও সে ধরনের প্রয়োজন স্বীকৃত হলে প্রয়োজন অনুপাতে তার অবকাশ থাকতে পারে।
নিচে কিছু শাখাগত মাসআলা উল্লেখ করা হলো।
ছবিযুক্ত মুদ্রা রাখার বিধান:
মুসলিম অমুসলিম প্রায় সকল দেশে মুদ্রায় নিজ দেশের কোন বিশেষ ব্যক্তির ছবি ছাপানোর প্রচলন রয়েছে। এক্ষেত্রে শরয়ী বিশ্লেষণ হল, প্রচলিত পয়সাতে যে ছবি ছাপা হয় সাধারণত তা স্পষ্ট ছবি হয় না, ভালো করে লক্ষ্য না করলে বোঝা যায় না। তাই এ জাতীয় পয়সা সাথে রাখতে শরয়ী কোন বাধা নেই। কিন্তু টাকার মধ্যে যে আকারের ছবি ছাপা হয় তা স্পষ্ট বোঝা যায়। তা সত্ত্বেও এ ধরনের কারেন্সি সাথে রাখা যাবে। আর ছবি সাথে রাখার দায়ভার মুদ্রায় ছবি যুক্ত করার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের ওপর বর্তাবে। সৌদি আরবের ইফতা বোর্ডের ফাতাওয়া এখানে তুলে ধরা হলো:
سوال: هناك أمور تقلقني كثيرا ومنها مسألة الصور التي على النقود فقد ابتلينا بها ودخلت المساجد في جيوبنا فهل دخولها إلى المساجد مما يسبب هرب الملائكة عنها فيحرم إدخالها وهل تعتبر من الأشياء الممتهنة؟ ولا تمنع الصور الممتهنة دخول الملائكة إلى البيوت؟
جواب : صور النقود لست متسببا فيها وأنت مضطر إلى تملكها وحفظها في بيتك أو حملها معك للانتفاع بها بيعا وشراء وهبة وصدقة وتسديد دين ونحو ذلك من المصالح المشروعة فلا حرج عليك، وليست ممتهنة، بل مصونة تبعا لصيانة ما هي فيه من النقد، وإنما ارتفع الحرج عنك من أجل الضرورة
অর্থ: মুদ্রায় যে ছবি থাকে তা ফেরেশতাদের চলে যাওয়ার কারণ হবে না। কারণ তোমার জন্য এ মুদ্রার মালিক হওয়ার কোন বিকল্প নেই এবং তুমি তা ঘরে সংরক্ষণ করতে বাধ্য অথবা বেচাকেনা, দান- সদকা, ঋণ পরিশোধ এবং শরীয়ত অনুমোদিত উপকার লাভের জন্য তোমাকে তা বহন করতে হবেই। তাই এতে তোমার কোন অসুবিধা নেই। তবে এই বিধান মুদ্রায় ছাপা ছবিটি পদদলিত ছবির হুকুমে হওয়ার কারণে নয়। কেননা (মুদ্রাসংশ্লিষ্ট হওয়ায়) মুদ্রার মত ছবিটিকেও যত্নের সাথে সংরক্ষণ করা হয়। এক্ষেত্রে ছাড়ের কারণ হল, প্রয়োজনীয়তা। (ফাতাওয়াল লাজনাতুদ দায়িমা লিলবুহুসিল ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা ১/৪৮৫)
উল্লেখ্য, স্মৃতি ধরে রাখার জন্য এ্যালবামে ছবি রাখাও জায়েয নেই। কেননা, হাদীসে সবধরনের চিত্রকরের শাস্তির কথা এসেছে। বিশেষ কাউকে আলাদা করা হয়নি।
ছবিযুক্ত কামরায় নামায পড়ার বিধান:
পায়ের নিচে ছাড়া ঘরের যেদিকেই ছবি থাকুক সে ঘরে নামায পড়া মাকরূহ। তবে ছবি সামনে থাকলে নিষিদ্ধের মাত্রা যে পরিমাণ থাকবে পিছনে থাকলে সে মাত্রা আরো কমে যাবে। ঘরে ছবিযুক্ত পত্র-পত্রিকা থাকলে তা কিছু দিয়ে ঢেকে নামায আদায় করতে হবে। (আদ দুররুল মুখতার ১/৬৪৮) এ সম্পর্কে হাদীসের উদ্ধৃতি পেশ করা হল,
عن أنس رضي الله عنه قال: كان قرام لعائشة سترت به جانب بيتها فقال لها النبي صلى الله عليه وسلم أميطي عني فإنه لا تزال تصاويره تعرض لي في صلاتي.
অর্থ: হযরত আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত, হযরত আয়েশা রাযি. এর ঘরে একটি পর্দা টানানো ছিল। নবী কারীম সা: বললেন, আমার সামনে থেকে এটা সরাও। কারণ এর ছবিগুলো আমার নামাযে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। (সহীহ বুখারী: ৫৯৫৯)
কার্টুনের শর‘ঈ বিধান:
আল্লাহ তা‘আলা কুরআনুল কারিমে বলেন,
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَشْتَرِي لَهْوَ الْحَدِيثِ لِيُضِلَّ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَيَتَّخِذَهَا هُزُوًا أُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ مُهِينٌ
অর্থাৎ, একশ্রেণীর লোক আছে যারা মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে গোমরাহ করার উদ্দেশে অবান্তর কথাবার্তা সংগ্রহ করে অজ্ঞতাবশত এবং উহাকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে। এদের জন্য রয়েছে অবমাননাকর শাস্তি।
(সূরা লুকমান-৬)
কার্টুনও যেহেতু অবান্তর ও অপ্রয়োজনীয় বিষয়ের শামিল তাই তা দেখা জায়েয হবে না।
কুরআনুল কারিমের অন্য জায়গায় আল্লাহ তা‘আলা মুমিন বান্দার পরিচয়ে বলছেন, মুমিনরা সফলকাম হয়ে গেছে, যারা নামাযে বিনয়ী ও নম্র। যারা অর্থহীন কথা ও কাজ থেকে বিরত থাকে। (সূরা মুমিন:১-৩)
নামাজে বিনয়ী হওয়া আর অর্থহীন কাজ থেকে বিরত থাকা সমমর্যাদার দাবি করছে কুরআন। তাফসীরে মা‘আরেফুল কুরআন বলছে, যে কাজে ধর্মীয় কোনো উপকার নেই, বরং ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে-এসবই অনর্থক কাজ। অনর্থক কাজ উচ্চস্তরের গোনাহ।
তাছাড়া, বর্তমানে ভারতের চ্যানেলসমূহে প্রচারিত বহু কার্টুনে শিরকের অনুষঙ্গ থাকে। এসব দেখে ছোটদের মন-মস্তিষ্কে অবচেতনভাবে শিরক অনুপ্রবেশ করে। অতএব, এর থেকে বিরত থাকা ওয়াজিব।
স্কাইপির ভিডিও কল এবং সরাসরি সম্প্রচারিত ছবির বিধান:
ছবি বলা হয় যা মূলের অনুগামী হয় না, বরং মূলের অনুপস্থিতিতেই তা সংরক্ষিত এবং স্বতন্ত্র হয়ে থাকে। সুতরাং যদি অন্য কোনো শরয়ী নিষিদ্ধতা না থাকে তবে ভিডিও কল করা জায়েয। কারণ, এ ক্ষেত্রে যে ছবি ভেসে আসে তা মূলের অনুগামী। অপর প্রান্ত থেকে যদি (যার ছবি) সে সটকে পড়ে তাহলে ছবি দৃষ্টিতে আসবে না। আর পূর্বেই বলা হয়েছে, যে ছবি মূলের অনুগামী সে ছবি হারাম নয়। যেমন আয়নার ছবি হারাম নয়। একই বিধান ‘লাইভ শো’ অর্থাৎ, সরাসরি সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তবে শরীয়তে নিষিদ্ধ অন্য কোনো কিছু এতে অন্তর্ভুক্ত হলে তা দেখা বা রাখা সেই নিষিদ্ধতার কারণে নাজায়েয হবে।
উলামায়ে কেরামের ভিডিও বয়ান:
বর্তমানে অনেক উলামায়ে কেরাম তাদের বয়ান ভিডিও করে ইন্টারনেটে আপলোড করছেন। জনসাধারণের কেউ কেউ এ বিষয়টি নিয়ে খুব পেরেশান। অনেকে বলে থাকে যে, ডিজিটাল ছবি যদি হারাম হয় তাহলে আলেমগণ তাদের বয়ান ভিডিও করছেন কেন?
এ বিষয় নিয়ে চিন্তা-ফিকির করা তো উলামায়ে কেরামেরই কাজ। সাধারণ জনগণের এ ব্যাপারে খুব বেশি ভাবার প্রয়োজন নেই। তাছাড়া একজন বিজ্ঞ আলেম কখনো এ কাজ বিশেষ অপারগতার কারণেও করতে পারেন। যে কারণটি সর্বসাধারণের বোধগম্যের বাইরে। এর উপর ভিত্তি করে জনসাধারণের জন্য অযথাই ছবি তোলা কিংবা ছবি সংরক্ষণ কোনটিই বৈধ হয়ে যাবে না।
নিরাপত্তার জন্য সার্কিট ক্যামেরা ব্যবহার করা কিংবা পাসপোর্টের জন্য ছবি তোলা জায়েয বলে যেমন এনালগ ছবি এবং ডিজিটাল ছবি জায়েয হয়ে যায় না; তদ্রূপ বিশেষ কোনো ফেরকার প্রতিরোধকল্পে কিংবা শরয়ী জরুরত পর্যায়ের কোনো কারণে বয়ান ভিডিও করলে ছবি জায়েয হয়ে যায় না। উম্মতের কর্ণধার এমন আলেমগণ কখনো বিশেষ কারণে কোনো আলেমকে বয়ান ভিডিও করার হুকুম করেন। এটাকে দলীল বানিয়ে সাধারণ জনগণের সুযোগ গ্রহণের অবকাশ নেই। এতে তারা হারাম কাজের গুনাহে গুনাহগার হবে।
এ কথা সত্য যে, অনেকে শরয়ী প্রয়োজন ছাড়াই তাদের বয়ান ভিডিও করছে। এর থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। আল্লাহ তা’আলা আমাদের সকলকে গোনাহ থেকে বেঁচে থাকার তাওফীক দান করুন, আমীন।
প্রয়োজনে ছবি তোলা:
কখনো কখনো অপারগতার কারণে মানুষ ছবি তুলতে বাধ্য হয়। কেউ যদি বাস্তবেই অপারগ হয় তাহলে ইসলামী শরীয়ত তার জন্য ছবি তুলতে ছাড় দিয়েছে। এক্ষেত্রে জনসাধারণের জন্য আবশ্যক হলো কোনো বিজ্ঞ আলেমের কাছে অপারগতার বিষয়টি উল্লেখ করে জেনে নিবে, শরীয়তে এক্ষেত্রে ছাড় রয়েছে কি না?

সারকথা:
পূর্বোল্লিখিত আলোচনা দ্বারা বুঝা গেল যে, প্রাণীর ছবি তোলা শরিয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ হারাম। চাই সেটা এ্যনালগ পদ্ধতিতে হোক অথবা ডিজিটাল পদ্ধতিতে হোক। তাই আধুনিক বিজ্ঞানের দোহাই দিয়ে হাদীসে বর্ণিত নাজায়েয ছবি থেকে ডিজিটাল ছবিকে পার্থক্য করার কোনো সুযোগ নেই।
তবে একান্ত প্রয়োজনে এ ধরনের ছবি ব্যবহার করা শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ। আর এই বৈধতা প্রয়োজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। অতএব, সর্বাবস্থায় একেবারে হালাল মনে করে প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে এসব ছবির ছড়াছড়ি শরয়ী দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। অন্তরে আল্লাহর ভয় বিদ্যমান রেখে সে অনুযায়ী আমল করা দরকার।
আর যে সব স্থানে ছবির প্রয়োজন পড়ে সেখানে যদি ছবির বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায় তাহলে ছবি তোলার আর প্রয়োজনই পড়ে না। ছবির বিকল্প হতে পারে- ফিঙ্গার প্রিন্ট; প্রত্যেক মানুষেরই আঙ্গুলের তালুতে নকশার মতো অসংখ্য অতি সূক্ষ্ম রেখা বিদ্যমান যে নকশা প্রতিটি
মানুষের জন্য পৃথক। একজনের নকশা অন্য জনের সাথে কখনোই মিলবে না। এমনকি জময ভাই (যাদের চেহারা একই রকম দেখতে) তাদের আঙ্গুলেরও রেখার সাথে মিল থাকে না।
পৃথিবীর সবজায়গায় গুরুত্বপূর্ণ কাজে ছবির চেয়ে ফিঙ্গার প্রিন্টকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। যেমন- মূল্যবান দলিলপত্রে, ব্যাংকে, বিমান বন্দরে, অধিক নিরাপত্তামূলক এমন বিভিন্ন স্থানে। তাই ছবির প্রচলনকে বাদ দিয়ে সর্বত্র ফিঙ্গার প্রিন্টসহ অন্যান্য বিকল্প ব্যবস্থা চালু করা উচিত।
ফিঙ্গার প্রিন্ট ছাড়াও কোনো ব্যক্তিকে চিহ্নিতকরণ বা সনাক্তকরণের অনেক বিকল্প পদ্ধতি রয়েছে। যেমন: চোখের রেটিনা স্ক্যান, চেখের রং, চোখের পুতলির দুরত্ব, ডিএনএ, তিল, দস্তখত (স্বাক্ষর) ইত্যাদি।
সুতরাং, মুসলিম অধ্যুষিত রাষ্ট্র হিসেবে এসব পদ্ধতিকে প্রাধান্য দিয়ে ছবির ব্যবহার আমাদের কমিয়ে আনা উচিত।
বর্তমানে ঢালাওভাবে হামদ-নাত, ইসলামী গজল কিংবা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের নামে যা হচ্ছে সেগুলো প্রয়োজনের মধ্যে পড়ে না।
সুতরাং ফেসবুক, ওয়াটসঅ্যাপ, ইমু ইত্যাদিতেও যেসব ছবি আপলোড দেয়া হয়, সেগুলো সম্পূর্ণরূপে নাজায়েযের অর্ন্তভুক্ত। কারণ এগুলোর মধ্যে কোনো ধরনের শরয়ী প্রয়োজন বিদ্যমান নেই।
আর যারা ডিজিটাল ছবি বৈধ হওয়ার দাবী করে থাকেন তাদের জন্যও دع ما يريبك الى ما لايريبك (সন্দেহপূর্ণ হালাল ছেড়ে নিশ্চিত হালাল গ্রহণ কর) হাদীস অনুযায়ী এর থেকে বিরত থাকা উচিত।

 

মুফতী আবূ যর
মুদাররিস, জামি‘আতুল আবরার আল-ইসলামিয়া টাঙ্গাইল

 

 

 

 

Share: