ইসলাম নারীকে দিয়েছে যথাযথ অধিকার, দিয়েছে প্রকৃত মুক্তি। ইসলাম নারীকে সম্পদের অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছে। সমাজের অচ্ছুৎ শ্রেণী থেকে উঠিয়ে বসিয়েছে রাণীর আসনে। তবে ইসলাম নারীকে তথাকথিত সমঅধিকার দেয়নি; দিয়েছে ন্যায্য অধিকার। পুরুষকেও ইসলাম নারীর চেয়ে বেশি অধিকার দেয়নি; দিয়েছে সুষম অধিকার। আল্লাহ তা‘আলা নারী-পুরুষ উভয়ের স্রষ্টা। তিনিই ভালো জানেন তার সৃষ্টি কোথায় কতটুকু অধিকার পেলে সর্বাঙ্গীণ সুন্দর হবে; সৃষ্টিজগতে ভারসাম্য রক্ষা হবে। স্রষ্টার বিধান থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণেই সমাজে এত অনাচার, এত অজাচার। নির্মাতার দেওয়া নিয়মানুযায়ী যন্ত্র পরিচালনা না করলে যেমন যন্ত্র ঠিক থাকে না; তেমনি স্রষ্টার দেওয়া বিধান না মেনে স্বেচ্ছাচারিতা করার কারণে সৃষ্টিও আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত।
তথাকথিত নারীবাদীদের সমঅধিকারের চটকদার স্লোগানে বর্তমানে পশ্চিমা সমাজ-ব্যবস্থা পর্যুদস্ত। বাহ্যিক উপায়-উপকরণের কমতি না থাকা সত্ত্বেও আত্মহনন তাই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে; সামাজিক জীব হয়েও সুষম সমাজব্যবস্থা না থাকায় সুখী সমাজ পুরাকালের কীর্তিতে পরিণত হয়েছে।
আফসোসের কথা হলো, তাদের যে মুক্তি স্লোগানে বেপথু হয়ে পশ্চিমা সমাজ সমাধান খোঁজায় ব্যস্ত; তাদের ঝকঝকে রাস্তা-ঘাটের মোহে অন্ধ প্রাচ্যসমাজ সেই স্লোগানকেই ভাবছে নিজেদের মুক্তির উপায়।
স্বাভাবিক ভাবে মুসলিমদের মাঝেও পুঁজিবাদী কালচার ভক্ত একদল মডারেট মুসলিমের উদ্ভব হয়েছে, যারা ইসলামও পালন করতে চায়, পশ্চিমকেও ত্যাগ করতে চায় না। বাহ্যত পুঁজিবাদী কালচারই যেহেতু দুনিয়াময় রাজত্ব করে বেড়াচ্ছে-কী কারণে রাজত্ব করছে সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ- অপরদিকে রাষ্ট্রিয় ইসলাম পৃথিবীতে অনুপস্থিত বেশ কয়েক যুগ হলো- স্বাভাবিকভাবেই বড় পরিসরে তার সুফলও অতীত; বাহ্যিক আবরণের মোহে আকৃষ্ট এই শ্রেণীর অবচেতন মন তাই ইউরোপকে দাঁড় করিয়েছে মানদণ্ড হিসেবে। ইসলামের যা কিছু পশ্চিমা সমাজব্যবস্থার দর্পনে চলনসই- সেগুলোকে আঁকড়ে ধরে বাকিটুকুকে গৌণ করে রেখেছে। ফলত: এদের ইসলাম কখনই সালাফে সালেহীনের পুরো ইসলামটাকে প্রতিফলিত করে না; করে তার খণ্ডিত একটা রূপকে।
মডারেট মুসলিম সমাজ পশ্চিমকে অনুসরণের অজুহাত দাঁড় করাতে ইসলামের অলিগলি হাতড়ে দলিল খুঁজে বেড়ায়- আমলযোগ্য হোক বা না হোক; ইউরোপিয়ান কালচারের সাথে সংযোগ রক্ষা করে চলতে পারে এমন বর্ণনা খুঁজে এনে সালাফের হাত ধরে চলে আসা ইসলামের চিরাচরিত আমলকে প্রশ্নবিদ্ধ করে বসে। দ্বীনি সমাজে হানাহানি উসকে দিয়ে ধর্মের নামে অধর্মের প্রসার ঘটিয়ে বেড়ায় সর্বত্র।
ইউরোপিয়ান কালচারের বড় একটা অংশ জুড়ে রয়েছে নারীবাদ। এতে নারীদের কথিত স্বাধীনতা দেওয়া হয়, তারা যথেচ্ছা চলাফেরার অধিকার পায়; প্রকৃতিগতভাবে ঘরমুখী নারীরা চটকদার স্লোগানে বিভ্রান্ত হয়ে বহির্মুখী হয়।
ইসলাম যেহেতু ফিত্্রাতের ধর্ম, নারীর স্বভাবগত ও দৈহিক বৈশিষ্টের প্রতি লক্ষ্য রেখে ইসলাম নারীকে ঘরমুখো হতে উৎসাহিত করেছে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের জামা‘আত, জুমু‘আর নামাযে নারীকে শরীক হতে
অনুৎসাহিত করেছে। কিন্তু নারীকে বহির্মুখী করতে মরিয়া ইউরোপের অনুকরণে মডারেট মুসলিম সমাজও নারীকে বাইরে বের করতে বদ্ধপরিকর। তাদের দাবি হলো, নারীগণ মসজিদে আসবেন, পুরুষের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ময়দানে ঈদের নামায পড়বেন।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের অনুসরণীয় সালাফে সালেহীনগণ ধর্মের দোহাই দিয়ে এধরণের ফিৎনা সৃষ্টির অনুমতি কখনই দেননি; ক্ষেত্রবিশেষে বরং নারীদের মসজিদে গিয়ে জামা‘আতে অংশগ্রহণ, ঈদগাহে উপস্থিতিকে হারাম করেছেন।
নবীযুগে নারীরা ছিলেন সর্বোচ্চ নিরাপদ। হাদীসে আছে, ইসলামের স্বর্ণযুগে ইরাকের হীরা শহর থেকে মদীনা পর্যন্ত নারী একাকী সফর করবে, তবুও তার কোনো বিপদ হবে না। অথচ সে যুগেও তাদের বাড়ির বাইরে বের হতে- হোক তা নামায আদায়ের উদ্দেশ্যে- অনুৎসাহিত করা হয়েছে।
সাহাবাযুগে ফিৎনার পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছিল, ফলে সাহাবায়ে কেরাম নিজেদের পরিবারকে মসজিদের জামা‘আতে বা ঈদগাহে যেতে বারণ করতেন। আয়েশা রা. এর বক্তব্য দ্বারা স্পষ্ট বুঝা যায়, তাদের এই বারণ হালকা কিছু ছিল না; বরং কঠোর নিষেধাজ্ঞা ছিল।
তাবে‘ঈন-তাবে তাবে‘ঈন এক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরামের পূর্ণ অনুসরণ করেছেন। বেশ কিছু জালীলুল ক্বদর তাবে‘ঈ থেকে নারীদের জামা‘আতে অংশগ্রহণ কিংবা ঈদগাহে উপস্থিতির ব্যাপারে স্পষ্ট নিষেধ পাওয়া যায়।
সালাফে সালেহীনের পদাঙ্ক অনুসরণ করে পরবর্তীতে উম্মাহর উলূল আমর ফকীহগণ ফিৎনার ক্রমবর্ধমান সয়লাবের প্রেক্ষিতে নারীদের জুমুআ ও পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের জামা‘আতে অংশগ্রহণ এবং ঈদগাহে উপস্থিত হতে বারণ করেছেন। আমাদের উচিত অনর্থক খেয়াল খুশির অনুসরণ না করে আলেমদের কথা মানা ও উম্মাহর একতা রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখা।
বক্ষমাণ প্রবন্ধে আমরা উপরোক্ত বিষয়ে নবীযুগ ও পরবর্তী যুগের সালাফে সালেহীনগণের কর্মপন্থা বিশ্লেষণ করার প্রয়াস চালাবো ইনশাআল্লাহ।
নবী যুগ:
নবী যুগে নবীজী সা. এর পেছনে নামায আদায় করতে পারাকে সাহাবীগণ উভয় জাহানের বড় সফলতা মনে করতেন । তাই পারতপক্ষে তারা জামা‘আত ছাড়তেন না। নারী সাহাবীগণ এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। তাঁরাও নবীজী সা: এর পেছনে নামায আদায়ে উদগ্রীব ছিলেন। কিন্তু নবীজী সা. তাঁদের মসজিদে এসে জামা‘আতে অংশগ্রহণ করাকে অনুৎসাহিত করেছেন।
عن عبد الله بن سويد الأنصاري عن عمته امرأة أبي حميد الساعدي : أنها جاءت النبي صلى الله عليه و سلم فقالت : يا رسول الله صلى الله عليه و سلم إني أحب الصلاة معك فقال : قد علمت أنك تحبين الصلاة معي و صلاتك في بيتك خير من صلاتك في حجرتك و صلاتك في حجرتك خير من صلاتك في دارك و صلاتك في دارك خير من صلاتك في مسجد قومك و صلاتك في مسجد قومك خير من صلاتك في مسجدي فأمرت فبني لها مسجد في أقصى شيء من بيتها و أظلمه فكانت تصلي فيه حتى لقيت الله عز و جل
অর্থাৎ, আবূ হুমাইদ আস-সা’য়ীদী রা. এর স্ত্রী নবীজী সা: এর নিকট এসে আরয করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি আপনার পেছনে নামায আদায় করতে ভালোবাসি। নবীজী সা: ইরশাদ করলেন: ‘আমি জানি তুমি আমার পেছনে নামায আদায় করতে ভালোবাসো; কিন্তু ঘরের এককোণে নামায আদায় করা তোমার ঘরে (বাহিরের অংশে) নামায আদায় করার চেয়ে উত্তম। আর তোমার ঘরে নামায আদায় করা তোমার বাড়ির (অন্য অংশে) আদায় করার চেয়ে উত্তম। আর তোমার বাড়িতে নামায আদায় করা তোমার মহল্লার মসজিদে নামায আদায় করার চেয়ে উত্তম। আর তোমার মহল্লার মসজিদে নামায আদায় করা আমার মসজিদে (আমার পেছনে) নামায আদায় করার চেয়ে উত্তম।’ রাসূলুল্লাহ সা: এর এই ইরশাদ শুনে উক্ত নারী সাহাবী ঘরের দূরতম কোণে নামাযের স্থান নির্ধারণ করলেন। বাকি জীবন তিনি সেখানেই নামায আদায় করেন। (মুসনাদে আহমাদ: ২৭০৯০, ইবনে খুযাইমা: ১৬৮৯)
উল্লেখিত হাদীসে নারীদের জন্য ইসলাম কি পছন্দ করে তার সুস্পষ্ট বর্ণনা আছে। নবীজীর প্রকৃত অনুসারীদের জন্য এরপর আর ফাঁকফোকড় খোঁজার প্রয়োজন থাকে না; যেমন সেই সাহাবীয়া খোঁজেননি, বরং সাথে সাথে নবীজী সা: এর ইরশাদকে আমলে পরিণত করে প্রকৃত নবী-অনুসারী হিসেবে উম্মতের জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন।
عن أبي الأحوص عن عبد الله، عن النبي – صلى الله عليه وسلم – قال: “صلاة المرأة في بيتها أفضل من صلاتها في حجرتها، وصلاتها في مخدعها أفضل من صلاتها في بيتها
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাস‘উদ রা. নবী কারীম সা: থেকে বর্ণনা করেছেন: ‘নারীদের জন্য নিজ গৃহকোণে নামায আদায় করা তার কামরায় (বাহিরের অংশে) নামায আদায় করার চেয়ে উত্তম। আর তার কামরায় নামায আদায় করা তার বাড়ির অন্য অংশে নামায আদায় করার চেয়ে উত্তম।’ (আবূ দাউদ: ৫৭০)
عن أم سلمة، زوج النبي صلى الله عليه وسلم، قالت: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: “صلاة المرأة في بيتها خير من صلاتها في حجرتها، وصلاتها في حجرتها خير من صلاتها في دارها، وصلاتها في دارها خير من صلاتها خارج”
উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মে সালামা রা. বর্ণনা করেন, নবী কারীম সা: ইরশাদ করেন:‘নারীদের জন্য নিজ গৃহকোণে নামায আদায় করা তার কামরায় (বাহিরের অংশে) নামায আদায় করার চেয়ে উত্তম। আর তার কামরায় নামায আদায় করা তার বাড়ির অন্য অংশে নামায আদায় করার চেয়ে উত্তম। আর নিজ বাড়িতে নামায আদায় করা বাড়ির বাইরে নামায আদায় করার চেয়ে উত্তম।’ (মু’জামুল আওসাত্ব: ৯১০১)
عن أبي هريرة أن نسوة من الأنصار قلن له: يا رسول الله، إنا لا نستطيع أن نأتيك مع الرجال، فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم: “موعدكن بيت فلانة” فجاء فتحدث معهن
আবূ হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, আনসারী নারীদের একটি দল নবীজী সা: এর কাছে আবেদন করল, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমরা পুরুষদের সাথে আপনার কাছে আসতে পারি না। তখন নবীজী সা: তাদের বললেন, ‘অমুক নারীর গৃহে তোমরা নির্দিষ্ট দিনে উপস্থিত থাকবে।’ (সহীহ বুখারী: ১০১, সহীহ ইবনে হিব্বান: ২৯৪১)
লক্ষণীয় বিষয়, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের জন্য ইলম শিক্ষা করা ফরয আর নারীদের জন্য মসজিদে জামা‘আতে অংশ নেওয়া মুস্তাহাবও না। অথচ নবীজী সা: পুরুষদের সাথে একত্রে শিক্ষা না দিয়ে নারীদের ইলম শিক্ষার জন্য একজন নারীর ঘর নির্বাচন করেছেন, যাতে পুরুষদের সাথে মেলামেশার সুযোগ তৈরী না হয়। সেক্ষেত্রে, পুরুষদের সাথে মেলামেশার আশঙ্কা থাকলে নারীদের মসজিদে গমনের অনুমতি কিভাবে দেওয়া যায়!
উপরোক্ত প্রতিটি হাদীসের ভাষ্য এক ও অভিন্ন। যদি কেউ প্রকৃতপক্ষে শরীয়ত মানতে চায়, ইসলামের রুচি-প্রকৃতি অনুযায়ী চলতে চায়, তার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট।
সাহাবী যুগ:
নবী কারীম সা: এর মেজায সবচেয়ে ভালো বুঝতেন সাহাবায়ে কেরামগণ। সেজন্যই নবীজী সা: নিজের সাথে মিলিয়ে সাহাবায়ে কেরামকে হক্বের মাপকাঠি হিসেবে ঘোষণা করেছেন। নবীজী সা: এর উত্তরকালে হক্বের পথ কোন্্টি হবে এ প্রশ্নের জবাবে বলেছেন—
ما أنا عليه وأصحابي
অর্থাৎ, ‘সে পথই হক্ব, যে পথে আমি আছি এবং আমার সাহাবাগণ থাকবে।’ (তিরমিযী: ২৬৪১)
অতএব, নবীজী সা: এর ইন্তেকালের পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সাহাবাগণের যে কর্মপন্থা ছিল তা কিয়ামত পর্যন্ত উম্মতের হক্বপন্থীদের জন্য অবশ্য-অনুসরণীয় বিধান হয়ে থাকবে।
সংশ্লিষ্ট মাসআলায় হযরত আয়েশা রা. এর বক্তব্য হলো:
عن عمرة بنت عبد الرحمن أنها أخبرته، عن عائشة , زوج النبي صلى الله عليه وسلم، أنها قالت: لو أدرك رسول الله صلى الله عليه وسلم ما أحدث النساء لمنعهن المسجد كما منعت نساء بني إسرائيل
সায়্যিদাতুত তাবী‘ঈয়্যাহ হযরত আমরাহ বিনতে আব্দুর রহমান রহ. উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়িশা রা. থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: ‘নবী করীম সা: যদি এযুগের নারীদের অবস্থা দেখতেন, বনী ইসরাঈলের
নারীদের মত এযুগের নারীদেরকেও মসজিদে আসতে নিষেধ করতেন।’ (মুআত্তা মালিক: ৬৭৭, বুখারী: ৮৬৯, আবূ দাউদ: ৫৬৯)
আয়েশা রা. নিজে একজন নারী এবং নবীজী সা: এর সুদীর্ঘ বারো বৎসরের সবচেয়ে প্রিয় সহধর্মিনী। নারীদের সম্পর্কে নবীজী সা: এর মনোভাব তারচেয়ে বেশি আর কে বুঝতে পারে!
লক্ষণীয় বিষয় হলো, হযরত আয়েশা রা. এর যুগ ছিল খায়রুল কুরূন তথা শ্রেষ্ঠতম তিনযুগের একটি। সে যুগের নারীগণ চৌদ্দশত বৎসর পরের আধুনিক নারীদের চেয়ে হাজারগুণ ভালো ছিলেন। সে যুগের ব্যাপারেই আয়েশা রা. এর মন্তব্য এমন; তিনি আমাদের যুগ পেলে কি মন্তব্য করতেন!
عن سعد بن إياس عن أبي عمرو الشيباني، أنه: رأى ابن مسعود، يخرج النساء من المسجد يوم الجمعة، ويقول: اخرجن إلى بيوتكن خير لكن. (وفي رواية: اخرجن فإن هذا ليس لكن).
অর্থাৎ, আবূ আমর আশশাইবানী রহ. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাস‘উদ রা. কে জুমু‘আর দিন নারীদের মসজিদ থেকে বের করে দিতে দেখেছেন। এসময় তিনি বলছিলেন,‘তোমরা তোমাদের বাড়িতে গিয়ে নামায আদায় করো, এতেই তোমাদের জন্য কল্যাণ রয়েছে।’ (মুসান্নাফে আব্দুর রায্্যাক: ৫২০১, মু‘জামুল কাবীর: ৯৪৭৫, বায়হাক্বী: ৫৬৫১)
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাস‘উদ রা. এর ব্যাপারে নবীজী সা: এর মন্তব্য হলো:
رضيت لأمتي ما رضي لها ابن أم عبد، وكرهت لأمتي ما كره لها ابن أم عبد
অর্থাৎ, ‘ইবনু উম্মি আবদ (ইবনে মাস‘উদ রা.) আমার উম্মতের জন্য যে বিষয়কে পছন্দ করে আমিও সে বিষয়কে উম্মতের জন্য পছন্দ করি, আর সে যে বিষয়কে আমার উম্মতের জন্য অপছন্দ করে, আমিও সে বিষয়কে অপছন্দ করি।’ (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা: ৩২২৩১)
তো সেই ইবনে মাস‘উদ রা. নারীদের মসজিদে আসা পছন্দ করতেন না। নবীজী সা: এর অনুসারী হিসেবে আমাদের জন্যও সেটাকে অপছন্দ করা উচিত।
عن عبد الله بن مسعود قال: صلاة المرأة فى بيتها أفضل من صلاتها فيما سواها ثم قال إن المرأة إذا خرجت تشرف لها الشيطان
অর্থাৎ, আব্দুল্লাহ ইবনে মাস‘উদ রা. বলেন,‘নারীদের নিজগৃহে নামায আদায় করা অন্যত্র নামায আদায় করার চেয়ে উত্তম।’ অত:পর তিনি বলেন,‘ নারীরা যখন বাড়ি থেকে বের হয়, শয়তান তাদের উঁকিঝুঁকি দিয়ে দেখতে থাকে।’ (মুসান্নাফে আব্দুর রায্্যাক: ৫১৭০, মু‘জামুল কাবীর: ৯৪৮২)
বোঝা গেল, নারীদের নামাযের দোহাই দিয়ে বাড়ির বাইরে আসা
শয়তানকে প্ররোচিত করে। কোনো বিবেকবান মানুষ নিশ্চয়ই শয়তানকে প্ররোচিত করতে পছন্দ করবে না।
عن ابن عمر انه كان لا يخرج نساءه في العيدين
অর্থাৎ, হযরত ইবনে উমার রা. ঘরের মহিলাদেরকে ঈদের নামাযের উদ্দেশ্যে বাহিরে নিয়ে আসতেন না। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা: ৫৭৯৫)
তাবে‘ঈ যুগ:
عن هشام بن عروة عن ابيه انه كان لا يدع امراة من اهله تخرج الي فطر ولا الي الاضحي.
অর্থাৎ, হিশাম বিন উরওয়া তাঁর পিতা বিখ্যাত তাবে‘ঈ হযরত উরওয়া বিন যুবাইর রহ. থেকে বর্ণনা করেন, তিনি তাঁর ঘরের মহিলাদের ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আযহায় (নামাযের উদ্দেশ্যে) বের হতে দিতেন না। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা: ৫৮৪৬)
حدثنا عبد الرحمن بن القاسم قال كان القاسم اشد شيئ علي العواتق لا يدعهن يخرجن في الفطر والاضحي
মদীনার সাত ফকীহের অন্যতম আবূ বকর রা. এর নাতি হযরত ক্বাসিম বিন মুহাম্মাদ রহ. নারীদের ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আযহায় ঈদগাহে যেতে দিতেন না এবং এব্যাপারে তিনি ছিলেন কঠোর। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা: ৫৮৪৪)
عن منصور، عن إبراهيم، قال: يكره خروج النساء في العيدين. ابن أبي شيبة
কূফার বিখ্যাত তাবে‘ঈ হযরত ইবরাহীম নাখ‘ঈ রহ. দুই ঈদে মহিলাদের নামাযে আসা মাকরূহ তথা অপছন্দ করতেন। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা: ৫৮৪১)
وروي عن ابن المبارك أنه قال: “أكره اليوم الخروج للنساء في العيدين، فإن أبت المرأة إلا أن تخرج فليأذن لها زوجها أن تخرج في أطمارها ولا تتزين، فإن أبت أن تخرج كذلك فللزوج أن يمنعها عن الخروج”
বিখ্যাত তাবে‘ঈ আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহ. এর বক্তব্য হলো:
‘বর্তমানে আমি নারীদের ঈদের জামা‘আতের উদ্দেশ্যে বের হওয়া অপছন্দ করি। যদি তারা বের হতেই চায় তবে যেন তাদের স্বামীরা তাদের অনুমতি দেয়; তবে নারীরা বের হবে পুরাতন কাপড় পরে এবং সাজসজ্জা করবে না। এভাবে যদি বের হতে না চায় তাহলে স্বামীর অধিকার আছে তাকে বাধা দেওয়ার। (তিরমিযী: ৫৪০, আল ইস্তিযকার: ২/৪৭০)
বলাবাহুল্য, বর্তমানে নারীরা পুরাতন কাপড় পরে বের হওয়ার কথা শুনলে বের হতে উদ্যোগী হবে না মোটেও।
জগদ্বিখ্যাত ফক্বীহ ও তাবে‘ঈ ইমাম আবূ হানিফা রহ. এর বক্তব্য ইমাম মুহাম্মদ রহ. নকল করেছেন:
وذكر محمد بن الحسن عن أبي يوسف عن أبي حنيفة قال: كان النساء يرخص لهن في الخروج إلى العيد فأما اليوم فإني أكرهه ، وأكره لهن شهود الجمعة والصلاة المكتوبة بالجماعة وأرخص للعجوز الكبيرة أن تشهد العشاء والفجر فأما غير ذلك فلا قلت أرأيت النساء هل عليهن خروج في العيدين قال قد كان يرخص لهن في ذلك فأما اليوم فإني أكره لهن ذلك قلت أفتكره لهن أن يشهدن الجمعة والصلاة المكتوبة في جماعة قال نعم. قلت فهل ترخص لشيء منهن قال أرخص للعجوز الكبيرة أن تشهد العشاء والفجر والعيدين فأما غير ذلك فلا
‘ইতিপূর্বে নারীদের ঈদগাহে যেতে অনুমতি দেওয়া হতো। কিন্তু বর্তমানে আমি তাদের জন্য ঈদগাহে যাওয়া মাকরূহ মনে করি। তাছাড়া, নারীদের জন্য জুমু‘আ ও পাঁচ ওয়াক্ত ফরয নামাযের জামা‘আতে অংশগ্রহণ করাকেও মাকরূহ মনে করি। তবে অশীতিপর বৃদ্ধা হলে ইশা, ফজর ও দুই ঈদের নামাযে অংশগ্রহণের অনুমতি দেওয়া যায়। (আল মাবসূত লিশ্্ শাইবানী ১/৩৮১)
وقال الثوري أكره اليوم للنساء الخروج إلى العيدين
আমীরুল মুমিনীন ফিল হাদীস ইমাম সুফইয়ান সাওরী রহ. বলেন,‘বর্তমানে আমি নারীদের ঈদগাহে যাওয়াকে মাকরূহ মনে করি।’ (তামহীদ, ২৩/৪০২)
قال يحيى الأنصاري: لا نعرف خروج المرأة الشابة عندنا في العيدين
ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আল আনসারী রহ. নিজ অঞ্চলের অবস্থা বর্ণনা করছেন:‘আমাদের অঞ্চলে যুবতী নারীদের ঈদের নামাযে অংশগ্রহণ করার প্রচলন নেই।’ (আল আওসাত্ব, ইবনুল মুনযির: ২১২০)
উল্লেখ্য, ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আল আনসারী রহ. এর ইন্তেকাল ১৪৩ হিজরী সনে। অর্থাৎ, তিনি ইসলামের প্রামাণ্য তিনযুগের শেষ যুগের ইমাম। মদীনায় তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। মদীনার প্রসিদ্ধ সাত ফকীহের একান্ত শাগরিদ ছিলেন তিনি।
তো, এই ইয়াহইয়া আল আনসারীর বক্তব্য হচ্ছে, তার সময়ে নারীদের ঈদের নামাযে অংশগ্রহণ করার প্রচলন ছিল না। অর্থাৎ, ইসলামের শ্রেষ্ঠ যুগসমূহে-যখন নারীদের পূর্ণ নিরাপত্তা ছিল, ফিৎনার প্রাবল্য ছিল না- সে সময়কার নারীগণই ঈদগাহে যেতেন না; তাহলে বর্তমানে কিভাবে
নারীদের দলে দলে ঈদগাহে গিয়ে নামায আদায় করার অনুমতি দেওয়া যায়!
উপরোক্ত বর্ণনাগুলো দ্বারা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, নারীদের ঈদগাহে যাওয়াটা তাবেয়ীনগণ পছন্দ করতেন না এবং তাদের যুগে এই আমলের প্রচলনও ছিল না।
পরবর্তীদের ফাতাওয়া:
হানাফী ফিক্বহের প্রাণপুরুষ ইমাম মুহাম্মদ রহ. এর ফাতাওয়া:
وليس على النساء خروج في العيدين
অর্থাৎ, নারীদের জন্য ঈদগাহে যাওয়ার অনুমতি নেই। (মাবসূত লিস্ সারাখসী: ২/৪১)
প্রসিদ্ধ ফিক্বহী গ্রন্থ বাদায়েয়ূস সানায়ে‘ এর বর্ণনা:
وأما النسوة فهل يرخص لهن أن يخرجن في العيدين؟ أجمعوا على أنه لا يرخص للشواب منهن الخروج في الجمعة والعيدين وشيء من الصلاة؛ لقوله تعالى {وقرن في بيوتكن} [الأحزاب: ৩৩] والأمر بالقرار نهي عن الانتقال ولأن خروجهن سبب الفتنة بلا شك، والفتنة حرام، وما أدى إلى الحرام فهو حرام
অর্থাৎ, যুবতী নারীদের জুমু‘আ এবং দুই ঈদের জামা‘আত কিংবা অন্য কোনো নামাযের জামা‘আতে অংশগ্রহণের সুযোগ না দেওয়ার ব্যাপারে সকলেই একমত। কারণ, আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশ: ‘হে নারীগণ, তোমরা তোমাদের গৃহে অবস্থান কর।’ (সূরা আহযাব:৩৩)
আর ঘরে অবস্থানের নির্দেশ মানে বাইরে বের হওয়া নিষেধ। তাছাড়া, যুবতী নারীদের বাইরে বের হওয়া নি:সন্দেহে বিভিন্ন ফিৎনার কারণ। আর ফিৎনা হারাম। আর হারাম পর্যন্ত নিয়ে যায় এমন সবকিছুও হারাম। (বাদায়েয়ূস সানায়ে’: ১/২৭৫)
বিখ্যাত হানাফী ফক্বীহ ইবনুল হুমাম রহ. বলেন:
وبالنظر إلى التعليل المذكور منعت غير المزينة أيضا لغلبة الفساق، وليلا وإن كان النص يبيحه لأن الفساق في زماننا كثر انتشارهم وتعرضهم بالليل،
‘(উম্মুল মু‘মিনীন হযরত আয়েশা রা. এর বক্তব্য নকল করার পর) উপরোল্লিখিত কারণের দিকে লক্ষ্য করে সাজসজ্জাবিহীন নারীকেও মসজিদে যেতে বারণ করা হবে, এমনকি রাতেও; যদিও হাদীসে অনুমতি দেওয়া হয়েছে। কেননা, আমাদের যুগে (৭ম হিজরী শতাব্দী) রাতেও বাজে লোকদের চলাফেরা বেড়ে গেছে।’ (ফাতহুল ক্বাদীর, বাবুল ইমামাহ, ১/৩৬৬)
উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠতম দ্বীনী ইদারা দারুল উলূম দেওবন্দের ফাতাওয়া:
(سوال نمبر: ৬৮১১৪ ) جمعہ اور عیدین کی نمازیں صرف مردوں پرواجب ہیں، عورتوں پر نہیں۔ عورتیں جمعہ اور عیدین کی نمازوں کے لیے مسجد اور عیدگاہوں میں نہ جائیں بلکہ جو نمازیں عورتوں پر فرض ہے ان کے لیے بھی جماعت کے ساتھ نماز پڑھنے کی غرض سے گھروں سے نکلنا عورتوں کے لیے مکروہ تحریمی وناجائز ہے
(دار العلوم دوبند : ঋধঃধি ওউ: ২৯০-২২২/ই=২/১৪৩৫-ট)
অর্থাৎ, জুমু‘আ এবং দুই ঈদের নামায শুধুমাত্র পুরুষের উপর ওয়াজিব, নারীদের উপর নয়। নারীরা জুমু‘আ এবং ঈদের নামাযে অংশগ্রহণের জন্য ঈদগাহে যাবে না। বরং, যে সব নামায নারীদের উপর ফরয (যেমন, পাঁচ ওয়াক্ত নামায ইত্যাদি) সেগুলোর জামা‘আতে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যেও নারীদের জন্য ঘর থেকে বের হওয়া মাকরূহে তাহরীমী এবং নাজায়েয। (দারুল উলুম দেওবন্দের ওয়েব পোর্টাল, প্রশ্ন নং: ৬৮১১৪)
নবীযুগে বের হওয়া জায়েয থাকলে এখন কেন পারবে না?
পশ্চিমা নারীবাদে বিমুগ্ধ সমাজ থেকে প্রশ্নটি বেশ উচ্চকিত হয় বর্তমানে। তবে খায়রুল কুরূন তথা ইসলামের স্বর্ণযুগে নারীরা এই আপত্তি করতেন না। কারণ, কুরআন-হাদীসের নির্দেশনা ও রুচি-প্রকৃতি সম্পর্কে তারা বেশ ভালোভাবেই অবগত ছিলেন।
কিন্তু পড়াশোনার স্বল্পতা ও চকচকে কিছু দেখলেই আগুনেপোকার মত ছুটে যাওয়ার প্রবণতা আমাদের এই প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করে। কারণ, এই প্রশ্ন তুলে নিজেদের বাইরে বের হওয়ার প্রবণতাকে ধর্মীয়ভাবে বৈধতার আবরণ পরানো যাবে। এতে সমাজ ও সংসার; সবকূলই রক্ষা পাবে।
নবীযুগে সাধারণ নিয়ম এটাই ছিল যে, নারীরা ঘরে থাকবে, তারা শরীয়তসম্মত প্রয়োজন ছাড়া ইবাদতের জন্যও বের হবে না। জামা’আতের বিধানও তাদের জন্য নয়। নবী কারীম সা: জামা’আতের গুরুত্ব বোঝাতে ইরশাদ করেন:
عن أبي هريرة قال: قال رسول الله -صلي الله عليه وسلم: “لولا ما في البيوت من النساء والذرية، لأقمت صلاة العشاء، وأمرت فتياني يحرقون ما في البيوت بالنار”
অর্থাৎ, যদি ঘরগুলোতে নারী এবং শিশু না থাকতো তাহলে আমি ইশার নামাযের জামা‘আত কায়েম করে যুবকদের আদেশ করতাম ঘরগুলোকে জ্বালিয়ে দিতে। (মুসনাদে আহমাদ: ৮৭৪২)
এই হাদীস দ্বারা একথা স্পষ্ট যে, নবীযুগে নারীরা নামাযের সময় ঘরে অবস্থান করতেন; মসজিদের জামা‘আতে অংশগ্রহণ করতেন না।
তাছাড়া, যে হাদীসে নবীজী সা: গৃহকর্তাদের বলেছেন নারীদের মসজিদে যেতে দিতে, সে হাদীসের বর্ণনাকারী ইবনে উমার রা. নিজেই পরিবারের নারীদের বের হতে নিষেধ করতেন; যা আমরা ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি। আর মুহাদ্দিসদের মূলনীতি হলো, কোনো হাদীসের রাবী যদি নিজেই হাদীসের উপর আমল না করে, তাহলে এটা উক্ত হাদীস মানসূখ তথা রহিত হয়ে যাওয়ার আলামত অথবা হাদীসের ভিন্ন কোনো ব্যাখ্যা আছে।
নবীযুগে কিছু নারী যদিও জামা‘আতে অংশ নিতেন, তবে—
১। নারীদের জামা‘আতে অংশ নিতে উৎসাহ দেওয়া হয়নি। ইমাম মুহাম্মাদ রহ. মদীনাবাসীদের আমল বর্ণনা করেছেন:
وقال أهل المدينة في خروج النساء في العيدين ما بلغنا ان ذلك عليهن
অর্থাৎ, ঈদের জামা‘আতে মহিলাদের হাজির হওয়ার ব্যাপারে
মদীনাবাসীর বক্তব্য হলো, নারীদের উপর ঈদগাহে যাওয়া আবশ্যক মর্মে আমাদের নিকট কোনো বর্ণনা পৌঁছেনি। (কিতাবুল হুজ্জাহ আলা আহলিল মাদীনা: ১/৩০৬)
বরং, নারীদের ঘরে অবস্থানের নির্দেশই মূল। অতএব, পারিপার্শ্বিক কোনো কারণে নারীদের মসজিদে আসার দ্বারা যদি শরীয়তের অন্য কোনো বিধান লঙ্ঘন হয়, সেক্ষেত্রে অন্য কারণকে প্রাধান্য দিয়ে নারীদের মসজিদে আসতে বারণ করা হবে। আয়িশা রা. এর বক্তব্য থেকে এমনটাই অনুমিত হয়।
বুখারী শরীফের ব্যাখ্যাকার আল্লামা যারক্বানী রহ. বলেন:
واستنبط من قول عائشة أيضا: أنه يحدث للناس فتاوى بقدر ما أحدثوا كما قال مالك
‘আয়েশা রা. এর বক্তব্য থেকে এই মূলনীতি উৎসারিত হয় যে, মানুষের কর্মকাণ্ড অনুসারে তাদের জন্য ফাতাওয়া দেওয়া হবে। ইমাম মালিক রহ. এর বক্তব্য এমনই। (শরহুয যারক্বানী: ১/৬৭৬)
বলাবাহুল্য, যুগের হাওয়ায় নারীদের জন্য নিজঘরের পরিবেশই দিনদিন অনিরাপদ হয়ে যাচ্ছে, বাইরের পরিবেশ তো বিষতুল্য।
২। নবীযুগে নারীগণ বের হতেন কোনো ধরণের সাজসজ্জা ছাড়া, পুরোনো মলিন পোষাকে; যাতে ভিন্ন পুরুষ তাদের প্রতি আকৃষ্ট না হন। যদি পরিবেশ এমন হয়ে যায়, যার ফলে নারী-পুরুষ মেলামেশা সহজ হয়ে যায় কিংবা নারীদের বের হওয়ার দ্বারা ফিৎনা হওয়ার আশঙ্কা থাকে তাহলে বের হওয়া নিষেধ।
لا تمنعوا إماء الله مساجد الله ولكن ليخرجن وهن تفلات
অর্থাৎ, তোমরা আল্লাহর বান্দীদের মসজিদে যেতে বাধা দিও না। তবে তারা বের হবে খুশবু ছাড়া। (আবূ দাউদ:৫৬৫)
এই হাদীসের আরেক বর্ণনায় মসজিদে গমনের অনুমতি শুধু রাতে দেওয়া হয়েছে (আবূ দাউদ: ৫৬৭)। যার উদ্দেশ্য ছিল, মসজিদে গমনরতা নারীরা যেন (পর্দাবৃত অবস্থায়ও) পুরুষের চোখে না পড়ে। (আল মুনতাক্বা, কুরতুবী ১/৩৪২) বলাবাহুল্য, বর্তমানে বিজ্ঞানের উন্নতির কল্যাণে রাতদিন সমান।
উল্লেখিত হাদীসের ব্যাখ্যায় মোল্লা আলী ক্বারী রহ. ইবনে হাজার মক্কী রহ. এর বক্তব্য নকল করেছেন:
قال ابن حجر: وقضية كلام النووي في تحقيقه، والزركشي في أحكام المساجد، أنه حيث كان في خروجهن اختلاط بالرجال في المسجد، أو طريقه، أو قويت خشية الفتنة عليهن لتزينهن وتبرجهن حرم عليهن الخروج، وعلى الحليل الإذن لهن، ووجب على الإمام أو نائبه منعهن من ذلك
অর্থাৎ, ‘যেখানে নারীদের মসজিদে গমনের দ্বারা মসজিদে অথবা গমনের পথে নারী-পুরুষ মেলামেশা হয় অথবা যেখানে মহিলাদের সাজসজ্জা ও সুগন্ধি ব্যবহার দ্বারা ফিৎনা সৃষ্টির প্রবল সম্ভবনা রয়েছে সেখানে নারীদের মসজিদে যাওয়া হারাম, স্বামীর জন্য অনুমতি প্রদানও হারাম এবং
শাসকদের জন্য নারীদের এ থেকে বাধা প্রদান করা আবশ্যক।’
এরপর মোল্লা আলী ক্বারী রহ. ইবনে মাস‘উদ রা. এর এক বর্ণনা নকল করেছেন:
عن ابن مسعود: نهى النساء عن الخروج إلا عجوزا في منقلها
অর্থাৎ, নারীদের মসজিদে গমন নিষেধ; শুধুমাত্র বৃদ্ধাগণ পুরাতন কাপড় পরে বের হতে পারবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ: ৩/৮৩৬)
উপমহাদেশের বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফকীহ খলীল আহমাদ সাহারানপুরী রহ. বৃদ্ধাদের মসজিদে গমনের অনুমতি সংক্রান্ত ইমাম আবূ হানীফা রহ. এর বক্তব্য নকল করার পর লিখেছেন:
والفتوى اليوم على الكراهة في الصلوات كلها لظهور الفساد
অর্থাৎ, বর্তমানে ফাতাওয়া হলো, ফিৎনার সয়লাবের কারণে (সকল নারীদের জন্য) সবধরণের নামাযে মসজিদে যাওয়া মাকরূহ। (বযলুল মাজহুদ: ৩/৪১৬)
বুখারী শরীফের ব্যাখ্যাকার ইবনে বাত্তাল রহ. বলেন:
وذلك محمول على الأصول إذا لم يخف الفتنة عليها ولا بها؛ لأنه كان الأغلب من حال أهل ذلك الزمان، وأما حديث عائشة ففيه دليل لا ينبغى للنساء أن يخرجن إلى المساجد إذا حدث فى الناس الفساد
‘নারীদের অনুমতি প্রদানের বিষয়টি নারীদের কারণে কোনো ফিৎনা না হওয়ার উপর নির্ভরশীল। কেননা, সে যুগের সাধারণ পরিস্থিতি ছিল এমন। আর আয়েশা রা. এর বক্তব্য একথার দলিল যে, সমাজে ফিৎনা ছড়িয়ে পড়লে নারীদের জন্য মসজিদে যাওয়া উচিত নয়। (শরহে ইবনে বাত্তাল: ২/৪৭০)
শরহু মুখতাসারি সহীহিল বুখারী কিতাবের ভাষ্য:
ويستفاد منه ما يأتي: أولاً: أنه يستحب لولي المرأة من زوج أو غير إذا استأذنته في الخروج إلى المسجد أن يأذن لها، لقوله صلى الله عليه وسلم في حديث الباب ” فأذنوا لهن “. والأمر للندب كما قال البيهقي، ولكن ذلك مندوب إذا أمِنَ الفتنة. أما إذا خشي فتنةً أو وقوع مفسدة، فلا يأذن لها، لأن درأ المفاسد مقدم على جلب المصالح
…নারীদের বের হতে দেওয়ার আদেশ বায়হাক্বী রহ. এর বক্তব্য অনুযায়ী মুস্তাহাব (অর্থাৎ, গৃহকর্তা চাইলে তাকে বের হতে বাধাও দিতে পারে)। কিন্তু এটা ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ ফিৎনার আশঙ্কা না হচ্ছে। যদি ফিৎনা বা ফাসাদের আশঙ্কা হয় তাহলে অনুমতি দেবে না। কারণ, ‘শিষ্টের প্রতিপালন অপেক্ষা দুষ্টের দমন অগ্রগণ্য।’(শরহু মুখতাসারি সহীহিল বুখারী ২/২২৭)
এযুগে নারীদের উন্নাসিক চালচলন যে সীমা ছাড়িয়েছে -একথা অস্বীকার করার লোক বোধহয় একজনও পাওয়া যাবে না। ফলশ্রুতিতে উলূল আমর ফক্বীহগণ নারীদের জামা‘আতে অংশগ্রহণ করতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। হ্যাঁ, কেউ যদি নবীযুগের বেশভূষায় বের হওয়ার সদিচ্ছা রাখে সেক্ষেত্রে তার ব্যপারে আলিমগণ ফয়সালা করবেন- তবে ফাতাওয়া কখনও ব্যক্তিবিশেষের প্রতি লক্ষ করে দেওয়া হয় না; সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেই আলিমগণ ফাতাওয়া দিয়ে থাকেন।
উল্লেখ্য, নবীযুগের বেশভূষায় যদি কেউ বের হয়, এবং এর বৈধতার দাবি করে, তাহলে নবীযুগের পরিবেশ বিদ্যমান আছে এমন এলাকায় তার অবস্থান হতে হবে। বলাবাহুল্য, সাহাবাযুগের শেষদিকেই এমন পরিবেশ
ছিল না; চৌদ্দশ বছর পরে এসে এযুগে নবীযুগের পরিবেশ বজায় আছে-এমন দাবি বাতুলতা।
৩। নবীযুগে নবীজী সা: এর সাহচর্যের সৌভাগ্য লাভ ও মাসআলা মাসায়েল জানার প্রয়োজনে নারীগণ নবীজী সা: এর দরবারে হাজির হতেন। নবী পরবর্তীযুগে ইলমের প্রসার ঘটার কারণে এই প্রয়োজনীতা আর বাকি থাকেনি। এখন নারীদের প্রয়োজনীয় ইলম শিক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব তার বাবার, পরবর্তীতে তার স্বামীর।
৪। নবীযুগে নারীরা ঈদগাহে যেতেন মুসলমানদের সংখ্যাধিক্য দেখিয়ে কাফেরদের মাঝে ভীতির সঞ্চার করতে।
وروى أبو يوسف عن أبي حنيفة: أن خروجهن لتكثير السواد يقمن في ناحية ولا يصلين لأنه قد صح أن النبي صلى الله عليه وسلم: مر الحيض بذلك فإنهن لسن من أهل الصلاة
ইমাম আবূ ইউসুফ রহ. আবূ হানীফা রহ. থেকে বর্ণনা করেন: ‘নারীদের ঈদগাহে গমন ছিল মুসলমানদের জামা‘আতকে ভারী করার জন্য। তারা নামায আদায়ের উদ্দেশ্যে যেতেন না, কারণ, নবীজী সা: থেকে বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণনা আছে যে, হায়েযা নারীগণও ঈদগাহে যাবে। আর হায়েযা নারীগণের জন্য নামায আদায়ের বিধান নেই। (উমদাতুল ক্বারী: ৬/১৫৬)
ইমাম ত্বহাবী রহ. বলেন:
وروت أم عطية كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يخرج الحيض وذوات الخدور يوم العيد فيعتزلن الحيض ويشهدن دعوة المسلمين فقالت امرأة فإن لم يكن لأحدنا جلباب قال فلتعرها أختها جلبابا. قال أبو جعفر ويحتمل أن يكون ذلك والمسلمون قليل فأراد التكثير بحضورهن إرهابا للعدو واليوم فلا يحتاج إلى ذلك
‘অর্থাৎ, উম্মে আতিয়্যা রা. বর্ণনা করেন, নবীজী সা: হায়েযা নারী এবং যাদের উপর পর্দা ফরয (অর্থাৎ, বালেগা) তাদেরকে ঈদের দিন বের হতে আদেশ করতেন। হায়েযা নারীগণ জামা‘আত থেকে পৃথক থাকতেন; নামায শেষে অন্যদের সাথে দু‘আয় শরীক হতেন……আবূ জা‘ফর ত্বহাবী রহ. বলেন, সম্ভাবনা আছে যে, মুসলমানদের সংখ্যাস্বল্পতার কারণে নবীজী সা: নারীদের উপস্থিতি দ্বারা সংখ্যাবৃদ্ধি করত: শত্রুদের মাঝে ভীতির সঞ্চার করতে চেয়েছেন। বর্তমানে (হিজরী তৃতীয় শতাব্দীতে) এই প্রয়োজন নেই। (মুখতাসারু ইখতিলাফিল উলামা ১/২৩২, ১৭১)
সারকথা হলো, বিভিন্ন কারণে নবীযুগে নারীদের মসজিদে এবং ঈদগাহে আসার অনুমতি ছিল এবং নবীজী সা: এর উপস্থিতির কারণে ফিৎনার আশঙ্কাও ছিল না; তবুও এ থেকে তাদের অনুৎসাহিত করা হয়েছে। ফলত; নারী সাহাবীয়্যাহগণ সাধারণত ঘরেই নামায পড়তেন, যার প্রমাণ আমরা উপরে উল্লেখ করেছি।
পরবর্তীতে যুগের পরিবর্তনের সাথে ফিৎনার ক্রমবর্ধমান সয়লাবের কারণে উলূল আমর ফকীহগণ (নবী-পরবর্তীযুগে সাহাবায়ে কেরাম, তারপর তাবে‘ঈন-তাবে তাবে‘ঈন, আইম্মায়ে মুজতাহিদীন, সবশেষে মুতাআখ্খিরীন ফক্বীহগণের জামা‘আত) তাদের ফাতাওয়া পরিবর্তন করেছেন এবং নারীদের মসজিদ ও ঈদগাহে যাওয়া থেকে বিরত রেখেছেন।
উপমহাদেশে প্রচলিত ফিক্বহে হানাফীতেও নারীদের মসজিদ ও ঈদগাহে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। ইমাম আবূ হানীফা রহ. যদিও বৃদ্ধাদের মসজিদে যেতে অনুমতি দিয়েছেন; কিন্তু ফিৎনার সয়লাবের কারণে বর্তমানে বৃদ্ধাদেরকেও মসজিদে যেতে নিষেধ করা হয়।
আল্লামা যফর আহমাদ উসমানী রহ. এর বক্তব্য:
واختار المتأخرون كراهة خروج العجائز أيضا ليلا كان أو نهارا لفساد الزمان…
অর্থাৎ,‘ মুতাআখ্্খিরীন ফক্বীহগণ বর্তমান যুগে ফিৎনার কারণে
বৃদ্ধানারীদের মসজিদে গমনকেও মাকরূহ বলেছেন- চাই রাতে হোক কিংবা দিনে।’(ই‘লাউস সুনান: ৪/২৬১)
প্রশ্ন হতে পারে, এযুগে তো নারীরা শর‘ঈ কোনো প্রয়োজন ছাড়াই বাড়ির বাইরে বের হচ্ছে। সেক্ষেত্রে তাদের মসজিদে যাওয়ার অনুমতি দিলে কি অসুবিধা?
অসুবিধা হলো, যারা শরয়ী প্রয়োজন ছাড়া বাড়ির বাইরে বের হয়, তারাও এই বের হওয়াকে ভালো মনে করে না। কিন্তু যদি নারীদের মসজিদে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয় তাহলে যারা ঘরে থেকে অভ্যস্ত তারাও ধর্মের নামে বাইরে বের হতে অভ্যস্ত হবে এবং চরিত্রভ্রষ্টা নারীরা অনর্থক বাইরে বের হওয়ার একটা অজুহাত পেয়ে যাবে। ইসলাম বিরোধী গোষ্ঠী ধর্মের আবরণে ফিৎনা ছড়ানোর সুযোগ পেয়ে যাবে।
আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে উলামায়ে কেরামের সাথে থেকে বিশুদ্ধ মত ও পথে চলার তাওফীক দান করুন, আমীন।

মাওলানা উবাইদুল্লাহ সাকিব
মুদাররিস, জামি‘আতুল আবরার আল-ইসলামিয়া টাঙ্গাইল।

Share: