হিজরতের পরিচয় ও মর্ম
হিজরত ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। হিজরত শব্দটির একটি সাধারণ অর্থ এবং একটি পারিভাষিক অর্থ রয়েছে। হিজরতের সাধারণ অথর্, আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কোন স্থান, বস্তু বা ব্যক্তিকে পরিত্যাগ করা, তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া। এই অর্থটি ব্যাপক। এই ব্যাপক অর্থেই নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন— (অর্থ:) ‘প্রকৃত মুহাজির সেই ব্যক্তি যে আল্লাহর বারণকৃত বস্তুকে পরিত্যাগ করে।’ [সহীহ বুখারী; হাদীস ১০]
অপর এক হাদীসে এসেছে— ‘নবীজীকে প্রশ্ন করা হলো, কোন হিজরত উত্তম? তিনি বললেন, তোমার রব্বের অপছন্দনীয় বস্তু ছেড়ে দেয়া।’ [মুসনাদে আহমাদ; হাদীস ৬৪৮৭] জ্ঞানার্জন, দাওয়াত-তাবলীগ ও জিহাদের জন্য নিজ দেশ ছেড়ে অন্যত্র সফর করাও হিজরতের এই ব্যাপক ও সাধারণ অর্থের অন্তর্ভুক্ত। পরিভাষায় হিজরত অর্থ হলো, স্বীয় দ্বীন ও ঈমানের সুরক্ষা এবং নির্ভয়ে প্রশান্ত চিত্তে আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন হওয়ার জন্য আল্লাহ ও তার রাসূলের সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে দারুল হরব বা দারুল খাওফ অর্থাৎ কুফরী ভূখণ্ড বা অনিরাপদ ভূখণ্ড ত্যাগ করে দারুল ইসলাম বা দারুল আম্ন অর্থাৎ ইসলামী ভূখণ্ড বা নিরাপদ ভূখণ্ডে গমন করা।
পরিভাষিক হিজরত সব সময়ের আমল নয়। বরং তার সময় ও ক্ষেত্র সবই নির্ধারিত। শরীয়তে হিজরতের জন্য সুনির্ধারিত শর্তাদি ও বিধানের আলোকে যদি কোথাও হিজরতের পরিবেশ সৃষ্টি হয়, তবে তা সাধারণ অবস্থায় সুন্নত। যেমন সাহাবায়ে কেরামের হাবশায় হিজরত, নবীজীর মদীনায় আগমনের পূর্বে সাহাবায়ে কেরামের মদীনায় হিজরত। আবার ক্ষেত্রবিশেষে হিজরত ফরযে আইনও হয়ে দাঁড়ায়। যেমন নবীজীর মদীনায় হিজরতের পর মক্কা বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত মক্কার সকল মুসলমানের জন্য মদীনায় হিজরত করা ফরয হয়ে গিয়েছিল। সামর্থ্যবান হওয়া সত্ত্বেও যারা এই হিজরত থেকে বিরত থেকেছে তাদের জন্য ঘোষণা করা হয়েছে ভয়াবহ শাস্তির বিধান।
সুকঠিন আমল হিজরত
মা-বাবা, স্ত্রী-সন্তান, ভাই-বোন ও আত্মীয়স্বজন পরিত্যাগ করে, তিলেতিলে গড়ে তোলা ভিটেবাড়ির মায়া ছেড়ে, শৈশব-কৈশোরের হাজারো স্মৃতিবিজড়িত জন্মভূমি পেছনে ফেলে চিরদিনের জন্য অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়ানো সহজ কথা নয়। আমল তো পরের কথা, ভাবলেও নিঃশ্বাস ভারি হয়ে ওঠে। কেবল পাক্কা ও মজবুত ঈমানদারের পক্ষেই হিজরতের মহান বিধান পালন করা সম্ভব। সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন উম্মতের প্রথম সারির ঈমানদার। ঈমানের দাবীর সামনে তারা নিজেদের প্রাণ পর্যন্ত বিসর্জন দেয়ার জন্য সদাপ্রস্তুত থাকতেন। এজন্যই তাদের দ্বারা হিজরতের বিধান পালন করা সম্ভব হয়েছে।
হিজরতের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য
সাহাবায়ে কেরাম প্রতিপক্ষের বাহ্যিক ও শারীরিক জুলুম-নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে মক্কা হতে পলায়ন করেছেন বিষয়টি এমন নয়। পলায়নপরতা সাহাবায়ে কেরামের প্রকৃতিবিরুদ্ধ। দ্বীনের জন্য নিজেদের জান-মাল কুরবান করে দেয়াকে তারা পরম সৌভাগ্য মনে করতেন। সারাটা জীবন তারা এর অগণিত প্রমাণও পেশ করেছেন। বস্তুত যতদিন পর্যন্ত হিজরতের বিধান ঐচ্ছিক ও সুন্নত ছিল, সাহাবায়ে কেরাম নিম্নলিখিত উদ্দেশে হিজরত করেছেন—
(ক) নির্যাতিত সাহাবায়ে কেরামের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পেরেশানী ও দুঃচিন্তা হালকা করা।
(খ) দ্বীন ও ঈমানের লুটেরা-ডাকুদের হাত থেকে নিজেদের দ্বীন ও ঈমান হেফাজত করা।
(গ) হিজরতের ভূ-খণ্ডে ইসলাম ও ইলমে দ্বীনের প্রচার-প্রসার ঘটানো।
(ঘ) কুরআন-সুন্নাহয় বর্ণিত হিজরতের ঈর্ষণীয় ফযীলত অর্জন করা।
অতঃপর যখন থেকে হিজরত ফরয করা হলো এবং হিজরতকে ঈমানের প্রধানতম আলামত নির্ধারণ করা হলো, সাহাবায়ে কেরাম উল্লিখিত চারটির সঙ্গে আরো দু’টি উদ্দেশ্যে হিজরত করেছেন।
(ঙ) আল্লাহ ও তার রাসূলের আহ্বানে স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া দান।
(চ) ঈমানের অগ্নিপরীক্ষায় কামিয়াবী ও সাফল্য অর্জন।
হিজরতের ফযীলত ও সাওয়াব
আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন—
(ক) ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে হিজরত করবে, সে যমীনে বহু প্রশস্ত জায়গা ও প্রশস্ততা পাবে। আর যে ব্যক্তি নিজ গৃহ থেকে আল্লাহ ও তার রাসূলের দিকে হিজরত করার জন্য বের হয়, অতঃপর তার মৃত্যু এসে পড়ে, তারও সাওয়াব আল্লাহর কাছে স্থিরীকৃত রয়েছে। আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ [সূরা নিসা-১০০]
(খ) ‘যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে আর যারা (তাদেরকে) আশ্রয় দিয়েছে ও (তাদের) সাহায্য করেছে, তারাই প্রকৃত মুমিন। তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও (জান্নাতের) সম্মানজনক রিযিক।’ [সূরা আনফাল-৭৪]
(গ) ‘যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে এবং নিজেদের জান-মাল দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে, তারা আল্লাহর কাছে মর্যাদায় অনেক শ্রেষ্ঠ এবং তারাই সফলকাম। তাদের প্রতিপালক তাদেরকে নিজের পক্ষ থেকে রহমত, সন্তুষ্টি ও এমন উদ্যানসমূহের সুসংবাদ দিচ্ছেন, যার ভেতর তাদের জন্য রয়েছে স্থায়ী নেয়ামত। তারা তাতে সর্বদা থাকবে। নিশ্চয়ই আল্লাহরই কাছে রয়েছে মহাপ্রতিদান।’ [সূরা তাওবা-২০-২২]
(ঘ) ‘যারা ঈমান এনেছে, যারা হিজরত করেছে এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে, নিঃসন্দেহে তারা আল্লাহর রহমতের আশাবাদী। আর আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ [সূরা বাকারা-২১৮]
হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে-
(ঙ) ‘হিজরত পূর্বে কৃত সকল গোনাহ মিটিয়ে দেয়।’ [সহীহ মুসলিম; হাদীস ১২১]
(চ) ‘হিজরতের ব্যাপারটি না ঘটলে আমি একজন আনছার হতাম।’ [সহীহ বুখারী; হাদীস ৩৭৭৯]
(ছ) ‘যে ব্যক্তি আমার প্রতি ঈমান আনল, আনুগত্য প্রদর্শন করল এবং হিজরত করল আমি তার জন্য জান্নাতের উপকণ্ঠে একটি বাড়ি এবং জান্নাতের মধ্যভাগে একটি বাড়ি পাইয়ে দেওয়ার যিম্মাদার হলাম।’ [মুসনাদে আহমাদ; হাদীস ৩১৩৩]
(জ) ‘হযরত আবূ ফাতিমা রাযি. নবীজীকে আরজ করেন ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে একটি আমলের কথা বলে দিন, যার উপর আমি অটল থাকবো এবং আমল করব। নবীজী বলেন, তুমি হিজরত করো; এর সমতুল্য কোন আমল নেই।’ [সুনানে নাসায়ী; হাদীস ৪১৬৭]
(ঞ) ‘হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রাযি. হতে বর্ণিত, নবীজী আমাকে বললেন, জানো! আমার উম্মতের মধ্যে সর্বপ্রথম কোন দলটি জান্নাতে প্রবেশ করবে? তিনি বললেন, আল্লাহ ও তার রাসূলই অধিক অবগত। নবীজী বললেন, মুহাজিরগণ। তারা কিয়ামতের দিন জান্নাতের দরজায় আসবে এবং জান্নাতের দরজা খুলতে বলবে। দ্বাররক্ষী তাদেরকে বলবে, তোমাদের হিসাব-নিকাশ হয়ে গেছে? তারা বলবে, কোন্ জিনিসের হিসাব?! আল্লাহর পথে আমাদের তরবারী সর্বদাই আমাদের গলায় ঝুলানো ছিল। আর এভাবেই আমাদের মৃত্যু এসে গেছে। নবীজী বলেন, অতঃপর তাদের জন্য দরজা খুলে দেয়া হবে। অন্যান্য লোকজন জান্নাতে দাখিল হওয়ার ৪০ বছর আগ থেকেই তারা সেখানে বিশ্রাম করতে থাকবে।’ [আল-মুসতাদরাক আলাস সহীহাইন লিল-হাকেম; হাদীস ২৩৮৯]
হিজরতের ঐচ্ছিক নির্দেশ ও সাহাবায়ে কেরাম
আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন—
(অর্থ:) ‘হে আমার মুমিন বান্দাগণ! অন্তরে তোমাদের প্রতিপালকের ভয় রাখো। যারা এ দুনিয়াতে ভালো কাজ করে তাদের জন্য রয়েছে কল্যাণ। আর আল্লাহর যমীন প্রশস্ত। যারা সবর অবলম্বন করে তাদেরকে তাদের সাওয়াব দেওয়া হবে অপরিমিত।’ [সূরা যুমার-১০]
এ আয়াতে ইশারা করা হয়েছে, নিজ দেশে দ্বীনের উপর চলা সম্ভব না হলে অথবা অত্যন্ত কঠিন হলে হিজরত করে এমন স্থানে চলে যাও, যেখানে দ্বীনের উপর চলা সহজ হবে। আর দেশত্যাগ করতে যদি কষ্ট হয় তবে সবর কর। কেননা সবর করলে অপরিমিত সাওয়াব পাবে। (তাওযীহুল কুরআন)এ সময় পরিস্থিতি বিবেচনায় কেউ দ্বীন ও নিজের জন্য অধিকতর উপযোগী মনে করলে হিজরত করতেন, আর কেউ হিজরত না করা অধিকতর উপযোগী মনে করলে নবীজীর সোহবতে থেকে যেতেন। এজন্যই দেখা গেছে, হযরত বেলাল, আম্মার প্রমুখ সাহাবায়ে কেরাম কুরাইশী নির্যাতনের প্রধান লক্ষবস্তু হয়েও হিজরত করেননি। আবার হযরত উসমান ইবনে আফফান ও আব্দুর রহমান ইবনে আওফের মতো ধনী ব্যক্তিবর্গ যারা শারিরীকভাবে তেমন নির্যাতনের সম্মুখীন হননি তারাও হিজরত করেছেন। এ সময় সাহাবায়ে কেরাম হাবশা অভিমুখে দু’বার হিজরত করেন।
হাবশায় প্রথম হিজরত:
ইসলাম গ্রহণকারীদের উপর কুরাইশ কাফেরদের অত্যাচার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছিল। সাধারণ মুসলমানদের পাশাপাশি সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিবর্গের প্রতিও অত্যাচারের হাত সম্প্রসারিত হচ্ছিল। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষেও তাদেরকে সুরক্ষা দেয়া সম্ভব হচ্ছিল না। এমন নাজুক পরিস্থিতিতে তিনি সাহাবায়ে কেরামকে হিজরত করার অনুমতি দিলেন। বললেন, ‘তোমরা আল্লাহর যমীনে ছড়িয়ে পড়ো, আল্লাহ শীঘ্রই তোমাদেরকে একত্র করে দিবেন। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, আমরা কোথায় যেতে পারি? নবীজী হাতের দ্বারা হাবশার দিকে ইশারা করলেন।’ [সীরাতে মুস্তাফা ১/২৪০] নবীজী আরও বললেন, ‘সেখানকার বাদশাহর কারণে কেউ কারও প্রতি অত্যাচার করতে পারে না। তোমরা তার এলাকায় চলে যাও, যতক্ষণ না আল্লাহ তোমাদেরকে বর্তমান দুর্দিন থেকে পরিত্রাণ দিয়ে সুদিন ফিরিয়ে দেন।’ [হায়াতুস সাহাবা ১/৩৭১ মাকতাবাতুল হরম]
নবীজীর পক্ষ হতে ইঙ্গিত পেয়ে নবুওয়াতের ৫ম বর্ষে সাহাবায়ে কেরামের একটি কাফেলা জেদ্দা উপকূল থেকে সাগরপথে হাবশায় হিজরত করলেন। এ কাফেলায় ১০/১১ জন পুরুষ ও ৫ জন মহিলা শামিল ছিলেন।
পুরুষগণ ছিলেন হযরত উসমান ইবনে আফফান, আবূ হুযাইফা ইবনে উতবা, যুবাইর ইবনুল আওয়াম, মুসআব ইবনে উমায়ের, আব্দুর রহমান ইবনে আওফ, আবূ সালামা ইবনে আব্দুল আসাদ মাখযূমী, উসমান ইবনে মাযঊন জাহমী, আমের ইবনে রবীআ, আবূ সাবরা ইবনে আবূ রুহাম, আবূ হাতেব ইবনে আমর, সুহাইল ইবনে বাইযা রাযিআল্লাহু আনহুম।
এ আয়াত দ্বারা বোঝা যায়, শুরুতে হিজরতের বিধানটি ছিল সুন্নাত ও ঐচ্ছিক। অর্থাৎ নিজেদের অবস্থা বিবেচনায় সাহাবায়ে কেরামের হিজরত করা বা না করার ইচ্ছাধিকার ছিল। মহিলাগণ ছিলেন নবীকন্যা রুকাইয়া, সাহলা বিনতে সুহাইল, উম্মে সালামা বিনতে আবূ উমাইয়া, লাইলা বিনতে আবূ হাশমা, উম্মে কুলসুম বিনতে সুহাইল ইবেন উমর রাযিআল্লাহু আনহুন্না; এঁরা তাদের স্বামীদের সঙ্গে হিজরত করেছিলেন।
সাহাবায়ে কেরামগণ কেউ সওয়ার হয়ে আর কেউ পায়দল অতি সংগোপনে রওয়ানা হয়েছিলেন। সৌভাগ্যক্রমে যখন তারা বন্দরে পৌঁছেন, হাবশাগামী একটি বাণিজ্যিক জাহাজ বন্দর ত্যাগের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। পাঁচ দেরহাম ভাড়া চুকিয়ে তারা জাহাযে আরোহন করলেন। টের পেয়ে কুরাইশরা তাদের পশ্চাদ্ধাবনে লোক পাঠাল। কিন্তু এরা বন্দরে পৌঁছার আগেই জাহাজ রওয়ানা হয়ে গিয়েছিল। [সীরাতুন্নবী, সীরাতে মুস্তাফা]
সাহাবায়ে কেরামের এ কাফেলাটি রজব মাস থেকে নিয়ে শাওয়াল পর্যন্ত হাবশায় অবস্থান করেছেন। ‘মক্কাবাসী মুসলমান হয়ে গেছে’, এমন একটা সংবাদের ভিত্তিতে তারা শাওয়াল মাসে হাবশা থেকে ফিরে আসেন। মক্কার কাছাকাছি পৌঁছে বুঝতে পারেন, সংবাদটি ভুল ছিল। অগত্যা কেউ চুপিসারে আর কেউ আর কেউ অন্যের মধ্যস্থতায় মক্কায় ফিরে আসেন।
হাবশায় দ্বিতীয় হিজরত
উল্লিখিত সাহাবায়ে কেরাম হাবশা থেকে মক্কায় প্রত্যাবর্তনের পর মুশরিকদের অত্যাচারের মাত্রা আরও বেড়ে গেল। একপর্যায়ে হযরত জাফর ইবনে আবূ তালিব রাযি. আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদেরকে এমন কোন ভূখণ্ডে চলে যাওয়ার অনুমতি দিন যেখানে নির্ভয়ে আল্লাহর ইবাদত করতে পারব! (তাবারানী, মুসনাদে বাযযার) নবীজী অনুমতি দিলেন। এবার হযরত জাফর রাযি.-এর সঙ্গে বড় একটি কাফেলা হাবশায় হিজরত করেন। এ কাফেলায় ৮৩ জন পুরুষ ও ১৮ জন মহিলা শামিল ছিলেন। তাদেরকে ফিরিয়ে এনে শায়েস্তা করার জন্য কুরাইশরা হাবশার বাদশাহর নিকট প্রতিনিধিদল প্রেরণ করে। কিন্তু উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার পর বাদশাহর নিকট সত্য স্পষ্ট হয়ে যায় এবং তিনি মুসলমানদেরকে ফেরৎ দিতে অস্বীকার করেন এবং মুহাজিরদের সঙ্গে অত্যন্ত সৌজন্যমূলক আচরণ করেন। মুহাজিরগণ হাবশায় অবস্থানকালীন পার্শ্ববর্তী এলাকার সঙ্গে হাবশার বাদশাহ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। মুসলমানগণ বাদশার পক্ষ নিয়ে এই যুদ্ধে শরীক হয়ে -নিজেদের বিশ্বস্ততার প্রমাণ পেশ করেন। এই মুহাজিরগণ নিরাপদ ভূখণ্ড হাবশায় নিজেদের দ্বীন-ধর্ম পালনের পাশাপাশি অন্যান্যদের নিকটও ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরেন। ফলে একপর্যায়ে স্বয়ং হাবশার বাদশাহও ইসলাম গ্রহণ করেন। এই কাফেলার সর্বশেষ ও প্রধান অংশটি দীর্ঘ পনেরো বছর পর ৭ম হিজরীতে খায়বার বিজয়ের সময় মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন।
হিজরতের আবশ্যিক নির্দেশ এবং সাহাবায়ে কেরামের মদীনায় হিজরত
আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন—
(অর্থ:) ‘নিজ সত্তার উপর জুলুমরত থাকা অবস্থায়ই ফেরেশতাগণ যাদের রূহ কব্জা করার জন্য আসে, (তাদেরকে লক্ষ্য করে) তারা বলে, তোমরা কী অবস্থায় ছিলে? তারা বলে, যমীনে আমাদেরকে অসহায় করে রাখা হয়েছিল। ফেরেশতাগণ বলে, আল্লাহর যমীন কি প্রশস্ত ছিল না যে, তোমরা তাতে হিজরত করতে? সুতরাং এরূপ লোকদের ঠিকানা জাহান্নাম এবং তা অতি মন্দ পরিণতি! তবে সেই সকল অসহায় নর, নারী ও শিশু (এই পরিণতি হতে) ব্যতিক্রম, যারা (হিজরতের) কোনও উপায় অবলম্বন করতে পারে না এবং (বের হওয়ার) কোনও পথ পায় না। তাদের ব্যাপারে পূর্ণ আশা রয়েছে যে, আল্লাহ তাদের ক্ষমা করবেন। আল্লাহ বড় পাপমোচনকারী, অতি ক্ষমাশীল।’ (সূরা নিসা-৯৭-৯৯)
‘নিজ সত্তার উপর জুলুম করা’ কুরআনে কারীমের একটি পরিভাষা। এর অর্থ, কোনো গোনাহে লিপ্ত হওয়া। বস্তুত গোনাহ করার দ্বারা মানুষ নিজ সত্তারই ক্ষতি করে থাকে। এ আয়াতে নিজ সত্তার উপর জুলুমকারী বলে সেই সকল লোককে বোঝানো হয়েছে, যারা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও মক্কা মুকাররমা থেকে মদীনা মুনাওয়ারায় হিজরত করেনি। মুসলিমদের উপর যখন হিজরতের হুকুম আসে তখন মক্কায় অবস্থানকারী মুসলিমদের জন্য মদীনায় হিজরত করা ফরয হয়ে গিয়েছিল; হিজরতকে তাদের ঈমানের অপরিহার্য দাবী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। কেউ সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও হিজরত না করলে তাকে মুসলিমই গণ্য করা হত না। এ রকমই কিছু লোকের কাছে যখন ফেরেশতাগণ প্রাণ-সংহারের জন্য এসেছিলেন, তখন কী কথোপকথন হয়েছিল এ আয়াতে সেটাই তুলে ধরা হয়েছে। হিজরতের হুকুম অমান্য করার কারণে তারা যেহেতু মুসলিমই থাকেনি, তাই তারা জাহান্নামী হবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।অবশ্য যারা কোনও অপারগতার কারণে হিজরত করতে পারে না, একই সঙ্গে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, ওজরের কারণে তাঁরা ক্ষমাযোগ্য। (তাওযীহুল কুরআন)
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে— (অর্থ:) ‘যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে এবং নিজেদের মাল ও জান দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে এবং যারা (তাদেরকে মদীনায়) আশ্রয় দিয়েছে ও (তাদের) সাহায্য করেছে, তারা পরস্পরে একে অন্যের অলি-ওয়ারিশ। আর যারা ঈমান এনেছে কিন্তু হিজরত করেনি, হিজরত না করা পর্যন্ত তাদের সঙ্গে তোমাদের উত্তরাধিকারের কোন সম্পর্ক নেই।’ (সূরা আনফাল-৭২)
মুহাজিরদের এমন কিছু আত্মীয়ও ছিল, যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিল বটে, কিন্তু মদীনা মুনাওয়ারায় হিজরত করেনি, তাদের সম্পর্কে এ আয়াত বিধান দিয়েছে যে, মুহাজির মুসলিমদের সঙ্গে তাদের উত্তরাধিকার প্রাপ্তির কোনও সূত্র নেই। তার এক কারণ তো এই যে, তখন মক্কা মুকাররমা থেকে হিজরত করা সকল মুসলিমের উপর ফরয ছিল। কিন্তু তারা হিজরত করে তখনও পর্যন্ত এ ফরয আদায় করেনি। (তাওযীহুল কুরআন)
উল্লিখিত আয়াতদ্বয় দ্বারা ফরয হিজরত বোঝানো হয়েছে। সাহাবায়ে কেরাম রাযি. যেভাবে ঐচ্ছিক ও সুন্নাত হিজরতে অংশগ্রহণ করেছিলেন তেমনিভাবে আবশ্যিক ও ফরয হিজরতেও স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহণ করেছিলেন। পুরুষ-মহিলা, ধনী-গরীব, সম্ভ্রান্ত ও সাধারণ সর্বশ্রেণীর সাহাবায়ে কেরাম হিজরতের এ সুকঠিন আদেশ দ্বিধাহীনচিত্তে পালন করেছিলেন। অবশ্য এক্ষেত্রে তারা পরিবেশ-পরিস্থিতি ও নিজেদের শক্তি-সামর্থ্য অনুপাতে ভিন্ন ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করেছিলেন। কেউ প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে দিনের বেলায় হিজরত করেছেন, কেউ গোপনে রাতের আঁধারে স্বদেশ ছেড়েছেন। কেউবা সঙ্গী-স্বজন ও সামানপত্রসহ রওয়ানা হয়েছেন, আবার কেউ নিঃসম্বল একাকী সফর করেছেন। প্রতিপক্ষও অবস্থাদৃষ্টে একেকজনের সঙ্গে একেক রকম আচরণ করেছে। কাউকে বাধা দেয়ার হিম্মতই করেনি, আবার কারও প্রতি অত্যাচারের কমতি রাখেনি। নিম্নে কয়েকজন বিশিষ্ট সাহাবীর হিজরতের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেয়া হলো—মুসআব ইবনে উমায়ের ও আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতূম রাযি.: নবুওয়াতের ১২তম বর্ষে আকাবার প্রথম বাই‘আত সংঘটিত হয়। এ সময় মদীনার ১২জন আনসারী নবীজীর হাতে বাই‘আত গ্রহণ করেন। তাদেরকে দ্বীন ও কুরআন শেখানোর জন্য হযরত মুসআব ইবনে উমায়ের রাযি. এবং অন্ধ সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতূম রাযি.-কে শিক্ষক ও মুবাল্লিগরূপে প্রেরণ করা হয়। এই দুজন ছিলেন সর্বপ্রথম মদীনায় হিজরতকারী। হযরত মুসআব ইবনে উমায়ের রাযি. ধনী পরিবারের সন্তান ছিলেন। তার পিতা তাকে শতশত দেরহাম মূল্যের কাপড় পরিধান করাতেন। ইসলাম গ্রহণের পর তাকে বিনাকাপড়ে ঘরছাড়া করে দেয়া হয়। মুহূর্তেই তিনি আমীর থেকে ফকীরী জীবনে পদার্পণ করেন। মদীনায় হিজরতের পর তার এক বছরের মেহনতে শতশত ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করে। যাদের মধ্যে আওস ও খাযরাজ গোত্রের অত্যন্ত প্রভাবশালী দুই নেতা সা’দ ইবনে মুয়ায ও উসাইদ ইবনে হুযাইরও ছিলেন। একই সময়ে হযরত সা’দ ইবনে মুআযের গোত্র বনু আশহালের সকলেই ইসলাম গ্রহণ করেন।
আবূ সালামা ও উম্মে সালামা রাযি.:
নবুওয়াতের ১৩তম বর্ষে আকাবার দ্বিতীয় বাইআতের পর থেকে সাহাবায়ে কেরাম ব্যাপকভাবে মদীনা অভিমুখে হিজরত শুরু করেন। সর্বপ্রথম হযরত আবূ সালামা রাযি. স্বীয় স্ত্রী উম্মে সালামা ও দুগ্ধপোষ্য সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে যাত্রা শুরু করেন। সংবাদ পেয়ে উম্মে সালামার গোত্রের লোকজন এসে বলল, তুমি যেখানে ইচ্ছা যাও, আমাদের মেয়েকে তোমার সঙ্গে যেতে দেবো না। তারা উম্মে সালামাকে সঙ্গে নিয়ে চলে গেল। ওদিকে আবূ সালামার গোত্রের লোকজন এসে বলল, তুমি যেথায় খুশি যাও, আমাদের বংশীয় শিশুকে তোমার সঙ্গে ছাড়ব না। তারাও সন্তানটিকে নিজেদের সঙ্গে নিয়ে গেল। ঈমানের বলে বলীয়ান আবূ সালামা রাযি. বুকে পাথর চাপা দিয়ে স্ত্রী-সন্তানকে রেখে একাকী রওয়ানা হয়ে গেলেন। এদিকে উম্মে সালামা স্বামী ও সন্তানের বিরহে কাতর হয়ে পড়লেন। যেস্থানে এই হৃদয় বিদারক ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল তিনি প্রতিদিন বিকেলে সেখানে গিয়ে স্বামী-সন্তানের জন্য কান্নাকাটি করতেন। কাফেরদের মুখে একটাই কথা ছিল— ইসলাম ছাড়ো, তবেই সন্তানের মুখ দেখতে পাবে।হযরত উম্মে সালামার অন্তরে সন্তানের চেয়েও ইসলামের দরদ বেশি ছিল। এজন্য তিনি তাদের কথায় বিলকুল কর্ণপাত করেননি। দীর্ঘ এক বছর পর তার এক চাচাতো ভাই দয়ার্দ্র হলেন। তিনি উভয় গোত্রকে অনুরোধ করে সন্তানসহ উম্মে সালামাকে ছেড়ে দিতে সম্মত করালেন। উম্মে সালামা এক আল্লাহর উপর ভরসা করে কোলের সন্তানসহ একাকী মদীনা অভিমুখে রওয়ানা হলেন। আল্লাহ তা‘আলাও তার প্রতি অত্যন্ত সদয় আচরণ করলেন। পথে উসমান ইবনে তালহা নামক জনৈক ব্যক্তির সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়। একজন নারীকে সন্তানসহ একাকী সফর করতে দেখে উসমান আশ্চর্যান্বিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার সঙ্গে কে আছে? হযরত উম্মে সালামা উত্তর দিলেন ‘আল্লাহ’। শুনে উসমানের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল। তিনি উম্মে সালামাকে সঙ্গে নিয়ে সসম্মানে মদীনায় পৌঁছে দিলেন।
সুহাইব রূমী রাযি.:
হযরত সুহাইব রূমী রাযি. মক্কায় ব্যবসা-বাণিজ্য করে প্রচুর ধন-সম্পদ উপার্জন করেছিলেন। তিনি মদীনায় যাচ্ছেন শুনে কুরাইশ নেতারা তার বাড়িতে গিয়ে বলল, তুমি তো আমাদের এলাকায় ব্যবসা করেই এই অঢেল সম্পদ উপার্জন করেছো, এখন এগুলো নিয়ে তোমাকে পালাতে দিচ্ছি না। যেতেই যদি হয় তাহলে সবকিছু রেখে খালিহাত যেতে হবে। সাহাবায়ে কেরাম দ্বীনের বিপরীতে ধন-সম্পদকে নেহায়েত তুচ্ছ জ্ঞান করতেন। হযরত সুহাইব রাযি. অবিচল কণ্ঠে ঘোষণা করলেন, আচ্ছা! তাহলে সবকিছুই পরিত্যাগ করেই চলে যাচ্ছি। এই বলে তিনি উটের পিঠে আরোহন করে মদীনা অভিমুখে রওয়ানা হলেন। মদীনায় পৌঁছার পর ঘটনা শুনে নবীজী বললেন— (দুনিয়ার বিনিময়ে আখেরাত খরিদ করার) এই ব্যবসায় তুমি বড়ই লাভবান হয়েছো।
উমর রাযি.:
হযরত উমর রাযি. যখন হিজরতের এরাদা করলেন, তখন সাথে তরবারী বেঁধে নিলেন। কাঁধে নিলেন ধনুক, তূণীর থেকে কিছু তীর বের করে হাতে নিলেন। কটিবদ্ধ করলেন তার লাঠি। অতঃপর কাবা-প্রাঙ্গণে এলেন। কাবার চারপাশে তখন বহু কুরাইশের সমাগম।তিনি বাইতুল্লাহর তাওয়াফ করে মাকামে ইবরাহীমে গিয়ে দু’ রাকাত নামায আদায় করলেন। অতঃপর মক্কার কাফেদের উদ্দেশে চিৎকার করে বললেন, ‘দুর্ভাগ্য তোমাদের! তেমাদের মধ্যে যে তার মায়ের বুক খালি করতে চায়, সন্তানকে বানাতে চায় ইয়াতীম কিংবা চায় স্বীয় স্ত্রীকে বিধবা বানাতে, সে যেন আসে! মক্কার ঐ প্রান্তরের পাদদেশে আমার মুখোমুখি হয়’। কিন্তু কেউই তার পশ্চাদ্ধাবন করতে এলো না। তিনি দৃপ্তপদে মদীনার পানে এগিয়ে চললেন। তখন তার সঙ্গে ছিল বিশজনেরও অধিক একটি কাফেলা।
আইয়াশ ও হিশাম রাযি.:
হযরত আইয়াশ ও হযরত হিশাম রাযি. হিজরত করার সময় কুরাইশদের হাতে ধরা পড়েন। কুরাইশরা উভয়কে বন্দী করে কারাগারে নিক্ষেপ করে। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় হিজরত করার পর একদিন সাহাবায়ে কেরামকে লক্ষ্য করে বলেন, তোমাদের মধ্যে কেউ কি আইয়াশ ও হিশামকে মক্কার বন্দীশালা থেকে মুক্ত করে আনতে পারে? ওলীদ ইবনে ওলীদ রাযি. বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি প্রস্তুত আছি। অতঃপর ওলীদ অতি সংগোপনে মক্কায় এসে আইয়াশ ও হিশামের খানা-পিনা সরবরাহকারী মহিলাকে কোনভাবে বশ করলেন। এরপর রাতের আঁধারে ঐ মহিলার সঙ্গে বন্দীশালায় প্রবেশ করে তাদেরকে মুক্ত করে মদীনায় নিয়ে আসলেন।
এভাবে ধীরে ধীরে নানা রকম নির্যাতন ও প্রতিকূলতা সহ্য করে বছর খানেকের মধ্যেই হিজরত করতে সক্ষম সকল সাহাবায়ে কেরাম মদীনায় চলে আসলেন। কেবল নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, হযরত আবূ বকর, হযরত আলী এবং হিজরতে অক্ষম মুষ্টিমেয় কিছু সাহাবী মক্কায় রয়ে গেলেন।
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আবূ বকর রাযি.:
নবীজীর প্রাণপ্রিয় সাহাবায়ে কেরামের অধিকাংশ মদীনার নিরাপদ ভূখণ্ডে হিজরত করলেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় কুরাইশ কাফেররা নবীজীকেই দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়ার দুরভিসন্ধি আঁটল। এবার স্বয়ং নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর তরফ থেকে হিজরতের নির্দেশ পেলেন। রাতের অন্ধকারে কাফেরদের বাছাইকৃত একদল খুনী নবীজীর পবিত্র গৃহ চারপাশ থেকে ঘেরাও করল।হযরত আলী রাযি. নবীজীর নিরাপদ হিজরতের স্বার্থে এবং নবীজীর উপর থেকে কাফেরদের নজর এড়ানোর জন্য নবীজীর চাদর মুড়ি দিয়ে তাঁরই বিছানায় শুয়ে পড়লেন। একজন নবীন কিশোর, যিন্দেগীর হাজারও আশা-আকাঙ্ক্ষা যাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে, সবকিছু উপেক্ষা করে নিজেকে মৃত্যুমুখে সঁপে দেয়ার জন্য আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি কী পরিমাণ মহব্বত এবং হিম্মতের প্রয়োজন, আমাদের কল্পনায় আসে না! এদিকে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাফেরদের চোখে ধূলো দিয়ে ঘর দিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। প্রিয়বন্ধু হযরত আবূ বকরকে সঙ্গে নিয়ে গারে সাওরে তিনদিন আত্মগোপনে রইলেন। দুর্গম পাথুরে পর্বতের কয়েক কিলোমিটার উঁচুতে অবস্থিত গুহায় তেপ্পান্ন ও পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সের দু’জন মানুষ কিভাবে রাতের অন্ধকারে পৌঁছে গিয়েছিলেন সেটা আজকের তরতাজা তরুণ-যুবকদেরও বিস্ময়ে হতবাক করে দেয়। তিনদিন পর খুঁজতে খুঁজতে শত্রুপক্ষ যখন নিরাশ হয়ে গেল তখন নবীজী ও হযরত আবূ বকর রাযি. অতি সন্তর্পণে শত্রুর নজর এড়িয়ে মদীনায় পৌঁছে গেলেন। নবীজীর হিজরত প্রসঙ্গে আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন— (অর্থ:) ‘হে নবী! সেই সময়কে স্মরণ করুন, যখন কাফেরগণ আপনাকে বন্দী করা অথবা আপনাকে হত্যা করা কিংবা আপনাকে দেশ থেকে বহিষ্কার করার জন্য আপনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছিল। তারা তো নিজেদের ষড়যন্ত্র পাকাচ্ছিল আর আল্লাহও নিজ কৌশল প্রয়োগ করছিলেন। বস্তুত আল্লাহ সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ কৌশলকারী।’ (সূরা আনফাল-৩০)
হযরত আলী রাযি. এবং অবশিষ্ট সাহাবায়ে কেরাম:
কুরাইশের ঘাতক দলটি সারা রাত হযরত আলীকে নবীজী মনে করে দাঁড়িয়ে রইল। ভোরে যখন হযরত আলী নবীজীর বিছানা থেকে উঠলেন, তাকে দেখে ঘাতকদের বিস্ময়ের অন্ত রইল না। হযরত আলীকে কিছুটা নির্যাতন ও জিজ্ঞাসাবাদের পর যখন তারা নিশ্চিত হলো যে, নবীজী তাদের হাতাছাড়া হয়ে গেছে তখন হযরত আলীকে ছেড়ে তারা নবীজীর অনুসন্ধানে লিপ্ত হলো। অতঃপর পরিস্থিতি যখন কিছুটা শান্ত হলো, এক সুযোগে হযরত আলী রাযি.-ও মদীনায় এসে নবীজীর সঙ্গে মিলিত হলেন। এছাড়া মক্কায় থেকে যাওয়া অসহায়, দুর্বল ও বন্দী সাহাবায়ে কেরামও পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সুযোগে মদীনায় হিজরত করেছেন।
বস্তুত হিজরত ছিল ঈমানের এক অগ্নিপরীক্ষা। সাহাবায়ে কেরাম এই পরীক্ষায় শতভাগ উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। উল্লিখিত বিবরণসমূহ এর সুস্পষ্ট প্রমাণ। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকেও ঈমানের সকল দাবী পূরণে জান-মাল কুরবান করার তাওফীক দান করুন। আমীন!
মাওলানা আবূ সাঈম
মুদাদ্দিস, জামি‘আ ইলিয়াছিয়া,ঢাকা।