ইসলামী রাষ্ট্র আসলে শাখাপল্লবিত ও পত্র বিরাট এক ছেয়ে যাওয়া বৃক্ষ। হঠাৎ করেই যা গজিয়ে ওঠে না। হঠাৎ করেই বেড়ে ওঠে না। এর জন্য জমি কর্ষণ করতে হয়, বীজ রোপন করতে হয়, নিয়মিত পানি, সার ও কীটনাশক দিতে হয়। তারপর ধীরে ধীরে একদিন তা পত্রপল্লবিত হয়ে বিরাট বৃক্ষে পরিণত হয়। অতঃপর দর্শককে মোহিত করে, পথিককে ছায়া দেয়, পড়শিকে অক্সিজেন দেয়, ফুল দেয় ফল দেয়। সবাইকে ভরপুর করে দেয়। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়া ছাড়া ইসলামী রাষ্ট্রকে কল্পনা করা যায় না। আজকে এই প্রবন্ধে আমরা মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্রের গোড়ার কথা থেকে শুরু করে পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্র হয়ে ওঠার ধারাবাহিক একটি চিত্র সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরার প্রয়াস পাব ইনশাআল্লাহ।
মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্রের গোড়ার কথা:
মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্রের শিকড় মৌলিকভাবে প্রোথিত আছে নবুওতপ্রাপ্তির পর তিন বছরের গোপন দাওয়াত অতঃপর প্রকাশ্য দাওয়াতী কার্যক্রমের মাঝে। তখন থেকে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা দিয়েছেন, আল্লাহ তা‘আলা এই দ্বীনকে অবশ্যই বিজয়ী করবেন। সহীহ বুখারীর বর্ণনায় আছে, হযরত খাব্বাব রা. মুশরিকদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে নালিশ নিয়ে আসেন এবং আল্লাহর কাছে দোয়া ও সাহায্য চাওয়ার অনুরোধ করেন। তখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,وليتمن الله هذا الأمر حتى يسير الراكب من صنعاء إلى حضرموت ما يخاف إلا الله অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা অবশ্যই অবশ্যই এই দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গতায় পৌঁছাবেন, এমনকি কোনো ব্যক্তি সওয়ারীতে আরোহন করে (ইয়ামানের) সানআ থেকে থেকে হাজারামওত এমন অবস্থায় সফর করবে যে, সে আল্লাহর ছাড়া কারো ভয় করবে না। [হাদীস নং ৩৮৫২] হযরত আমর বিন আবাসা সুলামী রা. যখন মক্কার সেই কঠিন সময়ে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট ইসলাম গ্রহণের জন্য হাজির হন,তখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেছিলেন, ‘যখন তুমি শোনবে যে, আমি বিজয়ী হয়েছি তখন (আবার) আমার নিকট আসবে।’ ঠিকই তিনি পরবর্তীতে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাই ওয়াসাল্লামের বিজয়ের সংবাদ শুনে মদীনায় এসে হাজির হয়েছিলেন। [সহীহ মুসলিম ৮৩২] মক্কায় অবস্থানের সময় থেকেই এমন বলিষ্ঠ প্রতিশ্রুতি নবীজীর ﷺ এর অহী থেকে প্রাপ্ত অটল বিশ্বাস ও এই দাওয়াতের প্রতি দৃঢ়চিত্ততার অনমনীয় প্রকাশ ছিল।
ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় নিবিড় দাওয়াতি কার্যক্রম ও সুদৃঢ় লক্ষ্যে স্থির থাকার প্রয়োজনীয়তা: আমরা শুরুতেই উল্লেখ করেছি, ইসলামী রাষ্ট্র হঠাৎ গজিয়ে ওঠা সম্ভব না। এর জন্য অত্যাবশ্যক হলো স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন আদর্শ এবং নিবিড় দাওয়াতি কার্যক্রম। একদল একনিষ্ঠ বিশ্বাসী এবং ত্যাগী আদর্শবাদী। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিন বছরের গোপন দাওয়াতি কার্যক্রমে এই মৌলিক ভিত্তি দাঁড় করিয়েছিলেন। তারপর প্রকাশ্যে দাওয়াতী কাজ শুরু করেন। তখন মুসলমানদের উপর নেমে আসে নির্যাতনের কি স্টিম রোলার। এই সময় জরুরী ছিল দাওয়াতী কার্যক্রমকে শক্ত ভিতের উপর দাঁড় করানো। একারণে মক্কার নিবিড় দাওয়াতী কার্যক্রমের সময়কালে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ধৈর্য ও ক্ষমার পন্থা অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। সূরা যুখরুফের ৮৯ নং আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অতএব আপনি তাদেরকে অগ্রাহ্য করুন এবং বলুন, ‘সালাম’। অচিরেই তারা জানতে পারবে।’
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা ইবনু কাসীর রহ. বলেন, ‘আপনি মুশরিকদের এড়িয়ে যান এবং বলুন ‘সালাম’। অর্থাৎ তাদের কটূকথার জবাবে কটূকথা বলবেন না, বরং সৌজন্য বজায় রাখুন, কথায় বা কাজে তাদের প্রত্যুত্তর করবেন না। অচিরেই তারা জানতে পারবে’ এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের জন্য ধমকি। এজন্যেই আল্লাহ তাআলা (পরবর্তীতে) তাদের উপর অনাবিল শান্তি অবতীর্ণ করেছিলেন। আপন দ্বীন ও কালিমা সুউচ্চ করতেছিলেন। এবং জিহাদ ও লড়াইয়ের বিধান অবতীর্ণ করেছিলেন, ফলশ্রুতিতে মানুষ দলে দলে দ্বীন ইসলামে দাখিল হয়েছে এবং পূর্ব-পশ্চিমে ইসলাম বিস্তার লাভ করেছে। ‘এতো গেলো মক্কায় থাকা অবস্থার কথা, এমনকি মদীনায় যাওয়ার পরও মদীনার আহলে কিতাবদের সাথে ক্ষমা ও উপেক্ষার নির্দেশনা ছিল একটা সময় পর্যন্ত। সূরা বাকারার ১০৯ নং আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, فَٱعۡفُوا۟ وَٱصۡفَحُوا۟حَتَّىٰ یَأۡتِیَٱللَّهُ بِأَمۡرِهِۤۗ
অর্থাৎ তোমরা ক্ষমা করো এবং এড়িয়ে চলো, ততদিন যতদিন না আল্লাহ তাআলা নিজ ফায়সালা পাঠিয়ে দিয়েছেন।
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম ইবনু কাসীর রহ. তাফসীরে ইবনু আবি হাতিমের সূত্রে নিম্নোক্ত হাদীস উল্লেখ করেন, ‘হযরত উসামা ইবনু যায়েদ রা. থেকে বর্ণিত, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবীগণ মুশরিক এবং আহলে কিতাবদের ক্ষমা করতেন, যেমনটি আল্লাহ তাআলা তাদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাঁরা তাদের দেওয়া কষ্টে সবর করতেন। তারপর উপরোক্ত আয়াত তেলাওয়াত করতেন। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উক্ত ক্ষমার নির্দেশনা অনুযায়ী আমল করতেন। একপর্যায়ে আল্লাহ তা‘আলা জিহাদের নির্দেশ দেন। তখন আল্লাহ তাআলা তাঁর মাধ্যমে কুরাইশ সর্দারদের বেশ কতককে হত্যা করেন।’ [হাফেজ ইবনু কাসীর রহ. বলেন, এর সনদ সহীহ।]
এভাবে এই নিবিড় দাওয়াতী কার্যক্রমের মাধ্যমে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন বিশ্বাসী ও ত্যাগী কিছু মানুষ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন, যারা পরবর্তীতে ইসলামীর আদর্শ ও ইসলামী রাষ্ট্রের মৌলিক ভিত্তি সাব্যস্তত্ম হয়েছিলেন। হযরত আবু বকর রা., হযরত উসমান রা., হযরত আলী রা., হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আউফ, হযরত মুসআব ইবনে উমাইর রা. এর নাম এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
হযরত আরকাম ইবনু আবিল আরকামের ঘর, প্রথম আঁতুড়ঘর:
মুসলমানগণের সংখ্যা যখন ৩৮, তখন হযরত আবু বকর রা. এর আবেদনে কাবার কাছে হাজির হন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। সাথে অন্যান্য মুসলমানগণ নিজ নিজ গোত্রের সাথে অবস্থান নেন। আবু বকর রা. প্রকাশ্যে ভাষণ দেন এবং ইসলামের দাওয়াত দেন। এর ফলাফল হয় ভয়ানক। কুরাইশ গোত্রের মুশরিকরা হযরত আবু বকর রা. কে এমনভাবে মারপিট করে যে তিনি মৃতপ্রায় হয়ে যান।এই ঘটনার পর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আরকাম বিন আবিল আরকাম রা. এর ঘরে অবস্থান নেন। মুসলমানগণ সেখানে গোপনীয়তার সাথে ইবাদত করতেন। বেশকিছুদিন সেখানে অবস্থান করা হয়। [সুবুলুল হুদা ওয়ার রশাদ ২/৩১৯] দারুল আরকাম সাফা পাহাড়ের নিকট অবস্থিত। মুসলমানদের শক্তি সঞ্চয়ের অন্যতম আঁতুড়ঘর ছিল এই দারুল আরকাম।
হিজরতের পরম্পরা, শক্তি সংরক্ষণের শক্তিশালী পন্থা:
শক্তি সংরক্ষণ করতে এবং সদ্যোদ্গত চারাকে টিকিয়ে রাখতে হিজরত বা নিরাপদ ভূমিতে স্থানান্তরিত হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হিজরত কোনো আদর্শের প্রতিষ্ঠার জন্য অত্যন্ত কার্যকরী পদক্ষেপ। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নির্দেশনায় সাহাবায়ে কেরাম কয়েকবার হিজরত করেন। নবুওয়তের পঞ্চম বছর রজব মাসে মোট পনের জন মুসলমান হাবশায় হিজরত করেন। তখন পর্যন্ত ইয়াসরিব/মদীনা হিজরতের জন্য উপযোগী ভূমি ছিল না। কারণ, ইয়াসরিবের অধিবাসী আওস ও খাযরাজ গোত্র মুসলমানদের আশ্রয় দিয়ে কুরাইশদের সাথে সম্পর্ক নষ্ট করতে প্রস্তুত ছিল না। তাছাড়া, তাদের নিজেদের মধ্যে তখন রক্তক্ষয়ী লড়াই চলছিল। এসব বিবেচনায় হাবশা ছিল তুলনামূলক নিরাপদ ভূমি। হাবশায় প্রথম হিজরতের ক’মাস পর হযরত উমর রা. ইসলাম গ্রহণ করেন। অত্যন্ত প্রভাবশালী ও দাপুটে হযরত উমর রা. এর ইসলামগ্রহণ ছিল ইসলামের একটি ছোটখাটো বিজয়ের মত। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলতেন, ‘আমরা হযরত উমর রা. এর ইসলাম গ্রহণের আগে কা’বার নিকট নামায পড়তে পারতাম না।’ [সীরাতে ইবনে হিশাম ১/৩৪২]
হযরত উমর রা. এর কিছু দিন আগে হযরত হামযা রা. ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তাঁদের উভয়ের ইসলাম গ্রহণ মুসলমানদের শক্তিবৃদ্ধি করেছিল বেশ। নবুয়তের ষষ্ঠ বছরের শেষের দিকে হাবশায় দ্বিতীয়বার হিজরত হয়। এবার একশর বেশি মুসলমান হিজরত করেন। হাবশায় মুসলমানদের শক্তিবৃদ্ধি ও নিরাপদ অবস্থান কুরাইশরা সহ্য করতে পারছিল না। তারা হাবশার বাদশাহ নাজাশির কাছে গিয়ে তাকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত করে তোলার চেষ্টা করে।কিন্তু রাজদরবারে হযরত জা’ফর বিন আবু তালিব রা. এর হৃদয়গ্রাহী বক্তব্যে বাদশাহ মুগ্ধ হন এবং মুসলমানদের নিরাপত্তাদানের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। এটা ছিল ভিনদেশে মুসলমানদের উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক সাফল্য। পরবর্তীতে মুসলমানগণ নাজাশীর হয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণেও প্রস্তুত হয়েছিলেন। মুসলমানদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এক সময় বাদশাহ নাজাশী ইসলাম গ্রহণ করেন।
হাবশায় মুসলমানদের কৌশলগত অবস্থান থেকে একটি উদীয়মান শক্তির প্রতিকূল পরিবেশে করণীয় সম্পর্কে স্পষ্ট শিক্ষা পাওয়া যায়। সে সাথে অমুসলিম সমাজে মুসলমানদের নিরাপত্তার সাথে বসবাসের বিষয়ে ইসলামের কর্মপন্থারও সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।
হজ্বের সময় বিভিন্ন গোত্রে নবীজী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে ইসলাম উপস্থাপন এবং পৃষ্ঠপোষকতার আহ্বান:
নবুয়তের তিন বছর পর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রকাশ্যে দাওয়াতের কাজ শুরু করেন হজ্বের মওসুমগুলোতে তিনি ওকায, মাজান্নাহ, যুল মাজায বাজারে ও মিনার জমায়েতে গিয়ে ইসলামের দাওয়াত দিতেন। পুরো আরব থেকে আসা পূণ্যার্থিদের কাছে ইসলামের মূল বাণী তুলে ধরতেন। সেই সাথে তাদের কাছে এই দাওয়াতের পৃষ্ঠপোষক হওয়ার প্রস্তত্মাব করতেন। বিনিময়ে তাদের জন্য জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দিতেন। [মুসনাদে আহমাদ ১৪৪৫৬, সুনানে আবু দাউদ ৪৭৩৪, সুনানে তিরমিযী ২৯২৫]
কিন্তু নবুওয়তের দশ বছর পর্যন্ত এই সৌভাগ্য অর্জনে তাঁকে কেউ সাড়া দেয়নি। এই প্রস্তাব ও ইসলামের দাওয়াত নিয়ে তিনি মক্কা থেকে ১২০ কিলোমিটার দুরে তায়েফে গমন করেছিলেন। কিন্তু তারা সে দাওয়াত ও প্রস্তাব কবুল না করে উল্টো তাঁকে কষ্ট দিয়ে বিদায় দিয়েছিল। আল্লাহ তাআলা যে এই মহান মর্যাদা ইয়াসরিববাসীর ভাগ্যে লিখে রেখেছিলেন, কে জানতো তা!

তৎকালীন মদীনার প্রেক্ষাপট, খোদায়ী ব্যবস্থাপনা:
বান্দা যখন চেষ্টা চালিয়ে যায়, তখন পদে পদে আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য আসতে থাকে। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি বছর হজ্বের মওসুমে দাওয়াত দিয়ে যাচ্ছিলেন। অব্যাহতভাবে এই দাওয়াত চলছিল। একপর্যায়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে নুসরত অবতীর্ণ হলো। নবীজীর এই দাওয়াত ও দাওয়াতের পৃষ্ঠপোষকতার প্রস্তাব কবুল করার ক্ষেত্র প্রস্তুত করে দিলেন আল্লাহ তাআলা। নবুয়তের সপ্তম বছর ইয়াসরিবের প্রধান দুই গোত্র আউস ও খাযরাজের মাঝে সংগঠিত হল ঐতিহাসিক ‘বুআস’ যুদ্ধ।
হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, বুআসের যুদ্ধকে আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য (অনুকূল পরিস্থিতি প্রস্তুত করতে) ভূমিকাস্বরূপ সাব্যস্ত করেছিলেন। ফলে তিনি এমন পরিস্থিতিতে (মদীনায়) আগমন করেন যখন তাদের জমায়েত ছিন্নভিন্ন, তাদের নেতারা নিহত আর তারা ক্ষত বিক্ষত। (মুসনাদে আহমাদের বর্ণনায় আছে, তাদের হৃদয় আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের [দাওয়াত কবুলের জন্য] কোমল হয়ে ছিল) এই ঘটনাকে আল্লাহ তাআলা আপন রাসূলের (নুসরতের) জন্য তাদের ইসলাম গ্রহণের কারণ বানিয়েছিলেন।’ [সহীহ বুখারী ৩৮৪৬, মুসনাদে আহমাদ ২৪৩২০]
এই যুদ্ধে আউস ও খাযরাজের বহু প্রবীণ নেতা মারা যায়। খাযরাজের সর্দার আমর ইবনু নুমান, আউসের সর্দার হুজাইর উভয়েই এই যুদ্ধে মারা যান। ফলে জাত্যাভিমান ও অহংকারবশত ইসলাম গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে পারে এমন সকল নেতারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। এই পর্যায়ের নেতাদের মধ্যে অন্যতম একজন, আব্দুল্লাহ বিন উবাই বিন সুলুল বেঁচে যায়। পরবর্তীতে যে ছিল মুনাফিক সর্দার। [ফাতহুল বারী উপরোক্ত হাদীসের ব্যাখ্যা, সুবুলুল হুদা ওয়ার রশাদ ৩/১৩২]
ফলে পরবর্তী নেতৃত্বে যারা আসেন তাদের অধিকাংশ ছিলেন যুবক ও তরুণ। (মুসনাদে আহমাদ ১৪৬৫৩) যাদের মধ্যে ইসলামের সুমহান দাওয়াত গ্রহণের জন্য উর্বর হৃদয় ছিল। প্রথমত ইয়াসরিববাসীরা পরিকল্পনা করেছিল যে, আব্দুল্লাহ বিন উবাই বিন সুলুলকে নেতা মেনে সকলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু আল্লাহর ফায়সালা ছিল ভিন্ন।

মদীনাবাসীদের ইসলাম গ্রহণ ও প্রথম বাইআতে আকাবা:
বুআসের যুদ্ধের আগেও নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ইয়াসরিববাসীকে ইসলামের দাওয়াত ও পৃষ্ঠপোষণের আহ্বান করেছিলেন। কিন্তু তখন ইয়াস বিন মুয়াজ নামে একজন অল্পবয়স্ক তরুণ ছাড়া অন্যরা সাড়া দেয়নি। [সীরাতে ইবনে হিশাম ১/৪২৭]
সীরাত রচয়িতা ইমাম ইবনে ইসহাক রহ. বলেন, ‘যখন আল্লাহ তাআলা চাইলেন আপন দ্বীনকে বিজয়ী করতে, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মর্যাদা দিতে ও তাঁর সাথে কৃত ওয়াদা পূরণ করতে, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ বছর হজ্বের মওসুমে বের হলেন, যে বছর আনসারদের দলটির সাথে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাক্ষাত হয়েছিল। তখন তিনি নিজেকে আরবের গোত্রগুলোর সামনে উপস্থাপন করলেন দ্বীনের সাহায্যের প্রস্তাবনা নিয়ে, যেমনটি প্রতি বছর করতেন। এরই মধ্যে জামরায়ে আকাবার নিকট সাক্ষাত হলো, ইয়াসরিববাসীর সেই দলটির সাথে, যাদের প্রতি আল্লাহ কল্যাণের ইচ্ছা করেছেন। [সীরাতে ইবনে হিশাম ১/৪২৮]
ইবনে ইসহাক রহ. এর বিবরণমতে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুশল বিনিময় করে তাদেরকে দাওয়াত দিলেন এবং ইসলাম কে সমর্থনের প্রস্তাব দিলেন। তখন তারা একে অপরকে বলতে লাগল, ‘হে লোকসকল! নিশ্চিত জানো, আল্লাহর শপথ, ইনিই সেই নবী, ইহুদীরা যার কথা বলে তোমাদের ভয় দেখায়। সুতরাং কিছুতেই ইহুদীরা যেন তোমাদের আগে তাঁকে পেয়ে না যায়। এই আলোচনার পরে তারা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাওয়াত কবুল করে নিলেন। বললেন, আমরা আমাদের গোত্রের বাকি লোকদের রেখে এসেছি। তাদের মত পর¯পর বিবাদ ও অশান্তিতে আক্রান্ত আর কোনো গোত্র নেই। হয়তো আল্লাহ তাআলা আপনার মাধ্যমে তাদের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপণ করে দিবেন। আমরা তাদের নিকট যাব এবং তাদেরকে আপনার আনিত ইসলামের প্রতি দাওয়াত দিব। আপনার ডাকে- যে দ্বীনের প্রতি আমরা সাড়া দিয়েছি- তা তাদের সামনে উপস্থাপন করব। যদি আল্লাহ এর উপর তাদেরকে একমত করে দেন-তাহলে আপনার চেয়ে অধিক মর্যাবাদাবান আর কেউ হবে না।’ এরপর তারা ইয়াসরিবে ফিরে গেলেন সেই বছর। তারা ছিলেন ছয়জন, আসআদ বিন যুরারাহ, আউফ ইবনুল হারিস, রাফে’ ইবনে মালেক, কুতবাহ ইবনু আমের, উকবাহ ইবনু মালেক, জাবের ইবনু আব্দিল্লাহ। [সীরাতে ইবনু হিশাম ১/৪২৯৩০]
এটা ছিল নবুওয়তের দশম বছরের ঘটনা। ইয়াসরিবের ইসলামগ্রহণকারী সাহাবীগণ নিজ এলাকায় গিয়ে দাওয়াতের কাজ শুরু করেন। দাওয়াতি কার্যক্রমের ফলে পরিস্থিতি এমন দাঁড়াল যে, ইয়াসরিবের এমন কোনো ঘর বাকি ছিল না যেখানে একদল প্রকাশ্য মুসলমান ছিলেন না এবং নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আলোচনা হত না। [সীরাতে ইবনে হিশাম ১/৪৩০]
পরবর্তী বছর আউস এবং খাযরাযের বার জন সদস্য হজ্বের মৌসুমে উপস্থিত হলেন। হযরত আবু উমামা আসআদ ইবনু যুরারাহ, আউফ ইবনে হারেস, উবাদাহ ইবনু সামিত, মালেক ইবনু তাইয়িহান প্রমুখ ছিলেন। তাঁরা শিরিক পরিহার; চুরি, যিনা, সন্তান হত্যা, অপবাদ ও নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবাধ্য হবেন না মর্মে বাইআত নিলেন। এটাকে প্রথম বাইআতে আকাবাহ বলা হয়। [সীরাতে ইবনে হিশাম ১/৪৩৪, সহীহ বুখারী ৩৮৯২]
হযরত মুসআব ইবনে উমাইর রা. এর মাদ্রাসা, হিজরতের ভূমির শক্ত ভিত:
প্রথম আকাবার বাইআতের পর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইয়াসরিবের মুসলমানদের জন্য কুরআন, ইসলামের বিধিবিধান এবং দ্বীনী ইলমের শিক্ষক হিসেবে প্রেরণ করেন হযরত মুসআব বিন উমাইর রা. কে। আরও পাঠান অন্ধ কারী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম রা. কে। [তারিখে উম্মতে মুসলিমাহ১/২০৭]
হযরত মুসআব রা.কে ইয়াসরিবে কারী ও মুক্বরি’ নামে ডাকা হতো। তিনি হযরত আসআদ ইবনে যুরারাহ রা. এর গৃহে অবস্থান করেন। সেখানে তিনি ইয়াসরিবীদের কুরআন ও দ্বীন শেখাতেন এবং তাদের নামাযে ইমামতিও করতেন। ইসলামের দাওয়াতে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতেন।তাঁর দাওয়াতেই ইসলাম গ্রহণ করেন আউস গোত্রের দুই সর্দার সা’দ বিন মুয়ায এবং উসাইদ ইবনে হুজাইর রা.। অতঃপর হযরত সা’দ ইবনে মুয়ায রা. এর দাওয়াতে পুরো গোত্র মুসলমান হয়ে যায়। হযরত মুসআব রা. আসআদ ইবনে যুরারাহ রা. এর ঘরে থেকে দাওয়াতী কাজ চালিয়ে যান। একপর্যায়ে আনসারদের প্রায় সকল ঘরে উল্লেখযোগ্য নারীপুরুষ মুসলমান হয়ে যান। [সীরাতে ইবনে হিশাম ১/৪৩৪—৪৩৭]
দ্বিতীয় বাইআতে আকাবা এবং মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নীতিনির্ধারণী সভা:
এর পরবর্তী বছর হজ্বের মওসুমে সংগঠিত হয় ঐতিহাসিক বাইআতে আকাবায়ে সানিয়াহ বা দ্বিতীয় আকাবাহ চুক্তি। এ বছর হজ্বের মওসুমে ইয়াসরিববাসীগণ পুনরায় উপস্থিত হলেন। সেখানে উপস্থিতদের একজন হযরত জাবের রা. এর বর্ণনায় ঘটনার বিরণ শোনা যাক। তিনি বলেন, অতঃপর আমাদের আল্লাহ তাআলা প্রেরণা দান করলেন। আমরা শলাপরামর্শ করে একত্র হলাম। আমরা আলাপ করলাম, কতদিন আর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এই অবস্থায় ছেড়ে রাখব যে, তিনি (প্রাণের) ভয়ে মক্কার পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে বেড়াবেন। তারপর আমাদের মধ্যে সত্তরজন সফর করলেন, তাঁরা হজ্বের মওসুমে তার নিকট হাজির হলেন। আকাবার উপত্যকায় আমাদের একত্রিত হওয়ার সিদ্ধান্ত হলো। আমরা একত্রিত হলাম একের পর এক। তখন আমরা জিজ্ঞাসা করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কীসের উপর বাইআত নেব? তখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা বাইআত নাও এই কথার উপর যে, তোমরা শুনবে ও আনুগত্য করবে, উদ্যমে ও অবসাদে, দান করবে স্বচ্ছল অবস্থাতেও এবং সঙ্কটে থাকা অবস্থাতেও, সৎকাজে আদেশ করবে আর অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে, আল্লাহর কথা বলবে; কোনো নিন্দাকারীর নিন্দাকে ভয় করবে না। আর এই কথার উপর বাইআত নাও যে, তোমরা আমাকে সাহায্য করবে যখন আমি তোমাদের নিকট ইয়াসিরবে গমণ করব; তোমাদের নিজেদের ও স্ত্রী-সন্তানদের যেভাবে সুরক্ষা দাও আমাকে সেভাবে সুরক্ষা দিবে। (বিনিময়ে) তোমাদের জন্য থাকবে জান্নাত।’ আমরা বাইআতের জন্য উদ্যত হলাম। তখন আসআদ বিন যুরারাহ তাঁর হাত ধরলেন।আসআদ ছিলেন সত্তরজনের মধ্যে সর্বকণিষ্ঠ। তার চেয়ে ছোট শুধু আমি ছিলাম। তিনি বললেন, ইয়াসরিবাবসীরা! থামো! আমরা বহু পথ পাড়ি দিয়ে এসেছি এটা নিশ্চিত জেনে যে, তিনি আল্লাহর রসূল। আজ তাঁকে বের করে নিয়ে যাওয়ার (পরিকল্পনার) মানে হলো, পুরো আরববাসী থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া, তোমাদের শ্রেষ্ঠদের প্রাণ বিসর্জন দেওয়া, আর তরবারীর আঘাতে বিক্ষত হওয়া। হয় তোমরা তরবারীর আঘাত, তোমাদের শ্রেষ্ঠজনদের প্রাণহরণ আর পুরো আরববাসী থেকে বিচ্ছিন্নতাকে সহ্য করবে, সেক্ষেত্রে তোমরা বাইআত নাও। তোমাদের প্রতিদান আল্লাহর নিকট। আর যদি তোমরা প্রাণের ভয় করো, তাহলে বাদ দাও। এটা আল্লাহর নিকট (বাইআত নিয়ে অটল না থাকার চেয়ে) ওযর হিসেবে তুলনামূলক বেশি চলনসই। আমরা বললাম, তুমি হাত সম্প্রসারিত করো হে আসআদ বিন যুরারাহ! আল্লাহর শপথ, এই বাইআত আমরা ছাড়বোনা, এর থেকে পিছু হটবো না। তখন আমরা একজন একজন করে বাইআত নেওয়ার জন্য দাঁড়ালাম। তিনি আমাদের থেকে তাঁর শর্তের (প্রতিশ্রুতি) নিচ্ছিলেন, আর বিনিময়ে জান্নাতের (ওয়াদা) দিচ্ছিলেন। [মুসনাদে আহমাদ ১৪৬৫৩]
ইবনে ইসহাক হযরত কা’ব ইবনে মালেকের সূত্রে বলেন, তাঁরা সংখ্যায় ছিলেন ৭৩ জন। আইয়ামে তাশরীকের মাঝামাঝি সময়ে হজ্বের শেষে গভীর রাতে তাঁরা একত্রিত হন জামরায়ে আকাবার নিকট উপত্যকায়। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আব্বাস রা. কে নিয়ে উপস্থিত হন। আব্বাস রা. তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি। সর্বপ্রথম কথা হযরত আব্বাস রা.-ই বলেন। তিনি বলেন, হে ইয়াসরিব থেকে আগত লোকেরা! মুহাম্মদ আমাদের লোক, তোমরা তা জানো। আমরা তাকে আমাদের গোত্রে লোকদের থেকে হেফাজত করে রেখেছি। যারা এখনও আমাদের চিন্তার উপর বিদ্যমান (ঈমান আনেনি)। সে নিজ গোত্রে সম্মানিত, নিজ এলাকায় নিরাপদ। তবে সে তোমাদের নিকট তোমাদের সাথে যুক্ত হতে প্রত্যয়ী। যদি তোমরা মনে করো যে, তোমরা যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিতে চাচ্ছ সেটা রক্ষা করবে, এবং তাকে তার শত্রুদের থেকে রক্ষা করবে, তাহলে তোমরা এই দায়িত্বসহ তাকে নিতে পার। আর যদি মনে করো যে, তোমাদের কাছে যাওয়ার পর তোমরা তাকে সাহায্য না করে ছেড়ে দিবে, তাহলে এখনই তাকে ছেড়ে দাও।কারণ সে এখানে নিজ গোত্রে নিজ এলাকায় সম্মান ও নিরাপত্তায় আছে। কা’ব বিন মালেক বলেন, তখন আমরা বললাম, আপনার কথা শুনেছি। এখন আপনি বলুন হে আল্লাহর রসূল! এবং নিজের জন্য ও আপনার রবের জন্য যা পছন্দ করেন তা আমাদের থেকে গ্রহণ করুন। এরপর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাইআত গ্রহণ করলেন। তখন হযরত বারা ইবনে মা’রুর রা. বললেন, ঐ সত্ত্বার শপথ যিনি আপনাকে সত্যসহ নবী হিসেবে পাঠিয়েছেন, আমরা ঘরের মানুষদের যেভাবে রক্ষা করি আপনাকেও সেভাবে রক্ষা করবো। আমরা বাইআত নিলাম হে আল্লাহর রসূল! আমরা হলাম যোদ্ধাজাতি, বংশপরম্পরায় আমরা তা লাভ করেছি। তখন আবুল হাইসাম মালেক ইবনে তাইয়িহান মাঝখান থেকে বললেন, আমাদের মাঝে এবং অপর লোকদের (ইহুদীদের) মাঝে চুক্তি রয়েছে। আমরা সেগুলো বাতিল করব। যদি আমরা সেটা করি, অতঃপর আল্লাহ আপনাকে বিজয় দান করেন, তখন আমাদের ছেড়ে আপনার গোত্রে ফিরে যাবেন? তখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুচকি হাসলেন এবং বললেন, ‘আদ দাম আদ দাম, ওয়াল হাদাম আল হাদাম!’ (অর্থাৎ আমার দায় তোমাদের দায়, আমার সম্মান তোমাদের সম্মান) আমি তোমাদের তোমরা আমাদের। তোমরা যাদের সাথে লড়বে আমরাও তাদের সাথে লড়ব, তোমরা যাদের সাথে সন্ধি করবে আমরাও তাদের সাথে সন্ধি করব। অতঃপর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের মধ্যে বারজন নকীব বা প্রতিনিধি নির্ধারণ করে দেন। যারা নিজ নিজ গোত্রের দায়িত্বশীলের ভূমিকা পালন করবেন। নয়জন ছিলেন খাযরাজের আর তিনজন আউসের। তাঁদের মধ্যে আসআদ বিন যুরারাহ, সা’দ বিন উবাদাহ, আব্দুল্লাহ বিন রওয়াহা, উবাদাহ বিন সামেত, উসাইদ বিন হুজাইর প্রমূখ ছিলেন। [সীরাতে ইবনে হিশাম ১/৪৪১-৪৪৪]
বর্নিত আছে, নুকাবাদের মধ্যে প্রধান নাকীব বানানো হয়েছিল হযরত আসআদ বিন যুরারাহ রা. কে। [সুবুল হুদা ওয়ার রশাদ ৩/২০৪]
এভাবেই এই ঐতিহাসিক বাইআতের মাধ্যমে রচিত হয় মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্র তৈরির নীতিগত ভিত। বলা যায়, এটাই ছিল মদীনা নামক ইসলামী রাষ্ট্রের সূচনা। এই বাইআতের মাধ্যমে রাষ্ট্রপ্রধানও এক অর্থে নির্ধারিত হয়ে যায়।

নবভূমিতে হিজরত:
দ্বিতীয় বাইআতে আকাবার কিছুদিন পরই নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে হিজরতের নির্দেশ দেন। সাহাবায়ে কেরাম একে একে হিজরত করতে থাকেন। নবুয়তের ১৩তম বছর দারুন নাদওয়ায় কুরাইশরা নবীকে হত্যার ষড়যন্ত্র করে। তখন আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে নবীজীর হিজরতের নির্দেশনাও এসে যায়। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আবু বকর রা., তাঁর গোলাম আমের ইবনে ফুহাইরা, পথপ্রদর্শক আব্দুল্লাহ বিন উরাইকিতসহ হিজরত করেন। দিনটি ছিল ১লা রবিউল আউয়াল সোমবার। ৮ই রবিউল আউয়াল সোমবার মদীনাসংলগ্ন কুবা পল্লিতে পৌঁছেন। সেখানে তিনি মসজিদ নির্মাণ করেন ও চারদিন অবস্থান করেন। ১২ই রবিউল আউয়াল মদীনায় রওনা করেন। আনসারগণ রাস্তায়, গলিসমূহে ও বাড়ির ছাদগুলোতে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দর্শনের জন্য একত্র হয়েছিলেন। শিশুরা ত্বলাআল বাদরু আলাইনা গেয়ে অভ্যর্থনা জানায়। আনসারগণ প্রত্যেকেই চাচ্ছিলেন নবীজীকে নিজের ঘরে নিয়ে যেতে। তখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতে থাকেন, উটনীকে যেতে দাও, কারণ সে আল্লাহর পক্ষ থেকে আদিষ্ট। চলতে চলতে শেষে উটনী গিয়ে হযরত আবু আইঊব আনসারী রা. এর বাড়ির সামনে বসে পড়ে। এই জায়গা ছিল দুই এয়াতীম বালক সাহল ও সুহাইলের মালিকানাধীন। তাঁরা বিনামূল্যে জমিটি দিতে চাইলেও নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিনিময় দিয়ে জমিনটি খরিদ করেন। অতঃপর অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সেখানে মসজিদ নির্মাণ করা হয়। নির্মাণ কাজে নবীজী নিজে অংশ গ্রহণ করেন। এটাই হলো মসজিদে নববী। এর দেয়ালগুলো কাঁচা ইট, স্তম্ভগুলো খেজুরকাণ্ড আর ছাদ খেজুর গাছের ডাল দিয়ে নির্মিত ছিল। লম্বায় ১০৫ ফিট, চওড়া ৯০ ফিট ছিল। [তারিখে উম্মতে মুসলিমাহ ১/২২৫]
মসজিদে নববীর দক্ষিণ দিকে দারুল আরকাম ও মাদরাসায়ে মুসআব বিন উমাইরের পর ইসলামের প্রথম মাদ্রাসা সুফফাহর সূত্রপাত হয়। সহায়সম্বলহীন মুহাজিরগণ এখানে থাকতেন আর ইলম চর্চা করতেন। মসজিদে নববী ছিল একাধারে ইসলামের প্রধান কেন্দ্র ও রাষ্ট্রপরিচালনার কেন্দ্র।এখান থেকেই দ্বীনী ও রাষ্ট্রীয় সকল নির্দেশনামা জারী করা হত।
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এর আগমণে ইয়াসরিব হয়ে যায় মদীনাতুর রাসূল। আওস ও খাযরাজ হয়ে যায় আনসার। (তাঁদের আনসার নাম আল্লাহ তাআলা নিজেই তাঁদের দেন।) [সহীহ বুখারী ৩৭৭৬] আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক স্থাপিত হয়। আনসারগণ এই ভ্রাতৃত্বকে এতটা গুরুত্ব দিয়েছেন যে, নিজেদের ঘর, বাগান ও সম্পদগুলোও ভাগাভাগি করে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মুহাজিরগণ অল্পতে সন্তুষ্ট থেকেছেন। এভাবে সকলে নিজেদের পূর্বপরিচয় পেছনে রেখে ঈমানের বন্ধনে আবদ্ধ হন। তৈরি হয় এক সুন্দর সুষম সমাজ। প্রতিষ্ঠিত হয় ইনসাফ। সর্বক্ষেত্রে ইসলামী পরিভাষা জাহিলী পরিভাষাসমূহের জায়গা দখল করে। মদীনায় আসার পর অল্প সময়ের মধ্যে শরীয়তের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিধান অবতীর্ণ হয়। যে বিধানগুলো মুসলমানদের ঐক্য সুদৃঢ় করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এসময় আযানের বিধান অবতীর্ণ হয়। যোহর আসর ও ঈশার নামায চার রাকাত করা হয়, যা ইতিপূর্বে দুই রাকাত করে ছিল।
নতুন রাষ্ট্রের সমূহ নিরাপত্তাশঙ্কা; এ বিষয়ে নতুন বিধানের অবতরণ ও নীতিপ্রণয়ন:
সদ্য অঙ্কুরোদ্গত এই রাষ্ট্রে বিভিন্ন ধরনের শঙ্কা ছিল। একদিকে ছিল মদীনার তিন ইহুদী গোত্র; বনু কাইনুকা’, বনু নজীর, বনু কুরাইজাহ। অন্য দিকে ছিলে প্রবীণ বয়সের মুনাফিকরা। বাহ্যিকভাবে যারা নিজেদের মুসলমান বলে পরিচয় দিত, ভিতরে ভিতরে ছিল চরম শত্রু। যাদের প্রধান ছিল আব্দুল্লাহ বিন উবাই বিন সুলুল। যাকে ইতিপূর্বে মদীনার প্রধান সর্দার বানানোর পরিকল্পনা হচ্ছিল। এই উভয়দল ছিল আভ্যন্তরীন শত্রু। আর বাইরে থেকে ছিল মক্কার কুরাইশদের থেকে শঙ্কা। তারা আরবভূমিতে মুহাম্মাদের শক্ত ঘাঁটি গাঁড়াকে ভাল চোখে দেখছিল না। সে কারণে তারা আব্দুল্লাহ বিন উবাইকে চিঠি লিখে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মদীনা থেকে বের করে দেওয়ার জন্য প্ররোচিত করতে থাকে। এদিকে মক্কা থেকে মদীনা পর্যন্ত বসবাসকারী গোত্রগুলো ছিল কুরাইশদের মিত্র। তাদের সহায়তায় কুরাইশরা মদীনার দক্ষিণ দিকের পথকে বন্ধ করে দেয়। যে কারণে ইয়ামান ও তার আশেপাশের ইসলামগ্রহণকারীদের মদীনায় আনাগোনা একটা সময় পর্যন্ত খুব কঠিন ছিল।তাছাড়া, মদীনার উপর কুরাইশদের আক্রমণের সম্ভাবনা তো ছিলই। এই সকল পরিস্থিতি বিবেচনায় মদীনার আভ্যন্তরীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা সুদৃঢ় করতে এবং রাষ্ট্রীয় সকল ব্যবস্থাপনা সুবিন্যস্ত করতে মদীনার আশেপাশে বসবাসকারী গোত্রগুলো ও ইহুদীদের অন্তর্ভুক্ত করে একটি গুরুত্বপূর্ণ সনদ তৈরি করা হয়। যা ঐতিহাসিক ‘মদীনাসনদ’ নামে প্রসিদ্ধ।
ঐতিহাসিক মদীনাসনদ:
এই সনদের দফাগুলো নিম্নে উল্লেখ করা হলো,
১. বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম। এই সনদনামা নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে লিখিত, যা কুরাইশ ও ইয়াসরিবের মুমিন মুসলমানগণ এবং যারা তাদের অনুগামী হয়ে তাদের সাথে যুক্ত হয়েছে এবং লড়াই করেছেুতাদের জন্য প্রযোজ্য।
২. তারা সকলেই অন্য লোকদের মোকাবেলায় এক জাতি।
৩. কুরাইশের মুহাজিরগণ পূর্বের অবস্থায় থাকবে, নিজেদের মাঝে পর¯পর রক্তপণের দায় বহন করবে, নিজেদের বন্দীদের মুক্তিপণ আদায় করবে, নীতিসম্মতভাবে এবং মুমিনদের মাঝে ইনসাফ রক্ষা করে। (একই কথা আনসারী গোত্রসমূহ তথা বনু আউফ, বনু সাইদাহ, বনু হারিস, বনু জুশাম, বনু নাজ্জার, বনু আমর বিন আওফ, বনু নাবীত, বনু আউস এর ক্ষেত্রেও উল্লেখ করা হয়)।
৪. মুমিনগণ তাদের মাঝে কোনো মুক্তিপণ বা রক্তপণে ঝণগ্রস্তকে নীতিসম্মত অনুদানে বিরত হবে না।
৫. মুমিন অপর মুমিনের মিত্রের সাথে তাকে বাদ দিয়ে চুক্তি করবে না।
৬. মুত্তাকী মুমিনগণ তাদের মধ্যে যে সীমালঙ্ঘন করবে কিংবা জুলুম, অপরাধ, বাড়াবাড়ি কিংবা মুমিনদের মধ্যে বিশৃঙ্খলার মত অনাচার করবে তার বিরুদ্ধে সকলে একজোট একহস্ত থাকবে। যদিও সে তাদের কারো সন্তানও হয়।
৭. কোনো মুমিন মুমিনকে কোনো কাফেরের জন্য হত্যা করবে না। কোনো মুমিনের বিপরীতে কাফেরকে সাহায্য করবে না।
৮. আল্লাহর প্রদত্ত নিরাপত্তা একক। সকল মুমিনের পক্ষ থেকে নগণ্য একজনের নিরাপত্তা প্রদান প্রযোজ্য হবে।

৯. অন্য সকলের বিপরিতে মুমিনগণ পর¯পর একে অপরের মিত্র। তবে যে সকল ইহুদী আমাদের অনুগত তার জন্য রয়েছে সাহায্য ও সমতা। তাদের উপর জুলুম করা হবে না, এবং জোট বেঁধে তাদের বিরুদ্ধে পর¯পর সাহায্য করা হবে না।
১০. মুমিনদের শান্তিচুক্তি একক। আল্লাহর পথের লড়াইয়ে কোনো মুমিন অন্য মুমিনের প্রতিকূলে নিরাপত্তাচুক্তি করবে না তবে পর¯পর মিলেমিশে ও ইনসাফ রক্ষা করে করতে পারবে।
১১. প্রত্যেক যোদ্ধাদল যারা আমাদের সাথে যুদ্ধ করবে তারা একের পর এক করবে।
১২. মুমিনগণ আল্লাহর পথের লড়াইয়ে তাদের কেউ হতাহত হলে তার প্রতিশোধ গ্রহণ করবে। নিশ্চয় মুত্তাকী মুমিনগণ শ্রেষ্ঠতম ও শুদ্ধতম আদর্শে প্রতিষ্ঠিত।
১৩. কোনো মুশরিক কুরাইশদের সম্পদ বা ব্যক্তিকে নিরাপত্তা দিবে না। কোনো মুমিনের জন্য তার ক্ষেত্রে বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে না।
১৪. যে বিনা কারণে ইচ্ছাকৃত কোনো মুমিনকে হত্যা করবে এবং তা প্রমাণিত হবে, তাকে কিসাসস্বরূপ হত্যা করা হবে। তবে নিহতের অভিভাবক কিসাস ক্ষমা করতে রাজি হলে ভিন্ন কথা। সকল মুমিন হত্যাকারীর বিরূদ্ধে অবস্থান নেবে। তার পক্ষে অবস্থান গ্রহণ কোনো মুমিনের জন্য হালাল নয়।
১৫. কোনো মুমিন, যে এই সনদপত্রকে মেনে নিয়েছে এবং আল্লাহ ও পরকালের উপর ঈমান এনেছে, তার জন্য হালাল নয় যে, কোনো (দ্বীনের বিষয়ে) বিদআতকে সাহায্য করবে বা আশ্রয় দিবে। যে তাকে সাহায্য করবে বা আশ্রয় দিবে তার উপর কিয়ামত দিবসে আল্লাহর অভিশাপ এবং ক্রোধ নিপতিত হবে। তার ফরজ বা নফল কোনো আমল কবুল হবে না।
১৬. তোমাদের মাঝে যে কোনো মতবিরোধ হোক, তার সমাধান আল্লাহ তাআলা এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট অর্পন করতে হবে।
১৭. ইহুদীরা মুসলমানদের সাথে যুদ্ধের ব্যয়ভার বহন করবে, যতক্ষণ লড়াইরত থাকে।

১৮. বনু আউফের মিত্র ইহুদীরা মুমিনদের সাথে একজোট। ইহুদী ও মুসলমান সবাই নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে। তারা নিজেরা ও তাদের মিত্ররা মুমিনদের সাথে একজোট। তবে যে অন্যায় বা অনাচার করে তার কথা ভিন্ন। সে শুধু নিজেকে ও নিজের পরিবারকে ধ্বংস করে। (এরপর বনু নাজ্জার, বনু হারেস, বনু সাইদাহ, বনু জুশাম, বনু আউস এবং বনু সালাবাহর মিত্র ইহুদীদের জন্য একই ধারা উল্লেখ করা হয়। তবে যে অন্যায় বা অনাচার করে তার কথা ভিন্ন, সে তো কেবল নিজেকে ও নিজ পরিবারকে ধ্বংস করে। সা’লাবাহর শাখা তাদের অন্তর্ভুক্ত। বনু শাতবিয়্যাহর জন্যও একই কথা যা বনু আউফের মিত্র ইহুদীদের ক্ষেত্রে বলা হলো। এই বিধান কল্যাণে ক্ষেত্রে প্রযোজ্য অনাচারের ক্ষেত্রে নয়। সা’লাবার মিত্রদেরও একই বিধান। ইহুদীদের অন্যান্য শাখার বিধান তাদের মতই।)
১৯. উপরের ধারায় উল্লিখিত গোত্র ও জনগোষ্ঠি কেউ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুমতি ছাড়া (যুদ্ধে) বের হবে না। তাদের কেউ কোনো আঘাতের প্রতিশোধে বাঁধা হবে না। যে ধ্বংস করবে সে নিজেকে আর নিজ পরিবারকেই করবে। যে অন্যায় করবে সে (সর্বদাই) আলাদা। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা এসব ক্ষেত্রে ন্যায়ের পক্ষে।
২০. ইহুদীদের খরচ তাদের যিম্মায়, মুসলমানদের খরচ মুসলমানদের যিম্মায়। তবে যে এই সনদে অন্তর্ভুক্তদের বিরুদ্ধে লড়াই করবে তাতের বিরুদ্ধে তারা পর¯পর সহযোগী হবে। তাদের মাঝে থাকবে কল্যাণোপদেশ ও কল্যানকামিতা। থাকবে সদাচার, অনাচার নয়।
২১. কোনো ব্যক্তি তার মিত্রের অপরাধে অপরাধী হবে না। সাহায্য মজলুমই পাবে।
২২. ইহুদীরা মুসলমানদের সাথে লড়াইয়ের ব্যয়ভার বহন করবে।
২৩. ইয়াসরিবের অভ্যন্তর এই সনদে অন্তর্ভুক্তদের জন্য হারাম/পবিত্র ভূমি। নিরাপত্তাপ্রাপ্ত ব্যক্তি স্থানীয় লোকদের মত একই অধিকার পাবে। তবে ক্ষতি ও অপরাধ করলে তার ব্যাপার ভিন্ন। কোনো নিরাপত্তাবেষ্টিত স্থানে কাউকে সেখানকার লোকদের অনুমিত ছাড়া নিরাপত্তা দেওয়া যাবে না।
২৪. এই সনদে অন্তর্ভুক্তদের মাঝে যদি কোনো দূর্ঘটনা বা বিরোধ হয় যার কারণে বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা তৈরি হয় তবে সেটার মীমাংসা অর্পিত হবে আল্লাহ তাআলার নিকট আর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট।নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা এই সনদের সর্বাধিক কল্যাণজনক ও যথার্থ পন্থার পক্ষপাতি।
২৫. কুরাইশ এবং তাদের সহায়তাকারীদের নিরাপত্তা দেওয়া যাবে না। মদীনায় যারা আক্রমণ করবে তাদের বিরুদ্ধে সকলে একে অপরের সহযোগী হবে। তারা যদি সন্ধির দিকে আহ্বান করে তবে তাদের সাথে সন্ধি করা হবে। মুমিনদের পক্ষ থেকে সন্ধিচুক্তি রক্ষা করা হবে। তবে যে দ্বীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে তার কথা ভিন্ন। প্রত্যেকের দায়িত্বে ঐটুকু অংশ সংরক্ষিত থাকবে যেটুকরু দায় তারা গ্রহণ করেছে। (আউসের মিত্র ইহুদীদের কথা পুনর্ব্যক্ত করা হয় যে, তাদের জন্য এই সনদের বিষয়গুলো প্রযোজ্য হবে ন্যায়সঙ্গত ব্যপারে)। ন্যায়ের ক্ষেত্রে এই সনদ প্রযোজ্য, অন্যায়ের ক্ষেত্রে নয়। প্রত্যেকে নিজ কর্মের দায়ভার নিজে বহন করবে। আল্লাহ এই সনদের সর্বাধিক কল্যানজনক ও সততাপূর্ণ বিষয়ের পক্ষে। এই সনদ কোনো অন্যায়কারী বা অনাচারীর পক্ষে কার্যকর হবে না। মদীনা থেকে যে বের হবে সে নিরাপদ। যে অবস্থান করবে সে নিরাপদ। আল্লাহ সদাচারী ও মুত্তাকির সহায়। এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও তাই। [সীরাতে ইবনে হিশাম ১/৫০২—৪]
সনদের ধারাগুলো থেকেই স্পষ্ট যে, এর মাধ্যমে আভ্যন্তরীন ও বহির্নিরাপত্তা এবং শৃঙ্খলার মূলনীতি তৈরি হয়ে গিয়েছিল।
জিহাদের বিধান:
ইসলামী রাষ্ট্রের হেফাজত এবং ইসলামকে সমুন্নত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ যে বিধানটি এই পর্যায়ে অবতীর্ণ হয় তা হলো, জিহাদের বিধান। আলোচনার শুরুর দিকে আমরা উল্লেখ করেছি যে, মক্কায় এবং মদীনায় প্রথমিক পর্যায়ে মুসলমানদের শক্তিসংরক্ষণ এবং টিকে থাকার খাতিরে লড়াইয়ের অনুমতি ছিল না। কিন্তু মদীনায় মোটামুটি স্থিত হওয়ার পর পরিস্থিতি পরিবর্তন হয়। নিজেদের টিকিয়ে রেখে ইসলামের ভূমি হেফাজত এবং কুফরের দর্প চূর্ণ করার জন্য জিহাদের বিধান এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক ছিল। সর্বপ্রথম সুরায়ে হজ্বের ৩৯ নং আয়াতে কিতালের অনুমতি দেওয়া হয়। এই আয়াতে বলা হয়, ‘যাদের সাথে যুদ্ধ করা হচ্ছে তাদের অনুমতি দেওয়া হলো (তারা নিজেদের আত্মরক্ষায় যুদ্ধ করতে পারবে), যেহেতু তাদের উপর জুলুম করা হয়েছে। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তাদের সাহায্য করতে সক্ষম।’এটা ছিল আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধের অনুমতি সংক্রান্ত আয়াত। এখানে যুদ্ধকে ফরজ করা হয়নি। এরপর সুরায়ে বাকারার ১৯০ নং আয়াতের মাধ্যমে যারা আক্রমণ করে তাদের সাথে লড়াইকে ফরজ করা হয়। এই আয়াতে বলা হয়, ‘তোমরা লড়াই করো- যারা তোমাদের সাথে লড়াই করে- তাদের সাথে।’ এরপরের স্তরে সকল মুশরিকদের বিরূদ্ধে জিহাদের নির্দেশ অবতীর্ণ হয়। [যাদুল মাআদ ৩/৬২]
জিহাদের অভিযানসমূহ:
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় আগমণের পর হযরত সা’দ বিন মুআয রা. উমরা করার জন্য মক্কা যান। সেখানে তার পুরনো বন্ধু উমাইয়া বিন খালাফের নিকট অবস্থান করেন। একদিন উমাইয়াকে সাথে নিয়ে কাবা শরীফ তাওয়াফ করতে যান। তখন আবু জাহল তাকে ধমক দিয়ে বলে, তোমাকে নিরাপদে কাবা তাওয়াফ করতে দেখছি! অথচ তোমরা ধর্মত্যাগী বদদ্বীনদের আশ্রয় দিয়েছ এবং তাদের সাহায্য করার প্রতিজ্ঞা করেছ। যদি তোমার সাথে আবু সাফওয়ান উমাইয়া না থাকত তাহলে তুমি নিরাপদে এখান থেকে পরিবারের নিকট ফিরতে পারতে না।’ এর জবাবে হযরত সা’দ বিন মুআয রা. উচ্চস্বরে বলেন, তোমরা যদি আমাদের কাবা যিয়ারত থেকে বাঁধা দাও তাহলে আমরা এরচে গুরুতর ক্ষেত্রে তোমাদের বাঁধা দিব। মদীনার নিকট দিয়ে তোমাদের সিরিয়ায় গমনের ব্যবসায়িক পথ অবরুদ্ধ করে দিব।’ [সহীহ বুখারী ৩৯৫০]
এই দ্বিপাক্ষিক হুমকি উভয় দিক থেকে বাস্তবায়িত হয়েছিল। প্রথম দিকে কুরাইশদের ব্যবসায়ী কাফেলাগুলো মুসলমানদের পক্ষ থেকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। হিজরতে সাত মাস পর রমজান মাসে সর্বপ্রথম অভিযান হযরত হামযা রা. এর নেতৃত্বে প্রেরণ করা হয়। সেখানে ত্রিশজন মুহাজির অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তাঁরা আবু জাহলের নেতৃত্বে অতিক্রমকারী একটি ব্যবসায়িক কাফেলাকে সতর্কবাণী দিয়ে আসেন। শাওয়াল মাসে হযরত উবাইদা বিন হারিস রা. এর নেতৃত্বে ‘বাতনে রাবেগে’ পাঠানো হয়। সেখানে আবু সুফিয়ানের একটি কাফেলাকে ভীতি প্রদর্শন করা হয়। এরপর আব্দুল্লাহ ইবনে জাহাশের নেতৃত্বে প্রেরিত অভিযানে কুরাইশের এক বড় সর্দার আমর বিন হাজরামী নিহত হয়।দ্বতীয় হিজরীর রমজান মাসে কুরাইশদের এক বৃহৎ কাফেলা- যা আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে সিরিয়া থেকে ফিরছিল- সেটাকে বাধা দিতে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বয়ং বের হয়ে যান। এর পরিপ্রেক্ষিতেই ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ সংঘটিত হয়। বদর যুদ্ধে বিজয়ের পর মুসলমানদের প্রভাব ও শক্তি বহুগুণে বেড়ে যায়।বদরের পর ইহুদী গোত্র বনু কাইনুকা’কে অবরোধ করে মদীনা থেকে উৎখাত করা হয়। কারণ তারা চুক্তির শর্ত অমান্য করে কুরাইশদের সাথে মিত্রতার প্রচেষ্টায় কোনো কমতি রাখেনি। তাছাড়া তাদের আরও কিছু বাড়াবাড়িও ছিল যা সন্ধিচুক্তির লঙ্ঘন বলে গণ্য হয়।
তৃতীয় হিজরী শাওয়াল মাসে উহুদ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে মুসলমানগণ বড় পরীক্ষার সম্মুখীন হন। এ যুদ্ধে মুমিনদের বিপদে ভেঙ্গে না পড়ার শিক্ষাপ্রদান করা হয়, ভবিষ্যতের জন্য তাদের দৃঢ়পদ থাকার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। উহুদযুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহে মুমিনদের জন্য বহুরকম শিক্ষা ছিল। এরপর বনু নজীরকে উৎখাত করে দেশান্তর করা হয়। ইহুদীদের সাথে চুক্তি অনুযায়ী তারা উহুদযুদ্ধে অংশগ্রহণে বাধ্য থাকা সত্ত্বেও তাতে তারা অংশ নেয়নি। সেই সাথে তারা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যার ষড়যন্ত্র করে। পঞ্চম হিজরীতে পূর্বে মদীনা থেকে উৎখাতকৃত ইহুদীগোত্র বনু নজীর কুরাইশ ও অন্যান্য গোত্রের সাথে যোগশাজস করে একটি ঐক্যজোট গঠন করে। সবগুলো গোত্র মিলে প্রায় দশহাজার যোদ্ধার দল মদীনা আক্রমণ করে। কিন্তু তিন সপ্তাহের অবরোধেও নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নেতৃত্বে খননকৃত পরিখা অতিক্রম করতে পারেনি। এসময় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি পাথর ভাঙতে গিয়ে তিনবারের আঘাতে তিনটি আলোর ঝলক দেখতে পান। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন অবগত করেন যে, প্রথম ঝলকে ইয়ামান, দ্বিতীয় ঝলকে সিরিয়া ও পশ্চিমের দেশগুলো এবং তৃতীয় ঝলকে পূর্বদিক বিজয়ের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে।
পরবর্তীতে এই ভবিষ্যদ্বানী সত্য হয়েছিল। পরিশেষে খোদায়ী নুসরতে ঝড়ো বাতাসের কারণে তারা ব্যর্থ হয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হয়। তখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘এখন থেকে আমরা তাদের উদ্দেশে অভিযান চালাব, তারা আর চালাতে পারবে না। আমরা অগ্রসর হবো তাদের দিকে।’ [সহীহ বুখারী ৪১১০]এই যুদ্ধে ব্যর্থতা তাদের ভবিষ্যতে যুদ্ধাভিযানের সামর্থ্য শেষ করে দিয়েছিল। এরপর খন্দক যুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতার অপরাধে বনু কুরাইযাকে অবরোধ করে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে একদিকে ইসলামী রাষ্ট্রের সাথে বিদ্রোহকারীদের প্রয়োজনে সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদানের নমুনা স্থাপিত হয়। সে সাথে বনু কুরাইজার অপরাধ অনুযায়ী শাস্তি হয়; কারণ তারা যুদ্ধ চলাকালে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। পক্ষান্তরে ইহুদী অন্য দ্ইু গোত্র এমনটি করেনি। ষষ্ঠ হিজরী যু-কা’দা মাসে নবীজী সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে উমরা করতে যান। কুরাইশরা তাদের হুমকি অনুযায়ী নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বাঁধা দেয়। এক পর্যায়ে নবীজীসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রেরিত দূত হযরত উসমান রা.কে হত্যার গুজব ছড়িয়ে গেলে সাহাবায়ে কেরাম এর প্রতিশোধের জন্য বাইআত গ্রহণ করেন। যাকে বাইআতে রিযওয়ান বলা হয়। তখন কুরাইশরা অবস্থা বেগতিক দেখে চুক্তি করতে বাধ্য হয়। চুক্তির কিছু শর্ত বাহ্যত মুসলমানদের স্বার্থের অনুকূলে ছিল না। কিন্তু নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ দূরদর্শীতায় উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে, এই সন্ধি মুসলমানদের অনুকূলে আসবে। চুক্তির একটি শর্ত এমন ছিল যে, কেউ মুসলমান হয়ে মক্কা থেকে মদীনায় আসলে তাকে ফিরিয়ে দিতে হবে। সে হিসেবে হযরত আবু জান্দাল রা. কে হুদায়বিয়া থেকেই ফিরিয়ে দেওয়া হয়, আর হযরত আবু বাসীর রা. মদীনায় আসার পর ফিরিয়ে দেওয়া হয়। তখন আবু বাসীর রা. সমুদ্রপাড়ে চলে যান, তার সাথে য্ক্তু হন আবু জান্দাল রা. এবং মক্কার জুলুম থেকে মুক্তিকামী অন্যান্য মুসলমানগণ। তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটি দল গঠন করে কুরাইশ ব্যবসায়িক কাফেলাগুলোর উপর চড়াও হতে শুরু করেন। ফলে কুরাইশদের ব্যবসায়িক সফর একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। তখন কুরাইশরা নিজেরাই চুক্তির এই ধারাটি বাতিল করতে বলে। মূলত হুদাইবিয়ায় কুরাইশদের চুক্তিতে রাজি হওয়াই ছিল মদীনার স্বাধীন ইসলামী রাষ্ট্রকে স্বীকৃতিদানের নামান্তর।
সপ্তম হিজরীর মুহাররম মাসে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনার উত্তরে ১৪৪ কিলো দূরত্বে অবস্থিত খাইবার অভিযান করেন, যেখানে মদীনা থেকে নির্বাসিত ইহুদীদের আবাস ছিল।ঐতিহাসিক ইসমাইল রেহানের মতে খাইবার ছিল প্রথমবারের মত উল্লেখযোগ্য ‘ইকদামী জিহাদ’ (নিরেট আত্মরক্ষা নয়; বরং ইসলামের মর্যাদা বুলন্দ করতে এবং শত্রুদের দর্প চূর্ণ করতে নিজ এলাকার বাইরে অভিযান)। ইসমাইল রেহান বলেন, হুদাইবিয়ার সন্ধি এবং খাইবারের অভিযানের পর আরবদের শত শত বছরের বিকেন্দ্রীকৃত অবস্থার সমাপ্তি ঘটে। মুসলমানরা হয়ে উঠেন আরবের একক বৃহৎ শক্তি। কুরাইশদের মুসলমানদের পরাভূত করার শক্তি নিঃশেষ হয়ে গিছেছিল। মদীনা আঞ্চলিক শক্তি থেকে উত্তোরণ করে আন্তর্জাতিক শক্তি হিসেবে পরিগণিত হতে থাকে। ফলে এই পর্যায়ে এসে আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন বাদশাহদের দাওয়াত দিয়ে এবং আনুগত্যের আহ্বান করে চিঠি পাঠানো শুরু হয়। এই ধারাবাহিকতায় সিরিয়ার সীমান্ত অঞ্চল বুসরার শাসক শুরাহবিল বিন আমর গাসসানীর নিকট চিঠি পাঠানো হয়। সে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দূত হযরত হারেস বিন উমাইর রা. কে শহীদ করে দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অষ্টম হিজরীর জুমাদাল উলা মাসে বাইজেন্টাইন রোমকদের বিরূদ্ধে অভিযান প্রেরণ করেন।
যুদ্ধে রোমকরা পূর্ণ পরাজিত না হলেও শক্ত ধাক্কা খায়। এদিকে হুদাইবিয়ার সন্ধি কুরাইশদের দিক থেকেই ভঙ্গ হয়ে যায়। তারা সন্ধিচুক্তির খেলাফ নিজেদের মিত্র বনু বকরকে মদীনা রাষ্ট্রের মিত্র বনু খুযাআর বিরুদ্ধে আক্রমণে সহায়তা করে। এর ফলে অষ্টম হিজরী রমজান মাসে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা অভিযান করেন। এর মাধ্যমে ঐতিহাসিক ফাতহে মক্কা বা মক্কা বিজয় সংঘটিত হয়। ফাতহে মক্কার পর লোকেরা দলে দলে ইসলামে প্রবেশ করে। মক্কা অধিকার করে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অতিদ্রুত মক্কার আশেপাশের এলাকাগুলো অধিকার এবং কুফর শিরকের পুরনো কেন্দ্রগুলো ধ্বংসের দিকে মনোনিবেশ করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে হুনাইন, তায়েফ ইত্যাদি অভিযান হয়। এভাবে পুরো আরব ইসলামের অধীনে চলে আসে। পারস্য তখন আভ্যন্তরীন বিশৃঙ্খলায় মারাত্মক অস্থিরতার শিকার। নবম হিজরীতে রোমকদের ষড়যন্ত্রের সংবাদ আসে। এর পরিপ্রেক্ষিতে তাবুক অভিযান সংঘটিত হয়।এই অভিযানে তাদের ভীত সন্ত্রস্ত করে পুনরায় ফিরে আসা হয়। (যুদ্ধের এই বিবরণ বিশেষত- তারিখে উম্মতে মুসলিমার আলোকে লেখা হয়েছে) এ বিষয়ে একটি সারসংক্ষেপ ইবনু কায়্যিম রহ. উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, মদীনায় আগমণের পর মোট সাতাশটি অভিযান নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে অংশ নিয়ে অভিযান পরিচালনা করেন। কারো কারো মতে এমন লড়াইয়ের সংখ্যা পঁচিশটি, কেউবা বলেন ঊনত্রিশটি। এরমধ্যে লড়াই হয়েছে মোট নয়টিতে; বদর, উহুদ, খন্দক, কুরাইজা, মুস্তালিক, খাইবার, ফাতহে মক্কা, হুনাইন এবং তায়েফ। কেউ কেউ বলেছেন, বনু নজীর, গাবাহ এবং খাইবারের অধীন ওয়াদিয়ে কুরার মধ্যেও লড়াই হয়েছে।
আর নিজে অংশগ্রহণ না করে প্রেরিত ছোট ছোট অভিযানগুলো ষাটটির কাছাকাছি।
বৃহৎ এবং প্রধান যুদ্ধ সাতটি; বদর, উহুদ, খন্দক, খাইবার, ফাতহে মক্কা, হুনাইন ও তাবুক। এই যুদ্ধগুলোর ব্যাপারে কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে। সূরায়ে আনফাল বদরের ব্যাপারে, সূরায়ে আলে ইমরানের ১২১ নং আয়াত থেকে প্রায় শেষ পর্যন্ত উহুদ সম্পর্কে, খন্দক কুরাইজা এবং খাইবার সম্পর্কে সূরায়ে আহযাবের শুরুর আয়াতগুলো, সূরায়ে হাশর বনু নজীর সম্পর্কে, হুদাইবিয়া এবং খাইবারের ঘটনা সম্পর্কে সূরায়ে ফাতহ নাযিল হয়েছে। সেই সাথে এর মধ্যে ফাতহে মক্কার ঈঙ্গিত আছে, আর ফাতহে মক্কার স্পষ্ট উল্লেখ আছে সূরায়ে নাসরে।
এই যুদ্ধগুলোর মধ্যে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আহত হয়েছিলেন শুধু উহুদ যুদ্ধে। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ফেরেশতাগণ লড়াই করেছেন বদর এবং হুনাইনে। আর খন্দকে ফেরেশতারা অবতরণ করেছেন এবং মুশরিকদের প্রকম্পিত করে পরাস্ত করেছেন। এই যুদ্ধে মুশরিকদের চেহারায় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কঙ্কর নিক্ষেপ করেছিলেন, তখন তারা পালিয়ে যায়। (রীতিমত লড়াই করে) বিজয় হয় দুটি যুদ্ধে; বদর এবং হুনাইন। মিনজানিক দ্বারা যুদ্ধ হয় একটিতে; তায়েফ। পরিখা দ্বারা প্রতিরক্ষা করেন একটিতে, সেটা হলো আহযাবের যুদ্ধ (খন্দক)। পরিখার পরামর্শ দিয়েছিলেন হযরত সালমান ফারসী রা.। [যাদুল মাআদ ১/১২৫]

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুদ্ধের আদর্শ:
যুদ্ধে অসমর্থ ছোটদের নিতেন না। মা-বাবার অনুমতি ছাড়া জিহাদের অনুমতি দিতেন না। যখন কোনো দিকে অভিযানে ইচ্ছা করতেন তখন ঈঙ্গিতবহ শব্দে বলতেন যেন শত্রু বিভ্রান্ত হয়। যুদ্ধের আগে পরামর্শ করতেন সাহাবায়ে কেরামের সাথে। [বিস্তারিত সুবুলুল হুদা ওয়ার রশাদ ৯/১০৬]
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কাউকে কোনো বড় বা ছোট বাহিনীর আমীর/সেনাপতি বানাতেন তখন তাকে ব্যক্তিগতভাবে তাকওয়ার উপদেশ দিতেন এবং বাহিনীতে থাকা অন্য মুসলমানদের সাথে কল্যানকর আচরণের নির্দেশনা দিতেন। অতঃপর বলতেন, তোমরা আল্লাহর নামে আল্লাহর পথে লড়াই করবে। যারা আল্লাহর সাথে কুফরী করেছে তাদের সাথে লড়াই করবে। লড়াই করবে কিন্তু গনীমতের সম্পদে খেয়ানত করবে না। বিশ্বাসঘাতকতা করবে না। মৃতদেহ বিকৃত করবে না। কোনো শিশুকে হত্যা করবে না। যখন শত্রুর মুখোমুখি হবে তখন তিনটি বিষয়ের কোনো একটির দিকে আহ্বান করবে৷যদি কোন একটি তারা মেনে নেয় তাহলে তোমরা গ্রহণ করে নিবে। এবং তাদের সাথে লড়াই থেকে বিরত থাকবে। তাদের ইসলামের দাওয়াত দিবে। যদি তারা কবুল করে তাহলে লড়াই থেকে বিরত থাকবে। (ইসলাম গ্রহণের পর) তাদেরকে তাদের এলাকা থেকে মুহাজিরদের এলাকায় (দারুল মুহাজিরীন-তৎকালে মদীনা) হিজরতের দাওয়াত দিবে। এবং তাদের জানাবে যে, যদি তারা হিজরত করে তাহলে তাদের জন্য ঐ সকল সুবিধা প্রযোজ্য হবে যেগুলো মুহাজিরদের জন্য প্রযোজ্য। এবং তাদের উপর ঐ সব দায় বর্তাবে যা মুহাজিরদের উপর বর্তেছে। যদি তারা দার/এলাকা পরিবর্তন করতে না চায় তবে তাদের জানিয়ে দাও যে, তারা বেদুইন মুসলমানদের মত। ঈমানদারদের উপর আল্লাহর যে সকল বিধান রয়েছে তাদের উপর তা থাকবে তবে গনীমত (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ) এবং ফাই (যুদ্ধাভিযানে লড়াই ছাড়াই পরাজয় স্বীকারকারী শত্রু থেকে প্রাপ্ত সম্পদ)-এর মধ্যে তাদের অধিকার নেই যতক্ষণ না তারা মুসলমানদের সাথে জিহাদে অংশগ্রহণ করে। (যাই হোক) যদি তারা ইসলাম গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়, তাহলে তাদের থেকে জিযয়া দাবী করো। যদি তারা রাজী হয়, তাহলে তা গ্রহণ করে লড়াই থেকে বিরত থাক।যদি তারা সেটাতেও রাজি না হয় তাহলে আল্লাহর সাহায্য চেয়ে লড়াই শুরু করো।… [সহীহ মুসলিম ১৭৩১]
অপর বর্ণনায় আছে, এক যুদ্ধে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক নারীকে নিহত অবস্থায় দেখলেন। তখন নারী ও শিশুদের হত্যা করতে নিষেধ করলেন। [সহীহ বুখারী ৩০১৫] আরেক বর্ণনায় আছে, তোমরা অশীতিপর বৃদ্ধকে হত্যা করো না। [সুনানে আবু দাউদ ২৬১৪] হযরত ইবনে আব্বাস রা.কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি যুদ্ধে নারীদের নিয়ে যেতেন? তিনি উত্তরে বলেন যে, হ্যাঁ, নিয়ে যেতেন। তবে তারা আহতদের চিকিৎসার কাজ করতেন। আর গনীমত থেকে তাদের অনির্ধারিতভাবে কিছু দিয়ে দেওয়া হত। নিয়মতান্ত্রিক অংশ সাব্যস্ত করা হত না। [সহীহ মুসলিম ১৮১২] যুদ্ধে বন্দীদের কারও উপর অনুগ্রহ করে ছেড়ে দিতেন, কাউকে হত্যা করতেন, কাউকে মুক্তিপণ দিয়ে ছেড়ে দিতেন আর কাউকে বন্দীবিনিময় করে ছেড়ে দিতেন।ইসলাম গ্রহণ না করলে কাউকে কাউকে দাস বানিয়েছেন। বন্দীদের এক পরিবারের সদস্যদেরকে আলাদাভাবে বন্টন করতেন না বরং, একসাথে রাখতেন। [যাদুল মাআদ ৩/৯৯]
শত্রুগোয়েন্দাদের ক্ষেত্রে অবস্থাভেদে মৃত্যু দেওয়ার সিদ্ধান্তও নিয়েছেন। অপর দিকে আবু লুবাবা এবং হাতেব রা. কে মৃত্যুদণ্ড দেননি; বরং ক্ষমা করে দিয়েছেন। [যাদুল মাআদ ৩/১০৪, ১২১]
চুক্তি ও সন্ধির নীতিমালা:
চুক্তি ও সন্ধির নীতিমালায় মূল কথা ছিল, মুমিনগণের নগণ্য থেকে নগণ্য সদস্যের প্রদত্ত নিরাপত্তা কেউ ভঙ্গ করতে পারবে না। সকল মুমিন এক্ষেত্রে সমান ও অবিভাজ্য। যে চুক্তি ভঙ্গ করবে, কিয়ামতের দিন তার পশ্চাদ্দেশে এই গাদ্দারির পতাকা বহন করবে। যদি চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে চুক্তি সমাপ্ত করতে চায় তবে সেটা উভয়পক্ষের সমতার সাথে জানিয়ে দিতে হবে। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চুক্তির ক্ষেত্রে এই কঠোর নিয়ম অনুসরণ করেছেন। । বদর যুদ্ধে লোক স্বল্পতার মুহূর্তেও দুই সাহাবী যখন মুশরিকদের কথা দিয়েছিল যে, তারা মুসলমানদের সাথে অংশ নিবে না, তখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে যুদ্ধে অংশ নিতে নিষেধ করেন।নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রসিদ্ধ চুক্তি সমূহের মধ্যে ইহুদীদের তিনটি গোত্রের সাথে চুক্তি অন্যতম। চুক্তিভঙ্গের কারণে তাদের সকলের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, যার সংক্ষিপ্ত বিবরণ উপরে উল্লিখিত হয়েছে। চুক্তির একটি ধারা ছিল, শত্রুপক্ষের কেউ যদি চুক্তি ভঙ্গ করে আর অন্যরা তাকে সমর্থন করে তবে এটা সকলের চুক্তিভঙ্গ হিসেবে গণ্য হবে। এটাই প্রয়োগ হয়েছে ইহুদীদের তিন গোত্রের সাথে। এমনিভাবে চুক্তির অন্তর্ভুক্ত মিত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলে সেটাও চুক্তিভঙ্গ। যেমন হুদাইবিয়ার চুক্তি ভঙ্গ করার প্রসঙ্গে কুরাইশদের ক্ষেত্রে ঘটেছে। অনুরূপভাবে শত্রুদের দূতকে হত্যা করা হবে না। মুসাইলামা কাযযাবের দুই দূতকে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন যে, যদি দূতদের হত্যা না করার বিধান না থাকত, তাহলে তোমাদের দুজনকে আমি হত্যা করতাম। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্যতম আরেকটি সন্ধি ছিল খাইবারবাসীর সঙ্গে। বাৎসরিক অর্ধেক শস্যের বিনিময়ে তাদের সাথে সন্ধি হয়। তখনও জিযয়ার বিধান অবতীর্ণ হয়নি। জিযয়ার বিধান অষ্টম হিজরিতে সূরা বারাআহ-র মাধ্যমে নাযিল হয়। এরপর থেকে তিনি বিভিন্ন গোষ্ঠী থেকে চুক্তির মাধ্যমে জিযয়া গ্রহণ করেছেন। অগ্নিপূজক, আহলে কিতাব, নাসারাদের থেকে গ্রহণ করেছেন। তাবুক থেকে ফেরার সময় উকাইদারের সাথে জিযয়া চুত্তি হয়। হযরত মুআয রা. কে ইয়ামানে পাঠানোর সময় জিযয়া গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়। ‘হাজার’ অঞ্চলের অগ্নিপূজকদের থেকে জিযয়া নেওয়া হয়। আর মূর্তিপূজকরা তখন প্রায় সব মুসলমান হয়ে যাওয়ায় তাদের থেকে নেওয়া হয়নি। ইমাম আবু হানীফা র. এর মতে আরব নয় এমন মুশরিকদের থেকে জিযয়া নেওয়া যাবে। [বিস্তারিত, যাদুল মাআদ ৩/১১২]
গোয়েন্দা ও সংবাদ সংগ্রহের ব্যবস্থা:
বহুক্ষেত্রে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওহীর মাধ্যমে সংবাদ পেয়ে যেতেন। তবে তাঁর পক্ষ থেকে গোয়েন্দাও নিয়োজিত থাকত। যাদের মাধ্যমে তিনি সংবাদ গ্রহণ করতেন। সহীহ বুখারীর ৪১১৩ নং বর্ণনায় আছে যে, খন্দকের যুদ্ধের সময় বনু কুরাইযার সংবাদ সংগ্রহে হযরত যুবাইর রা.কে পাঠিয়েছিলেন। সহীহ মুসলিমের ১৯০১ নং বর্ণনায় আছে যে, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বদরের আগে বাসবাস/বাসীস রা.কে গোয়েন্দা হিসেবে আবু সুফিয়ানের ব্যবসায়ী কাফেলা পর্যবেক্ষণে পাঠিয়েছিলেন।এছাড়া উহুদ যুদ্ধের পর হযরত আলী রা.কে আবু সুফিয়ানের বাহিনী ফিরে আসে কিনা তা পর্যবেক্ষণে পাঠিয়েছিলেন। বলে দিয়েছিলেন যে, যদি তারা ঘোড়ার উপর আরোহী থাকে তাহলে তারা ফিরে আসবে, আর উটের উপর থাকলে ফিরে আসবে না। [তারিখে উম্মতে মুসলিমা ১/২৭০]
খাইবারে হুয়াই বিন আখতাবের চাচা স্বর্ণ ও অলঙ্কারের থলের তথ্য গোপন করলে যুবাইর রা.কে দায়িত্ব দেন। তখন তিনি তাকে শাস্তি দিয়ে তার থেকে তথ্য উদ্ধার করেন। [যাদুল মাআদ ৩/১২৯]
মুনাফিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা:
মুনাফিকদের বিষয়ে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সর্বদা সজাগ দৃষ্টি ছিল। বিশেষ হিকমতে তাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত ব্যবস্থা তিনি গ্রহণ করেননি। পঞ্চম হিজরীতে বনু মুস্তালিকের যুদ্ধে মুনাফিক সর্দার আব্দুল্লাহ বিন উবাই বিন সুলুলের একটি মন্তব্য (মদীনায় ফিরে আমাদের মধ্যে অধিক মর্যাদাবানেরা নিম্নমর্র্যাদার লোকদের অর্থাৎ মুসলমানদের মদীনা থেকে বের করে দিবে) এর প্রেক্ষিতে হযরত উমর রা. তাকে হত্যার অনুমতি চেয়েছিলেন। তখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষেধ করে দিয়ে বলেন, লোকেরা যেন এমন কথা বলাবলি না করে যে, মুহাম্মাদ তার সাথিদের হত্যা করে। [সহীহ বুখারী ৩৫১৮, সহীহ মুসলিম ২৫৮৪]
ইমাম নববী রহ. এই হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন যে, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটা এজন্য করতেন যেন মুসলমানদের শক্তি বৃদ্ধি পায়, ইসলামের দাওয়াত পূর্ণতায় পৌঁছে, (দুর্বল ঈমান) মুআল্লাফাতে কুলুবের অন্তরে ঈমান দৃঢ় হয় এবং অন্যরা যেন ইসলাম গ্রহণে আগ্রহী হয়।’ তবে মুনাফিকদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হত না, এমন নয়। একবার মুনাফিকদের ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে তাদের মসজিদে নববী থেকে মেরে টেনে হেঁচড়ে বের করে দেওয়া হয়। [সীরাতে ইবনু হিশাম ১/৫২৪]
এমনিভাবে গযওয়ায়ে তাবুক থেকে ফেরার পর তাদের ষড়যন্ত্রের কেন্দ্র হিসেবে নির্মিত মসজিদে জিরারকে আগুন জ্বালিয়ে ধ্বংস করে দেওয়া হয়। [তারিখে উম্মতে মুসলিমাহ ১/৩৬৪]

মদীনার বিচার ব্যবস্থা:
উপরে মদীনার সনদে উল্লেখ করা হয়েছে যে, যা কিছু নিয়েই মতবিরোধ হবে তার মীমাংসা নিয়ে আসতে হবে আল্লাহ তাআলার কাছে এবং নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে। কুরআনে কারীমে সূরায়ে নিসার ৬৫ নং আয়াতে আছে, আপনার রবের শপথ, তারা ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ না নিজেদের ঝগড়া-বিবাদে আপনাকে বিচারক মানে, অতঃপর আপনি যে ফায়সালা দেন, সে ব্যাপারে কোনরূপ কুণ্ঠাবোধ না করে এবং অবনত মস্তকে তা মেনে নেয়। মদীনায় অবস্থানকালে বিভিন্ন সময় সকল বিচারাচার বিষয়ে ধারাবাহিক বিধান অবতীর্ণ হয়। যার মধ্যে প্রধান শাস্তিগুলো যেগুলোকে হুদুদ বলা হয় তথা ব্যাভিচার, চুরি-ডাকাতি, মিথ্যা তোহমত, মদ্যপান ও কিসাসের বিধান দেওয়া হয়। সেই সাথে বেচাকেনা, বিবাহ-তালাক, ভূমি-আইনসহ যাবতীয় বিষয়ে বিধান দেওয়া হয়। যার বিস্তারিত আলোচনা ইলমুল ফিকহে করা হয়েছে। এই ছোট্ট নিবন্ধে তার বিস্তারিত তুলে আনা সম্ভব নয়। [বিস্তারিত দেখুন, সুবুলুল হুদা ওয়ার রশাদ ৯/১৬৫, যাদুল মাআদ ৫/৫]
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পুলিশপ্রধান ও জল্লাদগণ- যারা তাঁর নির্দেশে অপরাধীর দণ্ড বাস্তবায়ন করতেন:
হযরত আলী ইবনে আবু তালিব, যুবাইর ইবনুল আওয়াম, মিকদাদ বিন আমর, মুহাম্মদ বিন মাসলামাহ, আসেম বিন সাবেত বিন আকলাহ, জহহাক বিন সুফয়ান কিলাবী, হযরত কায়েস বিন সা’দ বিন উবাদাহ আল আনসারী নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পুলিশ প্রধানের ভূমিকায়। [যাদুল মাআদ ১/১২৩]
মদীনার বিচারকগণ:
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই ছিলেন প্রধান বিচারক। তবে কয়েকজন সাহাবী ছিলেন বিচারকগুণ সম্পন্ন। তাঁরা অনেক ক্ষেত্রে নবীজীর নির্দেশে বিচারাচার করতেন। যেমন, হযরত উমর রা., আলী রা., আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.,উবাই ইবনে কা’ব রা., যায়েদ বিন সাবেত রা., আবু মুসা আশআরী রা। এছাড়া বর্ণনায় পাওয়া যায়, হযরত উকবা বিন আমের রা., মা’কিল বিন ইয়াসার, মুআয বিন জাবাল, উমারাহ বিন হাযম,হুযাইফা রা. এর নাম। তবে তাঁরা কেউ স্থায়ী কাজী ছিলেন না।নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নির্দেশে তাঁরা বিচার করতেন। [সুবুলুল হুদা ওয়ার রশাদ ১১/৩২৫]
মদীনার মুফতীগণ:
হযরত আবু বকর, উমর, উসমান, আলী রা. নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগে ফতোয়ার কাজ করতেন। আরও ছিলেন মুআয বিন জাবাল রা., আব্দুর রহমান বিন আউফ, উবাই বিন কা’ব, যায়েদ বিন সাবেত, আম্মার বিন ইয়াসির, হুযাইফা ইবনে ইয়ামান, আবুদ্দারদা, আবু মুসা আশআরী রা.। [সুবুলুল হুদা ওয়ার রশাদ ১১/৩২৮]
নায়েব ও গভর্নরগণ:
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আবু বকর সিদ্দীককে নবম হিজরীতে হজ্বের আমীর নিযুক্ত করেন। তারপর হযরত আলী রা.কে পত্রপাঠের দায়িত্ব দিয়ে পাঠান। হযরত আলী রা. কে পরবর্তীতে খুমুস বণ্টন করার জন্য ইয়ামানে-ও পাঠান। কিসরার মৃত্যুর পর বাযান বিন সাসানকে ইয়ামানের গভর্ণর বানান। বাযানের মৃত্যুর পর শাহর বিন বাযানকে সানআ ও অধীভুক্ত এলাকাগুলো আমীর নিযুক্ত করা হয়। শাহর নিহত হওয়ার পর খালেদ বিন সাঈদ ইবনুল আসকে সনআর দায়িত্ব দেওয়া হয়। মুহাজির বিন আবি উমাইয়াকে কিনদাহ এবং সাদাফের দায়িত্ব দেওয়া হয়। যিয়াদ বিন লাবীদ আনসারীকে হাজারামওতের গভর্ণর বানিয়ে পাঠান। আবু মুসা আশআরীকে যাবীদ, আদান, যামা’, সাহিলের গভর্নর নিযুক্ত করেন। মুআয বিন জাবাল রা.কে জুনদের গভর্ণর নিযুক্ত করেন। আবু সুফিয়ান বিন হরবকে নাজরানের, ইয়াযিদ বিন আবু সুফিয়ানকে তাইমা’র, আত্তাব বিন আসীদকেমক্কার, আমর ইবনুল আসকে ওমানের গভর্নর নিযুক্ত করেন। সফরে গেলে মদীনায় স্থলাভিষিক্ত বানিয়ে যেতেন, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম রা.কে। [সুবুলুল হুদা ওয়ার রশাদ ১১/৩৩৮—৩৪০]
এছাড়া বেশ কয়েকজন সাহাবাকে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভূমি, খনি ও কূপ বরাদ্দ দিয়েছিলেন। [সুবুলুল হুদা ৯/৩৫]

বিভিন্ন বাদশাহদের কাছে চিঠি:
ষষ্ঠ হিজরীতে হুদাইবিয়ার সন্ধির পর বিভিন্ন বাদশাহদের কাছে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলাম ও অনুগত্যের দাওয়াতসহ চিঠি পাঠান। এটা ছিল মদীনার রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক বলিষ্ঠ অবস্থানের বহির্প্রকাশ। কমপক্ষে ৪৫ জন প্রতিনিধিকে তিনি বিভিন্ন শাসকদের কাছে পাঠান। দিহয়াহ কালবী, আব্দুল্লাহ বিন হুযাফাহ রা. তাঁদের অন্যতম। বাদশাহদের মধ্যে নাজাশী, কিসরা, কায়সারসহ তৎকালীন প্রসিদ্ধ বাদশাহগণ এর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। যাদের কেউ ইসলাম গ্রহণ করে আনুগত্য স্বীকার করে, আর কেউ বিপরিতটি করে। প্রত্যেকের সাথে উপযুক্ত আচরণ করা হয়। [বিস্তারিত, সুবুলুল হুদা ওয়ার রশাদ ১১/৩৪৭—৩৭৪]
নবীজীর লেখকগণ:
কমপক্ষে ৪৪ জন লেখক ছিলেন। যাদের মধ্যে প্রসিদ্ধ হলেন, চার খলীফা, তলহা বিন উবাইদুল্লাহ, যুবাইর ইবনুল আওয়াম, আবু সুফিয়ান বিন হারব, ইয়াযিদ বিন আবু সুফিয়ান, আমর ইবনুল আস, খালেদ ইবনুল ওয়ালীদ, উবাই বিন কা’ব রা. প্রমূখ। [বিস্তারিত, সুবুলুল হুদা ওয়ার রশাদ ১১/৩৭৫—৩৯৪]
সদকা ও যাকাত এবং অর্থ ব্যবস্থা:
ইসলামী অর্থব্যবস্থার ভিত্তি হলো যাকাত, উশুর, গনীমত, ফাই, জিযয়া, স্বেচ্ছা অনুদান ও চাঁদা এবং নফল সাদাকা। যাকাত সর্বাধিক প্রচলিত ও প্রবৃদ্ধিযোগ্য সম্পদে আবশ্যক করা হয়েছে। যথা স্বর্ণ-রূপা/নগদ অর্থ, গবাদি পশু, ব্যবসার সম্পদ ও ফসল- এমন আটটি খাতে বণ্টিত হবে। যা সূরা তাওবার ৬০ নং আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। গনীমত ও ফাইয়ের ব্যাখ্যা উপরে গিয়েছে। গনীমতের একপঞ্চমাংশ নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তাঁর পরিবার, অন্যান্য ইয়াতীম মিসকীন, মুসাফির ও প্রয়োজনগ্রস্থদের জন্য বরাদ্দ ছিল। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ইন্তেকালের পর তাঁর অংশ ও পরিবারে অংশ মানসুখ হয়ে গেছে। গনীমতের বাকি অংশ প্রথমত যাদের অংশ নির্ধারিত নেই তাদের দিতেন। অতঃপর যাদের অংশ নির্ধারিত আছে তাদের ভাগ করে দিতেন যার যার অংশ অনুপাতে; অশ্বারোহীর জন্য দুই অংশ আর পদাতিকের জন্য এক অংশ।খারাজ ও জিযয়া যেগুলো অমুসলিমদের থেকে কর হিসেবে নেওয়া হয়, সেগুলো ‘ফাই’। ফাই রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হবে এবং রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় কাজে ব্যায় হয়। জিযয়া নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা উপরেও করা হয়েছে। বিভিন্ন যুদ্ধের সময় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চাঁদা উত্তোলন করতেন। যেমন তাবুক যুদ্ধের আগে সাহাবায়ে কেরাম প্রতিযোগিতা করে চাঁদা দিয়েছিলেন। হযরত আবু বকর রা. ঘরের সবকিছু দান করেছিলেন। [বিস্তারিত,সদকা এবং যাকাত ও অর্থ ব্যবস্থা: যাদুল মাআদ ২/৫, জিযিয়া ও যিম্মাচুক্তি: ঐ ৩/১৩৭,আত্মীয় তথা বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিবের অংশ: ঐ ৩/৯৪, খাবারের খুমুস বের করা হবে না: ঐ ৩/৯৫, যুদ্ধ ছাড়া ফাই ব্যবহারের বিধান: ঐ ৩/৯৬, আরও দ্রষ্টব্য, ফতোয়ায়ে শামী ৪/১৩৭, যুদ্ধের খরচে চাঁদা উত্তোলন, তারিখে উম্মাতে মুসলিমাহ ১/৩৬০]
প্রতিনিধি দলের আগমণ:
বিদায় হজ্বের পূর্ব তাবুক যুদ্ধের পর ইসলামের বিজয় যখন সুপ্রতিষ্ঠিত এবং মদীনা রাষ্ট্র যখন সর্ব স্বীকৃত তখন দলে দলে বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রতিনিধি দল আসতে থাকে। যারা নিজেরাও ইসলাম গ্রহণ করে আনুগত্য স্বীকার করতেন অতঃপর নিজ গোত্রে গিয়েও দাওয়াতের কাজ করতেন। এর মধ্যে তায়েফ থেকে, বনু তামীম থেকে, বনু আসাদ, বনু ফাযারাহ, বনু মুররাহ থেকে, ইয়ামান, ওমান, বাহরাইন থেকে প্রতিনিধিরা এসে ইসলাম কবুল করেন। আদী ইবনে হাতিম, ওয়ায়েল ইবনে হুজর, জারীর ইবনে আব্দুল্লাহ, তামীম দারী তখন ইসলাম গ্রহণ করেন। [সুবুলুল হুদা ৬/২৫৪, তারিখে উম্মতে মুসলিমাহ ১/৩৬৭]
শেষ কথা:
আল্লাহ তাআলা নিজ প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করলেন। আল্লাহ তাআলা বলেছিলেন, ‘তারা তাদের মুখ দিয়ে আল্লাহর নুর নিভিয়ে দিতে চায়, কিন্তু আল্লাহ তার নুরকে অবশ্যই পরিপূর্ণ করবেন , তা কাফেরদের জন্য যতই অপ্রীতিকর হোক। তিনিই তো নিজ রাসূলকে হেদায়াত ও সত্য দীনসহ প্রেরণ করেছেন, তাকে সকল দীনের উপর বিজয়ী করার জন্য। তা মুশরিকদের জন্য যতই অপ্রীতিকর হোক।’ [সূরা আস সফ, ৮—৯]এই আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফতী তাকী উসমানী দা. বা. লিখেন, দলীল-প্রমাণের ময়দানে তো ইসলাম সর্বদা বিজয়ীই আছে এবং থাকবেও। তাছাড়া বাহ্যিক শক্তিতে মুসলিমদের বিজয়ী থাকার বিষয়টা বিভিন্ন শর্তের সাথে যুক্ত। সে সকল শর্ত বিদ্যমান থাকায় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, খোলাফায়ে রাশেদীন এবং তারপরও কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহ সকলের উপর বিজয়ী ছিল। অতঃপর তাদের দ্বারা সেসব শর্ত পূরণ না হওয়ার কারণে বিজয়ও তাদের হাতছাড়া হয়ে যায়। পরিশেষে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভবিষ্যদ্বানী মোতাবেক শেষ যামানায় আবার ইসলাম ও মুসলিম জাতী সারা বিশ্বে বিজয় লাভ করবে। [তাফসীরে তাউযীহুল কুরআন]
আল্লাহ তাআলা ইসলামকে বিজয়ী করার এই প্রতিশ্রুতি পূরণের কথা উল্লেখ করে বিদায় হজ্বের পর আয়াত অবতীর্ণ করেন, ‘আজ কাফেররা তোমাদের দীন সম্পর্কে নিরাশ হয়ে গেছে। অতএব তোমরা ওদের ভয় করো না, বরং আমাকে ভয় করো। আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের উপর আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য ইসলামকেই দীনরূপে পছন্দ করলাম।’ [সূরা মায়েদা, ৩]
আল্লামা শাব্বীর আহমাদ উসমানী রহ. এর ব্যাখ্যায় লিখেন, এই আয়াতখানী তখন অবতীর্ণ হয়েছিল, যখন মানবজীবনের প্রতিটি বিভাগ আর হেদায়েতের প্রতিটি অধ্যায়সংক্রান্ত মূলনীতি ও নিয়ম-কানুন এমনভাবে বর্ণিত হয়েছিল এবং শাখা-প্রশাখার বিবরণও এত তফসীল ও ব্যাপকতার সঙ্গে দেওয়া হয়েছিল যে, ইসলামের অনুসারীদের জন্য কিয়ামত পর্যন্ত আল্লাহর বিধান ছাড়া অন্য বিধান বিবেচনার যোগ্যই থাকেনি; যখন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তরবিয়তের ফলে এমন আজিমুশ্শান জামাত তৈরি হয়ে গিয়েছিল, কুরআনী শিক্ষার জীবন্ত নমুনা বলা যেতে পারত; যখন মক্কা-বিজয় হয়ে গিয়েছিল এবং সাহাবা রাযিয়াল্লাহু আনহুম পরিপূর্ণ বিশ্বস্ততার সাথে আল্লাহর সঙ্গে ওয়াদা-অঙ্গীকার পূর্ণ করছিলেন; যখন অত্যন্ত ঘৃণিত খাদ্য ও মৃত জন্তু ভক্ষণকারী জাতি বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক পবিত্রতার স্বাদ গ্রহণ করছিল, আল্লাহর নিদর্শনসমূহের আদব ও সম্মান অন্তরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল; ধারণা-কল্পনা এবং মূর্তিপূজার বেদী ও জুয়ার তীরের বেড়াজাল ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল এবং আরব উপদ্বীপকে শয়তানের পূজা থেকে চিরতরে নিরাশ করে দেওয়া হয়েছিল। এমনি এক ঐতিহাসিক পটভূমিতে ইরশাদ হলো—اليوم يئس الخ
(তাফসীরে উসমানী ১/৪৯০)

মোটকথা, তখন পুরো আরব উপদ্বীপ মুসলমানদের করতলগত হয়ে গেছে। সেখানে কাফেরদের সকল দর্প চূর্ণ হয়ে গিয়ে ইসলামের বিজয় প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছে। এই ভিত্তির উপর ভর করে পরবর্তীতে খোলাফায়ে রাশেদার আমলে তা আরও বিস্তৃতি লাভ করেছে। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদিও পরবর্তী খলীফা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করেননি; কিন্তু ঈঙ্গিত ও দিক নির্দেশনা দিয়ে গিয়েছিলেন। জীবনের অন্তিম মূহুর্তে নামায পড়ানোর দায়িত্ব উম্মতের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ সিদ্দীকে আকবার হযরত আবু বকর রা.কে দিয়েছিলেন। এছাড়া বলেছিলেন, নেতা কুরাইশ থেকে হবে। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের পর সাকীফায়ে বনু সায়েদায় হযরত উমর রা. হযরত আবু বকর রা. এর সেই ইমামতির উল্লেখ করেই সকলকে তাঁর খেলাফতের উপর একমত করেছিলেন। এভাবে পরবর্তী খলীফা নির্ধারণ হয়ে যায়। [বিস্তারিত, তারিখে উম্মতে মুসলিমাহ ১/৩৯৬]
মদীনার ইসলামী রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো নববী যুগেই দাঁড়িয়ে যায়। এরপর ধীরে ধীরে তা আরও বিস্তৃতি ও পূর্ণাঙ্গতা লাভ করে। বর্তমান যুগেও ইসলামী শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার জন্য এবং তার সুফল লাভ করার জন্য আমাদের মদীনার সেই পথ ও পন্থা অনুসরণ করা আবশ্যই। এ জন্য মদীনার ইসলাম ও ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার ইতিহাস নিয়ে আমাদের গভীর অধ্যায়ন ও চিন্তা করা প্রয়োজন। মদীনার শাসন ব্যবস্থার সর্বপ্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, শুধু শাসনক্ষমতা নয় বরং আদর্শের প্রতিষ্ঠা; জবরদস্তি নয় বরং দাওয়াত। এসবই ছিল এর প্রধান উপকরণ। আদর্শ প্রতিষ্ঠার খাতিরে এক সময় সামরিক শক্তি বৃদ্ধি এবং যথা সময়ে শক্তির যথার্থ প্রয়োগ এই ব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ মর্যাদায় আসীন করে। এই সংক্ষিপ্ত নিবন্ধে আমরা সকল দিক বিস্তারিত আলোচনায় আনতে পারিনি। মোটামুটি ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। অন্য কোনো পরিসরে আল্লাহ তাআলা চাইলে আরও বিস্তারিত আলোচনা করা যাবে। ওমা তাউফীকী ইল্লা বিল্লাহ। আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা সাইয়িদিনা মুহাম্মাদ ওয়ালা আলিহী ওয়া আসহাবিহী ওয়া সাল্লিম আমীন ইয়া রাব্বাল আলামিন।

মাওলানা সাঈদুর রহমান
মুদাররিস, মা‘হাদুল বুহুসিল ইসলামিয়া, ঢাকা।

Share: