(২০/০৭/২৬ ইং তারিখে বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়ার একজন সম্মানিত পরিদর্শক অত্র জামি‘আ পরিদর্শনে আসেন ও তালেবে ইলমদের নসীহত করেন। বিষয়বস্তুর গুরুত্ব বিবেচনায় দরসে আবরারের পাঠকদের জন্য বয়ানটি লিখিত আকারে পেশ করা হলো – দারুত তাসনীফ)

হামদ ও সালাতের পর,

সবাই তারবিয়্যাতের কথা বলে। আমরা- বেফাকের লোকেরা তা‘লীমের কথা বলি। কারণ, তা‘লীম নিয়েই আমাদের কাজ।এই কথাগুলা আমরা শুনবো কি সামি‘না ওয়া আসাইনা এর উদ্দেশ্যে? নাকি সামি‘না ওয়া আতা‘না (শুনলাম এবং অনুগত হলাম) এর নিয়তে? মানার নিয়তে শুনবো।

আমি বয়ান করলে আমার লাভ কি? আমার লাভ হল, যদি তোমাদের একজনও আমার কথা মানে, আর তার জীবন সুন্দর হয় ও সে জান্নাতে যায়, তাহলে আমাকেও সে জান্নাতে নিয়ে যাবে। আমাকে রেখে যাবে না।
মোমেনশাহীর বড় হুজুর (ফয়জুর রহমান সাহেব রহ.) একবার তার নাতিকে বললেন, দাদু তুমি আমাকে জান্নাতে নিয়া যাবা না? নাতি বলল, হাঁ নিয়ে যাবো। তবে একটা শর্ত আছে। সেটা হল, আপনি আমার জন্য দুআ করবেন, যেন আমি জান্নাতে যাই। বড় হুজুর ছিলেন মুস্তাজাবুদ্দাওয়াহ। নুরুদ্দীন গহরপুরী রহ. নিজে বলতেন যে, বড় হুজুর মুস্তাজাবুদ্দাওয়াহ। তার দুআ কবুল হয়। তারমানে নাতি দাদার দুআর বরকতে জান্নাতে যাবে। তারপর সে দাদাকেও নিয়ে যাবে।
যা হোক, আমার এই কষ্ট করার উদ্দেশ্যও একই। আমাকে তোমরা যেন জান্নাতে নিয়ে যাও।

তা‘লীমের উদ্দেশ্য:
তা‘লীমের জন্য সবার প্রথমে দরকার খালেস নিয়ত। আমাদের মাদরাসায় আসা মা‘লুমাত শেখার জন্য নয়। আমাদের মাদরাসায় আসার নিয়ত হবে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা। আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে আমি মাদরাসায় এসেছি।
এখন, নিয়ত যখন ঠিক হল, তখন নিয়তকে মাঝে মাঝে যাচাই করা দরকার ও নবায়ন করা দরকার। যাতে সবসময় নিয়তটা বিশুদ্ধ থাকে।

ইলম ধরে রাখার জন্য দুটি জিনিস জরুরী:
সহীহ নিয়ত করার পরের কাজ হল, এই ইলমকে আমার অন্তরে, আমার দেমাগে, আমার ক্বলবে বসানো। ইলম ক্বলবে বসানোর পর কতদিন ধরে রাখতে হবে? মৃত্যুর আগ পর্যন্ত? তাই যদি হয়, তাহলে মুনকার-নাকীরের প্রশ্নের জবাবে কি বলবে? তারমানে মৃত্যুর পরেও ইলম দরকার আছে| মৃত্যুর পর কতদিন? জান্নাতে যাওয়ার আগপর্যন্ত? তাই হলে আল্লাহ যখন বলবেন, ইক্বরা‘ ওয়ারতাক্বি (কুরআন তিলাওয়াত করতে থাকো আর অট্টালিকার উপরে উঠতে থাকো) তখন আমি কি করব? তারমানে বুঝা গেল জান্নাতেও ইলম দরকার| আর জান্নাত পর্যন্ত ইলম নিয়ে যেতে হলে সেটাকে উপযুক্ত স্থানে বসাতে হবে| এরজন্য দুটি বিষয় জরুরী:

এক. আমরা যে কিতাব পড়ি, কুরআন পড়ি। এগুলো কোথায় রাখি? বাথরুমে? নাকি সম্মানিত স্থানে? সম্মানিত স্থানে। তেমনি এই ইলমকে আমার ভেতরে রাখতে হলে আমার ভেতরটা পরিষ্কার থাকতে হবে। গুনাহমুক্ত থাকতে হবে। যদি আমি গুনাহ করি তাহলে ইলম আমার ভেতরে থাকবে না। কারণ ইলম সম্মানিত জিনিস। এটা অসম্মানিত স্থানে থাকবে না। গুনাহ করলে ধীরে ধীরে ইলম বের হতে থাকবে। এক পর্যায়ে তার ভেতরে আর ইলমের লেশমাত্র থাকবে না। এইজন্য আমরা কখনো, কোনো অবস্থাতেই, কিছুতেই গুনাহ করবো না।
দুই. কখনো, কোনো অবস্থাতেই, কিছুতেই উস্তাদের সাথে বেআদবী করা যাবে না।

উস্তাদের সাথে বেআদবীর পরিণাম:
থানবী রহ. লিখেছেন, উস্তাদের বেআদবীর পরিণামে চারটি আযাব আসে:
(১) ইলম থাকবে না| সে যা ইয়াদ করেছে সব ভুলে যাবে| (২) ঘরে-বাইরে সর্বত্র সে লাঞ্ছিত হবে| এই যে ক্বওমী মাদরাসার উস্তাযগণ খেদমত পান, এটা শুধুমাত্র বেআদবী না করার কারণে| টাকা-পয়সার হয়তো অভাব থাকে, কিন্তু অত্যন্ত সম্মানের সাথে তারা জীবন কাটান| আর যারা বেআদবী করে তারা সবজায়গায় লাঞ্ছিত হয়| (৩)জীবনে কখনও তার অভাব দূর হবে না| হয়তো অনেক টাকা উপার্জন করবে কিন্তু তাও অভাব লেগেই থাকবে| (৪) মৃত্যুর সময় কালিমা নসীব হবে না| যে কারণেই হোক, সে বেঈমান হয়ে মৃত্যুবরণ করবে|
এইজন্য খুব সাবধান| উস্তাযের সাথে বেআদবী করলে দুনিয়াও বরবাদ আখিরাতও বরবাদ|

ইলম অর্জন করার জন্য চারটি কাজ জরুরী:
তো, এই দুটি কাজ করলে ইলম তার ভেতরে থাকবে| সেটা জান্নাত পর্যন্ত যাবে| এটা তো গেল ইলম তার ভেতরে থাকা| আর এর আগে ইলম অর্জন করতে হবে| থানবী রহ. বলেন, ইলম অর্জন করতে হলে তালেবে ইলমের জন্য চারটি কাজ করা জরুরী:

এক. পরের দিনের সবক আগের দিন মুতালাআ করা| মুতালাআ তিনটি কাজকে বলে: (১) ইবারত শুদ্ধ করে আয়ত্ব করা| সাথে নাহবী-সরফী তাহক্বীক ও তরজমা পড়া| মনে রাখবা শুধু পরীক্ষায় ভালো করার নাম ইলম অর্জন না| নোট পড়ে অনেক ছাত্র ভালো ফলাফল করে| সে ভালো আলেম হতে পারবে না| (২) বাইনাস সুতূর (দুই লাইনের মধ্যবর্তী টিকা) পড়া| বুঝে আসুক বা না আসুক| (৩) হাশিয়া (দরসী কিতাবের পার্শ্ববর্তী ব্যাখ্যা/টিকা) পড়া| এই তিনটা কাজ করলে বলা যায় যে সে মুতালাআ করেছে|

দুই. প্রতিদিন মাদরাসায় উপস্থিত থাকা| উস্তায একটা সবকের পিছনে চল্লিশ মিনিট মেহনত করেন| একটা ছাত্রের যদি মাসে পাঁচদিন দরস ছুটে যায়, তাহলে দশ মাসে তার পঞ্চাশটা দরস ছুটে যাবে| প্রত্যেকটা চল্লিশ মিনিট করে| এই দরসগুলো তাকে কোনো উস্তায কি পড়িয়ে দেবে? দেবে না| এইজন্য সবসময় উপস্থিত থাকতে হবে| আর দরস ভালোভাবে বোঝার জন্য দুইটি কাজ করতে হবে: (১) ওযু করে দরসে বসতে হবে| (২) উস্তাযমুখী হয়ে দরস গ্রহণ করতে হবে|
বিজ্ঞান বলে, মানুষের আশি পার্সেন্ট শেখা হয় কানের মাধ্যমে| আর আল্লাহর রাসূলের একশ পার্সেন্ট ইলম অর্জন হয়েছে শোনার দ্বারা|
যদি উস্তাযের প্রতি মনোযোগী হয়ে দরস শোনে, উস্তাযের প্রতি যদি মুহাব্বাত থাকে, তাহলে আল্লাহ তাআলা ইলম দান করবেন| ফাসতামিউ‘ লাহু ওয়া আনসিতু- লাআল্লাকুম তুরহামুন| তোমরা মনোযোগ দিয়ে শোনো ও চুপ থাকো| আল্লাহ তাআলা তোমাদের উপর রহম করবেন অর্থাৎ তোমাদেরকে ইলম ওহী দান করবেন|

তিন. প্রতিদিন সবকের পর তাকরার করতে হবে| তাকরারের দুইটা পদ্ধতি আছে| একটা হলো, আমরা যেমন করেছি; একজন পড়বে, বাকিরা পড়া ধরবে| এভাবে তাকরার শেষ| আরেকটা পদ্ধতির কথা এখন আমরা বলে থাকি, নাযেমে তা‘লীমাত সাহেব বিষয়টা প্রয়োগ করে দেখতে পারেন| সেটা হলো, মুযাকারার পদ্ধতি| দুইজন করে জোড়া করে দিবেন| একজন ভালো বুঝে অন্য জন একটু কম বুঝে| যে বেশি ভালো সে আগে বুঝিয়ে বুঝিয়ে পড়াবে অন্যজনকে| পড়ানো শেষ হলে অন্যজনকে বলবে, তুমি আমাকে বুঝিয়ে দাও| সে তাকে বুঝিয়ে দেবে| এতে সে কতটুকু বুঝলো সেটা বুঝা যাবে| না পারলে আবারো বুঝাবে| এভাবে দুজনের পড়াই হয়ে যাবে|

চার. মাগরীব থেকে এশা পর্যন্ত পড়া ব্যতিত অন্য কোনো শোগল রাখা যাবে না| মুহতামিম সাহেবগণও বিষয়টা খেয়াল রাখবেন| মাদরাসার কোনো কাজ তখন রাখা যাবে না| এটা হলো সবক ইয়াদ করার মূল সময়| যেহেতু আসরের পরে কোনো কাজ করে নাই, এখন যেহেন খালি আছে| যা পড়বে তাই ঢুকবে ভেতরে|

এই চারটি কাজ করলে তার পড়া হয়ে যাবে| এটা আর কখনও ভুলবে না| থানবী রহ. বলেন, যে ছাত্র একটা পড়া পাঁচবার পড়বে, সে এটা আর কখনও ভুলবে না| ১. মুতালাআ করেছে| ২. উস্তায থেকে শুনেছে| ৩. নিজে দুর্বলকে পড়িয়েছে| ৪. দুর্বল থেকে শুনেছে| ৫. মাগরীবের পর পড়েছে| এর সাথে সে যদি গুনাহ না করে, উস্তাযের সাথে বেআদবী না করে, তাহলে তার এই ইলম জান্নাত পর্যন্ত থাকবে|

এহসানুল হক্ব মিলন শিক্ষাপ্রতিমন্ত্রী থাকাকালীন আব্দুল জব্বার সাহেব রহ. একবার তার কাছে গিয়েছিলেন| আমিও ছিলাম সাথে| মন্ত্রী জিজ্ঞাসা করলেন, কওমী মাদরাসায় ছাত্ররা নকল করে না কেন? কওমী মাদরাসায় নকল ধরা পড়ে না কেন? আব্দুল জব্বার সাহেব রহ. বললেন, কওমী মাদরাসায় নকল ধরা পড়ে না কারণ, আমরা দরজা বন্ধ করে তারপর আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করি| দরজা খুলে ফি সাবিলিল্লাহ ছেড়ে রাখি না| আমাদের ছাত্রদের নকল করার প্রয়োজন হয় না, কারণ, তারা কিতাব আগাগোড়া পড়ে| আনকমন বলতে কোনো বিষয় তাদের নাই| যেহেন কম, কিন্তু উস্তাযের দরসে যখন সে বসেছে, উস্তায এই সবকটা চল্লিশ মিনিট তাদের বুঝিয়েছেন| তার কিছু হলেও তার খেয়াল আছে| ওযুর ফরয তো পড়েছিল নয়টা, কিন্তু সব মনে নাই| চারটা তো কমপক্ষে মনে আছে| আরো মনে করে-টরে আরো দুইটা লিখতে পেরেছে| নয়টা পর্যন্ত যেতে পারে নাই| এই ছেলে কি ফেল করবে? করবে না| তার নকল করার দরকার কি?
প্রত্যেকটা প্রশ্নই এরকম| উস্তাযের পড়া দরসে মন দিয়ে শুনেছে, তারপর গুনাহ করে নাই| তাহলে তার মনে থাকবে না কেন? সব মনে না থাকলেও কিছু তো মনে থাকবে| আব্দুল জব্বার সাহেব বলেছিলেন, আপনার আলিয়া মাদরাসার যে ফার্স্টবয় তাকে আর আমার কওমী মাদরাসার যে মকবুল তাকে একত্রে পরীক্ষায় বসিয়ে দিন| কওমী মাদরাসার ছাত্র যদি ভালো না করেছে তখন আমাকে বলবেন| কারণ, আলিয়ার ছাত্রের কাছে কিছু না কিছু আনকমন থাকবেই| কিন্তু কওমীর এই ছাত্রের কাছে কোনো আনকমন নেই| কারণ, সে তো পুরো কিতাব পড়েছে|
এখন চিন্তা শুরু করেছে যে, আলিয়ার শিক্ষকরা তো নাহু সরফ পারে না, তাহলে কওমী শিক্ষক নাও| কিন্তু তাদের নেয়ার উপায় কি? মুজাব্বিদ পরীক্ষা (ক্বারী) নিয়ে তাদের আলিয়ায় ঢোকাও| তারপর আস্তে আস্তে তাকে নাহু-সরফ-আদব সব দাও| পাঁচ বছর পরে বলবে যে, এরা যদি হাইয়ার কেরাতের সনদ নিয়ে দাখিল মাদরাসার ক্বারী শিক্ষক হতে পারে, তাহলে দাওরায়ে হাদীসের সনদ নিয়ে হাদীস কেন পড়াতে পারবে না? আস্তে আস্তে সবই হবে| ভালো করে পড়ালেখা করলে আল্লাহ তাআলা দুনিয়ায়ও পথ খুলে দেবেন|

এশার পরের কাজ:
এখন বাকি থাকে এশার পর| এশার পর কি করবে?
এশার পর হাতের লেখা লিখবে| হাতের লেখার বিষয়বস্তু হলো, উস্তায প্রতিদিনের দরস থেকে একটা করে প্রশ্ন করে সেটার উত্তর লিখতে দিয়ে যাবেন| তালেবে ইলম সেটাই হাতের লেখা হিসেবে লিখবে| এভাবে যদি একশ দিনও দরস হয়, তাহলে একশটা প্রশ্ন লেখানো হলো| পরীক্ষা কি এর বাইরে থেকে আসবে? আসবে না| এইকাজ যে ছাত্র করবে, তার পরীক্ষার জন্য পড়তে হবে না| আগের দিন দরস শেষ- পরের দিনই সে পরীক্ষা দিতে পারবে|
তো, কোনো তালেবে ইলম যদি আগের কাজগুলোর সাথে এই চারটি কাজ করে তাহলে সে জান্নাত পর্যন্ত ইলম ইয়াদ রাখতে পারবে| শেখার সময় কিন্তু শরহে বেকায়া পর্যন্তই| এরপর আর আর শেখার সময় নাই| এই সময়েই এই চারটি কাজ খুব গুরুত্ব দিয়ে করতে হবে| সাথে গুনাহমুক্ত থাকতে হবে| আল্লাহ তাআলা আমাদের এই সকল বিষয়ের উপর আমল করার তাওফীক দান করুন| আমীন|

(ঈষৎ পরিমার্জিত)

Share: