আল্লামা ইউসুফ বানূরী রহ.

দুনিয়ার যেকোনো বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করতে হলে সেই বিষয়ে পারদর্শী কারও কাছে থেকে শেখা জরুরি। সাধারণ কোনো কারিগরি কাজ বা পেশা শিখতেও একজন শিক্ষক ও পথপ্রদর্শকের প্রয়োজন হয়। শুধু নিজের বুদ্ধি, মেধা ও স্বাভাবিক প্রতিভার জোরে সঠিকভাবে কোনো বিষয়ে পূর্ণ দক্ষতা অর্জন করা যায় না।

ইঞ্জিনিয়ারিং হোক, ডাক্তারি হোক কিংবা অন্য যেকোনো শিল্প ও পেশা—সব ক্ষেত্রেই শুরুতে একজন শিক্ষকের প্রয়োজন হয়। কারণ, মানুষের বুদ্ধিকে সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তির দিকনির্দেশনা দরকার।

মানুষের বুদ্ধি থেকে তৈরি বিভিন্ন জ্ঞান ও বিদ্যা অর্জনের জন্য যখন একজন দক্ষ শিক্ষকের সান্নিধ্য প্রয়োজন, তখন নবীদের মাধ্যমে আসা জ্ঞান, তাঁদের শিক্ষা এবং শরিয়তের গভীর সত্য ও তত্ত্ব বোঝার জন্য শিক্ষক ও পথপ্রদর্শকের প্রয়োজন হবে না—এ কথা কীভাবে বলা যায়?

কারণ, এসব জ্ঞান কেবল মানুষের বুদ্ধি ও চিন্তার মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব নয়। আল্লাহ তাআলা ওহির মাধ্যমে নবীদের কাছে এসব জ্ঞান দান করেছেন এবং নবীদের মাধ্যমে তা উম্মতের কাছে পৌঁছেছে। আসমানি তরবিয়ত ও আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত হিদায়াত ও নির্দেশনার মাধ্যমেই এ জ্ঞানের ধারা চলতে থাকে।

এসব রব্বানি জ্ঞানের ক্ষেত্রে শুধু কিতাবের শব্দ ও বক্তব্য জানাই যথেষ্ট নয়। একজন মুরব্বির বিশেষ দৃষ্টি, তাঁর সান্নিধ্য এবং তাঁর জীবন ও কর্ম থেকে শিক্ষা নেওয়ারও বড় ভূমিকা রয়েছে। এখানে শুধু পড়াশোনার চেয়ে চিন্তা, মন-মানসিকতা ও কাজের সংশোধন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

তাই কোনো বুযুর্গ ও কামিল ব্যক্তির সান্নিধ্য যত দীর্ঘ হবে, তত বেশি উপকার ও পূর্ণতা লাভের সুযোগ হবে। আর শিক্ষক ও পথপ্রদর্শক যত বেশি যোগ্য ও পরিপূর্ণ হবেন, তাঁর কাছ থেকে তত বেশি শিক্ষা ও উপকার পাওয়া যাবে।

নববী জ্ঞানের উদ্দেশ্য হলো মানুষকে সঠিক পথ দেখানো এবং আল্লাহর বান্দাদের হিদায়াতের দিকে নিয়ে যাওয়া। তাই এসব বিষয় বুঝতে ও ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শয়তানের ধোঁকা এবং পথভ্রষ্ট হওয়ার আশঙ্কা খুব বেশি থাকে।

যে দক্ষতা মানুষ কেবল দুনিয়ার লাভের জন্য অর্জন করে, সেখানে শয়তান সাধারণত খুব একটা মাথা ঘামায় না। সেখানে তাকে বিশেষভাবে হস্তক্ষেপ করতে হয় না। কিন্তু যেখানে আখিরাত, দ্বীন ও হিদায়াতের বিষয় আসে, সেখানে শয়তান মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য নানা রকম চেষ্টা করে। সে চায়, কোনোভাবে সঠিক পথ ও হিদায়াতকে ভুল পথ ও গোমরাহিতে পরিণত করতে।

ইবলিসের সবচেয়ে বড় কৌশলগুলোর একটি হলো তালবিস। অর্থাৎ হক ও বাতিলকে এমনভাবে মিশিয়ে দেওয়া, যাতে বাইরে থেকে কোনো বিষয় ভালো ও সঠিক মনে হলেও বাস্তবে তা ক্ষতিকর ও ভুল হয়।

এর সঙ্গে মানুষের নফসের নানা দুর্বলতাও কাজ করে। মানুষের মধ্যে অহংকার আছে, নিজের সম্পর্কে অতিরিক্ত ধারণা আছে, লোক দেখানোর প্রবণতা আছে, নাম-যশের আকাঙ্ক্ষা আছে, পদ-মর্যাদা ও নেতৃত্বের প্রতি লোভ আছে। এগুলো এমন কঠিন ব্যাধি যে, অনেক সময় বছরের পর বছর সাধনা ও আত্মসংযমের চেষ্টা করেও তা পুরোপুরি দূর করা যায় না।

তাই নফস ও শয়তানের প্রভাব থেকে বাঁচার জন্য দীর্ঘদিন কোনো কামিল ও অভিজ্ঞ ব্যক্তির সান্নিধ্যে থাকা দরকার। এরপর আল্লাহ তাআলার বিশেষ অনুগ্রহ হলে মানুষের সংশোধন হয়। নইলে সে নিজের জ্ঞান ও বুদ্ধির ওপর ভর করে পথ হারিয়ে এদিক-সেদিক ঘুরতে থাকে।

জ্ঞান-বিজ্ঞানের ইতিহাস পড়লে দেখা যায়, অনেক বড় বড় ফিতনা অত্যন্ত মেধাবী ও প্রতিভাবান ব্যক্তিদের মাধ্যমেই সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে বহু ফিতনা জ্ঞানের পথ ধরেই এসেছে।

এমনকি হক্কানি আলেমদের মধ্যেও অনেক অসাধারণ মেধাবী ব্যক্তি নিজের তীক্ষ্ণ বুদ্ধির কারণে উম্মতের মূলধারা থেকে আলাদা হয়ে ভুল চিন্তা ও মতবাদের শিকার হয়েছেন। এর একটি বড় কারণ হলো, তাঁরা নিজেদের জ্ঞান ও মেধার ওপর অতিরিক্ত ভরসা করেছেন। ফলে তাঁদের মধ্যে জ্ঞানগত অহংকার এবং নিজের মতের প্রতি অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছে।

তাঁরা দীর্ঘদিন কোনো যোগ্য ব্যক্তির সান্নিধ্য পাননি। ফলে কোথা থেকে কোথায় গিয়ে পৌঁছেছেন!

আমাদের যুগেও এর অনেক উদাহরণ আছে। এ ধরনের ব্যক্তিদের মধ্যে সাধারণত জ্ঞান ও মেধা থাকে। অনেক সময় তাঁরা খুব ভালো কথাও বলেন এবং ভালো লেখেন। কিন্তু সমস্যা হলো, তাঁদের সেই ভালো কথাগুলোই অনেক সময় মানুষের কাছে তাঁদের ভুল চিন্তাগুলো গ্রহণযোগ্য করে তোলে।

যাঁদের গভীর ইলমি জ্ঞান বা অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের দীর্ঘ সান্নিধ্য নেই, তাঁরা খুব সহজেই এ ধরনের লোকদের ভক্ত হয়ে যান। এরপর তাঁদের এমন সব নতুন ও ব্যতিক্রমী চিন্তাধারারও সমর্থন করতে শুরু করেন, যা উম্মতের মূলধারা থেকে আলাদা।

আর শয়তান তো নিজের কাজ করেই যাচ্ছে।

যে ব্যক্তি উম্মতের হিদায়াত ও কল্যাণের জন্য কাজ করতে পারতেন, তিনিই শেষ পর্যন্ত উম্মতের মধ্যে ভুল পথ ও বিভ্রান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ান। প্রত্যেক যুগেই এর উদাহরণ রয়েছে।

ইমাম গাজালি রহ. তাঁর ‘মাকাসিদুল ফালাসিফা’ গ্রন্থে বলেছেন, গ্রিকদের গণিত, জ্যামিতি ও অন্যান্য কিছু সঠিক জ্ঞান দেখে মানুষ তাদের সব চিন্তা ও মতবাদকেই সঠিক বলে ধরে নিয়েছিল। ফলে প্রকৃতিবিদ্যা ও ইলাহিয়াতের ক্ষেত্রে তাদের ভুল চিন্তাগুলোও অনেকে গ্রহণ করে পথভ্রষ্ট হয়েছে।

ইমাম গাজালি রহ.-এর এ কথাটি অত্যন্ত গভীর এবং বাস্তব। কারণ, এ ধরনের সুযোগে শয়তান মানুষকে বিভ্রান্ত করার বড় সুযোগ পেয়ে যায়।

যখন অত্যন্ত জ্ঞানী ও অসাধারণ মেধাবী ব্যক্তিরাও ফিতনার শিকার হতে পারেন, তখন এমন ব্যক্তিদের অবস্থা কী হতে পারে, যাঁদের প্রকৃত ইলমি যোগ্যতা কম, কিন্তু লেখার ক্ষমতা অনেক বেশি; যাঁরা কামিল ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত; অথচ স্বভাবগতভাবে মেধাবী ও প্রতিভাবান?

এ ধরনের মানুষ খুব দ্রুত নিজের মতের প্রতি অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস ও আত্মমুগ্ধতায় আক্রান্ত হতে পারেন। এরপর তাঁরা গোটা উম্মতকে তুচ্ছজ্ঞান করতে শুরু করেন, উম্মতের দীর্ঘ ইলমি ঐতিহ্যকে হেয় করেন, সালাফে সালেহিনের কীর্তিকে বিদ্রূপ করেন এবং শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবার সমালোচনায় লিপ্ত হন। এভাবে তাঁরা নিজেরাও গভীর গোমরাহির মধ্যে পড়ে যান এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্যও বিভ্রান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ান।

এ ধরনের ব্যক্তিদের মধ্যে বর্তমান যুগের একটি পরিচিত ব্যক্তিত্ব হলেন জনাব আবুল আ‘লা সাহেব মওদূদী।

শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী ও প্রতিভাবান। কিন্তু পারিবারিক আর্থিক সমস্যার কারণে তাঁর পড়াশোনা এগোতে পারেনি। প্রথমে তিনি ‘মদিনা বিজনৌর’ পত্রিকায় চাকরি করেন। পরে দিল্লিতে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সংবাদপত্র ‘মুসলিম’-এর সঙ্গে যুক্ত হন। কয়েক বছর পর তিনি দিল্লি থেকে প্রকাশিত জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের মুখপত্র ‘আল-জমিয়ত’ পত্রিকায় কাজ শুরু করেন। সম্ভবত পত্রিকাটি সপ্তাহে তিন দিন প্রকাশিত হতো।

‘তারিখের জওহরপারা’ শিরোনামে তাঁর প্রবন্ধগুলো বেশ আকর্ষণীয়ভাবে প্রকাশিত হতো। এভাবে মাওলানা আহমদ সাঈদ সাহেবের মাধ্যমে তাঁর লেখার চর্চা ও বিকাশ ঘটতে থাকে।

পিতার মৃত্যুর কারণে তিনি তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা সম্পূর্ণ করতে পারেননি। শুধু তাই নয়, তাঁর আরবি শিক্ষাও প্রাথমিক স্তরের কিতাবগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। আধুনিক শিক্ষারও তিনি কোনো উচ্চতর স্তরে যেতে পারেননি।

তিনি ব্যক্তিগতভাবে ইংরেজি শিখেছিলেন এবং ভাষাটির সঙ্গে কিছুটা পরিচিতি গড়ে তুলেছিলেন। সে সময়ের ভালো লেখকদের বই, লেখা এবং বিভিন্ন পত্রপত্রিকা পড়ে তিনি অনেক উপকৃত হন। এভাবেই তাঁর লেখার দক্ষতা দিন দিন বাড়তে থাকে।

কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, তিনি কোনো দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা লাভ করতে পারেননি। আধুনিক শিক্ষায়ও কোনো ডিগ্রি অর্জন করতে পারেননি। আবার কোনো অভিজ্ঞ ও সুপ্রতিষ্ঠিত আলেমের দীর্ঘ সান্নিধ্যও তাঁর হয়নি।

এক প্রবন্ধে তিনি নিজেও এ বিষয়টি স্বীকার করেছেন। বহু আগে ভারতের মাওলানা আবদুল হক মাদানী মুরাদাবাদীর জবাবে প্রকাশিত এক লেখায় এ বিষয়ে তাঁর স্বীকারোক্তি রয়েছে।

বরং লেখকের ভাষায়, তাঁর দুর্ভাগ্য ছিল যে, নিয়াজ ফতেহপুরীর মতো একজন নাস্তিক ও জিন্দিক ব্যক্তির সান্নিধ্য তিনি পেয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব ছিল এবং সেই সঙ্গ ও সম্পর্কের কারণে তাঁর মধ্যে অনেক ভুল চিন্তা ও প্রবণতা তৈরি হয়।

১৯৩৩ সালে হায়দরাবাদ দাক্ষিণাত্য থেকে তিনি মাসিক ‘তারজুমানুল কুরআন’ প্রকাশ শুরু করেন। সেখানে তিনি জোরালো ও আকর্ষণীয় ভাষায় বিভিন্ন প্রবন্ধ লিখতে থাকেন। ধীরে ধীরে তাঁর কিছু ইলমি ও সাহিত্যিক লেখা মানুষের নজর কাড়তে শুরু করে।

সে সময় ভারতের রাজনৈতিক পরিবেশ ছিল খুবই উত্তাল। স্বাধীনতা আন্দোলন তখন একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে ছিল এবং দেশের বড় বড় চিন্তাবিদ ও মেধাবীরা সে দিকেই মনোযোগী ছিলেন।

মওদূদী সাহেব সবার থেকে আলাদা হয়ে ‘ইকামাতে দ্বীন’ ও ‘হুকুমতে ইলাহিয়া’-র কথা বলতে শুরু করেন। তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন শক্তি ও দলের সমালোচনাও করেন।

তাঁর সরলমনা প্রশংসাকারীরা মনে করতে লাগলেন, বুঝি কায়েমি দ্বীনের শেষ ভরসা এখন একমাত্র মওদূদী সাহেবই। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই মাওলানা সাইয়্যিদ সুলায়মান নদভী রহ., মাওলানা মানাযির আহসান গীলানী রহ. এবং আবদুল মাজিদ দরিয়াবাদী রহ.-এর মতো ব্যক্তিদের কাছ থেকেও তিনি প্রশংসা লাভ করতে থাকেন।

তখন অবশ্য ‘মওদূদী’ বলতে কেবল একজন ব্যক্তিকেই বোঝানো হতো। তখনো তাঁর কোনো সুসংগঠিত দাওয়াত, জামাআত বা আন্দোলন গড়ে ওঠেনি। তাঁর লেখা ও জোরালো বক্তব্য দেখে কিছু হকপন্থী আলেম তাঁর সম্পর্কে আশাবাদী হয়েছিলেন।

তাঁর আগ্রহ এবং চৌধুরী মুহাম্মদ নিয়াজের উৎসাহে পাঠানকোটে ‘দারুল ইসলাম’ প্রতিষ্ঠা করা হয়।

এদিকে মুসলিম লীগ ও কংগ্রেসের মধ্যে রাজনৈতিক টানাপোড়েন শুরু হয়ে গিয়েছিল। মওদূদী সাহেবের কলম থেকে এ সময় বিভিন্ন লেখা বের হয় এবং রাজনৈতিক টানাপোড়েন নিয়ে তাঁর একটি গ্রন্থও প্রকাশিত হয়। এসব লেখার জন্য তিনি সমমনাদের প্রশংসা পান এবং তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতিও তাঁর চিন্তাধারার প্রসারে সহায়ক হয়।

পরে লাহোরে একটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় এবং সেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে আমিরাতের ভিত্তি স্থাপন করা হয়। সেখানে তাঁর লিখিত একটি বক্তৃতা পাঠ করা হয়, যাতে বলা হয়েছিল, একজন আমিরের মধ্যে কী কী গুণ থাকা প্রয়োজন।

সে সমাবেশে মাওলানা মুহাম্মদ মানযূর নুমানী রহ., মাওলানা আবুল হাসান আলী নদভী রহ., মাওলানা আমীন আহসান ইসলাহী এবং মাওলানা মাসউদ আলম নদভীর মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও উপস্থিত ছিলেন।

একজনকে প্রধান আমির নির্বাচিত করা হলো এবং উল্লিখিত চারজনকে তাঁর অধীনস্থ আমির নির্বাচিত করা হলো।

এভাবেই আনুষ্ঠানিকভাবে জামাআতে ইসলামী গঠিত হলো। এর গঠনতন্ত্র তৈরি হলো, ঘোষণাপত্র প্রকাশিত হলো। মানুষের দৃষ্টি এদিকে ফিরল এবং চারদিকে এ জামাআতকে ঘিরে নানা আশা জন্ম নিতে লাগল।

কিন্তু ছয় মাসও হয়তো পার হয়নি, এর মধ্যেই মাওলানা মানযূর নুমানী রহ. ও মাওলানা আলী মিয়াঁ রহ. পদত্যাগ করেন।

লেখকের মতে, তাঁরা মওদূদী সাহেবের ইলমি দুর্বলতা এবং তাঁর মধ্যে ইখলাসের অভাব দেখতে পেয়েছিলেন। এ কারণে তাঁরা তাঁর সঙ্গে আর চলতে পারেননি।

তবে তাঁরা বিষয়টি প্রকাশ্যে আনেননি। উম্মতের সামনে তাঁরা স্পষ্টভাবে বলেননি যে, কেন তাঁরা আলাদা হয়ে গেলেন।

লেখক বলেন, সে সময় তিনি জামিয়া ইসলামিয়া ডাভেলে শিক্ষকতা করতেন। তিনি এই দুই বুযুর্গের কাছে তাঁদের আলাদা হওয়ার কারণ জানতে চেয়েছিলেন। তাঁরা অনেক কথাই বলেছেন, কিন্তু স্পষ্ট করে কোনো কারণ জানাননি। তবে লেখকের ধারণা, তিনি বিষয়টি বুঝতে পেরেছিলেন।

মাওলানা মাসউদ আলম নদভী রহ. ও মাওলানা আমীন আহসান ইসলাহীর বিশ্বাস ও কর্মপদ্ধতির সঙ্গে মওদূদী সাহেবের অনেক বিষয়ে মিল ছিল। এ দুই ব্যক্তি দীর্ঘদিন তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন।

মাওলানা মাসউদ আলম নদভী রহ. আরবি সাহিত্যের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ খেদমত করেছেন। তিনি মওদূদী সাহেবের বিভিন্ন লেখা ও বই আরবিতে অনুবাদ করেছেন এবং কয়েকজন ছাত্রকেও সাহিত্যিক প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।

অন্যদিকে মাওলানা আমীন আহসান ইসলাহী তাঁর নিজস্ব ইলমি রুচি ও পদ্ধতির মাধ্যমে মওদূদী সাহেবের আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রেখেছেন।

ভালো ভালো কর্মী, লেখক ও বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষ ব্যক্তিরাও এ আন্দোলনে যুক্ত হন। কমিউনিজমের বিরুদ্ধে এবং বিভিন্ন দ্বীনি বিষয়ে বেশ কিছু ভালো বই লেখা হয়। সুদ, মদ ও পর্দা নিয়ে ভালো বই প্রকাশিত হয়। ‘তাফহীমাত’‘তানকীহাত’-এও কিছু ভালো প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। আধুনিক প্রজন্মের সংশোধনের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন বই লেখা হয়।

আরব দেশগুলো, বিশেষ করে সৌদি আরবকে প্রভাবিত করার জন্য এবং সেখানকার শায়খদের নিজেদের চিন্তাধারার কাছাকাছি আনার জন্যও নানা পদ্ধতিতে কাজ করা হয় এবং এতে বেশ কিছু সফলতাও আসে।

সহযোগীদের লেখা ও কাজ এমনভাবে তুলে ধরা হতো যে, মনে হতো সবকিছুই মওদূদী সাহেবের দিকনির্দেশনা ও প্রেরণার ফল। এভাবে তাঁর ব্যক্তিগত প্রভাব ও মর্যাদা বাড়তে থাকে। জামাআতের বিভিন্ন সদস্যের লেখা ও কাজ থেকেও তাঁর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে থাকে।

লেখকের অভিযোগ হলো, মওদূদী সাহেব নিজে আরবি লিখতে বা বলতে পারতেন না। ইংরেজি লেখার ক্ষেত্রেও তাঁর দক্ষতা ছিল না। কিন্তু তাঁর বইগুলো যখন আরবিতে অনুবাদ করা হতো, তখন সেগুলোর প্রচ্ছদে লেখা হতো—‘তালীফাতে মওদূদী’, অর্থাৎ মওদূদীর রচনাবলি।

কোথাও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হতো না যে, এটি মাওলানা মাসউদ আলমের অনুবাদ কিংবা আসিম হাদ্দাদের অনুবাদ। ফলে সাধারণ মানুষ মনে করতে লাগল, উর্দুর একজন সাহিত্যিক হওয়ার পাশাপাশি তিনি বুঝি আরবি সাহিত্যেও একজন বড় ব্যক্তিত্ব।

কিন্তু অল্প কিছুদিনের মধ্যেই মাওলানা গীলানী রহ. ও হজরত সাইয়্যিদ সুলায়মান নদভী রহ. সতর্ক হয়ে ওঠেন। তাঁরা মনে করতে শুরু করেন, এসব লেখার মাধ্যমে নতুন ধরনের ফিতনা সৃষ্টি হচ্ছে।

এরপর আগে যেসব সম্মানসূচক কথা বলা হতো এবং ‘মুতাকাল্লিমে ইসলাম’ ইত্যাদি উপাধি ব্যবহার করা হতো, তা বন্ধ হয়ে যায়।

মাওলানা গীলানী রহ. ‘সিদক-এ জাদীদ’ পত্রিকায় ‘খারিজিয়াতে জাদীদা’ শিরোনামে একটি সমালোচনামূলক প্রবন্ধ লেখেন।

উলামায়ে কেরামের মধ্যে সম্ভবত হজরত মাওলানা সাইয়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানী রহ. প্রথম ব্যক্তি ছিলেন, যিনি তাঁর বিভিন্ন চিঠিতে এ ফিতনার প্রতি ইঙ্গিত করেছিলেন।

ধীরে ধীরে উম্মতের বিভিন্ন আলেম এ বিষয়ে লেখা শুরু করেন।

হজরত মাওলানা শায়খুল হাদিস মুহাম্মদ যাকারিয়া রহ. সে সময় পর্যন্ত মওদূদী সাহেবের যেসব লেখা ও বই প্রকাশিত হয়েছিল, সব পড়ে একটি বিস্তারিত পুস্তিকা লিখেছিলেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, সেটি ছাপা হয়নি।

এ প্রসঙ্গে মাজাহিরুল উলূমের একজন শিক্ষক মাওলানা মুহাম্মদ যাকারিয়া কুদ্দুসী সাহেব মওদূদী সাহেবের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর সংশোধনের উদ্দেশ্যে হজরত শায়খুল হাদিস রহ. একটি চিঠি লেখেন। পরে সেটি ‘ফিতনায়ে মওদূদিয়াত’ নামে একটি পুস্তিকা আকারে প্রকাশিত হয়।

লেখক বলেন, মওদূদী সাহেবের অনেক লেখা ও কথা তাঁর ভালোও লেগেছে, আবার অনেক কিছু অপছন্দও হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন তিনি তাঁকে কঠোরভাবে সমালোচনা করতে চাননি।

বরং তাঁর আধুনিক ভাষা ও লেখার ধরন দেখে লেখকের মনে হতো, আধুনিক প্রজন্ম তাঁর লেখার ভালো দিকগুলো থেকে উপকৃত হোক।

যদিও কখনো কখনো তাঁর লেখায় এমন কিছু কথা এসেছে, যা সহ্য করা কঠিন ছিল, তবুও দ্বীনি স্বার্থের কথা চিন্তা করে লেখক তা সহ্য করেছেন এবং নীরব থেকেছেন।

কিন্তু তিনি তখন ভাবতেও পারেননি যে, এই ফিতনা একদিন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে এবং বিশেষ করে আরব দেশগুলোতেও ব্যাপক প্রভাব ফেলবে।

আর তাঁর লেখনী থেকে একের পর এক নতুন নতুন বক্তব্য ও চিন্তার জন্ম হতে থাকবে। এমনকি সাহাবায়ে কেরাম রা. এবং আম্বিয়ায়ে কেরামের ব্যাপারেও অশোভন শব্দ ব্যবহার করা হবে।

শেষ পর্যন্ত ‘তাফহীমুল কুরআন’, ‘খিলাফত ও মুলুকিয়াত’ এবং ‘তারজুমানুল কুরআন’-এ দিন দিন এমন সব বিষয় তাঁর চোখে পড়তে লাগল যে, তিনি বুঝতে পারলেন—নিঃসন্দেহে মওদূদী সাহেবের লেখালেখি ও রচনাবলি বর্তমান যুগের সবচেয়ে বড় ফিতনাগুলোর একটি।

যদিও তাঁর লেখায় কিছু উপকারী আলোচনা রয়েছে, তবুও লেখকের মতে বিষয়টি সেই কুরআনের কথার মতো—

وَإِثْمُهُمَا أَكْبَرُ مِنْ نَفْعِهِمَا

অর্থাৎ, তাদের ক্ষতি তাদের উপকারের চেয়ে বেশি।

এখন পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, নীরব থাকাটাই লেখকের কাছে বড় অপরাধ বলে মনে হচ্ছে। গত চল্লিশ বছর তিনি যে নীরব থেকেছেন, সে জন্যও এখন তাঁর আফসোস হচ্ছে।

তাই তিনি মনে করছেন, এখন সময় এসেছে—কোনো নিন্দুকের নিন্দার ভয় না করে মওদূদী সাহেবের সব রচনা ও লেখা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ভালোভাবে পড়ে দেখা এবং হক, ইনসাফ ও দ্বীনের হেফাজতের স্বার্থে যা বলা ও করা প্রয়োজন, তা করা।

وَاللّٰهُ سُبْحَانَهُ وَلِيُّ التَّوْفِيقِ

Share: