الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ (2) الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ (3) مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ (4) إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ (5) اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ (6) صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ )٧
যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহ তা`আলার যিনি সকল সৃষ্টি জগতের পালনকর্তা। যিনি নিতান্ত মেহেরবান ও দয়ালু। যিনি বিচার দিনের মালিক। আমরা একমাত্র তোমারই ইবাদত করি এবং শুধুমাত্র তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করি। আমাদেরকে সরল পথ দেখাও, সে সমস্ত লোকের পথ, যাদেরকে তুমি নেয়ামত দান করেছ। তাদের পথ নয়, যাদের প্রতি তোমার গজব নাযিল হয়েছে এবং যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে। {সূরা ফাতিহা-১-৭}
তাকলীদের হাকীকত বুঝার সহজ উপায় হল, আমাদের আকাবীরে দেওবন্দের কিতাব ভাল করে মুতালাআ করা। কারণ আমরা যতই কিতাব পড়ি না কেন, আমাদের পড়াশোনার দৌড় আকাবীরদের মুতালাআ পর্যন্ত পৌঁছা খুবই দুস্কর। মাহমুদ হাসান দেওবন্দী রহ., হুজ্জাতুল ইসলাম কাসেম নানুতবী রহ., হাকীমুল উম্মত আশরাফ আলী থানবী রহ., শাইখুল আরব ওয়াল আজম সাইয়্যেদ হুসাইন আহমাদ মাদানী রহ., মুনাজিরে ইসলাম সরফরাজ খান সফদর রহ., মুনাজিরে ইসলাম মুহাম্মদ আমীন সফদর রহ. সহ আকাবীরে উলামাগণের লিখিত কিতাব পড়লে তাকলীদ বিষয়ে আমাদের সকল সন্দেহ-সংশয় দুরিভূত হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। কারণ আমাদের সমঝ, আর তাদের সমঝের মাঝে আকাশ পাতাল পার্থক্য। নিজে নিজে শত কিতাব পড়ে যা বুঝে আসে না, তাদের একটি কিতাব পড়ে এরচে’ হাজার গুণ বেশি বুঝে আসে। কুরআন ও হাদীস নিজে নিজে পড়ে অনেকে ভ্রান্ত হয়ে থাকে। তাই বড়দের কিতাব পড়া সবার জন্য জরুরী। আল্লাহ তা`আলা আমাদের আকাবীরে দেওবন্দের বাতলানো কুরআন সুন্নাহের পথে চলার তৌফিক দান করুন। আমীন।
যদি কোথাও আকাবীরদের কোন ইবারত কুরআন বা হাদীসের বিপরীত মনে হয়, তাহলে এ বিষয়ে প্রাজ্ঞ ব্যক্তিদের কাছে এর ব্যাখ্যা জিজ্ঞাসা করে নিলে বিভ্রান্ত হওয়ার কোন সম্ভাবনা থাকবে না। সংক্ষেপে এখানে তাকলীদের হাকীকত উপস্থাপন করা হচ্ছে।
ইসলামী শরী`আতের বুনিয়াদী বিষয়
ইসলামী শরী`আতে বুনিয়াদী বিষয় হল দু’টি। যথা-১- আকাইদ। ২- মাসাইল।
আকাইদের মাঝে বুনিয়াদী আক্বিদা হল, তাওহীদ। আর মাসাইলের মাঝে বুনিয়াদী মাসআলা হল তাকলীদ। যদি ব্যক্তি তাওহীদ না মানে, তাহলে তার রেসালাত মানার কোন ফায়দা নেই। তেমনি যদি কেউ তাওহীদ না মানে, তাহলে আখেরাত মানার কোন ফায়দাই নেই। কারণ আল্লাহর নবী দুনিয়াতে আসার মৌলিক কারণ হল, আল্লাহ তা`আলার একত্ববাদ তথা তাওহীদকে মানুষের কাছে পৌছে দেয়া।
هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَىٰ وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ وَلَوْ كَرِهَ الْمُشْرِكُونَ [ ٦١: ٩]
তিনি তাঁর রসূলকে পথ নির্দেশ ও সত্যধর্ম নিয়ে প্রেরণ করেছেন, যাতে একে সব ধর্মের উপর প্রবল করে দেন যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে। {সূরা সফ-৯}
রাসূল ﷺ নবুওতপ্রাপ্তির পর সর্ব প্রথম যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, তা তাওহীদ নিয়ে। রাসূল ﷺ ইরশাদ করেছিলেন,
يا أيها الناس قولوا لا إله إلا الله تفلحوا
অর্থাৎ হে লোক সকল! বল আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই, সফলকাম হয়ে যাবে। {সুনানে দারা কুতনী, হাদীস নং-১৮৬, সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং-৫১৮, সহীহ ইবেন খুজাইমা, হাদীস নং-৮২, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-১৬০২৩}
নবীর কাজ হল, আল্লাহ তাআলাকে মানার উপর নির্ভরশীল। আল্লাহ তা`আলা নবীকে মানতে বলেছেন তাই নবীকে মানা আবশ্যক। তাই আকাইদের মাঝে মূল হল তাওহীদ।
মাসাইলের মাঝে বুনিয়াদী বিষয় হল তাকলীদঃ কেন?
কারণ হল, প্রত্যেক ব্যক্তি কুরআনের সকল আয়াতের অর্থ বুঝা, তার শানে নুজুল বুঝা, হাদীস বুঝা, হাদীসের সনদ মতনের পার্থক্য বুঝা। সনদ সম্পর্কে বক্তব্য বুঝা। জরাহ-তাদীল সম্পর্কে সম্মক অবগতি থাকা এটি সকল মানুষের জন্য অসম্ভব বিষয়। তাই এক্ষেত্রে তাকলীদ ছাড়া কোন গত্যান্তর নেই। তাকলীদ কী জিনিস বুঝে আসলে সব কিছু সহজ হয়ে যাবে। শরী`আতের উপর আমল করা সহজ হয়ে যাবে যদি তাকলীদ করা হয়। নতুবা আমল করা হয়ে যাবে অসম্ভপর বিষয়।
সূরা ফাতিহা হল পুরো কুরআনের সারাংস। সূরা ফাতিহা প্রথমাংশে তাওহীদ। আর দ্বিতীয়াংশে তাকলীদ বর্ণিত হয়েছে।
الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ (2) الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ (3) مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ (4) إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ )٥ (
পর্যন্ত তাওহীদের কথা আলোচনা হয়েছে। কারণ এ পাঁচ আয়াতে সব ক’টিতেই আল্লাহ তা`আলার সিফাত বর্ণিত। যা তাওহীদ প্রকাশক। আর এর পর বলা হয়েছে “আমাদেরকে সরল পথ দেখাও, সে সমস্ত লোকের পথ, যাদেরকে তুমি নেয়ামত দান করেছ”।
সীরাতে মুস্তাকীম তথা সরল পথ বলতে কাদের পথ? আল্লাহ তাআলা নিয়ামাতপ্রাপ্ত বান্দা কারা? তাদের তালিকা কুরআনে কারীমে স্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছেন। ইরশাদ হচ্ছে-
وَمَن يُطِعِ اللَّهَ وَالرَّسُولَ فَأُولَٰئِكَ مَعَ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِم مِّنَ النَّبِيِّينَ وَالصِّدِّيقِينَ وَالشُّهَدَاءِ وَالصَّالِحِينَ ۚ وَحَسُنَ أُولَٰئِكَ رَفِيقًا [ ٤:٦٩]
আর যে কেউ আল্লাহর হুকুম এবং তাঁর রসূলের হুকুম মান্য করবে, তাহলে যাঁদের প্রতি আল্লাহ নেয়ামত দান করেছেন, সে তাঁদের সঙ্গী হবে। তাঁরা হলেন নবী, ছিদ্দীক, শহীদ ও সৎকর্মশীল ব্যক্তিবর্গ। আর তাদের সান্নিধ্যই হল উত্তম। {সূরা নিসা-৬৯}
তাহলে কী দাঁড়াল?
নবীগন যে পথে চলেন সে পথ মানেই সীরাতে মুস্তাকীম। আর তাদের গন্তব্য হল জান্নাত। সিদ্দীকীন তথা সাহাবাগণ যে পথে চলেন সে পথ মানেই সীরাতে মুস্তাকীম। আর তাদের গন্তব্য হল জান্নাত। শহীদগণ যে পথে চলেন সে পথ মানেই সীরাতে মুস্তাকীম। আর তাদের গন্তব্য হল জান্নাত। সালেহ তথা বুযুর্গগন যে পথে চলেন সে পথ মানেই সীরাতে মুস্তাকীম। তাদের গন্তব্যও জান্নাত।
অর্থাৎ তারা যে পথে চলছেন সে পথে চললে তারা যেখানে গিয়ে পৌঁছবেন, আমরাও সেখানে গিয়ে পৌঁছবো। যেহেতু তাদের পথ সীরাতে মুস্তাকীম। আর তাদের গন্তব্য জান্নাত। তাই আমরা তাদের পথে চললে জান্নাতে পৌঁছে যাবো ইনশাআল্লাহ। এ বিষয়টি আমাদের ভাল করে বুঝতে হবে।
উদাহরণতঃ
গুলিস্তান থেকে তালীমুল ইসলাম ইনষ্টিটিউট এন্ড রিসার্চ সেন্টারে আসতে চাওয়া এক ব্যক্তিকে পথের নির্দেশনা আমরা দেই যে, আপনি প্রথমে গুলিস্তান থেকে মেইন রোডে আসুন, তারপর সোজা উত্তর দিকে আসুন, তারপর পশ্চিম দিকে আসুন, তারপর আবার পশ্চিমে আসুন, তারপর আবার উত্তরে আসুন। তারপর পাঁচ ছয়টি রাস্তা পাড় হয়ে রামপুরা বাজারে আসুন। তারপর সেখান থেকে পশ্চিম দিকের ওয়াপদা রোডে আসুন। তারপর পাওয়ার হাউজে আসুন। তারপর বাম দিকের গুলিতে ঢুকুন। গলির দু’টি বিল্ডিং পর ৭তলা বিল্ডিংয়ের ছয় তলায় তালীমুল ইসলাম ইনষ্টিটিউট এন্ড রিসার্চ সেন্টার।
এভাবে কাউকে আমরা তালীমুল ইসলাম ইনষ্টিটিউট এন্ড রিসার্চ সেন্টারে আসার পথ বলতে পারি। কিন্তু অপরিচিত ব্যক্তি এ নির্দেশনা ফলো করে গন্তব্য পর্যন্ত পৌঁছা খুবই কঠিন। কিন্তু যদি তাকে বলে দেয়া হয় যে, আপনি যেখানে আছেন, সেখান থেকে এক লোক তালীমুল ইসলাম ইনষ্টিটিউট ভাল করে চিনে। আপনি তার পিছনে পিছনে চলে আসুন। ব্যস। কত সহজ তালীমুল ইসলাম ইনষ্টিটিউট এন্ড রিসার্চ সেন্টারে আসা তাই নয়কি?
ঠিক তেমনি কুরআন হাদীস মন্থন করে সীরাতে মুস্তাকীমের উপর চলা খুবই কঠিন। তাই আল্লাহ তা`আলা তাকলীদের সহজ পথ বাতলে দিয়েছেন। চার তবক্বার যে কোন একজনের তাকলীদ করলেই গন্তব্য জান্নাতে পৌছে যাওয়া যাবে। আয়াতে কারীমায় চার তবক্বার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথম তবক্বা হল, নবীগণ। এ তবক্বা দ্বারা কাদিয়ানীরা বেরিয়ে গেছে। কারণ তারা এমন ব্যক্তিকে নবী মানে যে ব্যক্তি নয়। আর সিদ্দীক বলে শিয়া রাফেজীরা বেরিয়ে গেছে। কারণ শিয়ারা সাহাবাগণকে মানে না। আর শুহাদা বলার দ্বারা আহলে বিদআত বেরিয়ে গেছে। কারণ তাদের কাছে কেউ শহীদ নয়।
আর যখন সালেহীন বলা হয়েছে, তখন মামাতী তথা যারা রাসূল ﷺ কে কবরে মৃত বিশ্বাস করে তারা এবং গায়রে মুকাল্লিদরা বেরিয়ে গেছে। কারণ তারা আউলিয়াদের মানে না। শুধুমাত্র দেওবন্দীগণই চার তবক্বাকেই মেনে থাকে। নবীগণকেও মানেন। সাহাবাগণকেও মানেন। শহীদকেও মানেন। আউলিয়াদেরও মানেন। তাই হাকীকী সীরাতে মুস্তাকীমে আছেন উলামায়ে দেওবন্দ আলহামদুলিল্লাহ।
কুরআনে কারীমের ১১৪ সূরার মাঝে সূরা ফাতিহা হল সারাংস। আর বাকি ১১৩ সূরা হল বিস্তারিত। আর সুরা ফাতিহার মাঝে মৌলিকভাবে দুটি বুনিয়াদী বিষয় বর্ণনা করা হয়েছে। অর্ধেকের মাঝে তাওহীদ। আর বাকি অর্ধেকে তাকলীদ।
রঈসুল মুনাজিরীন মুহাম্মদ আমীন সফদর রহ. বলেন, সূরা ফাতিহা নিয়ে ঝগড়াকারী দুই দল তৈরী হয়েছে।
যথা-১- ফাতিহা খালফাল ইমাম। ২- ফাতিহা আলাত তাআম।
একদল আছে, আপনি নামায শেষ করলে জিজ্ঞাসা করবে যে, আপনি ইমামের পিছনে নামায পড়েছেন?
-হ্যাঁ পড়েছি।
– ইমামের পিছনে সূরা ফাতিহা পড়েছেন?
– না পড়িনি।
– তাহলে আপনার নামায হয়নি।
– ইমামের অনুসরণ তথা তাকলীদ করার দ্বারাতো আমার ফাতিহাও হয়ে গেছে।
– না হয়নি।
এই হল এক তবক্বা। যারা সূরা ফাতিহা নিয়ে ঝগড়া করে থাকে। এরা তাওহীদকে মানে আর তাকলীদ নিয়ে ঝগড়া করে থাকে। আরেক দলের কাজ হল। আপনার কোন আত্মীয় মারা গেলে যদি আপনি গরীব দুঃখিকে খানা পাকিয়ে খাওয়ান। তাহলে এসে বলবে, আপনার মৃত আত্মীয়র জন্য ঈসালে সওয়াব করেন?
-হ্যাঁ, অবশ্যই করে থাকি।
– কিভাবে?
– আমি গরীবদের মাঝে খানা পাকিয়ে খাইয়েছি।
– খানা খাওয়ানোর সময় সূরা ফাতিহা পড়েছেন?
– না পড়িনি।
– তাহলে আপনার ঈসালে সওয়াব হয়নি।
এই হল আরেক তবক্বা। এরা তাকলীদ মেনে তাওহীদ অস্বিকার করে ঝগড়া করে থাকে। এ দুই দল হল ফাতিহা নিয়ে ঝগড়া করে থাকে। আর আমরা দেওবন্দীরা ফাতিহা নিয়ে ঝগড়া করি না। আমরা তাওহীদও মানি, সেই সাথে তাকলীদও মানি। ঝগড়াকারী হল, ফাতিহা খালফাল ইমামওয়ালা আর ফাতিহা আলাত তাআমওয়ালারা। মান্যকারীরা ঝগড়াটে হয়? না অস্বিকারকারী ঝগড়াটে হয়? আলহামদুলিল্লাহ আমরা মান্যকারী। অস্বিকারকারী ঝগড়াটে নয়।
আলোচনা চলছিল ইসলামী শরী`আতে বুনিয়াদী বিষয় দু’টি। আকাইদ ও মাসাইল। আকাইদের মাঝে বুনিয়াদী আক্বিদা তাওহীদ। আর মাসাইলের বুনিয়াদী মাসআলা তাকলীদ। তাওহীদ ছাড়া আকাইদের কোন ধর্তব্যতা নেই। আর তাকলীদ ছাড়া মাসআলার উপর আমল করা অসম্ভব।
তাকলীদের আভিধানিক অর্থ
আভিধানিক বলা হয়, যা অভিধানবীদগণ নির্ধারণ করে থাকেন। আর পারিভাষিক অর্থ বলা হয়, যা কোন কোন জাতি বা এলাকা বা বিশেষজ্ঞগণ নির্ধারণ করে থাকেন। কখনো এমন হতে পারে যে, অভিধানবিদগণ এক অর্থে নির্ধারণ করেছেন, কিন্তু নির্দিষ্ট কউমের কাছে এর অর্থ ভিন্ন হয়ে থাকে। এমনিভাবে বিষয় পরিবর্তন হওয়ার দ্বারাও অর্থ পাল্টে যায়। যেমন সালাত অর্থ নিতম্ব হেলানো। পরিভাষায় বলা হয়, বিশেষ আরকান আদায় করা। আজান অর্থ ঘোষণা করা, পরিভাষায় বিশেষ শব্দ বলা, রোযার আভিধানিক অর্থ বিরত থাকা। আর পরিভাষায় খানা-পিনা ও সহবাস থেকে বিরত থাকা সুবহে সাদিক থেকে নিয়ে সূর্য অস্ত যাওয়া পর্যন্ত নিয়তের সাথে। হজ্বের আভিধানিক অর্থ ইচেছ করা। আর পারিভাষিক অর্থ বিশেষ দিনে বিশেষ কাজ সম্পন্ন করা। জিহাদের আভিধানিক অর্থ চেষ্টা করা মেহনত করা। পরিভাষায় বলা হয়, আল্লাহর কালিমা বুলন্দ করার জন্য যুদ্ধ করা।
বিষয় ভিন্ন হয়ে গেলে অর্থ পাল্টে যাচ্ছে, যেমন কালিমা শব্দ। নাহুবীদদের কাছে এক অর্থ। আক্বিদা বিশেষজ্ঞদের কাছে আরেক অর্থ। গায়রে মুকাল্লিদরা যত স্থানেই আমাদের উপর অভিযোগ উত্থাপন করে থাকে, সকল ক্ষেত্রে এ সকল পরিভাষার পার্থক্য না বুঝার কারণে। এটি বুঝলে আমাদের আকাবীরদের উপর যত অভিযোগ আছে সব ক’টির জবাব দেয়া সহজ হয়ে যাবে।
যেমন হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজেরে মক্কী রহ. তার এক কিতাবে দুআ হিসেবে লিখেছেন যে, “আলী মশকিল কুশা কি ওয়াস্তে তথা বিপদ থেকে উদ্ধারকারী আলীর উসীলায়”।
ব্যাস, গায়রে মুকাল্লিদরা এর পিছনে লেগে গেছে। হযরত আলীকে বিপদ থেকে উদ্ধারকারী বলাতো শিরক। কিন্তু ওরা ফন বুঝতে পারেনি। আক্বিদার ফনে মশকিলকুশার এক অর্থ আর তাসাউফ শাস্ত্রে মাশকিল কুশার ভিন্ন অর্থ। আকাইদ ফনে মুশকিল কুশা অর্থ হল বিপদ থেকে উদ্ধার করা। আর তাসাউফ ফনে মাশকিল কুশা অর্থ হল, যিনি গোমরাহী থেকে হেদায়েদের পথে পথ প্রদর্শন করে থাকে। আর তাকে নাপাক পথ থেকে পাক পথে নিয়ে আসে, এবং মনের অবস্থাকে পরিস্কার করে দেয়, তাকে বলা হয় মশকিল কুশা। এটি অনেক মশকিল কাজ। কিন্তু শায়েখ যেহেতু এ কাজ করে দিয়েছেন। তাই শায়েখকে মশকিল কুশা বলা হয়ে থাকে। যেমন আমরা বলে থাকি যে, উস্তাদ আমি ফেঁসে গিয়েছিলাম। তারপর আপনার বুঝানোর কারণে আমি উদ্ধার পেলাম। এখানেও তাই হয়েছে। এ হিসেবে শিরক হল কিভাবে?
তাকলীদের আভিধানিক অর্থ হল, جعل القلادة فى العنق তথা গর্দানে কালাদা পরিধান করার নাম তাকলীদ। কালাদা অর্থ দু’টি। যথা-১- রশি। ২- হাড়।
উভয় অর্থ হাদীসে বিদ্যমান।
রশি অর্থ নিলে তা বিদ্যমান বুখারীর ১ম খন্ডের ২৩০ নং পৃষ্ঠায় এসেছে যে,
باب من قلد القلائد بيده এ অধ্যায়ে হাদীস এসেছে যে,
فقالت عائشة رضي الله عنها ليس كما قال ابن عباس أنا فتلت قلائد هدي رسول الله صلى الله عليه و سلم بيدي ثم قلدها رسول الله صلى الله عليه و سلم بيديه
তখন হযরত আয়িশা রা. বললেন, ইবনে আব্বাস যেমন বলেছেন বিষয়টি তেমন নয়, আমি রাসূল ﷺ এর হাদীর রশি আমার নিজ হাতে পাকিয়ে দিতাম। তারপর তা রাসূল ﷺ নিজ হাতে তা পরিয়ে দিতেন। {সহীহ বুখারী, হাদীস নং-১৬১৩}
তাহলে এখানে তাকলীদ অর্থ আসল, রশি।
অপরদিকে বুখারীর ২ খন্ডের ৮৭৪ নং পৃষ্ঠায় এসেছে যে, হযরত আয়িশা রা. এর বোন আসমা রা. থেকে হাড় ধার করে নিয়ে গিয়েছিলেন রাসূল ﷺ এর সাথে বনীল মুস্তালিকের যুদ্ধে। ফিরার পথে হাড়টি হারিয়ে যায়। এ ব্যাপারে হযরত আয়িশা রা. বলেন, هَلَكَتْ قِلَادَةٌ لِأَسْمَاءَ তথা আসমার [কালাদাটি] হাড়টি হারিয়ে গেছে। {সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৫৮৮২, ৪৩০৭}
এখানে হাড়কে কালাদা বলা হয়েছে। গায়রে মুকাল্লিদরা বলে থাকে যে, আমরা কি পশু নাকি যে, আমরা গলায় রশি দিব কেন? আসলে তারা কালাদার দুই অর্থ বিষয়ে অজ্ঞ। দুই অর্থ জানলে এমন বোকামীসূলভ মন্তব্য করতো না। যেমন মওত। রাসূল ﷺ মওতকে কবজ বলেছেন।
إِنَّ اللَّهَ قَبَضَ أَرْوَاحَكُمْ حِينَ شَاءَ ، وَرَدَّهَا إِلَيْكُمْ حِينَ شَاءَ
আর কবজের অর্থ দুটি। যথা খুরুজ তথা বেরিয়ে যাওয়া। আরেক অর্থ হল কাবজ তথা আবদ্ধ করা। কাবজ আসে বাসতুন তথা বিস্তৃতির বিপরীতে। হাত ছড়িয়ে দেয়া বাসতুন। আর মুঠ করে ফেলা কাবজুন। কবজুন এর আরেক অর্থ খুরুজ। যেমন এক হাত থেকে বেরিয়ে অন্য হাতে কোন কিছু চলে যাওয়া। কাসেম নানুতবী রহ. উভয় অর্থ জানতেন। তাই তিনি বলেছেন যে, সাধারণ মুসলমানদের আত্মা খুরুজ হযে যায়, আর নবীদের আত্মা হাবস তথা আবদ্ধ হয়। আর মামাতীরা জানে একটি অর্থ। তাই তারা একটি অর্থই বলে থাকে।
গায়রে মুকাল্লিদ যত বক্তৃতা আপনারা তাকলীদের ব্যাপারে শুনে থাকবেন, ওরা কখনোই তাকলীদের দুই অর্থ বলবে না। কখনোই বলবে না যে, তাকলীদের অর্থ হাড়ও। সর্বদা বলবে একটি তথা রশি। যেমন মামাতীরা মওতের অর্থ কখনোই দুটি করবে না। সব সময় বলবে খুরুজ। কখনোই কবজের আরেক অর্থ হাবস বলবে না।
রঈসুল মুনাজিরীন মুহাম্মদ আমীন সফদর রহ. বলেন। ইনসানওয়ালা অর্থ নেয়। আর জানোয়ার জানোয়ারওয়ালা অর্থ নেয়।
তাকলীদের পারিভাষিক অর্থ
জামেউল উলুম ফি ইসতিলাহাতিল ফুনুনে বিদ্যমান তাকলীদের পারিভাষিক অর্থ হল,
التقليد : إتباع الإنسان غيره فيما يقول بقول أو بفعل معتقدا للحقيقة فيه من غير نظر وتأمل في الدليل كان هذا المتتبع جعل قول الغير أو فعله قلادة في عنقه
তথা তাকলীদ বলা হয়, কোন মানুষ আরেকজনের কথা বা কর্মের ইত্তিবা করা এ বিষয়ে লোকটি সঠিক বিশ্বাস করে, দলীলের দিকে দৃষ্টি ও চিন্তা না করেই। যেন এ ইত্তিবাকারী অন্যের কথা বা কাজটিকে নিজের কাঁধে হাড় হিসেবে পরিধান করে নিয়ে নিয়েছে।
হাকীমুল উম্মত আশরাফ আলী থানবী রহ. তাকলীদের সংজ্ঞা করেছেন, কারো কথা এ হিসেবে মেনে নেয়া যে, লোকটি দলীলের ভিত্তিতে বলে দিবে। কিন্তু তার থেকে দলীলের বিষয়ে কোন তাহকীক করা হয় না।
তাহলে উক্ত দুই সংজ্ঞা দ্বারা আমরা বুঝতে পারছি যে, কারো অনুসরণ করা তার কাছে দলীল চাওয়া ছাড়া। যদিও তার কাছে দলীল বিদ্যমান আছে। এক হল দলীল নেই। আরেক হল দলীল না চাওয়া। তাকলীদ হল, দলীল আছে, কিন্তু মুকাল্লিদ সেই দলীল জানতে চায় না।
তাকলীদের একটি পূর্ণাঙ্গ সংজ্ঞা
তাকলীদ হল, মাসাইলে ইজতিহাদিয়্যাতে, গায়রে মুজতাহিদ ব্যক্তির এমন মুজতাহিদের মুফতাবিহা মাসাইলকে দলীল চাওয়া ছাড়া মেনে নেয়া, যে ব্যক্তির মুজতাহিদ হওয়া শরয়ী দলীল দ্বারা প্রমানিত, এবং তার মাযহাব উসুলান ও ফুরূআন সংকলিত হয়ে মুকাল্লিদের কাছে আমল হিসেবে মুতাওয়াতির সূত্রে পৌঁছেছে।
মাসাইলে ইজতিহাদিয়্যাহ
মাসাইলে ইজতিহাদিয়্যাহ বলে তাকলীদের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। মাসাইল দুই প্রকার হয়ে থাকে। যথা-১- মাসাইলে ওয়াজেহা তথা সুষ্পষ্ট মাসাইল। ২- মাসাইলে গায়রে ওয়াজেহা তথা অস্পষ্ট মাসাইল।
ওয়াজেহ মাসাইলের মাঝে তাকলীদ হয় না। চাই তা কুরআনে বর্ণিত হোক। বা হাদীসের মাঝে হোক।
মাসাইলে গায়রে ওয়াজেহা পাঁচ প্রকার। যথা-
১-মাসাইলে গায়রে মানসূসাহ
তথা মাসআলা বিদ্যমান কিন্তু এর উপর কুরআনের আয়াত বা হাদীস নেই। এর মূলনীতি কুরআনে বা হাদীসে বিদ্যমান। কিন্তু মাসআলাটি কুরআন বা হাদীসে বিদ্যমান নেই।
কুরআন থেকে উদাহরণ
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ [٥:٩٠]
হে মুমিনগণ, এই যে মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্য-নির্ধারক শরসমূহ এসব শয়তানের অপবিত্র কার্য বৈ তো নয়। অতএব, এগুলো থেকে বেঁচে থাক-যাতে তোমরা কল্যাণপ্রাপ্ত হও। {সূরা মায়িদা-৯০}
এ আয়াতে মদকে অপবিত্র হওয়া বর্ণনা করা হয়েছে। তাই অটোমেটিক তা হারাম হওয়া এমনিতেই বুঝে এসে গেছে। কারণ, কোন বস্তু নাপাক হলে, তা হারাম হয়ে থাকে, কিন্তু হারাম হলেই উক্ত বস্তু নাপাক হওয়া শর্ত নয়। হারাম ও নাপাকের মাঝে আম খাস মুতলাকের নিসবত। যেমন সুদের টাকা হারাম। কিন্তু হারাম টাকা নাপাক নয়। চুরি কলম হারাম। কিন্তু কলম নাপাক নয়। হারাম তিন কারণে হতে পারে।
যথা-১- নাপাক হওয়ার কারণে। যেমন পস্রাব-পায়খানা, গোবর-মদ ইত্যাদি।
২- ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য। যেমন বিষ।
৩- সম্মানার্থে। যেমন, মানুষ।
সুতরাং আমভাবে হারাম হলেই তাকে নাপাক হওয়ার হুকুমে নেয়া যাবে না। কিন্তু যে বস্তু নাপাক হয়, তা অবশ্যই হারাম হবে।
এ আয়াতের মাঝে মদকে নাপাক বলা হয়েছে। এর দ্বারা মদ হারাম একথা বুঝা গেল। কিন্তু ভাং বা গাঁজার কি হুকুম? এ কথার উল্লেখ আয়াতের মাঝে নেই। কিন্তু উসুল রয়েছে। আয়াতে খমর শব্দ বলা হয়েছে। খমর অর্থ হল মুখামারাতুল আকল তথা যা আকলকে ঢেকে দেয়। সুতরাং প্রত্যেক ঐ বস্তু যা আকলকে ঢেকে দেয়, তাই হারাম হবে। মুজতাহিদ ইল্লত বের করেছেন আয়াত থেকে। তারপর ভাং জাতীয় বস্তুর হুকুম বলে দিয়েছেন, যা সরাসরি কুরআনে বর্ণিত নয়।
হাদীস থেকে উদাহরণ
أَبَا هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ يَقُولُ قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا وَقَعَ الذُّبَابُ فِي شَرَابِ أَحَدِكُمْ فَلْيَغْمِسْهُ ثُمَّ لِيَنْزِعْهُ فَإِنَّ فِي إِحْدَى جَنَاحَيْهِ دَاءً وَالْأُخْرَى شِفَاءً
হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল ﷺ ইরশাদ করেছেন, যখন কারো পান পাত্রে মাছি পড়ে যায়, সে যেন তাকে আরেক বার ডুবিয়ে নেয়, তারপর তাকে ফেলে দেয়। কেননা, তার এক ডানায় থাকে রোগ আর আরেক ডানায় থাকে অষুধ। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৩৩২০}
এখানে লক্ষ্যণীয় দুটি বিষয়। এক হল মাছি পড়লে তাকে ডুবিয়ে নিবে। আর উক্ত খানা খেতে কোন সমস্যা নেই। জায়েয আছে খাওয়া।
এখন প্রশ্ন হল, মাছি ফেলে দিয়ে খানা খাওয়া জায়েয কেন? এর কারণ ইমাম আবু হানীফা রহ. বের করেছেন যে, মাছি এমন প্রাণী যার রগের মাঝে প্রবাহমান রক্ত নেই। তাই এটি পাত্রে পড়লে পাত্রের খাবার নাপাক করে না। তাই প্রত্যেক ঐ বস্তু যার মাঝে প্রবাহমান রক্ত নেই তার হুকুমও মাছির মতই হবে। অর্থাৎ এরকম প্রাণী খাবারে পরে গেলে তা ফেলে দিয়ে উক্ত খানা খাওয়া জায়েয হবে। যেমন, পিপড়া, মাছ ইত্যাদি।
পার্থক্য হল মাছির কথা হাদীসে স্পষ্ট উল্লেখ আছে। আর মাছ ও পিপড়ার কথা স্পষ্ট নেই। যা মুজতাহিদ ইজতাহিদ করে বের করেছেন।
২- মাসাইলে মানসূসায়ে মুতাআরিজা
তথা মাসআলা কুরআন বা হাদীসে বিদ্যমান। কিন্তু পরস্পর বিরোধী বর্ণনা নসের মাঝে রয়েছে।
কুরআন থেকে উদাহরণ
وَالَّذِينَ يُتَوَفَّوْنَ مِنكُمْ وَيَذَرُونَ أَزْوَاجًا يَتَرَبَّصْنَ بِأَنفُسِهِنَّ أَرْبَعَةَ أَشْهُرٍ وَعَشْرًا ۖ فَإِذَا بَلَغْنَ أَجَلَهُنَّ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ فِيمَا فَعَلْنَ فِي أَنفُسِهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ ۗ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ [٢:٢٣٤]
আর তোমাদের মধ্যে যারা মৃত্যুবরণ করবে এবং নিজেদের স্ত্রীদেরকে ছেড়ে যাবে, তখন সে স্ত্রীদের কর্তব্য হলো নিজেকে চার মাস দশ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করিয়ে রাখা। তারপর যখন ইদ্দত পূর্ণ করে নেবে, তখন নিজের ব্যাপারে নীতি সঙ্গত ব্যবস্থা নিলে কোন পাপ নেই। আর তোমাদের যাবতীয় কাজের ব্যাপারেই আল্লাহর অবগতি রয়েছে। {সূরা বাকারা-২৩৪}
এ আয়াত দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, মহিলার স্বামী মারা গেলে সে ইদ্দত পালন করবে চার মাস দশ দিন।
অথচ অন্য আয়াতে এসেছে,
وَالَّذِينَ يُتَوَفَّوْنَ مِنكُمْ وَيَذَرُونَ أَزْوَاجًا وَصِيَّةً لِّأَزْوَاجِهِم مَّتَاعًا إِلَى الْحَوْلِ غَيْرَ إِخْرَاجٍ ۚ فَإِنْ خَرَجْنَ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ فِي مَا فَعَلْنَ فِي أَنفُسِهِنَّ مِن مَّعْرُوفٍ ۗ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ [ ٢:٢٤٠
আর যখন তোমাদের মধ্যে যারা মৃত্যুবরণ করবে তখন স্ত্রীদের ঘর থেকে বের না করে এক বছর পর্যন্ত তাদের খরচের ব্যাপারে ওসিয়ত করে যাবে। অতঃপর যদি সে স্ত্রীরা নিজে থেকে বেরিয়ে যায়, তাহলে সে নারী যদি নিজের ব্যাপারে কোন উত্তম ব্যবস্থা করে, তবে তাতে তোমাদের উপর কোন পাপ নেই। আর আল্লাহ হচ্ছেন পরাক্রমশালী বিজ্ঞতা সম্পন্ন। {সূরা বাকারা-২৪০}
এ আয়াত প্রমাণ করছে যে, স্বামী মৃত্যুবরণ করলে স্ত্রীর ইদ্দত হল এক বছর। এখন যদি কেউ হাদীস রেখে শুধু কুরআন দেখে, তাহলে সে বলে বসবে যে, কুরআনের মাঝে বৈপরীত্ব আছে। তাই কুরআন গ্রহণীয় নয় [নাউজুবিল্লাহ]।
এ বিষয়ে মুজতাহিদগণ এসে বলে দিয়েছেন যে, স্বামী মৃত্যুবরণকৃত মহিলার ইদ্দত সম্পর্কিত বাকারা ২৪০ নং আয়াত মানসুখ তথা রহিত। কেননা, তা আগে নাজিল হয়েছিল। আর ২৩৪ নং আয়াত নাসেখ কেননা, তা পরবর্তীতে নাজিল হয়েছে। সুতরাং আর কোন বৈপরীত্ব বাকি নেই। এ বৈপরীত্ব দূর করেছেন মুজতাহিদ।
হাদীস থেকে দলীল
তিরমিজীর সৌন্দর্য হল, উভয় প্রকারের হাদীস তিনি এনেছেন। তারপর একটিকে তারজীহ দিয়েছেন। আর ইমাম বুখারী রহ. শুধু এক পক্ষের দলীল এনেছেন। তাই বুখারীর তুলনায় তিরমিজী গবেষণার জন্য অধিক উপকারী। আল্লামা তাজুদ্দীন সুবকী রহ. এর মতে ইমাম বুখারী রহ. শাফেয়ী। আর ইবনে তাইমিয়া ও ইবনুল কাইয়্যিম রহ. এর মতে তিনি হাম্বলী ছিলেন।
তাহাবী শরীফ ও খুব চমৎকার কিতাব। এতে উভয় প্রকারের দলীল এনে আকলী ও নকলী দলীলের ভিত্তিতে একটি প্রাধান্য দিয়েছেন। এ কিতাব ভাল করে পড়ানো উচিত।
তিরমিজীতে এক হাদীসে এসেছে,
عن وائل بن حجر قال سمعت النبي صلى الله عليه و سلم قرأ ( غير المغضوب عليهم ولا الضالين ) فقال آمين ومد بها صوته
হযরত ওয়ায়েল বিন হুজুর রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূল ﷺ কে বলতে শুনেছি যে, তিনি পড়েছেন গাইরিল মাগযূবি আলাইহিম ওয়ালায যয়াল্লীন, তারপর বললেন, আমীন। তিনি তা মাদ্দের সাথে পড়লেন। [সুনানে তিরমিজী, হাদীস নং-২৪৮}
মাদ্দা বিহা সাওতাহু এর অর্থ দুটি। একটি অর্থ হল, জাহারা, তথা জোরে বলা।
এ বর্ণনা দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, রাসূল ﷺ আমীন জোরে বলেছেন। ওয়ায়েল বিন হুজুর থেকে আরেক বর্ণনায় এসেছে যে,
عن علقمة بن وائل عن أبيه أن النبي صلى الله عليه و سلم قرأ ( غير المغضوب عليهم ولا الضالين ) فقال آمين وخفض بها صوته
হযরত ওয়ায়েল বিন হুজুর রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূল ﷺ কে বলতে শুনেছি যে, তিনি পড়েছেন গাইরিল মাগযূবি আলাইহিম ওয়ালায যয়াল্লীন, তারপর বললেন আমীন। তিনি তা আস্তে সাথে পড়লেন। [সুনানে তিরমিজী, হাদীস নং-২৪৮}
এ হাদীস দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, রাসূল ﷺ আমীন আস্তে বলেছেন। তাহলে এক বর্ণনায় এসেছে, আমীন জোরে বলার কথা। আরেক বর্ণনায় এসেছে আস্তে বলার কথা। আর উক্ত হাদীস দু’টিতে কোনটি আগের আমল আর কোনটি পরের আমল তার কোনই উল্লেখ নেই। তাই এখন আমরা কী করবো? এর সমাধান মুজতাহিদ ছাড়া কেউ করতে পারবে না।
৩- মাসাইলে মানসূসাহ মুজমালা
মাসআলা কুরআন বা হাদীসে বিদ্যমান আছে। কিন্তু বিস্তারিত নয় সংক্ষিপ্ত হওয়া।
কুরআন থেকে উদাহরণ
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا قُمْتُمْ إِلَى الصَّلَاةِ فَاغْسِلُوا وُجُوهَكُمْ وَأَيْدِيَكُمْ إِلَى الْمَرَافِقِ وَامْسَحُوا بِرُءُوسِكُمْ وَأَرْجُلَكُمْ إِلَى الْكَعْبَيْنِ ۚ وَإِن كُنتُمْ جُنُبًا فَاطَّهَّرُوا ۚ وَإِن كُنتُم مَّرْضَىٰ أَوْ عَلَىٰ سَفَرٍ أَوْ جَاءَ أَحَدٌ مِّنكُم مِّنَ الْغَائِطِ أَوْ لَامَسْتُمُ النِّسَاءَ فَلَمْ تَجِدُوا مَاءً فَتَيَمَّمُوا صَعِيدًا طَيِّبًا فَامْسَحُوا بِوُجُوهِكُمْ وَأَيْدِيكُم مِّنْهُ ۚ مَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيَجْعَلَ عَلَيْكُم مِّنْ حَرَجٍ وَلَٰكِن يُرِيدُ لِيُطَهِّرَكُمْ وَلِيُتِمَّ نِعْمَتَهُ عَلَيْكُمْ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ [٥:٦]
হে মুমিনগণ, যখন তোমরা নামাযের জন্যে উঠ, তখন স্বীয় মুখমন্ডল ও হস্তসমূহ কনুই পর্যন্ত ধৌত কর এবং পদযুগল গিটসহ। যদি তোমরা অপবিত্র হও তবে সারা দেহ পবিত্র করে নাও এবং যদি তোমরা রুগ্ন হও, অথবা প্রবাসে থাক অথবা তোমাদের কেউ প্রসাব-পায়খানা সেরে আসে অথবা তোমরা স্ত্রীদের সাথে সহবাস কর, অতঃপর পানি না পাও, তবে তোমরা পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করে নাও-অর্থাৎ, স্বীয় মুখ-মন্ডল ও হস্তদ্বয় মাটি দ্বারা মুছে ফেল। আল্লাহ তোমাদেরকে অসুবিধায় ফেলতে চান না; কিন্তু তোমাদেরকে পবিত্র রাখতে চান এবং তোমাদের প্রতি স্বীয় নেয়ামত পূর্ণ করতে চান-যাতে তোমরা কৃতজ্ঞাতা প্রকাশ কর। {সূরা মায়িদা-৬}
এ আয়াতে অজহুন তথা চেহারা ধৌত করার নির্দেষ এসেছে। কিন্তু অজহুন কাকে বলে? এটি কুরআনে বর্ণিত নয়। কতটুকুকে অজহুন বলে? কুরআন এ বিষয়ে নিশ্চুপ। এর সমাধান দিয়েছেন মুজতাহিদগণ। মাথার চুল উঠার স্থান থেকে থুতনির নিচ পর্যন্ত, আর এক কান থেকে থেকে আরেক কান পর্যন্তের অংশের নাম চেহারা বলা হয়। কিন্তু একথা কুরআনে নেই। যা বলে দিয়েছেন মুজতাহিদগণ।
হাদীস থেকে প্রমাণ
عن ابنِ مسعودٍ أن النبيّ صلى الله عليه وسلم قال: “إذا رَكعَ أحدُكُم فقَالَ في ركوعِه: سبحانَ رَبّيَ العظيم ثلاث مراتٍ فقد تمّ ركُوعُهُ، وذلك أدناهُ. وإذا سجدَ فقالَ في سجودهِ: سبحانَ رَبّيَ الأعْلَى ثلاثَ مرّاتٍ، فقد تمّ سجودُهُ، وذلك أدناه”
হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত। [সুনানে তিরমিজী, হাদীস নং-২৬০}
এ হাদীসে রুকু সেজদায় সর্বনি¤œ তিনবার তাসবীহ পড়ার কথা বলা হয়েছে। আর এটাকে বলা হয়েছে সর্বনি¤œ। অথচ তাসবীহ একবার পড়লেও নামায হয়ে যায়, এমন কি তাসবীহ না পড়লেও নামায হয়, এ বিষয়ে হাদীস নিশ্চুপ। এর সমাধান কে দিবে? মুজতাহিদ।
৪- মাসাইলে মানসূসাহ মুহতামিলাতুল মায়ানী
তথা মাসআলা কুরআন বা হাদীসে বিদ্যমান। কিন্তু উক্ত নসে একাধিক অর্থের সম্ভাবনা রয়েছে। মুজতাহিদ তা নির্ধারণ না করলে তা বুঝা দুস্কর হয়ে যায়।
কুরআন থেকে উপমা
সূরা বাকারা ২২৮ নং আয়াত وَالْمُطَلَّقَاتُ يَتَرَبَّصْنَ بِأَنْفُسِهِنَّ ثَلَاثَةَ قُرُوءٍ এ আয়াতে কুরু অর্থ স্পষ্ট নয়। কুরু অর্থ হায়েজ ও হয়। আর আবার কুরু মানে তুহুরও হয়।
কোন অর্থ এখানে কাম্য, তা নির্ধারণ করে দেন মুজতাহিদ।
হাদীস থেকে উপমা
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ كَانَ الطَّلاَقُ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- وَأَبِى بَكْرٍ وَسَنَتَيْنِ مِنْ خِلاَفَةِ عُمَرَ طَلاَقُ الثَّلاَثِ وَاحِدَةً فَقَالَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ إِنَّ النَّاسَ قَدِ اسْتَعْجَلُوا فِى أَمْرٍ قَدْ كَانَتْ لَهُمْ فِيهِ أَنَاةٌ فَلَوْ أَمْضَيْنَاهُ عَلَيْهِمْ. فَأَمْضَاهُ عَلَيْهِمْ.
{সহীহ মুসলিম। হাদীস নং-৩৭৪৬}
আরবীতে দু’টি শব্দ আছে। এক হল, তাকীদ। আরেক হল ইস্তিনাফ। ইস্তিনাফ হল যেমন এক ছাত্র এলে বললাম, টুপি নিয়ে আস। আমার কথা শুনে টুপি নিয়ে আসল। তারপর আরেক ছাত্রকে বললাম, টুপি নিয়ে আস। তখন সে আরেক টুপি নিয়ে আসল। এভাবে প্রত্যেকবার টুপি চাওয়ার দ্বারা নতুন টুপি উদ্দেশ্য হওয়ার নাম ইস্তিনাফ। আর তাকীদ হল, একাধিকবার বলার দ্বারা একই অর্থ উদ্দেশ্য নেয়া। যেমন মেহমান এলে আমরা খুশি হয়ে বলে থাকি যে, মেহমান এসেছে, মেহমান এসেছে, মেহমান এসেছে। এখানে তিনবার বলা হলেও মেহমান তিনবার আসেনি। এসেছে একবারই। বাকি দুইবার তাকীদান বলা হয়েছে।
কোন স্বামী যদি তার স্ত্রীকে বলে যে, انت طالق، انت طالق، انت طالق তথা তুমি তালাক, তুমি তালাক, তুমি তালাক। তাহলে এখানে দুই অর্থের সম্ভাবনা রয়েছে। তাকীদ হিসেবে একটি। আর ইস্তিনাফ হলে তিনটি। এখানে কোনটি উদ্দেশ্য হবে?
ইমাম নববী রহ. রাসূল ﷺ, হযরত আবু বকর রা. এবং হযরত উমর রা. এর শুরুর জমানায় মানুষের মধ্যে প্রচলিত ছিল যে, তাকীদ। কিন্তু পরবর্তীতে দ্বীনদারী কমতে থাকায় ইস্তিনাফ। তাই হযরত উমর রা. দুই অর্থের মাঝে একটি অর্থকে নির্দিষ্ট করে দিলেন। নতুন কিছু করেন নি। দুই অর্থের মাঝে একটিকে নির্দিষ্ট করেছেন।
أنه كان في أول الأمر إذا قال لها أنت طالق أنت طالق أنت طالق ولم ينو تأكيدا ولا استئنافا يحكم بوقوع طلقة لقلة ارادتهم الاستئناف بذلك فحمل على الغالب الذي هو ارادة التأكيد فلما كان في زمن عمر رضي الله عنه وكثر استعمال الناس بهذه الصيغة وغلب منهم ارادة الاستئناف بها حملت عند الاطلاق على الثلاث عملا بالغالب السابق الى الفهم منها في ذلك العصر
৫- মাসাইলে মানসূসাহ গায়র মুতাআইয়্যিনাতিল আহকাম
তথা মাসআলা নসে রয়েছে। কিন্তু মাসআলার হুকুম নসে বিদ্যমান নেই। সূরা মায়িদার দুই নং আয়াত
وَإِذَا حَلَلْتُمْ فَاصْطَادُوا
এখানে হজ্ব থেকে ফারিগ হওয়ার পর শিকার করার আদেশ এসেছে। ঠিক তেমনি আদেশ সূচক শব্দ এসেছে সূরা মায়িদার ছয় নং আয়াতে,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا قُمْتُمْ إِلَى الصَّلَاةِ فَاغْسِلُوا وُجُوهَكُمْ وَأَيْدِيَكُمْ إِلَى الْمَرَافِقِ وَامْسَحُوا بِرُءُوسِكُمْ وَأَرْجُلَكُمْ إِلَى الْكَعْبَيْنِ وَإِنْ كُنْتُمْ جُنُبًا فَاطَّهَّرُوا
এ সকল স্থানের চেহারা ধুয়ার হুকুম কি? শিকার করার আদেশ হলেও এর হুকুম কি? জাওয়াজ। তো মাসআলা নসে বিদ্যমান। কিন্তু হুকুম নসে নেই। হুকুম বলে দিবে কে? মুজতাহিদ।
গায়রে মুজতাহিদ
তাকলীদ করবে গায়রে মুজতাহিদ। আর মুজতাহিদ করবে ইজতিহাদ। এ কারণে গায়রে মুকাল্লিদদের অভিযোগ যে, আমাদের ইমাম গায়রে মুকাল্লিদ। আমরা বলি যে, ইমাম গায়রে মুকাল্লিদ মানে হল, তিনি মুজতাহিদ। তাই তার মুকাল্লিদ হওয়ার প্রয়োজন নেই। আর তোমরা গায়রে মুকাল্লিদ মানে হল, তোমরা মুজতাহিদও নয়, আবার তাকলীদও করো না, এর নাম গায়রে মুকাল্লিদ।
এক ব্যক্তি হয়তো ইমাম হবে, নতুবা মুক্তাদী। একজন এমন যে ইমাম ও নয়, মুক্তাদী নয়। ফাসাদকারী। হয়তো ব্যক্তি রাজা হবে, নয়তো প্রজা। উভয়ের কোনটি না হলে হয় বিদ্রোহী। তেমনি গায়রে মুকাল্লিদ। আর ইমাম আবু হানীফা রহ. হলেন রাজাওয়ালা, আর ইমামওয়ালা। গায়রে মুকাল্লিদরা হল, ফাসাদকারী আর বিদ্রোহী। মুসলমান হওয়ার জন্য প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য নবীর কালিমা পড়া জরুরী। নবীজী ﷺ নিজেও মুসলমান। কিন্তু তিনি কার কালিমা পড়েছেন? কারো নয়। তারপরও তিনি সাচ্চা মুসলমান। কারণ তিনি নিজেই নবী। তার জন্য অন্য কারো কালিমা পড়ার প্রয়োজনই নেই। তেমনি ইমাম আবু হানীফা রহ. মুজতাহিদ। তাই তার কারো তাকলীদ করার প্রয়োজনই নেই।
যেমন মুক্তাদী ইমামের ইত্তেবা করে বা জামাআত নামায পড়ে। আর ইমামও বা জামাআত নামায পড়ছে যদিও তিনি কারো ইত্তেবা করছে না। কেননা, তিনি নিজেই ইমাম। এমনিভাবে ইমাম আবু হানীফা রহ. এর অনুসারীরা তার তাকলীদ করে থাকে, কিন্তু তিনি কারো তাকলীদ করেন না। কারণ তিনি নিজেই ইমাম।
মুফতাবিহী মাসাইল
আমরা তাকলীদ করি মুফতাবিহী মাসাইলের উপর গায়রে মুফতাবিহী মাসাইলের নয়। যেমন কোথাও কোন এক মাসআলায় সহীহ হাদীসও রয়েছে, আবার জঈফ হাদীসও রয়েছে। তাহলে এক্ষেত্রে আমরা সহীহ হাদীস গ্রহণ করে থাকি। আর জঈফ হাদীস ছেড়ে দেই। এ জঈফ হাদীস ছেড়ে দেয়া মানে এই নয় যে, আমরা হাদীস অস্বিকারকারী। বা হাদীসকে মানি না। বরং যেহেতু এখানে বিশুদ্ধত হাদীস রয়েছে, তাই সে সময় গায়রে সহীহ হাদীসটি যেন বলাই হয়নি। তাই সহীহ হাদীসটি মানা মানেই মূলত হাদীস মানা। আর জঈফ হাদীস মানা মানে হাদীস ছেড়ে দেয়া।
ঠিক তেমনি আমরা হানাফী মাযহাবের মুকাল্লিদ। যেখানে হানাফী মাযহাবে এক মাসআলায় একাধিক বক্তব্য থাকবে, সেক্ষেত্রে আমাদের পালনীয় হল, মুফতাবিহী মাসাইল। গায়রে মুফতাবিহী মাসাইল নয়। এক্ষেত্রে মুফতাবিহী মাসাইল মানাই হল, হানাফী মাযহাবের অনুসরণ। তেমনি গায়রে মুফতাবিহী মাসাইল ছেড়ে দেয়া মানে হানাফী মাযহাব ছেড়ে দেয়া নয়। বরং গায়রে মুফতাবিহী মাসাইল মানা মানে মাযহাবে হানাফী ছেড়ে দেয়া।
দলীল চাওয়া ছাড়া মেনে নেয়া
এক হল, কোন বক্তব্যে দলীল না থাকা। আরেক হল দলীল জানতে না চাওয়া।
কুরআনের প্রতি আয়াতের সনদ আছে কি?
মুকাল্লিদঃ– কুরআনে কারীমের প্রতিটি আয়াতের কি সনদ আছে রাসূল ﷺ পর্যন্ত?
গায়রে মুকাল্লিদঃ– নেই।
মুকাল্লিদঃ– তাহলে কি নাউজুবিল্লাহ কুরআন রাসূল ﷺ এর উপর নাজিলকৃত কুরআন নয়?
গায়রে মুকাল্লিদঃ– অবশ্যই রাসূল ﷺ এর উপর নাজিলকৃত কুরআন।
মুকাল্লিদঃ– তাহলে সনদ কোথায়? সনদ ছাড়া কথা কি করে মানা যায় যে এটি রাসূল ﷺ এর উপরই নাজিল হয়েছিল?
গায়রে মুকাল্লিদঃ– আসলে বর্তমানে বিদ্যমান কুরআন যে রাসূল ﷺ এর উপর নাজিলকৃত কুরআনই তা মুতাওয়াতিসূত্রে বর্ণিত। তথা উম্মতের নিরবচ্ছিন্ন মতৈক্যে এটি প্রমাণিত। এ ব্যাপারে কেউ কোন দিন প্রশ্ন উত্থাপন করেনি। কিছু বিভ্রান্ত শিয়া এবং নাস্তিক ইসলাম বিদ্বেষী ছাড়া। যে বিষয় মুতাওয়াতির সূত্রে বর্ণিত হয়, সে বিষয়ের সনদের তাকানোর কোন প্রয়োজন নেই। সনদ ছাড়াই উক্ত বিষয়টি গ্রহণযোগ্য হয়ে থাকে। যেমন পবিত্র কুরআন যে রাসূল ﷺ এর উপর নাজিলকৃত কুরআন। তা মুতাওয়াতির সূত্রে প্রমানিত। তাই এ ব্যাপারে প্রশ্ন উত্থাপিত করা বা এর সনদ চাওয়া আহমকী ছাড়া কিছু নয়।
মুকাল্লিদঃ– আচ্ছা তাই নাকি? তাহলে আমি আরেকটু সংযোজন করি। বিখ্যাত হাদীস বিশারদ হযরত ইবনে হাজার আসকালানী রহ. তার সুবিখ্যাত উসূলে হাদীসের হাদীসের কিতাব “শরহু নুখবাতিল ফিকার” এ উল্লেখ করেছেন,-
والمتواتر لا يبحث عن رجاله، بل يجب العمل به من غير بحث
মুতাওয়াতির এর রিজাল তথা রাবী নিয়ে আলোচনা হয় না। বরং আলোচনা ও সমালোচনা ছাড়াই এর উপর আমল করা আবশ্যক। {শরহু নুখবাতিল ফিকার}
সুতরাং কুরআন যেহেতু মুতাওয়াতির। তাই এর সনদ খোঁজা সত্যিই আহমকী। বরং সনদ তালাশ করা ছাড়াই এটি রাসূল ﷺ এর উপর নাজিলকৃত ঐশী কুরআন বিশ্বাস করা আবশ্যক। ঠিক তেমনি হেদায়া, কুদরী, শরহে বেকায়া, কানযুদ দাকায়েক, তুহফাতুল ফুক্বাহা, আদদরুরুল মুখতার, বিদায়াতুল মুজতাহিদ, আলকাফীসহ যেসব গ্রন্থ ইমাম আবু হানীফা রহ. এর দিকে নিসবত করা গ্রন্থাদী যা মুতাওয়াতির হিসেবে চলে আসছে। সেগুলোরও ইমাম আবু হানীফা রহ. এর পর্যন্ত সনদ তালাশ করা আহমকী বৈ কিছু নয়। কারণ মুতাওয়াতির বিষয়ের সনদ তালাশ করার প্রয়োজন নেই। বরং তা মুতাওয়াতির হওয়াই এটির নিসবত সঠিক হওয়ার দলীল।
উপরোক্ত কিতাবাদী যে, ইমাম আবু হানীফা রহ. এর ফিক্বহের আলোকে লেখা তা সর্বজন বিদিত। হাজার বছর ধরে ফক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুসলিম উম্মাহের কাছে স্বীকৃত উলামা-মাশায়েখ, আইয়িম্মায়ে দ্বীন, ও বিদগ্ধ পন্ডিতগণ নিঃসংকোচে স্বীকার করে আসছেন। শুধু তাই নয়, হাজার বছর ধরে অধিকাংশ উম্মতে মুসলিমা ফিক্বহে হানাফী বিশ্বাস করেই এর উপর নিরবচ্ছিন্ন আমল জারি রেখেছেন। সেখানে অধুনা কিছু অর্বাচিন ব্যক্তিদের সন্দেহ প্রকাশ এ মুতাওয়াতির বিষয়ের ক্ষেত্রে সনদ তালাশ করার মানসিকতা ফিতনা সৃষ্টি বৈ কিছু নয়। সেই সাথে মুতাওয়াতিরের হুকুমের ক্ষেত্রে অজ্ঞতা ছাড়া আর কিছু নয়।
মুজতাহিদ হওয়া দলীলে শরয়ী দ্বারা প্রমাণিত
এটি তাকলীদের একটি শক্তিশালী শর্ত। যে কেউ নিজেকে মুজতাহিদ দাবি করলেই সে মুজতাহিদ হয়ে যাবে না। সেই সাথে তার তাকলীদ করার বৈধতা চলে আসবে না। বরং মুজতাহিদ হতে হবে এমন, যার মুজতাহিদ হওয়া শরী`আতের দলীল চতুষ্টয় তথা কুরআন, হাদীস বা ইজমা বা কিয়াস দ্বারা প্রমাণিত হতে হবে।
চার ইমামের যেকোন একজনের তাকলীদ করা জরুরী বলি আমরা কারণ, চার ইমামের মুজতাহিদ হওয়া শরয়ী দলীল “ইজমা” দ্বারা প্রমাণিত। ৪র্থ শতাব্দীর উলামাগণের ইজমা হয়ে গেছে যে, চার মুজতাহিদ ইমামের যে কোন একজনের তাকলীদ করা জরুরী। {আলইনসাফ-৫২, ৫৭-৫৯, মাদারে হক-৩৪১, ইন্তিসারুল হক বজওয়াবে মিয়ারে হক-১৫৩, আলমুআফাকাত-৪/১৪৬, আলমাজমূহ শরহুল মুহাজ্জাব-১/৯১}
উসূল ও ফুরূ সংকলিত মাযহাব
তাকলীদের জন্য উল্লেখিত সংজ্ঞায় আরেকটি শর্তারোপ করা হয়েছে, সেটি হল, মুজতাহিদের মাযহাবটি উসূল তথা মূলনীতি এবং ফুরূ তথা শাখাগত মাসাইলসহ সংকলিত হতে হবে। যদি উসূল ও ফুরূসহ সংকলিত না হয়, তাহলে সেই মাযহাব মানা সম্ভব নয়। কারণ তখন মাযহাবটি আসলে কি? কিসের ভিত্তিতে হয়েছে? তা স্পষ্ট জানা যাচ্ছে না, তাই তা মানাও সম্ভব হবে না। উল্লেখিত শর্তটি দ্বারা আরেকটি প্রশ্নের জবাব হয়ে যাচ্ছে, সেটি হল, চার খলীফা রেখে চার ইমামের মাযহাব মানা হয় কেন?
মূল কারণ হল, আমরা যদি বলি যে, হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা. এর তাকলীদ করা হোক। তাহলে হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা. এর তাকলীদ করলে তাঁর কাছে ছিল কুরআন, রাসূল ﷺ এর হাদীস এবং তার নিজস্ব ফাতওয়া। কিন্তু হযরত উমর, হযরত উসমান ও হযরত আলী রা. এর ফাতওয়া কিন্তু হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা. এর কাছে ছিল না? তাই তাঁর তাকলীদ করলে আমরা বাকি তিন খলীফায়ে রাশেদের ফাতওয়া থেকে বঞ্চিত থাকছি।
একইভাবে আমরা যদি উমর রা. এর তাকলীদের কথা বলি, তাহলে হযরত উমর রা. এর কাছে কুরআন, হাদীস, হযরত আবু বকর রা. এর ফাতওয়া এবং তাঁর নিজের ফাতওয়া রয়েছে। বাকি উসমান রা. এবং হযরত আলী রা. এর ফাতওয়া থাকছে না। একই অবস্থা হযরত উসমান রা. এর তাকলীদের কথা বললে। হযরত আলী রা. এর তাকলীদের কথা বললে তাঁর কাছে কুরআন, হাদীস, হযরত আবু বকর রা., হযরত উমর রা., হযরত উসমান রা. এর ফাতওয়া এবং হযরত আলী রা. এর নিজস্ব ফাতওয়া পাওয়া যাবে। কিন্তু তৎকালীন জিবীত থাকা ও মৃত্যুবরণ করা বাকি সাহাবীদের ফাতওয়া পাচ্ছি না।
এ কারণে সাহাবীদের পরবর্তীতে তাবেয়ী ইমাম আবু হানীফা এবং তাবে তাবেয়ী ইমাম শাফেয়ী, মালিক ও আহমাদ বিন হাম্বল রহ. এর তাকলীদের মাধ্যমে কুরআন, হাদীস এবং খুলাফায়ে রাশেদীনের ফাতওয়াও পাওয়া যায়। আর আমাদের কাছে কুরআন হাদীসের সাথে সাহাবাগণও অনুসরণীয়।
وعليكم بسنتي وسنة الخلفاء الراشدين من بعدي عضوا عليها بالنواجذ
হযরত ইরবাজ বিন সারিয়া রা. থেকে বর্ণিত। রাসূল ﷺ ইরশাদ করেছেন, তোমরা আমার সুন্নতকে আঁকড়ে ধর। এবং খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নতকে আঁকড়ে ধর আমার পরে। এগুলোকে মাড়ির দাঁত দিয়ে কামড়ে ধর। {আলমুজামুল কাবীর লিততাবরানী, হাদীস নং-৬১৮, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-৪২, সুনানে বায়হাকী কুবরা, হাদীস নং-২০১২৫, সুনানে তিরমিজী, হাদীস নং-১৫০, সুনানে দারেমী, হাদীস নং-৯৫, সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং-১৭৯, কানযুল উম্মাল, হাদীস নং-৯২২, মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদীস নং-৩২৯, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-১৭১৪২, মুসনাদুল বাজ্জার, হাদীস নং-৪২০১, মুসনাদুশ শামীন, হাদীস নং-৪৩৭, মাশকিলুল আসার, হাদীস নং-৯৯৮}
তাই চার ইমামের তাকলীদ করার মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ দ্বীনের মাসাইল পাওয়া যাচ্ছে। যা শুধু চার খলীফার তাকলীদ করলে পাওয়া যেতো না। আর আমরা বিশেষ করে ইমাম আজম আবু হানীফা রহ. এর অনুসরণ এ জন্য করে থাকি যে, যেহেতু হযরত আলী রা. সম্পর্কে রাসূল ﷺ ইরশাদ করেছেন যে,
عن ابن عباس رضي الله عنهما قال : قال رسول الله صلى الله عليه و سلم : أنا مدينة العلم و علي بابها فمن أراد المدينة فليأت الباب
হযরত ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত। রাসূল ﷺ ইরশাদ করেছেন, আমি হলাম ইলমের শহর। আর আলী হল এর দরজা। সুতরাং যে ব্যক্তি শহরে প্রবেশ করতে চায়, সে যেন দরজা দিয়ে আসে। {মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদীস নং-৪৬৩৭, আলমুজামুল কাবীর লিততাবারী, হাদীস নং-১১০৬১, কানযুল উম্মাল, হাদীস নং-৩২৮৯০, জামেউল আহাদীস, হাদীস নং-৫৭৪২}
যেহেতু আমরা ইলমের শহর রাসূল ﷺ এর ইলম পর্যন্ত পৌঁছতে চাই দরজা দিয়ে। আর ইলমের দরজা হযরত আলী রা. কুরআন, হাদীস, হযরত আবু বকর রা., হযরত উমর রা. এবং হযরত উসমান রা. এর ফাতওয়াসহ কুফায় এসে শুয়ে আছেন। তাই সেই কুফায় জন্ম নেয়া ইমামে আজম রহ. এর তাকলীদ করার মাধ্যমে এই সকল ইলমের দরজা দিয়ে রাসূল ﷺ এর ইলমের শহরে প্রবেশ করে থাকি।
এ কারণে আমরা ইমাম আজম আবু হানীফা রহ. এর তাকলীদ করে থাকি। যেহেতু তার কাছে সকল ইলমের ভান্ডার এসে পৌঁছেছে হযরত আলী রা. সহ অন্যান্য সাহাবীগণের পদচারণায় ধন্য কুফায়।
আল্লাহ তা`আলা এ ফিতনাবাজ গোষ্টি থেকে মুসলিম জাতিকে হিফাযত করুন।