হুজ্জাতুল ইসলাম কাসেম নানূতবী রহ.
একজন মানুষ আরেকজনের প্রিয় ও ঘনিষ্ঠ হতে পারে তখনই, যখন তার স্বভাব-চরিত্র ও কাজকর্ম প্রিয় ব্যক্তির পছন্দ ও ইচ্ছার সঙ্গে মিলে যায়। যার স্বভাব ও আচরণ তার একেবারে বিপরীত, সে কখনো তার ঘনিষ্ঠ ও প্রিয় হতে পারে না—এটা সহজেই বোঝা যায়।
ধরুন, কোনো মানুষ দেখতে অসম্ভব সুন্দর—যেন দ্বিতীয় ইউসুফ। কিন্তু তার একটি চোখ যদি কানা হয়, তাহলে সেই একটি ত্রুটিই তার পুরো চেহারার সৌন্দর্য নষ্ট করে দেবে। তেমনি কারও স্বভাবের মধ্যে যদি একটি দোষও থাকে, যা তার প্রিয় ব্যক্তির স্বভাব ও পছন্দের বিপরীত, তাহলে তার অন্য যত গুণই থাকুক, সেগুলো আর তেমন গুরুত্ব পাবে না।
কথা হলো, কারও মধ্যে যদি সামান্য একটি দোষও থাকে, তাহলে তার প্রতি পূর্ণ ভালোবাসা, স্বাভাবিক টান ও সন্তুষ্টি থাকা সম্ভব নয়। আর যার কাছ থেকে বিশেষ নৈকট্য ও মর্যাদা পাওয়ার আশা করা হয়, তার মধ্যে কোনো দোষ থাকা চলবে না। তাই নবী-রাসুলদের এমনই হতে হয় যে, তাঁরা পুরোপুরি আল্লাহর অনুগত থাকবেন এবং তাঁদের কোনো কাজই আল্লাহর ইচ্ছার বিরুদ্ধে হবে না।
এ কারণেই আমরা নবীদের মা‘সুম বা নিষ্পাপ বলে বিশ্বাস করি। এর মানে হলো, তাঁদের মধ্যে আল্লাহর অবাধ্য হওয়ার কোনো প্রবণতাই থাকে না। তাঁদের স্বভাব-চরিত্রে যখন কোনো মন্দ দিক নেই, তখন তাঁদের দ্বারা ইচ্ছা করে কোনো খারাপ কাজ করাও সম্ভব নয়। কারণ, মানুষের ইচ্ছাকৃত কাজ তার স্বভাব ও চরিত্রেরই প্রকাশ।
যেমন, উদার মানুষ স্বাভাবিকভাবেই অন্যকে দান করে। আর কৃপণ মানুষ টাকা-পয়সা জমিয়ে রাখে। সাহসী মানুষ বিপদের সামনে দাঁড়ায়, আর ভীরু মানুষ বিপদ দেখলে পিছিয়ে যায়।
তবে কখনো ভুল হয়ে যেতে পারে, কিংবা কোনো বিষয় ভুল বোঝা হতে পারে। বড় বড় বুদ্ধিমান মানুষেরও মাঝেমধ্যে এমন ভুল হয়। আল্লাহ তাআলা ছাড়া কেউই এ ধরনের ভুল থেকে পুরোপুরি মুক্ত নন।
তাই কেউ যদি ভুল করে এমন কোনো কাজ করে বসে, যা আসলে আল্লাহর ইচ্ছার বিরুদ্ধে—কিন্তু সে ভুল করে সেটাকেই আল্লাহর ইচ্ছার অনুকূল মনে করেছিল—তাহলে সেটাকে গুনাহ বলা হবে না। একইভাবে, আল্লাহর পছন্দের কোনো কাজকে ভুল করে অপছন্দনীয় মনে করে তার বিপরীত কিছু করলেও সেটাকে গুনাহ বলা হবে না।
যেমন, কোনো সম্মানিত ব্যক্তি তাঁর অধীন কাউকে নিজের পাশে বসতে বললেন। কিন্তু সেই ব্যক্তি অতিরিক্ত সম্মানের কারণে তাঁর সমান হয়ে বসতে সংকোচ করল। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, সে যেন তাঁর কথা মানেনি। অথচ তার উদ্দেশ্য ছিল সম্মান দেখানো।
আবার অতিরিক্ত ভালোবাসা ও সম্মানের কারণেও কখনো এমন হতে পারে যে, বাইরে থেকে কোনো কাজ বিরোধিতার মতো মনে হচ্ছে, কিন্তু ভেতরে উদ্দেশ্য আসলে আনুগত্যই।
এ ধরনের ভুলকে গুনাহ বলা হয় না। কারণ, গুনাহ তখনই হয়, যখন কেউ জেনে-শুনে আল্লাহর হুকুমের বিরোধিতা করে। ভুলে যাওয়া বা ভুল বোঝাকে গুনাহ বলা হয় না।
এ কারণেই কেউ ভুল করলে বলে, ‘আমি ভুলে গিয়েছিলাম’ অথবা ‘আমি বিষয়টি এভাবে বুঝিনি।’ যদি ভুলে যাওয়া বা ভুল বোঝাও গুনাহ হতো, তাহলে এসব কথা কোনো ওজর হতো না; বরং নিজের অপরাধ স্বীকার করার মতো হতো। কিন্তু যেহেতু অনিচ্ছাকৃত ভুল গুনাহ নয়, তাই এ ধরনের কথা ওজর হিসেবে গ্রহণ করা হয়।
এখন যখন বোঝা গেল যে, মানুষের কাজ তার স্বভাব-চরিত্রের ওপর নির্ভর করে, তখন আরও দুটি বিষয় মনে রাখতে হবে। একটি হলো চরিত্র ও স্বভাব, আর অন্যটি হলো বুদ্ধি ও সঠিকভাবে বোঝার ক্ষমতা।
চরিত্র ও স্বভাবের গুরুত্ব এখান থেকেই বোঝা যায় যে, মানুষ যে কাজগুলো করে বা করে না, সেগুলো ভালো না মন্দ হবে—তার সঙ্গে তার চরিত্রের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ইবাদত, আনুগত্য ও আল্লাহর হুকুম মানার ক্ষেত্রেও এ বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ মানুষের ভালো-মন্দ কাজের পেছনে তার স্বভাব-চরিত্রই মূল ভূমিকা রাখে।
তবে শুধু ভালো স্বভাব থাকলেই হয় না। কোন কাজ কখন করতে হবে, কোথায় করতে হবে এবং কীভাবে করতে হবে—সেটাও বুঝতে হয়। এর জন্য দরকার সুস্থ বুদ্ধি ও সঠিক বিচারবোধ। কারণ, ভালো কাজও যদি ভুল সময়ে বা ভুল জায়গায় করা হয়, তাহলে তা ক্ষতির কারণ হতে পারে।
যেমন, দান করা অবশ্যই ভালো কাজ। কিন্তু কাকে দান করা হচ্ছে, সেটাও দেখতে হবে। গরিব ও প্রকৃত অভাবী মানুষকে দান করলে খুবই ভালো। কিন্তু সেই টাকা যদি এমন লোককে দেওয়া হয়, যে তা দিয়ে মদ খাবে বা অন্য কোনো গুনাহের কাজে ব্যবহার করবে, তাহলে কি সেটা ভালো হবে? বরং এতে তার খারাপ কাজই আরও বাড়বে। কারণ, ভালো কাজটি ভুল জায়গায় করা হয়েছে।
তাই মানুষের কাজ তার স্বভাব-চরিত্রের ওপর নির্ভর করলেও, কোন কাজ কোথায় ও কখন করা উচিত—তা বোঝার জন্য সুস্থ বুদ্ধি ও সঠিক বিচারবোধ থাকা জরুরি।
এ কারণেই নবীদের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ বুদ্ধি ও উত্তম চরিত্র থাকা অপরিহার্য।
আর যার চরিত্র ভালো, তার মধ্যে ভালোবাসাও থাকবে। কারণ, সুন্দর চরিত্রের মূল ভিত্তিই হলো ভালোবাসা। আবার যখন সঠিক সময়, স্থান ও পরিস্থিতি বোঝার মতো পূর্ণাঙ্গ বুদ্ধিও রয়েছে, তখন আল্লাহর চেয়ে বেশি ভালোবাসার যোগ্য আর কে হতে পারেন?
আল্লাহর প্রতি যখন গভীর ভালোবাসা থাকবে, তখন তাঁর হুকুম মানা ও তাঁর অনুগত থাকার দৃঢ় ইচ্ছাও অবশ্যই থাকবে। আর এর স্বাভাবিক ফল হলো—আল্লাহর অবাধ্য হওয়ার ইচ্ছাই তার মনে জন্ম নেবে না।
নবীদের ‘মা‘সুম’ বা নিষ্পাপ হওয়ার অর্থ এটাই।