মসজিদের ঐতিহাসিক গুরুত্ব:
ইসলামী সমাজব্যবস্থা যেসব প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল সেসবের মধ্যে মসজিদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামের প্রাথমিক যুগে মসজিদ থেকেই মুসলমানগণ দ্বীনি শিক্ষা লাভ করতেন, মসজিদ থেকেই প্রশাসনিক ও বিচারিক কাজ চলত, মসজিদ থেকেই ই‘লায়ে কালিমাতুল্লাহ ও
অমুসলিমদের আগ্রাসন থেকে মুসলিম ভূ-খণ্ড রক্ষার নিমিত্তে ইসলামী সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করা হতো। মোটকথা- তখন মসজিদ থেকেই ইসলামী রাষ্ট্রের যাবতীয় কাজ পরিচালনা করা হতো। ইসলামের নবী মুহাম্মাদ সা: শিক্ষক হিসেবে, রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে, বিচারক হিসেবে,
সেনানায়ক হিসেবে এসব কাজ মসজিদ থেকেই পরিচালনা করতেন। তার ইন্তিকালের পরেও বহু যুগ পর্যন্ত উলামায়ে কেরাম ও দ্বীনি শাস্ত্রে পারদর্শী পণ্ডিতগণ মসজিদে বসেই অধ্যাপনার কাজ আঞ্জাম দিতেন। আর তাঁদের হাতেগড়া শাগরেদ ও ভক্ত-মুরীদগণ বিশ্বের চারদিকে ছড়িয়ে দিতেন ইসলামী শিক্ষার সে আলো। পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় কার্যাবলির পরিধি বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে বিচার, প্রশাসন, শিক্ষা প্রভৃতি খাতের জন্য সতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠায় মসজিদ কেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডের পরিধি কিছুটা সংকুচিত হয়ে আসে। তবে এমন কিছু কাজ আছে, যেগুলোর প্রাণকেন্দ্র হিসেবে মসজিদ এখনও অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন।
দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করা ছাড়াও নামাযীগণ মসজিদে ব্যক্তিগত ও সামাজিক বিষয়াদি নিয়ে পরস্পর আলোচনা করেন। এভাবে পারস্পরিক সহযোগিতা, সামাজিক সৌহার্দ্য এবং সংহতি বৃদ্ধির কাজে মসজিদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। তাছাড়া পবিত্র কুরআনে এক মুসলমানকে অপর মুসলমানের ভাই হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। সুতরাং মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত নামায জামা‘আতের সাথে আদায় করার এটাও অন্যতম একটি উদ্দেশ্য যে, এর দ্বারা পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ককে সংরক্ষণ করা এবং একে অপরের সুখ-দুঃখের সাথী হওয়া। এর বাইরে বিভিন্ন সময় দ্বীনি নানা বিষয় সম্পর্কে মসজিদে বিশেষ আলোচনা-সভা অনুষ্ঠিত হয়। বরং কোনো বিশেষ সময় নয়, সারা বছরব্যাপী মসজিদ মুসলমানদের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নে মসজিদের ভূমিকা:
মসজিদ কেবল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবেই নয়। বরং মসজিদ কেন্দ্রিক এমন কিছু কার্যক্রম পরিচালিত ও অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে যা কিনা গ্রামীণ ও শহুরে সামাজিক-সাংস্কৃতিক উন্নয়নে বহুমাত্রিক ভূমিকা রেখে চলেছে প্রতিনিয়ত। যথা-
১। পাঞ্জেগানা নামায। মুসলমানগণ দিনে পাঁচবার ফরয নামায মসজিদে আদায় করে থাকেন। পুরুষদের জন্য এটা সুন্নতে মুআক্কাদা। এটা মুসলমান এলাকাবাসী; ক্ষেত্র বিশেষে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের জন্য পারস্পরিক সহযোগিতা, সামাজিক সৌহার্দ্য এবং সংহতি বৃদ্ধির পাশাপাশি পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক সংরক্ষণ এবং একে অপরের সুখ-দুঃখের সাথী হওয়ার ক্ষেত্রে অকল্পনীয় ভূমিকা পালন করে থাকে।
২। জুমু‘আ ও ঈদের নামায। প্রতি শুক্রবারে স্থানীয় জামে মসজিদে এলাকার মুসল্লীগণ একত্রিত হয়ে জুমু‘আর নামায আদায় করে থাকেন। এসময় বিশিষ্ট আলেম ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব তাঁর খুৎবায় দ্বীন-ইসলাম সংক্রান্ত জরুরী বিষয়াদী সম্পর্কে আলোচনা করেন। এছাড়াও প্রতি বৎসর দুই ঈদ উপলক্ষে বৃহত্তর এলাকার লোকজন ঈদগাহে অথবা বড় মসজিদে সমবেত হয়ে ঈদের নামায আদায় করে থাকেন। এসময় খ্যাতনামা আলেমগণ তাঁদের নামায-পূর্ব বয়ান ও পরবর্তী খুৎবায় সামাজিক ও দ্বীন-ইসলাম সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা ও দিকনির্দেশনা প্রদান করেন, যা সাপ্তাহিক সামাজিক উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে থাকে।
৩। জানাযার নামায। কোনো মুসলমান ব্যক্তি মারা গেলে তার জানাযার নামাযও মসজিদ কেন্দ্রিক (স্থানীয় ইমামের নেতৃত্বে) আদায় করা হয়।
৪। দ্বীনি শিক্ষা ও ¯ স্বাক্ষরতা। আকীদা-বিশ্বাস, ইবাদাত-বন্দেগী, হারাম
হালাল প্রভৃতি মৌলিক দ্বীনি বিষয়ে শিক্ষা লাভ করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর ওপর ফরয। এ লক্ষে মুসলিম পরিবারের শিশু ও অনগ্রসর বয়স্কদের পবিত্র কুরআন ও মৌলিক দ্বীনি শিক্ষা দেয়ার ব্যবস্থা কেবল মসজিদ কেন্দ্রিক চালু রয়েছে। এর বাইরে বর্তমানে মাধ্যমিক, উচ্চ-মাধ্যমিক ও সর্বোচ্চ স্তরসম্পন্ন ক্বওমী মাদরাসাগুলো এই খিদমত বা সেবার কাজ ব্যাপক পরিসরে আঞ্জাম দিচ্ছে।
মোটকথা, মসজিদ কোনো নির্দিষ্ট কাজই নয়; বরং ক্ষেত্র-বিশেষে সারা বছরব্যাপী মুসলমানদের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবন-মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে| যার ফলে বর্তমানে মসজিদের অবদান সমাজের সকলের নিকটই এক অনস্বীকার্য বাস্তবতা ও স্বীকৃত বিষয়।
বাংলাদেশের মসজিদ সংস্কৃতি:
বাংলাদেশের সংস্কৃতি, ইতিহাস ও পরিচয়ে মসজিদ একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি মুসলমানদের ধর্মীয় উপাসনার স্থান হলেও একই সঙ্গে সামাজিক, শিক্ষামূলক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু। প্রাচীন বাংলায় ইসলামের আগমন থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত মসজিদ আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাস, স্থাপত্য শিল্প, গ্রামীণ জীবন-মান উন্নয়ন ও নগর সংস্কৃতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছে। কিন্তু মজার কথা হলো, বাংলাদেশের মসজিদ সংস্কৃতি মূলত একটি দীর্ঘ ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার ফল; যেখানে আরব ব্যবসায়ীদের আগমন, সুফি সাধকদের প্রচার, সুলতানি ও মুঘল আমলের স্থাপত্য বিকাশ, ঔপনিবেশিক আমলের চ্যালেঞ্জ ও পাকিস্তান আমলের আধুনিকায়ন
এবং সর্বশেষ স্বাধীন বাংলাদেশের নবজাগরণ; সবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
এ পর্যায়ে বাংলাদেশে ইসলামের আগমন ও মসজিদ স্থাপনা নির্মাণের ধারাবাহিকতা নিয়ে সংক্ষিপ্তাকারে কিছু তথ্য ও তার ওপর পর্যালোচনা পেশ করা হলো-
ইসলামের আগমন ও প্রাথমিক মসজিদ স্থাপনা [৭ম-১২শ শতক] বাংলাদেশে ইসলামের আগমন ঘটে প্রধানত তিনটি পথে:
১. আরব ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে (৭ম-৮ম শতক)
২. সুফি-সাধকদের মাধ্যমে (৯ম- ১১শ শতক)
৩. তুর্কি ও আফগান শাসকদের মাধ্যমে (১৩ শতক)
অর্থাৎ, প্রথম দিকে ইসলামের বিস্তার হয়েছিল বাণিজ্য ও আধ্যাত্মিক চর্চার মাধ্যমে। এজন্য প্রথম দিকের মসজিদগুলো সাধারণত সুফি খানকাহ বা দরগাহের পাশে নির্মিত হতো; যাতে নামায, ধর্মীয় শিক্ষা ও আধ্যাত্মিক অনুশীলন বা সংশোধন একই জায়গায় সম্পন্ন হয়। এসময়ের মসজিদগুলো ছিল অপেক্ষাকৃত ছোট প্রকৃতির। কাঠ বা মাটির ˆতরী এবং স্থানীয় স্থাপত্যের প্রভাবযুক্ত। যার ফলে এখনও প্রাচীন কিছু মসজিদে কাঠের তক্তা, বাঁশ ও মাটির মিশ্রণের ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায়।
সুলতানি আমল ও স্থাপত্যশিল্পের স্বর্ণ যুগ [১৩শ-১৬শ শতক]
বাংলার স্বাধীন সুলতানরা (যেমন: ইলিয়াস শাহী, হোসেন শাহী রাজবংশ) ইসলামী স্থাপত্য-শিল্পে বিশেষ অবদান রাখেন। এসময় মসজিদ নির্মাণ শুধু ধর্মীয় প্রয়োজনেই নয়; বরং শাসকের ক্ষমতা, সম্পদ ও শিল্প-রুচির প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। আর এসময়ে নির্মিত মসজিদগুলোতে প্রধানত বাংলার ভৌগলিক কারণে পাথরের বদলে ইটের ব্যবহার ছিল মূল উপাদান। এছাড়া টেরাকোটা অলংকরণ বা ফুল, লতা, জ্যামিতিক নকশা ও আরবী ক্যালিগ্রাফির পাশাপাশি বহু গম্বুজ নকশা তথা এক-গম্বুজ, তিন-গম্বুজ, এমনকি ষাট-গম্বুজ বিশিষ্ট বৃহদায়তনের মসজিদও নজরে পড়ে| যা কিনা সমসাময়িক শাসক শ্রেণী ও শিল্পপতিদের উচ্চ রুচিবোধ ও ধর্মের প্রতি আগ্রহের বহিঃপ্রকাশ বৈ কি।
এসময়ে নির্মিত মসজিদগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ষাট গম্বুজ মসজিদ (খুলনা), ছোট সোনা মসজিদ (চাঁপাইনবাবগঞ্জ), বাইগুনি মসজিদ (গৌড়)। সুলতানি আমলের এসব মসজিদ সংস্কৃতি সমাজে বসবাসকারীদের ইসলামী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে। এবং মসজিদ হয়ে ওঠে শিক্ষা, শালিস ও সমাজ পরিচালনার কেন্দ্ররূপে।
মুঘল আমল ও রাজকীয় শৈলীর প্রভাব [১৬শ-১৮শ শতক]
মুঘল আমলে মসজিদের নকশা ও স্থাপত্যে সর্বপ্রথম রাজকীয় প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। দিল্লি ও আগ্রার শাহী মসজিদের আদলে বাংলায়ও নতুন ধারা গড়ে ওঠতে শুরু করে। এসময়ের মসজিদগুলোতে বিশেষত পাথর ও মার্বেলের ব্যাপক ব্যবহার, উঁচু মিনারা ও বিশাল প্রবেশদ্বার নির্মাণ, বাগান ও জলাধারসহ মসজিদ কমপ্লেক্সের নকশা প্রণয়ন ও গম্বুজে পেঁয়াজ আকৃতিসহ বিভিন্ন শিল্পকর্ম চোখে পড়ে।
এসময়ে নির্মিত মসজিদগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: চকবাজার শাহী মসজিদ (ঢাকা), শাহী মসজিদ (রাজশাহী) ইত্যাদী। মুঘল আমলে নির্মিত এসব মসজিদ ছিল ধর্মীয় আচার, আদালতের নির্দেশ ও রাজনৈতিক ঘোষণার স্থান| পাঁচ ওয়াক্ত নামায থেকে শুরু করে জুমু‘আ, ঈদ এবং যুদ্ধসংক্রান্ত ঘোষণাও অনেক সময় এখান থেকেই দেওয়া হতো।
ঔপনিবেশিক আমল; চ্যালেঞ্জ ও প্রতিরোধ [১৮শ -১৯৪৭]
ব্রিটিশ শাসনামলে মুসলিম সমাজ রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। অনেক পুরনো মসজিদ ও খানকাহ অবহেলিত হয়ে পড়ার ফলে নতুন নির্মাণ কমে যায়। তবুও মসজিদ রক্ষা ও ইসলামী শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে বিভিন্ন আন্দোলন চলতে থাকে। যথা-হাজী শরীয়াতুল্লাহ ও দুলাল সাহেবের নেতৃত্বে ধর্মীয় সংস্কার ও ব্রিটিশবিরোধী চেতনা ছড়ানোর লক্ষে “ফরায়েজী আন্দোলন” কৃষক বিদ্রোহের কেন্দ্র হিসেবে শহীদ তিতুমীরের “বাঁশের কেল্লা” আন্দোলন এবং শিক্ষিত মুসলিম সমাজ কর্তৃক মসজিদের মাধ্যমে সামাজিক সংস্কারের লক্ষে আলিগড় আন্দোলন ইত্যাদী।
এসময়ে নির্মিত মসজিদগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- সাত মসজিদ (মোহাম্মদপুর, ঢাকা), আহসান মঞ্জিল সংলগ্ন মসজিদ (পুরান ঢাকা) ইত্যাদী।
পাকিস্তান আমল ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় মসজিদের আধুনিকায়ন [১৯৪৭-১৯৭১]
১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠন হলে ইসলামকে রাষ্ট্রীয় আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা হয়, ফলে মসজিদ নির্মাণে সরকারী ও ব্যক্তিগত বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যহারে বেড়ে যায়। এবং পশ্চিম পাকিস্তানের পাশাপাশি পূর্ব-পাকিস্তানে তুলনামূলক কম হলেও এর বাস্তবতা চোখে পড়ে| এসময়ে শহুরে এলাকাগুলোতে বৃহদায়তনের জামে মসজিদ নির্মাণ, সরকারী ও খাস জমিতে মসজিদের ভিত্তি স্থাপন এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এসব প্রজেক্টগুলো আরো ব্যাপকতার সাথে আঞ্জাম দেয়ার লক্ষে “ইসলামী ফাউন্ডেশন” প্রতিষ্ঠা অবশ্যই প্রশংসার দাবী রাখে।
এসময়ে নির্মিত মসজিদ ও স্থাপনাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- বাইতুল মোকাররম, জাতীয় মসজিদ (ঢাকা) ১৯৬৮ সালে ফিল্ড মার্শাল আইয়্যুব খাঁন কর্তৃক উদ্বোধনকৃত ও কাবা শরীফের আদলে নকশাকৃত|
স্বাধীন বাংলাদেশের উদয়: নবজাগরণ ও বহুমুখী উন্নয়ন [১৯৭১-বর্তমান]
১৯৭১ সালে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে অভ্যুদ্বয় ঘটে স্বাধীন বাংলাদেশের। অর্জিত হয় নতুন একটি নাম, নতুন একটি পতাকা, নতুন একটি মানচিত্র, নতুন একটি সংবিধান ও সর্বোপরি নতুন একটি রাষ্ট্রকাঠামোর। এবং এর অধিকাংশ নাগরিক ধর্মীয় পরিচয়ে মুসলমান হওয়ার ফলে মসজিদ বা ইসলামী সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণ ব্যাপক প্রসার লাভ করে। প্রবাসী বাংলাদেশীদের পাঠানো রেমিটেন্স, সরকারী সহায়তা ও জনউদ্যোগে নগরে-শহরে, গ্রামে-গঞ্জে গড়ে ওঠে হাজারো মসজিদ ও ইসলামী সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।
এসময়ের মসজিদগুলোতে উল্লেখযোগ্যভাবে আধুনিক যতসব ডিজাইনের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। যথা- আরবীয়, তুর্কী, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপীয় স্থাপত্যশৈলী, ডিজিটাল সাউন্ড সিস্টেম ও লাইটিং, চোখ ধাঁধাঁনো অত্যাধুনিক কাঠের ডেকোরেশনে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ-ব্যবস্থা, ইসলামিক লাইব্রেরী ও শিক্ষা কেন্দ্র ইত্যাদী সংযোজন চোখে পড়ার মতো।
এসময়ে নির্মিত মসজিদ ও স্থাপনাগুলোর মধ্যে- চাঁদগাঁও জামে মসজিদ (চট্টগ্রাম), বোর্ড বাজার মডেল জামে মসজিদ (গাজীপুর), বাইতুল আমান জামে মসজিদ (গুঠিয়া, বরিশাল), সাউথ টাউন জামে মসজিদ (কেরানীগঞ্জ), ঢাকা শহরের অভিজাত এলাকা-খ্যাত গুলশান, উত্তরা, ধানমণ্ডি, বারিধারা, বসুন্ধরা ও পূর্বাচলে স্থানীয় কল্যাণ সমিতি ও জনউদ্যোগে গড়ে ওঠা নান্দনিক ও আভিজাত্যের ছোঁয়া-ঘেরা আধুনিক মসজিদগুলো উল্লেখযোগ্য।
ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা:
মসজিদ একটি সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক ও ধর্মীয় স্থাপনা হিসেবে বিবেচিত হলেও রাজনৈতিক প্রভাব ও বিভাজনের উষ্ণ স্থান হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এছাড়া অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার অভাবের পাশাপাশি ক্ষেত্রবিশেষে অসচেতনতার ফলে ধর্মীয় বিধি বহির্ভূত সন্ত্রাস ও উগ্রপন্থার অনুপ্রবেশ ঘটছে। ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ক্ষেত্রে যা কিনা খুবই উদ্বেগের বিষয়।
তবে এতকিছুর পরেও বাংলাদেশে মসজিদ সংস্কৃতি এখনও সম্ভাবনাময় সেক্টর হিসেবেই বিবেচিত। বিশেষত- মসজিদ কেন্দ্রিক ডিজিটাল শিক্ষা ও লাইব্রেরী কর্ণার স্থাপন, নারী ও তরুণ সমাজের ব্যাপকহারে ধর্ম ও দ্বীনমুখী হওয়া, পরিবেশবান্ধব স্থাপত্য এবং সর্বশেষ মুসলমানদের ধর্মীয় স্থান হিসেবে মসজিদ স্থাপনা বর্তমানে একটি আন্তর্জাতিক পর্যটন আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে উঠে এসেছে।
একটি পর্যালোচনা:
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সরকারী পর্যায়ে এমন কিছু কাজ করা হচ্ছে, যা হিন্দু বা মুসলমানদের ইতিহাস ঐতিহ্যের সাথে কোনোভাবেই সংগতিপূর্ণ নয়। একটি বিষয় সকলেরই জানা যে, জাতিভেদের ভিত্তিতে হিন্দু সম্প্রদায় শতধা-বিভক্ত| যার ফলে হিন্দু ধর্মে সবার নিকট গ্রহণযোগ্য এমন কোনো সাধারণ বিধি-বিধান নেই।
তেমনিভাবে কোনো হিন্দু মন্দিরে ধর্মীয় বা অন্য কোনো ধরনের শিক্ষা দেয়ার রেওয়াজ কোনোকালেই ছিল না এবং এখনো নেই। এমনকি আমরা যতটুকু জানি, এখনও হিন্দু প্রধান দেশ-ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার মন্দিরগুলো আগের মতোই চলছে। কোথাও মন্দির কেন্দ্রিক শিক্ষা কার্যক্রম চালু হয় নি।
এর কারণ হলো, হিন্দুদের মধ্যে এখনো বেশিরভাগ লোকের মন্দিরে প্রবেশ করার অধিকারই নেই। বিভিন্ন পূজা-পার্বণ অনুষ্ঠান ও অন্যান্য উৎসবগুলোতে তারা মন্দির চত্বর বা পার্শ্ব সংশ্লিষ্ট অস্থায়ী সামিয়ানার নিচে জড়ো হয়ে নির্ধারিত রীতি-নীতি ও উৎসব পালন শেষে ফিরে যান| মূল মন্দিরের ভেতর প্রবেশ বা প্রতিমা স্পর্শ তাদের জন্য নিষিদ্ধ। হিন্দুদের রীতি অনুযায়ী কেবল ব্রাক্ষ্মণ ও হাতেগোনা অন্যান্য উচ্চ-শ্রেণী ও বংশীয় লোকেরাই এ সুযোগ লাভ করে| তথাকথিত অস্পৃশ্য দলিত-শ্রেণী এ অধিকার লােেভর জন্য বহুদিন থেকে আন্দোলন-সংগ্রাম করেও তা আদায় করতে পারছে না| উল্টো এতে করে তারা আরো নিজেদের সহায়-সম্পদ হাতছাড়া করছে প্রতিনিয়ত| ফলে ভাগ্যের নির্মম পরিহাস হিসেবে আজীবনের জন্য তারা এটা মেনে নিয়েছে। এ হচ্ছে বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক ও ধর্ম-নিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে পরিচয় দানকারী ভারতের অবস্থা।
অপরদিকে মুসলিপ্রধান বাংলাদেশের অবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন রকম। এখানে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত (নিউ মডেল) মসজিদ ভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রমের অনুকরণে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা স্বীকৃত হিন্দু-ঐতিহ্যকে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করে চালু করা হয়েছে, মন্দির ভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম| হয়তোবা এটা করার পেছনে উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের মাঝে সমতা রক্ষা করা। কিন্তু এধরনের উদ্যোগ যে হিন্দু সম্প্রদায়ের মাঝে প্রচলিত নীতিবিরুদ্ধ সেটাও তো একবার অন্তত ভেবে দেখা উচিত ছিল।
আমাদের দেশে ১৯৯২ সালে সর্বপ্রথম যে মন্দির ভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম চালু হয়েছে, তার অনুকরণে ভারত সরকারও যদি মসজিদ কেন্দ্রিক অনুরূপ কার্যক্রম শুরু করে, তাহলে ভারতে বসবাসরত প্রায় ৩০ কোটি স্থানীয় মুসলমানগণ কিছুটা উপকৃত হতেন। কিন্তু সেটা কিভাবে সম্ভব? কারণ, সে দেশের মন্দিরগুলোতেই তো এ ব্যবস্থা চালু নেই। তাছাড়া প্রতিনিয়ত যেখানে সরকারী (স্থানীয় প্রশাসনের) উদ্যোগে মুসলমানদের ধর্মীয় স্থাপনা মসজিদগুলোকে বুলডোজিংয়ের মাধ্যমে গুঁড়িয়ে দেয়া হচ্ছে, সেখানে সরকারী অর্থায়ন ও উদ্যোগে মসজিদ কেন্দ্রিক শিক্ষা-কার্যক্রমের কল্পনা করার চেয়ে বড় নির্বুদ্ধিতা আর কী হতে পারে? বরং অবস্থা তো এখন এতটাই নাজুক হালতে পৌঁছেছে যে, নতুন মসজিদ নির্মাণ তো দূরে থাক, পুরাতন মসজিদগুলো স্বমহিমায় নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে টিকে থাকতে পারলেই সেখানকার মুসলিম নাগরিকগণ যারপরনাই খুশী হবেন| আল্লাহ বিশে^র সকল মুসলমানদের সহায় হোন। আমীন।
উপসংহার:
বাংলাদেশের মসজিদ সংস্কৃতি শতাব্দীজুড়ে বিকশিত একটি ঐতিহ্য, একটি ইতিহাস| যা ধর্ম, স্থাপত্য ও সমাজ জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রাচীন পাথুরে গম্বুজ ও মিনার থেকে শুরু করে আধুনিক পিতল, কাঁচ ও স্বর্ণাবৃত ম্বুজ সবই আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করে। এই ঐতিহ্য সংরক্ষণ, স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা, এবং সময়োপযোগী উন্নয়ন নিশ্চিত করলে মসজিদ ভবিষ্যতেও কেবল ইবাদাতের স্থান নয়, বরং সমাজের নৈতিক ও সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের কেন্দ্র হয়ে থাকবে,
ইনশাআল্লাহ!
মুফতী হাফিজুর রহমান
মুদাররিস,
জামি‘আতুল আবরার আল-ইসলামিয়া টাঙ্গাইল