পৃথিবীতে জায়গার কোনো শেষ নেই এবং সর্বত্র আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করা যায়। কিন্তু এসবের মধ্যে মসজিদ এক অনন্য বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। এটি কেবল একটি ইবাদতের স্থান নয়; বরং মুমিনের প্রাণের স্পন্দন, মুসলিম সভ্যতার হৃদয়, আর একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি।
নববী যুগের সেই সাদামাটা মসজিদে নববী আজও দুনিয়ার সকল মসজিদের প্রেরণা। সেখানে সাহাবায়ে কেরাম তাদের জীবনের দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করেছেন।
মসজিদ শুধু ইবাদতের কেন্দ্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এখানেই আসহাবে সুফফার সাহাবাগণ অবস্থান করে দ্বীনের জ্ঞান আহরণ করতেন। এখান থেকেই রাসূলুল্লাহ সা: দাওয়াত দিতেন, সমাজের সংস্কার করতেন এবং রাষ্ট্রের নীতিমালা প্রণয়ন করতেন।
ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ে আমরা দেখতে পাই, যেখানে মুসলমানরা নতুন ভূমি জয় করেছে, সেখানেই সর্বপ্রথম একটি মসজিদ নির্মিত হয়েছে। কুফা, বসরা, ফুস্তাত, দামেস্ক, বাগদাদ, কায়রো, কর্ডোভা কিংবা দিল্লি—প্রত্যেক স্থানে মসজিদ ছিল ইসলামী সভ্যতা ও সমাজ বিনির্মাণের মূল কেন্দ্র। এমনকি মসজিদকে নির্মাণ এবং তা রক্ষণাবেক্ষণ করা ছিল সাহাবায়ে কেরাম রা., তাবে‘ঈন এবং তাবে‘ তাবে‘ঈনগণের অভ্যাস।
ইমাম আওযা‘ঈ রহ. বলেছেন: পাঁচটি বিষয়ে সাহাবাগণ এবং তাদের পরে আসা নেককার তাবে‘ঈন অবিচল ছিলেন। জামা‘আতের সাথে থাকা, সুন্নাহর অনুসরণ করা, মসজিদ নির্মাণ ও তা রক্ষণাবেক্ষণ করা, কুরআন তিলাওয়াত করা এবং জিহাদ করা।
নববী যুগের প্রথম মসজিদ:
নবী কারীম সা: এর প্রাথমিক জীবন এমন বিপদ ও কষ্টে ভরা ছিল, যার কোনো তুলনা ইতিহাসে পাওয়া যায় না। এমন কঠিন সময়ে কোনো মসজিদ নির্মাণ করা সম্ভব ছিল না, তবে মসজিদুল হারাম বিদ্যমান ছিল, যেখানে মুসলমানগণ অন্তরের প্রশান্তি লাভ করতেন। এই কারণেই মক্কী জীবনে কোনো মসজিদ নির্মাণের উল্লেখ পাওয়া যায় না। মানুষ লুকিয়ে-লুকিয়ে নামায পড়ত এবং নবী কারীম সা: কোনো সাহাবীর ঘরে উপস্থিত হলে সমস্ত সাহাবা একত্র হতেন এবং সেই সভায় দ্বীনের চর্চা হত। জামা‘আতে নামাযের কোনো বিশেষ ব্যবস্থা ছিল না, যেখানে সময় হতো সেখানেই নামায পড়া হতো। হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. বলেন:وَكَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُصَلِّي قَبْلَ أَنْ يَبْنِيَ الْمَسْجِدَ حَيْثُ أَدْرَكْتُهُ الصَّلَاةُ
অর্থ: মসজিদ নির্মাণের আগে নবী কারীম সা: যেখানে সময় পেতেন সেখানে নামায পড়তেন। ( সুনানে ইবনে মাযাহ, হাদীস নং: ৭৪২)
তবে কিছু সাহাবা রা. তাঁদের বাড়িতে নামাযের জন্য একটি নির্দিষ্ট স্থান তৈরি করেছিলেন। যেখানে তাঁরা তাহাজ্জুদ, নফলসহ আল্লাহ তা‘আলার ইবাদাতে মশগুল থাকতেন। ফিকহের পরিভাষায় একে “মসজিদুল বাইত” বলা যেতে পারে। কিছু মুহাদ্দিস এ ধরনের স্থানকেও মসজিদ বলে অভিহিত করেছেন।
মসজিদ তখনই প্রতিষ্ঠিত হলো যখন মক্কার কাফেরদের নির্যাতনে জীবন দুর্বিষহ হয়ে গেল এবং আল্লাহর নির্দেশে নবী কারীম সা: হিজরত করে মদীনায় রওয়ানা হলেন। পথে যখন কুবা নামক স্থানে কয়েকদিন অবস্থান করলেন, তখন সর্বপ্রথম মসজিদে কুবা তৈরি হলো।
মসজিদে কুবা:
কুবা মসজিদের জায়গাটি ছিল হযরত কুলসুম ইবনুল হিদম রা. এর খেজুর শুকানোর একটি জমি। তিনি ছিলেন আমর ইবনে আওফের গোত্রপতি। এখানে রাসূল সা: ১৪ দিন (মতান্তরে ১০ দিন) অবস্থান করেন ও তার আতিথ্য গ্রহণ করেন।
মদীনার দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে অবস্থিত এই মসজিদ ‘কুবা’ গ্রামে অবস্থিত। মসজিদে নববী থেকে এর দূরত্ব মাত্র পাঁচ কিলোমিটার। কুবা একটি বিখ্যাত কূপের নাম। সময়ের পরিক্রমায় এ কূপকে কেন্দ্র করে যে জনবসতি গড়ে উঠেছে, তাকেও কুবা বলা হতো। এরই সূত্রে মসজিদের নাম হয়ে যায় মসজিদে কুবা।
রাসূল সা: যখন এর ভিত্তি স্থাপন করেন, তখন কিবলার দিকের প্রথম পাথরটি নিজ হস্তে স্থাপন করেন। অতঃপর আবু বকর রা. একটি পাথর স্থাপন করেন। তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে আবু বকর রা.-এর পাথরের পাশের পাথরটি স্থাপন করেন উমর রা.। এরপর সবাই যৌথভাবে নির্মাণকাজ শুরু করেন।
তাঁরা নিজেরাই ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা এবং নিজেরাই ছিলেন শ্রমিক। এভাবেই রাসূলুল্লাহ সা: এর যুগের প্রথম মসজিদ প্রস্তুত হলো। এই মসজিদ আল্লাহর দরবারে এমন গ্রহণযোগ্যতা পেল যে কুরআন মাজীদ এভাবে এর মর্যাদা ঘোষণা করল:لَمَسْجِدٌ أُسِّسَ عَلَى التَّقْوَى مِنْ أَوَّلِ يَوْمٍ أَحَقُّ أَنْ تَقُومَ فِيهِ
অর্থ: “সে মসজিদ, যার ভিত্তি প্রথম দিন থেকেই তাকওয়ার ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তাতেই আপনার দাঁড়ানো অধিক যোগ্য।” নবী কারীম সা: এর সাথে এই প্রথম মসজিদের এমন গভীর ভালোবাসা ছিল যে তিনি প্রতি সপ্তাহে সেখানে আসতেন এবং দুই রাক‘আত নামায আদায় করতেন।
সাহাবাগণও নিজেদের সময়ে এ ধারাকে অব্যাহত রেখেছিলেন। উমর ফারুক রা. এর অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল যে, তিনি সপ্তাহে দুই দিন সেখানে আসতেন, এমনকি নিজ হাতে মসজিদ ঝাড়ু দিতেন।
মসজিদে নববী:
হিজরত শেষে মদীনায় পৌঁছে নবীজী সা: প্রথম যে কাজটি করলেন, তা হলো মসজিদে নববীর নির্মাণ। রাসূল সা: এর উট যেখানে বসেছিল, সে জায়গাটি ছিল বনু নাজ্জার গোত্রের দুই ইয়াতীম বালকের মালিকানাধীন জমি। এ জমি নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। রাসূল সা: বললেন:يَا بَنِي النَّجَّارِ، ثَامِنُونِي بِحَائِطِكُمْ هَذَا
“হে বনু নাজ্জার, তোমাদের এই জমির দাম আমাকে বলো।” (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৪৫০)
এ খবর শোনামাত্র তারা সেই জমি বিনা মূল্যে হাদিয়া করতে চাইলো এবং বলল:لا والله لا نطلب ثمنه إلا إلى الله
অর্থাৎ: “আল্লাহর কসম, আমরা এর দাম চাইব না; আমরা কেবল আল্লাহর কাছেই প্রতিদান চাই।”
কিন্তু নবী কারীম সা: তা মঞ্জুর করলেন না; তিনি দামে ক্রয় করতে সম্মত হলেন| পরিশেষে দাম দিয়ে জমিটি ক্রয় করা হলো। ঐ দাম হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা. তাঁর নিজ অর্থ থেকে পরিশোধ করেন।
(তারীখে তাবারী ২/৩৩৯, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৩/২২৩)
মসজিদের আকার ছিল, দৈর্ঘ্যে আনুমানিক ৭০ হাত, প্রস্থে আনুমানিক ৬০ হাত। (ইবনে সা’দ, তাবাকাত ১/২৪০)
এরপর নবী কারীম সা: সাহাবায়ে কেরামের সাথে ঐ স্থানে মসজিদে নববীর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেন| প্রথম ইট রাখলেন স্বয়ং রহমতের মূর্ত প্রতীক নবী কারীম সা: নিজ হাতে, তারপর সাহাবায়ে কেরাম রাখলেন। ইট বহনের কাজ নবী কারীম সা: নিজ হাতে এবং সাহাবাগণ নিজেরাই করছিলেন এবং বলছিলেন,اللهم لا عيش إلا عيش الآخرة، فاغفر للأنصار والمهاجرة
অর্থ: “হে আল্লাহ! প্রকৃত জীবন তো আখেরাতের জীবন| সুতরাং আনসার ও মুহাজিরদের ক্ষমা করে দাও।” (সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ৩৯২৩)
এই মুবারক মসজিদেরও স্থপতি এবং শ্রমিক ছিলেন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সা:। এই খোদাপ্রেমিকরা নবী কারীম সা এর তত্ত্বাবধানে যে মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন, তা সব ধরনের আড়ম্বর ও সাজসজ্জা থেকে মুক্ত ছিল। সেখানে কোনো অলঙ্করণ ছিল না, ঝাড়বাতি বা ফানুস ছিল না, উজ্জ্বল পাথরের ঝলকানি ছিল না, চোখ ধাঁধানো রঙ-রূপও ছিল না| বরং মসজিদে নববী সরলতার এক অনন্য উদাহরণ ছিল— কাঁচা ইটের দেয়াল, খেজুরপাতার ছাউনি আর খেজুরগাছের গুঁড়ি দিয়ে ˆতরি স্তম্ভ।
এই মসজিদগুলোর ভিত্তিই ছিল এক ইঙ্গিত যে, মুমিন যেখানে সুযোগ পাবে, সে প্রথমেই বরং নিজের ঘরের আগে মসজিদ নির্মাণ করবে।
সাহাবা যুগে বিভিন্ন অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য কিছু মসজিদ:
১| চেরামান মসজিদ, ভারত
ভারতবর্ষের প্রথম মসজিদ চেরামান মসজিদ। যা নির্মিত হয় ৬২৯ খ্রি.। ইসলাম প্রচারের জন্য ও ব্যবসায়িক কর্মকান্ডের কারণে রাসূলে কারীম সা: এর জীবদ্দশাতেই এখানে ছুটে আসেন সাহাবায়ে কিরাম। সেই সুবাদে ভারতবর্ষে প্রতিষ্ঠিত প্রথম মসজিদ। দেশটির কেরালা রাজ্যের ত্রিসুর অঞ্চলের চেরামান জামে মসজিদ। মসজিদটির সম্মুখভাগে স্থাপিত শিলালিপি অনুযায়ী পঞ্চম হিজরি মোতাবেক ৬২৯ খ্রিস্টাব্দে সাহাবী মালিক বিন দিনার রা. মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেন| স্থানীয়দের কাছে মসজিদটি ‘চেরামান জুমা মসজিদ’ নামে পরিচিত। মালিক ইবনে দিনার ছিলেন এই মসজিদের প্রথম ইমাম। একাদশ শতাব্দীতে মসজিদটির সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ করা হয়। ক্রমান্বয়ে মুসল্লীদের সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে ১৯৭৪, ১৯৯৪ ও ২০০১ সালে মসজিদের সামনের অংশ ভেঙে আয়তন সম্প্রসারিত করা হয়| (A Survey Of Kerala History:50)
২| হুয়াইশেং মসজিদ, চীন
হুয়াইশেং হলো চীনের প্রাচীনতম মসজিদ| যা ৬২৭ ঈ. সালে নির্মিত হয়। খ্রিস্টীয় ৬২৭ বা ৩য় হি. এর কাছাকাছি সময় রাসূলে কারীম সা. এর মামা হযরত সা‘দ বিন আবি ওয়াক্কাস রা. বিশিষ্ট তিনজন সাহাবীকে নিয়ে সর্বপ্রথম মসজিদটি নির্মাণ করেন। মসজিদটি ‘লাইটহাউস বা বাতিঘর মসজিদ’ নামেও পরিচিত। এটি চীনের গুয়াংজুর প্রধান মসজিদ। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সা. কে স্মরণ করে মসজিদটির নামকরণ করা হয় ‘হুয়াইশেং মসজিদ’| যেটিকে মসজিদের আলোক বুরুজও বলা হয়। বন্দরঘেঁষা ব্যস্ত এ শহরের কোলাহলে দাঁড়িয়ে আছে এক ইতিহাসের সাক্ষী, এক আধ্যাত্মিক নিদর্শন হুয়াইশেং মসজিদ| শুধু ইবাদাতের স্থান নয়, এটি এক জীবন্ত দলিল; যেখানে মিলেমিশে গেছে ইসলামি সভ্যতা, প্রাচীন চীনা ঐতিহ্য আর সমুদ্রপথে বিস্তৃত দাওয়াতের অনন্য কাহিনী| প্রায় ১৩৯০ বছরের পুরোনো এ স্থাপনাই ইসলামের আগমনের প্রথম স্বাক্ষর হয়ে আছে চীনের বুকে। ২ হাজার ৯৬৬ বর্গমিটার আয়তনের এ মসজিদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় নিদর্শন হলো মিনারটি। ১১৮ ফুট উচ্চতার সরু এক টাওয়ার, যা দেখতে একেবারেই সিলিন্ডারের মতো। পাথর ও চুন-সুরকির নিপুণ কারুকাজে গড়া এ আলোক বুরুজ শুধু চীনের মধ্যে নয়, সমগ্র ইসলামি স্থাপত্যেই এক অনন্য সংযোজন। এর ভেতরের সরু সিঁড়িপথ বেয়ে উঠলে আজও বোঝা যায়, এক সময় এটি কীভাবে ঝুজিয়াং নদীপথের নাবিকদের জন্য দিকনির্দেশনা ছিল| হুয়াইশেং মসজিদ শুধু গড়ে ওঠেনি, বারবার ধ্বংসও হয়েছে। ১৩৫০ সালে একবার বড় ধরনের সংস্কার হয়। পরে ১৬৯৫ সালে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মসজিদটি ধ্বংস হয়ে গেলে নতুন করে নির্মাণ করা হয়। তারপর থেকে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এটি অটল দাঁড়িয়ে আছে, যেমন দাঁড়িয়ে থাকে বিশ্বাসের দুর্গ। (Martin Frishman and Hasan-Uddin Khan: 110-112) (উত্তর-পশ্চিম চীনে মুসলমানদের ইতিহাস-জনাথান এন লিপম্যান: ২৯)
৩| আল-কুফা মসজিদ, ইরাক
ইরাকে ষষ্ঠ শতাব্দীতে নির্মিত মসজিদ আল-আযম বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ও পবিত্র মসজিদগুলোর অন্যতম মসজিদ আল-কুফা। ৬৭০ খ্রিস্টাব্দে ইরাকের নাজাফ নগরীতে মসজিদটি নির্মিত হয়। এটি ইরাকের নাজাফ প্রদেশের কুফা নগরীতে অবস্থিত হওয়ায় মসজিদ আল-কুফা নামে সর্বাধিক পরিচিত। মসজিদটির গুরুত্ব হিসেবে ইতিহাসবিদরা বলেন, এটি সেই জায়গা যেখানে আলী রা. মারাত্মকভাবে মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত হন যখন তিনি সেজদারত অবস্থায় ছিলেন। মসজিদটির পুনঃসংস্কারের কাজ ২০১০ সালের শুরুর দিকে শেষ হয়| বর্তমানে ভবনটির আয়তন প্রায় ১১ হাজার মিটার।
৪। কায়রুয়ান জামে মসজিদ, তিউনিশিয়া
তিউনিসিয়ার কায়রুয়ান জামে মসজিদে আফ্রিকার সবচেয়ে পুরোনো মসজিদ। ৫০ হিজরী সালে সাহাবী হযরত মু‘আবিয়া রা. এর অন্যতম সামরিক কমান্ডার উকবা বিন নাফি রহ. ৯ হাজার বর্গমিটার জায়গার ওপর এটি নির্মাণ করেন। তিউনিসিয়ার কায়রুয়ান শহরও প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। এই মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন বলে কায়রুয়ান জামে মসজিদকে উকবা জামে মসজিদও বলা হয়। ২৭ হিজরী সনে ইসলামের তৃতীয় খলীফা হযরত উসমান ইবনে আফফান রা. এর খেলাফতের সোনালী শাসনামলে তিউনিসিয়া ইসলামী শাসনে আসে। খলীফা উসমান রা. এর শাসনামলে মুসলমানরা এদেশ জয়ের পর ‘কায়রুয়ান’ শহরের পতন ঘটে। মুসলিম বাহিনীর মহান সেনাপতি উকবা ইবনে নাফে ফাহরি রা. গভীর চিন্তা-ভাবনার পর শহরটি গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন।
কায়রুয়ান মসজিদ থেকেই আফ্রিকা মহাদেশের প্রথম আযান উচ্চারিত হয়েছিল। শুরুতে এই মসজিদের আয়তন ছিল অনেক ছোট। অত্যন্ত সাধাসিধেভাবে মসজিদটি তৈরি করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে সময়ের পরিক্রমায় বিভিন্ন শাসনামলে মসজিদের আয়তন ও শান-শওকত বৃদ্ধি পায়| মসজিদটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে একটি শক্তিশালী দুর্গ মসজিদটিকে বেষ্টন করে রেখেছে।
কায়রুয়ান মসজিদে পাঁচটি গম্বুজ ও নয়টি প্রবেশদ্বার রয়েছে। এই মসজিদের মেহরাবের কাছে নিচু ছাদবিশিষ্ট আরেকটি কক্ষ রয়েছে। যার নাম মাকসুরা। খলীফাদের নামায আদায় এবং তাদের জীবনের নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য এই বিশেষ কক্ষ মাকসুরা নির্মাণ করা হয়েছিল। এই কক্ষের ভেতরে দাঁড়িয়ে মসজিদে অবস্থানরত মুসল্লিদের দেখা যাওয়ার পাশাপাশি তাদের সঙ্গে এক জামা‘আতে নামায আদায় করা যেত।
কায়রুয়ান জামে মসজিদের প্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছে ইট ও পাথর দিয়ে। এই প্রাচীরের ভেতরেই ˆতরি করা হয়েছে বড় বড় স্তম্ভ| আয়তাকার এসব কারুকাজ তিন স্তরবিশিষ্ট| এর দ্বিতীয় স্তরের কারুকাজ প্রথম স্তরের চেয়ে ছোট এবং তৃতীয় স্তরেরটি দ্বিতীয় স্তরের চেয়ে ছোট। কিন্তু নিচে দাঁড়িয়ে মিনারের দিকে তাকালে তিন স্তরের কারুকাজই সমান মনে হয়। কায়রুয়ান জামে মসজিদের মিম্বার খ্রিষ্টীয় নবম শতাব্দীতে নির্মিত হয়েছে এবং এটি মুসলিম বিশ্বের অন্যতম পুরোনো মিম্বার হিসেবে
পরিচিত।(Great Mosque of Qayrawān: britannica)
৫| মসজিদে আমর ইবনুল আস, মিশর
ইসলামিক কায়রোর ডেড সিটিতে অবস্থিত ‘মসজিদে আমর ইবনুল আস’ আফ্রিকায় স্থাপিত প্রথম মসজিদ। মিশরবাসীর মুক্তিদাতা হিসেবে আমর ইবনুল আস রা. এর নামে মসজিদটি ৬৪১-৬৪২ খ্রিস্টাব্দে রাজধানী ফুসতাতে নির্মাণ করা হয়।
খলীফা হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা. এর আদেশে আমর ইবনুল আস মিশর জয় করেন। তৎকালীন রাজধানী আলেকজান্দ্রিয়া আক্রমণের পূর্বে আমর নীল নদের পূর্ব পাশে শিবির স্থাপন করেন।
মসজিদের মূল কাঠামো ছিল আয়তাকার। এর দৈর্ঘ্য ৪৫ মিটার ও প্রস্থ ২৭ মিটার| ছাদ ছিল নিচু ও এর নির্মাণে পাম গাছের খুঁটি, পাথর ও মাটির ইট ব্যবহার করা হয়। ছাদ পাম পাতায় আচ্ছাদিত ছিল। মেঝেতে পাথর বিছানো থাকত| মসজিদটিতে আমর ইবনুল আসের সেনাবাহিনীর নামায পড়ার মতো বড় ছিল। এ সময় তাতে কোনও মিনার ছিল না।
৬৭৩ সালে গভর্নর মাসলামা ইবনে মুখাল্লাদ আল আনসারী মসজিদটি পুনর্নির্মাণ করেন। এ সময় মসজিদের চারকোণে চারটি মিনার যুক্ত করা হয়। ফলে মসজিদের আকার দ্বিগুণ হয়ে যায়। ৬৯৮ সালে গভর্নর আবদুল আযীয ইবনে মারওয়ান পুনরায় মসজিদ সংস্কার করেন। ৭১১ সালে এতে মেহরাব যুক্ত করা হয়। ৮২৭ সালে গভর্নর আবদুল্লাহ ইবনে তাহির মসজিদের আরও সংস্কার করান। এ সময় তা বর্তমান আকারে পৌঁছায়। নবম শতাব্দীতে আব্বাসীয় খলীফা আল মামুন মসজিদটি সংস্কার করেন। তিনি দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে কিছু অংশ যোগ করেন। এ সময় মসজিদের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ যথাক্রমে ১২০ মিটার ও ১১২ মিটারে পৌঁছায়।
ফাতেমীয় যুগে মসজিদের পাঁচটি মিনার ছিল। চার কোণের চারটি ছাড়াও বাকি একটি মিনার ছিল মসজিদের প্রবেশপথে| তবে বর্তমানে এসব মিনার নেই| এখনকার মিনারগুলো ১৮০০ সালে মুরাদ বে নির্মাণ করেন| (Islamic Architecture in Cairo: Behrens-Abouseif)
৬| মসজিদ আল-ওমরী, ফিলিস্তিন
গাজার পুরনো শহরে অবস্থিত ‘মসজিদ আল-ওমরী আল-কাবীর’ গাজার প্রাচীনতম ও সর্ববৃহৎ মসজিদ। মসজিদটিকে ‘জামে গাজা আল-কাবীর’ অর্থাৎ গাজার বড় মসজিদও বলা হয়| ফিলিস্তিনে এটি তৃতীয় বৃহত্তম মসজিদ—বায়তুল মুকাদ্দাস ও আহমদ পাশা আল-জাজার মসজিদের পরই এর অবস্থান। মসজিদটির আয়তন প্রায় ৪,১০০ বর্গমিটার। এর প্রাঙ্গণের আয়তন ১,১৯০ বর্গমিটার। এখানে একসাথে ৩,০০০-এরও বেশি মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন।
ওমরি মসজিদ নির্মিত হয়েছিল প্রায় দেড় হাজার বছর আগে ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা হযরত ওমরের রা. খেলাফতকালে। পরবর্তীতে তার নামেই মসজিদটির নামকরণ করা হয়েছে ‘মসজিদ আল-ওমরী’।এর আগে এ জায়গায় ছিল গির্জা, আরও আগে ছিল প্যাগান মন্দির।
মন্দির থেকে গির্জায় রূপান্তর:
প্রায় দুই হাজার বছরেরও বেশি সময় আগে এটি ছিল পৌত্তলিকদের অন্যতম বৃহৎ মন্দির। তখন গাজা ছিল ফিলিস্তিন ও শামের সর্বশেষ শহরগুলোর একটি। গাজায় তখন পৌত্তলিকদের আধিপত্য ছিল। সে সময় মন্দিরটি ছিল মজবুত দুর্গাকৃতির ভবন, যার আয়তন ছিল ৭০,০০০ বর্গমিটারের বেশি।
আজ যেখানে মসজিদে ওমরীর মিনারটি দাঁড়িয়ে, তখন সেখানে ছিল তাদের উপাস্য জিউসের মূর্তি। মন্দিরের এক প্রান্তে ছিল গাজা নগরীর প্রধান প্রবেশদ্বার| গাজার খ্রিস্টানরা তখন গোপনে ধর্মচর্চা করত। পৌত্তলিকরা খ্রিস্টানদের ওপর বিভিন্নভাবে নির্যাতন চালাতো। গাজার খ্রিস্টানদের একজন পুরোহিত গাজা থেকে বিতাড়িত হয়ে রোমানদের রাজধানী কনস্টান্টিনোপলে যান এবং তৎকালীন রোমান সম্রাট ও তার স্ত্রীর কাছে গাজার খ্রিস্টানদের দুরবস্থা তুলে ধরেন।
এর প্রেক্ষিতে রোম সম্রাট গাজায় হামলা চালায় এবং পৌত্তলিকরা ব্যাপক হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়। গাজায় পৌত্তলিক রাষ্ট্রের পতন ঘটে এবং খ্রিস্টধর্মকে গাজার সরকারি ধর্ম হিসেবে ঘোষণা করা হয়| রোমানরা প্যাগানদের দেবতা জিউসের মূর্তি মাটির নিচে পুঁতে ফেলে এবং মন্দিরটিকে গির্জায় রূপান্তরিত করে। ৬৩৫ খ্রিস্টাব্দে খলীফা ওমর ইবনুল খাত্তাব রা. এর খেলাফতকালে আমর ইবনে আস রা. এর নেতৃত্বে গাজা যখন মুসলমানদের শাসনাধীনে আসে, তখন গাজার অধিকাংশ মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে এবং তারা শহরের সবচেয়ে বড় গির্জাটিকে মসজিদে রূপান্তরের প্রস্তাব দেয়। এরপর এটি মসজিদে রূপান্তরিত হয়।
১১৪৯ খৃষ্টাব্দে ক্রুসেডাররা যখন গাজা দখল করে, তখন তারা ওমরী মসজিদ ধ্বংস করে সেখানে ‘সেন্ট জন গির্জা’ নির্মাণ করে। ১১৮৭ সালে সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ূবী ক্রসেডারদের পরাজিত করার পর এটি আবার মসজিদে রূপান্তরিত হয়।
মামলুক ও উসমানীয়দের যুগে ওমরী মসজিদ:
খ্রিষ্টীয় ১৩ শতকের শেষভাগ পর্যন্ত মসজিদটি প্রায় অপরিবর্তিত ছিল। মামলুকদের শাসনামলে মসজিদটিকে সম্প্রসারণ করা হয় এবং এতে বিভিন্ন সংস্কার করা হয়| পরে মঙ্গোলদের আক্রমণে এটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। কয়েক বছর পর মামলুকরা আবার এটি পুনর্নির্মাণ ও
সম্প্রসারণ করে।
মসজিদে ওমরীর প্রথম মিনারটি মামলুক আমলেই নির্মিত হয়। তাতে যে শিলালিপি পাওয়া গেছে তাতে মিশরের মামলুক সুলতান নাসির কালাউন, কায়েতবে এবং আব্বাসীয় খলীফা মুস্তাঈনের নাম রয়েছে, যারা ১৪ থেকে ১৬ শতকের শাসক ছিলেন। এ ছাড়া ১৬৬৩ সালে গাজার অটোমান গভর্নর মূসা পাশার নামও শিলালিপিতে পাওয়া যায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ বিমানবাহিনীর বোমা বর্ষণে মসজিদের বড় অংশ ধ্বংস হয় এবং মিনারটি ভেঙে পড়ে। ১৯২৬ সালে মসজিদটি পুনর্নির্মিত হয়। গাজার সাম্প্রতিক যুদ্ধে ২০২৩ সালের ৮ ডিসেম্বর ইসরায়েলী বিমান হামলায় ওমরী মসজিদ প্রায় সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে। এর আগেও ২০১৪ সালে ইসরায়েলের আক্রমণে এই মসজিদের কিছু অংশ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল যা পরবর্তীতে পুনর্নির্মাণ করা হয়। কিন্তু এবার মসজিদটি পুরোপুরি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
৭। আস-সাহাবা কমপ্লেক্স, বাংলাদেশ
ঐতিহাসিক ‘হারানো মসজিদ’ দেশের স্থাপত্য ও ঐতিহ্যের এক অমূল্য নিদর্শন। এটি লালমনিরহাট সদর উপজেলার পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের রামদাসে অবস্থিত। সম্প্রতি মসজিদটির নামকরণ করা হয়েছে ‘৬৯ হিজরীর হারানো (সাহাবা) মসজিদ কমপ্লেক্স’।
প্রায় ১৪০০ বছর আগে নির্মিত এই মসজিদ শুধু বাংলাদেশের নয়, এশিয়ারও অন্যতম প্রাচীন মসজিদ হিসেবে বিবেচিত। মসজিদটি বাংলাদেশে মুসলমানদের আগমনের প্রারম্ভিক ইতিহাসের রাজসাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
জানা যায়, ১৯৮৩-৮৪ সালে জঙ্গল পরিষ্কারের সময় মসজিদটির
ধ্বংসাবশেষ প্রথম আবিষ্কৃত হয়। পরবর্তীতে ১৯৮৬ সালের ১০ মুহাররমে স্থানীয় নাগরিক আইয়ূব আলী একটি খোদাইকৃত ইট উদ্ধার করেন। ইটে লেখা ছিল-‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ, হিজরী সন ৬৯।’
শিলালিপি প্রমাণ করে মসজিদটির বয়স প্রায় ১৩৫০ বছর। বর্তমানে এটি মসজিদের ভেতরে সংরক্ষিত ও প্রদর্শিত হচ্ছে। মসজিদের ভেতরে উদ্ধারকৃত শিলালিপি ও সংরক্ষিত প্রাচীন শিল্পকর্মগুলো পর্যবেক্ষণ করলে স্পষ্ট হয়, স্থাপত্যশৈলীতে প্রাচীন আরবীয় নকশার ছোঁয়া বিদ্যমান। মোটা ও খাঁজকাটা ইটে নির্মিত দেয়াল, সূক্ষ্ম অলংকৃত মেহরাব এবং খিলান স্থাপনার শিল্পকর্মের উৎকৃষ্ট নিদর্শন। ধ্বংসাবশেষের দৈর্ঘ্য ছিল ২১ ফুট ও প্রস্থ ১০ ফুট। ভেতরে চারটি খুঁটির অবশিষ্টাংশ এবং একটি প্রাচীন প্রবেশপথ এখনও সংরক্ষিত রয়েছে।
জানা যায়, ইসলাম প্রচারের প্রাথমিক সময়ে সাহাবায়ে কেরাম এ অঞ্চলে এসে মসজিদটি নির্মাণ করেন। অনেকে মনে করেন, সা‘দ বিন আবি ওয়াক্কাছ রা. চীনের পথে এ অঞ্চলে অবস্থানকালে মসজিদটির ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। তৎকালীন ব্রহ্মপুত্র-তিস্তা অববাহিকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ হিসেবে ব্যবহৃত হত, যা মসজিদের ঐতিহাসিক গুরুত্ব বাড়িয়ে তোলে।
পরবর্তীতে মসজিদ পরিচালনা কমিটির উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘আস-সাহাবা কমপ্লেক্স’, যা বর্তমানে ‘৬৯ হিজরীয় হারানো (সাহাবা) মসজিদ কমপ্লেক্স’ নামে পরিচিত। এখানে মসজিদ কমপ্লেক্সের পাশাপাশি একটি ক্বওমী মাদরাসাও স্থাপন করা হয়েছে| যেখানে প্রায় ২০০ শিক্ষার্থী পাঠ গ্রহণ করছে।( বাসস :২৩ আগস্ট, ২০২৫)
নিকট অতীতের কিছু উল্লেখযোগ্য মসজিদ:
মুসলিম উম্মাহ যেকোনো উপলক্ষে পৃথিবীর নানান জায়গায় বিভিন্ন জনপদে মসজিদ ˆতরি করেছেন। মসজিদ যেমন বিজয়ের স্মারক, ধর্মীয় প্রয়োজন, স্থানীয় মানুষের আত্মপরিচয়ের নিদর্শন ইত্যাদি। শতাব্দীর পর শতাব্দী অতিক্রান্ত হওয়ার পরও এ সকল মসজিদ অদ্যবধি আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে বিমূর্ত প্রতীকের মতো; যেন তারা প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য দিচ্ছে ইসলামের সৌন্দর্য, মুসলিম উম্মাহর ঈমানী শক্তি এবং ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় আমাদের আত্মপরিচয়ের। এগুলো আমাদের বলে দেয়, যেখানেই মুসলিম উম্মাহর পদচিহ্ন পড়েছে, সেখানেই আল্লাহর ঘর নির্মিত হয়েছে। নিচে নিকট অতীতকালের কিছু মসজিদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তুলে ধরা হলো:
১। জামে মসজিদ, দিল্লি
মুঘল সম্রাট শাহজাহান ১৬৪৪ থেকে ১৬৫৬ সালের মধ্যে মুঘল রাজধানী, শাহজাহানাবাদে সবচেয়ে উঁচু স্থানে মসজিদটি নির্মাণ করেন। এবং মসজিদটির প্রথম ইমাম, সৈয়দ আব্দুল গফুর শাহ বুখারী মসজিদটির উদ্ভোধন করেন। ১৮৫৭ সালে মুঘল সাম্রাজ্যের পতন পর্যন্ত এটি ছিল সাম্রাজ্যের প্রধান মসজিদ। মসজিদটি ভারতে ইসলামিক শক্তি এবং ঔপনিবেশিক শাসনে প্রবেশের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত ছিল। ব্রিটিশ শাসনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এটি রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এটি এখনও চালু আছে এবং এটি দিল্লির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোর একটি, যার পরিচিতি পুরান দিল্লির সাথে মিশে আছে। মসজিদটির নকশা করেন স্থপতি, উস্তব খলীল এবং এর নির্মাণে প্রায় ৫০০০ জন শ্রমিক কাজ করে। (Jama Masjid of Delhi” Britannica)| এ নিমার্ণে তুর্কি, আরব, পারস্য এবং ইউরোপ সহ বিভিন্ন দেশের মানুষ কাজ করে। এ নির্মাণের তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে ছিলেন শাহজাহান এর উযীর (বা প্রধান মন্ত্রী), সাদুল্লাহ খান এবং শাহজাহান এর পরিবারের হিসাবাধ্যক্ষ, ফজিল খান। সে সময় অনুযায়ী, নির্মাণ করতে প্রায় ১০ লাখ (১ মিলিয়ন) রুপি খরচ হয়| (History of Jama Masjid and interpretation of Muslim devotions. p. 8–9)
২। সুলতান আহমেদ মসজিদ, ইস্তাম্বুল
সুলতান আহমেদ মসজিদ ১৭ শতকের মসজিদ যা অটোমান সাম্রাজ্যের সবচেয়ে চমৎকার স্থাপনাগুলির মধ্যে একটি , যা তুরস্কের ইস্তাম্বুল বাইজেন্টাইন হিপোড্রোমের পাশে এবং আয়া সোফিয়ার বিপরীতে অবস্থিত। ছয়টি মিনার এবং এর অনেক গম্বুজের জন্য পরিচিত। ভবনটির অভ্যন্তরের রঙের জন্য নীল মসজিদ নামে পরিচিতি লাভ করে। তবে এটি আসলে সুলতান আহমেদ মসজিদ নামেই পরিচিত সুলতান প্রথম আহমেদের নামে নামকরণ করা হয়েছে। যিনি এর নির্মাণের আদেশ দিয়েছিলেন। নীল মসজিদটি ১৬০৯ থেকে ১৬১৬ সালের মধ্যে ইস্তাম্বুলের কেন্দ্রস্থলে নির্মিত হয়েছিল| আয়া সোফিয়ার বিপরীতে এর অবস্থান থেকে বোঝা যায় যে, আহমেদ প্রথম মসজিদটিকে পূর্বতন ক্যাথেড্রালের গৌরবের সাথে প্রতিযোগিতা করার জন্য ˆতরি করেছিলেন। মসজিদের স্থপতি, সেদেফকার মেহমেদ আগা, এর কাঠামোর নিখুঁত অনুপাতের জন্য কৃতিত্বের দাবিদার। খোদাই করা মার্বেল মিম্বার এমনভাবে স্থাপন করা হয়েছে যাতে মসজিদের যেকোনো স্থান থেকে ইমামের শব্দ শোনা যায়। মসজিদের কেন্দ্রীয় গম্বুজটি ৭৭ ফুট (২৩.৫ মিটার) ব্যাস এবং ১৪১ ফুট (৪৩ মিটার) উঁচু। এটি চারটি বৃহৎ স্তম্ভ দ্বারা সমর্থিত এবং আটটি ক্যাসকেডিং ছোট গম্বুজ দ্বারা বেষ্টিত। মসজিদের অভ্যন্তরটি ইজনিকের ২০,০০০ এরও বেশি হস্তনির্মিত সিরামিক টাইলস দিয়ে সারিবদ্ধ, যা ফুল, গাছ এবং বিমূর্ত নকশা দিয়ে সমৃদ্ধভাবে সজ্জিত। টাইলসের উপরে দেয়ালগুলি বিভিন্ন মোটিফ দিয়ে আঁকা। ২৫০টিরও বেশি রঙিন কাঁচের জানালা দিবালোককে ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়| মসজিদটি নির্মাণের পরপরই আহমেদ প্রথম মারা যান এবং মসজিদের দেয়ালের ঠিক বাইরে একটি সমাধিতে তাকে সমাহিত করা হয়।
সুলতান আহমেদ মসজিদে প্রায় ১০,০০০ মুসল্লী একসাথে নামায পড়তে পারেন এবং শত শত মুসলিম প্রতিদিন পাঁচবার নামাযের জন্য এটি ব্যবহার করে। আরও অনেকে শুক্রবার এবং মুসলিম উৎসবের সময় এখানে আসে| মসজিদটি যখন ইবাদতের জন্য ব্যবহৃত হয় না তখন পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত থাকে। অমুসলিমদের প্রবেশ পথ দক্ষিণ প্রবেশ পথ দিয়ে, তবে পশ্চিম প্রবেশ পথটি সবচেয়ে সুন্দরভাবে সজ্জিত। (Medieval Islamic Civilization an encylopedia)
৩| বাদশাহী মসজিদ, লাহোর
বাদশাহী মসজিদ পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের রাজধানী লাহোরে অবস্থিত একটি মুঘল যুগের মসজিদ। এটি পাকিস্তান ও দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম মসজিদ এবং পৃথিবীর পঞ্চম বৃহত্তম মসজিদ। ষষ্ঠ মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব রহ. ১৬৭১ সালে এই মসজিদটি নির্মাণ করেন এবং ১৬৭৩ সালে নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়| এই মসজিদ সৌন্দর্যের দিক থেকে মুঘল সাম্রাজ্যের স্মৃতি বহন করে।
সম্রাটের পালক ভাই এবং লাহোরের গভর্নর মুজাফ&ফর হুসেন – যিনি ফিদাই খান কোকা নামেও পরিচিত- মারাঠা রাজা ছত্রপতি শিবাজির বিরুদ্ধে তাঁর সামরিক অভিযানের স্মরণে আওরঙ্গজেব মসজিদটি ˆতরি করেছিলেন। নির্মাণ শুরু হওয়ার মাত্র দুই বছর পর মসজিদটি ১৬৭৩ সালে খোলা হয়। (Medieval Islamic Civilization an encylopedia)