মসজিদ আল্লাহর ঘর। ইসলামের অন্যতম নিদর্শন। আল্লাহ তা‘আলার কাছে দুনিয়ার সবচেয়ে প্রিয় স্থান। নবীজী সা: বলেছেন,أَحَبُّ الْبِلَادِ إِلَى اللهِ مَسَاجِدُهَا، وَأَبْغَضُ الْبِلَادِ إِلَى اللهِ أَسْوَاقُهَا
অর্থ: আল্লাহ তা‘আলার নিকট সবচেয়ে প্রিয় স্থান হল মসজিদ এবং সবচেয়ে অপছন্দের স্থান হল বাজার। (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং:৬৭)
‘মসজিদ আল্লাহর ঘর’ একথার পর সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা না থাকলেও আমাদের উপর অপরিহার্য ছিল, মসজিদের পবিত্রতা ও আদব রক্ষা করা। কারণ, এর আদব রক্ষা করা মহান আল্লাহর প্রতি ভালবাসা ও আনুগত্যেরই বহিঃপ্রকাশ। তথাপি মসজিদের আদব সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
১. মসজিদে যাওয়ার আগে মিসওয়াক করা।
বিষয়টির গুরুত্ব বোঝার জন্য একটি হাদীসই যথেষ্ট। নবীজী সা: বলেন,
لولا أن أشق على أمتي لأمرتهم بالسواك عند كل صلاة
অর্থাৎ. যদি আমার উম্মতের কষ্ট হবে মনে না করতাম, তবে আমি তাদের আদেশ দিতাম, যেন প্রত্যেক নামাযের সময় মিসওয়াক করে। (সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ৮৮৭)
এখানে একদিকে যেমন উম্মতের প্রতি নবীজীর মায়া প্রকাশ পাচ্ছে যে, উম্মতের কষ্টের আশঙ্কায় মিসওয়াকের আদেশ করেননি। কারণ, আদেশ করলে তো উম্মতের জন্য কাজটি বাধ্যতামূলক হয়ে যেত। অপরদিকে মিসওয়াকের গুরুত্বও প্রকাশ পাচ্ছে।
২. ভালো পোশাক পরিধান করে মসজিদে গমন করা।
কোনো সম্মানিত মানুষ বা বন্ধুবান্ধবের সাথে আমরা যখন সাক্ষাৎ করি, ভালো জামা পরে পরিপাটি হয়ে সাক্ষাৎ করি। এটি যেমন তার মর্যাদা রক্ষার দাবি, তেমনইভাবে ইসলামেরও নির্দেশনা। অনুরূপ আমরা যখন মসজিদে যাই, তখনো আমাদের এই বিষয়ে যত্নবান হওয়া কাম্য। কারণ, আদব-তাযীমের জন্য আল্লাহ তা‘আলা বেশি হকদার। আল্লাহ তাআলা বলেন,
یٰبَنِیْۤ اٰدَمَ خُذُوْا زِیْنَتَكُمْ عِنْدَ كُلِّ مَسْجِدٍ وَّ كُلُوْا وَ اشْرَبُوْا وَ لَا تُسْرِفُوْا اِنَّهٗ لَا یُحِبُّ الْمُسْرِفِیْنَ۠
অর্থ: হে আদম সন্তানেরা! তোমরা প্রত্যেক নামাযের সময় নিজেদের শোভা অবল¤^ন কর| (অর্থাৎ পোশাক পরে নাও|) (সূরা আ‘রাফ :৩১)
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা ইবনে কাসীর রাহ. বলেন,
ولهٰذه الاٰية وما ورد في معناها من السنة يستحب التجمل عند الصلاة ولا سيما يوم الجمعة ويوم العيد، والطيب، لأنه من الزينة، والسواك، لأنه من تمام ذٰلك الخ
অর্থাৎ, এই আয়াত ও এ বিষয়ক সুন্নাহ দ্বারা একথা প্রমাণিত হয় যে, নামাযের সময় বিশেষত জুমু‘আ ও ঈদে পরিপাটি হওয়া, সুগন্ধি লাগানো এবং মিসওয়াক করা মুস্তাহাব| (তাফসীরে ইবনে কাসীর ৩/৪৪৯)
বিষয়টি নবীজীর এই হাদীস থেকেও উপলব্ধি করা যায়,
مَا عَلَى أَحَدِكُمْ إِنْ وَجَدَ، أَوْ مَا عَلَى أَحَدِكُمْ إِنْ وَجَدْتُمْ، أَنْ يَتَّخِذ ثَوْبَيْنِ لِيَوْمِ الْجُمُعَةِ سِوَى ثَوْبَيْ مِهْنَتِهِ
অর্থাৎ. তোমরা পারলে কাজের পোশাক ছাড়া জুমু‘আর জন্য অতিরিক্ত একজোড়া জামা রাখবে| (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং: ১০৭৮)
৩.ধীরেসুস্থে মসজিদে গমন ও নামাযে অংশগ্রহণ করা|
নামাযে যেমন ধীরস্থিরতা অপরিহার্য, নামাযের দিকে আসার সময়ও তা কাম্য| হাদীসে এসেছে,
عن عبد الله ابن أبي قتادة أن أباه أخبره قال بينما نحن نصلي مع رسول الله صلي الله عليه وسلم فسمع جلبة فقال ماشانكم؟ قالوا إستعجلنا إلى الصلاة قال فلا تفعلواإذا أتيتم الصلاة فعليكم السكينة فماأدركتم فصلوا وماسبقكم فأتموا
অর্থাৎ, আবু কাতাদা রা. বলেন, একবার আমরা নবীজী সা: এর সাথে নামায পড়ছিলাম| নবীজী সা: সামান্য আওয়াজ শুনলেন| নামাযের পর জিজ্ঞেস করলে কেউ কেউ বলল, আমরা নামাযের দিকে দ্রুত এসেছিলাম| নবীজী সা: বললেন, আর কখনো এমন করো না| নামাযের দিকে ধীরেসুস্থে আসবে| অতঃপর যা পাবে তা পড়বে আর যা ছুটবে তা পূরণ করে নেবে| (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ৬০৩)
৪. মসজিদে প্রবেশের সুন্নতসমূহ|
ক. বিসমিল্লাহ পড়া| (মুসনাদে আহমাদ,হাদীস নং:২৬৪৭৩)
খ. দরূদ শরীফ পড়া| (মুসনাদে আহমাদ,হাদীস নং:২৬৪৭২)
গ.অতপর এই দু‘আ পড়া| (মুসলিম শরীফ, হাদীস নং ৭১৩)
اَللّٰهُمَّ افْتَحْ لِيْ أَبْوَابَ رَحْمَتِكَ
উল্লেখিত দু‘আসমূহ একত্রে এভাবে পড়া যায়-
بِسْمِ اللهِ والصلوة وَالسَّلَامُ عَلٰى رَسُولِ اللهِ اَللّٰهُمَّ افْتَحْ لِيْ أَبْوَابَ رَحْمَتِكَ
ঘ. তারপর ডান পা দিয়ে মসজিদে প্রবেশ করা, (বুখারী শরীফ, হাদীস নং: ৪২৬)
ঙ.মসজিদে প্রবেশ করে ইতিকাফের নিয়ত করা (বুখারী শরীফ, হাদীস নং: ২০৪২)
৫.মসজিদ থেকে বের হওয়ার সুন্নতসমূহ|
ক. বিসমিল্লাহ পড়া| (মুসনাদে আহমাদ,হাদীস নং: ২৬৪৭৩)
খ. দরূদ শরীফ পড়া| (মুসনাদে আহমাদ,হাদীস নং: ২৬৪৭২)
গ.অতঃপর দু‘আ পড়া, (মুসলিম শরীফ,হাদীস নং: ৭১৩)
اَللّٰهُمَّ إِنِّيْ أَسْأَلُكَ مِنْ فَضْلِكَ
উল্লেখিত দু‘আসমূহ একত্রে এভাবে পড়া যায়-
بِسْمِ اللهِ والصلوة وَالسَّلَامُ عَلٰى رَسُولِ اللهِ اَللّٰهُمَّ إِنِّيْ أَسْأَلُكَ مِنْ فَضْلِكَ
ঘ.মসজিদের বাহিরে জুতার উপর বাম পা আগে রাখা| (মুস্তাদরাকে হাকেম হাদীস নং:৭৯১)
ঙ.অতঃপর প্রথমে ডান পায়ে জুতা পরা তারপর বাম পা রাখা| (বুখারী শরীফ, হাদীস নং: ৫৮৫৫)
৬.তাহিয়্যাতুল মসজিদ আদায় করা|
মসজিদে প্রবেশের পর প্রথমেই দুই রাকা‘আত নামায পড়া| এটি মসজিদের হক। এ বিষয়ে নবীজী সা: নির্দেশের ভাষায় উৎসাহ দিয়ে বলেন,
إِذَا دَخَلَ أَحَدُكُمُ المسْجِدَ فَلْيَرْكَعْ رَكْعَتَيْنِ قَبْلَ أَنْ يَجْلِسَ
তোমাদের কেউ যখন মসজিদে প্রবেশ করবে, সে যেন বসার আগেই দুই রাকা‘আত নামায পড়ে| (সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ৪৪৪)
আমাদের অনেকের মাঝেই এ বিষয়ে উদাসীনতা পরিলক্ষিত হয়, সময় ও সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তাহিয়্যাতুল মসজিদ আদায় করি না; অথচ এটি মসজিদের হক এবং নবীজী সা: এর অনেক গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত।
৭. মসজিদে ওযু অবস্থায় থাকতে চেষ্টা করা।
মসজিদে যতক্ষণ থাকি, উযু অবস্থায় থাকতে চেষ্টা করা, তাহলে মসজিদের সম্মান ও আদব রক্ষা হবে, তেমনি ফেরেশতাদের দু‘আও লাভ হবে।
নবীজী সা: বলেন,
المَلائِكَةُ تُصَلِّي علَى أحَدِكُمْ ما دامَ في مُصَلّاهُ، ما لَمْ يُحْدِثْ: اللَّهُمَّ اغْفِرْ له، اللَّهُمَّ ارْحَمْهُ
অর্থাৎ, নামাযের স্থানে বসা ব্যক্তির জন্য ফেরেশতাগণ মাগফিরাত ও রহমতের দু‘আ করতে থাকে, যতক্ষণ না তার উযু চলে যায় বা উঠে যায়। (সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ৪৪৫)
৮. যিকির-আযকার, তিলাওয়াত ইত্যাদি বেশি বেশি করা।
মসজিদ নির্মাণ করা হয় নামায, যিকির, তিলাওয়াত ইত্যাদি আমলের জন্য| মসজিদ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
فِیْ بُیُوْتٍ اَذِنَ اللهُ اَنْ تُرْفَعَ وَ یُذْكَرَ فِیْهَا اسْمُهٗ یُسَبِّحُ لَهٗ فِیْهَا بِالْغُدُوِّ وَ الْاٰصَالِ، رِجَالٌ لَّا تُلْهِیْهِمْ تِجَارَةٌ وَّ لَا بَیْعٌ عَنْ ذِكْرِ اللهِ وَ اِقَامِ الصَّلٰوةِ وَ اِیْتَآءِ الزَّكٰوةِ یَخَافُوْنَ یَوْمًا تَتَقَلَّبُ فِیْهِ الْقُلُوْبُ وَ الْاَبْصَارُ،
অর্থাৎ, আল্লাহ ঘরগুলোকে উচ্চমর্যাদা দিতে এবং তাতে তাঁর নাম উচ্চারণ করতে আদেশ করেছেন| তাতে সকাল ও সন্ধ্যায় তাসবীহ পাঠ করে এমন লোক যাদেরকে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বেচাকেনা আল্লাহর স্মরণ, নামায কায়েম ও যাকাত আদায় থেকে গাফেল করতে পারে না| তারা ভয় করে সেই দিনকে, যেদিন অন্তর ও দৃষ্টি ওলটপালট হয়ে যাবে| (সূরা নূর: ৩৬-৩৭)
এখানে আল্লাহ তাআলা মসজিদকে সমুন্নত করতে এবং তাতে আল্লাহর যিকির করতে আদেশ করেছেন| পাশাপাশি যারা মসজিদে আল্লাহর তাসবীহ পাঠ করে তাদের প্রশংসা করেছেন।
৯. মসজিদ পবিত্র ও পরিষ্কার রাখা।
এটি মসজিদ সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ
তা‘আলা বলেন,
وَ عَهِدْنَاۤ اِلٰۤی اِبْرٰهٖمَ وَ اِسْمٰعِیْلَ اَنْ طَهِّرَا بَیْتِیَ لِلطَّآىِٕفِیْنَ وَ الْعٰكِفِیْنَ وَ الرُّكَّعِ السُّجُوْدِ
অর্থ: আর আমি ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে হুকুম করি, তোমরা আমার ঘরকে সেই সকল লোকের জন্য পবিত্র কর, যারা (এখানে) তাওয়াফ করবে, ইতিকাফ করবে এবং রুকূ ও সিজদা আদায় করবে। (সূরা বাকারা : ১২৫)
আম্মাজান আয়েশা রা. বলেন,
أمَرَ رسولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم ببناءِ المساجدِ في الدورِ، وأن تُنَظَّفَ وتُطَيَّبَ
অর্থাৎ, নবীজী সা: প্রত্যেক মহল্লায় মসজিদ নির্মাণের অনুমতি দিয়েছেন এবং তা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে আদেশ করেছেন| (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং: ৪৫৫)
আমাদের অসচেতনতায় অনেক সময় মসজিদ অপরিষ্কার হয়ে যায়। কাদাযুক্ত জুতা-স্যান্ডেল নিয়ে অসতর্কভাবে মসজিদে প্রবেশ করার কারণে দেখা যায় কাদাপানি মসজিদের ফ্লোরে পড়ে। এরকম আরও অনেক বিষয় থাকে, যেক্ষেত্রে আমাদের অসচেতনতায় মসজিদ অপরিচ্ছন্ন হয়; আমাদেরকে সেসব বিষয়ে সচেতন হতে হবে। সবসময় চেষ্টা করব, আমি মসজিদ পরিচ্ছন্ন রাখতে অবদান রাখব, অপরিচ্ছন্নতায় নয়।
১০. কোনো প্রকার দুর্গন্ধযুক্ত বস্তু নিয়ে মসজিদে প্রবেশ না করা।
নবীজী সা: বলেন,
من أكل من هذه الشجرة المنتنة فلا يقربن مسجدنا فإن الملائكة تتأذى مما يتأذى منه الإنس
অর্থাৎ, যে ব্যক্তি এই দুর্গন্ধযুক্ত খাবার (অর্থাৎ পেঁয়াজ-রসুন) খাবে, সে যেন (তা থেকে মুক্ত না হয়ে) আমাদের মসজিদে না আসে। কেননা, দুর্গন্ধের কারণে মানুষের মতো ফেরেশতাদেরও কষ্ট হয়। (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ৫৬৪)
উল্লেখ্য, মুখের দুর্গন্ধের ন্যায় ঘামের কিংবা অন্য কোনো জিনিসের, যেকোনো ধরনের দুর্গন্ধ নিয়ে মসজিদে প্রবেশ করা আদবের খেলাফ। এ কারণেই জুমু‘আর দিন গোসল, মিসওয়াক ও সুগন্ধির নির্দেশ এসেছে। (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ৮৪৬-৮৪৭)
১১. মসজিদে আওয়াজ উঁচু না করা এবং শোরগোল না করা।
অনেক মানুষ মসজিদে উঁচু আওয়াজে কথা বলেন| সাধারণ প্রয়োজনীয় কোনো কথা বলার সময় আওয়াজ উঁচু করেন অথবা খামোখা উঁচু আওয়াজে এটা-সেটা বলেন বা কাউকে ডাকেন| তেমনি সামান্য সামান্য বিষয় নিয়ে মসজিদে হট্টগোল বাঁধিয়ে দেন। কখনো মসজিদে নিজের উপস্থিতি জানান দেওয়া বা প্রভাব বিস্তারের জন্যও উঁচু আওয়াজে কথা বলেন| আমি মসজিদের এই, আমি এলাকার সেই! এটা অন্যায় ও অনেক গর্হিত কাজ।
আহা, কার ঘরে এসে উঁচু আওয়াজে কথা বলছি! এটা তো মহান রবের ঘর। এখানে কেবল তাঁর আওয়াজই উঁচু হবে| তাঁর যিকিরের আওয়াজই উচ্চারিত হবে আর সকল আওয়াজ থাকবে নিচু।
কোথায় এসে নিজেকে উঁচু ঠাওরাচ্ছি, বাহাদুরি প্রকাশ করছি! এটা উঁচু হওয়ার বা প্রভাব-প্রতিপত্তি দেখানোর জায়গা নয়; এটা তো বিনয়ী ও নিচু হওয়ার স্থান| নিজেকে ছোট হিসেবে প্রকাশের স্থান।
সুতরাং, কখনোই মসজিদে আওয়াজ উঁচু করব না। প্রয়োজনীয় কোনো কথাও বিনয়ের সাথে নিচু আওয়াজে বলার চেষ্টা করব। মসজিদে আওয়াজ উঁচু করার বিষয়ে নবীজী সা: হাদীস শরীফে সতর্ক করেছেন,
إياكم وهيشات الأسواق
অর্থাৎ, সাবধান! (মসজিদে) বাজারের মতো শোরগোল করো না। (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ৪৩২)
সাহাবায়ে কেরাম রা. ও এ ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতেন| একবার তায়েফের দুই লোক মসজিদে নববীতে উঁচু আওয়াজে কথা বললে উমর রা. তাদের ডেকে পাঠালেন এবং বললেন,
لو كنتما من أهل البلد لأوجعتكما ضرباً، ترفعان أصواتكما في مسجد رسول الله صلى الله عليه وسلم
অর্থাৎ, তোমরা মদীনার হলে আমি তোমাদের বেত্রাঘাত করতাম, মসজিদে নববীতে আওয়াজ উঁচু করো! (সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ৪৭০)
কিছু মানুষ নিজে তো গল্পগুজব করে না বা উঁচু আওয়াজে কথা বলে না; কিন্তু কেউ গল্পগুজব করলে বা কথা বললে তাকে নিষেধ করতে গিয়ে নিজের আওয়াজ এতটা উঁচু করে যে, তাদের গল্পগুজবের কারণে মুসল্লীদের যতটুকু আমলে ব্যাঘাত হচ্ছিল-না হচ্ছিল, তার ‘চুপ করো’ এর উঁচু আওয়াজে আরও বেশি ব্যাঘাত ঘটে| তাই তো জুমু‘আর দিন কেউ কথা বললে, তাকে ‘চুপ করো’ বলাকেও হাদীস শরীফে অনর্থক ও অর্থহীন কাজ বলা হয়েছে|
শুধু তাই নয়, অন্যের আমলে ব্যাঘাত হবে দেখে নবীজী সা: মসজিদে তিলাওয়াতের মতো গুরুত্বপূর্ণ আমলও উঁচু আওয়াজে করতে নিষেধ করেছেন। হাদীস শরীফে এসেছে,
একবার নবীজী সা: ই‘তেকাফে ছিলেন| তখন কিছু মানুষকে উচ্চৈঃ স্বরে তিলাওয়াত করতে শুনে পর্দার আড়াল থেকে মাথা বের করে বললেন,
أَلَا إِنَّ كُلَّكُمْ مُنَاجٍ رَبَّه، فَلَا يُؤْذِيَنَّ بَعْضُكُمْ بَعْضًا، وَلَا يَرْفَعْ بَعْضُكُمْ عَلى بَعْضٍ فِي الْقِرَاءَةِ، أَوْ قَالَ: فِي الصَّلَاةِ
অর্থাৎ, তোমাদের প্রত্যেকেই নিজ রবের সাথে মুনাজাতে (চুপিসারে কথোপকথনে) লিপ্ত। সুতরাং কেউ যেন কাউকে কষ্ট না দেয়। কেউ যেন অন্যের চেয়ে উঁচু আওয়াজে তিলাওয়াত না করে। অথবা বলেছেন, নামাযে একে আপরের চেয়ে উঁচু আওয়াজে তিলাওয়াত না করে।
(সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং: ১৩৩২; শু‘আবুল ঈমান, বাইহাকী, হাদীস নং: ২৪১২)
১২. মসজিদে নিজের জন্য স্থান নির্দিষ্ট না করা।
হাদীস শরীফে এসেছে,
عن عبد الله ابن مسعود قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم ليلنِي منكم أولو الأحلامِ والنُّهى ثمَّ الَّذينَ يلونَهُم ثمَّ الَّذينَ يلونَهُم
অর্থাৎ, শরীয়তের বিধান হল প্রাপ্তবয়স্করা সামনের কাতারে দাঁড়াবেন আর ছোটরা পেছনে। শরঈ বিষয়ে যারা জ্ঞানী, তারা ইমামের কাছাকাছি দাঁড়াবেন। ( সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ৪৩২)
এছাড়া যে আগে আসবে সে আগে স্থান পাবে, যে পরে আসবে সে পেছনে বসবে। শরীয়ত প্রদত্ত এই অগ্রাধিকারের অতিরিক্ত চাওয়া বা নিজের জন্য মসজিদে কোনো স্থান নির্দিষ্ট করা যে- কেউ আগে আসলেও এখানে দাঁড়াতে পারবে না- এমনটি করা মসজিদের আদবের খেলাফ।
এক বর্ণনায় এসেছে,
إِنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهَى عَنْ ثَلَاثٍ: عَنْ نَقْرَةِ الْغُرَابِ، وَافْتِرَاشِ السَّبعِ، وَأَنْ يُوطِّنَ الرَّجُلُ الْمَقَامَ لِلصَّلَاةِ كَمَا يُوطِّنُ الْبَعِيرُ.
অর্থাৎ নবীজী সা: তিন কাজ করতে নিষেধ করেছেন:
১. কাকের মতো ঠোকর দিতে (নামাযে সিজদা অতি দ্রুত করতে)
২. হিংস্র প্রাণীর মতো (সিজদার সময় যমীনে) হাত বিছিয়ে দিতে
৩. উটের মতো স্থান নির্ধারণ করতে (উট যেমন সবসময় এক স্থানেই বসে; তেমনি মসজিদে নিজের জন্য স্থান নির্ধারণ করা সবসময় ঐ স্থানেই নামায পড়া)। (সুনানে নাসায়ী, হাদীস নং: ১১১২)
১৩. মসজিদে কাউকে কোনোভাবে কষ্ট না দেওয়া।
মুসলমানের পরিচয় হল, সে যেমন সরাসরি কাউকে কষ্ট দেয় না; কারো কষ্টের কারণও হয় না।
নবীজী সা: বলেন,
المسلم من سلم المسلمون من لسانه ويده
অর্থাৎ, সেই ব্যক্তি হল মুসলমান, যার অনিষ্ট থেকে অপর মুসলমান নিরাপদে থাকে। (সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ১০)
এখানে ‘অপর মুসলমানকে কষ্ট দেয় না’ একথা না বলে ‘অপর মুসলমান নিরাপদে থাকে’ বলা হয়েছে। সুতরাং মসজিদের সম্মান রক্ষার্থে আমাদের সবিশেষ সতর্কতা কাম্য; যেন এই মহিমান্বিত ঘরে কোনোভাবেই আমি কারো কষ্টের কারণ না হই।
মসজিদে আমরা যেভাবে অন্যের কষ্টের কারণ হই (কয়েকটি উদাহরণ):
১. মসজিদে প্রবেশ ও বের হওয়ার সময় আমরা জুতা পায়ে অন্যের জুতার উপর দিয়ে হেঁটে যাই। এতে অন্যের জুতা ময়লা হয়, ফলে তার কষ্ট হয়| তেমনি মসজিদে প্রবেশ বা বের হওয়ার সময় আওয়াজ করে জুতা-স্যান্ডেল রাখি, যার ফলে ইবাদতকারীর আমলে ব্যাঘাত ঘটে।
২. অনেক সময় আমরা চলাচলের স্থানে বা সামনে খালি থাকা সত্ত্বেও একেবারে পেছনের কাতারে দাঁড়িয়ে নামায আরম্ভ করি; ফলে অন্যের চলাচলে কষ্ট হয়।
৩. জনবহুল এলাকার মসজিদগুলোতে জুমু‘আর দিন শেষদিকে আসা মুসল্লিদের দীর্ঘক্ষণ বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। একটু বসার জায়গা পর্যন্ত পায় না| অথচ ভেতরে অনেক ফাঁকা জায়গা পড়ে থাকে। ভেতরের লোকগুলো ফাঁকা জায়গা পূরণ করে বসলে বা অন্যদেরকে সামনে যাওয়ার সুযোগ দিলে তাদের এত কষ্ট হয় না!
এমন আরও অনেক কাজ আছে, যেগুলোর দ্বারা আমরা মসজিদে অন্যের কষ্টের কারণ হই। একটু খেয়াল করলে আমাদের নযরেও ধরা পড়বে ইনশাআল্লাহ।
১৪. মানুষকে না ডিঙানো।
হাদীস শরীফে এসেছে,
عن عبد الله ابن بسر قال جاءَ رجلٌ يتخطَّى رقابَ النَّاسِ يومَ الجمعةِ والنَّبيُّ صلى الله عليه وسلم يخطبُ فقالَ لَهُ النَّبيُّ صلى الله عليه وسلم: اجلس فقد آذيتَ
অর্থাৎ আবদুল্লাহ ইবনে বুসর রা. বলেন, একবার নবীজী সা: খুতবা দিচ্ছিলেন; এমতাবস্থায় এক ব্যক্তি মানুষকে ডিঙিয়ে সামনে আসছিল| তখন নবীজী সা: বললেন, (তুমি যেখানে আছ, ওখানেই) বসো, তুমি তো মানুষকে কষ্ট দিয়ে দিলে। (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং: ১১১৮)
সুতরাং আমাদের উচিত, মসজিদে এসে যেখানে জায়গা পাওয়া যায়, সেখানেই বসে যাওয়া।
তবে সামনের খালি স্থান পূরণের জন্য কেউ যদি আদব রক্ষা করে, কাউকে কষ্ট না দিয়ে সামনে যায়, তা এ নিষেধাজ্ঞার মধ্যে পড়বে না। কেননা, এর জন্য তো তারাই দায়ী, যারা সামনে ফাঁকা রেখে পেছনে বসে গেছে| (ফাতহুল বারী ২/৪৮২)
১৫. দুনিয়াবী কাজে মসজিদ ব্যবহার না করা।
মসজিদে এসে দ্বীনী কাজে ব্যস্ত থাকাই কাম্য| অন্য কাজ করলে মসজিদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়, মাহাত্ম্য নষ্ট হয়। এ প্রসঙ্গে দুটি হাদীস লক্ষ করি,
عن أبي هريرة رضى الله عنه قال, قال رسول الله صلى الله عليه وسلم من سَمِعَ رجُلًا يَنشُدُ ضالَّةً في المسجدِ فليقُلْ لا ردَّهَا اللَّهُ إليكَ فإنَّ المساجِدَ لَم تُبنَ لهذاَ
অর্থাৎ, হযরত আবু হুরাইরা রা.হতে বর্ণিত, নবীজী সা: বলেন, মসজিদে কাউকে হারানো জিনিসের এলান করতে দেখলে বলবে, আল্লাহ তোমাকে এই জিনিস ফিরিয়ে না দেন। মসজিদ তো এজন্য বানানো হয়নি| (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ৫৬৮)
অপর হাদীসে এসেছে, নবীজী সা: বলেন,
إذا رأيتُم من يبيعُ أو يبتاعُ في المسجدِ، فقولوا : لا أربحَ اللهُ تجارتَك
অর্থাৎ, তোমরা কাউকে মসজিদে বেচাকেনা করতে দেখলে বলবে, আল্লাহ তোমাকে লাভবান না করুন। (জা‘মে তিরমিযী, হাদীস নং: ১৩২১)
১৬. মসজিদে মোবাইল ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বন করা।
মসজিদ আল্লাহর ঘর। এখানে অন্যের ইবাদতের বিঘ্ন সৃষ্টি হয় এমন কোনো কাজ করা জায়েয নেই। অবশ্য অন্যের ইবাদতের কোনো ক্ষতি না হয় এভাবে মোবাইলে প্রয়োজনীয় কথাবার্তা ও বৈধ কোনো কাজে ইন্টারনেট ব্যবহারের অবকাশ আছে| তবে অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা ও কোনো নাজায়েজ ছবি বা ভিডিও দৃষ্টিগোচর হয় এমন কাজ থেকে বিরত থাকা জরুরী| হাদীস শরীফে এসেছে, নবীজী সা: বলেন,
إن المساجد لم تُبنَ لهذا، إنما بنيت لذكر الله والصلاة وقراءة القرآن
অর্থাৎ, মসজিদ আল্লাহর যিকির, নামায ও কুরআনে কারীম তিলাওয়াতের জন্য। (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৮৫)
আর মসজিদে প্রবেশের পূর্বেই রিংটোন বন্ধ করে দেয়া আদব| বিশেষ করে কেউ ইবাদতে মগ্ন থাকলে বা জামা‘আতের সময় হলে এ বিষয়ে যত্নবান হওয়া খুবই জরুরী। এরপরও যদি কখনও রিংটোন বন্ধ করতে ভুলে যায় এবং রিং বাজতে থাকে, তাহলে এক হাত দিয়ে অল্প সময়ে তথা তিন তাসবীহ পরিমাণ সময়ের কমে সম্ভব হলে বন্ধ করে দিবে; এতে নামায নষ্ট হবে না। (ফাতাওয়ায়ে কাযীখান ১/১২৯), (আহসানুল ফাতাওয়া ৩/৪২০)
১৭. মসজিদে বাতকর্ম না করা|
ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়ায় বলা হয়েছে,
وقال فى الهندية: وَاخْتُلِفَ في الذي يَفْسُو في الْمَسْجِدِ فلم يَرَ بَعْضُهُمْ بَأْسًا وَبَعْضُهُمْ قالوا لَا يَفْسُو وَيَخْرُجُ إذَا احْتَاجَ إلَيْهِ وهو الْأَصَحُّ كَذَا في التُّمُرْتَاشِيِّ. انتهىى من كتاب الكراهية
অর্থাৎ, মসজিদে ইচ্ছাকৃত বায়ূ ত্যাগ করা বিষয়ে ফুকাহায়ে কেরাম দ্বিমত পোষণ করেছেন। তাঁদের একদল এটাকে কোনো সমস্যা মনে করেননি। অপর একদল ফকীহ বলেন, মসজিদে ইচ্ছাকৃত বায়ূ ত্যাগ করবে না। বরং প্রয়োজন অনুভব করলে বাইরে চলে যাবে। তুমুরতাশী বলেছেন, এমতটি অধিক বিশুদ্ধ (অর্থাৎ ইচ্ছাকৃত বায়ূত্যাগ থেকে বিরত থাকা)। বলাবাহুল্য, ভদ্রজন কখনোই মানুষের ভরা মজলিসে ইচ্ছাকৃত বায়ূ ত্যাগ করেন না। (আলমগীরী, কিতাবুল কারাহিয়্যা৫/৩৭১)
মসজিদে খাওয়া ও ঘুমানোর বিধান:
মসজিদের আদব ও পবিত্রতার প্রতি লক্ষ রেখে প্রয়োজনে মসজিদে ঘুমানো ও পানাহার করা জায়েয| তবে ই‘তেকাফের নিয়ত করে নেয়া ভালো।
এ সংক্রান্ত কয়েকটি বর্ণনা:
আবদুল্লাহ বিন হারেস রা. থেকে বর্ণিত,
كنا نأكلُ على عهدِ رسولِ اللهِ صلَّى اللهُ عليْهِ وسلَّمَ في المسجدِ الخبزَ واللحمَ
অর্থাৎ, আমরা রাসূলুল্লাহ সা: এর যুগে মসজিদে রুটি ও গোশত খেতাম। (ইবনে মাজাহ, হাদীস নং: ২৬৬৯)|
অন্য হাদীসে এসেছে, হযরত জাবের রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা: প্রত্যেক কর্তিত খেজুর থেকে ডালাসহ মিসকীনদের জন্য ১০ উসুক (১,৩০৪.১৬ কিলোগ্রাম) মসজিদে লটকিয়ে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। (আবূ দাউদ, হাদীস নং: ১৪৬৪)।
২. বুখারী শরীফের এক বর্ণনায় রয়েছে, সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যায়েদ আনসারী রা. থেকে বর্ণিত,
أَنَّهُ رَأَى رَسُولَ اللَّهِ مُسْتَلْقِيًا فِي الْمَسْجِدِ وَاضِعًا إِحْدَى رِجْلَيْهِ عَلَى الْأُخْرَى وَعَنِ ابْنِ شِهَابٍ، عَنْ سَعِيدِ بْنِ الْمُسَيِّبِ ، قَالَ: كَانَ عُمَرُ وَعُثْمَانُ يَفْعَلَانِ ذَلِكَ
অথাৎ, তিনি রাসূলুল্লাহ সা: কে মসজিদে এক পা অপর পায়ের উপর রেখে চিৎ হয়ে শুয়ে থাকতে দেখেছেন| হযরত সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব বলেন, হযরত উমর ও উসমান রা.ও এভাবে মসজিদে ঘুমাতেন| (সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ৪৭৫)
৩. হযরত সাহল ইবনে সা‘দ রা. বলেন,
جَاءَ رَسُولُ اللَّهِ بَيْتَ فَاطِمَةَ فَلَمْ يَجِدْ عَلِيًّا فِي الْبَيْتِ، فَقَالَ: أَيْنَ ابْنُ عَمِّكِ؟ قَالَتْ: كَانَ بَيْنِي وَبَيْنَهُ شَيْءٌ فَغَاضَبَنِي فَخَرَجَ فَلَمْ يَقِلْ عِنْدِي، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ لِإِنْسَانٍ: انْظُرْ أَيْنَ هُوَ، فَجَاءَ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، هُوَ فِي الْمَسْجِدِ رَاقِدٌ، فَجَاءَ رَسُولُ اللَّهِ وَهُوَ مُضْطَجِعٌ قَدْ سَقَطَ رِدَاؤُهُ عَنْ شِقِّهِ وَأَصَابَهُ تُرَابٌ، فَجَعَلَ رَسُولُ اللَّهِ يَمْسَحُهُ عَنْهُ، وَيَقُولُ: قُمْ أَبَا تُرَابٍ، قُمْ أَبَا تُرَابٍ.
অর্থাৎ, একদিন রাসূলুল্লাহ সা. হযরত ফাতেমার ঘরে এসে আলী রা. কে পাননি। জিজ্ঞেস করলেন, আলী কোথায়? ফাতেমা বললেন, আমাদের দু’জনে মধ্যে কিছু রাগারাগি হয়েছে। ফলে তিনি রাগ করে বাইরে চলে গেছেন। রাসূলুল্লাহ সা. একজনকে বললেন, তাকে একটু খুঁজে দেখ কোথায়। লোকটি এসে জানাল, আলী মসজিদে ঘুমিয়ে আছেন।
রাসূলুল্লাহ সা. এসে দেখলেন আলী শুয়ে আছেন। শরীরের এক পাশ থেকে চাদর পড়ে গেছে। আর গায়ে ধুলো-বালি লেগে রয়েছে। রাসূলুল্লাহ সা. তাঁর গায়ের বালি ঝেড়ে দিচ্ছেন আর বলছেন ‘আবূ তোরাব উঠ উঠ। (সহীহ বুখারী, হাদীস নং:৪৪১)
৪. সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. নিজের সম্পর্কে বলেন,
عَبْدُ اللَّهِ إبن عمر أَنَّهُ كَانَ يَنَامُ وَهُوَ شَابٌّ أَعْزَبُ لَا أَهْلَ لَهُ فِي مَسْجِدِ النَّبِيِّ .
অর্থাৎ, তিনি ছিলেন অবিবাহিত যুবক। স্ত্রী-পুত্র কেউ ছিল না। তখন তিনি মসজিদে নববীতেই (রাতে ও দিনে) ঘুমাতেন। (সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ৪৪০)
এ ছাড়া অসংখ্য হাদীস থেকে জানা যায়, আসহাবুস সুফফার শিক্ষার্থীরা মসজিদে থাকতেন। তাঁরা মসজিদে পানাহার করতেন। তা ছাড়া তাবুক যুদ্ধের পর তিন ব্যক্তিকে মসজিদে বেঁধে রাখা হয়েছিল। তাঁদের জন্য মসজিদেই পানাহারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তাঁদের ঘটনা সূরা তওবার ১১৭ ও ১১৮ নম্বর আয়াতে বর্ণিত হয়েছে।
৫. হানাফী মাযহাবের প্রসিদ্ধ কিতাব ‘আলফাতাওয়াল হিন্দিয়া’য়
(ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী) উদ্ধৃত হয়েছে,
وَلَا بَأْسَ لِلْغَرِيبِ وَلِصَاحِبِ الدَّارِ أَنْ يَنَامَ في الْمَسْجِدِ في الصَّحِيحِ من الْمَذْهَبِ وَالْأَحْسَنُ أَنْ يَتَوَرَّعَ فَلَا يَنَامُ كَذَا في خِزَانَةِ الْفَتَاوَى
অর্থাৎ, বিশুদ্ধ মত অনুসারে মুসাফির ও স্থানীয় উভয়ের জন্যই মসজিদে ঘুমানো জায়েয। তবে উত্তম হল (প্রয়োজন ছাড়া) না ঘুমানো|
(ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী: ৫/৩২১)
তবে অপ্রয়োজনে ঘুমানো উচিত নয় এ ব্যাপারে অন্যত্র উদ্ধৃত হয়েছে,
وَيُكْرَهُ النَّوْمُ وَالْأَكْلُ فيه لِغَيْرِ الْمُعْتَكِفِ وإذا أَرَادَ أَنْ يَفْعَلَ ذلك يَنْبَغِي أَنْ يَنْوِيَ الِاعْتِكَافَ فَيَدْخُلَ فيه وَيَذْكُرَ اللَّهَ تَعَالَى بِقَدْرِ ما نَوَى أو يُصَلِّيَ ثُمَّ يَفْعَلَ ما شَاءَ
ই‘তিকাফের নিয়ত ছাড়া মসজিদে ঘুমানো ও খাওয়া-দাওয়া করা মাকরূহ (তবে এটি মাকরূহে তাহরীমী তথা হারাম নয়; বরং মাকরূহে তানযীহী অর্থাৎ, অপছন্দনীয় ও অনুচিত কাজ)। তাই যদি কেউ মসজিদে ঘুমাতে চায়, তাহলে তার উচিৎ ই‘তিকাফের নিয়তে মসজিদে প্রবেশ করে ইচ্ছানুসারে আল্লাহর যিকির অথবা নামায পড়ে নেবে। তার পর যা ইচ্ছা করবে| (ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী: ৫/৩২১)
ইবনে আবেদীন শামী রহ. তাঁর বিখ্যাত ফিকহ গ্রন্থ “ফাতাওয়ায়ে
শামীতে” লেখেন,
قال فى الدر المختار: لكن قال ابن كمال لا يكره الأكل والشرب والنوم فيه مطلقا ونحوه…… والظاهر أن مثل النوم الأكل والشرب إذا لم يشغل المسجد ولم يلوثه لأن تنظيفه واجب كما مر.
অর্থাৎ, ইবনু কামাল পাশা রহ. বলেন, ই‘তিকাফকারী ছাড়া অন্যদের জন্যও মসজিদে ঘুমানো জায়েয। ব্যক্তি স্থানীয় হোক বা মুসাফির| তবে মসজিদে ঘুম খাওয়া-দাওয়া জায়েয বটে; কিন্তু তা যেন মসজিদকে অপবিত্র না করে| কারণ, মসজিদ পবিত্র রাখা ওয়াজিব। (ফাতাওয়ায়ে শামী: ২/৪৯৪)
সুতরাং, মসজিদে ই‘তিকাফের নিয়ত ছাড়াও ঘুমানো জায়েয। তবে ই‘তিকাফের নিয়ত করে নেয়া ভাল। তবে সর্বাবস্থায়ই মসজিদের আদবের প্রতি লক্ষ রাখা আবশ্যক।
সারকথা:
মসজিদ সর্বাধিক পবিত্র স্থান। মুমিনের হৃদয়ের প্রশান্তির জায়গা। মসজিদের আদব রক্ষা অন্তরের তাকওয়ার বহিঃপ্রকাশ। তাই আসুন আমরা মসজিদের আদব রক্ষায় সচেতন হই, মুত্তাকী ও পরহেযগারদের কাতারে শামিল হই। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
ذٰلِكَ وَمَنْ یُّعَظِّمْ شَعَآىِٕرَ اللهِ فَاِنَّهَا مِنْ تَقْوَی الْقُلُوْبِ.
আর কেউ আল্লাহর ‘শা‘আইর’ (নিদর্শনাবলি) কে সম্মান করলে, এটা তো তার হৃদয়ের তাকওয়া সঞ্জাত। (সূরা হজ্ব: ৩২)
মুফতী তাওহীদুল ইসলাম
নাযেমে দারুল ইক্বামা,
জামি‘আতুল আবরার আল-ইসলামিয়া টাঙ্গাইল